রুপা

লেখকঃ একলা পথিক

এক.

রহমতগঞ্জ রেলস্টেশন। বেশ ভোঁর তাই ষ্টেশন চত্বর মোটামুটি জনশূন্যই বলা চলে। চায়ের দোকানীর কাঁপ-চামচের আঘাতে সৃষ্ট সামান্য টুংটাং শব্দ আর স্টেশনে প্রিয়জনদের গ্রহণ করতে আসা গুটিকয়েক স্বজনের খোশগল্পের মৃদু আওয়াজ ছাড়া ভিক্ষুক-হকারদের উচ্চবাচ্য হীন সুনসান নীরবতাময় এমন স্টেশন চত্বর এতো ভোরবেলা ব্যতীত কল্পনাও করা যায় না।

রেলস্টেশনের ঠিক দক্ষিণ কোনের একটা বেঞ্চিতে বসে দূরের লম্বা গাছপালার ফাঁক গলে উঠতে থাকা ভোরের রক্তিম সূর্যের দিকে আনমনে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে পলাশ। সূর্যোদয়ের এমন অদ্ভুত অপূর্ব দৃশ্য তাকে যেন কিছুতেই আন্দোলিত করতে পারছে না। রাজ্যের ক্লান্তি, বিষণ্ণতা আর অসহায়ত্বের ছাপ তার চোখেমুখে স্পষ্ট। আসলে পূর্বরাতটাই যদি হয় পিতৃবিয়োগের মতন মারাত্মক বেদনা বিধুর ও হৃদয়বিদারক তবে তার অভিব্যক্তি তো সন্তানের চোখেমুখে ফুটে উঠবেই।

প্রায় ঘণ্টা তিনেক হয়ে গেলো পলাশ এভাবে একাকী স্টেশনে বসে আছে তবুও এখন অবধি ঢাকা থেকে রহমতগঞ্জ গামী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনটি আসার কোন হদিসই মিলছে না। কখন যে ট্রেন আসবে আর কখন সে তার ভালোবাসার প্রিয় মানুষটাকে এক নজর দেখবে তার জন্য পলাশের যেন আর তর সইছে না। কারণ সে ভালো করেই জানে তার মানসিক ও মানবিক বিপর্যয়ের চরম সংকটময় এই মুহূর্তে কেবলমাত্র রজতের মায়াভরা মুখখানা দর্শন করাটাই তার জন্য এক ও অদ্বিতীয় সান্ত্বনা হতে পারে।

পিতা হারানোর মত বজ্র কঠোর শোঁককে শক্তিতে রূপান্তরিত করার একমাত্র পথ্যই হতে পারে রজতের বুকের সাথে নিজেকে শক্ত করে জাপটে ধরে কিছুক্ষণ পরম প্রশান্তি অনুভব করা। তাই রাতের অক্লান্ত পরিশ্রম, বাবা হারানোর সীমাহীন বেদনা আর স্বামী হারানো সদ্য বিধবা মায়ের বুকফাটা আর্তনাদকে পাঁশ কাঁটিয়ে হলেও পলাশ সশরীরেই স্টেশনে এসেছে রজতকে অভ্যর্থনা জানাতে।

রজত ও পলাশের পরিচয় হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালীন জীবনের একেবারে গোঁড়ার দিকেই। অতঃপর শরীরদ্বয় পৃথক কিন্তু প্রাণ,আত্মা ও সত্তা অভিন্ন- এই শপথ বাক্যের নীতিতে দুটি মনের আদানপ্রদান সেই পরিচয়ের সূত্রকে ভালোবাসার সমীকরণে রূপান্তরিত করে দীর্ঘ ছয় বছর যাবত একই ছাঁদের নিচে একজনকে আরেক জনের সহিত হৃদপ্রেম মেলবন্ধনের গভীর বাঁধনে আঁটকে রেখেছে। যেন অবাধ সেই প্রেম, সীমাহীন সেই ভালোবাসা। ওরা দুজনেই এখন পৃথক দুইটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসাবে কর্মরত।

কিছুদিন আগে পলাশের বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় পলাশকে মুমূর্ষু বাবার চিকিৎসা ও দেখভাল করার জন্য দিন দশেক পূর্বেই তাকে রহমতগঞ্জে নিজের বাস্তুভিটায় আসতে বাধ্য হতে হয়। অনেক চেষ্টা, তদবির, ডাক্তার, ওষুধ- দৌড়াদৌড়ি করেও বাবাকে শেষরক্ষা করতে পারলো না। জীবনের কাছে তিনি পরাস্ত হলেন। যদিও পলাশের বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়া মাত্রই রজত ঢাকা থেকে রহমতগঞ্জ গামী ট্রেন ধরেছিল কিন্তু পথিমধ্যে কোথায় যেন রেলের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় চার ঘণ্টার মতন যাত্রা বিরতি পড়ে যায়। যার ফলেই রজতের আসতে এতোটা কাল বিলম্ব হচ্ছে।

দুই.

আচমকা পলাশ তার কাঁধে কার হাতের যেন কোমল স্পর্শ অনুভব করলো। পেছন ফিরে তাকাতেই সে দেখতে পেলো বিমর্ষ ও মলিন মুখে রজত দাড়িয়ে। পলাশ মাত্রাতিরিক্ত বিস্মিত ও হতবাক হল এই ভেবে, সে এতোটাই বেশি আনমনা আর উদাসী হয়ে বেঞ্চিতে বসেছিল যে কখন ট্রেনটা এসে স্টেশনে পৌঁছেছে সে খেয়ালই করতে পারেনি। তাই রজতকে দেখামাত্রই পলাশ আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না। মুহূর্তের মধ্যেই তার বুকে আছড়ে পড়ে শিশুদের মত কাঁদতে লাগলো। রজত মুখ দিয়ে কোন বাক্যব্যয়ে পলাশকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা না করে তাকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলাতে লাগলো।

পরিবার থেকে খুবই আপন কেউ গত হলে বাড়ির পরিবেশ ঠিক কেমন হয় সেটা রজত পলাশদের বাড়ির সদর গেট ধরে বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেই ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারলো। কারণ পূর্বে সে যতবারই এ বাড়িতে এসেছিল আজকের মত এমন থমথমে আর পিনপতন নীরবতাময় পরিবেশ আগে কখনোই দেখেনি। ঘরে প্রবেশ করতে গিয়ে প্রথমেই রজতের চোখ পড়লো বারান্দার শেষ কর্নারে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকা ধবধবে সাদা শাড়ি পরিহিত কাকি মায়ের দিকে।

রজত আর পলাশের পরিচয়ের প্রথম থেকেই রজত পলাশের মা’কে কাকিমা বলেই সম্বোধন করে থাকে। রুগ্ন চেহারা,চোখের নিচে কালচে দাগ আর অসহায় মুখখানি দেখে যেন বিন্দুমাত্রও বোঝার উপায় নাই যে এই কাকিমাই কিনা আগে তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখলেই কতটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। অথচ আজকে তাকে খেয়াল পর্যন্ত করেনি। উদাস দৃষ্টিটিতে একনাগাড়ে আকাশ পানে তাকিয়ে প্রমাদ গুনছিলেন।

রজত ধীর পায়ে কাকি মায়ের কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে তাঁর পায়ে হাত ছোঁয়াতেই তিনি সংবিৎ ফিরে পেলেন। মলিন ও শুষ্ক ঠোঁটে কৃত্রিম মুচকি হাঁসি দিয়ে রজতের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। পলাশ তখন রজতের পাঁশেই নিশ্চুপ দাড়িয়ে ছিল। সৌজন্য আলাপচারিতা শেষ হতেই কাকিমা রজতকে নিয়ে খাবার টেবিলে যাবার জন্য পলাশকে আদেশ দিলেন। প্রলম্বিত যাত্রা পথের দীর্ঘ ভ্রমণ ক্লান্তি দূর করার জন্য তিনি রজতকেও গোসল সেরে আহার সম্পন্ন করে বিশ্রাম করার জন্য অনুরোধ করলেন।

তিন.

ডাইনিং রুমে ঢুকতেই রজত দেখতে পেলো অসাধারণ ও অদ্ভুত সুন্দরী একটি মেয়ে খাবার টেবিলে খাবার পরিবেশনায় ব্যস্ত। মেয়েদের প্রতি তার বিশেষ কোন অনুভূতি ও ভালোলাগা কাজ করে না বিধায় কতদিন যে কোন মেয়েকে এভাবে চোখের পলকের দেখাতেই এতোটা দারুণ লাগেনি সেটা সে নিজেও সঠিকভাবে হিসাব কষে বের করতে পারছে না। মেয়েটা খুবই সাধারণ কিন্তু ভিন্নরকমের কি একটা আকর্ষণ যেন তার মধ্যে বিদ্যমান। মেয়েটা চঞ্চল ভাবে রান্নাঘর থেকে একের পর এক বাহারি পদের খাবার আনছে আর ডাইনিং টেবিলে সুনিপুণ হাতে সাজিয়ে রাখছে। ভাবখানা এমন যেন দুনিয়ার সমস্ত প্রকার ও স্বাদের খাবার সে এই একবেলাতেই তাদের খাইয়ে ছাড়বে।

অদূরেই যে জলজ্যান্ত দুইটি মানুষ ঠায় দাড়িয়ে সেদিকে তার থোড়াই কেয়ার। তবে মেয়েটি যে পলাশদের বাড়ির নতুন সংযোজন সেটা বুঝতে রজতের মোটেও কাল বিলম্ব হল না। কিন্তু মেয়েটা আসলে কে ? এখানেই বা কি করছে ? আর সে পলাশের কেমন সম্পর্কের আত্মীয় ? এমন যাবতীয় সব প্রশ্নের ডালি রজতের মাথায় যেন লাটিমের ন্যায় ভনভন করে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর রজত যেই নতুন মেহমান সম্পর্কিত প্রশ্নের প্রশ্নবাণ ছুড়ে পলাশকে বিধ্বস্ত করতে উদ্যত হল ঠিক তখনি পলাশ নিজ থেকেই আগবাড়িয়ে মেয়েটির আগাগোড়া পরিচয় তার সামনে তুলে ধরল।

মেয়েটির নাম রুপা। পলাশের মায়ের দূরসম্পর্কের এক বোনের মেয়ে। আবাস পলাশদেরই গ্রামের ঠিক দু-চারটে গ্রামের পরেরই কোন এক নিভৃত পল্লীতে। স্থানীয় একটা কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছে। জন্ম থেকেই গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে উঠলেও হলেও চালচলন,সাজপোশাক, রুচিশীলতা এবং আধুনিকতায় শহুরে তরুণীদের চেয়েও ঢের বেশী বৈ কম নয়।

তবে চাকচিক্যে হাল-আমলের তথাকথিত ফ্যাশনবলে মেয়েদের মত উগ্রতার বাহুল্যতা একেবারে নেই বললেই চলে। স্বভাবে নম্র ভদ্র ও বুদ্ধিমতী শিক্ষিত মেয়েটিকে পলাশের মা পলাশের বাবার গুরুতর অসুস্থতার সময়ে তাকে সাহায্য করার জন্য এ বাড়িতে নিয়ে আসেন। রুপা বাড়িতে আসার পর থেকেই ঘরকন্না আর হেঁশেল সামলানোর যাবতীয় কাজকর্ম নাকি সেই’ই নিজ দায়িত্বে দেখভাল করছে।

পলাশ আর রজত খাবার টেবিলের সন্নিকটে ঘেঁষতেই রুপা আর ৫/১০’টা বাঙালী ললনার ন্যায় লম্বা ওড়নাখানা মাথায় টেনে দিয়ে ছোট ঘোমটা আঁটল। মৃদুস্বরে সালাম জানিয়ে আগত নতুন অতিথিকে খাবার টেবিলে বসতে বলার সামান্য ভদ্রতাটুকু দেখাতে সে মোটেও ভুল করলো না। রজত আড়চোখে রুপার মুখের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলো চিরাচরিত বাঙালী নারীর সহজাত প্রায় সমস্ত প্রবৃত্তি রুপার মধ্যে স্পষ্টত।

পরক্ষণেই পলাশ যখনই রুপার সাথে রজতের সৌজন্যমূলক পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলো ঠিক তখনি রুপা বাঁকা ঠোঁটে লাজুক হাঁসি হেসে জানালো, খালাম্মা মানে পলাশের মায়ের নিকট হতে পূর্বেই রজতের বিষয়ে বেশ ভালোভাবেই অবগত হয়েছে তাই তাকে আর রজতের ব্যাপারে নতুন কিছু না বললেও চলবে ।

চার.

কিন্তু দুজনে একত্রে আহার শুরু করার পর রজত বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে লাগলো রুপা পলাশের প্রতি যতটাই বেশী কেয়ারিং, খেয়ালী ও আগ্রহী তার প্রতি ঠিক ততটাই বেখেয়ালি এবং অমনোযোগী। রান্না সুস্বাদু হয়েছে কিনা জানতে চাওয়া, নিজ হাতে পলাশের গ্লাসে পানি ঢেলে দেওয়া, পলাশ নিজে থেকে না চাইলেও জোরপূর্বক এটাওটা পাতে তুলে দেওয়া, মুচকি হাঁসি দিয়ে মিষ্টি কণ্ঠে দুপুরে পলাশের পছন্দের প্রিয় কোন খাবার রান্না হবে সেটা শুনতে চাওয়া আর সবকিছুতেই পলাশেরও পরোক্ষ আগ্রহ ও মৌন সম্মতি কিচ্ছুই যেন রজতের দৃষ্টি এড়ালো না।

রুপার ভাবখানা এমন যেন নিজ গৃহে পলাশই আজ অতিথি আর রজত অনাকাঙ্ক্ষিত কোন আগন্তুক, মূল্যহীন কোন অজ্ঞাত জন। এখানে যে আরো একজন মানুষও বসে আছে সেদিকে রুপার যেন কোন ভ্রুক্ষেপই নাই। যদিও পলাশ কিন্তু ঠিকই বারবার রজতের সব খাবার ভালো লাগছে কিনা কিংবা কিছু লাগবে কিনা সেইদিকে বেশ সজাগ দৃষ্টি রাখছে। তবে পলাশের প্রতি রুপার অতি আলগা পিরিত আর আদিখ্যেতা দেখে রজত মনেমনে বেশ অপমানিত বোধ করতে লাগলো। একই জায়গায় বসা দুইজনের প্রতি রুপার এমন বৈষম্যমূলক আচরণে রজত কিছুটা অভিমান করেই আহার সম্পন্ন না করে স্থান ত্যাগ করলো।

খাবার শেষ না করেই অগত্যা রজতের স্থান ত্যাগে পলাশ বেশ অবাক হল। হঠাৎ কি এমন হল যে রজত এভাবে হুট করেই চলে গেলো সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলো না। রুপার সামনে রজতের এমন কাণ্ডে পলাশ বেশ অস্বস্তি ও লজ্জায় পড়লো। কিন্তু এবিষয়ে রুপার ভেতোরে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন বাৎচিত লক্ষণীয় হল না সে পূর্বের মতই পলাশকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে লাগলো।

তবে বিষয়টা নিয়ে পলাশের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ প্রত্যক্ষ করে রুপা অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, “রাতভর জার্নি করে তার হয়ত শরীর ভালো বোধ করছে না তাই খাবারে অরুচি লাগায় তিনি হয়তো চলে গেছেন এটা ভেবে আপনি এতো দুশ্চিন্তা করছেন কেন? সব ঠিক হয়ে যাবে”। রুপার সান্ত্বনামূলক বাণীতে পলাশ সন্তুষ্ট হতে না পেরে দ্রুতই তার শোবার ঘরে ঢুঁকে দেখতে পেলো রজত গায়ে কাঁথা টেনে কাঁত হয়ে শুয়ে আছে। পেছন থেকে ডাকতে গিয়েও আবার নিবৃত হল তার বিশ্রামের কথা চিন্তা করে।

সেদিন বিকেলে বাইরে থেকে হাঁটাহাঁটি করে বাড়িতে ফিরে ব্যালকোনিতে বসে রজত ও পলাশ আড্ডা দিচ্ছিল ঠিক এমন সময় একটা ট্রেতে করে গুটিকয়েক ভাপা পিঠা আর দুই কাপ গরম কফি নিয়ে ওদের পেছনে এসে দাঁড়ালো রুপা। রুপা পলাশের দিকে ইঙ্গিত করে বললো খালাম্মার কাছ থেকে সে শুনেছে ভাপা পিঠা নাকি পলাশের খুব পছন্দের। তাই রুপা আজ নিজ হাতেই অনেক যত্ন করে পিঠাগুলো পলাশের জন্য তৈরি করে এনেছে। তাই পিঠা খেয়ে কেমন লাগলো সেটা যেন পলাশ রুপাকে জানাতে ভুল না করে।

পলাশের প্রতি রুপার অতি যত্নশীল মনোভাবে পলাশ বেশ সন্তুষ্ট হয়ে রুপার দিকে দৃষ্টি না ঘুরিয়েই অনেকটা মশকরার ছলেই বলে উঠলো, যার হাতের এক গ্লাস পানি’ই শরবতের মত তার হাতের পিঠা অমৃতের মত না হয়ে যাবে কোঁথায়। এমনকি বাড়িতে আসার পর থেকে রুপার হাতের রান্না করা খাবারের মতন এতো সুস্বাদু খাবার সে বহুকাল যাবত খায়নি সেটার প্রশংসা করতেও ভুললো না পলাশ। পলাশের মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসায় রুপা মুচকি হেঁসে দুষ্টুমি করে জবাব দিলো, আপনাকে দেখে বেশ শান্ত-চুপচাপ স্বভাবের মনে হলেও কথায় যে এতোটা পাকনা হবেন সেটা কিন্তু ভাবিনি।

রুপা আর পলাশের হাসজ্জল মিষ্টি মধুর খুনসুটি ও আলাপচারিতার মাঝখানে রজত নিজেকে কাবাবের হাড্ডি মনে করে রাগে-অভিমানে তেলেবেগুনে জ্বলতে লাগলো। নিজেকে অচ্ছুত ব্যক্তি ভেবে রজতের ভীষণ মন খারাপ হল। পলাশের ন্যাকামি আর রুপার ঢং সহ্য করতে না পেরে সে হাতের মুঠোফোনটা মেঝেতে সজোরে আছড়ে মেরে সেখান থেকে হনহন করে হেঁটে বাইরে চলে গেলো। ঘটনার আকস্মিকতায় পলাশ একেবারে হকচকিয়ে গেলো। তবে রুপাও এবার বেশ বিস্মিত ও ভয় পেলো। টু-শব্দটি না করে চুপিসারে রুপা প্রস্থান করলো। আর পলাশ নির্বাক মূর্তির ন্যায় ঠায় দাড়িয়ে রইলো।

পাঁচ.

প্রায় মধ্যরাত। পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদটা আজ অকৃপণ ভাবে আলোক ঝরাচ্ছে পৃথিবীর পর। চারপাশের জঙ্গলে মিটমিট জ্বলতে থাকা জোনাকির আনাগোনারও কমতি নেই। কোন প্রেমিক যুগলের জন্য এমন একটা মোহনীয় রাত হতে পারে হাজারো কাব্য রচনার উপযুক্ত রজনী। মায়াবী পরিবেশের ঠিক এমনই রাতে আজ পলাশদের বাড়ির ছোট্ট ছাঁদে মুখোমুখি দাড়িয়ে পলাশ ও রজত।

_ কি হল রজত ? কি এমন কথা বলবা যার জন্য এত রাতে আমাকে ছাঁদে ডেকে নিয়ে আসলে?

~ তোমার আর আমার জীবন সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবো। আজ সবকিছুর এসপার ওসপার হওয়া দরকার!

_ মানে কি ? সত্যি করে বলতো রজত, তোমার কি হয়েছে ? এখানে আসার পর থেকেই তোমাকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে, ঘটনা কি?

~ আগে আমাকে বল আমি যা শুনলাম সেটা কি সত্যি? একদম সাফ সাফ জবাব চাই, কিছুই লুকাবে না?

_ কি শুনেছো ? কোনটা সত্যি? খোলাসা করে বলতো আমি কিছুই বুঝতেছি না তুমি কোন বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইছো?

~ থাক আর ভণিতা করতে হবে না। এমন ভাব করছো যেন ভাঁজা মাছটাও উল্টে খেতে জানো না। কি ভেবেছো আমি কিছুই জানিনা, কিছুই বুঝিনা ?

_ উহ রজত প্লিজ! নাটক করো নাতে যা বলার সোজাসুজি বলো?

~ তোমার আর রুপার ব্যাপারটা কি সত্যি? সন্ধেবেলায় কাকিমা বলল তোমার সাথে রুপার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে? আর তুমিও নাকি এ বিয়েতে সম্মতি জ্ঞাপন করেছো? চাচা মারা যাবার সময় নাকি তোমাদের দুইহাত এক করে দিয়ে গেছেন? আমাকে এটা আগে জানাও নি কেন? আমি শুধু শুধুই মেয়েটাকে সারাদিন ভুল বুঝলাম, হিংসে করলাম, খারাপ ব্যবহার করলাম।

_ আসলে আমি ন্যূনতম কিছুই জানতাম না যে অনেক পূর্বেই বাবা-মা রুপার সাথে আমার বিয়ে দেবেন এমন একটা মনস্তাত্ত্বিক ধারণা তারা ভেতোরে ভেতোরে পুষে রেখেছিলেন। তাই বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ছেলের হবু বৌয়ের মুখ দেখার ইচ্ছা পোষণ করলে মা’ই তাকে এ বাড়িতে নিয়ে আসেন। আর মৃত্যুকালে বাবার শয্যাপাশে উপস্থিত থাকাকালীন সময়ে তিনি যে এমন একটা ঘটনা ঘটাবেন তার জন্য আমি সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিলাম। অনেকটা হুট করেই তিনি আমার আর রুপার দুটিহাত এক করে দিলেন। কিন্তু মৃত্যু পথযাত্রী পিতাকে আমার মনোবাসনার কথা জানানোর পূর্বেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

~ বাহ! বেশ তো! আর তাই তুমি রুপাকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে গেলে। আমার কথা একটিবারের জন্যও ভাবলে না। জানানোর প্রয়োজনটুকু মনে করলে না। একদিনের মাথাতেই রুপার প্রতি তোমার প্রেম-ভালোবাসা বারুদের মত জ্বলে উঠলো। আমাদের এতদিনের সম্পর্ক কি এতোটাই ঠুনকো ছিল?

_ ছি ছি! রজত তুমি এভাবে কথা বলছো কেন? মাত্রই তো গতকালের ঘটনা আর আমার যে মানসিক অবস্থা ছিল তোমাকে এসব জানানোর ফুরসৎ পেলাম কই। আর রুপাকে বিয়ে করার জন্য আমাকে পাগল দেখলে কখন? আমি কি তোমাকে ভালোবাসি না? আমার পক্ষে কি সম্ভব তোমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে গ্রহণ করা, কারো বুকে মাথা রেখে আশ্রয় খোঁজা, কাউকে তোমার চেয়ে অধিক ভালোবাসা, এতদিনে তুমি আমাকে এই বুঝলে, আমার প্রতি তোমার বিশ্বাসের স্তম্ভ এরকম নড়বড়?

~ দেখো পলাশ যা বোঝার আজ সারাদিনে তা আমি বুঝে গেছি। সস্তা নাটকে তোমাকে মোটেও মানাচ্ছে না। তুমি একদমই কাঁচা অভিনেতা। এখন আর শাঁক দিয়ে মাছ ঢেকে লাভ নেই।

_ আহ রজত! একটু বুঝতে চেষ্টা করো আমি পরিস্থিতির স্বীকার। শেষ মুহূর্তে বাবাকে হয়তো কিছুই বলার সুযোগ পাই নি কিন্তু তার মানেই তো এই না যে আমি রুপাকে বিয়ে করে ফেলেছি। কেন এমন বাচ্চাদের মত আচরণ করছো?

~ হা হা হা… ভালোই বলেছো। যদি তাই’ই হবে তাহলে সারাদিন তোমার আর রুপার মধ্যে যে ঢলাঢলি মাখামাখি দেখলাম সে বাড়াবাড়ি’টাকে আমি কি মনে করবো, বলো? আর বিগত ১০/১২ দিন তো দুজনে একই সাথে একই বাড়িতে থাকছো না জানি আরো কত রঙ্গ লীলা হল দুজনের মধ্যে,কত গোপন অভিসারে মাতলে দুজন? আমি তো তোমার কাছে পুরনো একঘেয়েমি হয়ে গেছি এখন না হয় নতুন চামড়া নতুন স্বাদের মজা পেলে,মন্দ কি?

_ ছি রজত ছি! এতোটা সংকীর্ণ ও নোংরা মানসিকতা কোন মানুষের হতে পারে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আমার ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছে আমি কীভাবে এতদিন তোমার সাথে একই ছাঁদের নিচে বাস করেছি। তুমি তো দেখছি অধমেরও অধম, পশুর চেয়েও পশু। (কথাগুলো বলেই পলাশ কষে একটা থাপ্পড় মেরে দিলো রজতের গালে আর রজত কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে ছাঁদ থেকে নিচে নেমে গেলো।)
ছয়.
একে তো রাতবিরাতে রজতের সাথে মনোমালিন্য ও ঝগড়া আর দ্বিতীয়ত দুজনের মাঝখানে মস্ত বড় কোলবালিশের দেয়াল তুলে পুরো খাটের প্রায় সমস্ত জায়গা জুড়ে রজতের একার ঘুমিয়ে থাকার ফলে পলাশের প্রায় নির্ঘুম রাতকাটলো। পলাশেরও গভীর অভিমানে রজতের সাথে মোটেও কথা বলতে ইচ্ছে হয়নি বিঁধায় তাকে আর ডাকাডাকি না করে বিছানার স্বল্প স্থানটুকুতেই কোনোরকমে গা এলিয়ে শুয়ে থাকলো। এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যে ভোর হয়ে গেছে পলাশ বুঝতেই পারেনি।

মাথাটাও বেশ ধরেছে। এই মুহূর্তে ঘনদুধের গরম এক কাঁপ কড়া কফি হলে মন্দ হয়না। আসলে বাড়িতে আসার পর থেকে প্রতিদিনই ঘুম ভাঙার সাথে সাথে রুপার হাতের অমৃত স্বাদের কফি পান করতে করতে পলাশের ভেতোর কেমন যেন একটা লোভ তৈরি হয়ে গিয়েছে। চোখ মেলেই শয্যাপাশের টি-টেবিলে ধোঁয়া ওঠা গরম কফি তাও আবার যদি হয় মনকাড়া স্বাদের তাহলে তো কথাই নাই। কিন্তু কি এমন দাঁয় ঠেকেছে মেয়েটার যে আজ কাঁক ডাকা এই ভোরবেলায়ও তার জন্য কফি বানায়ে নিয়ে আসবে।

এমনটা ভেবে পাঁশ ফিরে তাকাতেই পলাশ দেখতে পেলো সত্যিই রুপা আজো এতো ভোঁরেও টি-টেবিলে কফি রেখে গেছে। মেয়েটার এই অদ্ভুত একটা গুণ সে কীভাবে যেন মানুষের অন্তঃস্থলের কথা পড়ে ফেলতে পারে। কিন্তু পলাশ ভেবেই অবাক হচ্ছে কখন রুপা এসে কফি রেখে গেলো যে সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। অতশত না ভেবে পলাশ তড়িৎগতিতে বিছানা ত্যাগ করে কফির কাঁপ হাঁতে নিতে গিয়েই দেখতে পেলো কাঁপের নিচেই ভাঁজ করা একটা কাগজের টুকরা। কাগজের ভাঁজের উপরের পৃষ্ঠে সুন্দরকরে লেখা, চিঠিটা পাইবে পলাশ।

অনেক যত্ন করে দারুণ হাতের লেখার চিঠিটা যে রুপার লেখা তা আর পলাশের বুঝতে বাকি রইলো না। কিন্তু সে বিস্ময়ে হতবাক এই মেয়ে তাকে চিঠি লিখতে যাবে কোন দুঃখে। তার সাথে রুপার কোন প্রকার মানসিক লেনাদেনা তো দূরের কথা একই বাড়িতে থাকার সুবাদে ঐ সামান্য সৌজন্যমূলক কথাবার্তাই মাঝেমাঝে হয়েছে যা। তাহলে রুপা কেন তাকে চিঠি লিখবে, কি এমন বলার আছে তার? – এসব ভাবতেই ভাবতেই চিঠিটা খুলে পড়া শুরু করলো পলাশ।

“অ”প্রিয় তুমি

পত্রের শুরুতেই আপনাকে “তুমি” সম্বোধন করার দুঃসাহস দেখালাম জীবনে এই প্রথম ও শেষবারের মত। জানি আপনাকে “তুমি” করে বলার অধিকার আমাকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু অনেকটা ইচ্ছে করেই জোরপূর্বক ভাবে চিঠিতে আপনাকে তুমি করেই ডাকতে মন চাইলো। কারণ কেবলমাত্র তুমি করে সম্ভাষণ করলেই গভীর হৃদ আবেগ প্রকাশ করা ভীষণ সহজতর হয়।

জ্ঞান হবার পর মা’য়ের মুখ থেকে যখন শুনলাম ভবিষ্যতে আমার জীবনে যে মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটবে তার নাম পলাশ। ঠিক তখন থেকেই আমার হৃদ ক্যানভাসে সর্বদা তোমার একটা কল্পিত ছবি আঁকার চেষ্টা করতাম। তুমি দেখতে হয়তো স্বপ্ন পুরীর রাজকুমারের মত হবে, নয়ত খুব সাদামাটা টাইপের পাঁশের বাড়ির ছেলেটির মত হবে। কিন্তু তোমাকে বাস্তবে দেখার পর আমার সেই কল্পনাও যেন মিথ্যেয় পরিণত হয়েছে। তুমি যেন সুন্দরের মধ্যেও সুদর্শন, অপূর্ব’র চেয়েও অধিক অনন্য। কল্পিত ভালোবাসায় আড়ষ্ট ডানাগুলো এই প্রথমবারের মত সত্যিকারে প্রসারিত হয়ে ঝাঁপটা দিতে লাগলো। আমি ভালবাসার অসীম আকাশে উড়তে শুরু করলাম।

হ্যাঁ, আমি গতরাতে ছাঁদে তোমার আর রজত ভাইয়ার মধ্যে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা আড়াল থেকে নিজকানে শুনেছি, স্বচক্ষে দেখছি। ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম রজত ভাইয়া কেন আমাকে সহ্য করতে পারছিলেন না, কেন তোমার পাঁশে আমার উপস্থিতি তার জ্বালাতনের কারণ হচ্ছিল। প্রথম প্রথম তোমাদের দুজনের মধ্যকার ভালোবাসার রসায়ন’টা আমার কাছে বেশ আশ্চর্যজনক,বিস্ময়কর ও অদ্ভুত গুরুগম্ভীর ঠেকলেও রাত ব্যাপী চিন্তায় এর গভীরতা উপলব্ধি করে আমার কাছে এটাই মনে হয়েছে সত্যিকারের ভালোবাসা হয় মানুষে-মানুষে, লিঙ্গের বৈপরীত্যে নয়।

কারণ একজন মানুষ আরেকজনকে কতটা ভালবাসলে তার ভালোবাসার প্রিয়জনের কাছে অন্যকারো নিবিড় উপস্থিতি অসহনীয় ঠেকতে পারে। তাই আমি বলবো রজত ভাইয়া যা করেছে সেটা তোমার প্রতি তার গভীর ও সত্যিকারের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়। তাই তোমার কাছে আমি জীবনে এই প্রথম ও শেষবারের মত অনুরোধ করছি তুমি তাকে বিন্দুমাত্রও ভুল বুঝবে না। তাকেও তোমার অসীম ভালোবাসায় আজীবন আবদ্ধ করে রাখবে এটাই আমার কাম্য।
মৃত্যুপথযাত্রী খালু জান হয়তো আবেগের বশে আমাদের দুইটি হাত এক করে দিয়েছিলেন। তুমি হয়তো নিশ্চয়ই অবগত যে মানুষ তার আবেগময়,সুখকর ও উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তেই কিন্তু সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্তগুলো নেন। তিনি হয়তো পৃথিবী থেকে গত হয়েছেন কিন্তু আমাদের ত্রয়ীর অনাগত বিশাল ভবিষ্যৎ সামনে পড়ে রয়েছে। আমরা তো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। তাই তুমি বিশেষ ঐ মুহূর্তের সামান্য কিছু কথা আর আমার বিষয়ে চিন্তা করে হয়তো ভীষণ দোটানায় ভুগছো।

আমাকে তোমার জীবনসঙ্গী না করলে আমার কি হবে কিংবা সবাই তোমাকে কি ভাববে এই ভাবনাগুলো তোমাকে প্রতিনিয়ত কুরেকুরে খাচ্ছে। তাই আমি এই রুপাই তোমাকে অভয় দিয়ে বলছি তুমি নিশ্চিন্তে নির্দ্বিধায় ও নিঃসংকোচে রজতের কাছে নিজেকে সঁপে দাও। আপন করে নাও তোমার ভালোবাসাকে, আর তোমাকেও প্রাণভরে ভালবাসতে দাও রজতকে।

আমি আমাকে নিয়ে তোমার সমস্ত চিন্তা হতে তোমাকে মুক্তি দিলাম। আমি আমার ভালোবাসাকে ত্যাগ করলাম। তোমাদের উৎসর্গ করলাম আমার বাস্তব ভালোবাসা, আর তোমার প্রতি আমার সেই কল্পিত ভালোবাসা নিয়েই তোমাদের মাঝে আমি বেঁচে থাকতে চাই। আর তুমি যেন এটাকে তোমার প্রতি আমার করুণা ভেবে ভুল না কর। কারণ এই ত্যাগ তোমার আর রজতের ভালোবাসার প্রতি আমার শ্রদ্ধা,সম্মান ও মর্যাদার ত্যাগ,ভালোবাসার নিদর্শন।

শেষকথা,দয়া করে অবশ্যই আমাকে ভুল বুঝবে না কারণ পত্রের প্রারম্ভে “অ” দ্বারা তুমি আমার “অধিক” প্রিয় এটাই বুঝাইছিলাম। আর চিঠিটা যখন তোমার পড়ার একদম শেষপ্রান্তে আসবে ততক্ষণ আমি হয়তো তোমার আর রজতের থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। আর তোমাদের দুজনের জ্বালাতনের কারণ হতে মন চাইলো না। তুমি ভালো থেকো, তোমরা ভালো থেকো, আমিও হয়তো কোন একভাবে থাকবো। হয়তো তোমার স্মৃতি হয়ে নতুবা রজতের চোখের বালি হয়ে।

ইতি আমি
রুপা

পলাশ তখনো রুপার চিঠিটা হাঁতে নিয়ে নির্বাক নিথর দাড়িয়ে রজতের মুখের পানে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। ততক্ষণে সকালের সোনারোদ জানালা দিয়ে সোজা ঘুমন্ত রজতের চোখেমুখে এসে পড়ছে। রাতের তীব্র জোরালো সেই চড়ের দাগটা রজতের মুখে লালচে দাগ ফেলে দিয়েছে। মুখ ভর্তি রাজ্যের অভিমান, রাগ আর লালচে দাগের সাথে মিষ্টি রোঁদের খেলা রজতের মুখাবয়ব জুড়ে এক অপূর্ব আভা সৃষ্টি করেছে।
পলাশ অপলক দৃষ্টিতে রজতের মুখের দিকে চেয়ে সেই খেলা উপভোগ করছে আর ভাবছে এক মায়াবতী মহীয়সী রুপা না হয় তার অসীম ভালোবাসাকে বলিদান দিয়েছে, ত্যাগের মহিমা দেখিয়ে রজত আর পলাশের ভালোবাসার পথ সুগম করে দিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে কি হবে ? সব মেয়েরা তো আর রুপার মত ত্যাগী হবে না,মহানুভব হবেনা। তাহলে এই ধরণের সম্পর্কগুলোর ভবিষ্যৎ পরিণতি আসলে কি? এহেন নানান দ্বিধাগ্রস্ত প্রশ্ন পলাশের মস্তিকে খেলা করতে লাগলো।

(বিঃদ্রঃ গল্পের সমস্ত স্থান,ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোন সম্পর্ক নেই। কারো সাথে কোনকিছুর সামান্যতম মিল পরিলক্ষিত হলেও তার জন্য লেখক কোনভাবেই দায়ী থাকবে না।)

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১৪ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৫।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.