স্কাইস্ক্রেপার

লেখকঃ হোসেন মাহমুদ

-অসহ্য!!!

অর্পণ তোর ন্যাকামো গুলো হিন্দি সিরিয়ালের ফুটেজ খাওয়ার তালবাহানার মত বিরক্তিকর। কবে বন্ধ করবি এই সব?

– সকাল বেলা দুই মাইল পায়ে হেঁটে বাড়ী বয়ে এসে তোমার পছন্দের ব্ল্যাক কফি নিয়ে গুড মর্নিং বলাটা ন্যাকামো?

-অফকোর্স, কেয়ারিং এর অত্যাচার দিয়ে মাথা ধরানোর জন্য আমার মমতাময়ী মা একাই যথেষ্ট। তোকেও যখন ঐ একই চরিত্রায়নে দেখি, মনে হয় মায়ের সাথে জোট মেলাতে আমার প্রয়াত বাবা কবর থেকে উঠে এসেছেন।

-ইরাজ! রাগ ঝাড়বে তো আমার উপরে ঝাড়, মৃত বাবাকে মাঝখানে ঢুকিয়ে তাকে অপমান, ব্যাপারটা কি বাড়াবাড়ি নয়?

-মটেও নয়। সকাল সকাল আমাকে চটে দেয়ার জন্য কোন মহাপুরুষের মাথার দিব্যি খেয়েছিস বল তো?

-ইরাজ আমি…।

নাহ আর একটি শব্দ ও নয়, আর শব্দ ব্যয় মানে ইরাজের রাগের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়া। এর চেয়ে ঢের ভালো শব্দহীন হওয়া। যা প্রতিনিয়ত অর্পণকেই হতে হয়। দোষ যারই হোক না কেন পরাজয়টা আগ বাড়িয়ে অর্পণ নিজের মাথায় নিবে। এর জন্য অবশ্য অর্পণের আছে নিজস্ব এক মনভোলানো যুক্তি,
“সব দুঃখ কিংবা পরাজয়ের উপস্থিতি বোঝাতে বেহালার করুণ সুরের প্রয়োজন পড়ে না। কিছু পরাজয়ে বাঁধা থাকে মনের নিজস্ব সুরের টান, সেই সুর গলায় সাধতে সা রে গা মা না জানলে ও চলে। আর হার জিৎ সেখানে আপাদমস্তকেই অবান্তর”

অর্পণ মনে করে তর্কের সিঁড়ি ভেঙ্গে যুক্তিতে চুক্তি, মামলায় মোকদ্দমায় খাটে, ভালোবাসায় নয়। যে ভালোবাসা হার, জিৎ কিংবা গিভ অ্যান্ড টেকে নির্ভরশীল সে ভালোবাসা ডাস্টবিনের আফ্রিকান মাগুরের মত, বাহির থেকে যতই বড়সড় হক না কেন স্বাদের বেলায় ঠং ঠং। ভালোবাসা দিতে পারাটাই বড়, বিনিময়ের ছাঁচে ফেলে পাওয়া না পাওয়ার লভ্যাংশের হিসাব, সত্যিকার প্রেমিক কখনো খুঁজে না।

অর্পণ রিকশায় চড়ে বসল। অর্পণ ভাবছে সে এমন কি করল যাতে ইরাজের মেজাজ বাচ্চাদের এংরি বার্ডের চেয়েও মারাক্তক এংরিতে রূপান্তরিত হল? অর্পণ হিসাব মিলিয়ে দেখেছে, ইরাজ ইদানীং পানের থেকে চুন খসলেই ছাঁৎ করে উঠে, এক আধবার হলেও হজম করে যায়। তাই বলে যখন তখন? তাও অর্পণের উপর? যে অর্পণ তার ভালোবাসা? এই ভালোবাসার কথাটাও একদিন হঠাৎ করে ইরাজ নিজ থেকে পেড়ে বসে অর্পণের সামনে। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো সোনালী দিন গুলী।

রামিম, সাগর, শুভ, রেজা, সৌমিন, ইরাজ আর অর্পণ, ঘড়ীতে সাতটা বাজা মানে কাজ কর্ম ফেলে সবার তোড়জোড়। উদ্দেশ্য মান্না দের কফি হাউজ নয়, ঢাকার রমনা পার্ক। সাতটাতে শুরু করে রাত ১০ টা অবধি ঘাসের উপর গোল বৈঠকে কিংবা কবিতা পড়ার প্রহর এসেছেতে টান মেরে জগিং ফিল্ডে দৌড়াদৌড়ি। অন্যরকম ছিল সময়টা, সবাই নূতন ছেলে ফেলে দেখলে ঠোঁটে শিস কিংবা লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে এগিয়ে গিয়ে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিত। শুধু অর্পণই ছিল আলাদা, শান্ত-শিষ্ট আর ভদ্রতার দারুণ খেতাব ছিল বন্ধু মহলে। কম বেশি সবাই খাবারে অ-খাবারে ছো মারত কিন্তু অর্পণ এই সবের মধ্যে ছিল না। তার কথা সমপ্রেমী হয়েছি বিধায় শুধু সমগোত্রীয় শরীর ফেলেই লাফিয়ে পড়তে হবে? শরীর ছাড়া ও মন, ভালোবাসা আর আবেগ বলতে কিছু আছে। আমি তারই পূজারী, শরীর আমার কাছে পাঁচ মিনিটের ক্ষুধা নিবারণ ছাড়া কিছুই নয়।

তার সম্পূর্ণ উল্টো চরিত্রের ছিল ইরাজ। তার কাছে মনের ক্ষুধার চেয়ে শরীরের ক্ষুধাই প্রাধান্য পেত বেশী। সারাক্ষণই হেঁয়ালি তামাশা নিয়ে কাটতো তার পুরো সন্ধ্যা। মানুষ সবসময় বিপরীত দিকের প্রতি আকর্ষিত হয়। কেউ কালো হলে তার চোখ ফর্সার দিকে যায় ঘুরে ফিরে। অর্পণ শান্ত শিষ্ট তাই চঞ্চল প্রাণবন্ত ইরাজের দিকেই থাকত তার চোখ। অর্পণ জানত সে যা ভাবছে তা হওয়ার নয়, ইরাজ কোন দিন ও কারো প্রতি সিরিয়াস হবে না। তার ধারণা পাল্টাতে বাধ্য করল ইরাজ। রাতারাতি বদলে যেতে লাগল সে। আকারে ইঙ্গিতে অর্পণের কাছে আসতে চাইত সে, অর্পণ বুঝে ও নিজেকে সংযত রাখত। কিন্তু মানুষ চাইলে ও সব সময় নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এক দিন সবার সামনে হাঁটু গেঁড়ে ইরাজ অর্পণকে অফার করে বসে। অবশ্য অর্পণ সেই দিন হ্যাঁ করেনি কিন্তু নাও করতে পারেনি।
অর্পণ চুপ করে থাকে। সব কিছু প্রকাশ করতে হয় না সবসময়। কিছু কথা সযত্নে হৃদয়ে তোলা রাখতে হয়, কিছু কথা জিব্বহায় তুলে ধরা মানে বাসি করে দেয়া। কিছু ভালোলাগাকে কখনো পুরনো গন্ধ তরকারীর মত বাসি করতে নেই। অর্পণ চুপ দেখে ইরাজ ধাক্কা দেয় তাকে।

স্পিড ব্রেকারের সাথে ধাক্কায় অর্পণ রাস্তায় পড়ে যেতে গিয়ে ও রিকশার হুট ধরে নিজেকে সামলেয়ে নেয়। অর্পণের রাগ হচ্ছিল নিজের উপর, কেন সে শুঁকনো মুখ দেখে নূতন গোঁপওলাকে নিয়ে আসল, এর চেয়ে তার বুড়ো রিকশাওলাটাই ভাল ছিল। বয়সের কথা মাথায় রেখে ধাক্কা উশটা থেকে নিজেকে সামলেয়ে চলত সাথে অর্পণকে ও চিন্তার এমন একটা মুহূর্ত থেকে ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে আনত না। ধাক্কা হজম করে অর্পণ আবার ভাবনার দোকান খুলে বসে…

তার পর থেকে তাদের পথচলা শুরু। কাঁঠালের আঠার মত লেগে থাকত একজন আরেকজনের সাথে। দুইজনের পরিবার পর্যন্ত তাদের মানিক জোড় উপাধি দিয়ে বসে। বিপত্তি ঘটে তার দুই মাস পরে, ইরাজের চালচলন আগের মত হতে লাগল। অর্পণ তার জায়গাতে অনড়, তার কথা ভালোবাসায় শুধু সুখ থাকবে এমন কোন কথা নেই। জগরা, মন মালিন্য ভালবাসারই একটা অংশ, আর বিশ্বাস ভালোবাসার মূলমন্ত্র। ইরাজকে নিয়ে লোকে আজেবাজে কথা বলে বিশেষ করে অর্পণের বন্ধুবান্ধবরা, সেই দিকে কান দেয়না সে। তার মতে ভালোবাসার প্রধান খুঁটি হল বিশ্বাস। যে ভালোবাসায় অবিশ্বাস দানা বাঁধে সেই ভালোবাসার পতন অনিবার্য। ইরাজকে মন প্রাণে বিশ্বাস করে অর্পণ, ইরাজ হয়তো কিছুটা চঞ্চল কিন্তু বদঅভ্যাসী নই। আর দোকা দেয়ার তো প্রশ্নই উঠে না। এইতো সেইদিন অর্পণের ফ্রেন্ড অতনু বাড়ী বয়ে বদনাম করে গেল ইরাজের, অতনুদের পাশের ফ্লাটে নাকি জামিল নামের কোন ছেলে ইরাজের ক্লাসমেট, প্রায়শই ইরাজ সেই বাসায় যাতায়াত করে, ব্যাপারটা অতনুর কাছে ভালো ঠেকল না বলে বন্ধুকে বলতে এলো। কিন্তু ইরাজ সেইটা আমলে না নিয়ে উল্টো তাকে সাত পাঁচ শুনীয়ে হাই কোর্ট দেখিয়ে দিল। অর্পণ বলে আমি ছাড়া ইরাজের নিজস্ব একটা জগত আছে, বন্ধু, বান্ধবী তার অংশ হতেই পারে। ইরাজ তাদের বাসায় যাতায়াত করে শুনে আমি কুটনি গৃহিণীর মত তেলে বেগুনে জ্বলে গিয়ে খুন্তি দিয়ে ইরাজের মাথা ফাটাবো? শুন, আমার ভালোবাসা হল নীলাভ খোলা বিশাল আকাশ, খাঁচায় বন্ধী পাখী নয়। আমার ভালোবাসা উন্মুক্ত, তাকে আকাশে উড়ার স্বাধীনতা দিয়েছি, যদি আমার ভালোবাসা সত্যি হয়, তাহলে যত ঝড় তুফানই আসুক না কেন ভুলক্রমে ও সেই ভালোবাসা অন্য কোন নীড়ে ভিড়বে না, অন্ধকারছন্ন দুর্গম মুহূর্তে ও সে পথভ্রষ্ট হওয়ার নয়, সব বাঁধা অতিক্রম করে আমার নীড়ে ফীরে আসবেই। সেই বিশ্বাস আমার আছে। সুতরাং আর কোন দিন ও আমাকে ইরাজের ব্যাপারে কান পড়া দিতে আসবি না। অর্পণের কথা শুনে অতনু একটা উত্তরই দিল, দোস্ত শুন, ভালোবাসায় বিশ্বাস থাকা ভাল কিন্তু অন্ধবিশ্বাস ভালো নয়। দোয়া করি তোর বিশ্বাস সারাজীবন টিকে থাকুক।

আজকে অতনুর কথাটা বার বার কানে প্রতিধ্বনি হচ্ছে অর্পণের, সত্যি কি সে ইরাজকে অন্ধবিশ্বাস করে? ইরাজ কেন করছে এমন? পরশু দিন রাতে রমনায় বসে আড্ডা দিচ্ছে সবাই, ইরাজ সবার সামনে নূতন একটা ছেলের হাত ধরে উঠে গেল। ইরাজের এই কাণ্ড দেখে সবাই অর্পণের দিকে তাকাচ্ছে। অর্পণ একটু মুচকি হেসে বলে সে মজা করছে। ভীতর ভীতর যত কষ্টই পাক না কেন নিজের ভালোবাসাকে অন্যর কাছে ছোট করতে চায় না অর্পণ। কালকে ইরাজকে প্রশ্ন করল অর্পণ ছেলেটা কে?

-কোন ছেলেটা?

-যার হাত ধরে পার্ক থেকে বের হয়েছিলে?

-ওহ আমার কাজিন, গ্রাম থেকে এসেছে। ঢাকার তেমন কিছু চিনে না তাই তাকে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম। কেন কি হয়েছে?

-না কিছু হয়নি।

-কিছু না হলে তুমি প্রশ্ন করতে না। আচ্ছা অর্পণ বিবাহিত বউদের মত জবাবদিহি নেয়াটা কি তোর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে?

-ইরাজ আমি শুধু জানতে চেয়েছি।

-সেই তো দেখতেই পাচ্ছি, উকিলের মত জেরা করছিস, আবার বলছিস শুধু জানতে চেয়েছিস।

-ইরাজ একটা সরাসরি কথা বলবে, এমন করছ কেন তুমি?

-কি করছি আমি?

-আচ্ছা বাদ দাও।

রিকশা থেকে নেমে হাঁটা ধরল ইরাজ। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না। আজ তার বিশেষ দিন, যার জন্য সকাল সকাল ইরাজের বাসায় গিয়েছিল সে। জন্মদিনের উইশ তো করলই না বিনিময়ে গোটা কয়েক কথা শুনিয়ে দিল। অর্পণ পার্কে এসে বসল, পকেট থেকে ইয়ারফোন বের করে মোবাইলে গান শুনছে আর চিন্তা করছে তাদের সম্পর্কটা কোন দিকে আগাচ্ছে। অর্পণ সিদ্ধান্ত নিল ইরাজের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে সরাসরি কথা বলা দরকার। সে আসলে কি চায় সেইটাই জানা দরকার।

গত দুইদিন অর্পণ বাসা থেকে বের হয়নি। ইরাজ একটি বার ও তার খবর নেয়নি। অর্পণ অবাক হয়ে ভাবছে ইরাজের কিছু হয়নি তো? তা না হলে সে দুই দিনে একবার ও ফোন করবে না সেইটা মেনে নেয়া যায় না। অর্পণ ভাবল একবার ইরাজের বাসায় গিয়ে খবর নেয়ার দরকার। এমন সময় অর্পণের মোবাইলে ফোন আসল ল্যান্ডলাইন থেকে।
-হ্যালো মামা আমি সালেহা, অতনু মামাগো বাড়িত কাম করি।
-হাঁ সালেহা বল, অতনু কোথায়?
-অতনু মামা(কান্না জড়ানো কণ্ঠে) মাথা ঘুরাইয়া পরিয়া গেছে। আফনি কি একটু আয়ইবেন?
-কি বল!! আমি এক্ষুনি আসছি।

অর্পণ তড়িঘড়ি করে সি.এন.জি ধরে অতনুর বাসায় এসে পৌঁছল। কাজের বুয়া কে জিজ্ঞাস করল অতনু কোথায়? বুয়া হাসতে হাসতে জবাব দিল মামা হের রুমেই আছে, আফনি যান। বুয়ার দাঁত কেলানি দেখে অর্পণের রাগ উঠে গেল। একটা মানুষ অসুস্থ আর মহিলা মুলা দেখিয়ে যাচ্ছেন। অতনুর রুমে ঢুকে অর্পণের চোখ কপালে উঠে যাওয়ার অবস্থা। সে দিব্যি সুস্থ, ফোন হাতে জানালার পাশে দাড়িয়ে দাঁত বের করে সেলফি তুলছে। অর্পণের রাগ চরমে উঠে এল। অতনু তুই!!

-আরে দাড়া পরে আমাকে ঠেঙ্গাস। আগে সামনের ফ্লাটের দিকে তাকিয়ে দেখ।

অর্পণ সামনের ফ্লাটের কাঁচের জানালার দিকে তাকিয়ে হালকা পর্দা সরানো ফাঁক দিয়ে যা দেখল, তার জন্য সে কোন দিন ও প্রস্তুত ছিল না। এক মিনিটের মত দেখে অর্পণ অতনুর বিছানায় বসে পড়ল। অতনু তাকে ধরে বলে,

-দোস্ত তুই ঠিক আছিস তো?

অর্পণের মুখে কোন কথা আসছে না। শুধু চোখ থেকে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। অর্পণ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ইরাজ!!! নৌ ওয়ে।

-অতনু তোর কোন ভুল হচ্ছে না তো? ছেলেটা ইরাজ নয় হয়তো অন্য কেউ।

-অর্পণ ভুল আমি নয়, তুই করছিস। সত্যিকথা বলতে তুই ভুলে পড়ে আছিস। তোর মনে আছে ঐ দিন বলেছিলাম সম্পর্কে বিশ্বাস থাকা ভালো তবে অন্ধবিশ্বাস ভালো নয়। তোর ভুল আসলে বিশ্বাস অবিশ্বাসে নয় অন্য যায়গায়। শুনবি সেইটা কোথায়?

অর্পণ মুখে কিছু বলতে পারে না প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে অতনুর দিকে তাকায়।

-দোস্ত শুন, বিয়ে বাড়ীতে অনেকে আসে যারা যে জামা পরে আসে তা নিজের থেকে বেশী খেয়াল করে সামলিয়ে চলে। কেন জানিস, কারণ সেইটা তার নিজের জামা নয় হয়তো কারো কাছ থেকে ধার করে এনেছে একদিনের জন্য। সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকে যদি খানিকটা জোল কিংবা দাগ পড়ে তাহলে জামাওলাকে কি জবাব দিবে। যদি সেইটা তার নিজের হত তাহলে যা ইচ্ছে তাই হক এতটা যত্ন নিয়ে চলার প্রশ্নই উঠত না, দাগ পড়ে নষ্ট হয়ে গেলে ফেলে দিবে। এখন আসি তোর কথায়, ভালবাসাটা ও ঐ জামার মতন, যাকে পরিয়েছিস সে যদি জানতে পারে এইটা তার নিজের জামা যা খুশি তাই করতে পারে তাহলে দাগ কিংবা নষ্ট করতে একটু কুণ্ঠিত হবে না। যদি সেই ভালোবাসার জামাটা তুই এমন একজনকে পরাস, সে জানে এইটা পুরোপুরি ভাবে তার নয় তাহলে ঐ ধার করা জামার মতন সে তোর ভালবাসাটাকে কেয়ার করে চলত। দোস্ত তোর ভুল এইখানে ইরাজ জানত, তুই তাকে নিজের থেকেও বেশী ভালবাসিস আর বিশ্বাস করিস। সে তোর দুর্বলতা জানে আর সেই সুযোগটাই পুরোপুরি হাতিয়েছে।

অতনুর কথা শুনে অর্পণের ভিতরটা ফেটে যেতে লাগল। তার কণ্ঠে কথা সরছে না। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে অর্পণ। ঘণ্টা খানিক পর অর্পণ অতনুকে বলে আমাকে একটু একা থাকতে দে। অতনু বলে না আমি তোর সাথে থাকবো, কোন কথা বলবো না তুই তোর মত একা থাক। এইবার অর্পণ একপ্রকার চীৎকার দিয়ে বলল, প্লীজ আমাকে একটু একা থাকতে দে। জীবনে এই প্রথমবার অর্পণকে এত উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনল অতনু। এক প্রকার ডরে ভয়ে অতনু রুম থেকে বেরিয়ে গেল, কিন্তু দরজা লাগাতে দিল না। অতনুর ভয় অর্পণকে নিয়ে, যদি সে উল্টা পাল্টা কিছু করে বসে? দশ মিনিট পর পর অতনু দরজার ফাঁক দিয়ে অর্পণকে দেখে যায়।

দিন গড়িয়ে এখন রাত, অর্পণ সারাদিন কিছু খায়নি। অতনু অনেক জোরাজোরি করেও পেটে দানা পানি দিতে পারেনি। রাত ১০ টার দিকে অর্পণ এসে অতনুকে বলল, সে বাসায় ফিরবে। অতনু তাকে তার বাসায় থেকে যেতে বলল, অর্পণ কিছুই শুনবে না সে বাসায় যাবেই যাবে। অতনু তাদের গাড়ী করে অর্পণকে বাসায় পৌঁছে দিল। তাকে রুমে বসিয়ে অনেক জ্ঞানী গুণী উপদেশ দিল। অর্পণের কানে কিছুই ঢুকছে বলে মনে হয় না।

এখন মধ্য রাত, অর্পণ রুমের বাতি নিবিয়ে অন্ধকারে বসে আছে। সে ভাবতে পারছে না কেন ইরাজ তার সাথে এমন করল। ইরাজ ভাল করেই জানে জীবনে প্রথম সে কাউকে ভালবাসল। অতনু বলে গিয়েছিল তাকে যত তাড়াতাড়ি ভুলতে পারবে তাতে তার ভালো। অর্পণের চীৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে আরে তাকে ভুলা এত সহজ? আমার বিছানায়, বালিশের কভারে তার স্পর্শ লেগে আছে, আমার টেবিলের উপর পাতায় ভাঁজ দেয়া বইটাতে তার দেয়া প্রথম শুঁকনো গোলাপের পাপড়ি গুলো, আমার বাথরুমের টাওয়েলটা এখনো ইরাজের হাতে মেলানো অবস্থায় আছে, আমার ওয়্যারড্রপে এখনো ইরাজের শরীরের গন্ধ জড়ানো জামা না ধোয়া অবস্থায় আছে, আমার ভিতরের রক্তে, হৃৎপিণ্ডের প্রতিটি যায়গায় সে, কি ভাবে আমি তাকে ভুলে যাব?

নাহ, চিৎকার করে সে কথা গুলো অতনুকে বলতে পারেনি। অর্পণ চোখ বন্ধ করে আছে ঠিকই কিন্তু চোখের জল ঝরছে অনবরত। মোবাইলের এম.এম.এস এর শব্দ পেয়ে চোখ খুলে অর্পণ। অতনু একটা হিন্দি গানের ভিড়িও পাঠিয়েছে, সানের “ভুলে যা” অনিচ্ছার স্বত্বে ভিড়িওতে ক্লিক করে অর্পণ। গানের ভিডিওর সাথে তার জীবনের অনেক মিল দেখে খানিকটা আগ্রহ নিয়ে দেখতে লাগল অর্পণ,
“চোখের জল বিসর্জন দিয়ে কি হবে?
মানছি এটা বলাটা সহজ,
করাটা তত কঠিন।
ভুলে যা যেটা হয়ে গেছে সেইটা ভুলে যা।
তোর কসম লাগে একটুখানি হেঁসে দেখ,
তুই তার স্মৃতি গুলো মনে করে নিজেকে কষ্ট দিসনা।
তোর জীবন শুধুই তোর নিজের,
কারো গচ্ছিত আমানত নয়,
যে যখন চাইবে ভেঙ্গে দিবে,
এমন কোন ইমারত নয়।
ভুলে যা যেটা হয়ে গেছে সেইটা ভুলে যা”।

অর্পণ গানটা বার বার শুনতে লাগল। তার সমস্ত চিন্তায় জুড়ে আছে ইরাজ। এত সহজে তাকে জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারবে না। আসলে এইটা সম্ভব নয়। এইবার অতনুর টেক্সট মেসেজ

“দোস্ত গানটা শুনতে থাক ভালো লাগবে, আর প্লিজ এমন কিছু করিস না যার জন্য সারা জীবন তোর পরিবারের দুঃখের কান্না হয়ে থাকিস। একবার তোর মায়ের কথা চিন্তা কর, কতটা কষ্ট করে মানুষ করেছে তোকে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ কর”

অতনুকে রিপ্লাই দিতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু বলতে চাচ্ছে বয়স কম হলে ও আমি আবেগি নয়, আবেগের বশবর্তী হয়ে কোন অঘটন ঘটিয়ে নিজের আর পরিবারের উপর অবিচার করতে পারবো না আমি। কিছুক্ষণ পর অতনু আরেকটা গান পাঠিয়েছে, অর্পণ সেইটা ওপেন না করে সানের ভুলে যা শুনতে লাগল বার বার।

তার কয়েকদিন পর ইরাজ কিছুটা স্বাভাবিক হতে লাগল। ইরাজ অবশ্য পুরো সপ্তাহে দুইবার ফোন করেছে কিন্তু একবারও বাসায় এসে অর্পণের খবর নেয়নি। অর্পণ অতনুকে নিষেধ করেছে কাউকে কিছু না বলার জন্য এমনকি ইরাজকেও না। বিকালে অতনু বাসায় এসে এক প্রকার জোর করে অর্পণকে বাহীরে নিয়ে আসল, অর্পণ একবার বলেছিল প্লিজ রমনার দিকে যাব না। অতনু তার কথা রেখেছে। শাহবাগ মোড়ের যাদুঘরের সামনে বসে আছে অর্পণ আর অতনু। অর্পণ কানে ইয়ারফোন দিয়ে গান শুনছে, ঐ দিন রাতে পরের বার অতনু যেটা পাঠিয়েছিল, ডেমির “স্কাইস্ক্রেপার” এই গানটা অর্পণকে নূতন ভোর দেখতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে এই লাইন গুলো,

তুমি চাইলে নিয়ে নিতে পার আমার যা আছে,
তুমি চাইলে ভেঙ্গে ফেলতে পার আমাকে,
যেন আমি কাঁচের তৈরি,
যেন আমি পাতলা কাগজের তৈরি,
চেষ্টা করে দেখ, আমাকে নিচে নামাতে পার কিনা?
আমি আবার মাটি থেকে গজীয়ে উঠবো,
আকাশচুম্বী দালানের মত।


ভুলে যা গানটা শুনার পর ও অর্পণের চোখের পানি বন্ধ হয়নি তবে স্কাইস্ক্রেপার তার মনে আশার আলো জাগিয়ে তুলল। ইরাজকে তার আসল চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলো, আসলে সে চেয়েছিল অর্পণকে নিয়ে খেলতে। খেলেছে ও বটে। অর্পণ শুধু তার খেলার সামগ্রী ছিল ভালোবাসা নয়। অর্পণকে ভেঙ্গে পড়তে দেখে নিশ্চয় সে আনন্দিত হবে, তাকে জয়ের আনন্দ দিয়ে জয়ী হতে দিবে না বলে অর্পণ বদ্ধপরিকর। তাই সে আবার স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করল।

শাহবাগ মোড়ে অর্পণ আছে জেনে রমনা থেকে সবাই জাদুগরের সামনে এসে পড়ল। সবাইর অর্পণের খোঁজ খবর নিচ্ছে, তাদের মধ্যে ইরাজ ও আছে। ইরাজ খানিকটা অর্পণের কাছে ঘেঁষে বসতে চাইল, অতনুর জন্য সুবিধা করতে পারেনি। অতনু তাকে যায়গা না দিয়ে নিজে অর্পণ ঘেঁষে বসল। ইরাজ স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞাস করল,

-কেমন আসছিস অর্পণ?

অর্পণ না শুনার বান করে রেজার সাথে কথা বলতে লাগল। আবার কি যেন জিজ্ঞাস করতে গেল অতনু মাঝখানে গলা ছেঁড়ে ধমক দিল ইরাজকে। অতনু আরও কিছু বলতে গেলে, অর্পণ তার হাত ধরে বলে দোস্ত প্লিজ সিন ক্রিকেট করিস না এইখানে। অর্পণ যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল, হঠাৎ ইরাজ অর্পণের হাত ধরে তাকে বসতে বলল, অর্পণ তার হাত সরিয়ে চলতে লাগল। ইরাজ ও তার পিছু পিছু। ইরাজ আবার তাকে জিজ্ঞাস করল,

-কি হয়েছে বলবি তো? এত দিন কোথায় ছিলি?

-কোথায় ছিলাম সেইটা এখন জিজ্ঞাস করছ তুমি?

-আমি তো তোকে ফোন করেছিলাম দুইবার, তুই তো ফোন উঠাসনি।

-দুই বার ফোন দিয়েছিলে? ফোন দিয়ে আমাকে উদ্ধার করেছিলে। আমার বাসা তো লন্ডনে, যেতে গেলে ভিসা, টাকা পয়সার ঝামেলা পোহাতে হত তোমাকে?

-এমন করে বলছিস কেন?

-কেমন করে আশা করেছিলে? আমি দুঃখে বনবাসী হব কিংবা দেবদাসের মত মাল খেয়ে টাল হয়ে যাবো নাকি সুইসাইড করবো?

-কি করেছি আমি?

-ওহ তুমি তো কিছু করনি, যা করেছি শুধুই আমি। সব ভুল আমার।

-কি ভুল?

-ভুল করেছিলাম তোমার কথা বিশ্বাস করে, ভুল করেছিলাম তোমাকে পাগলের মত ভালোবেসে, ভুল করেছিলাম আমার সর্বস্ব তোমার হাতে সপে দিয়ে।

-আমি ও তো তোকে ভালবেসেছিলাম।

-ভালবেসেছিলে? এখন বাস না?

-না মানে এখনো বাসি।

-আর কত মিথ্যা বলবি তুই ইরাজ?

-আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

-কিছুই বুঝতে পারছিস না। এই অতনু তোর মোবাইলটা দে তো।

অতনুর মোবাইলে সেই দিনের সেভ করা ভিডিও টা ওপেন করে ইরাজের সামনে ধরল অর্পণ।

-চিনতে পারো এই দুই জন কে? তোমার সাথে ছেলেটা নিশ্চয় আমি নয়, কি করছিলে তার সাথে?

ইরাজ মাথা নিচু করে চুপ করে থাকে।
অর্পণের সহ্যর বাঁধ ভেঙ্গেছে, সে অনর্গল বলে যাচ্ছে,

-কি ভেবেছিলে ইরাজ, আমাকে সকাল বিকাল মিথ্যা বলে কবিতা বুঝিয়ে দিবে? যখন তখন ধমক দিয়ে শান্ত করে রাখবে বাচ্চা ছেলের মত। আরে ধোঁকাই দিবি যখন তখন ভালোবাসার অভিনয় করলি কেন? দিনের পর দিন তোর রাগারাগি মুখ বুঝে সহ্য করেছিলাম আমি। সারারাত জেগে থাকতাম তোর একটা ফোনের জন্য, সকালে তোর ছবি দেখে আমার দিনের শুরু হত। সেমিস্টারে এক বিষয় ড্রপ করে তোকে তোর জন্মদিনে গিফট কিনে দেই, আর আমার জন্মদিনে তুই উইশটা পর্যন্ত করলি না। দিনের পর দিন তোকে ভালোবেসে কষ্ট পেয়েছি আর তুই?

-আমি ও তোকে ভালোবাসি অর্পণ, আমার ভুল হয়ে গেছে আমাকে মাফ করে দেয়। তোকে দূরে সরিয়ে আমি ও কম কষ্ট পায়নি।

-কষ্ট তুই পেয়েছিস? হাসি পেল তোর কোথায়, আরে কষ্ট কাকে বলে দেখতে চাইলে আমার রুমের প্রতিটি ইটকে জিজ্ঞাস কর, গত কয়েকদিন প্রতিটা রাত আমার কেমন কেটেছে? তোর দেয়া প্রতিটি জিনিষ বুকে ধরে কি ভাবে কেঁদেছি আমি। জানিস ইচ্ছে করছিল তিনতলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে তোর থেকে মুক্ত করি নিজেকে, কিন্তু পারি নি। তোর দেয়া প্রতিটি জিনিষ আমি পুড়িয়েছি নিজের হাতে। শুধু বাঁচিয়ে রেখেছি তোকে আমার ভীতরে। ভেবেছিস আমাকে কষ্টে দিয়ে তুই আনন্দ পাবি? তোকে সেই সুযোগ কোন দিন ও দিবো না ইরাজ। তোর স্মৃতি গুলো আমি তোলা রেখেছি আমার ভীতরে, তুই আমার দুর্বলতা ছিলি সেই দুর্বলতা কে আমি শক্তি বানিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাব। পরাজয় মেনে নিতে আমি শিখিনী, আমি আবার হাসবো, আমি আবার বাঁচবো নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য। তোর জন্য আমি আমাকে কখনো শেষ হতে দিবো না ইরাজ। যতই চাস আমাকে নিছে দেখতে আমি ততোই শক্তিশালী হয়ে মাটি থেকে মাথা গজিয়ে দাঁড়াবো তোর সামনে, স্কাইস্কেপারের মত মাথা উঁচু করে পার করে দিবো তুইহীন আমার জীবন।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৫ই আগস্ট, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.