শরীর

লেখকঃ অরণ্য যুবরাজ

থেকে থেকে বৃষ্টি হচ্ছে । সেই সকাল থেকে । অথচ আজই একটা নতুন এড এজেন্সি তে অডিশন দেয়ার কথা রিহাবের । রিহাব উঠতি মডেল । কিছুদিন হল রেম্পে কাজ করা শুরু করেছে সে । মাস খানেক আগে ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি হয়েছে রিহাব। ক্লাস শুরু হল কিছুদিন হল । ওর মাথায় মডেলিং এর ভূত সেই ছোটবেলা থেকেই । আর দেখতে শুনতেও অন্য আর দশটা ছেলের চাইতে সে আকর্ষণীয় । বিশেষ করে ওর শারীরিক ফিগার আর উচ্চতা ওকে সবার চাইতে আলাদা করেছে । ও জানে সেটা । কারন ক্লাসে, ইউনিভার্সিটি সব জায়গায় ও কিছুটা হলেও সুবিধা বেশি পায় । সুন্দর মুখের জয় নাকি সব জায়গায় !
রিহাব এর হাতে গরম চা এর মগ । ধোঁয়া ওঠা । সকালে উঠে এটা তার খুব প্রিয় সময় । সকালে এই সময়টায় সে চা এর মগ নিয়ে বারান্দায় বসে । ইজি চেয়ারে । ওর বাসার সামনেই লেক । আর বারান্দার কোল জুড়ে অনেকগুলো গাছ । রিহাবের গাছ অনেক প্রিয় । সেই ছোটবেলা থেকেই । ওর রুমে এখন হালকা মেজাজের রবীন্দ্র সঙ্গীত এর ইন্সট্রুমেনটাল মিউজিক চলছে । ইন্সট্রুমেনটাল মিউজিক এর আলাদা আবেদন আছে রিহাবের কাছে । ওর কাছে মনে হয় এই মিউজিক শুনার জন্য কোন ভাষা বুঝার দরকার হয় না । পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষই এটা বুঝে । সুরের নিজস্ব একটা ভাষা আছে ।
ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টির জল গাছের পাতায় আর শরীরে পড়ছে । সবুজ শরীর আরও সবুজ হচ্ছে । আহ । শরীর ! শব্দটা খুব অদ্ভুত । একটা সময় এই শরীরের প্রতি একটা মোহ কাজ করত রিহাবের । এখন করে না । চোখ বুজতেই একটা ঘটনা এখনও চোখের সামনে ভেসে উঠে রিহাবের ।
ওর বাবার বন্ধু । মনির আংকেল । ছোটবেলা থেকেই রিহাবদের বাড়িতে তার অবাধ যাতায়াত । পরিবারের একজন সদস্যের মতই ছিলেন তিনি । কি কারনে সারাজীবন বিয়ে করেন নি । তা কেউ জানে না । বাবা বলত, উনি নাকি কোন মেয়ের প্রেমে ছেকা খেয়েছিলেন । রিহাব এতো কিছু বুঝত না । ওর মনির আংকেলকে বেশ লাগত । ভালই লাগত । কারন আংকেল তাকে কোলে বসিয়ে আদর করে চকলেট খাওয়াত, আইসক্রিম খাওয়াত । প্রথম প্রথম মা খুব বকতেন । এরপর থেকে মনির আংকেল ওকে লুকিয়ে লুকিয়ে চকলেট দিত । কখনো পুকুর পাড়ে, কখনো পাড়ার খেলার মাঠে । বিনিময়ে মনির আংকেল ওকে শক্ত করে কোলে নিয়ে জড়িয়ে ধরত । আদর করত । আর বলত, কাউকে বল না যেন । বুঝলে ? অনেক চকলেট দিব । এই এত্তগুলা ।

তখন রিহাবের বয়সই কত ! আট কি দশ ! ও তখনও জানত না শরীর কি । কি শরীরের খেলা ! শরীর নিয়েও খেলা যায় । মনির আংকেল ওকে নিয়ে উনার বাসায় গেলেন । বললেন, বাসায় গেলে অনেক চকলেট দিবেন । রিহাব প্রথমে যেতে চায় নি । কিন্তু পরে সে চকলেট এর লোভ সামলাতে পারল না । তারপরও সে ভয়ে ভয়ে মনির আংকেলকে বলল, আংকেল মা যদি আমায় খোঁজেন, আমাকে না পেয়ে পরে যদি বকা ঝকা করেন ?
মনির আংকেল হা হা হেসে বলল, ধুর বোকা ছেলে । মাকে বললেই হবে যে তুমি আমার বাসায় এসেছিলে ।
মনির আংকেল এর কথায় আর চকলেট এর লোভে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল রিহাবের । সে খুব খুশি হয়েই আংকেল এর পিছু পিছু ছুটেছিল ।

মনির আংকেল এর সাথে তার বাসায় যেতেই আংকেল তার রুমের দরজা বন্ধ করে দিলেন ।
জানালার নিল রঙ্গা পর্দা টেনে দিলেন ।
রিহাব কে একটা চেয়ারে বসতে দিয়ে মনির আংকেল ফ্যান চালিয়ে দিলেন ।
এরপর ড্রয়ার থেকে ৪ টা বড় চকলেট এর বার বের করে এনে বললেন, এগুলো সব তোমার ! এখন খুশি ?
রিহাব কাঁপা কাঁপা হাতে চকলেট গুলো মনির আংকেল এর হাত থেকে নেয় ।
ওর কেন জানি খুব ভয় লাগছিল ।
মনির আংকেল কে ওর খুব অচেনা লাগছিল ।
মনির আংকেল টি ভি সেট এর দিকে এগিয়ে গেলেন ।
রিহাব এর দিকে তাকিয়ে বললেন, সিনেমা দেখবে ?
রিহাব মাথা নাড়ল ।
মনির আংকেল উনার ভিডিও প্লেয়ার এ একটা ক্যাসেট দিলেন ।
রিহাব অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ।
টিভির স্ক্রিনে দুজন নগ্ন নারী পুরুষ ।
ওর জীবনের প্রথম এমন দৃশ্য !
নারীর উন্নত বক্ষ, নাভি, নিতম্ব, জঙ্ঘা আর পুরুষের উত্থিত লিঙ্গ । রিহাবের চোখে রাজ্যের কৌতূহল ।
ওর জন্য আরও কিছু অপেক্ষা করছিল ।
মনির আংকেল কখন যে ওর পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে । ও বলতে পারে না ।
মনির আংকেল রিহাবকে তার কোলে তুলে নিয়ে বসে ।
ওর কানে কানে বলে, মুভিটা কেমন দেখতে?
স্ক্রিনে তখন নরনারীর আদিম খেলা শুরু হয়েছে । শীৎকার এর শব্দে সারা ঘর মুখরিত ।
রিহাব ভয় পায় । মেয়েটা কি ব্যথা পাচ্ছে ?
আর ঐ ছেলেটার ওটা এতো বড় কেন? ওর টা তো এতো বড় না !
মনির আংকেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ও বলল, আংকেল মেয়েটা ব্যথা পাচ্ছে তো ! আর ছেলেটার ওটা এতো বড় কেন?
মনির আংকেল উনার মুখটা রিহাবের কানের কাছে নামিয়ে আনে । ফিস ফিস করে বলে, মেয়েটা আনন্দ পাচ্ছে । আর বড় হলে সব ছেলেদের এমন বড় হয় । আমার টাও এতো বড় । দেখবে?
রিহাব চকলেট খেতে ভুলে যায় ।
ওর সামনে এখন একটা জিবন্ত খেলনা ।
মাংসল ।
গরম ।
ও ওর স্বভাবজাত কৌতূহল থেকে হাত বাড়ায় ।
মনির আংকেল ওকে শিখিয়ে দেয় । কেমন করে ওটাকে আদর দিতে হয় ! কেমন করে ওটাকে শান্ত করতে হয় ।

সেদিনের পর থেকেই রিহাব কেমন বদলে যায় । ওর জগত জুড়ে শুধুই শরীর আর শরীর । যখন ওর অন্য বন্ধুরা মাঠে ফুটবল খেলায় ব্যস্ত । ও তখন শরীরের খেলায় মত্ত ।
কিছু কিছু মানুষ আসে জীবনটাকে বদলে দেবার জন্য । নেতিবাচক কিংবা ইতিবাচক বদল ।
রিহাব কি এমন করে জীবন বদল চেয়েছিল ?
ওর কৈশোর পুরোটাই চুরি করে নিয়েছে এই শরীর শরীর খেলা !
মনির আংকেল এক বছর পর চলে যান । উনার চাকরির বদলি হয়েছিল ।
কিন্তু রিহাব!
ওর কেমন জানি পাগল পাগল লাগত তখন ।
নেশার মত ।
কি জানি নেই । কি জানি নেই ।
নেশারু যুবকের মত ওর শরীর চাইত কিছু । ঐ ছোট বয়সেই । অদ্ভুত খেলা শরীরের ।
বছর পাচেক এভাবেই কেটে গেল ।
তারপর কলেজে ভর্তি । নতুন শহর । নতুন মানুষ । নতুন পরিবেশ ।
এখানকার মানুষ গুলোও অন্যরকম ।
সেটা বুঝল যেদিন হোস্টেলে উঠল ।

প্রথম দিনই ছিল হোস্টেলের বড় ভাইদের রেগিং ।
আন্ডার ওয়্যার পরে হিন্দি সিনেমা দেবদাসের গানের সাথে মার ডালা নাচ কিংবা উচ্চ স্বরে চটি পড়া ।
রিহাব নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছিল না ।
ওর শরীর জেগে উঠে ।
এতো গুলো নগ্ন যুবক ওর সামনে দাঁড়ানো ।
ও চোখ বুজে ফেলে ।
এক সিনিয়র বড় ভাই ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, কি ব্যপার ! এই ছোকরা তুই কি গে নাকি । পোলা দেইখা খারাইয়া জাইতাছে নাকি ?
রিহাব দুই উরুর মাঝে চেপে ধরে আড়াল করতে চায় ওর উত্তেজনা ।
কিছুটা পারে । কিছুটা পারে না ।
সেদিনের মত রেগিং পর্ব শেষ হয় ।
ঘটনা এখানেই শেষ হলে পারত ।
কিন্তু না ।

ওর জন্য আরও কিছু অপেক্ষা করছিল ।
হোস্টেলে উঠার কিছুদিন পরই ঈদ এর ছুটি ।
ঐ সিনিয়র ভাই ছাড়া সবাই বাড়িতে চলে গেছে ।
রিহাবও যাবে একদিন পর ।
সারা হোস্টেলে ও , হোস্টেল সুপার আর ঐ সিনিয়র ভাই ছাড়া কেউ নাই ।
রাত তখন ১২ টা ।
রিহাব দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে ।
এমন সময় টক টক শব্দ । দরজায় ।
দরজা খুলতেই রুমে ঐ সিনিয়র ভাই ঢুকে গেল ।
উনার সাথে উনার বালিশ ।
উনি রুমে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে রিহাবকে বললেন, আজ তোর রুমে থাকুম । তোর কুন সমস্যা ?
রিহাব মাথা নাড়ে ।
ও গুটিসুটি হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে ।
সিনিয়র ভাই তার পাশের বিছানায় ।
কখন ঘুমিয়ে গেছে রিহাব । মনে নেই ।
মাঝ রাতে ঘুম ভাঙল ওর । প্রচণ্ড চাপে ।
কেউ একজন তার শরীর প্রচণ্ড আক্রোশে চেপে ধরে আছে । বিছানায় ।
রিহাব ভয় পায় ।
ওকে কি বোবায় ধরেছে ?
শুনেছে বোবা ধরলে এমন হয়।
রিহাব বুঝতে পাড়ে ওর শরীরে কাপড় নেই । পরনের হাফ প্যান্ট কোথায় ?
ও ঝটকা দিতে গিয়েই বুঝতে পারে এটা ঐ সিনিয়র ভাই ।
ঐ সিনিয়র ভাই রিহাবের কানে ফিস ফিস করে বলে, ঐ । এতো নড়স কেন ?
শালা । মাগি ।
মারা খাস সবার কাছে । আর এখন সতি সাজস?
আমি তোর চোখ দেইখাই বুঝছি তুই ঐ মাল ।
সব পোলা যখন জাইঙ্গা পইরা দারাইছিল তুই তহন ওদের আসল জিনিস দেখতাছিলি ।
রিহাব চুপ করে থাকে ।
ও জানে ও ধরা পরে গেছে ।
তারপরেও বলে, ভাই । আমি এসব করি না ।
সিনিয়র ভাই বলল, করস না ? না ? আইজ করামু ।
ভাই, আপনার পায়ে পরি । আমি এইসব করি না ।
জোরে একটা থাপ্পর পরে রিহাবের গাল বরাবর ।
ও কিছু শুনতে পারছিল না । এতো জোরে থাপ্পর টা গালে পড়েছে ।
ওর মাথা কেমন যেন ঘুরছিল ।
এরপর শুরু হল নির্যাতন ।
পুরুষ হয়েও ধর্ষিত হল রিহাব ।
দাঁতে দাঁত চেপে রিহাব পড়ে থাকে ।
বালিশ কামড়ে ধরে ।
একবার দুবার তিনবার ।
শেষ রাতের দিকে ঐ সিনিয়র ভাই চলে যায় । তার ঘরে ।
পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন সারা শরীরে জ্বর । রিহাবের ।
ওর খুব বমি লাগছিল ।
শরীর টাকে খুব নোংরা মনে হচ্ছিল ।
ওর সাথেই কেমন এমন হয় ? বার বার ।
সেবারের ঈদ টার মত খারাপ ঈদ আর আসে নি রিহাবের জীবনে ।
ঈদ এর পর আর হোস্টেলে যায় নি রিহাব । ঐ কলেজ ছেড়ে অন্য কলেজে ভর্তি হল ।
বাবা মা কয়েকবার কলেজ চেঞ্জ করার কারন জিজ্ঞেস করেছিল ।
রিহাব চুপ করে কোন কথা বলে নি ।

রিহাবের ফোন বেজে চলেছে ।
এড এজেন্সির মালিক ইমরান ভাই ফোন দিয়েছে ।
– কি খবর রিহাব । কখন আসছ ।
– এই তো ভাইয়া । ১ ঘণ্টার মাঝেই আসছি ।
– তা সব মাথায় নিয়ে আসছ তো ? কাল রাতে ফেসবুকে যা যা বলেছি তা পারবে তো ?
– চেষ্টা করব ।
– দেখ রিহাব । মিডিয়াতে চেষ্টা করব বলে কোন কথা নেই । তুমি যদি আমায় খুশি করতে পার তাহলে এড টা তুমি পাবে আর না পারলে যে আমার ডিমান্ড ফুল ফিল করতে পারবে তাকেই সুযোগ দিব ।
– ওকে ভাইয়া ।
– তাড়াতাড়ি আসো । বাই দ্য ওয়ে, কোন ফ্লেভার ইউজ করতে চাও ।
– চকলেট । ( দাঁতে দাঁত চেপে রিহাব বলে উঠে)
– ওকে । বেইবি । আমি অপেক্ষায় আছি ।

রিহাব চা এর মগে চুমুক দেয় ।
ওর কাছে চা টা এখন তেতো লাগছে ।
বিষের মত ।
নিজের রুমে গিয়ে তৈরি হয় ।
একটা ইয়েলো কালারের টি শার্ট আর বাদামি খয়েরি প্যান্ট পরে নিজেকে আয়নায় দেখে নেয় রিহাব ।
সাথে ব্রাউন শেডের সানগ্লাস ।
সারা গায়ে বডি স্প্রে করে ।

এড এজেন্সিতে আসার পর ওকে সরাসরি এম ডির রুমে পাঠিয়ে দেয়া হয় ।
– আসো আসো রিহাব । তোমার জন্যই অপেক্ষায় আছি । ওখানে বস ।
পাশের সোফা দেখিয়ে রিহাবের দিকে তাকিয়ে বলে ইমরান সাহেব ।
রিহাব ঠোঁটে নকল হাসি দিয়ে সোফায় বসে ।
ওর পাশে এখন চল্লিশ বছর বয়স্ক একজন মানুষ । যার হাত রিহাবের সারা শরীর জুড়ে বেড়াচ্ছে ।
ইমরান সাহেব ওর দিকে তাকিয়ে বলেন, এতো কিছু পরে আছ কেন ? স্ক্রিনে তো তোমাকে শরীরই দেখাতে হবে । আমাকে আগে দেখাও ।
আমাকে আগে টেস্ট নিয়ে দেখতে হবে ।
রিহাব ওর টিশার্ট প্যান্ট খুলে ফেলে ।
ওর এখন লজ্জা নেই ।
অভ্যাস হয়ে গেছে ।

রিহাব এখন সোফায় শুয়ে আছে ।
আর ওর উপর চল্লিশ বছরের একটা জান্তব পুরুষ ।
রিহাব চোখ বুজে আছে । দাঁতে দাঁত চেপে ।
ওর খুব ইচ্ছে করছে সময়টা ভুলে যেতে । শরীর ভুলে যেতে । ইচ্ছে করেই ।

রিহাব এর এখন সুন্দর কিছু ভাবার ইচ্ছে করছে ।
ও কল্পনা করছে ও এখন খুব সুন্দর একটা রাস্তা ধরে হাঁটছে ।
ছেলেবেলার সেই মফঃস্বল শহরের রাস্তা ।
যার দুপাশে সবুজ ঘাস । বুনো ফুল ।
যতদূর চোখ যায় শুধু হলুদ ফুল ।
রিহাবের খুব কান্না পাচ্ছে ।
শরীরের কষ্টে নয় ।
মনের কষ্টে । কারণ ইচ্ছের বিরুদ্ধে শরীর বিলনো অনেক যন্ত্রণার ।

(সমাপ্ত)

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৬ই আগস্ট, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.