যে গল্পে ভালোবাসা নেই

লেখকঃ একলা পথিক

খণ্ডঃ এক,

কলিং বেলের সুইচটা মাত্র একবার সজোরে চাপতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে দিল ফয়সাল। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা ঘর্মাক্ত শ্রাবণকে দেখে চোখ-ভ্রু কুঁচকে মুখে একরাশ বিরক্তি ভাব নিয়ে তাকালো তার দিকে। আর বিরক্ত হবেই না বা কেন। আজকাল প্রায়শই যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে শ্রাবণের দেরি করে আসাটা যেন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। শ্রাবণ নিজেও যে ব্যাপারটা একেবারেই উপলব্ধি করতে পারেনা, তা কিন্তু নয়। তাই আজ শ্রাবণ নিজের প্রতি ফয়সালের কঠোর রুদ্রমূর্তি ধারণ করার পূর্বেই তার চোখের দিকে তাকিয়ে গালভরা হাসি দিয়ে হ্যাঁচকা টানে বুকের সাথে জড়িয়ে আলিঙ্গনে বেঁধে তার কানের কাছে ঠোঁট দুখানা ঘেঁষে দিয়ে একগাদা অজুহাত দাড় করিয়ে কোনরকমে পার পেলো। ফয়সালও প্রতিউত্তরে দ্বিতীয় কোন বাক্যব্যয়ের চেষ্টা করে বাদানুবাদে না জড়িয়ে শ্রাবণের একগাদা মিথ্যা অজুহাত হজম করলো। তাছাড়া কি আর করার আছে হাজার হলেও ছেলেবেলার বন্ধু বলে কথা। কিন্তু ফ্ল্যাটের ভেতরে প্রবেশ করতেই শ্রাবণ স্বচক্ষে যা দেখল তার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। কয়লা ধুইলেও যেমন ময়লা যায়না ঠিক তেমনি শ্রাবণের শতসহস্র নীতি-জ্ঞানের আদর্শ বাণীতেও যে ফয়সালের চরিত্র এতটুকু বদলায়নি সেটা চাক্ষুষ করে শ্রাবণের মেজাজ রীতিমত পারমাণবিক চুল্লীর উত্তপ্ত চিমনীর ন্যায় অগ্নিরুপ ধারণ করলো। ঘরভর্তি এলেমেলো দেশি-বিদেশী ব্র্যান্ডের বেশ কয়েকটা মদ-হুইস্কির অপূর্ণ ও অর্ধপূর্ণ বোতল, ছড়ানোছিটানো সিগারেট-ইয়াবার প্যাকেট আর রুমভর্তি ময়ময় করা অসহনীয় গাজার গন্ধে শ্রাবণের প্রায় নাভিশ্বাস উঠতে লাগলো। এটাও শ্রাবণের নিকট অতোটা বিরক্তির কারণ ছিলনা যতোটা বিরক্ত সে হয়েছিল ফয়সালের বিছানায় নগ্ন এবং পুরো উদোম শরীরে শুয়ে থাকা তার তথাকথিত কতিপয় তিন ফেসবুক বন্ধুদের দেখে। যাদের কারো সাথে তার নামমাত্র পূর্ব পরিচয় তো দূরের কথা এমনকি তাদের নাম পর্যন্তও শ্রাবণের নিকট অজানা । সে খেয়াল করে দেখল যে একজন তো তবুও গায়ে একটা কাঁথা টেনে ঘুমুচ্ছে , আর বাকি দুইজনের একজন কোনরকমে একটা অন্তর্বাস পরে আছেন আর আরেক মহাশয় তো পুরাই নগ্ন। শরীরে সামান্য সুতাটি পর্যন্তও নেই। আর সবগুলোই যে অপরিমাণ নেশা করে রাজ্যের ঘুমে বুদ হয়ে আছে এটা আর তার বুঝতে বাকি রইলো না। শ্রাবণ ভাবতে লাগলো সে নিজেও অসম্ভব রকমের বাজে চরিত্রের একটা ছেলে কিন্তু তাই বলে অবশ্যই ফয়সালের মতন এতোটা রুচিহিন আর মানসিক বিকারগ্রস্থদের মত নয়। ফয়সালের সীমাহীন নষ্টামি আর জ্বালাময়ী অপকর্মকাণ্ডে রেগেমেগে শ্রাবণ গভীর রাগান্বিত চোখে তার দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করতেই সে বলে উঠলো—

– দ্যাখ, শ্রাবণ! অমন বড়বড় চোখ কইরা আমার দিকে তাকাবি না কিন্তু। তোর এইসব ন্যাকামি দেখতে দেখতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এতো ভাবভঙ্গি না মারাইয়া পাশের রুমে “মাল(ছেলে)” ডা শুইয়া আছে, যা ওরে যাইয়া লাগাইয়া আয়। আমাগো সবার কাম শ্যাষ হইয়া গেছে। তুই তো কক্ষনোই টাইমমত আসবার পারোস না। তাই সারাজীবন তোর আইডা(এটো) জিনিসই খাইতে হইবো। তোর জন্যই মালডারে আটকাইয়া রাখছি। যা, জলদি গিয়া কইরা ঐটারে বিদায় কর।

~ মাল ! মাল আবার কেমন শব্দ ? তুই এইসব কি নোংরা ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজ করতেছিস ফয়সাল? নেশা করে তোর মাথাও পুরাই হ্যাং হয়ে গেছে নাকি। তোর রুমের একি অবস্থা আর ঐ ছেলেগুলোই বা কারা? আমাকে ওদের কথা আগে বলিস নি কেন? আগে বললে আমি কক্ষনোই তোর এখানে আসতাম না। (রেগে গিয়ে উচ্চস্বরে বলতে লাগলো শ্রাবণ)

– উহ রে! এতো শুদ্ধ ভাষায় কথা বলিস নাহ তো শ্রাবণ! অসহ্য লাগে। তোর মুখে এসব মানায় না কারণ তুই নিজেও যে দুধে ধোঁয়া তুলসী পাতা না সেটা আমিও ঢের ভালো করেই জানি। তাই যা করতে আইছোস জলদি তাই কইরা এইখান থেইকা ভাগ। আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। আর ওরা সবাই আমার খুব ভালো বন্ধু ওদেরকে নিয়ে তোর ভাবতে হবে না।

~ শোন! আমি তোর চেয়েও অনেক খারাপ সেটা আমি নিজেও মানি কিন্তু তোর মতন এতোটা রুচিহীন মানুষ আমি কখনোই ছিলাম না। আর তোর সাথে এসব নিয়ে ঝগড়া করার মতন কোন মুডই আমার এখন নাই । কারণ এখন তুই পুরাই একটা মাতাল। আর মাতালেরা আজেবাজে বকবক করবে এটাই স্বাভাবিক।

_ হা হা হা… হ্যাঁ রে বাপ, হইছে! তুই পারিস ও বটে। একটু মজা করলাম তোর সাথে। আর সবকিছুতে এত্ত সিরিয়াস হবার কি আছে। এইনে, আমি তোর কাছে কান ধইরা মাফ চাইতেছি। আমি একখান আস্ত মাতাল, হইলো । কিন্তু তুই জলদি গিয়া ঐ পোলারে বিদায় কর। আমি আর একমুহূর্তও এইভাবে দাড়ায়ে থাকতে পারতেছিনা, ঘুমে পইড়া যাইতেছি।
~ থাক ! আর ঢং করা লাগবে না। এখন গরু মেরে জুতা দান করা হচ্ছে তাই না ! তোর অপমান করতেও বাধে না আবার পিরিত করতেও সময় লাগে না।
_ হা হা হা… সরি বললাম তো ভাই। এ যাত্রায় মাফ কর না প্লিজ! এখন জলদি ঐ রুমে গিয়া পোলাটারে কিছু করতে চাইলে কর,নইলে বিদায় কর। একটু পরে বাসায় আব্বা-আম্মা চইলা আসলে কিন্তু ঝামেলায় পইড়া যামু। যা জলদি যা। (এই বলেই ফয়সাল শ্রাবণকে সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে পাশের রুমের ভেতোরে ঠেলে দিলো )

খণ্ডঃ দুই
দরজা জানালা বন্ধ ছোট্ট রুমটিতে মিটমিট করে সবুজ আভার একটা ডিম লাইট জ্বলছে। আলো-আঁধারের আবছা খেলায় সামনের বিছানাতে যে অজ্ঞাত কেউ একজন শুয়ে আছে সেটা অতি সহজেই শ্রাবণ অনুধাবন করতে পারলো। কিন্তু স্বীয় শয্যাটি আর কিছুক্ষণ বাদেই তার দীর্ঘবিরতির লোভাতুর যৌনপিপাসার কামুক আলোর পূর্ণ আলোকছটায় উদ্ভাসিত হতে যাচ্ছে ভেবেই সে মনে মনে আত্মতৃপ্তির ইয়া লম্বা ঢেঁকুর তুলতে লাগলো। তবে আজ কেন জানি অজানা কোন এক কারণে শ্রাবণের বুক কিছুটা দুরুদুরু করছে। হয়তো বিগত অনেকদিন যাবত সে এমন কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নাই সেটাও একটা কারণ হতে পারে। তাই নিঃশব্দ পায়ে ধীর গতিতে হেঁটে একদম বিছানা ঘেঁষে দাড়িয়ে ভাতঘুমে শুয়ে থাকা তরুণটিকে স্বচক্ষে উপভোগ করার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু বেরসিক ডিম লাইটের মৃদু আলোতে শ্রাবণের সে সাধ আর পূরণ হলো না। তাই অগত্যা রুমের ইলেকট্রিক বাতি জ্বালিয়ে আলো-আঁধারে সৃষ্ট রোম্যান্টিক নির্জনতা না ভেঙে পকেট থেকে মোবাইল বের করে টর্চলাইটের সাহায্য নেওয়াটাকেই তার নিকট পরিবেশের সহিত উপযুক্ত বলে মনে হল। কিন্তু টর্চলাইটের সুইচটা অন করে ঘুমন্ত তরুণটির মুখের উপর আলো নিক্ষেপ করতেই শ্রাবণের চোখ যেন ঝলসে উঠলো। তার কাছে এমন ঠেকতে লাগলো যেন এহেন অপূর্ব ও অদ্ভুত সুন্দর মায়াময় মুখ সে বহুকাল দেখেনি। কপালে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা এলোমেলো কেশ, কালো মেঘ রঙের চন্দ্রবক্র ভ্রুযুগল, তুলসীপাতার ন্যায় পাতলা চোখের পাতা, খোঁচাখোঁচা শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখাবয়ব আর চারিদিকে শ্মশ্রুদ্বারা পরিবেষ্টিত মুখবয়বের অভ্যন্তরে গোলাপের পাপড়ির ন্যায় উজ্জ্বল অধরদ্বয় নিমিষেই যেকাউকে ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট। যেন অচিন কোন রাজ্যের এক সাক্ষাৎ রাজপুত্র পথভুলে দিগ্বিদিক হয়ে একদল দৈত্যের কবলে পড়েছে আর দৈত্যদল তার মাথায় রুপোর কাঁঠি পায়ে সোনার কাঁঠি দিয়ে জোর নিদ্রায় মগ্ন করে রেখেছে। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই যার রূপের আভায় সারা অন্ধকার ম্লান হবার জোগাড় না জানি চোখ দুখানা মেলে তাকালে কি অবস্থা হবে সেটা ভেবেই শ্রাবণের হৃদস্পন্দন ক্রমান্বয়ে উচ্চতর থেকে অধিকতর উচ্চতর মাত্রায় উঠতে লাগলো। শ্রাবণ রাজপুত্রের নিদ্রাঘাত না করে তড়িৎ গতিতে টর্চের আলোকে মুখের উপর থেকে সরিয়ে কচ্ছপ গতিতে শরীরের উপর দিয়ে বুলাতে লাগলো। শ্রাবণ অবলোকন করলো পুরাই দিগম্বর দুধসাদা দেহখানা পা থেকে কোমর পর্যন্ত বাহারি নকশার একখানা পাতলা নকশী কাঁথা দ্বারা আবৃত আর নাভি হতে মস্তক পর্যন্ত অনাবৃত অবস্থায় রয়েছে। হৃদহননকারী মুখায়বয়ের ন্যায় অবশিষ্ট অনাবৃত অঙ্গটুকুও যেন কামদেবতাকে উত্তেজিত করার মত সমস্ত উপকরণে অলংকৃত। সফেদ মৃদু স্ফীত বুক সাথে বৃত্তাকার বাদামী বর্ণের তুলতুলে একজোড়া বক্ষের মাঝে রসালো কিসমিসের মতন গোলাকার দুইটি বক্ষবৃন্ত আর কোমরের ছয় ইঞ্চি উপরে অবস্থিত লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চেয়ে থাকা পদ্মফুলাকৃতি সম নাভি কামনার বিষে দংশিত হবার জন্য শ্রাবণকে যেন বারবার তাগিদ দিচ্ছিল। তাই শ্রাবণ আর কালক্ষেপণ না করে চটজলদি নিজেকে অনাবৃত করে লালসার বিষ আস্বাদন করার নিমিত্তে রাজপুত্রের শরীরের উপর নিজেকে আঁচড়ে ফেলার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত করলো। কিন্তু ঘুমন্ত রাজপুত্রের স্নিগ্ধ গোলাপি সিক্ত ঠোঁটে শ্রাবণের কম্পিত কামনার হাতের আলতো স্পর্শ লাগতেই রাজপুত্র খপ করে ভীষণ শক্তভাবে শ্রাবণের হাতখানা তার নিজের মুঠোয় পুরে নিলো। শ্রাবণ রাজপুত্রের অকস্মাৎ অচিন্তনীয় এহেন কর্মে ভীষণ ভীত সন্ত্রস্ত হল। কারণ প্রায় ঘুমে নিমগ্ন রাজপুত্রের আচমকা এমন আচরণ তাকে অতি মাত্রায় বিচলিত করলো তাই সে দ্রুত আরেক হাত দিয়ে জোর করে রাজপুত্রের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতে গেলেই রাজপুত্র কাঁপা কাঁপা গলায় ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলে উঠলো-

– প্লিজ ভাইয়া! আপনি আমাকে বাঁচান নইলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে । আমি আপনার কাছে হাত জোড় করে প্রাণভিক্ষা চাইছি দয়া করে আমাকে বাঁচান। এখান থেকে বাইরে নিয়ে চলুন। আপনার দোঁহাই লাগে। আমি আর সইতে পারছি না। এভাবে কিছুক্ষণ থাকলে আমি নিশ্চিত মারা যাবো। (বলতে বলতে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো)

~ আরে একি করছেন! শান্ত হউন! কে আপনি? কি হয়েছে আপনার? আমাকে ব্যাপারটা খুলে বলুন, প্রমিজ করছি আমি আপনাকে সাহায্য করবো ।

– প্লিজ! আমাকে বাঁচান! আমাকে বাঁচান! ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে ! অসম্ভব জ্বালাপোড়া করছে। সারা শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। আপনার কাছে আমি প্রাণভিক্ষা চাইছি আমাকে বাঁচান ভাইয়া আমাকে বাঁচান। ( কাঁদতে কাঁদতে সে আরো শক্ত করে শ্রাবণের হাতখানা তার বুকের সাথে জাপটে ধরলো )
~ আরে বললাম তো সাহায্য করবো। কেউ আপনার কিছু করতে পারবে না। আপনি আমাকে ভয় পাবেন না প্লিজ। আমাকে সব খুলে বলুন,কি হয়েছে আপনার? আর কে আপনি ?

~ সত্যি বলছেন তো ভাইয়া আপনি আমাকে এখান থেকে বাঁচাবেন ? কথা দেন ?

~ হ্যাঁ কথা দিলাম। একদম সত্যি ! আপনি আমার উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারেন। এখন বলুন দয়া করে, কি হয়েছে আপনার? আর কে আপনি ?

– আমি মেঘ ! ফয়সাল ভাইয়া আমার পূর্ব পরিচিত। তাই ওনার কথাতেই আমি আজ এখানে আসতে রাজি হয়েছিলাম কিন্ত………… ( বলতে বলতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললো মেঘ )

~ এই মেঘ! কি হলো আপনার ? এমন করছেন কেন ? কথা বলেন প্লিজ….?? ( অনেক চেষ্টা করেও শ্রাবণ মেঘকে কথা বলাতে অসমর্থ হল )

খণ্ডঃ তিন

উদ্ভূত অনাহূত পরিস্থিতিতে ভয়ে আতংকগ্রস্থ শ্রাবণ দ্রুতই রুমের বাতি জ্বালিয়ে মেঘের মাথা ও শরীর ধরে জোরে জোরে ঝাঁকাতে লাগলো। কিন্তু তাতেও কাজ না হলে গ্লাস থেকে পানি নিয়ে বার কয়েক ঝাঁপটা দিলো মেঘের চোখ-মুখ বরাবর অবশ্য এতেও মেঘের হুঁশ ফিরলো না। ঘটনার আকস্মিকতায় শ্রাবণ পুরাই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়লো। অবশেষে সে দৌড়ে গিয়ে পাশের রুমে অবস্থানরত ফয়সালের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হলো। কিন্তু ততক্ষণে নেশাগ্রস্থ ফয়সাল মাতালের মতন গভীর ঘুমে অচেতন। তাই শ্রাবণের হাজার চিৎকার-চেঁচামেচি এমনকি শরীর ধরে ধাক্কাধাক্কিও তাকে এতোটুকু জাগ্রত করতে সক্ষম হল না। অতপর আর কোন উপায়ন্তর না দেখে শ্রাবণ মনস্থির করলো যত দ্রুত সম্ভব মেঘকে হসপিটালে স্থানান্তর করতে হবে নইলে বড় ধরণের কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। কিন্তু প্রথমেই বিপত্তি ঘটলো পূর্ণনগ্ন মেঘের বিবস্ত্র শরীরে বস্ত্র প্রদান করাতে গিয়ে। বিছানার এক কোণে পড়ে থাকা মেঘের প্যান্টখানা হাতে নিয়ে শ্রাবণ কাঁথা দিয়ে মোড়ানো মেঘের নিম্ন অর্ধঅঙ্গ উন্মুক্ত করতেই ভয়ে শিউরে উঠলো। পুরো বিছানা যেন রক্তে সয়লাব। একসাথে এতোটা তাজা রক্ত একই জায়গায় পড়ে থাকতে সে আগে কখনো দেখেনি। মেঘের পায়েও ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে। শ্রাবণের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে কিছুক্ষণ আগেই মেঘের উপর দিয়ে কি পাশবিক নির্যাতনটাই না চালিয়েছে ফয়সাল ও তার ভাড়াটে ফেসবুক বন্ধুগুলো। নিশ্চয়ই ফয়সাল মেঘকে মিথ্যা বলে ভুলিয়েভালিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। মানুষও যে জানোয়ারের মত হিংস্র হতে পারে সেটা আজ শ্রাবণ হাড়েহাড়েই উপলব্ধি করতে লাগলো। আর নিজেকে এইসব মানুষরূপী কোন পশুর বন্ধু ভেবে সে নিজেই নিজেকে শত ধিক্কার দিতে লাগলো। চোখের সামনে রাজপুত্রের মত এমন টগবগে যুবকের অসহায় পরিণতি দেখে সে নিজের চোখকে সংবরণ করতে পারলো না। অতপর মারাত্মক গুরুতর কিছু ঘটবার পূর্বেই সে মেঘের সারা শরীর ভেজা কাপড় দ্বারা ভালো করে রক্ত মুছে পরিস্কার করে পোশাক পরিয়ে আড়কোলা করে তাকে নিয়ে হসপিটালের দিকে ছুটলো।

খণ্ডঃ চার

ঠিক ছয় মাস পরের ঘটনা………

কলিং বেলটা টংটং আওয়াজ তুলে বাজতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে দিলো মেঘ। দরজার সামনে দাড়িয়ে ঘেমে ভিজে একাকার শ্রাবণ।

– কি হলো ? এতো ঘেমে গেছো যে ? এত উত্তেজিত হয়ে আসার কি দরকার ছিল ? চেহারা দেখে মনে হচ্ছে যেন ট্রেন ধরতে পিছুপিছু ছুটছিলে আর একটু হলেই ট্রেন মিস করতে। ( মশকরা করে বলতে লাগলো মেঘ )

~ তুমি ডেকেছো আর আমি উত্তেজিত হয়ে আসবো না তাই কি হয় ? তুমি যে আমার কাছে ট্রেনের চেয়েও অতীব জরুরী বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটা ট্রেন মিস করলে না হয় পরের ট্রেন পাব কিন্তু তোমাকে যে আমি একবারের জন্যও হারাতে চাইনা মেঘ।

– উহ শ্রাবণ ! তুমি না পারোও বটে! একটু মশকরা করলাম আর ওমনি সিনেমার ডায়ালগ শুরু করে দিছো।

~ কি বললে মেঘ ? তোমার কাছে এইটা সিনেমার ডায়ালগ মনে হল ? তোমাকে আমি আর কিভাবে বিশ্বাস করাবো যে আমি তোমাকে আমার জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসি। আমাদের সম্পর্ক দেখতে দেখতে আজ ছয় মাস পূর্ণ হলো অথচ এখনো তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারলে না। তুমি বল, আমাকে কি পরীক্ষা দিতে হবে ?

– ছি ! শ্রাবণ এভাবে বলে না। আমি সত্যিই ফাজলামো করে বলেছি। তোমাকে অবিশ্বাস করার মত দুঃসাহস আমার নেই। তুমি আমাকে যে পরিস্থিতি থেকে বাঁচিয়ে এনে এতো সুন্দর একটা জীবন উপহার দিয়েছ এটা আমার পক্ষে কখনোই ভোলা সম্ভব নয়। তাছাড়া আমার জীবনের চরম বাজে কিছু ঘটনার সাক্ষী হয়েও তুমি আমাকে ভালোবেসেছো আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছ এতেই কি প্রমাণিত হয়না যে তুমি মানুষরূপী দেবতা বৈ অন্য কিছুই নও।

~ আমিও তোমাকে পেয়ে অনেক সুখি মেঘ। আমার ছন্নছাড়া নষ্ট জীবনের পরিসমাপ্তি হয়েছে তোমাকে পেয়ে। আমি তোমাকে নিয়েই বাকীটা জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। প্লিজ তুমি কখনোই আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি মেঘ অনেক ভালোবাসি।

– আমিও অনেক সুখি শ্রাবণ। আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আর তোমার মতন সৎ বিশ্বাসী কাউকে পেয়ে আমি নিজেও ভীষণ গর্বিত এবং ধন্য। সত্যি বলতে কি তুমি আমার কাছে আর সবার চাইতে একদম আলাদা। এইযে আমাদের সম্পর্ক ছয় মাস হয়ে গেলে অথচ তুমি আজ অবধি আমার শরীরের দিকে কখনোই কামনার দৃষ্টি নিক্ষেপ করনি। একেই হয়তো ভালোবাসা বলে যা আমি তোমাকে পেয়েই বুঝেছি। (বলতে বলতে মেঘের চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো)

~ আচ্ছা মেঘ! ঢের হয়েছে এইবার থামো । প্রেম আলাপ করতে করতে গলা শুঁকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। এই মেঘ! তুমি কি আমাকে এইভাবে দরজাতেই দাড় করিয়েই রাখবে। প্রথমবার তোমার বাসায় আসলাম একটু বসতেও দেবে না নাকি ? (শ্রাবণ মেঘকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে নিজ হাতে মেঘের চোখ থেকে জল মুছতে মুছতে কথাগুলো বলতে লাগলো)

– ওহ সরি! আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। এসো ভেতোরে এসো ।

ড্রয়িং রুমের সোফায় মেঘের কোলের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে শ্রাবণ আর মেঘ শ্রাবণের চুলের ভেতোরে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। হঠাৎ মেঘ খেয়াল করলো তার হাতের কোমল ছোঁয়ার স্নিগ্ধ আরামে শ্রাবণের চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আছে। যেন নিষ্পাপ এক শিশু তার কোলে পরম মমতায় ঘুমাচ্ছে। মেঘের নিজের উপর ভীষণ রাগ হল কেন সে এতদিন ভালোকরে কখনোই শ্রাবণকে খেয়াল করেনি যে শ্রাবণ আসলেই অদ্ভুত সুন্দর। ঘুমন্ত শ্রাবণ যেন আরো বেশি রহস্যময় ও যৌনাবেদনময়ী। এমন পরিস্থিতিতে মেঘ শ্রাবণের ভেজা লাল ঠোঁটে হালকা একটা চুমু খাওয়ার লোভ হতে নিজেকে সামলাইতে পারলো না। মেঘ ক্রমান্বয়ে নিচু হয়ে নিজের ঠোঁটের সাথে শ্রাবণের ঠোঁট স্পর্শ করতে গেলেই শ্রাবণ হাত দিয়ে মেঘকে থামিয়ে দিয়ে উঠে বসে পড়লো। অকস্মাৎ শ্রাবণ জেগে ওঠাতে মেঘ কিছুটা লজ্জা পেলে। কিন্তু তটস্থ ও কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শ্রাবণ বলে উঠলো-

~ মেঘ! তোমাকে একটা কথা বলবো বলবো করেও বলা হয়ে উঠেনি। কথাটা আমাদের দুজনের জন্যই ভীষণ সিরিয়াস বিশেষ করে আমার জন্য তো বটেই। আর আজ যেহেতু আমরা দুইজনেই এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি তাই আজকেই কথাটা আমি তোমাকে বলতে চাই। যদিও কথাটা তোমাকে আগেই বলা উচিৎ ছিল।

_ হুম ! কি এমন কথা যা আগে বলনি ? আচ্ছা বাদ দাও। বলা যখন হয়নি তাহলে আজকে না হয় থাক, পরেই বইলো। এতো সুন্দর একটা মুহূর্ত আমি অন্য কথা বলে নষ্ট করতে চাই না। প্লিজ কাল বইলো ? (কিছুটা আবদারের সুরেই বলল মেঘ)

~ না, মেঘ কথাটা বলার এখনি উপযুক্ত সময় তাই এক্ষনি বলতে চাচ্ছি। তাছাড়া না বলা পর্যন্ত নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছে। জানিনা তুমি বিষয়টা কীভাবে নিবা? তবে বল কথাটা শুনে আর যাইহোক তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো। কথা দাও। প্লিজ ?

– উহ। এতো ভণিতা করতে পারো তুমি জানা ছিল না। আচ্ছা ঠিক আছে কথা দিলাম। তুমি যখন শুনবেই না। তখন বল কি এমন সিরিয়াস কথা যা এক্ষনি বলতে হবে ?

~ হুম ধন্যবাদ। কথাটা আসলেই ভীষণ সিরিয়াস। সত্যটা হচ্ছে আমি কিন্তু পজিটিভ।

– পজিটিভ মানে কি ? কি পজিটিভ, শ্রাবণ ? কিছুই বুঝতেছিনা পাগলের তুমি কিসব বলছো ? প্লিজ খোলাসা করে বল তো ?

~ আমি পজিটিভ। মানে আমি H.I.V.+ (এইচ.আই.ভি.) পজিটিভ। বেশ কিছুদিন আগে আমার রক্তে HIV ভাইরাসের উপস্থিতি দেখা যায়। অর্থাৎ আমি একজন এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি। আমি ভীষণ দুঃখিত মেঘ তোমাকে কথাটা এতোটা কাল বিলম্ব করে বলার জন্য।

– বল কি শ্রাবণ ? তার মানে তুমি মারাত্মক ব্যধি এইডস এ আক্রান্ত একজন রোগী। ছি ছি ছি… শ্রাবণ! এতোটা সিরিয়াস একটা বিষয় তোমার আমাকে আগেই জানানো উচিৎ ছিল। কথাটা এভাবে এড়িয়ে গিয়ে তুমি আমার সাথে ছলনা করেছো। (মেঘ দ্রুত শ্রাবণের নিকট থেকে উঠে দূরে সরে গিয়ে ভীষণ রাগান্বিত কণ্ঠে বাক্যগুলি বলতে লাগলো )

~ সরি মেঘ। আসলে বলবো বলবো করেও বলতে পারিনি।তুমি কীভাবে নেবে সেইটা ভেবে। তোমাকে হারানোর ভয়ে। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি মেঘ। প্লিজ আমাকে ভুল বুঝনা। আমার পাশে থাকো। কখনো ছেড়ে যেওনা। আমি তোমাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই।

– রাখো তোমার সস্তা রোম্যান্টিক বক্তব্য। সরি!সরি আবার কীসের? সরি! বললেই সবকিছু মিটে যায় না শ্রাবণ। তোমাকে আমি প্রচণ্ড বিশ্বাস করতাম কিন্তু তোমার বিশ্বাসের মূল্য রাখনি। তুমি একটা প্রতারক। বিশ্বাস ভঙ্গকারী। শুরুতে বিষয়টা আমাকে জানালে আমি নিশ্চয় এইডস আক্রান্ত খারাপ চরিত্রের কোন ছেলের সাথে নিজেকে জড়াতাম না। কেন বলনি আমাকে, কেন ?? জবাব দাও ?(মেঘ রেগেমেগে অগ্নিমূর্তি হয়ে একের পর এক প্রশ্নবাণে শ্রাবণকে বিধ্বস্ত করতে লাগলো)

~ প্লিজ মেঘ এভাবে বলনা। আমার ভীষণ কষ্ট লাগছে। অন্তত আর কেউ আমাকে না বুঝুক তুমি আমাকে বুঝবা এই বিশ্বাস আমার আছে। দয়া করে আমাকে ফিরিয়ে দিও না। তোমার ভালোবাসায় আমাকে একটু আশ্রয় দাও। আমি তোমার কাছে হাতজোড় করে ভালোবাসা ভিক্ষা চাইছি। প্লিজ মেঘ আমাকে এভাবে দূরে ঠেলে দিও না। প্লিজ।

– দেখ শ্রাবণ। এইসব ফালতু সিনক্রিয়েট করে কোন লাভ নাই। তুমি একটা ভণ্ড মিথ্যুক চরিত্রহীন। যারতার সাথে নষ্টামি করে মরণ ব্যধি বাধিয়েছ আর আমার কাছে এসেছ ভালোবাসা ভিক্ষা চাইতে। এতো সহজ না। প্লিজ তুমি এক্ষনি আমার বাসা থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার সাথে কথা বলতেও ঘৃণা করছে। আজ হতে আমার সাথে তোমার সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ। আর কক্ষনো আমার সাথে দেখা করার চেষ্টা করবে না।

~ হা হা হা হা…… যাচ্ছি মেঘ। আমি চলে যাবো, থাকব না।তবে আজ আমার অবশিষ্ট বিশ্বাসটুকুও ভেস্তে গেলো। যদিও তোমার উপরে কখনোই আমার বিশ্বাস এতোটা দৃঢ় ছিল না। আমি আসলে দীর্ঘ ছয় মাস যাবত এইদিনটার অপেক্ষাতেই ছিলাম। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে আমাকে এমন একটি দিন উপহার দেবার জন্য।

– কি হলো পাগলের মত হাসছ কেন ? আর কি বলছ এইসব কি অপেক্ষায় ছিলে শুনী ? তবে যাই বল না কেন আমাকে কিন্তু তুমি আর পাবে না এইটা কনফার্ম। ভালোবাসা তো দূরের কথা কারণ আমি এখন তোমাকে ভীষণ ঘৃণা করি।

~ হা হা হা…কি বলছি একটু পরেই তুমি বুঝতে পারবে মেঘ। তবে শেষমেশ তোমাকে কিছু বলতে চাই। ভালোবাসা কাকে বলে তুমি সেটা জাননা, জানবেও না কোনদিন। আমি চরিত্রহীন নষ্ট ছেলে ছিলাম ঠিকই কিন্তু তোমাকে পাবার পর থেকে আমি শুধুই মনেপ্রাণে তোমাকেই ভালবেসেছিলাম। এবং কতোটা ভালবেসেছিলাম সেটাও একটু পরেই প্রমাণ করবো। আমি আসলে এতদিন তোমার পরীক্ষা নিচ্ছিলাম যে আদৌ তোমার হৃদয়ে সত্য ভালোবাসার অঙ্কুর আছে কিনা, কিন্তু আমার ধারণাটাই প্রতিষ্ঠিত হল । আজ আমি সত্য প্রমাণিত হলাম। আমি বিজয়ী হলাম। তুমি হেরে গেছো। আমার কাছে হেরেছো আর তুমি তোমার নিজের জীবনের কাছেও পরাজিত এক সৈনিক।

– কীসের সত্য ? কীসের বিজয়? আচ্ছা শ্রাবণ! আবোলতাবোল না বকে কি প্রমাণ দিবে দেখি ? আমার কি পরীক্ষা নিলে তুমি ?

~ এই খামটা ধরো। এর ভেতোরে একটা চিঠি আছে। চিঠিটা ভালোকরে পড়বে। তবে অবশ্যই আমি চলে যাবার পরে। যে প্রমাণ তুমি চাইছিলে সেটা এখানেই আছে। চিঠিটা পড়লেই বুঝবে কে বিজিত আর কে পরাজিত।( এই বলেই শ্রাবণ পকেট থেকে খামখানা বের করে মেঘের হাতে ধরিয়ে দিলো)

– আজিব এইসব কি ? এটা কীসের চিঠি ? কি লেখা আছে এতে ?

~ পড়ো মেঘ ভালো করে চিঠিটা পড়ো। তুমিতো অবুঝ নউ, পড়লেই বুঝতে পারবে। আমি চলে যাচ্ছি। জানিনা আর কোনদিনও তোমার সাথে দেখা হবে কিনা। অবশ্য দেখা হবার কোন প্রয়োজনও আর নাই তবে শেষ একটা কথা বলি, মানুষকে ভালোবাসো আর ভালবাসতে না পারলে তাকে অন্তত ঘৃণা করোনা। কারণ রোগ,শোঁক,হাসি,আনন্দ মিলিয়েই জীবন। জীবনে জরাব্যধি আসবেই আর এইসবের সাথে মোকাবেলা করেই বাঁচতে শিখতে হবে তবে সাথে যদি প্রিয় মানুষটি থাকে তাহলে সেই পথাচলা আরেকটু মসৃণ হয়। আরেকটা কথা আমি কিন্তু সত্যি তোমাকে অনেক ভালবেসেছিলাম। তবে এখন থেকে আর বাসি না। আচ্ছা চলি, তুমি ভালো থেকো অনেক শুভকামনা রইলো। (বলেই শ্রাবণ মেঘের বাসা হতে প্রস্থান করলো)

শ্রাবণের বিদায় মেঘকে এতোটুকুও আবেগাক্রান্ত করলো না। তবে শ্রাবণের বিদায়ী মুহূর্তের গুরুগম্ভীর নীতিবাক্যগুলো মেঘকে কিছুটা বিচলিত করলো। ভারাক্রান্ত মুখে সে অতিসত্বর খাম থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়তে শুরু করলো…

প্রিয় মেঘ,

প্রথমবারের মত তোমার উদ্দেশ্যে চিঠি লিখলাম এবং শেষবারের মত তোমাকে প্রিয় শব্দে সম্বোধন করলাম।তুমি হয়তো ভেবে অবাক হচ্ছ ঘটনা ঘটবার আগেই কীভাবে চিঠিটা আমি লিখলাম। হ্যাঁ আমি জ্যোতিষী কিংবা গণক নই তবে জানি এমন একটা দিন উদ্ভূত হবেই তাই আমি বেশ কিছুদিন আগেই চিঠিটা লিখে রেখেছিলাম। সে যাই হোক, তোমার হয়ত মনে নেই অবশ্য মনে থাকার কথাও নয় কারণ তুমি তখন অজ্ঞান অবস্থায় ছিলে। হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর প্রচুর রক্তক্ষরণ হবার ফলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তোমাকে জরুরী ভিত্তিতে রক্ত দেবার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু সৌভাগ্যবশত তোমার আর আমার রক্তের গ্রুপ মিলে যাওয়াতে আমার শরীর থেকেই তোমাকে রক্ত দেবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর তখনই আমার আর তোমার ব্লাডের ক্রস ম্যাচিং এর জন্য আমাদের দুইজনের রক্তের কতগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়। ঠিক তখনই আসলে ধরা পড়ে বিষয়টা।বিষয়টা নিদারুণ কষ্টের হলেও সত্য আর পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেই চরম কঠিন সত্যটাই আজ তোমাকে না বলে পারছি না। আসলে আমার রক্তে নয় তোমার রক্তেই এইচ.আই.ভি. ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। তাই আমি নয় তুমিই হচ্ছ HIV সংক্রমিত এইডস রোগী। তবে তখন তোমার মানসিক অবস্থা আর সুচিকিৎসার স্বার্থে পুরো বিষয়টা গোপন রাখা হয়।
প্রায় ছয় ঘণ্টা পরে তোমার জ্ঞান ফিরলে তুমি যখন আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে আমার উপর আস্থা ও ভরসার নিঃশ্বাস ফেলে কেঁদে দিয়েছিলে আসলে আমি নিজেও তখন আমাকে সামলাতে পারিনি। অতপর দুইদিন যাবত হসপিটালে তোমার নিবিড় সন্নিবেশে থাকাকালীন সময়ে এবং তোমার সেবা শুশ্রূষা করতে করতে আমি নিজেও যে কখন তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়লাম বুঝতেই পারিনি। তোমার কি এক অপূর্ব মায়াজালে আমি নিজেকে আবদ্ধ করতে লাগলাম যেন কোনভাবেই নিজেকে ছুটাতে পারছিলাম না। ছুটানোর চেষ্টাও করিনি। ধীরেধীরে তোমার কাছে গেলাম তোমার প্রেমে পড়লাম তোমাকে ভালোবেসে ফেললাম। তুমিও যেন আমাকে আপন করে নিতে লাগলে । ভাবলাম রোগ শোঁক জরা এসব কিছুই ভালোবাসার ঊর্ধ্বে নয়। তাই তো এতদিন যাবত তোমাকে আমি তোমার ভয়ংকর এই মরণব্যধি সম্পর্কে তোমাকে কিছুই অবগত করিনি। অবগত করতেও চাই নি। এটা জেনেও তোমাকে আমি ভালবেসেছিলাম। কিন্তু কেন জানি হুট করেই পেন্ডুলামের মত দোলায়মান বিষয়টা মস্তিষ্কে খেলে গেলো।আমি না হয় এতো বড় সত্য জেনেও গোপন করে তোমাকে ভালবাসলাম। তুমি হলে কি আদৌ আমাকে ভালোবাসতে, থাকতে আমার পাশে? তাই আমি একটু নাটকের আশ্রয় নিলাম এই আর কি। এমনিতেই সমপ্রেমি ভালোবাসা নিয়ে অনেক গালগল্প শোনা যায়। এরা নাকি শুধুই কামনা নির্ভর প্রেম ভালোবাসা করে, বাস্তবে এদের ভালোবাসা কখনো আজীবন টেকসই হয় না। সেই চিন্তা থেকেই তোমাকে একটু যাচাই করে দেখার শখ হলো। কিন্তু এ যেন কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরোবার মতন ঘটনার জন্ম তুমি দিলে। এককথায় খেলতে খেলতে খেলাঘর ধ্বংস করার ঘটনা চাক্ষুষ করার সৌভাগ্য আমার হলো। আমার সমস্ত বিশ্বাস আর ভালোবাসার উপাখ্যান শুরু করতে না করতেই উপসংহারে গিয়ে ঠেকলো। তুমিও আর সাধারণ পাচ-দশজন সমপ্রেমিদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারলে না। তোমাদের মতন ছেলেরা আজ এর কাছে তো কাল ওর কাছে ভালোবাসার খেলা খেলতে পছন্দ করো। আমরাই ভালো অন্তত কাউকে ভালোবাসার মিথ্যা কথা দিয়ে ঠকাই না। তাই এতোটা নিষ্ঠুর ভাবেই অনেকটা ইচ্ছে করেই তোমাকে চরম সত্য কথাগুলো লিখতে বাধ্য হলাম। আর এটাকে যদি তুমি তোমার অন্যায়ের প্রতি আমার প্রতিশোধ মনে কর তবে তাই। এর জন্য আমি মোটেও অনুতপ্ত নই।আসলে নিজের জীবনের সাথে ঘটে যাওয়া কিছু কিছু অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়া উচিত নইলে নিজেকে কাপুরুষ বলে মনে হয়। বরঞ্চ তোমার সাথে আমার বিচ্ছেদে আমি অনেক খুশী। কারণ তুমি আমার দুঃখকে ভালবাসতে চাও নি শুধুই সুখকে গ্রহণ করতে চেয়েছিলে আর এরকম স্বার্থান্বেষী মানুষ আর যাইহোক ভালোবাসার যোগ্য নয়।

আশা করি এতক্ষণ নিশ্চয়ই তুমি সব প্রমাণ পেয়ে গেছো। আর কথা বাড়াবো না। ভালো থেকো সুস্থ থেকো। নিজের প্রতি খেয়াল রেখো। আর আমাকে ভুলে যেও আমিও তোমাকে ভুলে যাবো। ভুলে যে যেতেই হবে। কারণ তোমাদের মত ছেলেরা হাজারজনের জীবনে শুধুই আসবে আর যাবে।তোমরা ভাগাড়ে ভালোবাসার ফুল ফোটাবে পাঁথরে ফুল ফোটানো আদৌ তোমাদের কর্ম নয়। তাই শ্রাবণ আজ থেকে মেঘশূন্য হয়েই বাঁচতে শিখবে। কালচে দস্যু মেঘে আকাশ ঢেকে থাকার চেয়েও শূন্য আকাশ অনেক বেশি নীলাভ বর্ণিল চকচকে। তাই আজ থেকে শ্রাবণের আকাশ সম্পূর্ণ মেঘমুক্ত।

ইতি
তোমার অপ্রিয়
শ্রাবণ

( বিঃদ্রঃ গল্পের প্রয়োজনে কিছু কিছু অশালীন শব্দ ও বাক্য প্রয়োগের জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। আশা করি সবাই বিষয়টি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর একটা কথা, গল্পের সমস্ত ঘটনা, স্থান ও চরিত্র সম্পূর্ণটাই কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোন মিল নাই। সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ। )

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৭ই অক্টোবর, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.