স্বপ্নলোকের সিঁড়ি

লেখকঃ হোসেন মাহমুদ

(ও হে স্বপ্ন-বিলাসী সমপ্রেমীর দল জেগে উঠ, খবর আছে কি? করিম আলীর স্বপ্নরাজ্য বাস্তবতার তীরাঘাতে শব হয়েছে। এবার তোমার পালা কি…? )

“জীবনের অবশিষ্ট ক্যালেন্ডারের কোন তারিখে তোকে দেখবোনা বলে সৃষ্টিকর্তার কাছে যে ওয়াদা করেছি, দোয়া করিস তা যেন পূর্ণ হয়। ভবিষ্যতে আমি বা আমার স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করা থেকে নিজেকে দুরে রাখবি। বিধাতার কাছে প্রার্থনা করি, তোর মত কুলাঙ্গার যেন আর কারো ঘরে না জন্মায়।”

ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যু অবধারিত খুনি-আসামীর কাছে বাবার এই ধরণের চিঠি মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়, কিন্তু আমি কাকে খুন করলাম? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নায়ক হিটলারের নেৎসী বাহিনীর সদস্য ছিলাম না। ঘষেটি বেগমের ষড়যন্ত্রের দোসর ছিলাম না। ইতিহাসের ঘৃণিত হত্যাকাণ্ড গুলোর একটিতে আমার অবস্থান ছিল না। তাহলে বাবা আমার গাঁড়ে ত্যাজ্যপুত্রের তকমা ঝুলায় কোন দুঃখে?
নিজের ভীতরে লালিত আত্মার আত্মহনন করবো না বলে?
জীবনযুদ্ধের নিত্য নাট্যমঞ্চে মুখ্য অভিনেতার মিথ্যা অভিনয় করবো না বলে?
নাকি নকশী কাঁথার সোনামুখী সুঁই দিয়ে জীবনের সবগুলো রঙের রেশমি সুতোয় স্বপ্ন বাস্তবায়নের নকশা আঁকব বলে যে সংকল্প করেছিলাম তার জন্য?

সেইদিন বাবার মুখের উপর সাফ কথায় কাটা উত্তরে বলেছিলাম,
“বিপরীত লিঙ্গে আমি আকৃষ্ট নই”
ব্যাস, এইটুকুনের জন্য ২৭টি বছরের উৎসর্গীকৃত সমস্ত ভালোবাসার চূড়ান্ত অবমাননা করতে বিন্দু মাত্র কুণ্ঠিত হল না বাবা? চিঠিটা পড়ে নোনতা জলের চাপ সহ্য করতে না পেরে চোখ দুটো আষাঢ়ে বর্ষণ শুরু করেছে। এই মুহূর্তে খালেদকে আমার ভীষণ প্রয়োজন। দরজার সিটকানিটা সরিয়ে নেমে এলাম রাজ পথে। চিঠিটা আমার ভাঁজ করা মুষ্টিবদ্ধ।

স্টোকওনের রাস্তা ধরে হেঁটে চলছি আমি। ক্ষয় হয়ে যাওয়া কনভার্সে সেঁধিয়ে দেয়া সুস্থ সবল পা দুটোকে আজ ভীষণ দুর্বল লাগছে। মাথার উপরের উত্তপ্ত সূর্যটা বোধহয় হাতখানিক উপরে। এই দেশের আবহাওয়া টিনএজারের মনের চেয়েও দ্রুত পাল্টায়। এই কাঠ ফাটা রোদ তো; খানিক বাদে বিড়াল কুকুর বর্ষণ। গায়ের টি-শার্ট ঘ্যামে ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাচ্ছে। হাতের বা’দিকে “স্টোক ক্যাফে” কফি শপ। খালেদের চুলায় চড়িয়ে দেয়া চায়ের কেটলির লিকার বোধহয় এতক্ষণে ঘন হতে শুরু করেছে।

খালেদের সাথে পরিচয়-সখ্যতা এই কফি হাউজের চার দেয়াল ঘিরে। সেইদিন সকালের আকাশটা আজকের মত পরিষ্কার ছিল না। গুটি গুটি বৃষ্টি আর কনকনে ঠাণ্ডায় ছাতা হাতে দোকান খুলি আমি। দরজায় ঠক ঠক!! আমি জন্ম-বধির ভাব ধরে কাল রাতের অগোছানো চেয়ার গুলো ঠিক করে টেবিল-ক্লথ পরিবর্তন করে দিচ্ছিলাম। দরজায় আবারো ঠক ঠক। আড়চোখ তাকিয়ে মনে মনে বলি, মগের মুল্লুক নাকি! দোকান সকাল ৭টার আগে খুলবে না বলে হাত ঘড়িটা মাথার উপর তুলে বুঝিয়ে দিলাম। কথাগুলো ব্যাটার মগজে ঢুকেছে বলে মনে হচ্ছে না। থাকুক পড়ে দরজার ওপাশে। বৃষ্টিতে ভিজুক কি রোধে শুকাক, আমার কি যায় তাতে? ব্রিটেনে পড়াশুনা করতে এসে এখন গোলামি করছি কিছু সাদা চামড়ার গোয়ারদের। যদিও যে এখন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সে ব্রিটিশদের কেউ না। ইদানীং মেজাজটা বেশ খুঁতখুঁতে হয়ে উঠেছে, চেহারার উপর সারাক্ষণই রাগের একখণ্ড মেঘ ভেষে বেড়ায়। পড়াশুনার প্রচুর খরচ এইখানে। বাবা যা পাঠায় তাতে কুলায়ে উঠে না। এইজন্য পার্টটাইম জব করতে হচ্ছে। জানি না আগামী বছর-নাগাদ পি,এইচ,ডি টা শেষ করতে পারবো কিনা। এইদিকে উজবুকটা এসে পিতলা খাতির জমাতে চায়। ঐ দিন মুখের উপর বলেছিলাম, “গুল্লি মারি তোর খেজুরে আলাপের, চা কফি কি খাবি খেয়ে বিদায় হও” কথাগুলো বাংলায় বলতে পারলে একটা ঝাড়ির এক্সপেশন দেয়া যেত মারাক্তক। ইংরেজিতে বললেও গাধাটার কানে ঢুকেছে বলে মনে হয় না। প্রতিদিন সকালে আমার মুণ্ড ভাঙার জন্য সাতটার আগেই দরজায় ঠক ঠক। অসহ্য!

সেইদিন অনিচ্ছার স্বত্বে মগে চামচে বাড়ি মেরে কফির মগটা এগিয়ে দিতে গিয়ে দেখি, তার চোখের জলে “ডেইলি স্টার” ভিজে যাচ্ছে। আমি হুমায়ূন ভক্ত, তাই হুমায়ূন থিউরির মত অন্যর ব্যাপারে কেন; নিজের ব্যাপারেও আজকাল কৌতূহলের ছিটে ফোঁটা দেখিনা। কিন্তু ছয় ফুটের এক দামড়া যুবক পাবলিক প্লেসে বসে নূতন বউয়ের বিদায় যাত্রা উপলক্ষে পাশের বাড়ীর বউ-ঝিদের মত আঁচলে মুখ গুঁজে নাক টানবে, সেইটা হজম করতে পারছিলাম না। যুবকের হাতেধরা পত্রিকায় রেডলাইনের হেডিং চোখে পড়তেই বুঝলাম, এই যুবকের দেশ ফিলিস্তিন। সেই দেশের মানুষ গুলোর প্রতি অদৃশ্য এক সহানুভূতি কাজ করে আমার। তাদের জন্মথেকেই যুদ্ধ করতে হয় ইজরাইলের ঘৃণিত হিংস্র কুকুরদের সাথে। সেই থেকে শুরু, যে আমি খালেদকে চৌকাঠ মাড়াতে দেখলে এঙরিবার্ডস হতাম, এখন তাকে দেখলে শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে ল্যাম্পপোস্ট হয়ে সালাম দেই, আদিখ্যেতা করে বলি, গুড মর্নিং।

স্বচ্ছ কাঁচে-ঘেরা কফিশপের প্রাচীর ডিঙতেই চায়ের কড়া লিকারের ঘ্রাণ এসে নাকে লাগে। বুঝতে পারলাম; সকাল থেকে ক্যাফেইন আর নিকোটিন ঢুকেনি শরীরে। একটা সময় এই রকম কড়া লিকারের চা হাতে আমার ঘুম ভাঙ্গাত মা। ড্রয়িং-রুমের হোসাফ মিটারে তিন পাখনায় ভর করে আস্তে আস্তে ঘোরা সবুজ রঙা ফ্যানের নিচে বসে চা খেতাম বাবা-মা আর তাদের একমাত্র খোকা। চা হাতে অভিযোগের সুরে বলতাম, “মা এবার ফ্যানের রেগুলেটরটা বদলে দিও তো, পাঁচ চাপলেও তিনে এসে ভিড়ে” মা মুখের রেখা গুলো নাড়িয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি এঁকে বাবার দিকে তাকাত। এই শুকনো হাসির তাৎপর্য বের করতে আমার অনেকদিন লেগেছিল। আমার ঠাণ্ডায় অ্যালার্জি আছে। আমি ড্রয়িং-রুমে কি বেড়-রুমে, মা সবসময় রেগুলেটর কিংবা এ’সির রিমোট কমা-কমিতে সময় নিত না একদম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যেত গলায় ফাঁসির দড়িতে টান খেয়ে। উলের সুতোয় গলা খস খস করত, অন্ধকারে হাত দিয়ে বুঝতাম, দুই কাঁটায় যুদ্ধ বাঁধিয়ে উলের সুতোয় তিল তিল করে গড়ে তোলা মায়ের হাতে বুনা মাফলার প্রতিরাতে গলায় ফাঁস বেঁধে দিত। প্রায় রাতে দেখতাম দুটো শক্ত হাত, আমার হাঁটুর উপরে সরে যাওয়া কাঁথা টেনে দিত। মাথার কাছে রাখা আধ-খাওয়া পানির গ্লাসটা ঢেকে দিয়ে কপালে হাত রাখত। সদ্য জ্বালানো নিকোটিনের গন্ধ আমাকে জানান দিত, এই আমার জন্মদাতা আর তার একমাত্র সন্তানের উপর বাবার ভালোবাসা। দুইজনের ভালোবাসা আমাকে সকাল বিকাল অত্যাচার করত, যত্নে গড়া উলের মাফলারের মত শ্বাসনালী চেপে ধরত। তিন রুমের ফ্ল্যাটে বাবা-মায়ের ভালোবাসা হামাগুড়ি খেত। সামান্য ক্লাস টেস্টে ফাস্ট হলে বাবা পিঠ চাপড়ে আমেরিকা জয়ী কলম্বাসের হাসি দিত। আজ বাবা সেই হাত দিয়েই নোটারীকৃত ষ্ট্যাম্পে পিতার সমস্ত ভালোবাসার মুক্তি দিলেন পিকাসোর পায়রার ডানায়। অবশ্য ব্যক্তিগত ভাবে দোষ আমার নিজেরই, জন্মেছিলাম যে সমকামী হয়ে!!

কফিশপে ঢুকে জানতে পারি খালেদকে চাকুরী থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। এই যাহ, বিপদ আসতে থাকলে সব দিক থেকে আসে। শত দুঃখ কষ্টে এই একজন খালেদই দাঁড়িয়ে আছে পাশে। একত্রে একই ছাদের নিচে বেশীদিন অতিবাহিত করলে নাকি সমপ্রেমী ভালোবাসাগুলো সাদা কালো ছবি বনে ফ্রেমে বন্ধী দেয়ালিকা হয়ে যায়। ওতে গাঁদা ফুলের মাল্য প্রদানের পূজারীগুলো বাস্তবতার গ্রাসে নিজেদের দ্রুত কর্পোরেট যান্ত্রিকতার যন্ত্রে বানিয়ে ফেলে। খালেদ আর আমি গত তিন বছর একই বিছানায় থেকেও ভালবাসার মধুরতা তিতকুটে চায়ে রূপান্তর করেনি। হয়তো আমরা দুইজন শরীর নয়, প্রেমের ভালবাসার গাছের গোঁড়ায় নিয়মিত পানি ঢেলেছি বলে। আমাদের ভালোবাসা প্রকাশের মুহূর্তগুলোও বড় অদ্ভুত ধরনের। যেমন, ওভেন থেকে খাবার নামাতে গিয়ে অসতর্ক ভাবে তর্জনী ঝলসে গেছে, খালেদ এসে আমার আঙুলটা মুখে পুরে হাতুড়ে চিকিৎসক বনে যায়। এসির বাতাসে মাঝরাতে যখন শরীরটা থর থর করে কাঁপত তখন, দুটো উষ্ণ বাহু আমাকে জোঁকের মত খিঁচে রাখে। অনেকক্ষণ ধরে সোফায় বসে বই পড়ার সময়, একটা নরম কুশন এসে যখন ঠেশে ধরত আমার গলা, তখন উপলদ্ধি করতাম কাকে বলে ভালোবাসা। ২৭ বছরের এক যুবাকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মত দেখাশোনার জন্য খালেদের ভীতর একজন আয়াকে যখন দেখতাম, তখন অনুভব করতাম ভালোবাসার তীব্রতা।

অন্যমনস্ক হয়ে আমার চোখ দুটো যখন কফিশপের দেয়ালে টাঙানো ঘোড়শওয়ারীর উপর, তখন সদ্য নিযুক্ত ওয়েটারের “উড় ইয়উ লাইক টু হ্যাভ সাম কফি”? এর প্রশ্নে সম্বিত ফিরে পেয়ে পুষ্টি-হীন শিশুর রুক্ষ হাসি ঠোঁটে ধরে বলি। “নো থ্যাংকস অ্যাই এম ওকে উইথ ইট”। কফিশপ পিছনে ফেলে আমি আবার রাজ পথে। বাবার নোটারিকৃত সম্পর্কচ্ছেদের ছাড়পত্র এখনো আমার মুষ্টিবদ্ধ। বুঝতে পারছিলামনা খালেদ আমাকে না বলে চাকরী ছেড়ে দিল কেন? একটা সময় এই চাকরীটা আমারই ছিল। খালেদ আমাকে এক প্রকার হাত পা বেঁধেই চাকরীচ্যুত করল। তার একটাই কথা, “আগে ভালভাবে পি,এইচ,ডি টা শেষ কর, তারপর পুরোদমে চুটিয়ে চাকরী করবে। এখন তোমার পড়াশুনার খরচ সম্পূর্ণ আমার” খালেদের কথার উপর যত যুক্তিই দাড় করাইনা কেন, তার কথা ঐ (বিচার মানতে রাজী কিন্তু তাল গাছ আমার) সুতরাং তার কথা মানতে বাধ্য হলাম। “কেলে ইউনিভার্সিটি” দিকে গিয়ে খালেদের খোঁজ নিতে হবে। কিন্তু আমি এখন যেখানে আছি সেখান থেকে খালেদের ইউনিভার্সিটি বেশ দূরই বলা যায়। বাস কিংবা ট্রেনে করে যাওয়ার পাউন্ড আমার পকেটে নেই।

একটা সময় আমার এই পকেটে না থাকলেও কয়েক পাউন্ড তো থাকতই, কিন্তু গত কয়েকমাস ধরে ঠিকমত দু’মুঠো ভাতই জুটে না মুখে, তার উপরে বাবা টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলেন কয়েকমাস ধরে। বাবার উদ্দেশ্য প্রেরিত সেই টেক্সট ম্যাসেজটাই আজ আমার বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। বাবার কাছে নিজেকে প্রকাশ করা ছাড়া তখন আর কোন উপায় জানা ছিল না। প্রায় প্রতিদিন ফোন করে বাবা-মা দুইজনেই বিয়ের জন্য চাপাচাপি, আর কত দিন এই ভাবে চোর পুলিশ খেলবো? তাই একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, বাবাকে জানিয়ে দিব বিয়ে আমি করছি না। তাছাড়া যে স্বপ্ন বুকে ধরে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে, সেই স্বপ্ন পুরুষ’তো আছেই আমার সাথে। এখন শুধু ছোট্ট একটা ভালোবাসার ঘর। ব্যাস, আর কি চাই জীবনে? কিন্তু আমার সিদ্ধান্তে বাম হাত ঢুকিয়ে দিল আমার স্বপ্ন পুরুষ নিজেই, খালেদ জানত আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থা। কোন বাবা মা নিজেদের সমকামী ছেলের পরিচয়ে গর্বিত হবে না। এই প্রসঙ্গে তার যুক্তি ছিল, “এখন অন্তত জানানোর দরকার নাই, আগে পি,এইচ,ডি টা শেষ হোক, তারপর দেশে গিয়ে দুইজন মিলে বাবা মাকে বুঝিয়ে বলব” তার কথায় আমি হেসে উত্তর দেই, “তুমি কি ভেবেছ, আমরা বাবা-মায়ের সামনে বসে নিজেদের সম্পর্কে জানান দিলেই তারা বরণ ডালা সাজিয়ে আমাদের আশীর্বাদ করবেন? তারচেয়ে এই প্রতিদিন “বিয়ে কর” “বিয়ে কর” শব্দের বিরক্তিকর ঘ্যানর-ঘ্যানর শোনার থেকে আমি একটা টেক্সট ম্যাসেজের আশ্রয় নেই” সেই প্রথম, আমার জেদের কাছে খালেদ হার মানতে বাধ্য হয়। আমার টেক্সট দেখার সাথে সাথে বাবার ফোন পাই মোবাইলে, বাবা আমার কণ্ঠে নিশ্চিত হতে চায় টেক্সট ম্যাসেজটা ভুল করে চলে আসেনিতো? আমি নরম কণ্ঠে বাবাকে আশ্বাস দিলাম, ম্যাসেজের কথাটাই সত্যি। আমার কথা শুনে বাবা টু শব্দ না করে দুই মিনিটের মত চুপ করে ফোন কেটে দেয়। সেইদিন থেকে বাবার ফোন আর আমার মাসিক টাকাটা ব্রিটেনের রাস্তা ভুলে যায়। তখন আমি সেমিস্টারের মাঝামাঝিতে, পার্টটাইম জব করে পড়াশুনা আর থাকা খাওয়ার খরচ যোগান দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে খালেদের দ্বারস্থ হয়ে জব ছেড়ে পড়াশুনায় মনঃস্থ হই। কিন্তু এখন যদি খালেদ জব ছেড়ে দেয়, তাহলে এইদেশে দুই দিন থাকাটাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ দিকে বাবার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশা তো নেই বললেই চলে।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে গিয়ে উঠলাম খালেদের ইউনিভার্সিটিতে। তার ফ্যাকাল্টি সুপারভাইজরের সাথে কথা বলে জানতে পারি, খালেদ গত দুই মাস ধরে ঠিক মত ইউনিভার্সিটিতে আসছে না। তাহলে খালেদ এতদিন বাসা থেকে বের হয়ে কোথায় কাটিয়েছে সময়? ভাবছি, খালেদ কোন সমস্যায় পড়েনি তো? কিংবা কিছু একটা নিয়ে খালেদের মন খারাপ নয়তো? যদি মন খারাপ হয় তাহলে লেকের ধারে বসে গীটার বাজানো তার অভ্যাস। ফিলিস্তিন থেকে আসার সময় তার প্রিয় গীটারটা সাথে নিয়ে এসেছে খালেদ। গীটারটা তার ভীষণ প্রিয় ছিল। কিছুদিন আগে দেখি সেইটা আর নাই। অনেক চাপাচাপি করে জানতে পারি, আমার টিউশন ফিস দেয়ার জন্য সেইটা তার বন্ধুর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। জীবনে অনেক লাভ স্টোরি পড়েছি, কিংবা মুভিতে দেখেছি, কিন্তু সত্যিকার ভালোবাসার জন্য বাস্তবে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিষটিও হাত ছাড়া করতে খালেদকেই প্রথম দেখলাম। ভাবতাম, প্রেমের বিদ্যায় আমি বিদ্যাসাগর কিন্তু খালেদের ভালোবাসার কাছে আমি নিতান্তই চুনোপুঁটি বৈ অন্যকিছু নয়। দেশে থাকতে টি’ভি নাটকে দেখতাম, গরীব ঘরের মায়েরা তুখোড় মিথ্যাবাদী হত, যেমন পরিবারের সবার খাবার ভাত পাতিলে নেই, মা হাসি মুখে সন্তানদের খেতে দিয়ে বলত, আমি খেয়ে ফেলেছি তোরা পেট ভরে খা। সন্তানদের প্লেটে ভাত বাড়তে বাড়তে মায়ের চোখে থাকত ক্ষুধার্ত পেটেও আত্মতৃপ্তির চাউনি। যেন সন্তানের পেটে ভাত গেলেই নিজের পেট ভরা হয়ে যায়। সন্তানের জন্য মায়ের সেক্রিফাইস সেইত সার্বজনীন, কিন্তু ভালোবাসার জন্য উনুপেটে দিন যাপন সচরাচরে দৃষ্টিগোচর হয় না। গত কয়েক মাস ধরে খালেদকে গরিব ঘরের মা হতে দেখেছি বারংবার। সকালে নাস্তা বানাতে গিয়ে দেখত দুই পিস পাউরুটি পড়ে আছে প্যাকেটের কোনে, খালেদ ঐ দুই স্লাইসকে টোস্ট বানিয়ে আমাকে দিয়ে বলত, সে আগেই খেয়ে নিয়েছে। তার মুখের রেখা গুলো পড়তে পারতাম আমি। তাই আমার চোখে খালেদের মিথ্যা ধরা পড়ে যেত খানিকক্ষণের মধ্যেই। দুইজনেই ভাগাভাগি করে খেতাম সেই রুটি দুখানা। বাসায় প্রতিদিন অভাব-অনটন লেগেই আছে, তারপরও কোনদিন খালেদের মুখে কষ্টের বলি রেখা দেখতাম না।

খালেদ এই অব্ধি অনেক কিছু করেছে আমার জন্য কিন্তু আমি কিছুই করতে পারলাম না তার জন্য। আগামী মাসেই তার জন্মদিন। আমার হাত এতটাই খালি যে একটা গোলাপ কিনে যে তাকে উপহার দিবো তারও উপায় নেই। দেশ থেকে আশার সময় আমার হাতে রাডো ব্যান্ডের একটা ঘড়ি ছিল, যেটা আমার এস,এস,সি রেজাল্টের পর বাবা দিয়েছিল। এখানে আসার পর অনেক টান-পোড়নেও এই ঘড়ি হাত থেকে হাতছাড়া করিনি। খালেদের জন্মদিনে তার গিটারটা ফিরিয়ে আনতে সেই ঘড়িটা বিক্রি করে দিয়েছি। টাকাটা এখনো আমার কাছেই আছে। খালেদের ফ্রেন্ডের সাথে কথা হয়েছে, সে পাউন্ডের বিনিময়ে গিটারটা ফিরিয়ে দিতে রাজী আছে। খালেদের প্রিয় গীটারের চেয়ে তার জন্মদিনে বড় গিফট কি হতে পারে? আমি কথা গুলো চিন্তা করতে করতে পার্কের দিকে হাঁটা ধরলাম।

মোবাইলের রিং এর শব্দে ফীরে এলাম বাস্তবে। মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখি খালেদের কাজিন সাইদ কল করেছে। ওহ, তার কথা তো বলাই হয়নি, সাইদ খালেদের কাজিন হলেও বেস্ট ফ্রেন্ড। সে সৌদিআরবে একটা ব্যাংকে কাজ করে। খালেদ আর আমার ব্যাপারটা পুরোপুরি জানে সে। মাঝে মাঝে খালেদকে ফোনে না ধরতে পারলে আমার মোবাইলে ফোন দেয়। সাইদের ফোন রিসিভ করে আমার মাথাটা আরও ঘুরতে লাগল। কিছুদিন আগে ইজরাইলের কুকুরেরা বোমা ফেলেছে খালেদের এলাকাতে। তার বাবা-মা কিংবা পরিবারের কেউ বেঁচে আছে কিনা অনিশ্চিত। সাইদ খালেদকে দেশে ফেরার জন্য বলেছে কিন্তু খালেদ যাচ্ছে না। খালেদ এই কথা গুলো আমার থেকে চেপে গেছে। আমি অবাক হয়ে ভাবছি, পরিবার হারানোর কষ্ট নিজের ভিতর ধরে রেখেছে খালেদ! আমার সাথে শেয়ার পর্যন্ত করেনি যদি আমি ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিত হই। বুঝতে পারছি না খালেদ কি মানুষ নাকি অন্যকিছু? আমি মত পরিবর্তন করলাম। পার্কে নয় আমার এখন ট্র্যাভেল এজেন্সি যাওয়া দরকার।

দুইদিন পর…..
একটু আগে খালেদকে এয়ারপোর্টে ছেড়ে আসলাম। আজ রাতের ফ্লাইটে সে ফিলিস্তিন যাচ্ছে। যদিও খালেদ দেশে যাওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনাগ্রহী ছিল। আমি একপ্রকার জোর করেই তাকে পাঠালাম। প্লেন ভাড়া সাইদ পাঠিয়েছে সৌদি থেকে আর হাত খরচের জন্য তার গিটার কেনার পাউন্ড গুলো ধরিয়ে দিলাম।
অনেকদিন পর নিজেকে আজ ভীষণ একা লাগছে। বাবা আমার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার পরও এতটা একাকীত্ব অনুভব হয়নি। হয়তো খালেদ আর তার ভালোবাসার ছায়া আবর্তিত ছিল আমার চার দিক জুড়ে তাই।

হঠাৎ করে পেটে ক্ষুধার তাড়া পেলাম। কিচিনে গিয়ে দেখি খাবার বলতে কিছু নাই। দুই গ্লাস পানি খেয়ে সোফায় এসে বসলাম। ঘরের আলো নিবিয়ে চিন্তা করছি, এখন আমি কি করবো? কি খাবো? পি,এইচ,ডি টা কি ভাবে শেষ করবো? খালেদের কথা মেনে নিয়ে সেইদিন যদি বাবাকে সমকামীর পরিচয়টা না দিতাম তাহলে আজকে অভুক্ত থেকে অনিশ্চয়তার হাতছানিতে ভাসতাম না। আমার কিসের এত তাড়া ছিল? যখন নিজের পায়ের মাটি পাকাপোক্ত হত তখন বুক ফুলিয়ে বলা যেত। সামান্য একটা ভুলের কারণে আমার সামনের দিন গুলো অন্ধকারছন্ন করে দিলাম।

আমার মত অনেক সমকামীরাই বাস্তবতার চেয়ে স্বাপ্নিকতার দোলনায় দোল খেতে ভীষণ ভালোবাসে। দেড় ঘণ্টার ইংলিশ মুভিতে সমকামী জুটির সার্থক ভালোবাসা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়, মনে মনে সেই স্বপ্নের বীজ বুকে পুঁতে স্বপ্নলোকের সিঁড়ি বেয়ে বনসাইকে বট বানায়। সেললুডের 3D গ্লাস কানের উপর ঠেসে দিবাস্বপ্ন রচনা করে, আর নিজের দেশের সামাজিক অবস্থার কপালে ঝাঁটা মেরে বলে, “এই দেশে কিচ্ছু হবে না। ঈশ, যদি ইউরোপ-আমেরিকায় যেতে পারতাম তাহলে ফ্লিমের মত একজন জীবনসঙ্গী নিয়ে সুখের স্বর্গ রচনা করতাম। সত্যি কি তাই? সব স্বপ্নই কি সত্যি হয়? আমিও সেইরকম স্বপ্ন বুকে চেপে এসেছিলাম ব্রিটেনে, কিন্তু পেরেছি কি স্বপ্নের রঙে নিজেকে রাঙাতে? সময়ের আগে পরিবারের কাছে নিজেকে প্রমাণিত করলাম কুলাঙ্গার হিসাবে। এখন আমার অবস্থা তলাবিহিন ঝুলির মত। আগে যদি জানতাম প্রাচ্যে এসে পশ্চাৎদেশের নেংটি থাকবে না তবে এই ধরনের স্বপ্ন দেখা থেকে নিজেকে সংযত রাখতাম।

কয়েকদিন পর কফিশপের জবটা আবার ধরলাম। পি,এইচ,ডি আর শেষ করা হল না এই বছর। এখন আমার রাত আর দিন একই রকম কাটে। অতিরিক্ত স্বপ্ন প্রবণতার প্রশ্রয় দিয়ে আমি এখন জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ইতিমধ্যে খালেদের সাথে একবার ফোনে কথা হয়েছে। সে জানিয়েছে তার বাবা মায়ের খবর এখনো পায়নি। তাদের খুঁজে পেলেই সে ফিরে আসবে।

এইভাবে কয়েকদিন কেটে যায়। তারপর এক রাতে সাইদের ফোন আসে আমার মোবাইলে। সাইদ জানালো খালেদের মা-বাবার খবর পাওয়া গেছে তারা দুইজনই মারা গেছেন। শুধু এই অব্ধি হলে ঠিক ছিল, কিন্তু সাইদ যা শোনাল তার জন্য মটেও প্রস্তুত ছিলাম না আমি। খালেদকে ইজরাইলের কুকুর গুলো ধরে নিয়ে গেছে। সে বেঁচে আছে কি মারা গেছে কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। সাইদের কথা শোনার পর আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। আমার অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনটায় এতদিন ভালোবাসার আলোটাই বেঁচে থাকার রসদ যুগিয়েছিল। আজ সেই ভালোবাসার প্রদীপটাও নিভতে বসেছে। এই সব আমার ভুল সিদ্ধান্ত গুলোর মাশুল। স্বপ্নলোকের সিঁড়ি বেয়ে স্বপ্ন বুনে যদি এদেশে না পাড়ি দিতাম, যদি অসময়ে বাবা মায়ের কাছে নিজের পরিচয় না দিতাম, তাহলে আজকে আমার জীবনের আশার আলো গুলো আস্তে আস্তে নিভে যেত না।

দুই মাস পর,
গুটি গুটি বৃষ্টি আর কনকনে ঠাণ্ডায় ছাতা হাতে দোকান খুলি আমি। কালকের অগোছানো চেয়ার গুলো ঠিক করে দিতে দিতে ভাবছি, “সাময়িক স্বপ্নগুলো যতই চকচকে আর তীব্র হোক, শেষমেশ ক্ষুধা আর যৌনতার কাছে নতি স্বীকার করেই মানুষের পথ চলা”। আমি ও তাই করছি। হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক। কপালে বিরক্তির ভাব ধরে হাত ঘড়িটা মাথার উপর তুলে বুঝিয়ে দিতে চাইলাম দোকান ৭টার আগে খুলবে না। মেজাজ খারাপ করে দরজায় তাকিয়ে আমি স্থির হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। কই দরজার ওপাশটায় কেউ নেই। এই শুধু আমার স্বপ্নবিলাসী মনের ভ্রম মাত্র। এই স্বপ্নবিলাসীতাই আজ আমাকে এই অবস্থানে এনে দাড় করিয়েছে। স্বপ্ন তবুও আমার পিছু ছাড়ে না…।

(ও হে স্বপ্ন-বিলাসী সমপ্রেমীর দল জেগে উঠ, খবর আছে কি? করিম আলীর স্বপ্নরাজ্য বাস্তবতার তীরাঘাতে শব হয়েছে। এবার তোমার পালা কি…? )

********

{বিঃ দ্রঃ গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক}

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.