মনের মানুষ

লেখকঃ আনন্দ ধারা

(একটি সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে)

৪ নভেম্বর, ২০১০
আসিফের আজ বিয়ে। গতকাল গায়ে হলুদে যে ঝক্কি সামলতে হয়েছে তাতে করে আসিফ যে এখনো সুস্থ অবস্থায় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারছে সেই ঢের। সারা রাত জেগে বন্ধু আর কাজিনদের সাথে নেচে গেয়ে ঘুমাতে গেছে সেই ভোরের দিকে। আবার সকাল নয়টা না বাজতেই ব্যাপক চেচামেচি আর হৈ হুল্লোড়ে সাধের ঘুমটা গেছে ভেঙ্গে। কি আর করা! কড়া এক লিকার চা খেয়ে দিনটা শুরু করে সে। আজকের দিনটা তার জীবনের বিশেষ একটা দিন। জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু করবার দিন। অনেক দায়িত্ব ঘাড়ে এসে পড়ার দিন। তাই নতুন দিনের সূচনাটা এক কাপ কড়া লিকারের চা দিয়েই শুরু করলো আসিফ। দিনটা ভালোয় ভালোয় যেন পার হয় এই তার ইচ্ছে!

“আসিফ… শেরওয়ানিটা পড়ে তোর ছোট খালাকে একবার দেখাতো বাবা!” মায়ের ডাকে সংবিত ফিরে পায় আসিফ। এই নিয়ে তিনবার একই শেরওয়ানি পড়তে হচ্ছে তাকে। কমিউনিটি সেন্টারে যাবার আগে আরো কতবার যে পড়তে হয় আল্লাহ্‌ই ভালো জানেন! যখনই মায়ের বিশেষ কোন আত্নীয় আসছেন, তখনই মা তার সামনে আসিফকে শেরওয়ানি পড়ে আসতে বলছেন। অন্য সময় হলে ঝাড়ি মেরে মা’কে চুপ করে দিত আসিফ। কিন্তু আজ তা সম্ভব নয় কোনভাবেই। সম্ভব নয় কারণ ২০০৩-এ এই মাসের ২৩ তারিখে তার একমাত্র ভাই মায়ের কোল ছেড়ে চিরতরে বিদায় নেয়। আর কাকতালীয়ভাবে এই মাসেই তার বিয়েটা হচ্ছে। ভাইয়া বেঁচে থাকলে মা’কে “ছেলের শেরওয়ানি পড়া সাজ”টা দেখার জন্য এতগুলো বছর অপেক্ষা করতে হতো না। আসিফ যে তার মায়ের একমাত্র জীবিত সন্তান, তা কিন্তু নয়। তার মায়ের আরো ছয় ছয়টি মেয়ে আছে। কিন্তু ছেলের প্রতি মায়েদের যে কী বিশেষ টান থাকে, সেটা আসিফ আগে না বুঝলেও ভাইয়া মারা যাবার পর তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারে। আর তাই সুবোধ বালকের মত শেরওয়ানিটা পড়ার জন্য আলমারির দিকে এগোয় আসিফ।

৩১ জুলাই, ২০১১

জীবনের কিছু কিছু তারিখ মানুষের পক্ষে ভোলা কখনই সম্ভব নয়। আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় আসিফ ভাবতেও পারেনি আজকের দিনটা তেমনই এক দিন হয়ে আসবে তার জীবনে। বিকেলের দিকেই আসে খবরটা। আজ আসিফ প্রথমবারের মত বাবা হয়েছে। প্রথম বাবা হওয়াটা একজন পুরুষের জীবনে যে কত বড় আনন্দের, সেটার বহিঃপ্রকাশ মানুষজন খুব একটা দেখতে পায়না। হয়তোবা দেখতে চায়না বলেই! সন্তান জন্মদানের সবটুকু কষ্ট মেয়েদেরই কুক্ষিগত কিনা! তাছাড়া সমাজের চোখে পুরুষমানুষ মানে হলো আবেগহীন জড় পদার্থ। যে কিনা সারাদিন খেটে টাকা কামাবে, আর রাতে স্ত্রী সম্ভোগের মাধ্যমে, সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে নিজের পুরুষত্ব জাহির করবে। পুরুষ মানুষের আবার আবেগ-অনুভূতি কি? অন্তত সমাজের কারনে হলেও পুরুষজাতির মাঝেও এ ধারনা আজ বদ্ধমূল। আসিফ নিজেকে তাই প্রায়ই অসামাজিক একটা জীব বলে মনে করে। কেন সে আর দশটা পুরুষের মত নয়? কেন মানুষের কষ্টানুভূতিগুলো এতো বেশি করে নাড়া দেয় তাকে? কেন সে আর সবার মত ভেতরে এক সত্বা রেখে বাইরে আরেক সত্বার খোলসে নিজেকে আবৃত করতে পারে না? আসিফ ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা।

বিদেশ বিভূঁইয়ে নিজের আনন্দ জাহির করার সুযোগটা আরো কম। কাকে দেখাবে আনন্দ? সবাই তো যে যার কাজে ব্যস্ত। শুকনো হাসি দিয়ে কাঠখোট্টা ইংরেজিতে “কংগ্রেচুলেশন্স” বলেই সবাই দায় সারে। তাই নিজের এত বড় প্রাপ্তির সংবাদটা অফিস আর বাসার যান্ত্রিক সব মানুষদের সাথে শেয়ার করে নিজের আনন্দটা মাটি করতে চায় না আসিফ। সোজা চলে যায় একটা অরফানেজ হাউজে। সেখানকার বাচ্চাদের জন্য কিছু খেলনা কিনে তাদের দিয়ে আসে। আর এভাবেই নিজের সন্তানের কাছে না থেকেও হাজারো সন্তানের মাঝে থেকে নিজের পিতৃত্বের স্বাদ কিছুটা হলেও লুফে নেয় আসিফ।

ছেলের নামটা নিজেই ঠিক করে আসিফ। আইমান। তার স্ত্রীরও তাতে আপত্তি নেই। বাসার সবাই নামটা খুব পছন্দ করে। বাবার সাথে মিলিয়ে রাখা- আইমান ইকবাল। শুধু ছেলের ছবি আর ভিডিও ক্লিপ দেখেই নিজের মনকে শান্ত করতে হয় আসিফকে। দেশে যাওয়া হবে সেই ডিসেম্বরে। তাই ছেলের অস্তিত্বটাকে নিজের কাছে সবসময়ের জন্য দৃশ্যমান রাখতে আর সব আধুনিক বাবা মায়ের মত ছেলের জন্মের কিছুদিন পরই ছেলের নামে একটা ফেইসবুক আইডি খোলে সে। উদ্দেশ্য আইমানের সব ছবি আর ভিডিওগুলো সেখানে এক করে রাখা, যেন ছেলে বড় হয়ে নিজের ছোটবেলার ছবি আর ভিডিওগুলো দেখে অবাক হয়। আসিফ ঠিক করেছে, আইমান বড় হলে এই আইডির পাসওয়ার্ডটা তাকে দিয়ে দেবে, আইমান তখন নিজের মত করে চালাবে এই আইডিটা।

সেই থেকে নিজের আইডির চেয়ে আইমান ইকবাল আইডিতে বেশি সময় কাটানো হয় আসিফের। নিজের আইডিতে সব পরিবার পরিজন আর কলিগরা এড করা। তাদের সাথে একঘেয়েমি মার্কা কথা বলতে আর ভাল লাগে না। হয় জিজ্ঞেস করবে “দেশে কবে আসবা? এখন বেতন কত?” নয়তো জিজ্ঞেস করবে “আজকে নাইট ক্লাবে যাবি? ইন্দোনেশিয়ান কিছু সেক্সি মাল এসেছে।” তার চেয়ে বরং এই আইডিতে বসে নিশ্চিন্তে দেশ বিদেশের খবর পড়া যায়, নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিতও হওয়া যায়।

১৫ জুলাই ২০১৩,
আইমান এখন দুই বছরের দূরন্ত শিশু। তার দুরন্তপনা আসিফকে পিতৃত্বের ষোলকলা স্বাদ পূর্ণ করে দেয়, তবে আফসোস জন্মের পর থেকে এই দুই বছরে ছেলেকে মাত্র এক মাসের জন্য কাছে পেয়েছে সে। জীবিকার তাগিদে দেশের বাইরে থাকা, তবু সান্ত্বনা এত কষ্ট সব তো আইমানের সুন্দর ভবিষ্যত গড়তে সাহায্য করার জন্যই।

সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে ফেইসবুকে ছেলের নামে করা আইডিটা খুলে বসে আসিফ। উদ্দেশ্য নতুন জুটে যাওয়া দেশী-বিদেশী কিছু বন্ধুর সাথে ভাববিনিময়, যাদের অনেকেই তার মত, নিজের মনের অব্যক্ত কথাগুলো বলার জন্য এক নকল পরিচয়ে নিজেদের পরিচিত করে। হঠাত একদিন “পিপল ইউ মে নো” এর নোটিফিকেশনে একটা ছবি দেখে চোখ আটকে গেল তার। ছেলেকে কাঁধে চড়িয়ে সমুদ্র সৈকতের দিকে হেঁটে যাচ্ছে এক বাবা। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালো। কিছুক্ষন পর নোটিফিকেশনে আসলো এক্সেপ্টেড। অনেকটা আগ্রহ নিয়েই আসিফ নক করলো লোকটিকে,
– ছবিটি কি আপনার?
– জ্বি।
– কাঁধে কি আপনার ছেলে?
– জ্বি, আমার।
– খুব সুন্দর।
– ধন্যবাদ।
– আপনার কি একটাই ছেলে?
– না দুইটা। এটা ছোটটা। বড়টার বয়স ১০। এটার ৪।
– বাহ খুব ভাল।
– আপনার কয় ছেলেমেয়ে?
– একটাই ছেলে। দুই বছর। দেশে থাকে।
– আপনি? আপনি কোথায় থাকেন?
– জ্বি মালয়েশিয়া। আপনি?
– ইংল্যান্ড।
– কত বছর?
– তা প্রায় বারো বছর তো হবেই।

এভাবেই ফেইসবুকীয় কথোপকথন শুরু হয় আমজাদের সাথে। প্রতিদিন সন্ধ্যায়। প্রথমে আধ ঘন্টা, এরপর আস্তে আস্তে সময় বাড়তে থাকে। এরপর এমন হয়ে যায় যে সারাদিনই আসিফ অপেক্ষা করতে থাকে সন্ধ্যা হবার, কখন কথা হবে আমজাদের সাথে। কথার বিষয়বস্তু যদিও প্রতিদিন প্রায় একই ধরনের- পারিবারিক, দেশীয় দূর্দশাগ্রস্থ রাজনীতির বা কখনো কখনো সাংস্কৃতিক, তবুও কথার তুবড়ি যেন থামতেই চায় না দুজনের। বন্ধুত্বের যে পবিত্র সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুজনের মাঝে, তেরো বছরের বয়সের পার্থক্য সেখানে কোন বাঁধাই হয়ে দাঁড়ায় না।

২০ অক্টোবর, ২০১৩
(সকাল ৯টা)
অফিসে তেমন কাজ নেই। তাই এক ফাঁকে ফেইসবুকে ঢুঁ মারে আসিফ। দেখে যার জন্য আসা, সেই মানুষটি অনলাইনেই। নক করলো আসিফ,
– কেমন আছেন?
– হুম ভালো। আপনি?
– হুম ভালো।
– একটা অন্যায় আবদার করবো রাখবেন?
– এভাবে বলছেন কেন? আপনার সাথে কি আমার একদিনের বন্ধুত্ব। বলেন না, কী বলবেন।
– যদি কিছু মনে না করেন, আপনার ফোন নাম্বারটা পেতে পারি?
– হা হা হা! না পেতে পারেন না।
– ও আচ্ছা, সরি।
– কেন পেতে পারেন না জানতে চাইলেন না?
– কেন?
– কারন আপনি মাত্রাতিরিক্ত ভদ্রতা করছেন।
– ও।
– ********* এটা আমার নাম্বার।
– ধন্যবাদ।
– একটা কল করি?
– আবার?

দ্বিতীয়বার আর ঝাড়ি খাওয়ার মত কাজ না করে সোজা কল করলো আমজাদ আসিফের মোবাইলে। সেই প্রথম কথা। লন্ডনের ঘড়িতে রাত দুটো বেজে যাওয়ায় কথার ফুলঝুড়ি ফোটানোর প্রচন্ড ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাড়াতাড়িই ফোনটা রাখতে হয় আমজাদকে। কথা দেয় লন্ডন সময় পরদিন দুপুরের দিকে আবার ফোন দেবে।

সারাটাদিন খুব উত্তেজনার মাঝেই কাটে আসিফের। তিন মাস পর আজ প্রথম আমজাদের সাথে ফোনে কথা হলো, সবচেয়ে বড় কথা লন্ডন সময় দুপুরে, তার মানে মালয়েশিয়ান সময় অনুযায়ী রাতে আবারো কথা হবে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আর তর সয় না আসিফের। ফ্রেস হয়ে মুখে কিছু একটা গুজেই সোজা ল্যাপটপটা কোলে নিয়ে বসে পড়ে।

কিন্তু, নাহ্‌! প্রত্যাশিত মানুষটা নেই। অপেক্ষা করতে থাকে সে। রাত ১০ টা বেজে যায়। কিন্তু এখনো তার দেখা নেই। সারাদিনের উত্তেজনায় স্নায়ু দূর্বল হয়ে আসে আসিফের। ল্যাপটপ অন করেই বালিশে মাথা দিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে সে নিজেও জানে না।

হঠাত ফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে তার। ঘুম ভাংতেই ঘড়ির দিকে তাকানো আসিফের পুরনো অভ্যাস। রাত দু’টো। হকচকিয়ে ওঠে সে। হ্যাঁ। ফোন এসেছে। বহুল প্রতীক্ষিত সেই ফোন। তাড়াতাড়ি উঠে ফোনটা ধরে সে।
– এক্সট্রিমলি সরি। ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেবার জন্য।
– না না ঠিক আছে।
– না একদমই ঠিক নাই। আসলে দুপুরে কাজের ফাঁকে আজ কথা বলার ফুরসতই পাচ্ছিলাম না। অফিস থেকে বাসায় ফিরে আবার শপিঙ্গে যেতে হলো কিছু জরুরি জিনিস কেনার জন্য। এরপর ফ্রেস হয়ে কল দিতে যাবো দেখি আপনার ওখানে রাত ১ টা বাজে। তাই ভাবলাম আর বিরক্ত না করি, আপনি হয়তো ঘুমিয়ে গেছেন। কিন্তু মনকে মানাতে পারলাম না। কথা দিয়েছিলাম যে রাতে ফোন দেবো। তাই ভাবলাম কথা রাখার জন্য হলেও একবারের জন্য একটা কল দেই।

– আরে বাবা, ঠিক আছে তো, কোন সমস্যা নাই। আমি ভাবলাম নিজেই একটা কল দেই, পরে আবার ভাবলাম আপনি বাসায় ফিরেছেন কিনা তখন, তাই আর দেই নি।
– দিলেই পারতেন, অবশ্য আজ কাজের খুব চাপ ছিল তাই ফ্রি ভাবে কথা বলতে পারতাম না।
– হুম বুঝেছি
কথা চলতে থাকে প্রায় দুই ঘন্টার মতো। কৈশোরের প্রেমের মত কেমন যেন একটা অজানা আকর্ষণ অনুভব করতে থাকে দুজন দুজনের জন্য।

এরপর প্রতিদিন অন্তত একবার ফোনে কথা হতে থাকে দুজনের। আমজাদই বেশিরভাগ ফোন দেয়। মালয়েশিয়ার টাইম শিডিউল, বিশেষ করে আসিফের টাইম শিডিউলটা তার মুখস্থ। তাই আসিফের সময় বুঝেই তাকে কল দেয় সে। চলতে থাকে দুজনের সম্পর্ক, যেটাকে এখন আর নিছক বন্ধুত্বের ছকে আবদ্ধ রাখা যায় না, আবার ভালোবাসার শিরোনামেও আখ্যায়িত করা যায় না।

মনের দরজায় দুজনই দুজনকে ধীরে ধীরে কড়া নাড়তে থাকলেও মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস হচ্ছিল না কারোই। একদিন অনেক সাহস সঞ্চার করে আমজাদ বলে বসলো,
– আচ্ছা তোমার জীবনে কী ভালোবাসা ধরা দিয়েছিল?
– হুম দিয়েছিল, তবে ধরে রাখতে পারিনি।
– কেন?
– সে অনেক কথা।
– বলো না শুনি।
– পুরনো কথা মনে করে কষ্টটা আর বাড়াতে চাই না যে!
– ওহ্‌ হো! সরি।
– ইট্‌স ওকে।
– আচ্ছা, ন্যাড়া কী আবার বেলতলায় যাবে?
– উমমম… বেলতলাটা যদি লোভনীয় হয় তবে কেন নয়?

সেই থেকেই শুরু। মুখে হয়তো ভালোবাসি কথাটা আওড়ানো হয়নি, তবে দুজনই বুঝে গেছে সারাদিনে অন্তত দু’বার কথা না বললে তাদের চলবে না কিছুতেই। আমজাদ সকালে জগিং করার সময়টায় রোজ এক ঘন্টা করে কথা বলে আসিফের সাথে। আসিফের তখন লাঞ্চব্রেক। আবার আসিফ যখন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সাতটার দিকে ল্যাপটপটা নিয়ে বসে, লন্ডনের সময় দুপুর ১২টার দিকে অনলাইনে হাজির হয়ে যায় আমজাদ। এ যেন এক অলিখিত নিয়ম। জীবন নামের দিবসটার মধ্যাহ্নে দাঁড়িয়ে দুজনেই যেন তারুন্যের উচ্ছ্বল এক ভালবাসার স্বাদ আস্বাদন করতে থাকে।

জানুয়ারী ১০, ২০১৪
ছুটিতে গ্রীসে বেড়াতে যায় আমজাদ তার পুরো পরিবার নিয়ে। কয়েকদিনের জন্য রুটিন কথা বার্তার মাঝে বিরতি, তাই বলে আসিফের ফ্রি টাইম অনুযায়ী প্রতিদিন একবার করে ফোন দিতে ভুল হয় না আমজাদের। আসিফ খুব অবাক হয়। কিভাবে পারে এই মানুষটা এভাবে ভালবাসতে? শত ব্যস্ততার মাঝেও কিভাবে পারে খবর নিতে যে আসিফ দিনে অন্তত তিন লিটার পানি পান করেছে কিনা?

এভাবেই চলতে থাকে তাদের “হঠাৎ বৃষ্টি” ভালবাসা। “হঠাৎ বৃষ্টি” এই জন্য, কারন অজিত আর দীপার মত আসিফ আর আমজাদও কেউ কাওকে দেখেনি। অজিত-দীপার হয়তো সু্যোগ ছিল না। কিন্তু আসিফ-আমজাদ তাদের শত সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগায়নি। কেননা আসিফের সেই এক গোঁ। দেখা যখন হবে, সামনা সামনিই হবে। আমজাদ তাই আর জোর করেনি। প্রকৃত ভালোবাসার জন্য যে বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে ভেতরকার সৌন্দর্যটা অনেক বেশি প্রয়োজন, জীবন দরিয়ার মধ্যভাগে এসে এ কথা আর তাদের কারোরই অজানা নয়।

জানুয়ারী ২০,২০১৪
দশ দিন পর লন্ডনে ফেরে আমজাদ। অনলাইনে কথা বলার সময় হঠাত আসিফকে বলে,
– জানো, গ্রীসে গিয়ে অনেক মূল্যবান একটা জিনিস পেয়েছি।
– কী পেয়েছো?
– আমার অনেক আগেকার একটা ছবি। সেই ১৯৯৮ সালের দিকে তোলা। যখন আমি গ্রীসে থাকতাম।
– তুমি গ্রীসে থাকতা?
– হুম। দেখবে?
– আচ্ছা দেখাও।
– কী ব্যাপার? তুমি না বলেছিলে যে সামনা সামনি দেখবে আমাকে? (আমজাদ খোঁচা দেয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করে না) হা হা হা!
– জ্বি হ্যাঁ। সামনা সামনা সামনিই দেখবো। এখন যেটা দেখবো সেটা তোমার ১৬ বছর আগে তোলা। সেই চেহারার সাথে এখনকার অবশ্যই মিল থাকবে না, তাই না?
– বাপরে! তোমার সাথে কথায় পারা যাবে না।
– আর হ্যাঁ শোন। আমি কিন্তু তোমার প্রস্তাব এখনো গ্রহণ করিনি। তাই ছবি যদি দেখতে খারাপ হয় তাহলে কিন্তু বাদ।
– হায় হায়, তাহলে আমার কী হবে? কেন যে বলতে গেলাম ছবিটার কথা!
– হুম! বলে ফেলেছো, তাই এখন তো দেখাতেই হবে। পাঠাও।

বাধ্য ছেলের মত ছবিটা আপলোড করে আমজাদ। ছবি আসতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে মাত্র। ছবিটা দেখেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সে।

মার্চ ২০, ১৯৯৮
এস এস সি দিয়ে ঢাকায় চাচার বাসায় বেড়াতে আসে বকুল। হাতে অফুরন্ত সময়, কিন্তু সময় কাটানোর জন্য কেউ নেই পাশে। চাচার ছেলে মেয়ে সব ছোট ছোট। ঢাকায় বেড়াতে এসে অনেক যায়গায় ঘোরার পরিকল্পনা থাকলেও সঙ্গীর অভাবে এক রকম ঘরেই বন্দি থাকতে হয় তাকে। বাইরে যাওয়া বলতে চাচা-চাচির সাথে শুক্রবারে একদিনের জন্য চিড়িয়াখানা বা শিশুপার্ক যাওয়া। ব্যস ওই পর্যন্তই।
ভাগ্য ভালো যে বাসা থেকে অনেকগুলো গল্পের বই এনেছে, তা নাহলে দম বন্ধ হয়ে প্রায় মরার দশা হতো বকুলের।

চাচার শহুরে ভাড়া বাসার একটা ভালো দিক হলো তাদের ছাদটা। বিশাল ছাদে সারি সারি টবে সুন্দরভাবে ফুলগাছ লাগানো। ছাদের এক পাশে অনেক বড় একটা পানির ট্যাঙ্কি। ট্যাঙ্কির ঠিক নিচে ছায়ায় বসে গল্পের বইয়ে বুঁদ হয়ে থাকাটা এখন বকুলের নতুন অভ্যাস। সেদিনও “পথের পাঁচালী” তে বুঁদ হয়েছিল বকুল দুপুরের খাবারের পর। হঠাত “পথের পাঁচালী? আমার প্রিয় উপন্যাস!” কথাটা শুনে অবাক হয়ে বইটা নামালো মুখের ওপর থেকে।

– আপনি?
– আমি শাওন। দোতলায় বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছি। তুমি?
– আমি বকুল। আমিও আপনার মত বেড়াতে এসেছি। তিনতলার রফিক সাহেব আমার ছোট চাচা।
– এত অল্প বয়সেই “পথের পাঁচালী” হাতে নিয়েছো? বুঝতে পারছো তো?
– কেন বুঝবো না? বইয়ের প্রতি ঝোঁক আমার সেই ক্লাস সিক্স থেকে। শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ সবই পড়ি। এই প্রথম বিভূতিভূষণ ধরলাম, কই কঠিন তো লাগছে না।
– হুম! আসলে পড়ার অভ্যাস থাকলে হয়ে যায়।
– আপনাদের বাড়ি কোথায়?
– দিনাজপুর। তবে আমি বাইরে থাকি। বেড়াতে এসেছি মাস দুয়েকের জন্য।
এভাবেই পরিচয় পর্বটা শুরু হয় তাদের মাঝে। এরপর থেকে প্রায়ই আলসে দুপুরটা এক সাথে গল্প করে কাটাতে থাকে দু’জন। হয় সাহিত্য নিয়ে, না হয় শাওনের বিদেশের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে। এভাবে দুজনের মাঝে গড়ে ওঠে বন্ধুত্বপূর্ণ এক সম্পর্ক।

ঢাকায় থেকে এক মাসের ছুটিটা বরবাদ করতে মন সায় দিল না শাওনের। ঠিক করলো কক্সবাজার যাবে ঘুরতে। পরিচিত বন্ধুরা সবাই বিয়ে শাদি করে যার যার মত সেটলড। তাকে সময় দেবার মত অফুরন্ত সময় কারো হাতে নেই। তাই শাওন ঠিক করে বকুলকে সাথে নিয়ে যাবে, যদি সে যেতে চায়। একদিন জিজ্ঞেস করলো,
– বকুল, এভাবে ঢাকায় বসে থেকে তো দুজনেই বোর হচ্ছি।
– তাহলে কী করতে চান?
– চলো কোথাও থেকে ঘুরে আসি।
– কই যাবেন?
– কক্সবাজার।
– কক্সবাজার? সে তো অনেক দূর। চাচা অনুমতি দেবেন না।
– অনুমতির ব্যবস্থা করবো আমি। তুমি যাবে কিনা বলো।
– যেতে তো চাই, কিন্তু…
– ব্যাস, আর কোন কিন্তু নয়। আমি আজকেই দুলাভাইকে নিয়ে তোমার চাচার সাথে কথা বলতে যাবো।

এপ্রিল ২৩, ১৯৯৮
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে পাশাপাশি হাঁটছে শাওন আর বকুল। বকুলের নির্বাক স্তব্ধাবস্থা শাওনের বুকের কম্পন বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকটা সময় পার হবার পর শাওন নিজেই আবার মুখ খোলে,
– কিছু বলো!
– কী বলবো?
– দেখো আমার মনের ভেতরে যা এসেছে আমি তাই তোমাকে বলে দিলাম। এখন বাকিটা তোমার ব্যাপার।
– তাই কী কখনো সম্ভব?
– সম্ভব তো হচ্ছে। আমাদের দেশে যদিও এ ভালোবাসার এখনো কোন স্বীকৃতি নেই, তবে বাইরের দেশে কিন্তু আছে। তুমি যদি রাজি থাকো আমি তোমাকে বাইরে নিয়ে যাবো।

মে ১৫, ১৯৯৮
আজ শাওনের চলে যাবার দিন। গত কয়দিন ধরেই বকুলের প্রচন্ড মন খারাপ। চাচা চাচিও বুঝতে পারে দীর্ঘদিন একসাথে থাকায় শাওনের সাথে একটা বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বকুলের। তাই শাওনকে বিদায় দিতে আনিস সাহেবের পরিবারের সাথে বকুলকে এয়ারপোর্টে পাঠান রফিক সাহেব।
– আমি তোমাকে চিঠি লিখবো বকুল, একটা ফোন নাম্বার দিও, ফোন করবো মাঝেমধ্যে।
– আচ্ছা।
শাওন কথা রাখে। নিয়মিত চিঠি লেখে বকুলকে। বকুলও উত্তর দেয়। নিজেদের বাসায় টেলিফোন না থাকায় পাশের বাসার নাম্বারটা দেয় সে শাওনকে। সপ্তাহে শুক্রবার করে তাদের কথা হয়। বকুলের বাসার সবাই জানে শাওনের সাথে তার এই বন্ধুত্বের কথা। বকুলকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, কিভাবে তার চেয়ে বয়সে বড় একটা মানুষের সাথে তার এত খাতির? আর কেনই বা সে বকুলকে তার কাছে নিয়ে যেতে চায়? বকুল কোন উত্তর দিতে পারে না।

জুলাই ২০, ১৯৯৮
শাওনের ফোন আসে একদিন।
– তুমি কি আমার কাছে আসতে চাও কিনা বলো। (শাওনের কণ্ঠে প্রচন্ড অভিমান)
– আসতে তো চাই, কিন্তু কি করবো বলো? বাবা এত কম বয়সে কিছুতেই ছাড়বেন না আমাকে। আর তোমাকেও তো তারা ভালভাবে চেনেন না। কোন ভরসায় পাঠাবেন আমাকে?
– বুঝতে পেরেছি। তোমারই আসার ইচ্ছা নেই। থাকলে এতদিনে ঠিকই তোমার বাবাকে ম্যানেজ করে ফেলতে…
– শাওন বোঝার চেষ্টা করো!
– টুট টুট টুট…
ফোনটা কেটে দেয় শাওন। বকুলের আর বলা হয় না তার বাবার পোস্টিং হয়েছে রংপুরে। আগামীকালই তারা লালমনিরহাট ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দেয়া হয় না নতুন ঠিকানাটা।

একটা চাপা অভিমান কাজ করে বকুলের মাঝেও। সেও আর চিঠি দেয় না শাওনকে। কেন শাওন তার মুখের ওপর ফোনটা রেখে দিল? কেন বুঝতে চাইলো না যে তার পক্ষে গ্রীসে যাওয়াটা এখন সম্ভব নয়?

জানুয়ারী ২০, ২০১৪
বাস্তবে ফিরে আসে আসিফ ইকবাল বকুল। নিজের প্রথম ভালবাসার মানুষটাকে চিনতে একটুও সময় লাগে না তার। এ কী করে সম্ভব? তাহলে আমজাদই শাওন? তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে সে আমজাদ তথা শাওনের ১৬ বছর আগে সেই ১৯৯৮ সালে তোলা ছবির দিকে। মনে বাজতে থাকে লালনের সেই বিখ্যাত লাইনগুলো –
যখন ও রূপ স্মরণ হয়,
থাকে না লোক লজ্জার ভয়-
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই ll
প্রেম যে করে সে জানে…
ও প্রেম যে করে সে জানে…
আমার মনের মানুষেরও সনে ll
মিলন হবে কত দিনে
আমার মনের মানুষেরও সনে ll

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৩০শে জুলাই, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.