ফিরে আসা ভালোবাসা

লেখকঃ শিমুল

আজকে যেমন রোদ উঠেছে এই রোদে আগুন ছাড়াও তেল গরম করে পুরি ভেজে খাওয়া যাবে অনায়েসে। বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি বাস স্টপে বাসের কোন পাত্তা নাই। যাও একটা দুটা আসতেছে হুস হাস করে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। আজকে তারা অতিশয় ভদ্র এবং নিয়ম পালনকারী হয়েছে। গেইটলক করে গাড়ি চালাচ্ছে। স্টপে গাড়ি থামার সাথে সাথে দৌড়ে উঠতে যাচ্ছি তা তারা উঠতে দিবেনা। কারন জিজ্ঞেস করলে বলতেছে -সিটিং গাড়ি ভাইজান দাঁড় করিয়ে লোক নেয়া যাবেনা। মেজাজ যে কি পরিমান চড়ে যাচ্ছিল কথা শুনে তা বলে বুঝাতে পারবোনা। মনে চাচ্ছিল হেলপাররে বলি -ওই তোর মাদার ফাদার-রে আজকে আমার সালাম দিস। হা হা হা এত্ত মেজাজ খারাপ তার পরও এই কথাটা মনে হওয়ার সাথে সাথে হেসে ফেললাম। হেলপার বলে ভাইজান হাসেন কেন, আমি কিছুনা বলে আবার আমার স্টপে ফেরত আসি। মনে পড়ে গেল তরুণ এর কথা। মনে পড়ে গেল বললে ভূল হবে, তার বিচরন তো সর্বক্ষণই আমার ভিতর। তরুণ সচরাচরই জানে যে আমি কখনই স্ল্যাং দেই না। কিন্তু ও যখন স্ল্যাং দেয় তখন হাসতে হাসতে পেটে আমার খিল পড়ে যায়। প্রতিটা স্ল্যাং ওর মোডিফাই করা চাই ই চাই। সেই রকম মাদার ফাকারের তরুণ সংস্করণ মাদার ফাদার। স্ল্যাংটা আমার খুব পছন্দের। এইসব কথা যখন ভাবছি হঠাৎ করেই দেখলাম রোদের লু হাওয়াটা লিলুয়া বাতাসে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এই তেলে ভাজা গরমেও এখন মুটামুটি একটু আরাম লাগছে। যাত্রি ছাউনিতে বসার জন্য পাতা বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে হতাশ হলাম কারন অধিকাংশ পাইপ-ই টোকাই বাবাদের নিপুন চুরির স্বীকার, তাই বেঞ্চ মশাইও আমার করুণ অবস্থা দেখে তার বিশাল হা দিয়ে হাসছে। যাই হোক কোনরকমে বেঞ্চের একপাশে বসলাম আর বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। আজ আমার কোন তাড়া নাই, তাই গা এলিয়ে এই অপেক্ষা। অন্যান্যদিন হলে যে করেই হোক যে বাস আসবে তাতে চড়া চাই ই চাই। বাসের ভিতর না উঠতে পারলেও ঝুলে যাওয়া চাই। কারন এটাই আমাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বল্প বেতনের চাকুরীজীবির দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ চিত্র।

বসে বসে যখন ঝিমুনি চলে এসেছে, রাস্তার ঐপাশে যা দেখলাম তা বিশ্বাস করার মত নয়। একটা ছেলে লাল রঙের টি শার্ট পড়া, চোখে সানগ্লাস, পরনে রাউডি রাঠোর মুভি থেকে উঠে আসা ট্রেন্ড সিরিজের সোনালী রঙের প্যান্ট হাসি হাসি মুখে রাস্তার ফুল বিক্রেতা এক পিচ্ছির সাথে কথা বলতেছে আর ফুল কিনতেছে। খুবই সাধারণ চিত্র কিন্তু আমার মনের খুব ভিতরে ঝড় তুলে দেয়ার মত এক ঘটনা। এমন সময়েই বাস আসল এবং বাসের হেলপার বলতে গেলে একরকম টেনে হিঁচড়েই আমাকে বাসে তুলল, যেন এই বাসে না উঠলে আজকে তাদের হাড়ি উনুনে চড়বে না। বাসে চড়লাম এবং দেখলাম ছেলেটি সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে এক লাইব্রেরীর সামনে দাড়িয়ে কারো সাথে কথা বলছে, দেখতে চাচ্ছিলাম ছেলেটা কোন দিকে যায় একটু খেয়াল করি, কিন্তু আজ আর তা হতে? আমার বাস, আমার সোনার বাংলার রয়েল বেঙ্গল বাস, বাঘের মত তীব্র গর্জন করতে করতে আমার আশা কিছূ নিকশ কালো ধোঁয়ায় উড়িয়ে বীর দর্পে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। আমি দেখেছি এমনই হয়, যখন যা চাইনা তাই খুব বেশী বেশী করে আমার সাথেই হয়। বাসায় ফিরলাম ঘামে চুপচুপ হয়ে, নিজের দিকে তাকিয়ে আমার নিজেরই খুব অস্বস্তি হতে লাগলো। ফ্যানটা ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে শার্টটা খুলে বাথরুমের পানি ভরতি বালতিতে ছেড়ে দিলাম এবং বাকি কাপড় গুলো ছেড়ে নিজেকে শাওয়ারের নিচে সপে দিলাম। শাওয়ারের মুক্তোর মত জলগুলো আমার শরীরের উপর আছড়ে পড়তে লাগলো। আমি নিজের শরীর নিজেই মুগ্ধ হয়ে দেখছি, সাবান ডলার সময় শরীরের প্রতিটি রোমে রোমে আমার যৌবনের অনুভূতি নিচ্ছি। এভাবে একযুগ সময় নিয়ে এবং বাড়িওয়ালির ট্যাংকির পানি পুরোপুরি খালি করে বাথরুম থেকে বের হয়ে আসি। মেজাজ এবং মন দুইটাই খুব ফুরফুরে লাগছে এখন। তাই চট করে নিজের পরিচয়টা দিয়ে নেই- আমি আসাদ একজন এতিম ছেলে। বাবা ছোট বেলাতেই আর মা মারা গিয়েছেন মাস্টার্স প্রথম পর্বের সময়। গ্রামে যতটুকু সম্পদ ছিলো বেঁচে দিয়ে ঢাকায় চলে এলাম এবং এক পরিচিতর বাসার ছাদের চিলেকোঠার রুমে আমার স্থায়ী আস্তানা গাড়লাম। ভার্সিটি লাইফ থেকেই পত্রিকায় লিখা লিখি করতাম এবং প্রাইভেট টিউশানি করাতাম। গ্রাজুয়েশনের পর পত্রিকা অফিসে পারমানেন্ট কলামিস্টের চাকুরীটা পেয়ে যাই। এভাবেই চলছে আমার এখনকার জীবন।

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে অফিসের কাজে ধানমন্ডিতে গেলাম। কাজ শেষে ফেরার পথে মনে হলো একটু রাইফেল স্কয়ার হয়ে যাই। রাইফেল স্কয়ারে ঢুকে সাজানো সীমান্তের পাশের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যেতেই চরম এক ধাক্কা খেলাম দৌড়ে নেমে আসা এক ছেলের সাথে। ছেলেটির হাতে একটি বই ছিলো যেটা পড়ল আমার পায়ের কাছে আর ছেলেটা হুমড়ি খেয়ে পড়ল রেলিং এর উপর। উচিৎ শিক্ষা হয়েছে -যেই বলতে যাবো চেয়ে দেখি বাস স্টপে দেখা সেই ছেলেটা। চোখে চোখ পড়তেই বুকের ভিতর এক শীতল শিহরণ বয়ে গেল। বইটা তুলতে গিয়ে আবারো অবাক হওয়ার পালা- হুমায়ূনের “লীলাবতী” অনেক প্রশ্ন বুকের ভিতর তোলপাড় করছিলো কিন্তু কিছুই বলতে পারিনি, বিনা শব্দে বইটি ছেলেটির হাতে তুলে দিলাম। ভদ্রতার পাছায় দুইটা লাথি মেরে ধাক্কা দেয়ার জন্য সরি বা বই তুলে দেয়ার জন্য থ্যাংকস কোনটা না জানিয়েই যেভাবে নামতেছিলো সেভাবেই আজব এক ভাব নিয়ে চোখের সমনে থেকে নিমিষেই উধাও হয়ে গেল ছেলেটা। নিজের মনেই ভাবতে লাগলাম কি হচ্ছে কি এসব? ছেলেটার কাছে হুমায়ূনের “লীলাবতী”ই থাকতে হবে কেন, পঞ্চকন্যা থাকলে কি এমন ক্ষতি হতো। চিন্তা করতে করতে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে এসে বসলাম এবং তরুনের সাথে কাটানো স্মৃতি মন্থনে লেগে গেলাম।

তরুন আমার ভার্সিটি লাইফের বন্ধু। ভার্সিটির মাসিক পত্রিকায় আমার প্রকাশিত লেখার সূত্র ধরেই ওর সাথে আমার পরিচয়। পড়াশোনাতে অসাধারন এই ছেলেকে কখনই আমি ক্লাস করতে দেখিনি। সারাদিন ইয়ার বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজী করেই তার দিনপাত। প্রতিদিন ভার্সিটিতে এসেই আমাকে খুঁজে বের করা আর “এই শালা তোর মাদার ফাদারকে আমার ছালাম দিস” এই ডায়ালগ বলা তার প্রতিদিনের এক রুটিন। আমার সাথে দীর্ঘক্ষণ বসে অবিশ্রান্ত আড্ডা, আমার ছোটখাটো পছন্দ গুলোকে প্রশ্রয় দেয়া, আমাকে কারনে অকারনে শাসন করা, আমাকে জোর করে মটরসাইকেলের পিছনে করে ঘোরানো সবই যেন ওর জন্মগত অধিকার। আমি একদিন ভয়ে ভয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা তুমি কি আমাকে শুধু আমার কলামের জন্যই এত পছন্দ কর নাকি অন্য আর কোন কারন আছে। আমি কখনই তোমার মত এত চঞ্চল না, আমার বন্ধু মহলও তোমার মত এত বিশাল না, খুব ধনী কিংবা খুব একটা ফ্যাশনেবলও না আমি, দেখতেও তো বাংলার পাঁচ তো আমাকে কেন তুমি এত প্রাধান্য দাও? ও শুধু একটা কথাই বলত আর সেটা হলো- ত্রিয়াং মনতঃ হুতাশনং লও, যদিত ধ্যানো তব্ আসাদং পাও। আমি এর মানে জিজ্ঞেস করলে সে আমাকে ধমকে বলত, মানে নিজে নিজে খুঁজে লও আর না পাইলে বাংলা একাডেমীতে যোগাযোগ করো।

হুমায়ূন ওর পছন্দের একজন লেখক আর ওর প্রিয় বই লীলাবতী, রাস্তায় কোন ফুল বিক্রেতা শিশু দেখলে বাইক থেকে নেমে গিয়ে তাদের সাথে ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলা এবং সবগুলো ফুল কিনে নিয়ে ফুলের তিনগুণ দাম দিয়ে দেয়া ওর সখ। রাস্তার পাশে দাড়িয়ে ফুচকা খাওয়াতেও তার জুড়ি নাই, দেখলে মনেই হবেনা এ কোন ধনীর দুলাল। আমি ওর এইসকল অতিসাধারন কর্মকান্ডে ধীরে ধীরে ওর প্রতি দূর্বল হতে থাকি। একজন ছেলের প্রতি অন্য এক ছেলের এই ধরনের দূর্বলতাকে সমাজ কিভাবে সংজ্ঞায়িত করে আমার জানা আছে কিন্তু তারপরেও আমি ওকে অন্তর থেকে ভালোবাসি। আমার ভালোবাসার নবিন কুড়ি তার পাপড়ি না মেলতেই আমাদের মাঝে এক ধনীর দুলালীর আবির্ভাবে তরুনকে পাওয়ার আগেই হারালাম আমি। ওদের দুজনের মাঝে নিজেকে একেবারেই অবাঞ্চিত মনে হতে লাগলো আমার। তরুণ মেয়েটিকে অসম্ভব পছন্দ করে এবং তাকে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। মানায়ও দুজনকে চরম, একজন বাইকে করে আরেকজন প্রাইভেট গাড়িতে আর আমি আমার পা দুখানা নিয়ে নিজের সমস্ত অনুভূতিগুলো বাতাসে উড়িয়ে আড়াল হতে শুরু করি ধীরে ধীরে। আমি চাইনি আমার স্বার্থপর ইচ্ছা এবং লালসার কাছে তরুণের জীবন এবং ভবিষ্যৎ দুইটাই প্রশ্নের সম্মুখিন হউক।

এরই মাঝে গ্রামের বাড়ি থেকে খবর পেলাম মা মারা গিয়েছেন। তাই কাউকে কিছু না বলে গ্রামে চলে যাই। আমি জানি ও আমাকে না পেয়ে ঘনঘন ফোন দিবে তাই মোবাইলটাও অফ করে রাখি। গ্রামের সবস্মৃতি মাটি চাপা দিয়ে চীরদিনের জন্য ঢাকা ফিরে আসি মাস খানেকের মধ্যেই। চেষ্টা করি নতুন করে জীবনটা শুরু করার। ঢাকা এসে ভার্সিটিতে একে তাকে জিজ্ঞেস করে ওকে না পেয়ে ফোন দিলাম, কিন্তু সেটাও বন্ধ। শেষমেষ ওদের বাসার দারোয়ানের কাছে জানতে পারি ও হাসপাতালে ভর্তি। হাসপাতালে গিয়ে আমার পেনসিলে আঁকা রাজপুত্রকে আমি চিনতেই পারছিনা। ওর অবস্থা দেখে কান্নায় আমার বুক খান খান হয়ে যাচ্ছিলো। পাশে বসে মাথায় হাত বুলাতেই চোখ খুলে আমাকে দেখলো এবং কিছুনা বলে শুধু আমাকে লজ্জার স্রোতে ডুবিয়ে মারার জন্য চোখে শ্রাবনের ঝড় তুলতে লাগলো। আমিও কিছুনা বলে ওর পা দুটি ধরে নিরবে চোখের জল ফেলতে থাকি। মনে মনে বলতে থাকি ক্ষমা করে দে দোস্ত। দুজনই নিরব শুধু ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার শব্দ। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর ও আমাকে বলল এদিকে আয়। আমার যা হয়েছে তাকে আমি আত্মহত্যা করতাম সাথে সাথেই কিন্তু তোর অপেক্ষাতে ছিলাম, কিছু কথা ছিলো। আমি বললাম কি হয়েছে তোর, কেন এভাবে কথা বলতেছিস। বাসার সবাই কই? তরুণ তখন যা বলল তার সংক্ষেপ-

আমার এইচ.আই.ভি ধরা পড়েছে। শিলা নিজেও বোদহয় জানত না ও এইচ.আই.ভি পজেটিভ। ওর সাথে আমার বিশ্বস্ত মিলনই আমার জীবনের জন্য কাল হবে বুঝতে পারিনি। আমি আমার পরিবারের পালক পুত্র। যতদিন তাদের জন্য সুনাম কুড়িয়েছি পরিবারে আমার স্থান ছিলো কিন্তু যেদিন থেকে কলঙ্ক নেয়ার সময় এলো আমাকে ছুড়ে ফেলা হলো পরিবার থেকে। আগামী দু দিন হাসপাতালের খরচ দিবে ওরা এরপর সেটাও বন্ধ করে দেয়া হবে। কলঙ্কের দাগ মাথায় নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘোরার চাইতে মৃত্যুটাই শ্রেয় তাইনা? তাই নিজেকে তুলে দিবো মৃত্যুর হাতেই। তুই আগে আগে আসাতে ভালোই হলো, তোর সাথে কিছু বোঝাপড়া ছিলো শেষ করে যেতে চাই। তুই আমাকে ভালোবাসিস এই কথা আমার কাছ থেকে কেন লুকিয়েছিস, বন্ধু হিসেবে কি তুই একবার আমাকে এই কথাটা বলতে পারতি না? আমি চুপ করে শুধু ওর কথাগুলো শুনছি আর চোখের পানি ছেড়ে নিজের অদৃষ্টকে বলছি এমন এক অবস্থায় আমাকে না ফেললে কি হতো না? তোর সব প্রশ্নের জবাব দিবো একটা শর্তে, কথাটা শোনামাত্রই তরুন এমন জোরে হেসে উঠল যে আমার বুকটা কেঁপে উঠল। মৃত্যু পথযাত্রির কাছেও দুনিয়ার মানুষ তার শেষ স্বার্থটুকু উসুল করে নিতে চায়, কি অবস্থা! আমি কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব পাই নাই, যদি তুই আমার শর্তে রাজি থাকিস তাহলে তোর সব প্রশ্নের জবাব দিবো আমি। হা হা হা ঠিক আছে বল, কিইবা আছে আমার যা নিয়ে তুই সুখি হবি, বল আমি রাজি। এখন থেকে তোর জীবনের শেষকটা দিন আমার নামে লিখে দিতে হবে। কথা যখন দিয়েছি আমি কথা রাখবো তবে যদি তুই তোর সাথে থাকার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ দেখাতে পারিস তবে। আমি কারো করুণার পাত্র হতে চাইনা। তুই আমার সাথে জীবনের শেষকটা দিন থাকবি আমার ভালোবাসার মানুষ হিসেবে। আমার অর্ধেক জীবনের বাকি অর্ধেক হয়ে। যদি তুইও আমাকে ভালোবেসে থাকিস তাহলেই আমার সাথে আসবি নইলে না। ও চুপচাপ পড়ে রইল বিছানায় আর আমি হাসপাতালের সমস্ত ঝামেলা চুকিয়ে ওকে নিয়ে ওই দিনই আমার বাসায় চলে আসি। বাসায় আসার পর ও আমাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে আর বলতে থাকে আমি জানতাম আমার বিশ্বাস কখনো আমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করবেনা। দুনিয়ার সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও তুই কখনও আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবিনা। আমি বড় একা হয়ে গেলাম আসাদ, দুনিয়াতে তুই ছাড়া আজ আর আমাকে কেউ নেই। আমি কেন আমার তোর ভালোবাসাকে আগে বুঝতে পারিনি কেন? মিথ্যা এক লালসার পিছনে ছুটেছি দিনের পর দিন। ও শুধু কেঁদেই যাচ্ছে আর আমি ওকে কি বলে স্বান্তনা দিবো বুঝতেই পারতেছিলাম না, আমার বুক ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাচ্ছে ওর কান্নার শব্দে।

ওকে শান্ত করে আমি আমার কোলে শোয়ালাম আর বললাম আমি তো আছি তাইনা, তোর আর কারো প্রয়োজন জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত হয়ে দিবোনা, প্রমিস! আমি তোকে ভালোবাসি এই কথাটা আমি ছাড়া দুনিয়াতে আর কেউ জানে না। তুই জেনেছিস কারন তুই আমার ডাইরী পড়েছিস যেটা তোর বইয়ের সাথে ফেরত দেয়ার সময় ভুলে চলে গিয়েছিলো। তুই জানিস না, দিনের পর দিন আমি কত কষ্টে তোকে শিলার সাথে ভাগ করেছি। তোদের সুখের জন্য নিজেকে সব সময় দূরে দূরে রেখেছি। আমার অসামাজিক ভালোবাসার মোহে আমি তোর নিখাঁদ বন্ধুত্ত্ব কখনই হারাতে চাইনি। যেই ভালোবাসা তোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দিবে, যে ভালোবাসা আমাদের এতদিনের বন্ধুত্বকে নষ্ট করে দিবে সেই ভালোবাসা বট হওয়ার আগেই তাকে বনসাই তে রূপান্তর করে নিজের ভিতরেই লালন করেছি আমি সারাটাক্ষণ। তোরা যেন তোদের ভালোবাসার সাগরের তীরে প্রাসাদ গড়তে পারিস তার জন্যই মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে তোকে না জানিয়ে গ্রামে চলে যাই। গ্রামের সবকিছু শেষ করে তোর কাছেই তো প্রথমে ছুটে এসেছি আমি তাইনা। আমার কাছে তোর সুখে থাকাটাই ছিলো সবচাইতে বড়, সেটা যেভাবে হোক আর যার সাথেই হোক। আমি তোকে পৃথিবীর সবচাইতে সুখী মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। তাই নিজের ভালোবাসা বুকে লালন করেই তোর খোঁজে বেরিয়েছিলাম। আমি আজ আমার একটা প্রশ্নের জবাব পেয়েছি তুই কেন আমাকে এত ভালোবাসিস, আমরা দুজনই অনাথ! সেটা আমরা না বুঝলেও আমাদের মন ঠিকই বুঝত তাই অনেক ভেবে চিন্তে আমাদের মিলন ঘটিয়েছে কোন বাহুল্য ছাড়াই।

তরুণ অস্ফুট স্বরে বলে উঠল আমি মহাপাপ করেছি দোস্ত মহাপাপ, আমি সোনা পেয়েছি কিন্তু তার কদর করতে পারিনি কখনই। তুই কি আমাকে আমার এই অপরাধের জন্য কখনো ক্ষমা করতে পারবি? আমি বললাম আমার এই জীবনটার মালিক তো শুধুই তুই তারপরও কি তোর এই প্রশ্নের উত্তরে আমাকে কিছু বলতে হবে? তরুন আমার কানের কাছে এসে আমাকে বলল- আজ আমি দুনিয়ার সবচাইতে সুখী একজন মানুষ। ও এই প্রথমবার একজন প্রেমিক হিসেবে আমাকে আলিঙ্গন করল, আমার দেহের প্রতিটা লোমকে ওর ভালোবাসার পরশ দিল। আমার দেহের প্রতিটি রোমের সাথে সাথে সেদিন ও ছুঁয়েছিলো আমার আত্মাও। সত্যি বলতে সেদিন আমিও ছিলাম দুনিয়ার সবচাইতে সুখী মানুষদের একজন। তরুণ আজ বেঁচে নেই, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি ওর পাশে ছিলাম এবং শুধুমাত্র ভালোবাসার বিশ্বাসে ভালোবাসাকে জয় করেছিলাম। আজ এতটা দিন পরে তবে কে এই ছেলে তরুনের ভালোবাসা ঝুড়িতে ভরে ঘুরেঘুরে আমাকে যেখানে সেখানে পাগল করছে?

হৈ চৈ চেঁচামেচিতে স্বপ্ন রাজ্য থেকে যখনই বাস্তবে ফিরে এলাম দেখি সন্ধ্যে হই হই করছে। রাস্তার পাশে নজর গেলেই দেখতে পেলাম সেই ছেলেটি বন্ধুদের সাথে মিলে গপাগপ ফুচকা খেয়ে যাচ্ছে। এ কি তবে আমার তরুন? তার অসমাপ্ত ভালোবাসাকে সমাপ্ত করতে আমার কাছে ফিরে এসেছে? সারাটা রাস্তায় ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরলাম আর দৈহিক এবং মানসিক ক্লান্তিতে খালি পেটেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলাম। সকালে উঠে তাড়াহুড়া করে অফিসে পৌছেই দেখলাম সেই ছেলেটি ওয়েটিং রুমে বসে হয়ত কারো জন্য অপেক্ষা করছে। নিজের ডেস্কে গিয়ে পিয়নকে জিজ্ঞেস করতেই বলল আপনার খোঁজ করতেছিলো, আমি বললাম ঠিক আছে ডেকে নিয়ে এসো। পিয়ন ঘুরে এসে বলল স্যার, চলে গেছে।

পরের দিন খুব সকালে ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো এবং দরজা খুলে যা দেখলাম তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। সেই ছেলেটি হাতে এক রাশ তাজা গোলাপ নিয়ে দাড়িয়ে আমার দুয়ারে। আমাকে দেখেই সন্দেহঘন স্বরে বলল -আমি কি আপনাকে এর আগে কোথাও দেখেছি? যাই হোক কিছু মনে করবেন না আমি একটু ভুলো মনের। এই ফুলগুলো আপনার জন্য, আমি কি একটু ভিতরে আসতে পারি? দরজা ছেড়ে দাড়াতেই সে খুব সহজেই ঘরের ভিতর ঢুকে চেয়ার টেনে বসল এবং বলতে শুরু করলো খুব সকালে এভাবে বিনা এ্যাপোয়েনমেন্টে আপনার বাসায় সরাসরি উপস্থিত হওয়ার জন্য আমি দুঃখিত। আমার নাম জীবন পড়াশোন শেষ করে কিছুদিন আগেই দেশে ফিরেছি ছুটি কাটাতে। আমি আপনার কলাম “ধ্যান ধারনার” সবচেয়ে বড় ফ্যান। আপনার “অপেক্ষা” শিরোনামের প্রথম লেখাটি পড়ার পর এমন নেশা চেপে যায় আমার যে খুঁজে খুঁজে আপনার প্রত্যেকটা লেখা পড়ি আমি। আমি জাস্ট ফ্ল্যাটারড। দেশে আসার পিছনে আপনার সাথে দেখা করাও একটা বিরাট উদ্দেশ্য ছিলো। বিভিন্নভাবে আপনার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি আপনার অফিসে কিন্তু পারিনি। আপনি অফিসেই থাকেন না। শেষমেষ গতকাল আপনার অফিসের এক কলিগের একরকম পায়ে ধরেই আপনার বাসার ঠিকানাটা সংগ্রহ করা। আপনি কিছু মনে করেননি তো? আমি মনে মনে বিধাতাকে শতকোটি ধন্যবাদ জানাচ্ছিলাম যখন আমার তরুন অনর্গল আমার সামনে বসে কথা বলে যাচ্ছিলো। সত্যিকারের ভালোবাসা কখনই মরেনা তা আমার সৃষ্টিকর্তা জীবনের ভিতর তরুনের পূনর্জনমের মাধ্যমে আমাকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিলেন।

আমি শুধু জীবনের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলেছিলাম – চা খাবে?

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১১ই আগস্ট, ২০১৩।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.