যখন পৃথিবী নিমগ্ন ছিল অমিয় জোছনা ধারায়

লেখক: স্বপ্নবাজ আরীজ আরমান

আম্মুর কাছে অনেকদিন আগে থেকেই শুনছিলাম আমি ভাইয়া আর আম্মু আমাদের সবাইকে ময়মনসিংহে আমার মামার বাড়িতে যেতে হবে, কিন্তু আমার সেখানে একদমই ভালো লাগে না, সেখানে আমার সমবয়সি এমন কেউ নেই যার সাথে ঘুরে বেড়াতে পারবো শুধু ক্লাস নাইন পড়ুয়া মামাত ভাই নয়ন ছাড়া। কিন্তু মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত যাওয়াই লাগবে, এমনিতেই দু’সপ্তাহ হলো এইচএসসির চ্যাপ্টার ক্লোজ করে ঘুরে বেড়াচ্ছি তার ওপর আম্মু যাচ্ছে যখন যাওয়া তো লাগবেই।
ময়মনসিংহ যাওয়ার দিন অফিসের কাজে ভাইয়া আটকে যাওয়ায় শুধু আমি আর আম্মু চলে আসলাম। ত্রিশালে আমার মামার বাড়িটা শহরের কাছেই খুব চমৎকার সবুজ নিরিবিলি মফস্বলের মত একটা এলাকায়, এখানে আসার পর প্রথম দুদিন একটু বোরিং টাইম কাটল। শুনলাম আমার নানার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কুরআন খতম আর মিলাদের আয়োজনে আম্মুদের অনেক আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত করা হয়েছে। মিলাদের দুএকদিন আগে থেকেই দুরের আত্মীয়স্বজনরা আসতে লাগলো, তখন সঙ্গ দেবার মত তেমন কেউ না থাকলেও নানান মানুষের নানান কীর্তি দেখে দেখে সময়টা একেবারে খারাপ কাটছিল না।
মিলাদের আগের দিনের কথা, আমি শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিলাম, আম্মু পাশের রুমে কাদের সাথে যেন গল্প করছিল, হঠাৎ আম্মু আমাকে পাশের রুম থেকে ডাকতেই আমি উঠে সেখানে গেলাম, আম্মু প্রথমে আমাকে একজন ভদ্রমহিলার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “আরমান, উনি তোর পারুল খালা, আমরা একসাথে স্কুলে পড়তাম” আমি সালাম দিলাম, পারুল খালা খুবই হাসিখুশি একজন মানুষ, আমাকে হাত ধরে পাশে বসিয়ে আম্মুকে বললেন “বাহ, তোর ছেলে দেখছি তোর মতই হয়েছে” আমাকে বললেন “বাবা তুমিও নাকি এবার পরীক্ষা দিয়েছো, আমাদের সামিরও তো এবার পরীক্ষা দিল, ওর সাথে পরিচয় হয়েছে?” আমি হয়নি বলতেই তিনি সামির সামির বলে ডাকলেন, একটা ছেলে রুমে আসলো… পরনে একটা টিশার্ট আর থ্রিকোয়ার্টার, খালা আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, হাত বাড়িয়ে হেন্ডসেক করলাম। ছেলেটার গায়ের রঙ আমার মতই হবে, মাথা ভরা কালো এলোমেলো চুল, ছোট ছোট চোখ, দেখতে একটু ইনোসেন্ট… এই হলো সামির।
আমি সামিরকে নিয়ে টিভির রুমে চলে আসলাম। টিভি দেখছি আর টুকটাক গল্প করছি। গল্প করতে করতে জানলাম সামির ইন্টারমিডিয়েট দিয়ে ডাক্তার হবার লক্ষ্য নিয়ে এখন ঢাকায় কোচিং করছে, এখানে ওদের নিজের বাড়ি থাকলেও বাবার চাকরি সুত্রে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে, সে সুত্রেই ওরা এখন ঢাকায় থাকে আর কিছুদিন পর পর এখানে নিজের বাড়িতে এসে ঘুরে যায়। আমরা কথা বলছি আর টিভি দেখছি, কথা বলতে বলতে একটা জিনিস খেয়াল করলাম যদিও আমি টিভি দেখছি আর কথা বলছি কিন্তু সামির শুধু আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। ওর চোখের দৃষ্টি এমন অদ্ভুত যে কয়েকবার ওর দিকে তাকিয়ে কথা বলতে গিয়ে চোখে চোখ আটকে গেল, আর সেটা হওয়া মাত্রই ও টিভির দিকে চোখ সরিয়ে নিল। আমি আরও কয়েকবার দেখে ব্যপারটা নিশ্চিত হলাম। সামিরের একটা জিনিস খেয়াল করলাম ওর চোখের চাহুনি খুব মায়াময়, ছোট বাচ্চারা বাবা-মায়ের কাছে কিছু একটা চেয়ে যে রকম এক্সপেকটেশনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সামিরের দৃষ্টি অনেকটা তেমন, কেবলই মনে হয় কি যেন একটা চাইছে।
সামিরের সাথে গল্প করতে করতে অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা পুরনো বন্ধুর মত ফ্রি হয়ে গেলাম। এর কৃতিত্ব অবশ্য সামিরের কারণ আমি এমনিতে খুব চাপা স্বভাবের, নতুন কারো সাথে মিশতে সময় লাগে কিন্ত সামির হলো পুরো আমার বিপরীত। পরদিন মামা বাড়িতে মিলাদের আয়োজন হবে সেদিন তারই পূর্ব প্রস্তুতি চলছিল। আমার দুজনে অন্যদের সাথে সাথে কিছুক্ষন থাকলাম, যেসব ছোটখাট কাজ আমাদের দিয়ে করা সম্ভব সেগুলো করার চেষ্টা করলাম। দুপুরে এক সাথে খেলাম, বিকেল হতেই সামিরের আম্মু সামিরকে বাসায় ফেরার জন্য তাড়া দিচ্ছিলো, সামির চলে যাবে… এটা ভেবে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমি সামিরকে বললাম “থেকে গেলে হয়না?” সামির বলল, “থাকা যাবে কিন্তু বাসায় যে আদর একা, “আম্মুকে তবে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে”
আমি বললাম, “তবে খালাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে তুই আবার চলে আয়” সামির বলল,
-তুইও আমার সাথে চল, আমাদের বাসা থেকে ঘুরে আসবি।
সামিরদের বাসায় পৌছতে পৌছতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল, সামিরের ছোট ভাই আদর দরজা খুলে দিল। বাসায় ঢুকে সামির আমাকে সাথে নিয়ে ওর থাকার রুম, বারান্দা, ছাদ সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলো। সব কিছু দেখিয়ে টায়ার্ড হয়ে যখন সামির ক্ষান্ত দিল তখন আমার মনে হলো ওর হয়ত দেখানোর মত আর কিছু বাকি নেই। খালা আমাদের জন্য হালকা নাস্তা তৈরি করে দিলেন, আমরা খেয়ে আবার মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লাম। তখন মোটামুটি সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে, দুজনে রিকশায় করে ফিরছি, সামির আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল “আজ কি পূর্ণিমা?” আমি এতক্ষণে খেয়াল করলাম পূর্ব আকাশে বিশাল একটা রুপালি চাঁদ। আমি ভালো করে দেখে বললাম, “আজ নাহ, মনে হয় কাল ফুল মুন… চাঁদের একপাশে এখনো একটু কম আছে”। সামির কিছুক্ষন চাঁদের দিকে আবার কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কি ভাবলো কে জানে।

ফিরে আসতে আসতে আমাদের রাত হয়ে গেল, আমি ফ্রেস হয়ে বারান্দায় এসে বসলাম, দেখি বাইরে ঝকঝকে চাঁদের আলো, আমি উঠানে নেমে এলাম, চাঁদের আলোয় একা একা হাঁটা আমার পুরনো অভ্যাস, হাটতে হাটতে বাড়ির বাইরের দিকে চলে এসেছি হঠাৎ পেছনে আওয়াজ শুনে ঘুরে তাকিয়ে দেখি সামির, বলল “কি ব্যাপার একা একা চাঁদের আলোয় হাটছিস কেন, ভুতে ধরবে তো”
-আমার চাঁদের আলোয় একা একা হাটতে ভালো লাগে
-আমার লাগে না। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
-তুই খুবই আনরোম্যান্টিক তো তাই
-আমি না, তুমি আনরোম্যান্টিক। একা একা হাঁটার মাঝে রোমান্টিসিজমের কি আছে রে, আমিও হাটতে চাই তবে সেটা একা নয়, কারো হাত ধরে…
সামিরের গভীর কণ্ঠে বলা কথা গুলো শুনে আমি একটু অবাক হলাম, ওর দিকে চেয়ে দেখি ও এক দৃষ্টিতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে, চাঁদের আলোয় ওর চোখ গুলো জ্বলজ্বল করছিল, আমি বললাম “চল, বাইরে থেকে হেটে আসি”। সামির বলল,
-মামী এখনি খাওয়ার জন্য খুজবে, খেয়ে তারপর যাব।
-আচ্ছা
এখানে এসে এই হল আরেক ঝামেলা, অল্প রাতেই ডিনার করে ফেলতে হয়, পরে মাঝ রাতে ক্ষুধা লাগে। ঠিকই মামী একটু পরই খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি শুরু করলেন। আমরা গিয়ে খেয়ে নিলাম। তারপর দুজনে আবার বেড়িয়ে পড়লাম, গ্রামের মাঝ দিয়ে একেবেকে চলে যাওয়া একটা মেঠো পথ ধরে আমরা হাঁটছিলাম, আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, জোছনা যেন উপচে উপচে পরছে, রাস্তার দুপাশে ঘাসের ওপর নিয়নের আলোর মত জোনাকির আলো জলছে, সামির কয়েকটা জোনাকি এনে আমার হাতে দিল, আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে আশেপাশে চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম, প্রকৃতির এমন সুন্দর রুপ এই প্রথম দেখলাম। সামির পাশে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে হাঁটছিল, আমি বললাম “গানটা একটু জোরে গাইলে হয়না” সামির বলল, “আমি গান গাইতে পারি না”
-চাপা মারিস কেন, ছোটবেলায় ওই প্রাইজ গুলো কি এমনি পেয়েছিস? সামির অবাক…
-তোকে কে বলল?
-তোর বাসায় ছোটবেলার পুরনো ছবিতে দেখেছি, আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডির ভালো কালেকশন দেখলাম।
-হুম… ছোটবেলায় গান শিখতাম, ক্লাস সিক্সে উঠে পড়াশোনার চাপে বাদ দিয়েছি, সিডির কালেকশন আম্মুর, আম্মুর আগ্রহেই গান শিখেছিলাম।
-একটা গান শোনা
সামির হো হো করে হেসে উঠলো, “মাফ চাই, অনেক দিন ধরে প্র্যাকটিস নাই, তুই গান শুনে হাসবি”
-আরে নাহ, গা তো…
-উহু… নাহ
-কিন্তু আমার যে এই মুহূর্তে গান শুনতে খুব ইচ্ছে করছে
সামিরের চোখে আবার সেই অদ্ভুত মায়াময় দৃষ্টি… চুপ করে আছে। আমিও কিছু না বলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ সামিরের কণ্ঠে যেন জোছনা ঝরতে লাগলো…
যদি জানতেম, আমার কিসের ব্যথা তোমায় জানাতাম… যদি জানতেম
কে যে আমায় কাঁদায়, কে.. যে.. আমায় কাঁদায়…
আমি কী জানি তার নাম… যদি জানতেম
কোথায় যে হাত বাড়াই মিছে, ফিরি আমি কাহার পিছে
সব যেন মোর বিকিয়েছে, পাই নি তাহার দাম।
এই বেদনার ধন সে কোথায় ভাবি জনম ধরে
ভুবন ভরে আছে যেন, পাই নে জীবন ভরে।
সুখ যারে কয় সকল জনে বাজাই তারে ক্ষণে ক্ষণে
গভীর সুরে “চাই নে” “চাই নে” বাজে অবিশ্রাম।
যদি জানতেম, আমার কিসের ব্যথা তোমায় জানাতাম……
গান শুনতে শুনতে বিস্ময়ের ঘোর কাটছিল না, ও গান গাইতে জানে জানতাম কিন্তু তাই বলে এত সুন্দর গলা! এই গানটা হয়ত আগেও দুএকবার শুনেছি মনে ধরেনি কিন্তু আজ এটা কি শুনলাম! হঠাৎ সেই অচিন মানুষটাকে খুব চিনতে ইচ্ছে করছে, লুকোনো ব্যথা নিয়ে জীবনের ১৮টি বসন্ত ধরে যার অপেক্ষায় আছি, অচেনা পরিবেশে নীলচে চাঁদের আলোয় সামিরের গানের কথা গুলো মনের গভীর কোণে কেমন যেন ব্যথার মত বাজলো…
গান শেষ হতে আমি বললাম, “তোর গানের গলা কিন্তু খুবই সুন্দর, তোর গান ছাড়া ঠিক হয় নি”
– তাই?… একটা কথা বলি, আরমান… তোর চোখ গুলো কিন্তু খুব সুন্দর। আমি শুনেই হাহ হাহ করে হেসে বললাম,
-আরে বাহ, তুই যে ছেলেদের চোখেও সৌন্দর্য খুজিস, হাহ হাহ হাহ… সামির কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল, একটু চুপ থেকে আবার বলল,
-আরমান…
-হুম
-আমার এই গানটা কি ছেলে ছিল নাকি মেয়ে? সামিরের প্রশ্নে আমি একটু থেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-কি আজব! গানের আবার ছেলে মেয়ে হয় নাকি।
-সেটাই তো কথা, যখন আমাদের কিছু ভাল লাগে তখন সেটা ছেলে কি মেয়ে তার ওপর নির্ভর করে না, এমনি ভাল লেগে যায়।
-কি জানি, কিন্তু তোর কথা মত দেখছি আমার ছেলে বা মেয়ে যে কাউকেই ভালোলেগে যেতে পারে
-হুম পারে, যখন কিছু ভাললাগে তখন সেটা ছেলে মেয়ের ওপর নির্ভর করে না, ভালোলাগা এমনি…
-যত্ত সব আজগুবি কথা, আচ্ছা তুই যে কাল বলেছিলি তুই যেন কার হাত ধরে হাটতে চাস, সে কেরে?
-আছে একজন
-তার মানে তোর সামওয়ান স্পেশাল আছে, আমার পোড়া কপাল। আমি ফোঁস দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম…
-নারে, আমি তাকে চিনি কিন্তু সে আমাকে চেনে না।
-বলিস কি! তাকে এখনো কিছু জানাস নি?
-বলে দিলে সে যদি আমাকে ফিরিয়ে দেয়
-মনে হচ্ছে তুই তার ব্যপারে অনেক বেশি সিরিয়াস, তাকে অন্তত এটা জানানো উচিৎ
-আমার এই ভাললাগায় অনেক বড় একটা কিন্তু আছে যে দোস্ত
-সেটা কি, মেয়েটা কি হিন্দু নাকি তোর চেয়ে বয়সে বড়?
-ধুর… বাদ দে তো। তুই বুঝবি না, তুই যদি বুঝতি… বলে থেমে গিয়ে সামির আবারো সেই স্বভাবসুলভ দৃষ্টিতে তাকালো।
আমি বললাম, “দেখ সামির, আমাদের জীবনটা খুবই ছোট, এই অল্প সময়ের জীবনে ভালোবাসা যদি ধরা দেয় তবে আর সময় নষ্ট করা ঠিক না” সামিরের চোখ গুলো জোছনার আলোতে হঠাৎ আমার কাছে বৃষ্টি ভেজা জানালার গ্লাসের মত মনে হলো, কেমন যেন ভেজা… উজ্জ্বল…… আমি ওর ভেজা চোখের দিকে ভালো করে তাকাতেই ও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল, বুঝলাম ও সিরিয়াসলি কাউকে ভালোবেসে ফেলেছে, আর যাকে ভালবাসে সে নিঃসন্দেহে খুবই সৌভাগ্যবান।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর আমি সামির আর নয়ন আমরা তিনজন একটা বড় খাটে এক সাথে শুয়ে পরলাম, সারাদিনের ক্লান্তিতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল, তিনজনেই টুকটাক গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি টের পাই নি।
মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল কেন বুঝলাম না, এমনিতেই কোন নতুন জায়গায় আমার ঘুম ভালো হয় না। ঘুম ভাংতেই অনুভব করলাম আমার হাতে কারো হাত, অন্ধকারে ব্যপারটা ধরতে একটু সময় লাগলো যে এটা সামির!!! রাতে সামির আমার ডান পাশে শুয়েছিল। আমি কিছু বললাম না, সামির ওর হাতের মুঠোয় আমার হাত ধরে আছে, একবার আমার হাতটা তুলে ওর গালে সাথে আলতো করে চেপে ধরে রেখে আবার আস্তে করে নামিয়ে রাখলো, ওর হাতের গালের উষ্ণতা আমার হাতে অন্য রকম অনুভূতি তৈরি করছিল… প্রত্যেকটা স্পর্শে আলাদা শিহরন… জানি না কেন ইচ্ছে হলো আমিও ওকে একটু ছুয়ে দেই… আমারও ওর হাতটা খুব চেপে ধরতে ইচ্ছে করলো, আমি হাত মুঠো করতেই ও হুট করে হাতটা ছেড়ে দিয়ে ঘুরে সরে গেল, হয়ত আমি জেগে যাচ্ছি ভেবেছে সরে গেছে, আমি চুপ করে শুয়ে থাকলাম, জানিনা হঠাৎ কোথা থেকে একটা অন্যরকম ভালোলাগা এসে আমাকে গ্রাস করে নিল।
কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিলাম জানি না, সকালে নয়নের ডাকাডাকি তে ঘুম ভাংলো। পাশে তাকিয়ে দেখি সামির নেই, আমার দৃষ্টি কি নয়নের কাছে অন্য রকম লাগলো কিনা জানি না নয়ন বলল “সামির ভাইয়া বাসায় গেছে, আবার একটুপরই চলে আসবে। সামিরের রেখে যাওয়া শূন্য বিছানা বালিশের দিকে তাকাতেই মুহূর্তের জন্য আমার শূন্যে ভাসার অনুভূতি হল, বুঝলাম না কেন আজ ঘুম থেকে উঠে সামিরকে দেখতে এত ইচ্ছে করছে।
আমি উঠে ফ্রেস হয়ে নাস্তা সেরে নিলাম, বাইরে গিয়ে দেখি রান্না-বান্না শুরু হয়ে গেছে। অনেক মানুষের আয়োজন হচ্ছে, দুরের মেহমানরা অনেকেই এর মধ্যে চলে এসেছে, ভাইয়াকেও দেখলাম। বারান্দায় এসে দাড়িয়ে দাড়িয়ে একমনে অচেনা মানুষদের আসা যাওয়া দেখছিলাম… হঠাৎ বুঝতে পারলাম অবচেতন মনে আমি এখানে দাড়িয়ে আসলে সামিরের জন্যই অপেক্ষা করছি… অচেনা মানুষের ভীরে আমি একজন চেনা মানুষকে খুঁজছি… অচেনা চোখের ভীরে খুঁজে ফিরছি শুধুই এক জোড়া চোখ। নিজেকে নিজের কাছে খুব অপরিচিত লাগলো, আমার অনুভূতিগুলো আমার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে… ক্রমশ বদলে যাচ্ছে আমারই অজান্তে।
সামির এলো ১১টার দিকে, আমি সামিরকে দেখে ভেতরে চলে এলাম, সামির একটা অফহোয়াইট পাঞ্জাবি পরে এসেছে, সাথে আন্টি আর আদর। আমি রুমের জানালা থেকে দেখছিলাম সামির উঠানে ঢুকেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, নয়নকে ডেকে কি যেন জিজ্ঞেস করলো, নয়ন এই ঘরের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখাতেই বুঝলাম সামির আমাকে খুজছে। সামির তৃষ্ণার্ত চোখে আমাকে খুঁজছে… কেউ কি আমাকে বলতে পারবে সামিরের চোখের ওই তৃষ্ণাটুকু আমার এতো এতো ভালো লাগছে কেন? কেন ইচ্ছে করছে ঠিক এই মুহূর্তে হারিয়ে যেতে, যেন সামির ওই তৃষ্ণার্ত চোখের পিপাসা অনন্তকাল আমার জন্যই ধরে রাখে।
সামির ঘরে এসে আমাকে দেখেই হাসলো, আমি বললাম “চোরের মত চলে গেলি কেন”
-তুই অমন করে ঘুমোচ্ছিস দেখে আর ডাকলাম না, শুধু তো যাব আর আসবো
-তোর পাঞ্জাবিটা খুব সুন্দর
-সুন্দর চোখে সবই সুন্দর, বলেই হেহ হেহ করে হাসতে লাগলো।
-কই… তোকে তো একটুও সুন্দর লাগছে না।
কথাটা একটু গম্ভীর কণ্ঠে বলে আমি নিজের অনুভুতির রাশটা টেনে ধরতে চাইলাম, সামির আমার কথা শুনে চুপ হয়ে গেল।
দুপুরের মধ্যে মেহমানে বাড়ি ভরে গেল, মিলাদের পর আমরা দুজনেই সবার সাথে মেহমানদের খাওয়া-দাওয়ায় সাহায্য করলাম, নিজেরাও খেয়ে নিলাম। খাওয়া দাওয়ার এক ফাকে আম্মার সাথে দেখা হতেই বলে দিলেন আমি যেন দূরে কোথাও না যাই, আমরা বিকেলেই ভাইয়ার সাথে বাসায় চলে যাচ্ছি। আমার মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত হল। সামিরকে বলতেই মুখ কালো করে বলল, “আমি বললে কি খালা শুনবে? আমি বললাম “নাহ, ভাইয়া আছে সাথে” সামির আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে যেন আমার চোখ থেকে মনের কথা গুলো পড়ে নিতে চাইলো, বলল “তুই যা, দেখি কি করতে পারি”।
আমি বিরস মুখে আম্মা আর ভাইয়ার সাথে ঘরে বসে আছি তখন সামির আর ওর আম্মু আসলো, খালা আম্মুকে বলল কাল ওরাও ঢাকায় ব্যাক করবে, আমি যেন আজ ওদের বাসায় থেকে কাল একসাথে যাই, আম্মা খালার কথায় রাজি হয়ে গেলেন।
বিকেলে আম্মা আর ভাইয়াকে বিদায় দিয়ে আমি সামিরদের সাথে ওদের বাসায় চলে এলাম। তখন সূর্য প্রায় ডোবে ডোবে, সামির আমাকে নিয়ে সোজা ছাদে চলে এলো, আমরা ছাদের পাশে দাড়িয়ে শেষ বিকেলের আলো আধারের খেলা দেখছিলাম। ওদের বাসার কাছে ছোট্ট একটা খাল তাতে ছোট ছোট নৌকা চলে, চারপাশের পরিবেশ খুবই মুগ্ধকর, অন্ধকার নামতেই আমরা নিচে নেমে এলাম, খালা আমাদের জন্য নুডুলস রান্না করে দিলেন। একটুপর আমরা আবার ছাদে চলে এলাম।
আকাশে রুপালি চাঁদ, চাঁদ থেকে যেন জোছনা টুপ টুপ করে ঝরে পরছে, আশেপাশের সব কিছুই এত অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল, আমি ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাড়িয়ে আছি, সামির পিছনে এসে দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরার মত করে হাত বাড়িয়েও কি ভেবে যেন হাত সরিয়ে নিল, কেন জানি আমার হঠাৎ সব কিছুই প্রচণ্ড এলোমেলো লাগলো… আমারও ইচ্ছে করলো কাউকে জড়িয়ে ধরতে… জীবনের এই একাকীত্বের বোঝা আমি আর টানতে পারছিনা… প্রচণ্ড তৃষ্ণা পাচ্ছে… একটা হাত ধরার তৃষ্ণা, কাল রাতে যে হাতটা ধরতে পারিনি একবারের জন্য হলেও সে হাতটা ধরতে ইচ্ছে করছে… আগে পিছে কিছু ভাবতে চাইনা কে কি ভাববে জানতে চাইনা আমি শুধু ওর ওই হাতের আঙ্গুলের ভাঁজে আমার হাতটা রাখতে চাই।
সামির তখন পাশে দাড়িয়ে এক মনে আকাশের দেখছিল, আমি বললাম
-সামির
-হুম
-কাল তুই বলেছিলি না তুই কারো হাত ধরে হাটতে চাস…
সামির কিছু না বলে আমার দিকে তাকালো।
আমি কিভাবে বলবো বুঝতে পারছিলাম না, মাথায় অজস্র শব্দের ঝর বয়ে যাচ্ছে কিন্তু মুখে একটাও আসছে না। আমি চোখ বন্ধ করে বললাম,
-সামির… আমি তোর হাত ধরে জোছনায় হাটতে চাই, আমাকে সাথে নিবি?…
সামির একটু চুপ করে থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরল, আমিও হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিলাম, দুজনে দুজনের আলিঙ্গনে বাঁধা পরে গেলাম, আমার গালে কয়েক ফোঁটা জল এসে লাগতেই খেয়াল করলাম সামির ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি বললাম, “হেই বোকা, কাঁদছিস কেন” সামির হাতের উলটো পিঠে চোখ মুছে বলল,
-আরমান
-হুম
-জানি আমাদের এই ভাললাগা বাইরের পৃথিবীতে অনেক বেশি বেমানান, যতই ঝর আসুক তুই আমার পাশে সারাজীবন থাকবি, প্লিজ…. আমি আর একা হয়ে হয়ে যেতে চাইনা।
আমি সামিরের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বললাম,
-তুই আমার হাতটা অনেক শক্ত করে ধরে থাকতে পারবি? যেন আমি কখনোই তোর থেকে হারিয়ে না যাই… আমিও আর একা হয়ে যেতে চাইনা, কখনোই না।
আমি অনুভব করলাম সামির আমার হাতটা প্রাণপণে চেপে ধরেছে…
আমি হেসে ফেলে বললাম
-আরে বোকা তুই তো আমার হাতটাই ভেঙ্গে ফেলবি
সামির হেসে বলল…
-আচ্ছা শোন, কাল সকালেই তো আমরা চলে যাচ্ছি, তুই কি সন্ধ্যার দিকে একবার নিকুঞ্জ আসতে পারবি?
-কেন?
সামিরের চোখে মুখে রক্তিম আভা… মৃদুস্বরে বলল,
-তোর সাথে রিকশায় ঘুরবো
আমি হাসলাম, বললাম “নাহ, কাল সম্ভব না”
-পরশুদিন???
-মনে হয় নাহ…
এবার সামিরের চোখের কোনে মেঘ…
-তবে পারবি কবে?
আমি হেসে মৃদুস্বরে বললাম,
-আমার যে এখনি রিকশায় করে ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করছে
আমার কথা শুনে সামিরের মুখে যে আনন্দ আলোর ছটায় বয়ে গেল তার কাছে জোছনার আলোকেও ক্ষণিকের জন্য ম্লান মনে হলো… পরক্ষনেই আবার চিন্তার ছায়া, “কিন্তু আম্মু কিছুতেই এতো রাতে বাইরে যেতে দিবে না”
-খালাকে আমি ম্যনেজ করবো
খালাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে দুজনে বেড়িয়ে পড়লাম। একটা রিকশা খুঁজে উঠে পড়লাম, রাস্তায় লোকজন খুব কম। কিছুক্ষন চাঁদের আলো কিছুক্ষণ ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রিকশা এগিয়ে চলছে, সামির আমার হাত ধরে রাখলো, “আচ্ছা আরমান, তোকে প্রথমদিন দেখেই আমার অতো চেনা চেনা মনে হচ্ছিলো কেন বলতো?”
-হয়ত আমার মত দেখতে কাউকে তুই চিনিস
এই কথা শুনে সামির হাহ হাহ করে হেসে ওর হাতের তালুতে আমার মুখটা ধরে বলল,
-ধুর বোকা, তোর মত কেউ না… কেউ না। এই বলেই সামির ঝুঁকে ঠোঁট বাড়িয়ে দিল… জীবনে প্রথমবারের মত আমার ঠোঁটে কারো ঠোঁটের স্পর্শ পেলাম… নরম… উষ্ণ। মুহূর্তেই যেন একটা হাজার ভোল্টের ইলেকট্রিক শক খেলাম, মুভিতে এসব তো কতই দেখেছি কিন্তু মুভির সাথে বাস্তবের এত তফাৎ!! আমি সামিরের দিকে তাকিয়ে দেখি ওর চোখমুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেছে… সামির যদি জানত সামিরের এই রক্তিম আভা ভরা মুখটা দেখতে আমার কত ভালো লাগে। আমি ওর কাঁধে আস্তে করে মাথা রেখে ফিসফিস করে বললাম, “রিকশাওয়ালা মনে হয় আমাদের কথা শুনছে” সামির জোরে জোরে বলে উঠলো, “শুনলে শুনুক, তাতে আমাদের কি”
-তুই আসলেই একটা পাগল
-হুম… তোর জন্য
এবার দুজনেই শব্দ করে হেসে উঠলাম
বাসায় ফিরতে ফিরতে দেরী হয়ে গেল, এর মধ্যে দুবার খালা সামির কে কল দিয়েছে। ভয়ে ভয়ে বাসায় ঢুকলাম, সামিরকে রুমে পাঠিয়ে দিয়ে আমি সোজা খালার কাছে ডায়নিং-এ চলে আসলাম। একটা খাবার টেস্ট করে খালার রান্নার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলাম, মুহূর্তেই খালার মাথা ঠাণ্ডা, খালা ডিনার করার জন্য তাড়া দিলেন। আমরা ফ্রেস হয়ে খেতে বসলাম, খালা আর আদর আগেই খেয়ে ফেলেছে। শুধু আমরা দুজনেই খাওয়ার বাকি ছিলাম। আমরা খাচ্ছি… খালা খাবার দিয়ে কিচেনে সরে যেতেই সামির ভাত মেখে আমার মুখের সামনে তুলে ধরল, আমি দরজার দিকে একবার দেখে নিয়ে খেয়ে নিলাম, খালা এর মধ্যে দুএকবার এসে আর কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে গেলেন, খালার আসা যাওয়ার ফাঁকে ফাঁকেই সামির আমার মুখে ভাত তুলে দিচ্ছিলো। আমিও ওর মুখে খাবার তুলে দিলাম, খাওয়ার প্রায় শেষ দিকে আমার হাত থেকে খাবার খেতে গিয়ে সামির ইচ্ছে করে আমার আঙ্গুলে কামর দিল।
আমি উহ করে উঠতেই সামির হাহ হাহ করে হাসতে লাগলো, খালা পাশের রুম থেকে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে রে?
সামির হাসতে হাসতে বলল, “আরমানের গলায় কাটা আকটে গিয়েছিল, নেমে গেছে”
আমি রাগ দেখিয়ে বললাম “দাঁত কেলানো বন্ধ কর, এর মজাটা পরে টের পাবি”
সামির আমার রাগ দেখে পারলে বত্রিশ দাঁত বের করে হাসতে লাগলো, আমি সম্মোহিত দৃষ্টিতে সেই হাসির দিকে চেয়ে থাকলাম। ভাগ্যিস কেউ জানে না… ওই হাসিতে আমার পৃথিবী কেমন দোলায় দোলে।
আমরা খেয়ে ছাদে চলে এলাম, ভরা জোছনায় পুরো ছাদ দিনের মত ঝলমল করছে, সামির আমার হাতে একটা পাটি ধরিয়ে দিয়ে বলল, “পাটিটা বিছা, আমি কফি নিয়ে আসছি” আমি পাটিটা বিছিয়ে বসলাম, সামির দুহাতে দুটা কফির মগ নিয়ে হাজির, পাশে এসে বসে একটা মগ আমাকে এগিয়ে দিয়ে নিজের মগে চুমুক দিল, আমি ওর এগিয়ে দেয়া মগটা পাশে সরিয়ে রেখে দিলাম, সামির বলল, “কি ব্যপার কফি খাবি না? আমি নিজে তোর জন্য স্পেশাল ভাবে বানিয়েছি” আমি বললাম “হুম, খাবো” বলেই ওর চুমুক দেয়া মগটায় হাত বাড়ালাম, সামির মগটা আমার হাতে দিয়ে দিল, ওর চোখেমুখে আবার সেই রক্তিম আভা।
সকাল সকাল উঠতে হবে, তাই ছাদে বেশি রাত না করে নেমে পড়লাম… সামির বিছানা রেডি করে দিল, লাইট অফ করতেই বিস্ময়ে থ! দক্ষিণের জানালা দিয়ে জোছনার নীলচে আলো এসে ঘর আলোকিত করে দিচ্ছে, পুরো ঘরে রহস্যময় মায়াবী আলো, জানালার গ্লাসে পুরো চাঁদটাই দেখা যাচ্ছে, ঠিক এই মুহূর্তে যদি কোন উইস করার সুযোগ আসতো, আমি পৃথিবীটাকে ঠিক এই সময়ে স্থির করে দিতে চাইতাম, যেন চাঁদটা আমাদের জানালায় ওভাবেই থেমে থাকে… যখন আমার পাশে একই বালিশে মাথা রেখে শুয়ে আছে সামির। সামির হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে আমার বুকের ওপর মাথা রেখে বলল, “তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম মনে আছে?”
-কোনটা?
-তোকে প্রথমদেখায় কেন আমার এতো চেনা চেনা মনে হচ্ছিলো কেন।
আমি হাতের আঙ্গুলে সামিরের মাথার চুল গুলো এলোমেলো করে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলাম,
-কেন? সামিরের ফিসফিস কণ্ঠে বলা গানের গানের লাইন গুলো কানে এলো……
– “I’ve seen you in my dreams
and I wanna be with you forever
I need you, stay with me
Just touch my skin, Just take my soul… into hell”
আমি থেমে গেলাম, হাতের তালুতে ওর মুখটা তুলে ধরে চোখে চোখ রাখতেই মনে হলো এ যেন এক অনন্ত চোরাবালি, আমাকে আর কে ফেরায়… আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত সামিরের দিকে তৃষ্ণার্ত ঠোঁট বাড়িয়ে দিলাম… প্রথমে নিচের ঠোঁটে সামিরের দুঠোঁটের আলতো স্পর্শ পেলাম… তারপর আরও গভীরে…
অনেক সকালে এমনি এমনি ঘুম ভেঙ্গে গেল, চেয়ে দেখি সামির আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে… এমনিতেই দেখতে ইনোসেন্ট তার ওপর ঘুমন্ত মুখ, খুবই নিস্পাপ… সরল, এখনো ঠোঁটের কোনায় যেন রাতের সেই এক চিলতে হাসি। খুবই ভালো লাগছিল ওকে দেখতে, নরম লালচে ঠোঁট… বুকে হালকা হালকা পশম… সে পশমের অরণ্য থেকে একটা ঘাসের মেঠো পথ চলতে চলতে দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে… সে পথের গন্তব্যে তাকিয়ে হেসে ফেললাম। সামিরের ঘুম ভেঙ্গে গেল, একবার মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে আবার বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে বিরবির করে বলল, “কিরে একা একা হাসিস কেন”? আমি হাসতে হাসতেই বললাম, “নাহ, এমনি” সামির দুহাতে জড়িয়ে ধরে আমার বুকে ওর মুখ মিশিয়ে দিয়ে বলল,
-আরমান
-হুম
-এভাবেই আমাকে সারাজীবন থাকতে দিবি?
-এভাবেই থাকতে চাস?
-হুম… থাকতে দিবি?
-নাহ, তার আগে লুঙ্গিটা পরতে হবে। বলেই আমি হো হো করে হেসে উঠলাম
সামির এক ঝটকায় ওর কাঁথাটা টেনে নিয়ে বলল,
-মাত্র কয়েক মাস হলো মাত্র লুঙ্গি পরা শিখছি। আমি হাসছি… সামির কাঁথাটা জড়িয়ে লুঙ্গির সন্ধানে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে,
-কিরে, লুঙ্গি তো পাচ্ছিনা। আমার এবার হাহ হাহ করে হাসতে লাগলাম, বললাম “আমার দিকে বারবার ওভাবে তাকাস কেন, আমি কিছু জানিনা… আমি সারারাত ঘুমিয়েছি”
হঠাৎ বাইরে খালার ডাকাডাকির আওয়াজে চুপ হয়ে গেলাম, খালা আমাদের উঠে তাড়াতাড়ি নাস্তা করে নিতে বললেন, বাসের টাইম হয়ে যাচ্ছে, আমি খালাকে বললাম, আমরা উঠে গেছি। সামির লুঙ্গি পরে আমার কাছে এসে আলতো করে গলা চেপে ধরে বলল, “আমাকে বেকায়দায় দেখে খুব আনন্দ পাচ্ছিলি, নাহ? কোথায় বন্ধু হয়ে বন্ধুর ইজ্জত রক্ষা করবি তা না তাকিয়ে তাকিয়ে মজা লুটেছিস” আমি বললাম, যাহ তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে নে, নয়ত আজ সংবাদের শিরোনাম হয়ে যাবে “লুঙ্গি খুঁজতে খুঁজতে বাস মিস” বলেই আমি আবার হেসে দিলাম, সামির রাগ দেখিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
বাসে আমি আর সামির পাশাপাশি সামনে ছিল আন্টি আর আদর। পুরোটা পথ সামির আমার হাত ধরে থাকলো। বাস ভর্তি মানুষের মাঝে নিজেকে সংযত রাখতে যে অনেক কষ্ট হচ্ছিল সেটা সামিরের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, মাঝে মাঝে পায়ের ওপর পা দিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল। একটানা জার্নিতে একবার চোখটা একটু লেগে আসছিল ভাঙ্গা রাস্তার ঝাকুনিতে সেটা কেটে গেল, সামিরের দিকে চোখ পরতেই সামির মুখ ঘুরিয়ে বাইরের দিকে তাকালো, ক্ষণিকের জন্য ওর ভেজা চোখ গুলো ঠিকই আমার চোখে পরেছে, আমি হাতের মুঠোয় ওর হাতটায় আলতো করে চেপে ধরলাম, দেখলাম সামির বাইরের দিকে তাকিয়ে অন্য হাতে গোপনে চোখ মোছার চেষ্টা করছে।
আমি টঙ্গি কলেজ গেট নামবো। যখন প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি তখন সামির কে বললাম “এবার যে যেতে হবে” সামির কোন কথা না বলে ওর ব্যাগের দিকে হাত বাড়ালো, ব্যাগ থেকে একটা কাগজের প্যাকেট বের করে আমার হাতে দিল, আমি সেটার মুখটা খুলে উঁকি দিয়ে দেখি একটা উইন্ড চাইম, মনে পরলো এটা আমি সামিরের বারান্দায় ঝুলতে দেখেছিলাম, সামিরের বার্থডে তে ওর মামার দেয়া অনেক পছন্দের একটা গিফট। আমি বললাম “কিন্তু এটা তো…” আমার ঠোঁটে আঙ্গুল তুলে চুপ করিয়ে দিয়ে প্যাকেটের মুখটা বন্ধ করে দিল। আমি সেটা ব্যাগে ঢুকালাম, সামির একটা কথাও বলছেনা কেন বুঝলাম না। আমি উঠে আন্টির কাছ থেকে বিদায় নিলাম, আন্টি বাসায় যেতে বলল, সামির একটা শব্দও বলল না শুধু মৃদু হেসে হেন্ডশেক করে হাতটা ছেড়ে দেবার সময় একটু চেপে ধরে ছিল। ওর সব না বলা কথা যেন সেখানেই, আমি ওর ছলছল চোখের মৌনতার ভাষা গুলো এক পলকেই বুঝতে পারলাম। সময় কম, বাসটা থামতেই নেমে পরলাম।
নেমে হাটতে শুরু করেছি… বাসটাও চলতে শুরু করলো, বাসের জানালায় সামিরের দিকে তাকানোর সাহস হলো না, জানি পেছন থেকে যতক্ষণ দেখা যাবে সামির ততক্ষন তাকিয়ে থাকবে, তবুও আমি একবারও ঘুরে সেদিকে চাইলাম না… হয়ত সেটা সামিরের জন্য নয় আমার নিজের জন্যই… বাসার পথে হাঁটছি… কেমন যেন একটা দুঃখ-সুখ মেশানো অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে… টুকরো টুকরো সৃতি মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠছে… জীবনের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত গুলো… ম্যাসেজের টোনে ফোনটা হাতে নিলাম, সামিরের মেসেজ… ম্যাসেজ পড়ে হাসলাম, আস্ত পাগল একটা… মোবাইলটা পকেটে রেখে আবার হাঁটছি… মনের ভেতর হঠাৎ একটা ঝরের অস্তিত্ব টের পেলাম… যে ঝড়টা গোটা পৃথিবীটাকে ভেঙ্গে চুরে আমাকে সামিরের পথটা ধরে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে… পা গুলো পাথরের মতন ভারি মনে হলো, আর এক কদম সামনে এগোনোর শক্তিও পাচ্ছি না… পথের মাঝে হঠাৎ থমকে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম…

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১২ই অক্টোবর, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.