মায়া

লেখকঃ শাহরিয়ার সুমন

ভূমিকা: নাফিস ও আসিফকে অনেকেই হয়তো কিছুটা চেনে। তারা দুজন দুজনের প্রাণের বন্ধু। ইতিপূর্বে এই দুই বন্ধুকে নিয়ে বাংলা গে গল্প পেইজে “অসংজ্ঞায়িত ভালোবাসা” নামে একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছে। অনেক পাঠকই হয়তো গল্পটি পড়েছে, এই দুই বন্ধুর বন্ধুত্ব, ঝগড়া, মান-অভিমান আর সংজ্ঞাহীন ভালোবাসা নিয়ে নতুন গল্প ‘মায়া’


আজ অনেকদিন পর শেষ বিকেলে আসিফ নাফিসকে নিয়ে পাহাড়ে ঘুরতে এসেছে। জায়গাটা তাদের বাসা থেকে কাছেই। আসিফ আগে প্রায় এখানে ঘুরতে আসতো, জায়গাটা কিছুটা নির্জন, তবে মারাত্মক সুন্দর। ফিরোজ শাহ কলোনীর ভেতরে ফয়েজ লেকের এই পাহাড়গুলোতে আসলে আসিফের ভীষণ ভালো লাগে। চারিদিকে সবুজের প্রাচুর্য, মাথার উপরে দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ, মনটাই ভাল হয়ে যায়। তারা দুজন বসে আছে একটা পাহাড়ের চূঁড়ায়, চারিদিক নিস্তব্ধ, কোথাও কোনো কোলাহল নেই, জায়গাটা লোকালয় থেকে কিছুটা দূরে, স্থানীয় মানুষজন এদিকে তেমন একটা আসে না।

– এই আসিফ, কি ব্যাপার, চুপ করে আছিস কেন?
-তো কি করব? আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ, কি অদ্ভুত লাল! আর শুভ্র মেঘগুলো দুরন্ত কিশোরের মত ছুটে বেড়াচ্ছে অবারিত নীল আকাশে। কি সাংঘাতিক সুন্দর, তাই না?
– ঘোড়ার ডিমের সুন্দর, আমার খুব ক্ষিধা লেগেছে, চল নীচে নামি।
– তোর ভাল না লাগলে এসেছিস কেন? তোকে আসতে বলছে কে?
– তুই আসলি বলেই তো আমাকে আসতে হল।
– আমি কি তোকে জোড় করেছিলাম এখানে আসার জন্য?
– জোড় করিসনি কিন্তু তোকে এখানে একা একা কিভাবে আসতে দেই বল?
– কেন, তোর কি ধারণা আমি এখানে একা আসতে পারতাম না?
– পারতিস, কিন্তু একা আসলে যদি হারিয়ে যাস?
-হ্যাঁ, আমি তো কচি খোকা!
নাফিস হাসতে হাসতে বললো, হুম সেটাই। আর নির্জন পাহাড়ি এলাকা, তোকে একা পেয়ে কেউ যদি উঠিয়ে নিয়ে যায়। আমার দশটা না, পাচটা না, একটাই মাত্র বন্ধু।
নাফিসের কথা শুনে আসিফও হাসতে লাগলো, আমাকে উঠিয়ে নিয়ে কি করবে? রেপ করবে?
– করতেও পারে, দেখতে শুনতে তো তুই খারাপ না, নাদুস নুদুস আছিস।
– হ্যাঁ, এই দেশের বখাটে ছেলেরা সব তোর মত সমকামী তো!
-ফাজলামি করিস না, সন্ধ্যার পর জায়গাটা সত্যি খুব একটা ভালো না, একা পেলে অনেক সময় মোবাইল, মানিব্যাগ এইসব নিয়ে যায়।
-বুঝলাম, তারমানে তুই আমার বডিগার্ড? নিজেকে সম্মানিত বোধ করছি।
– এইসব ফালতু কথা রাখ, তুই আমাকে কি যেন বলবি বলেছিলি?
– এখন বলতে ইচ্ছা করছে না, পরে বলব।
– পরে না, এখনই বল।
-আমরা এই মাসে বাসা ছেড়ে দিচ্ছি।
– নতুন বাসা ঠিক করছস?
– না, ভাইয়া ভাবীকে নিয়ে আলাদা বাসায় থাকবে। বাবা মা শিমুকে নিয়ে গ্রামে চলে যাবে। তুই তো জানস, বাবা রিটায়ার্ড করছে, এখন শহরে বাসা নিয়ে থাকা বাবার পক্ষে সম্ভব না।
– কিন্তু শিমুর পড়াশোনা?
– ওকে গ্রামের কলেজে ভর্তি করে দিবে।
– কিন্তু তুই কোথায় থাকবি এখন?
– দেখি, আপাতত কোনো মেসে থাকতে হবে আর কি।
– তুই মেসে থাকবি! খাওয়া দাওয়ার অনেক কষ্ট হবে তোর।
– একটু কষ্ট তো করতেই হবে, তাই না?
– তোর ভাইয়ের সাথে না হয় কিছুদিন থাক, তাঁরপর দেখি কি ব্যাবস্থা করা যায়।
– ভাইয়া অবশ্য বলছিল ওর বাসায় থাকার জন্য, আমি মানা করছি। আমি ওর সাথে থাকব না।
-এক কাজ কর, তুই বরং আমার সাথে থাক।
– কি যে বলিস না, পাগলের মত।
– কেন, সমস্যা কোথায়? আমার বাসায় তো আম্মু ছাড়া অন্য কেউ নেই।
– বাদ দে নাফিস, তোকে এত চিন্তা করতে হবে না। আমার ব্যাবস্থা আমি নিজে করে নিব।
নাফিস আর আসিফকে কিছু বললো না, সে জানে বলেও কোনো লাভ নেই। আসিফ যে ঘাড়ত্যাড়া, নিজে যেটা বলবে সেটাই করবে।

২.
নাফিসের বাবা একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, বছরে বেশিরভাগ সময় তিনি জাহাজে থাকেন। মা একজন স্কুল শিক্ষিকা। নাফিস তার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। তার বড় একজন বোন আছে, যার কিছুদিন আগে বিয়ে হয়ে গেছে, তিনি এখন স্বামীসহ কানাডায় থাকেন। চট্টগ্রামে নাফিসের নিজেদের বাড়ি আছে, মাকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার।

আসিফ এখন নাফিসদের ড্রয়িংরুমে নাফিসের মায়ের সামনে বসে আছে। জাহানারা আজ নিজে থেকেই আসিফকে আসতে বলেছেন।
– আসিফ, তোমাদের সব কথা নাফিসের কাছে শুনলাম। তোমরা নাকি বাসা ছেড়ে দিচ্ছ, তোমার বাবা মা গ্রামে চলে যাচ্ছে?
– জ্বি, আন্টি।
– তুমি এখন কোথায় থাকবে বলে ঠিক করেছ?
– দেখি না আন্টি, কি করা যায়।
– দেখি মানে? তোমাকে তো এখানে থেকেই পড়াশোনা করতে হবে, তাই না?
-হ্যাঁ, আমার এক বন্ধুর সাথে মেসে থাকব ভাবছি।
– তোমাকে মেসে থাকতে হবে না। আমার এত বড় বাসা থাকতে তুমি মেসে থাকতে যাবে কেন?
-কিন্তু আন্টি
– কোন কিন্তু না, আমি যেটা বলেছি সেটাই হবে। এখন থেকে তুমি আমার বাসাতেই থাকবে, ঠিক আছে?
– ঠিক আছে আন্টি, আপনি যা বলেন
– আচ্ছা, আমি তাহলে আজকেই তোমার মায়ের সাথে ফোনে কথা বলব।

জাহানারা আসিফকে নিজের ছেলের মতই আদর করেন। আসিফও তাকে নিজের মায়ের মত শ্রদ্ধা করে। তাই সে আর রাজী না হয়ে পারলো না। জাহানারা নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে বললেন, কি এখন খুশী, কাল থেকে তো আমার মাথা পাগল করে ফেলছিলি। তবে খবরদার, আসিফকে কোনো রকম জ্বালাতন করবি না, এখানে ওর যেন কোনো সমস্যা না হয়।

– চিন্তা করো না, আমি আসিফের খুব ভাল মত খেয়াল রাখব।
জাহানারা আসিফকে বললেন, আসিফ, নিশাতের বিয়ের পর থেকে তো ওর রুমটা খালি পড়ে আছে, তুমি এখন থেকে ঐ রুমে থেকো,
– জ্বি আন্টি
– আর আজ থেকে এটা তোমার নিজের বাসাই মনে করবে, কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে, কোনো কিছু নিয়ে সংকোচ করো না।

নাফিস আসিফের হাত টেনে তাকে নিজের রুমে নিয়ে আসলো, তার এত আনন্দ হচ্ছে যে খুশীতে নাচতে ইচ্ছে করছে। সে আসিফকে জড়িয়ে ধরে বললো, আমি জানতাম তুই মায়ের কথা ফেলতে পারবি না।
– তোকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, থ্যাঙ্কস্ ফর everything
-লাথি দিবো একটা, আমি যা করছি নিজের জন্য করছি, তোর জন্য কিছু করি নাই
– আচ্ছা ঠিক আছে, ধন্যবাদ দিমু না। আমি সত্যি ভাগ্যবান যে তোর মত একটা বন্ধু পাইছি যে আমার কথা এত ভাবে।
– তোর কথা না ভাবলে আর কার কথা ভাবব, তুই ছাড়া আর আমার আছেই কে?
– হ্যাঁ, বয়ফ্রেন্ড পাইলে তো তখন এই বন্ধুর কথা ভুলে যাবি, আমার কথা মনেও থাকবে না,
– সেজন্যতো আমার বয়ফ্রেন্ড হবেও না।
– হবে না কেন? দরকার হলে আমি নিজে তোর জন্য পাত্র খুঁজবো।

– দরকার নেই, আমি একাই ভাল আছি। আচ্ছা, তুই তো চাইলে আমার রুমেই থাকতে পারিস।
– জ্বি না, আমি নিশাত আপার রুমেই থাকব।
– কেন, আমার রুমে থাকলে কি সমস্যা।
-এক রুমে থাকলে আমাদের দুজনের কারোই পড়াশোনা হবে না। তাছাড়া আলাদা রুমে থাকলেই বা কি? ঘুমানোর সময় ছাড়া আমরা দুজন তো একসাথেই থাকতে পারব।
– ঠিক আছে, তোর কাছে যেভাবে ভাল লাগে, আমি তোকে কোনো জোড় করব না।

৩.
আজ প্রায় একমাস হয়ে গেছে আসিফ নাফিসদের বাসায় এসে থাকছে। ধীরে ধীরে সে যেন তাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছে। একসাথে ভালই চলছে দুই বন্ধুর, পড়াশোনা, আড্ডা, গান আর সেই সাথে ফেসবুক। সবকিছুই একে অপরের সাথে শেয়ার করে তারা, কে কার সাথে চ্যাট করছে, ফেসবুকের কার নতুন রিলেশন হল, কোন বন্ধুর ব্রেকআপ হয়েছে, কোনো কিছুই বাদ দেয় না তারা। সবাই ভেবে অবাক হয়, দুজন দুজনের এত কাছাকাছি থেকেও দুজনের মাঝে কোনো রিলেশন হচ্ছে না কেন? তাদের দুজনের বন্ধুরাও বুঝে না, তাদের সম্পর্কটা আসলে কি, শুধুই কি বন্ধুত্বের?
হঠাৎ একদিন নাফিস একটু সেজে গুজে বাসা থেকে বের হচ্ছিল।
– কোথায় যাচ্ছিস তুই?
– এই তো একটু বাইরে
– বাহিরে কোথায়?
– পতেঙ্গার ঐদিকে যাব, একটা বন্ধুর সাথে দেখা করতে.
– তোর আবার নতুন বন্ধু হল কবে থেকে?
– তুই এমন পুলিশের মত জেরা করছিস কেন? রাকিবের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি, ওর বাসা পতেঙ্গার কাছে। অনেকদিন থেকে চ্যাট হচ্ছিল, কাল সে নিজ থেকেই দেখা করতে চাইল, তুই যাবি আমার সাথে?
-না, তুই সাগর পাড়ে যাচ্ছিস ডেটিং করতে, আমি কেন তোর সাথে যাব?
– ডেটিং এর কথা আসছে কেন? ফেসবুক বন্ধু হিসেবে আমি ওর সাথে দেখা করতে পারি না?
– অবশ্যই পারিস, তবে আমি তোর সাথে গেলে রাকিবের নিশ্চয় ভাল লাগবে না।
– আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তাহলে যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
– ওকে যা, তবে বেশী রাত করিস না, তাড়াতাড়ি চলে আসিস।
– জো হুকুম, জাহাঁপনা।
নাফিস তাড়াহুড়ো করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় সে পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পেত আসিফের মুখটা কেমন অমাবস্যার রাতের মত অন্ধকার হয়ে আছে।

৪.
রাত নয়টা বাজে। নাফিস এখনো বাসায় ফেরেনি। আসিফ অনেকবার তার মোবাইলে কল করেছে, কিন্তু নাফিসের মোবাইল বন্ধ। আসিফের মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেছে। এদিকে এখন তাকে আন্টির সাথে নাফিসদের এক আত্মীয়ের বিয়েতে আসতে হয়েছে। আসিফের আসার কোনো ইচ্ছাই ছিল না, কিন্তু নাফিসও নেই, আন্টি রাতের বেলা একা একা যাবেনই বা কিভাবে ? ক্লাবে আসার পর তার আরো বেশি বিরক্ত লাগছে, এখানে সে কাউকেই চেনে না, নাফিস সাথে থাকলে তার নিশ্চয় এতটা বোরিং লাগত না। নাফিসের উপর তার এত রাগ লাগছে, বেছে বেছে হারামজাদাকে আজকেই ডেটিং এ যেতে হল!

হঠাৎ আন্টি এসে আসিফকে জিজ্ঞাসা করল, নাফিসকে ফোনে পেয়েছিস?
– না, ওর মোবাইল বন্ধ।
– তোকে বলে যায়নি কোথায় গেছে?
– বললো তো কোন বন্ধুর সাথে ঘুরতে যাচ্ছে।
– আমি তো জানতাম, তুই এখন ওর একমাত্র বন্ধু।
আসিফ কি বলবে বুঝে পেল না।
– একা একা খুব বিরক্ত হচ্ছিস, না?
– না আন্টি, অসুবিধা নেই।
– চল, আমরা খেয়ে ফেলি। আমার শরীরটাও ভাল লাগছে না, খেয়ে বাসায় চলে যাব।

রাত প্রায় সাড়ে দশটা, আসিফ তার আন্টিকে নিয়ে বাসায় ফিরছে। অনুষ্ঠানে একা একা বিরক্ত লাগলেও একটা কারণে আসিফের মনটা খুব ভাল। জাহানারা আসিফকে তার সব আত্মীয় স্বজনের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছেন, এই হচ্ছে আমার আরেক ছেলে আসিফ। কিছু কিছু মানুষ সবাইকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারে। বাসায় ফিরে আসিফ দেখে নাফিস রুমে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে, ঘরের দরজা বন্ধ। নাফিস ঘুমিয়ে গেছে ভেবে আসিফ আর তাকে ডেকে বিরক্ত করেনি।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আসিফ দেখে আন্টি স্কুলে চলে গেছেন, নাফিস নিশ্চয় এখনো ঘুম থেকে উঠেনি। প্রতিদিন সকালে নাফিসকে ঘুম থেকে জাগানোর মত দূরহ কাজটি এখন আসিফের রোজকার রুটিন হয়ে গেছে। তবে নাফিসের যেকোনো কাজ করতেই আসিফের ভাল লাগে। তার বিছানা গুছানো, বইপত্র গুছিয়ে রাখা, ছাদ থেকে কাপড় আনা, নাফিসের এমন অনেক কাজই আসিফ আনন্দের সাথে করে, সেই সাথে অগোছালো বলে নাফিসকে অনেক বকাবকিও করে। প্রতিদিনের অভ্যাসমত আজকেও নাফিসকে জাগানোর জন্য দরজা ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। নাফিস হয়তো দরজা লক করতে ভুলে গেছে। ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল আসিফ। বিছানায় চিত হয়ে ঘুমাচ্ছে নাফিস, পাশেই তার গলা জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে অপরিচিত একটা ছেলে, দুজনেই সম্পূর্ণ বিবস্ত্র। হঠাৎ অসুস্থবোধ করল আসিফ, দৃশ্যটা দেখে তার মাথাটা যেন ঘুরছে। তার ইচ্ছে হল ছুটে পালায়, কিন্তু পায়ে যেন শিকড় গজিয়েছে, নড়ার এতটুকু শক্তি নেই। নিজের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটিকে কখনো এমনভাবে অন্য একটি ছেলের সাথে দেখতে হবে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি আসিফ।

৫.
ঐ ঘটনার পর থেকেই আসিফ ও নাফিস একে অপরের সাথে কথা বলে না, দুজনই দুজনকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে। সেদিন আসিফ রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় নাফিসের ঘুম ভেঙ্গে যায়। দরজা বন্ধ করার শব্দে নাফিস বুঝতে পারে যে, আসিফ কিছুক্ষণ আগে রুমে এসেছিল। লজ্জায় সে আসিফের সামনে দাঁড়াতে পারে না। নিজের কাছেই নিজেকে ছো্ট মনে হচ্ছে নাফিসের। ঐদিন আসলে তার কোনো হুসই ছিল না। জীবনে প্রথম বিয়ার খেয়েছে সে. নাফিস ভেবেছিল বিয়ার খেলে মানুষ মাতাল হয় না, সে হয়তো একটু বেশী খেয়ে ফেলেছিল। রাতে বাসায় ফেরার পথে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছিল না, তাই রাকিব তাকে বাসায় পৌছে দেয়ার জন্য তার সাথে এসেছিল।

রুমে ঢুকেই রাকিব তাকে পাগলের মত কিস করতে শুরু করল, মাতাল অবস্থায় নাফিসও কোন বাঁধা দিল না। তেইশ বছরের ভরা যৌবনে নাফিসের শরীরও অস্থির হয়ে উঠে। ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে লোভনীয় খাবার থাকলে সে যেমন চুপচাপ বসে থাকে না, নাফিসও তেমনি সেদিন রাকিবের উপর ঝাঁপিয়ে পরেছিল নিজের শরীরের ক্ষিধা মেটাতে।

গত একসপ্তাহে আসিফ একবারও নাফিসের রুমে যায়নি। নাফিসের আর এই মৌন যুদ্ধ সহ্য হচ্ছিল না, তাই সে একদিন নিজ থেকেই আসিফের রুমে গেল।
– কি হইছে তোর, আসিফ?
-আমার কি হবে?
– তুই আমার সাথে কথা বলছিস না কেন?
-কি কথা বলব তোর সাথে? তুই এখন এখান থেকে যা, আমার কাজ আছে।
– প্লিজ আসিফ, আমি যদি কোনো অন্যায় করি তাহলে তুই আমাকে যা খুশী শাস্তি দে, কিন্তু এভাবে তোর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিস না। তুই দূরে সরিয়ে দিলে আমি বাঁচবো না।
– দেখ নাফিস, তুই কোনো অন্যায় করিসনি। তুই যার সাথে খুশী , তার সাথে রাত কাটাতে পারিস, এখানে আমার কিছু বলার নেই।
– না, তোর অবশ্যই বলার অধিকার আছে।
– কিসের অধিকার? আমি তোর কে?
– তুই আমার কেউ না?
-না, কেউ না। হ্যাঁ তুই আমার ভাল বন্ধু, এর বেশি কিছু তো না।
– তাহলে কেন তুই সেদিনের ঘটনায় এতটা কষ্ট পাচ্ছিস?
– আমি কেন কষ্ট পাব? আমি যদি তোর বয়ফ্রেন্ড হতাম, তাহলে নিশ্চয় তুই অন্য একটা ছেলের সাথে ডেটিংএ যেতি না, তাকে নিয়ে এক বিছানায় রাত কাটাতিস না। কিন্তু তুই সেটা করেছিস, কারণ আমি তোর শুধু একজন বন্ধু। তাই তোর উপর রাগ করার কোন অধিকারও আমার নেই।
– অথচ গত একসপ্তাহ ধরে তুই আমার সাথে রাগ করে কথা বলছিস না, কেন রাগ করেছিস তুই?
– তুই নিজেও আমাকে দেখলে এড়িয়ে চলছিস।
– আমি তো লজ্জায় তোর সামনে দাঁড়াতে পারছিলাম না। প্লিজ আসিফ, তুই আমাকে ক্ষমা করে দে, আমি জীবনেও আর এমন কাজ করব না।
– নাফিস, তুই এখন যা, তোর সাথে কথা বলতে আমার ইচ্ছে করছে না. আর একটা কথা, আমি এখানে থাকব না, আগামীকাল আমি চলে যাব।
আসিফের কথায় নাফিসের চোখে পানি চলে আসছিল, সে নিজেকে কোনো রকম সাম্‌লে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

সেদিন থেকেই নাফিসের ভীষণ জ্বর, কিছু খেতে পারছে না, বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। ডাক্তার বলেছেন, ভাইরাস জ্বর, দুই একদিনের মধ্যে ভাল হয়ে যাবে, অথচ তিনদিন হয়ে গেল নাফিসের জ্বর ভাল হচ্ছে না। প্রতিদিন রাত হলেই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে। আসিফের খুব খারাপ লাগছে নাফিসের জন্য, কিন্তু রাগের জন্য ঐ রুমে যেতেও পারছে না। আন্টিকে বারবার জিজ্ঞাসা করছে, নাফিস এখন কেমন আছে, ওর জ্বর কমেছে কিনা। জাহানারা বুঝতে পারছেন যে দুই বন্ধুর মধ্যে কিছু একটা হয়েছে, কিন্তু তিনি নিজ থেকে কিছু বললেন না। হঠাৎ সেদিন আসিফের মোবাইলে একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলো।
– হ্যালো আসিফ, আমি রাকিব বলছি।
– তুমি আমাকে কেন ফোন করেছ?
– আজ দুই দিন ধরে নাফিসের মোবাইল বন্ধ, ওর কি হয়েছে?
– ওর কি হয়েছে সেটা তো তোমারই ভাল জানার কথা, তাই না?
-মানে?
– মানে তুমি নাফিসের বয়ফ্রেন্ড, তোমারই তো ওর ভাল মন্দের খেয়াল রাখা উচিত।
– দেখো আসিফ, কারো সাথে এক রাত বিছানায় গেলেই, সে তার বয়ফ্রেন্ড হয়ে যায় না। আমি জানি, সেদিনের ঘটনার জন্য তুমি নাফিসের উপর রাগ করে আছ।
– আমি কেন ওর উপর রাগ করব? সে যার সাথে খুশী রাত কাটাতে পারে।
-আসিফ, আমি জানি না তোমাদের দুজনের মাঝে সম্পর্কটা আসলে কি। তবে এটা ঠিক যে, নাফিস তোমাকে অনেক ভালবাসে। সেই রাতের পর থেকে, নাফিস প্রচন্ড অপরাধবোধে ভুগছে, নিজে নিজে কষ্ট পাচ্ছে, আমার সাথেও কথা বলছে না। প্লিজ, তুমি আমাদের দুজনকে ক্ষমা করে দাও, আমার জন্য তোমাদের দুজনের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে।
– এইসব কথা থাক। আজ কয়েকদিন থেকে নাফিসের জ্বর, সেজন্য হয়তো মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে।
-জ্বর কি খুব বেশী?
– হ্যাঁ, মনে হয়।
– বুঝতে পারছি। আসিফ একটা কথা বলি, পৃথিবীতে খুব অল্প কিছু মানুষই সত্যিকার ভালোবাসার সন্ধান পায়, তারা অনেক সৌভাগ্যবান। কিন্তু পৃথিবীতে সবচেয়ে দুর্ভাগা মানুষ তারা, যারা সেই ভালোবাসার সন্ধান পেয়েও তাকে ধরে রাখতে পারে না।
– আচ্ছা রাকিব, এখন রাখি। তুমি না হয় কাল একবার নাফিসকে দেখতে এসো।
– হ্যাঁ, আসব। তবে এসে দেখতে চাই, তুমি নাফিসের হাত ধরে বসে আছ, তোমার স্পর্শে ওর সব অসুখ ভাল হয়ে গেছে।

রাত প্রায় একটার দিকে আসিফ নাফিসের রুমে গেল, নাফিস তখন ঘুমুচ্ছে। আসিফ নাফিসের পাশে বসে তার কপালে হাত রাখলো, নাফিসের শরীরে তখনো অনেক জ্বর, এক অচেনা কষ্টে আসিফের বুকটা হুহু করে উঠলো। নিজের হাতে নাফিসের কপালে জলপট্টি দিল, ভেজা গামছা দিয়ে সমস্ত শরীর মুছে দিল। জ্বরের ঘোরে নাফিস বির বির করে প্রলাপ বকছে, প্লিজ আসিফ, তুই আমাকে মাফ কর, তুই আমাকে মাফ না করলে যে আমি কখনো ভাল হব না, আমি সত্যি সত্যি মরে যাব। I love you, দোস্ত। কেন তুই শুধু শুধু আমার উপর রাগ করিস? তুই বুঝিস না…
মনের অজান্তেই আসিফের চোখ বেয়ে পানি পরতে লাগলো। সে নাফিসকে জড়িয়ে ধরে তার কপালে চুমু খেলো, নাফিসের হাতটা শক্ত করে ধরে বললো, প্লিজ বন্ধু, তুই তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যা, আমি আর কখনো তোর উপর রাগ করব না।
আসিফের মনে হচ্ছে সে এভাবেই সারাজীবন এই মানুষটার পাশে থাকতে পারবে। আসিফ নাফিসের চুলে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলো। কেন এত মায়া হচ্ছে এই মানুষটার জন্য? কোথা থেকে জন্ম হয় এই মায়ার? এই মায়ার অপর নামই কি ভালোবাসা?
কেন জানি একটা লোকজ গান তার খুব মনে পড়ছে, সে গুন গুন করে গাইতে শুরু করল,
বন্ধুয়ারে, তুই যদি আমার হইতিরে,
আমি হইতাম তোর।
কোলেতে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৩১ই জুলাই, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.