মায়াবন্দী

লেখকঃ তারাশঙ্কর

১.

বাতাসে বসন্তের ঘ্রাণ। সাইনা পর্বতের ঢালের তৃণভূমির ঘাসে এখনো শিশির জমে আছে। সূর্য ওঠেনি তখনো, আকাশ কেবল ফর্সা হতে শুরু করেছে। সাইনার মাথায় জমে থাকা বরফের পানি শীতঘুম শেষে গলতে শুরু করেছে, আর সেই পানিতে নিচের তৃণভূমি দিয়ে বয়ে যাওয়া মানালি নদীও তার আগের রুপে ফিরেছে। নদীটা ঢাল বেয়ে নেমে সোজা চলে গেছে খানিকটা, তারপর বাঁয়ে ঘুরে আরও কিছুটা যেয়ে মিশে গেছে আরেকটা নদীর সাথে, তারপর দুজনে জলকেলি করতে করতে দূরের ঘন বনটাকে ভেজাতে ভেজাতে নেমে গেছে আরো দক্ষিণে। দূরের বন আর সাইনার তৃণভূমিকে আলাদা করেছে এই পাথুরে পাহাড়ি কন্যা মানালি। বসন্তের শুরুতেই এখানে দল বেঁধে চলে আসে অনিন্দ্যসুন্দর নায়েলা হরিণরা। পুরুষগুলো তাদের বাঁকানো চোখা শিং আর ছাই রংয়ের চামড়ায় হালকা সোনালী দাগগুলো গর্বিত ভংগিতে দেখিয়ে মেয়েদের আকর্ষণ করতে চায়, আর অসাধারণ সোনালী বাদামী রঙয়ের মেয়েগুলো তা দেখে মুচকি মুচকি হাসে আর কচি সবুজ ঘাস খায়। নায়েলাদের নিয়মকানুন বেশ কঠোর, নিজেদের রুপ আর শক্তিমত্তা নিয়ে তারা গর্বিত আর দলপতির আদেশই আইন। দুর্বল বাচ্চাদের তারা বোঝা মনে করে, তাই তাদের জন্মের পরপরই মেরে ফেলা হয়। দলপতি ইংকা আর তার হরিণী মিম্মার শাসনে এই দলটা বেশ সুখেই আছে। কিন্তু আজকের এই সুন্দর ভোর তাদের জন্য একটা দু:সংবাদ নিয়ে অপেক্ষা করছিল।

২.

মিম্মার প্রসববেদনা শুরু হয়েছে। ও দল থেকে একটু আলাদা হয়ে ঘাসের জংগলে ঢুকে গেছে। একটু দূরেই ইংকা উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছে, সাথে দলের আরো কিছু উৎসাহী হরিণ। মাঝে মাঝেই মিম্মার গোংগানীর শব্দ ভেসে আসছে। এরপর বেশ কিছুক্ষণ সব চুপ, অধৈর্য্য হয়ে ইংকা এগিয়ে গেল। ঘাসের ওপর একটা কালো পুটুলি পড়ে আছে, আর মিম্মা তার জিভ দিয়ে বাচ্চাটার নাক-মুখ-চোখ পরিষ্কার করে দিচ্ছে। কালো রং দেখে ছেলে হয়েছে ভেবে ইংকা খুশির ডাক দিয়ে এগিয়ে গেল, কাছে যেতেই মিম্মা মুখ তুলে তাকাল তার দিকে, আর সেই দৃষ্টি দেখে থমকে গেল ইংকা। ধীরে ধীরে সামনে এগুলো সে, কাছে যেয়ে ভাল করে বাচ্চাটাকে দেখেই আঁতকে উঠল, এ যে মেয়ে বাচ্চা, আর কালো মেয়ে তাদের কাছে অমংগলের চিহ্ন! মাথা নিচু করে ফিরে গেল সে, দলের সবাইকে পর্বতের নিচে বাদাম গাছের ছায়ায় জড়ো হতে নির্দেশ দিল। মিম্মা বুঝে গেল কি হতে চলেছে, তার নাড়ীছেঁড়া ধনকে বাঁচতে দেয়া হবে না, তাদের সমাজে কালো হরিণীর কোন জায়গা নেই! বাচ্চাটা এর মধ্যেই উঠে দাঁড়িয়েছে, দুধ খাবার জন্য অস্থির সে, মিম্মা পরম মমতায় তার বাচ্চার পিঠে জিভ বুলাল, ‘মায়া, মা আমার!’ হুম, সেই মুহুর্তে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কি করতে হবে, এই বাচ্চা সে বাঁচিয়ে রাখবে, আর তার নাম হবে মায়া!

৩.

বিশাল বাদাম গাছটার নিচে সবাই জড়ো হলে ইংকা একটা পাথরের ওপর উঠে দাঁড়াল, তারপর সবাইকে এই ভয়াবহ দু:সংবাদটা দিল। একটা চাপা আর্তনাদ উঠল দলের মেয়েদের মাঝে। একটা শক্তিশালী পুরুষ হরিণ, যাকে লড়াইয়ে হারিয়ে ইংকা দলপতি হয়েছিল, সামনে এগিয়ে এসে বলল, নিজের মেয়ে বলে নতুন কোন নিয়ম চালুর চেষ্টা কোরো না, বাচ্চাটাকে আমাদের হাতে তুলে দাও! ইংকা সবার দিকে তাকাল, সবাই কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত ভাবল সে, তারপর নিজের মেয়ের প্রাণদন্ড ঘোষণা করল। হইহই করতে করতে সবাই ঘাসের জংগলের সেইদিকে ছুটল যেখানে মিম্মা সেই ‘অশুভ’ বাচ্চাটার জন্ম দিয়েছে। সেইসময় টলতে টলতে মিম্মা বেরিয়ে এল সেখান থেকে, সেই পুরুষ হরিণটা জানতে চাইল বাচ্চাটা কোথায়। ‘আমি ওকে মানালির জলে ভাসিয়ে দিয়েছি, এক ফোঁটা দুধও খেতে দেই নি।’ উত্তর দিল মিম্মা, ইংকার চোখে চোখ রেখে। ইংকা সেই তীব্র দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল, অন্যরাও হাফ ছেঁড়ে বেঁচে ঘাস খাওয়ায় মন দিল।

৪.

সন্ধ্যা নামতেই মিম্মা লুকিয়ে রওনা দিল সাইনার পূর্বদিকের পাথুরে জমির দিকে। ওদিকে ঘাসের আড়াল তেমন নেই, তবে মানালির তীর ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে দৃষ্টির আড়ালে কয়েকটা পাথুরে গুহা আছে। গুহার ভেতরে পানি, তার ওপারে কিছুটা শুকনো জমি। প্রচন্ড আতংক আর একবুক ভালবাসা নিয়ে ঘাসবনটা পার হতেই সে দৌড়াতে শুরু করল। হাঁপাতে হাঁপাতে গুহার ভেতর ঢুকতেই কচি গলার কান্নার শব্দ শুনতে পেল সে। ‘মায়া, সোনা আমার, সারাদিন না খাইয়ে রেখেছি তোকে! আমি তোর দুর্ভাগা মা, রাগ করিস না!’ কাঁদতে কাঁদতে মিম্মা মায়াকে দুধ খাওয়াতে লাগল। সাইনা পর্বতের যদি হৃদয় থাকত, সেই কান্নার শব্দে তা হয়ত এতক্ষণে টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়ত, মানালির জলে তৃণভূমি ভেসে যেত! কিন্তু কিছুই হয় না, আকাশের তারারা লক্ষ প্রদীপের মত জ্বলতে থাকে, আর তার নিচে এক অসহায় মা সন্তানকে অন্ধকারে একা ফেলে চোখের জলে ঘরে ফেরে!

৫.

মায়া বড় হতে লাগল। মিম্মা প্রতিদিন দু’বেলা এসে ওকে দুধ খাইয়ে যেত। একটু বড় হবার পর যখন মায়ার দাঁত উঠল আর ঘাস খাবার বয়স হল, তখন মিম্মা ওকে সন্ধ্যার পর ঘাসের বনে নিয়ে যেত। মেয়ে খেত, মা একটু দূরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিত। মিম্মা তাকে বাইরের জগতের গল্প শুনাত, ওদের দল আর তাদের উন্মুক্ত তৃণভুমির গল্প মায়াকে খুব টানত। কিন্তু তার বাইরে বেরুনো ছিল বারণ! সে অবশ্য খুব লক্ষী মেয়ে, মায়ের কথার অবাধ্য হত না কখনো। ১ বছর পার হয়ে গেল, মিম্মার পেটে আবার সন্তান এল। সে বুঝতে পারল, মায়াকে দেখাশোনা করা তার পক্ষে আর সম্ভব হবে না, প্রকৃতির হাতেই তাকে এবার ছাড়তে হবে। এক অলস দুপুরে মায়া জানল তার দুর্ভাগ্যের ইতিবৃত্ত। মায়ের কাছে মায়া প্রতিজ্ঞা করল, সে কখনো তৃণভূমির দিকে যাবে না, আর দিনের বেলা বের হবে না। চোখের জলে মা-মেয়ে বিদায় নিল। শুরু হল মায়ার একাকী জীবন। প্রতিদিন যখন সূর্য সাইনার ওপারে হারিয়ে যায়, মায়া তখন গুহা থেকে বেরিয়ে একটা উঁচু পাথরের ওপর উঠে দাঁড়ায়, আর যেদিক থেকে তার মা আসত সেদিকে তাকিয়ে থাকে, যদি মাকে একবার দেখা যায়! তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, একসময় ক্লান্ত হয়ে গুহায় ফিরে মেঝেতে শুয়ে পড়ে সে, দু’পায়ের মাঝে মাথাটা রেখে মায়ের কথা ভাবে, আর চোখ বেয়ে নেমে আসে কান্না!

৬.

মায়ার বয়স ২ বছর পার হয়ে গেছে, এখন সে কিশোরী। গত একটা বছরে তার জীবনে অনেক ওলটপালট ঘটে গেছে। মায়ের আশ্রয় হারিয়েছে সে, মাত্র ৩ বার মাকে কাছে পেয়েছে এর মধ্যে। একা একা চলতে শিখে গেছে, বাইরের পৃথিবীর প্রতি তার অদম্য আকর্ষণ, কিন্তু মাকে কথা দিয়েছে, তাই ইচ্ছেগুলোকে গলা টিপে মেরে ফেলে। ইদানিং মায়ার খুব একা লাগে, ইচ্ছে করে কারো সাথে গলা জড়াজড়ি করে চুপচাপ বসে থাকতে, আকাশে যখন থালার মত চাঁদ ওঠে, সেসময় কারো শুণ্যতা অনুভব করে সে। মনের সাথে সাথে শরীরের পরিবর্তন টের পায় সে, কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারে না অনুভূতিটাকে। একদিন ভোরবেলা গুহার সামনে শব্দ পায় মায়া, ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। নাহ, বিপদজনক কিছু মনে হচ্ছে না, কিছুক্ষণ পর কৌতুহলী মন বিদ্রোহ করে ওঠে, দুরুদুরু বুকে সামনের দিকে সন্তর্পণে এগোয় ও। দুটো সদ্য যুবক নায়লা হরিণ নতুন ঘাসের সন্ধানে এদিকে চলে এসেছে, নিয়ম ভাংগার উত্তেজনায় জোরে জোরে কথা বলছিল ওরা। মায়ার দম বন্ধ হয়ে আসে! এই প্রথম এত কাছ থেকে সে ছেলেদের দেখছে, ওদের পেশীবহুল শরীর, তীব্র পুরুষালি ঘ্রাণ; মায়া স্তব্ধ হয়ে গেল, ওর বুকে কেমন একটা কষ্টের চোরানদী, সেই মুহূর্তে ও বুঝে গেল তার কেন এমন লাগছিল এতদিন, বুঝে নিল তার অপূর্ণতা। দুটো হরিণের একটা আরেকটু সামনে এগিয়ে গেছে, পরের জন হঠাৎ কি মনে করে পেছন ফিরে তাকাল, মায়ার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল ওর! দুজনেই হকচকিয়ে গেল, বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটা সামলেই মায়া এক দৌড়ে চলে গেল গুহার ভেতরে, ছেলেটা কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর ওর সংগীকে পিছু নিতে বলে ফিরে চলল দলের কাছে।

৭.

পরদিন ছেলেটা ফিরে এল, একা! সারাদিন সে মায়ার ডেরার আশেপাশে কাটিয়ে দিল, কিন্তু ওই পর্যন্তই। এবং এভাবে আরো কয়েকদিন। সে এসে ঘুরে বেড়ায়, খায়, মাঝ দুপুরে ছায়ায় শুয়ে বিশ্রাম নেয়, গান গায়, তারপর সূর্য যখন সাইনার আড়ালে হারিয়ে যায় তখন ধীরে ধীরে সেও ঘাসের জংগল পেরিয়ে বাড়ির পথ ধরে। গুহার ভেতর থেকে মায়া সব বুঝতে পারে, কি করছে এখন ছেলেটা, গানের কথা সে ভুলেই গিয়েছিল, সেই কবে মা তাকে গান শোনাত! ধীরে ধীরে মায়ার ভয় কেটে গেল। নাহ, এ মনে হয় না তার কোন ক্ষতি করবে, করলে এতদিনে করত। মায়ার ইচ্ছে করছে বাইরে গিয়ে কথা বলতে, কিন্তু মায়ের নিষেধ আর ভয় তাকে বারবার আটকে দিচ্ছে। কৃষ্ণের বাঁশি যেমন রাধাকে অদৃশ্য বাঁধনে টেনে নিয়ে আসত, নাম না জানা এই যুবক যেন তার চেয়ে বেশি আকর্ষণ করতে লাগল মায়াকে! নাহ, যাই হোক, কাল কথা বলতেই হবে, ভাবল সে। কিন্তু পরদিন সে এল না। মায়া সারা সকাল অপেক্ষা করল, সারা দুপুর, কিন্তু এল না। পরদিনও এল না সে। সন্ধ্যে হলে বহুদিন পর মায়া বড় পাথরটার ওপর উঠে দাঁড়াল, মাকে খোঁজার জন্য যেখানে ও আসত, তারপর অপলক চেয়ে রইল সামনের কুয়াশা ঢাকা বাদামী প্রান্তরে! জোর বাতাস উঠেছে আজকে, বাতাসে বৃষ্টির সুবাস, কিন্তু সে বাতাস মায়ার জন্য আজ আর কোন খুশি নিয়ে এল না।

৮.

রাত বেশ গভীর হয়েছে। ফেরার জন্য পেছনে ঘুরতেই মায়া চমকে উঠল, একটু দূরেই সেই ছেলেটা বসে আছে। ‘গুহার ভেতরে গিয়েছিলাম তোমাকে খুঁজতে, না পেয়ে এদিকে আসলাম’, ছেলেটাই প্রথম কথা বলল, ‘আমার নাম সেফি। তোমার সাথে কথা বলতে পারি?’
মায়া কি বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না, মা ছাড়া আর কোনদিন সে একটা কথাও বলে নি কারো সাথে।
‘মায়া’, কথাটা বলেই সে বুঝতে পারল তার গলা কাঁপছে, ‘আমার নাম মায়া’।
‘আমি পাহাড়ের ওই ঢালে থাকি। আমার বাবা ওখানকার নায়লাদের দলপতি!’
ভীষণ চমকে উঠল মায়া। দলপতির ছেলে? তার বাবা তো দলপতি ছিল। তাহলে কি এই ছেলে তার ভাই?? নাহ, মায়া আর কিছু ভাবতে পারে না।
মায়ার হঠাৎ পরিবর্তন সেফির চোখ এড়ালো না। কয়েক পা সামনে এগিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কিছু হয়েছে? তুমি কি আমার বাবাকে চেনো?’
নাহ, মায়া তার বাবাকে চেনে না। কিন্তু… কিন্তু মায়ার কোন বড়ভাইয়ের কথা তো মা তাকে বলে নি! তবে? এবার আরো ভয়ংকর একটা সম্ভাবনা ওর মনে উঁকি দিল।
‘তুমি মিম্মা কে চেনো?’ ভয়ে ভয়ে সেফি কে প্রশ্ন করল ও।
‘হুম চিনি, আমাদের আগের দলপতি ইংকার বাচ্চার মা। কিন্তু তুমি তার নাম জানো কি করে?’ সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল ও।
‘মিম্মা কোথায়? ওর ছেলেটা কোথায়? কি হয়েছিল ওদের?’ আর্তনাদ করে উঠল মায়া।
‘ওরা ভাল আছে, দলের সাথেই আছে। গত বছরের শেষে আমার বাবা আগের দলপতিকে লড়াইয়ে হারিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তুমি কাঁদছ কেন?’
মায়া কোন কথা বলতে পারছিল না। দলের নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য ওর বাবা নিজের মেয়েকে পর্যন্ত খুন করতে চেয়েছিল, বাবার আদর সে কোনদিন পেল না। কি লাভ হল তাতে? যে ক্ষমতার জন্য এত কিছু, সেই ক্ষমতাও তো তার থাকল না!
‘মা, মা’! অনেকদিন পর কাঁদতে কাঁদতে জোরে ডেকে উঠল সে!

৯.

আকাশে বিশাল একটা চাঁদ উঠেছে। মানালির পানিতে তার ছায়া জোর বাতাসে মাঝে মাঝে ভেঙ্গে যাচ্ছে। গুহার একটু সামনেই পাশাপাশি ওরা দুজন বসে। সেফি ততক্ষণে জেনে গেছে মায়ার সব জমানো কথা আর লুকোনো কান্নার গল্প। এই মুহূর্তে দুজনেই কিছুটা বাকরুদ্ধ।
সেফিই প্রথম নীরবতা ভাঙলো। ”তোমার কথা আমরা ছোটবেলায় শুনেছিলাম’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে লাগল ও, ‘অত কিছু বুঝতাম না তখন, কিন্তু মানালিতে ভাসিয়ে দেয়ার কথা শুনে কষ্ট পেয়েছিলাম। অকারণ কিছু নিয়ম কানুন আমাদের অযথা কষ্টের কারণ হয়, তারপরেও কেন সেসব টিকে আছে এটা ভেবে খুব অবাক লাগে। তোমাকে একটা প্রশ্ন করব?’ মায়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল সে।
মায়া কিছু না বলে তাকিয়ে রইল। ‘আমাকে সেদিন দেখার পর তুমি ভয় পাও নি? পালিয়ে গেলে না কেন? আমি তো সবাইকে বলে দিতে পারতাম।’
‘আমি জানতাম তুমি এমন কিছু করবে না। সেদিন প্রথম যখন তোমাকে দেখলাম, আমি চমকে গিয়েছিলাম সত্যি, কিন্তু সেভাবে ভয় পাইনি। আমি জানতাম একদিন আমাকে সবার মুখোমুখি হতেই হবে। এই একলা জীবন ভীষণ অসহ্য! আমি মৃত্যুর বিনিময়ে হলেও একদিনের জন্য অন্তত স্বাধীনতা চাই, দলের সবার সাথে দৌড়াতে চাই, নিজের একটা পরিবার চাই। যে অপরাধের জন্য আমি দায়ী না, তার জন্য আমি এভাবে ভুগতে চাই না। তাই আমি থেকে গিয়েছিলাম, তুমি যদি দলের সবাইকে নিয়েও আসতে তারপরেও আমি কোথাও যেতাম না!’
সেফি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল মায়ার দিকে। এমন উত্তর সে ঠিক আশা করে নি। নিজেকে যেন সে দেখতে পেল মায়ার মধ্যে, সমাজের নিয়ম যাকে সারাক্ষণ শেকল পরাতে ব্যস্ত, অনিয়ম গুলো প্রকট হয়ে চোখে লাগে আর তা বদলাবার অক্ষমতা ক্রোধ হয়ে নিজেকে পোড়ায়, নিয়ম ভাঙ্গার যে স্বপ্ন সে দেখে সেখানে আরেকজন সহযাত্রী পেল সে।
‘সে বুঝলাম না হয়। কিন্তু তারপর কয়েকদিন আমি আসার পরেও তো বের হও নি, সামনে আসো নি। সেটা কেন?’
মায়া চট করে কিছু বলতে পারল না। কি করে এই যুবককে বোঝাবে সে কেমন লেগেছে তার ওই কয়টা দিন, কেমন করে সে বলবে বারবার তার কাছে যেয়ে কপালে কপাল ঘষতে ইচ্ছে করছিল তার! লজ্জা আর জড়তার যে নতুন উপলব্ধি তার হয়েছে, সে কথা মুখ ফুটে ব্যাখ্যা করতেও কী ভীষণ লজ্জা হচ্ছে তার, এই ছেলে সেটা কোনদিন বুঝবে না!
সেফি তাকিয়ে তাকিয়ে মায়ার লজ্জানত ভঙ্গী দেখছিল। বুকে কিছুটা সাহস পেল সে।
‘মায়া, দলে ফিরবে? আমার হয়ে, আমার সাথে?’।

১০.

অদ্ভুত, অদ্ভুত এই অনুভূতি! মায়ার সারা শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে, জোরে জোরে নি:শ্বাস ফেলতে শুরু করল ও, হৃদপিন্ড এত জোরে লাফাচ্ছে যেন গলা দিয়ে উঠে আসবে বাইরে। মায়ার চোখ প্রথমে লাল হয়ে গেল, গলার রগগুলো ফুলে উঠেছে, চোখ পানিতে ভরে উঠেছে কিন্তু সে কাঁদতে চাচ্ছে না। অবশেষে সেফি তার গলা বাড়িয়ে মায়ার ঘাড়ের উপর স্পর্শ করল, মায়ার প্রতিরোধও ভেঙ্গে পড়ল। যে নি:সঙ্গতা জীবনের প্রথম ক্ষণ থেকে তার সঙ্গী ছিল, তা থেকে আজ তার মুক্তি মিলেছে। বুকের ভেতরে জমানো হাজার না বলা কথা শোনার জন্য আজ একজন শ্রোতা আছে। তার অস্তিত্বকে স্বীকার করবার, জীবনকে নতুন অর্থ দেবার, একটা পরিবার-সন্তানের জন্য সদ্য ফোটা যে আবেগের স্রোত জমা হয়েছে, তাকে বইয়ে দেবার একটা নদীর খোঁজ সে পেয়েছে। আজকে কাঁদতে কোন বাঁধা নেই, মায়া আজ কাঁদবে। শুধু পাশের জন তার পাশে এভাবেই জড়িয়ে থাক, সব সময়!

১১.

পরদিন সকালের আলো ফুটলে মায়া আর সেফি দলের উদ্দেশ্যে রওনা হল। রওনা হবার মুখে মায়া সেফি কে জিজ্ঞেস করল, ‘যদি তোমার বাবা মেনে না নেন, কি করবে তুমি? আমাকে কি আবার এই গুহায় ফিরে আসতে হবে?’
‘তুমি জাননা আমার বাবা আমাকে কতটা ভালবাসে। আমার জন্য যদি তাকে দলের ক্ষমতাও ছাড়তে হয়, উনি ছেড়ে দেবেন। তুমি চিন্তা করবে না। আর তোমাকে যদি এখানে আবার ফিরতেই হয়, একা ফিরতে হবে না!’
কথাগুলো শুনে খুশি হলেও অস্বস্তি গেল না মায়ার। ঘাসের জংগলে ঢোকার আগে একবার গুহার দিকে ফিরে তাকাল, জীবনের কঠিন সময়ে যে তাকে আশ্রয় দিয়েছে, লুকিয়ে রেখেছে, যেখানকার জীবন সে বারবার ভুলে যেতে চায়, তবু আজ এই মুহূর্তে তার এমন লাগছে কেন? সেফি’র ডাকে সম্বিত ফিরলে ওরা চলতে শুরু করল। ঘাসের জংগল পেরিয়ে উন্মুক্ত তৃণভূমি এই প্রথম দেখছে মায়া। দূরে যেখানে সাইনার অন্য ঢালের নিচের দিকে বেশ কিছু বড় গাছ আছে, সেখানে দলের সবাইকে বিশ্রাম নিতে দেখা যাচ্ছে। সেফি মায়াকে একটা বড় পাথরের পাশে দাঁড়াতে বলে দলের দিকে এগিয়ে গেল। মায়ার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিল মিম্মাকে। হঠাৎ বেশ শোরগোল শোনা গেল। সেফিকে দেখা যাচ্ছে একজনের সাথে কথা বলছে, সম্ভবত সেই দলপতি। তাকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছে, সবাই তাদের ঘিরে ধরে কথা শুনছে। এরপর সবাই একসাথেই যেখানে মায়া দাঁড়িয়ে আছে, সেদিকে তাকাল। আরেকটা হইচই শুরু হল, এর মধ্যেই একজনকে মায়া দৌড়ে আসতে দেখল, কাছাকাছি হতেই বুঝল এটা মিম্মা। মায়া আর থাকতে পারল না, দৌড়ে গেল মায়ের দিকে। কতদিন পর মা-মেয়ের মিলন, কিন্তু কেউ কোন কথা বলতে পারছিল না, তাদের হয়ে চোখ কথা বলে দিচ্ছিল। ততক্ষণে পুরো দল এসে গেছে সেখানে। দলপতি টংবা এগিয়ে এল প্রথমে, ভাল করে দেখে নিল মায়াকে। তারপর মিম্মার দিকে ফিরে বলল, ‘তুমি আমাদের সবাইকে মিথ্যে বলেছিলে!’
‘অদ্ভুত বিশ্বাসের চাইতে নিজের মেয়ের জীবন আমার কাছে বেশি জরুরি!’
‘তাই বলে তুমি পুরো দলের সাথে মিথ্যে বলবে?’
‘তখন যদি তোমাদের ৫ জনেরও সাহস থাকত সেই নিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার, আমাকে মিথ্যে বলতে হত না!’
‘চুপ কর! প্রাচীনকালের গুরুজনরা এসব নিয়ম এমনি এমনি করেনি। নিশ্চয় কোন ভাল আছে এর মধ্যে।’
‘কি ভাল বলতে পারো টংবা? কি ভাল এক মা থেকে তার মেয়েকে আলাদা করায়? কি ভাল একটা শিশুকে সারা দুনিয়া থেকে, তার পরিবার আর দল থেকে আলাদা করে রাখায়? কালো মেয়ে, এই তার অপরাধ? সে অন্যদের থেকে আলাদা, এটাই তার অপরাধ? তাহলে তো টংবা তুমিও অপরাধী, অন্যদের থেকে তোমার শক্তি বেশি, তুমিও আলাদা, তাহলে তুমি কেন এখানে নায়ক, আর আমার মেয়ে অপরাধী?’ টানা কথা বলে মিম্মা কিছুটা হাঁপিয়ে গেল।
‘অবুঝ মেয়েমানুষ, কথা বলো না। তুমি দলের নিয়ম ভেঙ্গেছ, তোমাকে শাস্তি পেতে হবে। আগে এই অপয়াকে দূর করি।’
‘বাবা, একটু বোঝার চেষ্টা কর! অপয়া বলে কিছু নেই, আর আমি মায়াকে ভালবাসি। তুমি ওকে এভাবে বলতে পারো না!’ সেফি সামনে এগিয়ে এসে বলল।
‘চুপ!’ গর্জে উঠল টংবা, ‘কি ভেবেছিস নিজেকে, বেশি আদর পেয়ে মাথায় উঠে গেছিস, এখনো ভালমতন শিং গজায় নি, আর নিজেকে লায়েক ভেবেছিস, না? এই, ওকে নিয়ে যেয়ে আটকে রাখ, প্রয়োজনে মারতে দ্বিধা করবি না!’
কয়েকজন সেফি কে ঘিরে ফেল, তাদের সবার শিং লম্বা আর ধারালো। সে কিছুটা ধাক্কাধাক্কি করবার চেষ্টা করতেই একজন তার শিং দিয়ে জোরে গুঁতা দিল পায়ে, সাথে সাথে রক্ত বেরোতে শুরু করল। মায়া চিৎকার করে উঠল, সেফিকে বাধা দিতে নিষেধ করল। অন্যরা এবার ঠেলতে ঠেলতে তাকে দূরে নিয়ে গেল।
টংবা এবার মায়ার দিকে ফিরল। ‘তুমি আসলেই অপয়া, আমার পরিবারের জন্য অকল্যাণ নিয়ে এসেছ, তোমাকে না তাড়ালে এমন আরো ঘটবে।’
হঠাৎই ইংকা এগিয়ে এল, ‘আমার মেয়ের গায়ে হাত দেয়ার আগে আমাকে আটকাতে হবে।’ এ কথা বলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল টংবার উপর। তখন টংবার অন্য অনুগামীরাও যোগ দিলে মিম্মাও এগিয়ে গেল, আর এক ধুন্ধুমার কান্ড শুরু হল সেখানে। একসময় সব থেমে গেলে দেখা গেল মিম্মা আর ইংকা দুজনেই পড়ে আছে মাটিতে। ইংকা নড়ছে না একটুও, মিম্মা একবার শুধু জোরে বলে উঠল, ‘মায়া, ফিরে যা!’ মায়া কিছুক্ষণ মিম্মার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর দৌড়াতে শুরু করল পুরোনো আশ্রয়ের দিকে।

১২.

কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। মায়া আবার একাকী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। সেদিন ওখান থেকে পালিয়ে এসে সে প্রথমে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। জায়গাটা আর নিরাপদ না বুঝে সরে পড়ে ওখান থেকে। সেটা যে অনেক বুদ্ধিমানের মত কাজ ছিল তা বোঝা গেল একটু পরেই, তাকে ওরা খুঁজতে এসেছিল। এরপর আরো কয়েকবার এসেছিল, প্রতিবারই মায়া বেঁচে গিয়েছে। এখন মানালির ধারে আরেকটা আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে সে। লুকিয়ে লুকিয়ে খবর নিয়ে জেনেছে, সেফি কে টংবা অনেক দিন আটকে রেখেছিল, ছাড়া পেয়ে সে এখন নতুন সংগী বেছে নিয়েছে। ইংকা সেদিনই মারা গিয়েছিল, মিম্মা আহত হলেও বেঁচে ছিল, কিন্তু সবকিছু হারানোর শোক সে বেশিদিন সহ্য করতে পারে নি। মায়া এখন আর তার দলের জন্য কোন টান অনুভব করে না, সেফি’র জন্যও তার কষ্ট হয় না। মাঝে মাঝে শুধু বাবা-মা’র জন্য কান্না পায় তার! বাবা তাকে স্বীকার করল শেষ পর্যন্ত, কিন্তু বড্ড দেরিতে। এখন সে ভালই আছে, শুধু মাঝে মাঝে যখন সন্তানসহ কোন মা’কে দেখে, তার মন ভার হয়ে যায়। একটা সন্তান, পরিবারের খুব আশা ছিল তার। কিন্তু ‘মা’ ডাক শোনা যে তার ভাগ্যে কোনদিন হবে না, এটা বুঝতে তার বাকি ছিল না। কিন্তু সবাই যেভাবে বোঝে, বিধাতা সেভাবে কাজ করেন না। তাই এক বর্ষার রাত মায়ার জীবনে নিয়ে এল অদ্ভুত আরেক পরিবর্তন!

১৩.

সেদিন ছিল ভীষণ বর্ষার রাত। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে মানালিতে ঢল নেমেছে। নদী ছাপিয়ে ঘাসের জংগলেও পানি উপচে পড়েছে। রাতে আর গুহায় থাকা যাবে না ভেবে মায়া সাইনার উপরের দিকে আশ্রয় খুঁজতে বের হল। একটা ঝোপ পার হবার সময় অদ্ভুত একটা শব্দ কানে এল তার, কেমন কান্নার মতন। খুঁজতে খুঁজতে একটা বড় পাথরের খাঁজে সমাধান খুঁজে পেল। একটা বাচ্চা, চিতাবাঘের ছানা। এত্তটুকুন, হলদে কালো লোমে শরীর ঢাকা, গায়ের কালো ফোঁটা গুলো এখনো অতটা স্পষ্ট নয়। বৃষ্টিতে ভিজে বাচ্চাটা চুপচুপে, ঠান্ডায় কাঁপছে। মায়া ভয় পেয়ে গেল, নিশ্চয় মা চিতাটা আশেপাশে কোথাও আছে। কিন্তু ওরা তো থাকে নদীর ওপাশটায়, এদিকে কেন? আর বাচ্চাটাকেই বা এমন বৃষ্টিতে ফেলে যাবে কেন? আবার বাচ্চাটাকে এভাবে দেখে তার ভীষন মায়া লাগছে, হোক না শত্রুর সন্তান, শিশু তো শিশুই! মায়া অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। একটু দূরের একটা ঝোপে লুকিয়ে সে ঠায় বসে থাকল বৃষ্টির মাঝে, অনেকটা সময় পার হয়ে গেল, মা চিতার দেখা নেই। এদিকে বাচ্চা টার কান্নার আওয়াজ কমে এসেছে, কিছুক্ষণ কোন শব্দ না পেয়ে মায়া কিছুটা ভয় পেল। নাহ, এভাবে চোখের সামনে একটা বাচ্চার কষ্ট সে দেখতে পারবে না, যা হয় হবে! আর কিছু চিন্তা না করে মায়া ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল।

১৪.

ভয়ে ভয়ে পাথরটার কাছে গেল মায়া। বাচ্চাটা চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে, কোন শব্দই করছে না। তাড়াতাড়ি কাছে গেল ও, নাহ, শ্বাস নিচ্ছে, বেঁচে আছে এখনো। একবার দেখেছিল ও, বাঘেরা কিভাবে বাচ্চা মুখে করে নেয়। সেভাবে কয়েকবারের চেষ্টায় বাচ্চাটাকে মুখে করে ও নিয়ে গেল একটা শুকনো জায়গায়। জিভ দিয়ে চেটে বাচ্চার শরীরের পানি মুছে দিল, তারপর নিজে ভাঁজ হয়ে শুয়ে পেটের কাছে রেখে শরীরের তাপে বাচ্চাটাকে গরম করতে লাগল। ভীষণ অস্থির লাগছে ওর। এরকম একটা দৃশ্য কতদিন কল্পনা করেছে সে নিজের জন্য, আজ বিধাতা তার সে ইচ্ছা পূরণ করেছেন। কিন্তু এভাবে কেন? সে কি পারবে এই সময়কে ধরে রাখতে? আর সে তো শুধু একরাত বা একদিনের জন্য এমন চায় না। কি হবে তাহলে এরপর? ভাবতে ভাবতে সে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছিল না। এর মধ্যে বাচ্চাটা নড়ে উঠেছে কয়েকবার, এখন মাঝে মাঝে শব্দও করছে। যাক, একটা চিন্তা গেল মায়ার, বাচ্চাটা না বাঁচলে সে খুব কষ্ট পেত। কিন্তু চিতা মা’র অভাব সে পূরণ করবে কিভাবে? খাওয়াবে কি বাচ্চাটাকে? বাচ্চাটা ততক্ষণে আবার কান্না শুরু করেছে। মায়া বুঝতে পারছে না তার কি করা উচিৎ। ওর কি ক্ষুধা লেগেছে, নাকি ঠান্ডা? ততক্ষণে বাচ্চাটা নিজে মায়ার পেটের মধ্যে মুখ গুঁজে কিছু খুঁজতে শুরু করেছে। এবার মায়া বুঝল ব্যাপারটা, আর সাথে সাথেই দমে গেল। এই বাচ্চা দুধ ছাড়া আর কিছু এখনো খায় না, কিন্তু ও কিভাবে বাচ্চাকে দুধ খাওয়াবে! বুঝে নিল মায়া, বিধাতা হয়ত আরো একবার তার সাথে কৌতুক করলেন। নাহ, মায়া আর কাউকে মায়ার বাঁধনে বন্দী করতে চায় না। সকালের আলো ফুটলেই সে এই বাচ্চার মা কে খুঁজে বের করবে, মায়ের সন্তান ফিরে পাক তার মা কে।

১৫.

সকাল হল। বাচ্চাটা তখন মায়ার পেটের মধ্যে মুখ গুঁজে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। সারারাত ক্ষুধায় কেঁদেছে বাচ্চাটা, মায়া ছটফট করেছে কিছু না করতে পেরে। দূর থেকে গম্ভীর একটা শব্দ শুনে মায়া বাইরে বেরিয়ে এল। তখনো বৃষ্টি হচ্ছে। মায়া দেখল নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে একটা চিতা ডাকছে এদিকে মুখ করে। ডাকটার মধ্যে কেমন একটা কান্না আছে। বুঝতে বাকি রইল না মা তার বাচ্চাকে খুঁজছে। বাচ্চাটা সম্ভবত কোনভাবে পানিতে পড়ে গিয়েছিল, তারপর যে কোনভাবেই হোক ভাসতে ভাসতে এপারে চলে এসেছে। চিতারা গাছে উঠতে পারদর্শী, কিন্তু সাঁতার তারা খুব একটা পারে না। আর মানালির এই ফুঁসে ওঠা অবস্থাতে তা তো আরো অসম্ভব! মায়া সিদ্ধান্ত নিল বাচ্চাটাকে ও ফিরিয়ে দেবে, যেভাবেই হোক। কিন্তু ও কোনদিন মানালি পাড়ি দেয় নি, এমনকি গরমকালেও! সাথে অতিরিক্ত হিসেবে বাচ্চাটা। কিন্তু ওকে পারতেই হবে। আর কোন মাকে সে সন্তানহারা দেখতে চায় না, চায় না কোন সন্তান তার পরিবার ছাড়া বড় হোক। এ কাজে ঝুঁকি আছে, কিন্তু তার জীবন তো কারো জন্য কোন অর্থ বহন করে না, অন্তত কোন কাজে লাগুক সে! বাচ্চাটার পেটের নিচ দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে দিল সে, তারপর নিয়ে এল ঘাড়ের কাছে। তারপর একপা একপা করে নেমে পড়ল পানিতে। ততক্ষণে মা চিতা বুঝে গেছে কি ঘটতে চলেছে। প্রচন্ড উদ্বেগ নিয়ে সে তাকিয়ে থাকল এদিকে। নদীতে নেমেই মায়া বুঝতে পারল স্রোতের শক্তি। পায়ের নিচে পাথরের কারণে ঠিকভাবে দাঁড়াতেও পারছে না। স্রোত ঠেলে একটু এগুতেই মায়া হাঁপিয়ে উঠল, কিন্তু এখন আর ফেরা যাবে না। ধীরে ধীরে মায়ার নাক পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেল, ও এখন একদম মাঝনদীতে। মায়ার আর একটুও শক্তি নেই, ওর এখন আর সাঁতরাতে ইচ্ছে করছে না, শুধু বাচ্চাটার জন্য ও চলতেই থাকল। অবশেষে পানি কিছুটা কমতে শুরু করল, ‘আর একটু মায়া, আর একটু’, নিজেকেই বলতে লাগল সে। এখনও বেশ কিছুটা পথ বাকি, মায়া আর পারছে না, ওর চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, তীব্র স্রোতের সাথে লড়াই করে ওর সব শক্তি নি:শেষ। একবার একটু চোখ খুলে সে শুধু দেখল চিতা মা বেপরোয়া হয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, আরেকবার দেখল বাচ্চাটাকে মাটিতে রেখে নদীর তীর ধরে গর্জন করতে করতে চিতাটা দৌড়াচ্ছে। আহ, শান্তি! বাচ্চাটা অবশেষে মা’র কাছে পৌঁছেছে। নিজের মার মুখটা মনে পড়ল মায়ার। অবশেষে সে তার জীবনকে অর্থবহ করতে পেরেছে, পালিয়ে বেড়ানো অসহায় একটা হরিনী থেকে আজ সে কারো কাছে আজ বীরে পরিণত। দুটো জীবনকে সে হাসি ফিরিয়ে দিতে পেরেছে, এক জীবনে এটাই বা ক’জন পারে!

১৬.

মায়ার শরীর সেদিন মানালির জলে ভেসে যায়। মা চিতাটা চেষ্টা করেছিল ওকে বাঁচাতে, কিন্তু প্রচন্ড স্রোতে তা আর হয়ে ওঠেনি। নিজের জীবনের বিনিময়ে সে সেদিন দুটো জীবনকে রক্ষা করেছিল। জন্মক্ষণে তার জীবন বাঁচাবার জন্য মা বলেছিল তাকে মানালিতে ভাসিয়ে দেবার কথা, তা সেদিন শেষ পর্যন্ত সত্যি হল। সারাজীবন নিষ্ঠুর নিয়মের শিকার হয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। বাবা তাকে স্বীকার করে নি। মাকে সে কাছে পায়নি। ভাইকে সে কোনদিন দেখেনি। ভালবাসার সংগীকে হারিয়েছে। কেউ তাকে কোনদিন সম্মান দেয় নি। এতকিছুর পরেও সে সবাইকে বারবার ভালবেসেছে। নিজের স্বপ্নকে ভালবেসেছে। মায়া তার নাম, সবার জন্য অনন্ত মমতা নিয়ে বেঁচে থাকার মানে খুঁজে বেড়িয়েছে। ছোট্ট সেই চিতাছানার মায়ায় পড়ে তার জন্য জীবন দিয়েছে। মায়া তার নাম, সবাইকে মায়ায় বাঁধতে চেয়েও পারেনি, হয়ে গেছে অন্যের মায়ায় বন্দী, মায়া-বন্দী!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.