মা

লেখকঃ শাহরিয়ার সুমন

ভূমিকাঃ গল্পের নাম শুধু মা, কারণ আমার ধারণা মা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম শব্দ, এর সাথে কোনো বিশেষণের প্রয়োজন হয় না।
গল্পটি উৎসর্গ করছি আমার গর্ভধারিনী মাকে, যিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল মানুষদের মধ্যে একজন।
আচ্ছা, পৃথিবীর সব মায়েরাই এত ভালো হয় কেন, বলো তো??

১।

শীতের সকাল, নয়টা বেজে গেছে, রেহান এখনো চাদরমুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। রাহেলা বেগম সেই কখন থেকে রেহানের সাথে একটানা বকাবকি করে যাচ্ছেন। প্রতিদিন সকালে রেহানকে ঘুম থেকে জাগিয়ে কলেজে পাঠানো রাহেলার কাছে একটা ছোট খাটো যুদ্ধের মত ব্যাপার।
– রেহান, তুই এখনো উঠোস নাই বিছানা থেকে?
-এই তো উঠছি মা, আর পাঁচ মিনিট।
-আর এক মিনিটও না, তুই এক্ষুণি বিছানা থেকে উঠবি, না হলে কিন্তু আমি এই ঠান্ডার মধ্যেই তোর গায়ে পানি ঢেলে দিব।
-উফ মা! তুমি প্রতিদিন সকালবেলা এত বিরক্ত কর কেন? তোমার যন্ত্রনায় আমি একটু শান্তিতে ঘুমাতে পর্যন্ত পারি না।
-হইছে, আর ঘুমানো লাগবে না। প্রতিদিন রাত একটা পর্যন্ত মোবাইলে কথা বলবি, আর সকাল নয়টা পর্যন্ত ঘুমাবি! তোর অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে।
রাহেলা রেহানের কাছ থেকে চাদর কেড়ে নিয়ে তাকে বিছানা থেকে টেনে তুললেন।
– তুমি সত্যি আমার সবচেয়ে বড় শত্রু!
-হ্যা, শত্রু তো! দোয়া কর আমি যেন তাড়াতাড়ি মরে যাই। তাহলে তুই শান্তিতে ইচ্ছামত ঘুমাতে পারবি।
– তুমি যে মা কিসব বলো না!
– ঠিক কথাই বলি, যখন থাকব না তখন বুঝবি।
রেহান আর কিছু না বলে চুপ করে থাকল। সাত সকালে এখন তার মায়ের সাথে ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে না। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখল ৯টা বিশ, সত্যি তো আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে। আজকের প্রথম ক্লাসটা মনে হয় সত্যি মিস হয়ে যাবে। বড় একটা তোয়ালে টেনে নিয়ে বাথরুমের দিকে দৌড় দিল সে।
ছেলের দিকে তাকিয়ে আপনমনে হাসছেন রাহেলা বেগম। সত্যি তার ছেলে অনেক বড় হয়ে গেছে। সময় কত দ্রুত চলে যায়! বছর পাঁচেক আগেও রেহান মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাত। মায়ের শরীরের গন্ধ না পেলে নাকি তার ঘুম আসে না। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে দৌড়ে এসে মায়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়ত। আর এখন তো রেহান তার সামনে শার্ট খুলতেও লজ্জা পায়। ছেলেগুলো চিরকাল ছোট থাকলেই যেন ভাল হত! কিন্তু উপায় নেই। বড় তো হবেই। কল্পনায় ছোট দেখে আনন্দ পাওয়া ছাড়া করার কিছু নেই। রেহান চট্টগ্রাম মেডিকেলে ডাক্তারী পড়ছে। এই তো আর কিছুদিন পরেই পাশ করে বের হবে। তখন সবাই তাকে দেখে বলবে, ডাক্তার সাহেবের মা। গর্বে তার বুকটা ফুলে উঠবে। সুন্দর দেখে একটা মেয়েকে ছেলের বউ করে ঘরে আনবেন। আচ্ছা, বিয়ের পর কি রেহান মায়ের চেয়ে বউকেই বেশি ভালোবাসবে? তখন নিশ্চয় রেহান, ‘মা ক্ষিধে লেগেছে, কি খাব?’ বলে কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করবে না! বিয়ের পর কি ছেলে সত্যি পর হয়ে যায়? নিজের অজান্তেই ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রাহেলা। রেহানের বিছানা গুছিয়ে এলোমেলো বইপত্রগুলো ঠিক করে রাখছেন। ছেলেটা এত অগোছালো! নিজের জিনিসগুলো পর্যন্ত ঠিক করে গুছিয়ে রাখতে পারে না।

২।

রাহেলা বেগম তার তিন সন্তানকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন। রেহানের বাবা যখন মারা যায়, তখন রেহানের মাত্র সাত বছর বয়স। সেদিনের কথা এখনো রাহেলার চোখের সামনে ভাসে। উঠোনে স্বামীর লাশ, প্রতিবেশি মহিলারা রাহেলার নাকফুল, হাতের চুড়ি সব একে একে খুলে নিচ্ছেন। রাহেলা তখন অকালে স্বামী হারানোর শোকে পাগলের মত কাঁদছেন। ছোট্ট রেহান তখনো বুঝতেই পারেনি যে তার বাবা চিরকালের জন্য তাদের ছেড়ে চলে গেছেন অনেক অনেক দূরে। তার বোনেরাও চুপচাপ, ঘরের এক কোণে বসে নিঃশব্দে কাঁদছে। তাদের গ্রামের বাড়িতে হাজার হাজার মানুষ, সবাই তাদের দেখতে আসছে, অনেকে তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে যাচ্ছে। রেহানের কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে। রেহান মাকে জড়িয়ে ধরে বললো, আম্মু তুমি কেঁদোনা, তুমি কাঁদলে আমার বুকের ভেতরে কেমন যেন ব্যাথা হয়। ছেলের কথা শুনে রাহেলা সাথে সাথেই কান্না থামিয়ে ফেললেন। চোখের পানি মুছে নিলেন। তিনি ভাবলেন, তার স্বামী তো তাকে ছেড়ে চিরদিনের জন্যই চলে গেছেন, তাকে আর কখনোই ফিরে পাবেন না। কিন্তু এই ছেলেটির জন্যই তাকে এখন বাঁচতে হবে। সেদিনের পর রাহেলা আর সত্যি কাঁদেননি। তিনি চাননি তার চোখের পানি দেখে তার সন্তানেরা কষ্ট পাক। স্বামীর মৃত্যুর চারদিন পরই ছেলেমেয়েদের নিয়ে একাই শহরের বাড়িতে ফিরে এলেন। একজন সহজ সরল সাধারণ গৃহিণী হয়ে একাই সংসারের হাল ধরলেন। শক্ত হয়ে সব রকম ঝড়-ঝাপ্টা থেকে সন্তানদের বুক দিয়ে আগলে রাখলেন। সেদিন তার আত্মীয় স্বজনদের কেউ তার পাশে এসে দাড়ায়নি। রাহেলার স্বামী সবসময় গর্ব করে বলতো, তারা সাত ভাই। কিন্তু ভাইয়ের মৃত্যুর পর রেহানের চাচারা কেউ কোনোদিন এসে তাদের খোঁজ নেয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। কখনো রাহেলাকে এটা জিজ্ঞাসা করেনি, ‘ভাবী, ছেলে মেয়েদের নিয়ে আপনার কোন সমস্যা হচ্ছে না তো? অবশ্য কথায় বলে, যার কেউ নেই, তার আল্লাহ আছে। আল্লাহ পাশে ছিলেন বলেই হয়তো রাহেলা ছেলে মেয়েদের একা হাতে বড় করেছেন, পড়াশোনা করিয়েছেন, বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন একমাত্র ছেলেকে নিয়েই রাহেলার ছোট্ট সংসার। ভালোই আছেন তিনি। রেহানকে নিয়ে যে তার অনেক স্বপ্ন!

৩।

রাত প্রায় বারটা। রেহানের রুমে লাইট জ্বলছে। রাহেলা এসে দেখেন রেহান রুমে নেই, হয়তো বারান্দায়।
মাকে দেখেই রেহান তাড়াতাড়ি মোবাইল রেখে দিল।
-কিরে এত রাত পর্যন্ত কার সাথে মোবাইলে কথা বলিস?
-এই তো মা, কলেজের এক বন্ধুর সাথে।
রাহেলা হেসে বললেন, বন্ধু না বান্ধবী?
-বান্ধবী আসবে কোথা থেকে? তুমি না মা আজব!
– হইছে, মায়ের কাছ থেকে আর লুকাতে হবে না।
-ঠিক আছে, তুমি যা ভাব।
-তা মেয়েটা দেখতে কেমন?
-তোমার এতকিছু জানতে হবে কেন?
-আমি তোর মা, আমি জানব না?
-সময় হলে সবকিছু জানতে পারবা।
-ঠিক আছে, মেয়েটাকে একদিন বাসায় নিয়ে আসিস। দেখি, আমার ছেলের সাথে মানায় কিনা!
-মা, তুমি এখন ঘুমাতে যাও তো। সকালে আবার হাঁটতে যাবে না!
-যাচ্ছি, তুইও ঘুমা, আর জানালা বন্ধ কর, না হলে রাতে ঠাণ্ডা লাগবে।

৪।

রেহান কলেজের ক্যান্টিনে পার্থের সাথে বসে গল্প করছে।
– রেহান, তুমি কিন্তু এখনো আমাকে আন্টির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে না!
-নিয়ে যাব একদিন, সময় হোক।
-তোমার সেই সময় কখন হবে? তোমার তো আজকে আর ক্লাস নেই, চলো আজকেই যাই।
-না, আজ নয়। পরে একসময় যাওয়া যাবে।
-কেন, আজকে সমস্যা কোথায়?
-তোমাকে মায়ের সামনে কি বলে পরিচয় দেব? সমবয়সী হলে না হয় বলতাম আমার কলেজের বন্ধু।
-রেহান, আমার মনে হয় তোমার আন্টিকে সব খুলে বলা উচিত। আন্টি অনেক আধুনিক মানসিকতার, তিনি হয়তো তোমাকে বুঝবেন।
-কি যে বলো, আমার মা যে পরিমাণ ধার্মিক! তিনি জীবনেও এটা মেনে নিতে পারবেন না।
-কিন্তু একসময় তো আন্টিকে তোমার সবকিছু বলতেই হবে। সারাজীবন তো আমরা এভাবে আলাদা থাকতে পারব না।
– জানি না, ভবিষ্যতে কি হবে।
-আচ্ছা, আন্টি জোড় করলে তুমি সারাজীবন বিয়ে না করে থাকতে পারবে?
– আমার মা কখনোই আমার উপর জোর করে কোনোকিছু চাপিয়ে দেবে না
– কিন্তু তুমি আন্টির একমাত্র ছেলে।
– আমি জানি, মায়ের কাছে তার সন্তানের সুখটাই বড়। শুধু যদি ধর্মে সমকামিতা হারাম না হত, আমি নির্ভয়ে তোমাকে নিয়ে মায়ের সামনে দাড়াতে পারতাম।
রেহান হঠাৎ করে কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল। পার্থ রেহানের কাঁধে হাত রেখে বললো, টেনশন করো না, একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে।

৫।

তখন রাত প্রায় একটা, রেহান এখনো বাসায় ফেরেনি। সে নাকি তার কোন বন্ধুর ভাইয়ের বিয়েতে গেছে। রেহান তার মাকে বলেই গিয়েছি যে তার বাসায় ফিরতে দেরী হবে, তিনি যেন টেনশন না করেন। তবুও রাহেলার কেন যেন দুশ্চিন্তা হচ্ছে, ছেলে বাসায় না ফেরা পর্যন্ত তার ঘুম আসবে না। রাহেলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ পর তিনি হঠাৎ একটি গাড়ির শব্দ শুনতে পেলেন। রাহেলা তাদের চারতলার খোলা বারান্দা থেকে গলা বাড়িয়ে দেখলেন একটি সাদা এক্স করোলা কার তাদের বাড়ির গেটের সামনে এসে দাড়ালো। গাড়ি থেকে প্রথমে রেহান, পরে সাতাশ আটাশ বছরের একজন সুদর্শন তরুণ বেরিয়ে এলো।


রেহানদের বাসা এলাকার একদম শেষ মাথায়, এদিকে আর কোনো বাড়ি নেই। গভীর রাত, চারদিক একদম নির্জন হয়ে গেছে। রেহান পার্থের হাত ধরে বললো, চলো আজ তোমাকে মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।
-আজ না, অনেক রাত হয়ে গেছে, আন্টি নিশ্চয় এতক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে।
-আমি না ফেরা পর্যন্ত মা জীবনেও ঘুমাবে না।
– জানি আমি, তুমি হচ্ছ আন্টির অতি আদরের ধন। তোমাকে ছাড়া আন্টি কখনো খেতে বসে না, এমনকি তোমার কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে ইস্ত্রি করে আলমারিতে গুছিয়ে রাখা, সব কাজ আন্টি নিজেই করে।
-মা সত্যি আমাকে অনেক ভালবাসেন।
– আমিও তোমাকে অনেক ভালবাসি।
– ভালবাস, কিন্তু আম্মু থেকে অনেক কম।
– পাগল! মায়ের মত কেউ ভালবাসতে পারে না। আচ্ছা আমি এখন যাই, বিদায় দাও হে সখা।
– যাও, আমি কি তোমাকে ধরে রেখেছি নাকি?
-এই, আমাকে একটা কিস করবে প্লিজ?
– পাগল হইছ? এই রাস্তার মাঝে!
-চারপাশে অন্ধকার, আশেপাশেও কেউ নাই।
-তবুও না।
– আচ্ছা যাও, ঘাড়ে একটা কিস করো
– আমি পারব না
– আমি কিন্তু তাহলে এই ঠান্ডার মধ্যেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব।
– তুমি না সত্যি একটা শয়তান!
পার্থ হাসতে হাসতে বললো, এতদিন প্রেম করার পর এটা বুঝলে?
রেহান এগিয়ে এসে পার্থের ঘাড়ে চুমু খেয়ে দ্রুত সরে যেতে চাইল। কিন্তু পার্থ রেহানের হাত ধরে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর তার কপালে আলতো চুমু খেয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
রেহান জানে না, চারতলার উপর থেকে তার মা এতক্ষণ সবকিছুই দেখেছেন। রেহান যখন উপরের দিকে মুখ তুলে তাকাল, রাহেলা দ্রুত বারান্দা থেকে সরে গেল।

৬।

সে রাতে রাহেলা রেহানকে আর কিছুই জিজ্ঞাসা করলেন না। তিনি আসলে পুরো ব্যাপারটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সমকামিতা বিষয়টা সম্পর্কে তিনি ভাল করেই জানেন, কিন্তু নিজের একমাত্র ছেলে গে এটা তিনি ভাবতেই পারছেন না। তিনি নিজেকে বোঝাতে চাইলেন, তিনি যা দেখেছেন, যা ভাবছেন সব ভুল। কিন্তু নিজের চোখকেই বা অবিশ্বাস করবেন কিভাবে?
দুইদিন পর সকালে নাস্তার টেবিলে রাহেলা নিজের সব দ্বিধা সংকোচ কাটিয়ে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, রেহান, সেদিন রাতে তোকে যে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল ছেলেটা কে?
-ওর নাম রেহান, আমার বন্ধু।
-কি ধরনের বন্ধু? বয়সে তো মনে হয় তোর অনেক বড় হবে।
রেহান বুঝতে পারল সেদিন নিশ্চয় মা তাদের দুজনকে একসাথে দেখেছে। তাই সে মাকে সবকিছু খুলে বলার সিদ্ধান্ত নিল।
– মা, আমি পার্থকে ভালোবাসি। রাহেলা অবাক হয়ে ছেলের দিকে চেয়ে রইলেন
মা, I’m gay, আমার পক্ষে কোনো মেয়ের সাথে জীবন কাটানো সম্ভব নয়।
-তোর মাথা ঠিক আছে? তুই কি বলছিস সেটা নিজে বুঝতে পারছিস?
-হ্যা, বুঝতে পারছি। ক্লাস নাইনে উঠার পর থেকেই ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম আমি ঠিক অন্য সবার মত নই, আমি সবার থেকে আলাদা। মেয়েদের প্রতি আমার কোন ফিলিংস নেই। তখন মনে হত আমার নিজের ভেতরেই হয়তো কোন সমস্যা আছে। কিন্তু পরে জানলাম আমি অস্বাভাবিক নই, আমার মত আরো অনেকেই আছে যাদের অনুভুতিগুলো ঠিক আমারই মত। গত একবছর ধরে পার্থের সাথে আমার সম্পর্ক, আমরা দুজন দুজনকে অনেক ভালবাসি।
রাহেলা চেয়ার থেকে উঠে সজোড়ে রেহানের গালে চড় বসালেন। রেহান অবাক হয়ে মায়ের দিকে চেয়ে রইল। তেইশ বছরের জীবনে এই প্রথম মায়ের হাতে চড় খেলো সে। ছোটবেলাতেও রেহান কোনদিন মায়ের হাতে মার খায়নি। রাহেলা মুখে শত রাগারাগি করলেও কখনো ছেলে মেয়ের গায়ে হাত তোলা পছন্দ করেন না।
– তুই আজকেই আমার সাথে ডাক্তারের কাছে যাবি।
-মা, আমি কোন মানসিক রোগী নই।
– তুই আর একটা কথাও বলবি না।
– মা, আমি তো কোন অন্যায় করিনি। সমকামিতা একটি স্বাভাবিক যৌনপ্রবৃতি। আল্লাহই আমাদের এভাবে বানিয়েছে, এখানে আমাদের কি দোষ?
-রেহান তুই আমার সামনে থেকে যা, তোর মুখ দেখতেও আমার ঘেন্না লাগছে।
রেহান নাস্তা না খেয়েই বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।

৭।

রেহান এখনো বাসায় ফেরেনি। ছেলেটা হয়তো সারাদিন না খেয়েই আছে, না জানি কোথায় কোথায় ঘুরছে, ছেলেটার গায়ে এভাবে হাত তোলা উচিত হয়নি, এসব ভেবেই রাহেলার এখন খারাপ লাগছে। রেহানের মোবাইলও সুইচ অফ। ছেলেটার জন্য বড্ড টেনশন হচ্ছে, কোন বিপদ আপদ হল না তো? রাহেলার নিজেরও আজ সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। রাত আটটার দিকে হঠাৎ বেল বাজতেই রাহেলা দৌড়ে ছুটে গেল। দরজা খুলে তিনি অবাক হলেন। দরজায় রেহান নয়, পার্থ দাঁড়িয়ে আছে।
– তুমি এখানে কেন?
-আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।
-তোমার সাথে আমার কোন কথা নেই, তুমি যাও এখান থেকে।
-প্লিজ আন্টি, আমাকে কিছুক্ষণ সময় দিন, আমার কথাগুলো বলেই আমি চলে যাব।
– ঠিক আছে, বলো কি বলবে?
-আন্টি আমি কি একটু ভেতরে এসে বসতে পারি? আমি জানি, আপনি আমাকে অনেক ঘৃণা করেন। ভাবছেন, আমিই আপনার ছেলেকে এই খারাপ পথে এনেছি।
-তুমি ভেতরে এসো। পার্থ ড্রয়িংরুমে সোফার উপর এসে বসলো। তারপর ব্যাগ থেকে ল্যাপ্টপ বের করলো।
-কি করছ তুমি?
-আমি আপনাকে একটা মুভি দেখাতে চাই, মুভিটার নাম ‘প্রেয়ারস ফর ববি’। একজন মা ও ছেলের গল্প।
– দেখো, আমার খুব মাথা ধরেছে, আমি এখন কোন মুভি দেখবনা।
– প্লিজ আন্টি, আমি জানি আপনি রেহানকে অনেক ভালবাসেন। ওর জন্য সবকিছু করতে পারেন। রেহানের ভালর জন্যই না হয় আমার সাথে বসে মুভিটা দেখুন। আমি নিশ্চিত ছবিটা দেখার পর আপনি রেহানের সমস্যাটা বুঝতে পারবেন।
রাহেলা কিছু না বলে চুপচাপ পার্থের পাশে বসল। মুভি দেখার সময় কেউ কোন কথা বললো না। ইংরেজী সাবটাইটেল থাকায় রাহেলা মুভির কথা মোটামুটি বুঝতে পারছিল। এরপরও পার্থ কিছু কিছু জায়গার সংলাপ রাহেলাকে বাংলাতে বলে শোনালো। সিনেমার এক পর্যায়ে রাহেলা চোখের পানি আটকে রাখতে পারলেন না। অপরিচিত ছেলেটির সামনেই তিনি ঝরঝর করে কাঁদতে লাগলেন।
মুভি শেষ হবার পর পার্থ ব্যাগ গুছিয়ে বললো, আন্টি আমি যাই, যাওয়ার আগে শুধু এটুকু বলব, রেহান আপনাকে অনেক ভালোবাসে। সে সবসময় আমার কাছে আপনার গল্প করত, ও বলতো, ‘আমার মা আগের যুগের মানুষ হয়েও অনেক বেশি আধুনিক, অনেক উঁচু মনের মানুষ। আপনি তার আদর্শ, আপনাকে নিয়ে তার অনেক গর্ব। সেই আপনি যদি তাকে না বোঝনে, তার সেক্সুয়ালিটিকে গ্রহণ করতে না পারেন, সে নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে না। আন্টি, আমি চাই না আপনাকেও একদিন ববির মায়ের মত কাঁদতে হোক।
পার্থ চলে গেছে, রাহেলা একা একা কাঁদছেন। ছবির কিছু দৃশ্য এখনো তার মাথায় ঘুরছে।
ববির মা চার্চের ফাদারকে বলছেন, ‘I know now why God didn’t heal Bobby. He didn’t heal him because there was nothing wrong with him. I was wrong. I couldn’t understand my son. Bobby was different.

৮।

রাত ১১টা বাজে, রেহান পার্থের বাসায়, পাথরের মত নিশ্চুপ বসে আছে, চোখগুলো এখনো ভেজা, কিছুটা লাল হয়ে ফুলে আছে।
-রেহান, বাসায় যাও। আন্টি তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
-মা আমাকে ঘৃণা করেন, আমি কিভাবে মায়ের সামনে গিয়ে দাড়াব?
-আন্টি অনেক বড় শক পেয়েছেন। নিজের একমাত্র ছেলে গে হওয়া তো স্বাভাবিক বিষয় নয়, তাই না? তুমি তাকে কিছুদিন সময় দাও। দেখবে, তিনি ঠিক নিজেকে সামলে নিবেন। everuthing will be ok.
– কিছু ঠিক হবে না, পার্থ। মা আর কখনো আমাকে ভালোবাসতে পারবে না, she hates me.
– কোন মা তার সন্তানকে কখনো ঘৃণা করতে পারে না। সন্তান যত বড় অন্যায়ই করুক না কেন, মা ঠিক সন্তানকে ক্ষমা করে দেন। দেখো রেহান, তুমি ছাড়া আন্টির কেউ নেই। এই দুঃসময়ে তোমার আন্টির পাশে থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরী।
– কিন্তু পার্থ
-কোন কিন্তু না, তুমি এখন বাসায় যাবে। আর টেনশন করছ কেন? আমি আছি তো তোমার পাশে। এই বলে পার্থ রেহানকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল।

৯।

প্রায় একমাস পার হয়ে গেছে। রেহান বাসায় ফেরার পর রাহেলা তাকে আর বিশেষ কিছু বলেনি। মা ছেলে দুজনেই চুপচাপ। কেউ কারো সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলছে না, যেন দুজনের মাঝে এক অদৃশ্য নীরব যুদ্ধ চলছে। রেহান অপেক্ষা করছে কখন মায়ের রাগ গলে পানি হবে, মা তাকে আবার কাছে টেনে নিবে।
রাহেলার মনের মধ্যেও চলছে ভীষন দ্বিধা, এক ভয়ঙ্কর দোটানার মধ্যে পরেছেন তিনি। মা হয়ে তিনি কিভাবে নিজের সন্তানকে অস্বীকার করবেন? সত্যিই তো, রেহান সমকামী, এখানে তার কি দোষ? নিজের জন্মের উপর তো কারো হাত থাকে না। অন্যদিকে নিজের ধর্ম, সমাজ সবকিছুকে উপেক্ষা করে পারছেন না রেহানকে বুকে টেনে নিতে। কারণ রেহানের ভালবাসাকে মেনে নেয়ার অর্থ নিজের ধর্মবিশ্বাসকে ভুল প্রমাণিত করা। ধর্মকে অস্বীকার করলে তো নিজের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যায়। রাহেলা কি করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। এমন জটিল সমস্যা যে তিনি মেয়েদের সাথেও কিছু আলোচনা করতে পারছেন না। অবশেষে তিনি একজন সাইক্রিয়াটিস্টের সাথে কথা বলার সিধান্ত নিলেন।

রাত প্রায় সাড়ে বারটা, রেহান একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। রাহেলা নিঃশব্দে ছেলের পেছনে দাঁড়িয়ে কাধে হাত রাখলেন। রেহান কিছুটা চমকে উঠে বললো, মা, তুমি এখানে!
-ঠান্ডার মধ্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
-ঘুম আসছে না, মা।
-আচ্ছা, তোর ঐ বন্ধু কি যেন নাম, পার্থ, সে কেমন আছে?
-ভাল, হঠাৎ ওর কথা জিজ্ঞেস করছ?
-এমনি, এরমধ্যে তোর সাথে দেখা হয়েছে?
-দেখা হয়নি, তবে ফোনে কথা হয়েছে।
-পার্থকে কাল রাতে ডিনারে আসতে বলিস তো, সেদিন ছেলেটা প্রথম বাসায় আসলো। ভাল করে কথাও বললাম না, চা নাস্তাও কিছু দেয়া হয়নি।
– মা তুমি সত্যি পার্থকে আসতে বলছ?
– হ্যা, আমার ছেলের বিশেষ বন্ধু, আমার তার সাথে পরিচিত হওয়া দরকার না?
মায়ের কথা রেহান প্রথমে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না, সে অবাক চোখে মায়ের দিকে চেয়ে রইল।
-রেহান, আমি জানি না, আমি ঠিক করছি কিনা। আমি শুধু চাই, তুই ভাল থাক। তোর সেই ভাল থাকা যদি পার্থের সাথে হয়, আমি বাধা দেব না। আমার কাছে তোর সুখের চেয়ে বড় আর কিছু নেই।
রেহান খুশীতে ছোটবেলার মত মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আনন্দে তার চোখে পানি এসে গেছে।
-তুমি এত ভালো কেন মা?
রাহেলা হেসে বললেন, এখন ছাড়, ব্যাথা পাচ্ছি আমি। এখন আর তুই আগের মত ছোট নেই।
রেহান মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললো, আমি তোমার কাছে সারাজীবন ছোটই থাকতে চাই, আমি কখনো বড় হব না।
মায়ের ভালবাসার কাছে পৃথিবীর সবকিছুই বড় তুচ্ছ। আজ রাহেলার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সবকিছু করতে পারেন। তিনি আজ মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন, সমাজ, ধর্ম, সব নীতি- নিয়ম গড়ে উঠেছে জীবনের প্রয়োজনে, জীবনের চেয়ে বড় কিছু নয়।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ২৫ই ডিসেম্বর, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.