সংজ্ঞাহীন ভালোবাসা

লেখকঃ একলা পথিক

খণ্ডঃ এক

পঁচিশ বছর পূর্বের রাজধানী ঢাকার সাথে আজকের ঢাকার বিন্দুমাত্র মিলও খুঁজে পাচ্ছেন না মিস্টার আফজাল। স্কুল-কলেজ,অফিস-আদালত, রাস্তাঘাট এমনকি পূর্বপরিচিত ঐতিহ্যবাহী সব স্থানগুলোর নাম অপরিবর্তিতই আছে কিন্তু এখনকার রাজধানীর পরিবেশের সাথে তিনি একদমই অপরিচিত। তার কাছে এমন ঠেকতে লাগলো যেন আলাদীনের চেরাগের অতিমানবীয় ক্ষমতা সম্পন্ন সেই কিম্ভূতকিমাকার দৈত্যটি আবির্ভূত হয়ে চোখের নিমিষেই সবকিছু বদলিয়ে দিয়ে গেছে ফলে যারপরনাই চারদিকে এতোশত আধুনিকতার ছোঁয়া । আসলে তার কাছে এমন আশ্চর্য লাগাটাই বোধহয় স্বাভাবিক কারন হাতেগোনা এক দুইদিন তো আর নয় তিনি যে এর মাঝে পাক্কা পঁচিশটি বছর আমেরিকাতে কাঁটিয়ে সবেমাত্র গত রাতেই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছেন। অতএব পঁচিশ বছর বয়সের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া টগবগে তারুণ্যদীপ্ত সেই যুবকের সহিত আজকের মধ্যবয়স্ক আধাপাকা চুলের অধিকারী নিপাট ভদ্রলোকের এমন মনস্তাত্ত্বিক ধ্যানধারণার কিঞ্চিৎ মতপার্থক্য হওয়াটা নেহায়েতই অতি নগণ্য ছাড়া আহামরি কোন ব্যাপার নয়। আফজাল সাহেব আজ নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছেন। উত্তরার বাসা থেকে কালো রঙের মার্সিডিজ বেঞ্জ- ৩৭এক্স মডেলের গাড়িটা প্রায় দেড় ঘণ্টা যাবত স্বয়ং নিজেই ড্রাইভ করে শহরের অসহনীয় যানজট পেরিয়ে শাহবাগের মোড় ভেদ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিমুখে প্রবেশ করলেন। গন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়েরই কলা ভবনের পেছনে অবস্থিত তার জীবনের সবচেয়ে মধুময় ও বিষাদমাখা স্মৃতিবিজড়িত মধুর ক্যান্টিনের দিকে। ঠিক পঁচিশ বছর পূর্বের এমন একটি দিনেই এই মধুর ক্যান্টিনেই কারো প্রতি তার হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা তীব্র অপমানিত হয়েছিল। কাউকে জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসি কথাটা মুখ ফুটে প্রকাশিত হবার ফলস্বরূপ প্রতিদানে তাকে সইতে হয়েছিল সহপাঠীদের অসহনীয় তিক্ত লাঞ্ছনা, গালমন্দ ও ভ্রর্তসনা । প্রায় চার বছর ধরে বুকের ভিতরে তিলতিল করে গড়ে ওঠা ভালোবাসার অংকুর চারাগাছ হয়ে প্রস্ফুটিত হবার পূর্বেই এই মধুর ক্যান্টিনেই বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাকী সবার কাছ থেকে পাওয়া কটাক্ষ ও অপমানমূলক আচরণ সেইদিনের সেই তরুণ আফজালের নিকট যতটা না বেদনাদায়ক ছিল তার চেয়েও শতগুণ বেশি অন্তর্ঘাতী ছিল যাকে মনে মনে ভালোবাসার সর্বচ্চ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় সেই মানুষটার দেওয়া অপমান ও লাঞ্ছনা।

খণ্ডঃ দুই

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরুর একদম প্রথক দিককার কথা। সবেমাত্র দুইএক দিন হবে ক্লাস শুরু হয়েছে। এমনি রৌদ্রজ্জ্বল এক মিষ্টি সকালে আফজাল মধুর ক্যান্টিনের একদম দক্ষিণ কোনের একটা টেবিলে বসে চায়ের কাপে ঠোঁট ভেজাচ্ছে আর “দৈনিক বাংলাদেশ” বার্তার প্রধান প্রধান শিরোনামগুলোতে চোখ বুলাচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ সে পেছন দিক থেকে তার কাঁধে রাখা কারো হাতের আলতো স্পর্শ অনুভব করলো এবং মৃদু স্বরের সুমিষ্ট আওয়াজ তার কর্ণকুহরে ভেসে আসলো, “আচ্ছা, আমি কি পত্রিকাটা একটু দেখতে পারি। একটা ভীষণ জরুরি দরকার ছিল”। কাঁধে হালকা নরম ছোঁয়া আর অসম্ভব সুন্দর কণ্ঠস্বরের সাথে মৃদুকোমল ভদ্রকোচিত বিনয়ী আহবান শ্রুত হয়ে আফজাল তৎক্ষণাৎ পেছন ফিরে তাকালো। শ্যামল গাত্র বর্ণ,লম্বা বেশ খানিকটা, পেটানো শরীর, কোঁকড়ানো চুল, মায়াবী চোখে আর লালসাদা চেকের নকশা করা শার্ট পরিহিত সুঠাম দেহের অধিকারী এক দুরন্ত তরুণ তার পেছনে ঠায় দাড়িয়ে। প্রথম দেখাতেই আফজালের কাছে মনে হল পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের অমর সৃষ্টি রুপাই কবিতার স্বয়ং রুপাইই যেন তার সামনে দাড়িয়ে। আফজাল কিছুক্ষণ একনাগাড়ে অপলক দৃষ্টিতে অদ্ভুত ভাবে তার দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল। কিয়দক্ষন পর তার চোখে আফজালের চোখ পড়তেই স্মিত হাসি হেসে সে যখন পুনরায় আবারো পত্রিকা দেখার ইচ্ছা পোষণ করলো ঠিক তখনই আফজাল সংবিৎ ফিরে পেয়ে তার প্রতি জবাব দিল,
– জি হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই পত্রিকা দেখতে পারেন। এই নিন দেখুন।
~ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আর আমি ভীষণ দুঃখিত যে এভাবে আপনার কাঁধে হাত দিয়ে জোর করে পত্রিকা চাওয়াটা আমার উচিত হয়নি। আসলে আমি অনেকক্ষণ যাবত আপনাকে পেছন থেকে ডাকছিলাম। কিন্তু আপনি পত্রিকা পড়াতে এতোটাই নিমগ্ন ছিলেন বিঁধায় আমার কথা ভালোভাবে খেয়াল করতে পারেননি। তাই ওভাবে আপনার কাঁধে হাত দিয়ে আপনাকে ডাকতে বাধ্য হয়েছিলাম।
_ আরে ঠিক আছে তো। এতো কৈফিয়ত দেখানোর দরকার নাই। আমি এমনিতেও কিছুই মনে করি নি।
~ ধন্যবাদ । আমি কি এখানে একটু বসতে পারি।
_ হ্যাঁ অবশ্যই বসতে পারেন, বসুন বসুন। আচ্ছা যেহেতু আমরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সেহেতু আমরা তো একে অন্যের সাথে পরিচিত হতেই পারি, তাই না ?
~ কেন নয়! অবশ্যই আমরা পরিচিত হতে পারি। আমি রফিক। বিক্রমপুর থেকে এসেছি।
_ আর আমি আফজাল। বাড়ি ময়মনসিংহ । সবেমাত্র প্রথম বর্ষে ভর্তি হলাম। এখনো কোন হলে আসন পাইনি তাই আপাতত কিছুদিন উত্তরাতে খালার বাসাতেই থাকছি ।
~ আরে আমিও তো প্রথম বর্ষের ছাত্র। আপনি কোন সাবজেক্টে আছেন ? আমি অর্থনীতি নিয়েছি।
_ বাহ! কি তাজ্জব ব্যাপার। আমিও তো অর্থনীতিতেই আছি।
~ সত্যিই !!! হা হা হা হা। দেখলেন কাকতালীয় ভাবে আমাদের দুইজনের কতকিছুই মিলে গেলো ।
_ হা হা হা ! আসলেই ভীষণ অবাক করা কাণ্ড। আপনি কোথায় থাকেন। মানে কোন হলে সিট পেয়েছেন ?
~ না এখনো পাই নি। মতিঝিলে আমাদের এলাকার এক বড়ভাইয়ের মেসে উঠেছি।
_ ও আচ্ছা। দেখলেন আমিও সিট পাই নি, আপনিও পান নাই। তার মানে আরেক জায়গাতেও কিন্তু আমাদের মিল হয়ে গেলো । তাই না ?
~ হা হা হা !!! সত্যিই তো, তাই !

খণ্ডঃ তিন

সেদিন সকালে মধুর ক্যান্টিনে আফজালের সাথে রফিকের প্রথম দেখা ও অতপর পরিচয় হয়। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলো প্রায় মাস দুয়েক পর যখন কাকতালীয়ভাবেই তারা দুজনে একত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মোহাম্মাদ মহসিন হলের ৩০২ নম্বর কক্ষে একসাথে আবাসিক সুবিধা লাভ করলো। প্রথম পরিচয়ের দিন হতেই রফিকের প্রতি আফজালের বেশ দুর্বলতা ছিল তার উপর আবার রফিকের সঙ্গে একই রুমে থাকতে পারাটা তার কাছে যেন পাতের গরম ভাতে খাটি ঘিয়ের মতন মজা অনুভূত হতে লাগলো। মানুষ হিসেবে আফজাল বেশ মিশুক,আলাপি আর বন্ধুবাৎসল প্রকৃতির। অতি সহজেই কাউকে আপন করে নেবার এক অকৃত্রিম ক্ষমতা ছিল আফজালের ভেতোরে। অন্যদিকে রফিক কিছুটা আড্ডাবাজ,মেজাজি ও পরোপকারী স্বভাবের। কিন্তু একই কক্ষে থাকার সুবাদে দুইজনের মধ্যে খুব দ্রুতই ভীষণ গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বন্ধু মহলে অনেককেই তাদের দুইজনের মধ্যকার এমন গলায় গলায় ভাব নিয়ে ঈর্ষা করতেও দেখা যায়। যদিও আফজাল, রফিক, সুজন,পরেশ,আজাদ আর শমশের এই পাঁচজন ভার্সিটিতে সিনিয়র-জুনিয়র ও পরিচিত বন্ধুমহলে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একদল বন্ধু হিসেবে বেশ সুপরিচিত তবুও এদের মধ্যে আফজাল ও রফিকের সখ্যতা ছিল বাকী অন্যান্যদের চেয়েও ঢের বেশি। এতোটাই বেশি গভীর সম্পর্ক ছিল যে, কেউ কেউ তাদেরকে মানিকজোড় বলতো। আবার বান্ধবীরা কখনো কখনো মশকরা করে আফজাল-রফিক জুটিকে জামাই-বউ বলে ডাকতেও কার্পণ্যতা করতো না। তাদের দুইজনকে ঘিরে বন্ধুমহলের এমন ঠাট্টাতামাসা ও কৌতুকপূর্ণ আচরণ রফিকের কাছে নিতান্তই দৃষ্টিকটু, লজ্জাস্কর এবং বিব্রতকর বলে ঠেকলেও আফজালের কাছে বিষয়টা বরাবরই বেশ উপভোগ্য ছিল।

খণ্ডঃ চার

আড্ডা, ক্লাস, নোট মিলিয়ে পড়া,ঘুমনো সবকিছুই যেন একই সাথে করাটা দুইজনের রুটিন হয়ে দাড়ায়। একজন না খেলে আরেকজনও খেত না। এমনও হয়েছে যে সময়ের অভাবে দুইজনেই একসাথে গোসল করতে বাথরুমে ঢুকে পড়েছে । আবার দেখাগেল কেউ একজন গোসল সেরে বাথরুম থেকে তোয়ালে পেঁচিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে তো আরেকজন সেইটা হ্যাঁচকা টানে খুলে দিলো। অমনি শুরু হয়ে গেলো যুদ্ধ। বিছানায় গড়াগড়ি একে অপরকে বালিশ দিয়ে মারা। পেছন থেকে জাপটে ধরে বিছানায় ফেলে পিঠে কামড় দেওয়া। আবার কেউ কারো লুঙ্গী খুলে জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলা। এমনসব খুনসুটি আর দুষ্টু মিষ্টি ফাজলামো করতে করতে কখন যে বন্ধুত্বের সীমানা ছাপিয়ে নিজের অজান্তেই আফজাল রফিককে মনে মনে ভালোবেসে ফেললো তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি। একবার আফজাল জ্বরে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লে রফিক সারারাত জেগে তার মাথায় জলপট্টি লাগিয়ে সেবা শুশ্রূষা করে সারিয়ে তুললো। মাঝে মাঝে আফজালের প্রতি রফিকের অতি স্নেহ পরায়ণতা,মায়া ও দরদের জন্য সেও মনে মনে ভাবতো হয়তো রফিকও নিশ্চয়ই তাকে ভালোবাসে। কিন্তু রফিকও হয়ত মুখ ফুটে আফজালকে ভালোবাসার কথাটা তাকে বলতে পারছে না। তবে তার দৃঢ় বিশ্বাস রফিক তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে এবং আফজালের দেয়া ভালোবাসার প্রস্তাবও রফিক সাদরেই গ্রহণ করবে। কিন্তু আফজালও আগবাড়িয়ে বলতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে ভেবে অনেকবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সাহস করে বলে উঠতে পারেনি। এভাবে দিন গড়িয়ে মাস বছর পেরিয়ে ভার্সিটি লাইফের শেষ ক্ষণে পৌঁছে গেলেও আফজাল কোনভাবেই রফিককে সে বন্ধুর চেয়েও অন্যভাবে পছন্দ করে , তাকে নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবতে তার ভাললাগে, তাকে আসলে বন্ধু নয় প্রেমিক প্রবর হিসাবে ভালবাসতে চায় সেই কথা বলতে পারেনি।

খণ্ডঃ পাঁচ

দিনটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ছাত্র জীবনের শেষ দিন। অবশেষে ভার্সিটি পিরিয়ডের একদম শেষদিন অর্থাৎ স্নাতক শেষ পর্বের ফলাফল ঘোষণার দিনটিকেই আফজাল ঠিক করলো রফিককে যে সে ভালোবাসে সেটা তাকে সরাসরি জানাবে। সবাই তখন সদ্য গ্র্যাজুয়েট হবার অপার আনন্দে উদ্বেলিত। তাই সবাই যখন মধুর ক্যান্টিনে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট উদযাপনের বুনো উল্লাসে ব্যতিব্যস্ত ঠিক তখনি আফজাল রফিককে ক্যান্টিনের একদম দক্ষিণ কোনের টেবিলের কাছে টেনে নিয়ে গেলো। ঠিক যেই টেবিলেই তাদের দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ ও পরিচয় হয়েছিল। সবার অগোচরে রফিকের ঠোঁটে হালকা একটা চুমু খেয়ে তার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে নির্দ্বিধায় বলে দিল,“আমি তোকে অনেক ভালবাসি রফিক। তবে সাধারণ আর পাঁচটা বন্ধুর মত করে নয়। বন্ধুর চেয়েও অনেক বেশি করে অন্যভাবে। আমি তোকে আমার প্রেমিক হিসাবে চাই। আমার শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু প্রতি মুহূর্তে পৃথক পৃথক ভাবে চিৎকার আমাকে বলে তারাও তোকে ভীষণ ভালোবাসে। তুই যদি বলিস সারাটা জীবন একলা গাছের তলায় দাড়িয়ে থাকবো। পৃথিবীর সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেও আমি শুধু তোকেই চাই। তুই ছাড়া আমার শরীর মিথ্যা, আমার নিঃশ্বাস,ঘাম,বেচে থাকা মিথ্যা। আমি তোকে অনেক ভালবাসি রফিক”।

খণ্ডঃ ছয়

শাহবাগের মোড় থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই আফজাল সাহেব গাড়ি চালিয়ে মধুর ক্যান্টিনের সম্মুখে এসে থামলেন। ব্যবধান পঁচিশ বছরের হলেও রাস্তা চিনতে এতোটুকু ভুল করলেন না। গাড়ি থেকে নেমেই এদিকদিক তাকিয়ে দেখলেন তার রেখে যাওয়া সেই মধুর ক্যান্টিন আর আগের মতন নেই। জীর্ণশীর্ণ অবস্থার ক্যান্টিনের সামনের সেই বিশাল বুড়ো বটগাছটা আজ উধাও। টিনে মরিচা ধরেছে দেয়ালের রঙ উঠে ফ্যাঁকাসে হয়ে গেছে। তবুও এতদিন পর পুরনো সেই জায়গায় পা রেখে ভেতোরে এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলেন। কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজেকে সেই তরুণটি ভাবতে লাগলেন। ধীরেধীরে ক্যান্টিনের ভেতোরে প্রবেশ করলেন। ভেতোরে ঢুকতেই বুকটা খা খা করে উঠলো। অজানা আর্তনাদে চিৎকার করে কাঁদতে মন চাইল। সেইদিনের শেষ মুহূর্তে রফিকের অনর্গল বলে যাওয়া সেই কথাগুলোর আওয়াজ চারদিক দিক থেকে তার কানে ভেসে আসতে লাগলো। শুধুই রফিককে ভালবেসেছিলেন রফিককের কাছে এইকথা ব্যক্ত করাটাই কি ছিল তার অন্যায়। যার জন্য রফিক সেইদিন লোকভর্তি এই ক্যান্টিনেই তাকে অপমান করেছিল। সবার সামনে তাকে হাস্যকর বস্তুতে পরিণত করে লোকজনের হাসির খোরাক যুগিয়েছিল। সেইদিনকার কথা ভাবতে ভাবতে আফজাল সাহেব ধিরস্থির পায়ে ক্যান্টিনের দক্ষিণ কোনের সেই টেবিলের সামনে কাছে এসে থামলেন। চেয়ারটা টেনে টেবিলের সাথে গা ঘেঁষে বসলেন। খেয়াল করলেন যে, টেবিলটা অদলবদল হলেও জায়গাটা কিন্তু সেই একই আছে। টেবিলটা হাত দিয়ে স্পর্শ করতেই হঠাৎ তার স্মৃতিতে তার প্রতি ব্যক্ত রফিকের সর্বশেষ বক্তব্যগুলো রোমন্থন হল, “ছি ছি ছি তুই এসব কি বলছিস আফজাল? তুই আমাকে ভালবাসিস? মানে কি? হাসতে হাসতে আমার পেট ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। তুই কি পাগল হয়ে গেছিস রে। একটা ছেলে হয়ে তুই আরেকটা ছেলেকে ভালবাসিস। যেখানে সব ছেলেরা মেয়েদের জন্য পাগল সারাদিন মেয়েদের পিছে ঘুর ঘুর করে সময় পার করছে। আর তুই কিনা আমাকে ভালবাসিস। আবার সেইকথা মুখ ফুটে বলছিস, লজ্জা করে না তোর। এই তোরা কে কোথায় আছিস এইদেখ আফজাল পাগল হয়ে গেছে ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। শমশের,পরেশ,আজাদ তোরা কই গেলিরে জলদি এখানে আয়। আফজালের পাগলামো দেখে যা। ও আমাকে কি বলছে শুনে যা, ও নাকি আমাকে ওর প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, আমাকে ওর প্রেমিক হিসাবে চায়। আফজাল সম্ভবত হিজড়া হয়ে গেছে নইলে ও কেন আরেকটা ছেলেকে ভালবাসবে। ওকে এক্ষনি পাগলা গারদে ভর্তি করতে হবে। ও বোধহয় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে”। বন্ধুদের সম্মুখে রফিকের কাছ থেকে প্রাপ্ত সেইদিন কার বর্ণনাতীত সেই অপমান, লজ্জা আর কটূক্তি আফজালকে বিমর্ষ করে ফেলে। কাউকে এতোটা ভালোবাসার পরিণতি এমন অমানবিক হতে পারে সেটা তার কল্পনাতেও ছিল না। প্রিয় মানুষের নিকট হতে এমন অপমানমূলক আচরণ প্রাপ্ত হবার কিছুদিন পরেই আফজাল একটা স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকাতে চলে আসে। তীব্র রাগ ও অভিমানের কারনে সে এতদিন কারো সাথেই কোনপ্রকার যোগাযোগ রাখেনি। এভাবেই দেখতে দেখতে বিদেশ বিভূঁইয়ে তার পঁচিশটি বছর অতিবাহিত হল। কিন্তু প্রথম প্রেম,প্রথম ভাললাগা আর প্রথম ভালোবাসা নাকি কেউ চাইলেও মন থেকে ভুলে থাকতে পারে না। আফজাল সাহেবও পারেননি। তাই হয়তো এতদিন পর তিনি ছুটে এসেছেন পুরনো সেই ক্যাম্পাসের সেই প্রিয় মধুর ক্যান্টিনে যেখানে তার প্রথম ও শেষ প্রেমের শুভ সূচনা হয়েছিল। প্রায় দুইযুগ পর তার হয়তো আর নতুন করে পাওয়ার কিছুই নেই তবুও চেনা সেই জায়গাগুলোতে একটু স্মৃতি হাতড়াতে দোষ কি। যদি এতে করে কিছুটা হলেও তার ভালোবাসার প্রিয় মানুষের স্পর্শ অনুভব করা যায়। যতই সেদিন রফিক তাকে অপমান অপদস্ত করে ভালোবাসার বলি দিয়েছিল কিন্তু সেতো তাকে সত্যিকারেরই ভালবেসেছিল।

খণ্ডঃ সাত

আচমকা আফজাল সাহেব পেছন থেকে তার কাঁধে রাখা কারো হাতের কোমল স্পর্শ অনুভব করলো এবং মিষ্টি একটা আওয়াজ শুনতে পেলো, “কেমন আছেন আপনি ?” মুহূর্তের মধ্যেই কাঁধ ফিরিয়ে আফজাল সাহেব দেখতে পেলেন প্রায় বিশ বছরের এক তরুণ যুবক তার পেছনে দাড়িয়ে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে ছেলেটা দেখতে অবিকল রফিকের মতই। অনেকটাই সেই একইরকম শারীরিক অবয়ব,চোখ চাহনি, ঠোঁটের স্মিত হাসি। আফজাল সাহেব তরুণ যুবাকে দেখে রীতিমত ভিরমি খেয়ে গেলেন। বিস্ময়ে বিমুঢ় আফজাল জলদি নিজেকে সামলায়ে প্রতিউত্তরে বললেন,
_ হ্যাঁ আমি ভালো আছি। কিন্তু তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না বাবা ?
~ আমি আফজাল। আমি আপনার বন্ধু রফিকের ছেলে। বাবাই আমার নামটা আপনার নামের সাথে মিলিয়ে রেখেছিলেন।
( তরুণ যুবকটির বাণীশ্রুত হয়ে আফজাল সাহেব যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি আসলেই বাস্তবে আছেন নাকি কোন ঘোরের ভেতোরে। হ্যাঁচকা টানে যুবকটিকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন।)
_ বল কি ? তুমি রফিকের ছেলে? আমি তো তাজ্জব বনে যাচ্ছি। কিন্তু তুমি আমাকে চিনলে কি করে। তুমি তো আমাকে আগে কখনো দেখো নি ?
~ বাবার মুখ থেকে আপনার অনেক গল্প শুনেছি। বাবা সবসময়ই আমাকে আপনার কথা বলত। তাই আপনাকে নিয়ে আমার একটা কল্পনা ছিল যে আপনি দেখতে ঠিক কেমন হবেন। মনে মনে আপনার যেমন অবয়ব এঁকেছিলাম আপনি প্রায় তেমনি। তাই আজ আপনাকে চিনে নিতে খুব বেশি কষ্ট হয়নি।
_ বাহ বাবার মত বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারো দেখি। তুমি বুঝলে কি করে আমি আজকে এখানে আসবো ?
~ আমিতো এখানেই থাকি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি আর এই মধুর ক্যান্টিনের দেখাশোনা করি। তাছাড়া আমি এমনিতেও আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কারণ বাবার আত্মবিশ্বাস ছিল আপনি ঠিকই কোন একদিন এখানে ফিরে আসবেনই।
_ হুম তোমার বাবার আত্মবিশ্বাসের প্রশংসা করতেই হয়। আচ্ছা রফিক এখন কোথায় আছে ?
~ বছর দুয়েক হতে চলল বাবা মারা গিয়েছেন।
( রফিকের মারা যাবার খবর শুনে আফজাল সাহেব ভীষণ মূর্ছা গেলেন। চেয়ারটা টেনে নিয়ে আবারো বসে পড়লেন। এতদিন তার সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজানা ছিল সেইটাই বরং ভালো ছিল। সে বেঁচে আছে, সুখে আছে ভালো আছে ভেবে নিজে এক ধরণের আত্মতৃপ্তি অনুভব করতেন। নিজের ভেতোরে রফিককে ধারণ করে রেখেছিলেন তার ভালোবাসাকে লালন করেছিলেন। কিন্তু রফিকের মৃত্যুর খবরে আজ কেন যেন মনে হচ্ছে সমস্ত কিছু বিলীন হয়ে গেলো। তার অস্পৃশ্য ভালোবাসার কফিনে কে যেন শেষ পেরেকটিও ঠুকে দিলো। )
_ আর কয়েকটা দিন বেঁচে থাকতে পারলো না, আমার জন্য। অবশ্য বেঁচে থাকলেই কি? আমি তো আর তার সাথে কোনোদিনই মুখোমুখি হতাম না। তার চেয়ে মরে গিয়েই ভালো করেছে। কি হয়েছিল রফিকের যে এতো দ্রুতই পৃথিবী ত্যাগ করলো ?
~ শরীরের এক পাঁশ প্যারালাইজড হয়ে বাবা প্রায় বছর দশেক ক্র্যাচে ভর করে চলাফেরা করতেন। সরকারী চাকরীটা ছেঁড়ে দিয়ে তারপর তিনি এই ক্যান্টিন দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। কিন্তু শেষের দিকে শরীরের অবস্থা মারাত্মক খারাপ হয়ে তিনি একদমই শয্যাশয়ী হয়ে পড়েন। অতপর মারা গেলেন। তারপর থেকে আমি এই ক্যান্টিন দেখাশোনা করি। জানেন বাবার একটা ধারণা ছিল আপনাকে দেয়া অন্তিম কষ্ট, অপমান আর লজ্জা অভিশাপ হয়ে তার জীবনের এমন করুন দশা হয়েছিল। তিনি আমাকে আপনার সম্পর্কে সবকিছুই বলেছিলেন। আপনার প্রতি তার চরম অন্যায়ের জন্য ভীষণ অনুতপ্ত ছিলেন। তিনি জানতেন এর প্রায়শচিত্ত করে যাওয়া তার জীবদ্দশায় সম্ভব না তাই যদি কোনোদিন আমার সাথে আপনার দেখা হয়। আমি যেন তার হয়ে আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেই। আপনি যেন তাকে অভিশাপ না দেন, ক্ষমা করে দেন। তিনি আসলে তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। ভালোবাসা তো ভালোবাসাই সেখানে ছেলে বা মেয়ে কি। যেকারো জন্য যেকারো হৃদয়েই ভালোবাসার বীজ অঙ্কুরিত হতে পারে। তাই সেইদিন না বুঝে আপনাকে ঐভাবে অপমান করা তার মোটেও ঠিক ছিল না। মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে আমার হাত ধরে বাবা বলেছিলেন, “ যদি আফজালের সাথে তোর কোনদিন দেখা হয় তাহলে আমার পক্ষ থেকে তার পা ধরে ক্ষমা চেয়ে বলিস, আমি তার ভালোবাসার প্রতিদান হয়ত দিতে পারিনি কিন্তু ক্ষুদ্রতম একজন বন্ধু ভেবে থাকলেও যেন সে আমাকে অভিশাপ না দেয়। আর আমিও যে সত্যিকারের তাকে ভালবেসেছিলাম সেটা সে হারিয়ে যাবার অনেক পরে উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম কিন্তু তখন আর কিছুই করার উপায় ছিল না। তাই তার ভালোবাসাকে আমার ভেতোরে বাচিয়ে রাখতে তার নামের সাথে মিলিয়েই আমার ছেলের নামও আফজাল রেখেছিলাম”।

(আফজাল সাহেব হাত দিয়ে অনর্গলভাবে বলে যাওয়া ছেলেটির ঠোঁট দুটিকে থামিয়ে দিলেন। তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। কেন মিছেমিছি এতদিন পরে এসে পুরনো ভালোবাসা আবার নতুন করে জাগতে শুরু করছে ভাবতেই তার বুক ফেটে কান্না আসতেছে।)

_ চুপচুপ আর একটা কথাও বলবা না। আমি আর সইতে পারছিনা। পঁচিশ বছর ধরে এই জ্বালা বয়ে বেড়াচ্ছি। তুমি আর নতুন করে জ্বালানি দিও না। তোমার কি মনে হয় আমি রফিককে অভিশাপ দিতে পারি ? যার জন্য ওর এতো বড় অসুখ করেছিল। (চোখের জল সামলে বললেন আফজাল সাহেব)
~ না না আমি মোটেও সেটা বিশ্বাস করিনা। এটা বাবার একটা ভ্রান্ত ধারণা ছিল। আসলে আজীবন তিনি ব্যাপারটা নিয়ে ভীষণ অপরাধ বোধে ভুগছিলেন। তার অপরাধের জন্য তিনি নিজেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারেননি তাই এমন ভাবে বলতেন। আপনি শুধু বাবাকে মন থেকে একটু ক্ষমা করে দিয়েন তাতেই বাবার বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে।

_ আরে বোকা যাকে আমি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি যার জন্য এতদিন পর এখানে ছুটে এসেছি তাকে আমি অভিশাপ দিতে যাবো কেন। আর ক্ষমা করার তো প্রশ্নই আসে না। আমি রফিককে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভালোবেসে যাবো। আমি ভেবেছিলাম এবার শুধু এসে এখানে একবার ঘুরে আমেরিকাতে চলে যাবো আর কোনোদিনও এখানে ফিরে আসবো না। কিন্তু তোমাকে দেখার পরে মনে হচ্ছে আমি যেন আমার হারানো রফিককে তোমার ভেতোরে দেখতে পাচ্ছি তাই যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন বছরে একটিবারের জন্য হলেও আসবো তোমাকে দেখতে। কারণ তোমার মাঝেই আমার রফিক বেঁচে থাকবে আমার ভেতোরে। তোমার মাঝেই বসত করবে আমার ভালোবাসা।
~ আমি কি একটু আপনার পা টা ছুঁয়ে দেখতে পারি, বাবার খুব ইচ্ছা ছিল।
_ পায়ে না! তুমি আমার বুকের উপরে একটু মাথা রাখো। তাহলে আমি আমার আত্মায় অস্তিতে রফিকের সংস্পর্শ অনুভব করতে পারবো। (কাঁদতে কাঁদতে টেনে বুকের সাথে মিলিয়ে ধরে)
~ আপনি কাঁদছেন তাই না ?
_ কই না তো, মোটেও কাঁদছি না।
~ তাহলে এইযে আমার কাঁধের উপরে অশ্রু ফোঁটা পড়লো যে।
_ আরে চোখের ভেতোরে কি একটা ময়লা ঢুকেছে তাই।
~ আপনি মিথ্যা বলছেন।
_ এই তুমি কথায় কথায় বাপের মতন এতো জেরা করো কেন ? একদম রফিকের স্বভাব পেয়েছ।
~ হয়তো তাই । কিন্তু আপনি কাঁদছেন এটা সত্য। কাদুন বেশি করে কাদুন। কাদলে মন হালকা হবে।
_ আচ্ছা আমাকে রফিকের কবরের কাছে নিয়ে যাবে ? আমি ওর কবরটা একটু ছুঁয়ে দেখবো ? ভালোবাসা প্রকাশ করার পূর্বে ওকে বহুতবার স্পর্শ করেছি কিন্তু ভালোবাসার পর ওকে আর ছুঁয়ে দেখা হয়নি শুধুই অনুভব করেছি। খুব ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করছে। অনেকদিন পর ভীষণ কাছ থেকে রফিককে অনুভব করতে ইচ্ছে করছে । নেবে আমায় ওর কবরের পাঁশে। আমার প্রেমের সমাধির পাঁশে।
~ জি অবশ্যই নেবো। এতে করে হয়তো বাবার আত্মাও শান্তি পাবে। তার অতৃপ্ত আত্মার ভেতরে গুমরে থাকা প্রেমও হয়তো আজ প্রকাশিত হবে, তৃপ্ত হবে। নিজের উপরে জন্মানো এক গাদা ক্ষোভ, অপরাধবোধ কিছুটা হলেও কমবে। হোক সে মর্তলোকে অনুস্পস্থিত কিন্তু তার অব্যক্ত ভালোবাসা হয়তো গোপনে অন্তরালে আপনাকে কাছে পেয়ে সবার অলক্ষে উচ্চারিত হতে পারে। তার সমাধিতে আপনার প্রেমের ছোঁয়া হয়তো নতুন করে নতুন এক নাম না জানা সংজ্ঞাহীন কোন ভালোবাসার আবির্ভাব ঘটাবে।

(ভালোবাসার আদৌ কোন কাগুজে-কলমে সংজ্ঞা আছে কিনা তা জানা নাই তবে শুনেছি এক এক জনের কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞা নাকি এক এক রকম। কিন্তু এই গল্পে ব্যক্ত ভালোবাসার প্রকৃত সংজ্ঞা কি সেটা পাঠকেরাই খুঁজে বের করুন। তাই গল্পের শিরোনাম দিলাম “সংজ্ঞাহীন ভালোবাসা”)

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ২ই আগস্ট, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.