মনের মন্দিরে

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা
উৎসর্গঃ সজল আহসান

১।
দাড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার পিত্তি জ্বলে গেলো। অথচ মুবাশ্বিরের আসার নাম নেই । ফোন দিলাম আবার । ফোন ধরতেই প্রায় খেঁকিয়ে উঠলাম। বললাম
-” কোথায় মরে গিয়েছিলি?”
-“তোর বাপের শ্রাদ্ধতে।”
-“আসতে কতক্ষণ লাগাবি?”
এমন সময় দেখি নবাব গ্যাঁজ দাঁতের হাসি দিয়ে পাড়ার মোড় থেকে বের হচ্ছে । এসে বলল
-“তোকে সুন্দর লাগছে” ।
-“বাল না বকে রিক্সা ডাক তো । প্রোগ্রামের দেরি হয়ে যাচ্ছে । “
আজ বসন্তের ১ তারিখ । বসন্তবরণ উপলক্ষে উপজেলায় প্রোগ্রাম আছে । আর ম্যাম আমাকে অনেকক্ষণ ধরে নক করছে । ৫ মিনিট ৫ মিনিট বলে সময় বাড়াচ্ছি । কিন্তু ৫ মিনিট আর আসছে নাহ হারামজাদা মুবাশ্বিরের জন্য । আজ আমি নাচ করবো আর মুবাশ্বিরের গান আছে । এমন সময় মুবাশ্বির রিকশা নিয়ে এলো । পড়িমরি করে রিক্সায় উঠলাম । চলতে লাগলো রিক্সা ।

বাতাসে বসন্তের সুর উঠেছে । কুহুকুহু রাগে কোকিল চারপাশ উদাস করে দিচ্ছে । সূর্যদেব আমাদের উপর ঝলমলে আশীর্বাদ ঢেলে দিচ্ছে অকাতরে। অমল খুশিতে ভাসে চরাচর । ফুলে ফুলে প্রজাপতির নাচ । আহা বসন্ত!
প্রিয় বসন্ত!

দেখতে দেখতে চলে এলাম । গ্রিনরুমের দিকে যেতেই ম্যাম আমায় দেখে ৫ মিনিট কি যে বলল তা বুঝতে পারি নি । তবে আমায় যে ঝাড়ছে এতোটুকু নিশ্চিত । বাঙ্গালির সময় জ্ঞান বলে কথা । এখনো প্রোগ্রাম শুরুই হয় নি ।রেডি হয়ে বসে বসে ঝিমুচ্ছি । এমন সময় ভাবলাম ফেবুতে একটা ঢুঁ মেরে দেখি । দেখলাম কে যেন একটা গল্প লিখেছে । পড়তে বসলাম । অবাক হয়ে যাচ্ছি! কি সুন্দর মখমলের মতো লেখা । নদীর মতো প্রাঞ্জল । শিশিরের মতো ঝকঝকে আর শ্রাবনের নীল বিকেলের মত অপ্টিমিস্টিক । ভালোবাসা যেন দিগন্ত বিস্তৃত ধানখেতের মোহহীন কাকতাড়ুয়ার মতো উদাসীন ! জানিনা এ ভালোবাসা পিয়াসী মনটা কারো অভাব অনুভব করছে । লেখকের নামটা দেখবো এমন সময় আমার নাম এনাউন্স করলো । চলে গেলাম মঞ্চে ।

২।
বরাবরের মতোই ভালো করলাম । নামতেই কতগুলো মেয়ে ছেঁকে ধরলো । ভাইয়া হ্যান , ভাইয়া ত্যান । চরম বিরক্ত লাগছিলো । কোথায় যেন পড়েছিলাম ৩ টা মেয়ে একসাথে থাকলে ১ টা শয়তানের চুলা হয় । এখানে আছে ৮ টা মেয়ে , তার মানে ২.৬৭ টা শয়তানের চুলা । এমন সময় মুবাশ্বির ডাকলো আমায় । হাঁফ ছেড়ে বাচলাম । হাটতে থাকলাম তার সাথে ।
রাস্তার একদিকে ঘন বন আর একদিকে তেপান্তরের মাঠের মতো বড় ধানক্ষেত । আমরা তখন শহর ছারিয়ে বহুদূর । দুপুরের রোদ শরীরে কামড় বসাতে পারছে নাহ দখিনা বাতাসের জন্য । আমি হঠাথ করে তাকে বললাম
-“জানিস আজ একজনের গল্প পড়লাম । অসধারন লিখে সে ! “
-“নাম কি তার ? ”
আমি পকেটে হাত দিয়েই চমকে গেলাম ! হায় হায় আমার ফোন ! পাচ্ছি নাহ ! মুবাশ্বির ফোন দিলো । বন্ধ ! আমরা তাড়াতাড়ি গ্রীন রুমে গেলাম । খুঁজলাম । কিন্তু নেই ! আমার ফোনটা হারিয়ে গেলো ।

বাসায় গিয়ে মার ফোনে আমার ফেবুতে ঢুকতেই দেখি ফটো ভেরিফিকেশন চাচ্ছে । দুঃসংবাদ যেন দলবল সহই আসে । আমার আইডি টাও চলে গেলো ।

আর তারপর? আমার দিনগুলো যেন কেমন করে কাটতে লাগলো । বসন্ত গেলো গ্রীষ্ম এলো , কিন্তু সেই লেখক আর আমার মন থেকে যায় নাহ । না দেখা অজানা এক ভালোলাগার জন্য আমার মন কেমন করে , খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করে । কেমন এক বোহেমিয়ান আবেগ !

৩।
এমন এক দিনের কথা ।
আমি আর মুবাশ্বির বাইরে বের হলাম । চারদিকে খাঁ খাঁ রুদ্দুর । এ নগরীকে মধ্য প্রাচ্যের এক প্রাচীন নগরী মনে হচ্ছে । রাস্তায় হাঁটছি । চোখ পড়লো এক ছাগল এর উপর । দেখি সে কুকুরের মত শুয়ে মাথা তুলে রেখেছে । মুবাশ্বির ছাগলের ক্যান ধরে বলল
-“পরের ভঙ্গী নকল করে নটের মত কেন চলিস”
আমার হাসি পেয়ে গেলো । এমন সময় শুনছি পাশ হতে কে যেন হাসছে । আমি পাশে তাকাতেই দেখি কেউ নেই! কেমন যেন ঘোরের মধ্য চলে গেলাম । মুবাশ্বিরের ডাকে ঘোর ভাংলো । সে বলল
-” কি হলো তোর ?”
আমি কিছু না বলে চলতে থাকলাম । কল্পনায় সে মানুষ তার নিত্য আসা যাওয়া । চোখের সামনে সে আর এলো না সেই লেখক ।
*
দিন গেলে মানুষ না কি আস্তে আস্তে ভুলে যায় । আমার হয়েছে উলটো দশা । এক অচেনা মানুষের প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি । শুধু দুর্বল নাহ , ভয়াবহ দুর্বল । মুবাশ্বির কে বললাম । সে হেসেই উড়িয়ে দিলো । এক বর্ষার দিনে কলেজ যাচ্ছি । হঠাথ দেখলাম রাস্তার মাঝখানে কে যেন দাড়িয়ে আছে! অপরুপ কান্তি ! দু গালে বর্ষার স্নিগ্ধতা । এক শ্যামল সুন্দর রূপ । আমি তার দিকে এগুতে লাগলাম । এমন সময় হর্নের শব্দ শুনে হুশ এলো। কন্টাক্টার আমায় বিরবির করে কি বলে যেন গাল দিলো । মনের মাঝ থেকে তার জন্য একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো । এ জীবনে হয়তো তার খোঁজ আর পাবো নাহ ।

৪।
একদিন , ফেবু চালাচ্ছি । হঠাথ করে একটা আইডি সাজেশনে এলো । সবুজের নীলাকাশ । আমার মনে হতে লাগলো নামটা কোথায় যেন শুনেছি! আইডি তে ঢুকলাম । দেখি অনেক গল্প লিখা ! কিসের জন্য জানিনা হঠাথ ব্যস্ত হয়ে গেলাম। একের পর এক গল্প পড়তে লাগলাম । একটা গল্পের দিকে চোখ আটকে গেলো । পড়ছি আর হাসছি , হাসছি আর কাঁদছি । আমি পাইলাম , আমি তাকে পাইলাম ! রিকুয়েস্ট পাঠালাম । সাথা সাথে রিসিভ । খুশিতে ইয়াহু বলে লাফ দিলাম । আর তারপর ?
*
বেকায়দায় পড়ে আমার পা মচকে গেছে । দাক্টার বলল ৭ দিন বেড রেস্ট। সাতদিন তার সাথে দিনরাত কথা বলতে লাগলাম। অপার্থিব সুখতন্দ্রায় ভাসছি । প্রাপ্তিতে !
*
পা ভালো হলো । ফোন নাম্বার নিলাম তার । দুরুদুরু বুকে ফোন দিলাম । আজ যা হোক বলে দিবো । ১ বছরের সমস্ত কষ্টের নিষ্কৃতি আজ । কিছু কথা বলতেই সে বলল
-” এই মিথ্যের দুনিয়া থেকে চলে যেতে চাই। একেবারে । আর আসতে চাই না এই কম্যুনিটি তে । পাওয়া না পাওয়ার হিসেব চুকিয়ে দিয়েছি । আইডিও আজ ডিলিট করে দিবো । একজন ক্ষণিক বন্ধু হিসেবে তুমি কি কিছু বলবে?
আমি শুধু একটা কথাই বললাম
-” পিছুটানের গতি বারিয়ে দাও। “
সেই ছিল তার সাথে শেষ কথা । আর কখনো ফেসবুকেও আসে নি । হারিয়ে গেছে জীবন থেকে! চিরতরে ! তাকে বলতে পারলাম নাহ, “ভালোবাসি”।

৫। আমি আর মুবাশ্বির হাঁটছি রেললাইন ধরে। মনের ভিতরে এক পাহাড় অব্যাখাত কষ্ট । কিন্তু কাঁদি নি আমি । হঠাথ করে মুবাশ্বির বলল
-” তোর হাতটা একটু ধরি ? “
-” নাহ “
মুবাশ্বির গান ধরলো । তার গানে আমার দুচোখ বেয়ে জল পড়তে লাগলো । বসন্তের সুকরুন সুরে সে গাইছে
,
– ” ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে
আমার নামটি লিখো তোমার
মনের মন্দিরে……………………” 

পর্ব ২

১.

গ্রীষ্মের পর বর্ষা এলো তারপর শরৎ। গ্রীষ্ম আর বর্ষা তাকে চিন্তা করেই কাটিয়ে দিলাম। শরতের আগমনী গানে কি সে সুর তুলবে?

মুবাশ্বিরেরর ধাক্কাতে চিন্তার ছেদ পড়ল।
মুবাশ্বিরঃ কি রে। কার কথা চিন্তা করছিস?

আমি তার কথার জবাব না দিয়ে বললাম
– ” আচ্ছা মুবাশ্বির তোর কি কখনো ভালবাসতে ইচ্ছে করে নাহ ? একাকী রাত্রির বিষণ্ণতা কারো সাথে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করে নাহ ?

মুবাশ্বির কিছুক্ষণ চুপ করে তারপর বলল
– নাহ , আমার জন্য ভালোবাসা নাহ ।

আমি আর মুবাশ্বির রেল লাইন ধরে হাটছি। স্যারের প্রাইভেটে যাচ্ছি। শরৎকাল।। আর কিছুদিন পর দূর্গাপূজো শুরু হবে। সেই উপলক্ষেই যেন রেললাইনের পাশে শাদা কাশফুল গুলো যেন বেশি করেরে ফোটতে আরম্ভ করেছে। হঠাৎ করে ফোন এলো। নামটা দেখে মুখে একচিলতে হাসি ফোটে উঠল। নূর।

আমার এক অলিখিত ভালোলাগা নূর । তার সাথে আমার বাধ্যবাধকতা নেই , ভালোবাসা নেই কিন্তু অভ্যস্থতা আছে । তার সাথে আলাপ করতে ভালো লাগে । হয়তো সেই লেখক কে ভুলতে তার সাথে আলাপ করি! কি আজীব দুনিয়া ! তাই নাহ !

২.

ফোন হারিয়ে যাবার পর অনেক ঝামেলায় পড়লাম। (মনের মন্দিরে ১ দ্রষ্টব্য). আবার একটা আইডি খুললাম । সেখানে একটা ছেলে আমার সাথে যুক্ত হলো । নূর । প্রথম প্রথম তার সাথে কথা বলতে এত আগ্রহ পেতাম নাহ । কিন্তু তার আগ্রহের কারণে আমার অনাগ্রহে ভাটা পড়তে লাগলো । আস্তে আস্তে তার সাথে আমার সম্পর্ক ফোনালাপে জড়ালো। সঙ্গহীন জীবনে যদি কেউ সহচরী হয় তাতে খারাপ কি ?
আমাদের কথা চলতে থাকে। দিনে রাতে সময়ে অসময়ে কি নিয়ে যে এত্তো কথা বলতাম তা জানি না। মনে হতো কথাগুলো যেন পিয়ানোর মতো অবিরাম সুরের তালে ঢেউ দিচ্ছে আমার অন্তরে। দিন কে দিন তার প্রতি আমি দুর্বল হচ্ছি , তবুও মনের মাঝে একটা কেমন যেন টান অন্যকারো প্রতি। সেই লেখক ………………………।

আজ দূর্গাপূজোর অষ্টমী। সকালে ঢাকে কাঠি পড়ার ফলে সেই ছোটবেলার মত তড়াক করে উঠে পড়লাম। আজ নূরের সাথে দেখা হবে । ভালোলাগা যেন হু হু করে বেড়ে চলল আমার মনে। মনে হচ্ছে যেন একগুচ্ছ রঙ বেংঙের ম্যাকাও আমায় ঘিরে চক্কর দিচ্ছে। অনেক অপেক্ষার পর দেখা । তার হাসিটা দেখে মাথা ঘুরে যাবার মতো অবস্থা। আমাদের সাথে মুবাশ্বিরও ছিল। তিনজন মিলে নাগরদোলায় উঠলাম। নাগরদোলা নিচে নামার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে রীতিমতো চিৎকার আরম্ভ করল। আমিতো হাসতে হাসতেই শেষ। তারপর তাকে নিয়ে গেলাম নৌকায়। দুজনে নৌকায় উঠে ছই এর উপর বসে আছি।

আমিঃ নুর। পুরোটাই কেমন যেন স্বপ্ন মনে হচ্ছে।

নূরঃ আসলে ভালোলাগার মুহূর্ত গুলো কেমন যেন তাড়াতাড়ি চলে যায় । ভাবতে পারিনি তোমার সাথে কিছুটা সময় দিতে পারবো । কিছুক্ষণ তোমার স্পর্শে থাকতে পারবো ।

আমি কিছু না বলে তার হাতটা শক্ত করে ধরলাম । নির্ভরতা ছিলো । কে জানে কিছুটা ভালোবাসাও ছিলো কি নাহ ?!

ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপার থেকে কিছু কাশফুল এনে দিলাম তাকে। কাউকে কাশফুল পেয়ে এতটা খুশি হতে দেখিনি। সারাদিন প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরলাম। বিদায়বেলা যে বেদনাবিধূর। বাসে উঠে গেলো সে। চেয়ে রইলাম তার পথপানে। নীরবে সবকিছু অবলোকন করছিল মুবাশ্বির।

৩.

হালকা হিমেল হাওয়ার সাথে মিস্টি কুয়াশাকে নিমন্ত্রন জানালো হেমন্ত। সদ্যস্নাত শান্ত কন্যার চোখের শুভ্রতা নিয়ে এলো এই হেমন্ত। এক হেমন্ত সকালে মুবাশ্বিরের ফোন।

মুবাশ্বিরঃ কই তুই।

আমি ঘুমজরানো কণ্ঠে তাকে বললাম
সকাল ৬ টার সময় মানুষ কই থাকে?
মুবাশ্বিরঃ টয়লেটে?
আমিঃ না, বিছানায়।
মুবাশ্বিরঃ চল একটু গা টা গরম করি।
আমিঃ হোটেলের তাওয়া কিংবা চুলার উপর ২ মিনিট বস। তাহলে গা এম্নিই গরম হয়ে যাবে । এই বলে আমি লাইন কেটে দিলাম।

তৎক্ষনাত উঠে গিয়ে জগিং এর ড্রেস পড়ে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। রাস্তার শেষ মোড়ে দেখি সে দাড়িয়ে আছে। আসতেই সে খুশিতে দাঁত বের করে দিল।

আমিঃ সকালে ব্রাশ করেছিস বলে সবাইকে দাঁত দেখিয়ে বেড়াতে হবে, এটা তো কথা না।

মুবাশ্বিরঃ করেছি বলেই তো দেখাব।তুই করেছিস? জানি, করিস নি।

আমিঃ আমি রাত্রে ব্রাশ করে শুই।

মুবাশ্বির যেন আরো কি কি বলতে লাগল। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে এই প্রভাতে। কত সুন্দর। আচ্ছা প্রিয় মুহূর্ত গুলোতে কি প্রিয় মানুষটার জন্য মন কাঁদে । আমার খুব লেখকের কথা মনে হচ্ছে ।

হঠাথ মুবাশ্বির আমায় বলল
-” ইশ্বরের দোহাই লাগে , তুই এখন বলবি না যে তুই লেখক কে মিস করছিস ।
-” আচ্ছা আমরা যাকে ভালবাসি তাকে মিস করাটা কি খুব অন্যায় কিছু?
-“আসলেই কি তুই তাকে আদৌ ভালোবাসিস? না কি না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে বিরহে আছিস। বলবি আমায়?

আমি আসলে কিছুই বলতে পা্রি নি । আমার দৃষ্টি ছিল শূন্য।আমার আসলে কিছু বলতে পারার কথাও নাহ ।

মুবাশ্বিরঃ দেখ, এমন হতে পারে নাহ যে সেই লেখক কারো প্রতি চুক্তিবদ্ধ ।

প্রশ্নটা আমায় বেশ ভাবিয়ে তুলল। কেন যেন আর কিছু চিন্তা করতে চাইলাম না। আমার ফোন বাজছে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি নূরের ফোন। ফোনটা ধরলাম না। বাজতেই থাকল। হেমন্তের সোনারং রৌদ্রের হালকা আলোয় সকাল টা ছিল মনোমুগ্ধকর। কিন্তু সেই দৃশ্য অবলোকন করার মত মন মানসিকতা আর ছিলো না।

৪।
শীত চলে এলো । আমি এমন দোটানায় আর থাকতে পারছি নাহ । আমি মনে হয় নূর কে ভালবাসতে শুরু করে দিয়েছি । এমন এক দিনে আমি আর মুবাশ্বির একটা কাজে বাইরে বের হলাম । মুবাশ্বির ফোনটা আমার কাছে দিয়ে কাজ করছে । একটা ম্যাসেজ এলো । নূর এর । আমি খুলব না খুলবো না করে খুলেই ফেললাম । তারপর যা দেখলাম তাতে আমার আমার মাথা কাজ করছে নাহ । খুব কষ্ট পেলাম । কিন্তু কিছু বললাম নাহ । খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম । কাজ শেষে চলে এলাম বাসায় ।
এ জিনিস টা আমার ক্লিয়ার হতে হবে । নুরের সাথে কথা বললাম , কোন তাড়া না নিয়ে । দেখা করতে বললাম । অবশেষে সময় হলো দেখা করার । ৩০ শে মাঘ ।
*
আজ শীতের শেষ দিন। শেষ দিন যেন শীত তার প্রকোপটা দেখিয়ে দিচ্ছে ইচ্ছেমতো। নিরাসক্তভাবে ট্রেনে উঠে বসলাম। সবকিছু কেমন যেন নিষ্প্রান লাগছিলো। কানের কাছে হু হু করে শিষ কেটে যাচ্ছিলো হিমেল হাওয়া। যেন কারো বুক চিরে বেরুনো শেষ নিঃশ্বাস। পার্কের নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। অবশেষে সে এলো । আমার পাশে বসতেই তাকে বললাম
-” পরিকল্পনা সফল হতে আর কতদূর?”
*
সে অবাক দৃস্টিতে তাকিয়ে আছে । আমি জল্ভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললাম
-” আমি তোমার আর মুবাশ্বিরের ইনবক্স দেখেছি ।”
সেও অনেকটা ক্লান্ত পরাজিত মানুষের মত বলতে লাগলো

“মুবাশ্বির তোমায় অনেক আগে থেকেই ভালো বাসত । কিন্তু তোমার চোখে তখন সেই লেখক ছাড়া কিছুই নেই । সে কারণে মুবাশ্বির বলে যে আমি তোমার সাথে কিছুদিন সম্পর্কে থাকি । তারপর ব্রেকাপ করি । তখন তুমি একাকী বোধ করবে , আর সে সময় এই মুবাশ্বির তোমার কাছাকাছি আসবে ও বলে দেবে তোমায় তার মনের কথা । “
আমার এসব শুনে ঘৃনায় গা রি রি করছে । ধাম করে তার নাকে একটা ঘুসি মেরে আমি চলে এলাম ।

৫।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। গাছ থেকে পাতারা ঝরে ঝরে পড়ছে। আর আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বাজে সকালের অপেক্ষায় আছি । গড়িয়ে গড়িয়ে নির্ঘুমে পাড়ি দিলাম শীতের শেষ রাত্রটি।

আজ বসন্তবরন অনুষ্ঠান। উপজেলায় বসন্তবরন উৎসব শুরু হবে। বিছানা থেকে একটা প্রানহীন দেহ উঠে বাথরুমের দিকে গেলো।

ম্যাম ফোন করল । অর্কমার ধাড়ি সব। কখন আসবে তোমরা। তাড়াতাড়ি এসো। পারফর্ম করতে হবে। মুবাশ্বির কে আসার সময় নিয়ে এসো। তোমার পারফর্মের পরে তার পারফর্ম টা।

নাস্তা করলাম না। মা রবীন্দ্রসংগীত গুনগুনিয়ে ভজছে -আহা, আজি এ বসন্তে, এতো ফুল ফোটে…..
রাস্তায় নেমে পড়লাম।

চারদিকে সবুজের আগুনে জ্বলে গেছে। কিন্তু আমার কাছে এসবের কোন মানে নেই । নির্জীব বসন্ত।
অনুষ্ঠানে পৌছুলাম। পিছনে একটা বিশাল পুকুর ও তার পাড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছ। গুড়িতে বসে পা ডুবিয়ে আছি পানিতে । পেছন থেকে কম্পিত স্বরে আমাকে ডাকল মুবাশ্বির। তার চোখ দুটো জলাসিক্ত। তার কাছাকাছি এগিয়ে গেলাম।

মুবাশ্বিরঃ তোকে একটা কথা বলতে চাই।

মুবাশ্বির কিছু বলার আগেই আমি তার গালে একটা চড় বসালাম। কড়া স্বরে বললাম

-উত্তরটা পেয়েছিস?? ভালো বন্ধু হয়ে তুই এটা কেন করলি! কখনো কারো আশ্রয় ছাড়া নিজে বলে দেখতি। তুই যা আমার সামনে থেকে। কখনো আসবি নাহ ।

মুবাশ্বিরের চোখে সেদিন দেখেছিলাম ভালোবাসার বাঁধন। এক অব্যাক্ত আকুতি। তাকে তার পছন্দের কথাটাও বলতে দেইনি। হয়তো সে বয়ে বেড়াবে এক বুক ভরা কষ্ট। নিঃস্থব্ধ সেই দুপুরে মুবাশ্বিরের গানে আমার ভাষাহীন চোখে জমছে মেঘ। দুঃখগুলো গুমড়ে গুমড়ে থেকে এখন যেন গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে গেছে। দুফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল মুবাশ্বিরের গানে।

মুবাশ্বির গাইছেঃ ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখ তোমার মনের মন্দিরে…………

পর্ব ৩

১.
কেটে গেলো কতগুলি বছর।
আমি এখন অনেকটা বড় হয়ে গেছি। আগের মতো সাময়িক ভালোলাগা আর আমায় ভাবায় না। সুন্দর কাউকে দেখে বুকে ব্যাথা লাগে না। ভালোবাসার ইচ্ছেটাও আজকাল মরে যাচ্ছে।
আগের সময়গুলো নিয়ে আজকাল কেন যেন ভাবতে বসি। হয়তোবা ভালো লাগে। তাই!
কত সুন্দর ছিলো সে সময়গুলো।

২০১৩ সাল।
সজল নামে তখন এক বন্ধুর সাথে কথা হতো। অনেকদিন কথা হয়েছিলো। এখন আর যোগাযোগ নেই। পুরনো ছবির মতো ফোনের অনেক ভেতরে অযত্নে পরে থাকে। তার সাথে কখনো দেখা হয় নি। একবার দেখা হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তার আর সময় হয় নি। দেখাও হয় নি। ভুলে গিয়েছিলাম তাকে। হয়তো মনেও হতো না। পনেরোটা বছর কেটে গেলো।

২০২৮ সাল।
অফিসের উদ্দ্যেশে রওনা দিয়েছিলাম। পেছন থেকে কে যেন ডাক দিলো
“এই চিন্ময়…”
থমকে দাড়ালাম!
কারন অনেক আগে চিন্ময় নামে ফেসবুকের কিছু বন্ধু আমাকে চেনতো! তারপর আইডি চলে যাবার পর আর কেউ মনে রাখেনি। তখন কতশত গল্প লিখতাম। সেলিব্রেটি, জনপ্রিয়তা এসবের গন্ধে মিশে থাকতে ভালো লাগতো। অথচ কি অথর্বই না ছিলাম আমি!
আবার তার ডাক। পেছনে ফিরলাম। রীতিমতো অবাক হলাম! চেহারাটা চেনা চেনা লাগছে…! মাথায় চাপ দিতেই নামটা বের হয়ে আসলো! রুহুল!
২.
২০১৫ সাল।
হুটহাট করেই রওনা দিলাম। একদম অপ্রত্যাশিত। অনেক দিনের কথাবার্তারর পর দেখা করা। প্রথমে দেখেই তার প্রেমে পড়ে গেলাম। হতে পারে লাভ এট ফার্স্ট সাইড। সাধারন একটা ছেলে। চোখেমুখে মফঃস্বলীয় সরলতা। চেহারাতে আছে এ তীব্র অমোঘ আকর্ষন। তাদের বাসায় গেলাম। ফ্রেশ হয়েই বেরিয়ে পড়লাম সাইড সিয়িং এ। একটা কালভার্টের উপর বসলাম পা ঝুলিয়ে। হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম
-“আচ্ছা কালপুরুষ চেনো?”
-না, তো।
তাকে কালপুরুষ দেখালাম। অষ্টাদশীর ভাঙা চাঁদের মৃৎ জোছনায় দেখি সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে কালপুরুষের দিকে। আর আমি তাকে দেখি। হা বলতে দ্বিধা নেই, আমি তার প্রেমে পড়েছি। বাসায় গিয়ে খেয়েদেয়ে দুজন শুয়ে পড়লাম। সংকোচ ভেঙে আমি তাকে আমার কাছে টেনে নিলাম। সে কিছু না বলে আমার বুকের মাঝে মাথা দিয়ে আঁকড়ে ধরে শুয়ে থাকলো। বুকটা যেন ভরে উঠল এক অপার্থিব ভালোলাগায়।কামনা জাগলেও কামনার কোন স্থান ছিল না সে আলিঙ্গনে।
.
রাতটা কেটে গেলো। পরদিন বের হলাম খুলনার বাইরের সৌন্দর্যের অবলোকনে। ষাটগম্বুজ মসজিদ, খানজাহান আলীর মাজারসহ আরো অনেক কিছু দেখলাম। সারাদিন কাটানোর পর বুঝতে পারলাম তার সম্পর্কে। বাস্তবতার নাগপাশে বদ্ধ সে। সাবলীল আকর্ষনে সবাইকে কাছে টেনে নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে, কিন্তু তাকে কাছে টানার মতো কেউ নেই।
অকারনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বাসায় এসে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লাম। আগেরদিনের মতো তার মাথা আবারো আমার বুকে। কেন যেন আত্মসংযম টা হারিয়ে ফেলেছি। চোখ জ্বলছে। গড়িয়ে পড়ছে গরল! সে মাথাটা আরো গুঁজে দিল বুকের মাঝে। কেটে গেল বিনিদ্র এক রাত।
.
আজ চলে আসছি আপন নীড়ের ঠিকানায়। বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। তার চোখ ছিল শূন্য। হয়তো আবেগহীন। খুব কষ্ট হচ্ছিলো। বাস ছেড়ে দেয়ার প্রাক্কালে আমি তাকে জিগ্যেস করেছিলাম
-আচ্ছা বলতো, আমাদের সম্পর্কটা কেমন?
-বন্ধু??
মুচকি হেসে বললাম
-না, বন্ধু না,
“আমরা আমাদের কেউ না।”
.
এটা ছিলো রুহুলের সাথে প্রথম দেখার পর কিছু অনুভূতি। সে কাছে এসে বললো
-‘গুগোলের জগতে যে একেবারে হাওয়া হয়ে গেলে! ‘
মুচকি হেসে অনুযোগ এড়িয়ে আমার প্রথম প্রশ্ন
-অনেকদিন পর। সবকিছু ভালো তো?
-হা, অফিস যাচ্ছিলে?
-হা, তবে তোমার হাতে সময় থাকলে কিছুক্ষন আড্ডা দিতাম।
-সে আছে।
বসকে ফোন দিয়ে মিথ্যে অজুহাত দাড় করিয়ে দিনটাকে ছুটির দিনে রূপান্তর করলাম। একটা কফিশপে বসে কোল্ড কফি অর্ডার দিতে দিতে বললাম
-“হঠাৎ ময়মনসিংহে?”
-হা, অফিসিয়াল কাজে।
-তা বাকি খবর বলো…
-বিয়ে করেছি আজ প্রায় দশবছর হলো। সাংসারিক জীবনে চলে যাচ্ছে বেশ।
-আমার ভাতিজা, ভাতিজি?
-দু ছেলে। বড়টা ক্লাশ ফ্লোরে, ছোটটার ৩ বছর।

কি সাবলীলভাবেই বলে গেলো। আসলে কিছু কিছু মানুষের সুখী থাকার ক্ষমতা অসাধারন! যেমন রুহুল! অথচ আমিও সুখী থাকতে পারতাম। কিন্তু….. পারি নি!
সে আবার বললো
-সজলের সাথে কথা হয়…?
নাহ, প্রায় ১০-১২ বছর ধরে কারো সাথে যোগাযোগ হয় না। তোমার?
-আমার হয়। মাসে তিনমাসে একবার।
কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো
এভাবে সবার কাছে পালিয়ে কি পেলে চিন্ময়…?
-“পাওয়া না পাওয়ার হিসেব করে কিছুই করি নি। একসময় করতাম। কিন্তু পাই নি কিছু। আজ করি না! কিন্তু পেয়ে গেলাম ঠিকই!
তোমার সাথে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ!
কিছুক্ষন চুপ করে ছিলো সে। বৈষয়িক কথা ছাড়া তারপর আর সেরকম কথা হয় নি। যাবার সময় বললো
-“কন্ট্রাক্ট নাম্বার টা পেতে পারি?”
কিই বা আর হবে। পথ চলতে কখনো দেখা হলে আবারো দুটো মিনিট সময় দিয়ে দেবো দুজনে।

তার সাথে আর আমার কখনো দেখা হয় নি!

৩.
আমি বিয়ে করিনি!
মা বাবা প্রথম প্রথম প্রচুর চাপ দিতো। সেখানে আমার বিয়ের প্রতি বিমুখতা দেখে আরো চাপ দিতে লাগলো। একসময় আমি রূঢ় ভাষায় ই বললাম
-“চাপ দিয়ে বিয়ে করাতে চাইলে কি বিয়ে হয়? যখন মনে করবো আমি দ্বায়িত্ব নিতে পারবো তখন আমি বিয়ে করবো”
তারপর থেকে তারা আমায় আর কিছু বলতো না। বলা কি উচিত ছিলো? জানি নাহ!
একা একা চলে যাচ্ছে বেশ। কিংবা ভালো নেই। দ্বৈত চিন্তায় ভুগছি ইদানিং।
আমার একজন পার্মানেন্ট সেক্স পার্টনার আছে। কারন আমার সেক্স পার্টনার ঘন ঘন চেঞ্জ করতে ভালো লাগে নাহ। তবে তার সাথেই যে কমিটেড তা না। মাঝে মাঝে সুন্দর ছেলেদের দেখে রক্তে বেশ টেস্টোস্টেরন খেলা করে। কাউকে বিছানায় নিয়ে আসি যদি সেরকম সুযোগ পাই। বন্য হয়ে যাই। অনেকটা নির্দয়ের মতোই। তবু তাদের মধ্য কেউ কেউ আমায় ভালোবাসতে চায়। আমি চাই না। কারন আমি ভালোবাসা সংক্রান্ত জটিলতায় জড়াতে চাই না।
.
সে ঘটনাটার কথা খুব মনে পড়ছে। বিশেষ একটা ঘটনা….।
বাবা অসুস্থ । বাবার দিকে তাকিয়ে আমার বুক বিদীর্ণ হয়ে বেরিয়ে এলো একচিলতে দীর্ঘশ্বাস। আমার ছোট ভাইও আমার সাথে বসা। দুজন দুজনের হাত ধরে অাছি। হঠাৎ সে ভারীকন্ঠে বললো
.
-আচ্ছা দাদা, মৃত্যুর পর কি হয়?
.
আমি কিছু বলি না। চুপ করে থাকি। মনে মনে বলি
.
-কিচ্ছু হয় না রে। মৃত্যুর পর সব শেষ। আর কিছুই বাকী থাকে না। অনেকটা সে কবিতার মতো
.
“যে জীবন দোয়েলের-ফড়িঙের
মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা…..”
.
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলাম। পাশেই হরিতকীর বন। সেরাতে খুব জোৎস্না হয়েছিলো।নীবর রাস্তায় দুজনে হেটে হেটে বাসার উদ্দ্যেশে যাচ্ছি। পায়ের শব্দগুলো কানে লাগছিলো। ঝিঁ ঝিঁ পোকা হয়তো মৃত্যুর সুর নিয়ে গাইছিলো গান। কি সুকরুণ সুর ঝিঁঝিঁ পোকার কন্ঠে! সেরাতে হরিতকীর বনে জোছনা দেখা হয়নি কারো। হয়নি নীরব রাত্রির কাছে নিজ সময়ের আত্নসমর্পন। আস্তে আস্তে বাবাকে ভুলে যাবো, কিন্তু পারবো কি? মাঝে মাঝে আধো তন্দ্রায় দেখবো বাবা ওপার হহতে বলছে অামায়
.
-ভালো আছিস খোকা?

কতদিন কেটে গেলো। বাবা, মা আর নেই। ছোট ভাই বিদেশে সেটেল্ড। আমি একাই পরে আছি। প্রথম প্রথম আত্মীয়স্বজন খবর নিলেও আমার গা ছাড়া ভাব দেখে তারা আর খবর নেয় না। আমি বিপুল ব্রহ্মান্ডে একা হয়ে গেলাম!
অনেকটা একা!

৪।
আরো দশটি বছর কাটলো।
হঠাৎ একটা কাজে আমার রংপুরে দৌড়াতে হলো। অফিসের ঝামেলা শেষ করে এক্সট্রা দুদিন ছুটি পেলাম। চিন্তা করছি রংপুর ঘুরে দেখি!
প্রথম দিন ঘুরে দেখলাম। সাধারন শহরগুলোর মতোই। বিশেষত্বহীন। কিছু দর্শনীয় জায়গায় ও গেলাম। দিনটা চলে গেলো এভাবেই।
দ্বিতীয় দিন বিকেলে বের হলাম। কারমাইকেল কলেজ গন্তব্য। কলেজটা বিশাল একটা জায়গার উপর অবস্থিত। ঘুরে ঘুরে দেখছি। হঠাৎ ই চোখ পড়লো! ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। ঠিক! এ চেহারা ভোলার নয়! সজল!
সেও আমায় দেখতে পেলো।
তার চোখে ভারী লেন্সের চশমা ঝুলছে। অনেকটা বুড়িয়ে গেছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।
কাছে এসে বললো
-“অবশেষে দেখা হয়েই গেলো”
মুচকি হেসে বললাম
-‘চল কোথাও গিয়ে বসি’
হাটতে হাটতে একটা জায়গায় এসে পড়লাম। পার্কের মতো। বড় বড় গাছ। বাতাসে শীত শীত গন্ধ। হেমন্তের শেষভাগ। একটা জায়গায় বসে বললাম
-কখনো ভেবেছিলি দেখা হবে?
-নাহ, জীবনের এ অপরাহ্নে দেখা হয়েই গেলো।
-তা কেমন আছে পরিবারের সব?
-আর পরিবার! আমিই আমার পরিবার।
আমি মৌলিক বিষ্ময় টেনে বললাম
-“বিয়ে করিস নি!”
-সবার কপালে কি বিয়ে থাকে? সেসব নিয়ে ভাবি নি। এ কলেজের শিক্ষক। পছন্দের পেশা। তা নিয়ে বেশ আছি। আর তুই?
-না রে, ইচ্ছে করেই করি নি।
-কারো প্রতি অভিমান?
-অভিমান করে নিজের উপর প্রতিশোধ নেয় বোকারা। আমি বোকা না।
-তবে কেন করলি না?
দার্শনিক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললাম
“জীবন যেখানে যেমন, সেরকম তাল মিলিয়ে চলেই বেশ আছি।
-ভালো আছিস কি?
আমি চুপ করে রইলাম। জানি না, কেমন আছি!
.
মধ্যপ্রাচ্যের শেষ বিকেলের অচেনা রোদ্দুরের মতো এখানকার রৌদ্র। বাতাসে যেন বিরহ ছুটে। একদুটো ঝরাপাতা উড়ে যায় দূরে। পরজীবনের কথা কেন জানি মনে পরে। সজল গুনগুন করে গান করছে। বুকটা মুচড়ে উঠলো তার গানে। গান কি মনের কথা বলে? জানি না। শেষ বয়সেও চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে তার গানে
.
“ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে,
আমার নামটি লিখো তোমার
মনের মন্দিরে…..”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.