বর্ষণের অপেক্ষায় রংধনু

লেখকঃ হাসান শুভ্র

আমার নাম বর্ষণ, বাবা মায়ের দেয়া নাম নয়, কিন্তু তারপরও এই নামটা আমার অনেক প্রিয়। কারণ এই নামটি একজন আমাকে অনেক ভালোবেসে দিয়েছিল। কিন্তু সত্যি কি সে আমাকে ভালোবেসেছিল? যদি ভালোই বাসে তাহলে কেন সে আমার সাথে মিথ্যে ছলনা করলো? কেন বারবার দেখা করার কথা বলেও সে আসলো না, কেন সে রংধনু মত আমার জীবনে এসে হারিয়ে গেল চিরতরে? আমি তো কাউকে আমার জীবনে ভালোবাসার আমন্ত্রন জানাইনি, তাহলে সে কেন এমন করলো আমার সাথে?

সে ছিল আমার জীবনের রংধনু, রংধনুর সাত রঙ্গে রাঙ্গিয়ে দিয়েছিল আমার সাদা কালো জীবনটাকে। আমি কখনো ভাবিনি রংধনু শূন্যতায় আমার জীবনটা এতটা বিবর্ণ হয়ে যাবে। তার ফেসবুক আইডি ছিলো রংধনু, অবশ্য তার সাথে আমার পরিচয় ফেসবুকে নয়। আমার জীবনে রংধনুর আগমনটা একটু অদ্ভুতই বলা যায়। সেদিনের তারিখটা আমার আজও মনে আছে, অবশ্য মনে থাকাই স্বাভাবিক, কারণ সেদিন ছিল একটি বিশেষ দিন, ২০১৩ সালের ১৪ ই ফেব্রুয়ারী, ভ্যালেন্টাইনস ডে। আমি তখন চট্টগ্রামে হলমার্কের একটি শাখার সেল্স ম্যানেজার। যেহেতু আমাদের দোকানটা একটা গিফটশপ ছিল, তাই এরকম বিশেষ দিনগুলোতে কাজের ঝামেলা অনেক বেড়ে যেত। দোকানে তরুণ তরুণীদের প্রচুর ভীড়, কেউ হয়তো কার্ড কিনছে, কেউ হয়তো কিনছে বিভিন্ন ধরনের শোপিস, পুতুল বা আর্টিফিসিয়াল গহনা। সেদিন দোকানে এত ভীড় ছিল যে ক্যাস সাম্‌লাতে আমার মাথা পাগল হবার যোগাড়। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন অনেকগুলো কার্ড আমার হাতে ধরিয়ে দিল, সে ক্যাস পেমেন্ট করলো, আমি কার্ডগুলো প্যাক করে তার হাতে না দিতেই সে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমি ভাবলাম সে হয়তো ভুলে কার্ডগুলো না নিয়েই দোকান থেকে বের হয়ে গেছে, হয়তো কিছুক্ষণ পরেই সে কার্ডগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য আবার দোকানে ফিরে আসবে, তাই আমি কার্ডের প্যাকেট আলাদা করে আমার ড্রয়ারে রেখে দিলাম, এত ভিড়ের মধ্যে আমি তার চেহারাও ভাল করে খেয়াল করিনি কিন্তু সে কার্ডগুলো নিতে কখনোই আসেনি। এত দাম দিয়ে কেনা ভ্যালেন্টাইনস ডের বিশেষ কার্ডগুলো পড়ে রইলো দোকানের ছোট্ট ড্রয়ারে।

এর কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন আমার ফেসবুক আইডিতে রংধনু নামে কেউ একজন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালো, আমি এক্সেপ্ট করার সাথে সাথে সে মেসেজ দিল ” আমি কি আপনার বন্ধু হতে পারি? রংধনুর বন্ধু হতে আমার কোনও আপত্তি ছিল না। আমরা বন্ধু হলাম, শুরু হলো আমাদের মধ্যে নিয়মিত চ্যাট, ফেসবুকে আসলেই সে আমাকে নক করতো, তার সাথে চ্যাট করতে আমারও অনেক ভাল লাগতো। কিছুদিন চ্যাট করার পর আমি বুঝতে পারলাম রংধনু ঠিক অন্য দশ জনের মত নয়, সে সবার থেকেই একটু আলাদা। আমরা দুজনেই জানতাম আমরা সমকামী, কিন্তু এই বিষয়টা নিয়ে কখনো আমাদের মাঝে কোনও কথা হয়নি, আমরা কেউ কাউকে জিজ্ঞাসা করিনি কার কি রোল, সেক্স বিষয়ক কোনও কথাই কখনো আমাদের মাঝে হত না। রংধনু একটু চাপা স্বভাবের ছিল, নিজের সম্পর্কে কোনও কিছু সে বলতে চাইত না, আমি আজও জানি না তার সত্যিকারের নাম, ঠিকানা বা সে দেখতে কেমন, আমারও খুব বেশী জানার কৌতূহল ছিল না। আমি ভেবেছি একদিন নিজ থেকেই রং তার সম্পর্কে সবকিছু আমাকে বলবে, আমি সেই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই দিনটি আমার জীবনে কখনোই আসলো না।আমাদের চ্যাট হবার কিছুদিন পর একদিন আমি রঙের কাছে তার ফোন নম্বর চাইলাম, প্রথমে সে কিছুতেই নাম্বার দিতে রাজী হলো না, নানা ধরনের বাহানা করতে লাগলো, এই নিয়ে আমাদের মাঝে একটা ছোটখাটো ঝগড়া হয়ে গেল, অবশেষে আমি রংকে বললাম,

– ঠিক আছে, তোমাকে নাম্বার দিতে হবে না, যে মানুষ আমাকে বিশ্বাসই করে না, তার সাথে আমার কোনও সম্পর্ক নেই, তুমি একটা ভীরু কাপুরুষ নিজেকে হাইড করে রাখতে চাও, যে মানুষ কাউকে নাম্বার দিতে এত ভয় পায়, আমি তাকে বন্ধু হিসেবে চাই না। তুমি আমার বন্ধু হওয়ার যোগ্য না, এই বলে আমি তাকে ব্লক করে দিলাম।

ঐ ঘটনার কিছুদিন পর একদিন রাতের ১২টার দিকে আমার মোবাইলে একটা কল আসলো। আমি রিসিভ করে হ্যালো বলতেই খুব পরিচিত গলায় কেউ একজন বলে উঠলো,
– আমি রংধনু বলছি
-কোন রংধনু?
– বর্ষণের অপেক্ষায় রংধনু
-আপনি কি আমার সাথে ফাজলামি করার জন্য এত রাতে ফোন করেছেন?
– তুমি আমাকে চিনতে পারছ না? সেদিন তুমি না আমার নাম্বার চাইলে, আমার উপর রাগ করে আমাকে ব্লক করে দিলে।
-সরি, আমি আসলে তোমাকে চিনতে পারিনি, কিন্তু তুমি আমার নাম্বার পেলে কোথায়?
– কিভাবে পেলাম তা না হয় একটু রহস্যই থাকুক।
– আচ্ছা রং, আমি কি আগে কখনো তোমার সাথে কথা বলেছি?
-না তো কেন?
-তোমার কণ্ঠটা কেন জানি খুব পরিচিত লাগছে।
– কিছু কণ্ঠ হয়তো এমনই, শুনলেই পরিচিত মনে হয়।
– আমি কিন্তু এখনো তোমার নামই জানতে পারলাম না।
– নাম দিয়ে কি কাউকে জানা যায়? নাম দরকার শুধুমাত্র কাউকে সম্বোধনের জন্য, তুমি আমাকে রং বলেই ডেকো।
– আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি না চাইলে আমি জোড় করব না
– তোমাকে দেওয়া আমার বর্ষণ নামটা তোমার কেমন লাগে?
-বর্ষণ? একটু অবাক হলাম আমি, আগে কখনো বলোনি তো?
– মানে কি? তুমি কার্ডগুলো এখনো খুলে দেখোনি?
– কিসের কার্ড?
– ভ্যালেন্টাইনস ডেতে আমি তোমাকে রংধনুর সাত রঙের সাতটি কার্ড দিয়েছি।
– তারমানে তুমিই সেই ব্যক্তি যে টাকা দিয়ে কার্ড কিনে ভুলে ফেলে গিয়েছিল?
– ভুলে ফেলে যাইনি, যার জন্য কার্ডগুলো কেনা তাকেই দিয়ে এসেছি।
– তুমি কার্ডগুলো আমার জন্য কিনেছিলে?
– তুমি কার্ডগুলো খুলে দেখো, তাহলেই বুঝতে পারবে।
– আচ্ছা বর্ষণ, আজ তাহলে রাখি, পরে কথা হবে, এই কথা বলেই ফোন রেখে দিল রং. আমি এতটা অবাক হয়েছিলাম যে আমার মুখ দিয়ে কোনও কথাই বের হচ্ছিল না।

পরদিন সকালে দোকানে গিয়েই প্রথমে ড্রয়ার থেকে কার্ডের প্যাকেট বের করলাম, আমি সত্যি অবাক, বিস্মিত। প্যাকেটের ভিতরে সাতরঙের সাতটি কার্ড এবং প্রত্যেকটা কার্ডে শুধু একটি কথাই লেখা, বর্ষণের অপেক্ষায় রংধনু.

আমি সাথে সাথে রঙকে ফোন দিলাম, সে ফোন রিসিভ করেই বললো।
-অবশেষে কার্ডগুলো খুলে দেখলে?
-হ্যাঁ, দেখেছি
-কেমন লাগলো?
– আগে বলো, তুমি আমাকে কিভাবে চিনো? ফেসবুকে ফ্রেন্ড হওয়ার আগে থেকেই তুমি আমাকে চিনতে, তাই না?
-হ্যাঁ, অনেক আগে থেকেই আমি তোমাকে চিনি, তোমার সব কিছু আমি জানি।
-কিন্তু কিভাবে?
-সেটা জানা কি খুব বেশী প্রয়োজন?
– হ্যাঁ, আমার জন্য প্রয়োজন।
– বর্ষণ, তুমি আমাকে দেখলেই তোমার সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবে।
– ঠিক আছে, কখন দেখা করবে?
– আমি এখন ঢাকায়, চট্টগ্রামে এসেই আমি তোমার সাথে দেখা করব।
– ওকে, এখন তাহলে তুমি তোমার ছবি দাও।
– আমি ফেসবুকে তোমাকে ছবি দিবো না।
– কেন? ছবি দিলে সমস্যা কি?
– কোনও সমস্যা নেই, কিন্তু আমি চাই তুমি আমাকে সরাসরি দেখো, আমাকে দেখার পর তোমার তাত্ক্ষণিক অভিব্যাক্তি আমি দেখতে চাই।
– রঙ, তুমি যদি ছবি না দাও তাহলে কখনো আমাকে ফোন করবে না।
– প্লিজ বর্ষণ, আমাকে জোড় করো না, জোড় করে তুমি আমার কাছ থেকে কিছু পাবে না। বরং তুমি যত আমাকে জোড় করবে, আমি তত তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যাব।
সেদিনের পর থেকে আর কোনও কিছুর জন্যই আমি রঙকে জোড় করিনি। রঙ তার ফেসবুক আইডি ডিএকটিভ করে দিয়েছিল। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে রঙের সাথে আমার কথা হত, ধীরে ধীরে আমরা ঘনিষ্ঠ হতে লাগলাম। আমি জানতাম, আমি ক্রমশ রঙের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি। তবে রঙ কখনোই আমার তথাকথিত বয়ফ্রেন্ড ছিল না, আমরা সমাজের আর দশটা কাপলের মত কখনো সারাক্ষণ ফোনে কথা বলিনি, দুজনেই নিজেদের মত ব্যাস্ত থাকতাম। “জান, তুমি এখন কি করছ, আমার বাবুটা খাইছে” এই জাতীয় আহ্লাদী কথা আমরা কখনোই বলিনি। আমাদের সম্পর্কটা ছিল অনেকটা বন্ধুর মত, হয়তো বন্ধুর চেয়েও অনেক বেশী কিছু। রোজ রাতে ঘন্টাদুয়েক আমাদের কথা হতো। আমাদের রোজকার দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ঘটনা আমরা একে অপরের কাছে শেয়ার করতাম, আমাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, একাকীত্ব, সব দুঃখ, কষ্টকে আমরা ভাগাভাগী করে নিয়েছিলাম। তখনও আমি জানতাম না, আমি রঙকে সত্যি ভালোবাসি কিনা। শুধু জানতাম, আমি তাকে অনেক পছন্দ করি, তার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। আমিও ধীরে ধীরে ফেসবুকে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম, রঙ ছাড়া অন্য কারও সাথে কথা বলতে আমার ভাল লাগত না। এভাবেই চলে গেল বেশ কিছুদিন।

তারপর হঠাৎ করেই আমার মোবাইল নষ্ট হয়ে গেল। মাসের শেষ, আমার হাতে টাকা পয়সাও নেই যে একটা নতুন মোবাইল কিনব। রঙের সাথে কথা বলতে না পেরে আমার যেন মাথা পাগল অবস্থা, খেতে ভাল লাগে না, রাতে ঘুম আসে না, পরে আমার এক কলিগের মোবাইল থেকে রঙকে ফোন করলাম, আমার সাথে কথা না বলতে পেরে রঙও খুব অস্থির ছিল, এর দুইদিন পরেই রঙ বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠালো নতুন মোবাইল কেনার জন্য। রঙের পাঠানো টাকায় মোবাইলটা কেনার পর থেকেই আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত অনুভুতি হচ্ছিল, রঙের কাছ থেকে টাকা নেয়ায় আমার মধ্যে কোন সংকোচ ছিল না, উল্টো মনে হচ্ছিল রঙের কাছ থেকে কিছু পাওয়া যেন আমার অধিকারের আওতায় পড়ে, আমি ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করলাম, সারাক্ষণ শুধু রঙের কথাই ভাবতাম। আমার সমস্ত চিন্তা চেতনা জুড়ে শুধু রঙধনুর সাত রঙ. আমাদের পরিচয়ের ৫ মাস পর আমি প্রথম অনুভব করলাম আমি সত্যি প্রেমে পড়েছি।

– রঙ, তোমাকে আমার কিছু কথা বলার ছিল।
– বল
– আমি মনে হয় প্রেমে পড়েছি
– প্রেমে পড়েছ, কি সাংঘাতিক কথা, তা সেই হতভাগ্য ব্যাক্তিটা কে?
– ফাজলামি করো না, আমি সত্যি সিরিয়াস।
– আমি কি বলেছি তুমি সিরিয়াস নও?
– আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি, রঙ আই লাভ ইয়উ!
আমার কথা শুনে রঙ হো হো করে হেসে উঠলো।
– হাসছ কেন?
-তোমার কথা শুনে, এতদিন পর তুমি আমাকে বলছ, আই লাভ ইয়উ?
– কেন সমস্যা কোথায়? ডোন্ট ইয়উ লাভ মি?
– আরে গাধা, আমি তো তোমাকে অনেক আগে থেকেই ভালোবাসি, আর ভালোবাসি বলেই তো ভ্যালেন্টাইনস ডেতে তোমাকে কার্ডগুলো দিলাম, তোমাকে ভালোবাসি, তাই তো রোজ রাতে তোমার সাথে ফোনে কথা বলি, তোমার সাথে কথা না বলতে পারলে আমার ঘুম আসে না। তুমি জানো, তোমার মোবাইল নষ্ট হওয়ায় আমার তিন রাতের ঘুম নষ্ট হয়েছে।
রঙ সত্যি আমাকে অনেক ভালবাসত কিন্তু তারপরও সে আমার সাথে কেন এমন করলো তার কারণ আমি আজও খুজে পাই না।

জুলাইয়ের শেষের দিকে রঙ চট্টগ্রামে আসলো। সে নিজে থেকেই আমার সাথে দেখা করতে চাইল। সেদিন ছিল শুক্রবার, কথা হয়েছিল বিকাল ৫টায় সানমার ওশ্যান সিটিতে আমাদের প্রথম দেখা হবে। আমি খুব excited ছিলাম রঙের সাথে দেখা করার জন্য। বাসা থেকে বের হবার সময়ও রঙের সাথে আমার কথা হয়েছে, কিন্তু সেদিন রঙ আসেনি। আমি বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করেছি শুধু একবার রঙকে দেখার জন্য, বারবার তার মোবাইলে কল করেছি কিন্তু সেটা অফ করে রাখা হয়েছিল। শেষপর্যন্ত রাত দশটায় আমি বাসায় ফিরলাম দীর্ঘ অপেক্ষায় ক্লান্ত এক বুক শূন্যতার হাহাকার নিয়ে।

রাত ১২টার দিকে রঙ আমাকে ফোন করলো, আমি ধরলাম না, ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দিলাম, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার মোবাইলে রঙের ৮৫টা মিসড কল, সেই সাথে একটা বিশাল মেসেজ, ” বর্ষণ, I am very sorry, আমি জানি আমি ক্ষমার অযোগ্য অন্যায় করেছি, তুমি আমাকে যা শাস্তি দেবে আমি মাথা পেতে নেব, তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, কিন্তু আমি কাল সত্যি সানমারে গিয়েছিলাম।

তোমাকে দেখার পর ইচ্ছা করছিলো দৌড়ে গিয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু তারপরই মনে হলো, আমাকে দেখার পর তুমি হয়তো ঘৃণায় আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, বর্ষণ। তুমি যদি আমাকে দেখে ফিরিয়ে দাও, আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করো, আমি কখনো তা সহ্য করতে পারব না, শত চেষ্টা করেও তোমার সামনে যাওয়ার সাহস হলো না আমার, তাই কাপুরুষের মত পালিয়ে এলাম। বর্ষণ, তোমার এই পাগল প্রেমিকটাকে কি একটা শেষ সুযোগ দেয়া যায় না? কাল সন্ধ্যায় আমি সাগর পাড়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করব, আই প্রমিস ইয়উ, এবার যদি আমি আমার কথা রাখতে না পারি, তাহলে আমি জীবনেও কোনদিন তোমাকে ফোন করে বিরক্ত করব না। “
রঙের মেসেজ পড়ার পর তার উপর আমার সব রাগ চলে গেলো, আমার ইচ্ছে করছিলো তখনই রঙকে ফোন করতে, কিন্তু আমি রঙকে শুধু একটা মেসেজ দিলাম, ” rong, I wanna give you one more chance. If you lose it, so consider everything, you will lose me forever”

পরদিন সন্ধ্যায় আমি রঙের জন্য সাগর পাড়ে গেলাম, ৬টা বাজার ২০মিনিট আগে রঙ আমাকে ফোন করে জানালো সে বাসা থেকে বের হচ্ছে, সেটাই ছিল রঙের সাথে আমার শেষ কথা কারণ সেদিনও রঙ আসেনি, এভাবেই রঙ হারিয়ে গেল আমার কাছ থেকে বহু দূরে, আমার জীবনকে সম্পূর্ণ রঙহীন বিবর্ণ করে। সেদিনের পর আমি আমার এয়ারটেল সিমটা বন্ধ করে দিলাম, তার কিছুদিন পরই আমার বাবা মারা গেল, এই শহরের উপর আমার ঘেন্না ধরে গিয়েছিল, তাই চাকুরীটা ছেড়ে দিলাম, সবকিছু গুছিয়ে ফিরে গেলাম ফেনীতে আমার গ্রামের বাড়িতে। তাছাড়া বাবার অবর্তমানে সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ল আমার কাধে, সবকিছু নিয়ে অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়লাম আমি। কিন্তু তাই বলে রঙকে ভুলে যেতে পারিনি কারণ আমি যে তাকে আজও ঠিক আগের মতই ভালোবাসি। জীবনে প্রথম ভালোবাসা মানুষ কখনো ভুলতে পারে না, রঙকে ভুলে যাওয়া আমার পক্ষেও কখনো সম্ভব নয়, রঙ চিরকাল রবে আমার হৃদয়ে, তার ভালোবাসার অনুভুতি থাকবে আমার প্রতিটি শিরা উপশিরায়।

২.

সাব্বিরের খুব বিরক্ত লাগছে, গ্রামে রাত ১০টা না বাজতেই সবাই খেয়ে শুয়ে পড়ে। দিনের বেলা কাজে কর্মে সময় কেটে যায়, কিন্তু রাতের বেলা সময় যেন কাটতেই চায় না, সাব্বিরদের গ্রামে ইদানিং এফ এম রেডিও ধরে, আর কিছু না পেয়ে সাব্বির গান শোনার জন্য এফ এম চালু করলো,

” হ্যালো বন্ধুরা, আপনারা শুনছেন এফএম ৮৯.২, আর আপনাদের সাথে আছি আমি কথা বন্ধু ফারিয়া, এখন ঘড়িতে রাত ১০টা, শুরু হয়ে গেল আপনাদের সবার প্রিয় প্রোগ্রাম ভালোবাসার কথামালা, আপনারা সবাই হয়তো ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা শ্রোতাদের ভালোবাসার মেসেজ পৌঁছে দিই তাদের প্রিয় মানুষটির কাছে, আজকের প্রথম মেসেজটি পাঠিয়েছে রঙধনু। আসুন জানা যাক, বন্ধু রঙধনুর ভালোবাসার কথামালা।

“প্রিয় বর্ষণ, কেমন আছ তুমি? আমাকে নিশ্চয় অনেক ঘৃণা কর তুমি। জানি, তোমার বিশ্বাস অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি আমি, আমার কথাগুলো হয়তো কখনোই তোমার কাছে পৌছাবে না। তারপরও জানি না কেন তোমাকে খুব বলতে ইচ্ছে করছে আসলেই সেদিন কি ঘটেছিল। তুমি হয়তো ভেবে নিয়েছ, সেদিনও আমি তোমাকে আগের বারের মত ধোঁকা দিয়েছি, কিন্তু তা সত্যি নয়। সাগর পাড়ে যাওয়ার জন্য আমি সত্যি বাসা থেকে বের হয়েছিলাম, হয়তো সেদিন আমিও তোমার মত খুব excited ছিলাম, তোমার সামনে যাওয়ার জন্য আমিও যে অনেক অস্থির হয়েছিলাম। কিন্তু বাসা থেকে বের হয়ে নীচে নামার সময় সিড়ি থেকে পড়ে যাই, সিড়ির রেলিঙ এর রডের সাথে লেগে আমার মাথা ফেটে যায়, জ্ঞান হারাই আমি, এরপর পরদিন সকালে জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি, মাথায় ব্যান্ডেজ, প্রায় এক সপ্তাহ পর আমাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেয়া হয়, এই এক সপ্তাহে আমি আবার হারিয়ে ফেলি তোমাকে, তোমার মোবাইল অফ, চাকুরীটা ছেড়ে দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে চলে গেলে, জানিনা তুমি কোথায় আছ, কিভাবে আছ, এখনো কি ঠিক আগের মতই ভালোবাস আমাকে? না কি হারিয়ে গেছি আমি স্মৃতির অতলে তোমার মনের আঙ্গিনা থেকেও। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি আজও তোমাকে অনেক ভালোবাসি, ঠিক কলেজের প্রথম দিনের মত, হয়তো সারাজীবন এভাবেই ভালোবাসব। জানো বর্ষণ, আমি ভাগ্যকে খুব বিশ্বাস করি, ভাগ্যের কারণে হয়তো এত কাছাকাছি থেকেও আমাদের দেখা হল না, হয়তো এই ভাগ্যই আবার আমাদের দুজনকে একসাথে মিলিয়ে দেবে। কাল পহেলা বৈশাখ, পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে আমরা বরণ করে নেব নতুন বছর ১৪২১কে, আমি কাল সকাল থেকেই চট্টগ্রামের ডিসি হিলে থাকব, সবার সাথে মিলে একসাথে স্বাগত জানাব নতুন বাংলা বছরকে। বর্ষণ, তুমি কি একবার আসবে শুধু তোমার রঙধনুর জন্য? জানি তুমি আসবে না, আমার কথা হয়তো কখনোই তোমার কাছে পৌছাবে না, হয়তো তুমি ভাববে আমি আবার তোমাকে ধোঁকা দিবো, কিন্তু তারপরও আমি সারাদিন অপেক্ষা করব শুধু তোমার জন্য, বর্ষণের অপেক্ষায় রঙধনু।

I am so speechless, বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি আমি, চলো বন্ধুরা আমরা সবাই মিলে দোয়া করি রঙধনুর জন্য, কাল নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রঙধনু যেন অবশ্যই খুজে পায় তার ভালোবাসার বর্ষণকে। চল এখন আমরা শুনে আসি বর্ষণের জন্য রঙধনুর পছন্দের হাবীবের খুব জনপ্রিয় একটি গান,
“দিন গেলো তোমার পথ চাহিয়া
মন পুড়ে সখীগো কার লাগিয়া
সহে না যাতনা তোমারে আশায় বসিয়া
মানে না কিছুতে মন আমার যায় যে কাঁদিয়া। “

৩.

প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে চট্টগ্রামের ডিসি হিলে অনেক বড় মেলার আয়োজন করা হয়, নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয় বাংলা নববর্ষ। ডিসি হিলে প্রচন্ড ভীড়, চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। সাব্বিরের কাছে নিজেকে পাগল মনে হচ্ছে, না হলে মেলার এই জনসমুদ্রে কোনও একজনকে খুজে পাওয়া কি কখনো সম্ভব? তার উপর সে এটাও জানে না যে রঙ দেখতে কেমন। আর রঙ সত্যি মেলায় এসেছে কেনা সেটাও কে জানে? নিজেকে এখন একটা গাধা মনে হচ্ছে সাব্বিরের। কাল রাতে রঙধনুর মেসেজটা শোনার পর, সে কোনও কিছু না ভেবেই রাতের বাসে চট্টগ্রাম চলে এসেছে, সূর্যোদয়ের পরই এসে উপস্থিত হয়েছে মেলা প্রাঙ্গনে, মেলায় তার বয়সী ছেলে মেয়ের ভীড় বেশী, ছেলেরা পাঞ্জাবী আর মেয়েরা শাড়ি পড়ে এসেছে, সবাইকে দেখতে তার কাছে একই রকম লাগছে, সবাই একচেটিয়া পান্তা ইলিশ খাচ্ছে। সাব্বিরেরও সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, কিন্তু সবার আগে জরুরী রঙধনুকে খুজে বের করা, কিন্তু কিভাবে? সাব্বিরের নিজেকে বোকা বোকা লাগছে। ইতিমধ্যেই সে দুজনকে জিজ্ঞাসা করেছে, “ভাই, আপনি কি রঙধনু?” একজন তো উল্টো তাকে ঝাড়ি দিয়েছে। সাব্বির বুঝতে পারছে সে আসলে কখনোই রঙধনুকে খুজে পাবে না। রঙধনু তার জীবনে মরীচিকার মত অধরাই থেকে যাবে, যার কাছে কখনোই পৌঁছনো যায় না।
হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে প্রচন্ড বেগে বৃষ্টি শুরু হল, সেই সাথে ঝড়ো বাতাস, মেলায় উপস্থিত সবাই বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিলো মেলার স্টলগুলোতে কেউবা গাছের নীচে। সাব্বির পাহাড়ের উপরে একটি গাছের নীচে ছুটে গেল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল নীচের চত্বরে একটি ছেলের দিকে, ছেলেটি আকাশের দিকে মুখ তুলে বৃষ্টিতে ভিজছে, ছেলেটি পঙ্গু, তার দুই হাতে দুটি ক্রেচ। হঠাৎ সাব্বির ছেলেটিকে চিনতে পারলো, ওর নাম সুমন, তার সাথেই কলেজে পড়তো, খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল তাদের।

সুমন অনেক পছন্দ করতো সাব্বিরকে, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কখনো তাকে বলতে পারেনি তার ভালোবাসার কথা। কিভাবে সে সাব্বিরকে বলবে যে সে একজন সমকামী, যদি সাব্বির তাকে ফিরিয়ে দেয়, যদি ঘৃণায় তাকে দূরে ঠেলে দেয়, যদি তার মুখ দেখাও পাপ মনে করে সাব্বির! সুমন তার এই বন্ধুটিকে কখনো হারাতে চায়নি, সাব্বিরকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পেয়েই অনেক সুখী ছিল সুমন, কিন্তু একটি ছোট্ট দুর্ঘটনা তার পুরো জীবনটাই বদলে দিল। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় সুমন মারাত্মকভাবে আহত হয়, তার বাম পায়ের নীচের দিকটা পুরোপুরি অবশ হয়ে যায়, এই দুর্ঘটনায় সুমন মানসিকভাবে অনেক ভেঙ্গে পড়ে, পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, বন্ধু বান্ধব সবার কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যায়, হারিয়ে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে, ধীরে ধীরে এক সময় সাব্বিরও ভুলে যায় সুমনকে। কিন্তু সুমন কখনোই সাব্বিরকে ভুলতে পারেনি, কারণ সে যে তাকে অনেক ভালবাসত। কিন্তু পৃথিবীটা সত্যি মনে হয় খুব ছো্ট। একদিন হঠাৎ ফেক আইডিতে চ্যাট করতে গিয়ে সুমন আবার খুজে পায় তার ভালোবাসার সাব্বিরকে, সুমন বুঝতে পারে সাব্বিরও তার মতই সমপ্রেমী, খুশিতে সুমনের নাচতে ইচ্ছে করে, পরক্ষণেই মনে পড়ে এখন আর সে স্বাভাবিক নয়, সে সাব্বিরের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হাটতে পারবে না, সে কখনো সাব্বিরের উপযুক্ত জীবন সঙ্গী হতে পারবে না। যদি সাব্বির তার মত একজন পঙ্গু মানুষকে ভালোবাসতে না চায়? আর কেনই বা চাইবে, সাব্বিরের নিজের মধ্যে তো কোনও খুঁত্ নেই, সে চাইলেই একজন সুস্থ স্বাভাবিক ছেলেকে ভালোবাসতে পারে। কিন্তু মনকে কি বেধে রাখা যায়? তাই সে রঙধনু হয়ে বন্ধুত্ব করে সাব্বিরের সাথে। সে জানে, সাব্বির এখন তাকে ভালোবাসে কিন্তু তাকে সামনাসামনি দেখে যদি সাব্বির ফিরিয়ে দেয়, এই ভয়ে সুমন কখনোই সাব্বিরের সামনে আসতে চাইতো না, তাকে হারানোর ভয়ে।

৪.

আজ অনেকদিন পর সুমনকে দেখে সাব্বিরের খুব ভালো লাগছে, যাক তার এত কষ্ট করে চট্টগ্রামে আসা ব্যর্থ হয়নি, রঙধনুকে না পেলে কি হবে তার পুরনো বন্ধুকে তো পেয়েছে। সাব্বির দ্রুত সিড়ি দিয়ে নেমে নীচের চত্বরে নেমে এলো, সুমন এখনো চোখ বন্ধ করে বৃষ্টিতে ভিজছে, সে জানে না তার ভালোবাসার মানুষটি তার এত কাছে দাড়িয়ে আছে, তাকে মেলার প্রতিটি মানুষের ভীড়ে খুজে ফিরেছে। সাব্বির যখন সুমনের সামনে এসে দাঁড়ালো সে অবাক হয়ে দেখে সুমনের সাদা টিশার্টে লাল রঙে লেখা বর্ষণের অপেক্ষায় রঙধনু . সাব্বিরের বুঝতে বাকি রইলো না যে তার কলেজের প্রিয় বন্ধু সুমনই তার ভালোবাসার রঙধনু, রঙ ঠিকই বলেছিল, সুমনকে দেখেই সাব্বির পেয়ে গেছে তার সব প্রশ্নের জবাব। তার মনের এতদিনের সব সন্দেহ, সব প্রশ্ন দূর হয়ে গেছে, এখন সে বুঝতে পারছে কেন রঙধনু তার সাথে এমন করেছিল। সাব্বির সুমনের কাধে হাত রেখে বললো, বর্ষণ এসে গেছে, রঙধনুর অপেক্ষা শেষ। সাব্বিরকে দেখতে পেয়ে সুমন আনন্দে সবার সামনে জড়িয়ে ধরলো তাকে। কে কি ভাবলো তাতে সুমনের আজ আর কিছু যায় আসে না, আজ তার মনের সব শঙ্কা, সব ভয় দূর হয়ে গেছে, এত দিন পর সে ফিরে পেয়েছে তার বর্ষণকে। সাব্বিরও ভালোবাসার আবেগে জড়িয়ে ধরে আছে সুমনকে, অনেক সাধনার পর সে ফিরে পেয়েছে তার জীবনের রঙধনু. ছেড়ে দিলেই যদি সে আবার হারিয়ে যায়। রঙধনু ছাড়া যে তার জীবনটা আবার বিবর্ণ ক্যানভাস হয়ে যাবে।

“সমাপ্ত”

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১৫ই আগস্ট, ২০১৪।


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.