হাফলেডিস

লেখকঃ শুভ্র ভাই

“ওই হাফলেডিস তোর অংক খাতাটা দে দেখি।”
কথাটা সৌরভকে উদ্দেশ্য করেই বলা। দুচোখে জান্তব আক্রোশ তুলে তাকালো। তার চোখে যদি দেবতাদের মত আগুন থাকতো তবে প্রশ্নকর্তাকে নিমিষেই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতো। বড্ড অসহায় বোধ করে সে। পোড়া চোখ কেন ঝাপড়া হয়ে আসে। কিসের জন্য! কাদের জন্য! এরা কি মানুষ! এদের ব্যবহারে কি কষ্ট পেতে আছে। রাগ করা উচিত পরম সৃষ্টিকর্তার উপরে। কেন তিনি এভাবে সৃষ্টি করলেন। কি দরকার ছিলো এই আলাদা বিশেষত্বের। সন্তানের কষ্ট কি তার প্রানে বাজে না!

সৌরভের শৈশব ছিলো আনন্দময়। সদ্য কৈশোরে এসে সে বড় দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছে। তার গলার স্বর অপেক্ষাকৃত চিকন। ক্লাসের ছেলেরা তাকে সরাসরি হাফ লেডিস বলা শুরু করেছে। খুব লজ্জা লাগে। খুউব খুউব। চোখ ফেঁটে পানি চলে আসে। এই সেদিন ক্লাসের সবার মধ্যে তিন বেঞ্চ পেছনে বসা সাইফুল চিৎকার করে বললো “ওই হাফলেডিস তোর অংক খাতাটা দে দেখি।” অঙ্ক খাতা চাওয়া মুখ্য নয়, সৌরভকে হাফলেডিস বলাই ছিলো তার আসল উদ্দেশ্য। কি ক্ষতি করেছে সে সাইফুলের। হাফলেডিস বলার পরে দাঁত বের করে জান্তব হাসি হাসলো সাইফুল। সহপাঠীদের কেউ ঠোঁট বেকিয়ে আসে, কেউ নিরুত্তাপ মুখে তাকিয়ে থাকে, কেউ কেউ বিরক্ত হয়। সাইফুল কি ও খুব আনন্দ পেয়েছে। অন্যকে কষ্ট দিয়ে মানুষ কি এমন আনন্দ পায়।

সৌরভ কি করবে! সে ভাবে। ছোট বেলা থেকেই সে মেয়েদের সাথে খুব সহজে মিশতে পারে। ছেলেদের সাথে মিশতে বিব্রত লাগে। পাড়ার ছেলেরা যখন দলবেঁধে রাইস মিলের চাতালে খেলতে যেতো তখন সে মেয়েদের সাথে বাবলা তলায় নারিকেলের ঠুলা মালা নিয়ে ঘর সংসার খেলেছে। ঝগড়া বাঁধলে সেও চুল টানাটানি করেছে। কৈশোরে এসে সমবয়সী ছেলেরা যখন ক্রিকেট ফুটবল নিয়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছে তখন সে নিজের মধ্যে গুটিয়ে যাচ্ছে। এই বুঝি কেউ তাকে হাফ লেডিস বলে খেপাতে শুরু করে। তেলাপোকার মত আঁধারবাসী হয়ে যাচ্ছে। সংকুচিত হয়ে আসছে পৃথিবী।

সবাই যে খেপায় এমন নয়। ক্লাসে দুয়েকজন আছে যারা অন্য সবার থেকে আলাদা। ওর সাথে মেশে। ওকে সংগ দেয়। তাদেরই একজন মনিরুজ্জামান। মনি একদিন বললো, “সৌরভ, আমার মনে হয় অন্যেরা তোকে খেপানোর জন্য এসব বলে। তুই খেপবি না। তাহলে দেখিস দুদিন পরে ওরা এসব বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে’’।

না সৌরভ আর খেপে না। কিন্তু অন্যদের আগ্রহ হারানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাদের পাশবিক উল্লাসের মাত্রা বাড়তেই থাকে। কাজ নেই কথা নেই ঠাস করে পেছন থেকে সৌরভের পিছে থাপ্পড় মেরে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সৌরভ ফুঁসে ওঠে। কিন্তু ওদের সংগে পেরে ওঠে না। বুলিংয়ের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ভাবে স্যারদের কাছে নালিশ করবে। খুব লজ্জা লাগবে এসব কথা স্যারদের বলতে।

একদিনের ঘটনা। ক্লাস সিক্সে পড়ে তখন। গরমের দিন। সৌরভ বাড়ির পাশে শিরিষ গাছের নিচে বসে বই পড়ছিলো। নিজ ইচ্ছায় পড়ছিলো এমন না। বাবা তাকে ওখানে বসে পড়তে বাধ্য করছিলো। ক্লাসের বদ একটা ছেলে এদিকের রাস্তা দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলো। হঠাৎ ওকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে বললো, “ঐ মাইয়া এইটা তোগো বাড়ী”? সৌরভের দুচোখে যদি ভস্ম করে দেওয়ার শক্তি থাকতো সে তবে হতচ্ছড়াটাকে ভস্ম করে দিতো। মহাভারতের সিরিয়ালে যেমনটি দেখায়। সে কিছু বললো না। বিকাশ আবার চিৎকার করলো, “ঐ মাইয়া কথা কস না ক্যা!” আশেপাশের মানুষেরা শুনে কি ভাববে। সৌরভ বই খাতা ওখানেই ফেলে রেখে বাড়ির মধ্যে দৌড় দিলো।

আরো এক শ্রেনীর লোক আছে। এলাকার কাকা সম্পর্কের বিয়াইড্ডা সব, পোলাপাইনের বাপ। সৌরভকে কাছে পেলে ডেকে নিয়ে ঘাড়ে হাত দিয়ে গল্প শুরু করে আন্তরিকভাবে। কিন্তু তাদের হাত ঘাড় থেকে পিঠে নামে, নিতম্বের মাংসল অংশে চাপড় মেরে যায়। কি চায় তারা সৌরভের কাছে। সৌরভ বোঝে।
স্কুল ছুটির ঘন্টা বেজে গেছে। ক্লাস সেভেনের সবাই ক্লাস ছেড়ে বেরোনোর জন্য ব্যাগ পত্তর গুছিয়ে নিয়ে হুড়োহুড়ি শুরু করেছে। এমন সময়ে পেছন থেকে এসে নাইম সৌরভের বিশেষ স্থান চেপে ধরলো। সৌরভ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। তার হতবিহ্বলতা কাটলো নাইমের উচ্চ চিৎকারে, “আছে রে আছে। মোটা জিনিস আছে। গর্ত না”। ক্লাসের মেয়েরা সব মুখ টিপে হাসতে লাগলো। সারা পথ সৌরভ কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলো। বিকেলে প্রাইভেট পড়তে গেলো না। অন্যদিন বাড়িতে এসে ব্যাগ খাটের উপর ছুড়ে দিয়ে সে খেতে বসে। আজ সে খাটের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। জামা জুতো সেভাবেই পরা আছে।

মা কি কাজে ব্যস্ত ছিলো। ছেলেকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন। কি হয়েছে সৌরভ?
– কিছু না।
– আমাকে বল। কেউ মেরেছে?
– না।
– তাহলে?
– আমাকে সবাই খেপায় মা। আমি কারো সাথে ঝগড়া করি না। তাও সবাই আমাকে এসে হাফ লেডিস বলে। খোদা আমার ভয়েস এমন মেয়েদের মত করে দিয়েছে কেন মা!
– পাগল ছেলে। এই বয়সে সবারই ভয়েস এরকম একটু চিকন থাকে। দেখিস নাইন টেনে পড়ার সময়ে ভয়েস বদলে যাবে। আর তুই মন দিয়ে পড়াশোনা করিস। দেখবি সবাই তোকে খাতির করছে। নে ওঠ খেয়ে নিবি। আমার হাতে এখন অনেক কাজ। ওঠ।
হ্যাঁ। সৌরভ মন দিয়ে পড়ছে। নাইন টেন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। ক্লাস এইটের মাঝামাঝি এসে সৌরভের ভয়েস ভাঙতে শুরু করলো। ক্লাসে ফার্স্ট বয় হয়। অন্যকে ম্যাথ দেখিয়ে দেয়। অনেকেই খাতির করে। এখনো ক্রিকেট ফুটবল খেলার আগ্রহ পায় না সে। মালিঙ্গা আফ্রিদিদের ইতিহাস ভূগোল নিয়ে কথার তুবড়ি ছোটাতে পারে না বটে কিন্তু সেও কম যায় না। সুযোগ পেলে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা ফেঁদে বসে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মেম্বার সে। প্রতি সপ্তাহে একটা করে বই নিয়ে আসে। জুল ভার্নের গল্পের চরিত্রের সাথে সাথে সেও ঘুরে আসে দেশ থেকে দেশান্তরে। সাগর থেকে মহাসাগরে। অবসর সময়ে বাড়ির বাগানে বসে ফুল গাছ, শিম গাছ গুলোকে দেখাশুনো করে। পানি দেয়, আগাছা নিড়ায়, বিকেল গড়ায়, সন্ধ্যা নামে, বয়স বাড়ে।

সময় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। গলার ভয়েস বদলে গেছে। একটু টেনে টেনে কথার বলার অভ্যেষ রয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও এটা সে ছাড়তে পারেনি। আর এটুকুই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অফপিরিয়ডে একদিন আনিসের সাথে সৌরভের তর্ক বেঁধে গেলো। কেমিস্ট্রির কোন সূত্র নিয়ে। দুজন দুজনের যুক্তিতে অনড়। সৌরভ যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে এনেছে এমনি সময়ে আনিস বলে উঠলো, “ঐ হাফলেডিস, মেয়েদের মত প্যাঁচাস নাতো। থাম”। সৌরভ চুপসে যায়। সৌরভের গল্প কখনো শেষ হবে না। জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে সৌরভের গল্প। হাজারো সৌরভ ঘরের কোনে একাকি মন ভার করে বসে থাকে। তাতে আনিসদের কি আসে যায়! তারা সৌরভদের হাফলেডিস বলবে, দাঁত বের করে পাশবিক উল্লাসে হাসবে। তাতে কার কি আসবে যাবে। যুগে যুগে সৌরভদের কষ্ট কেউ কখনো বুঝবে না।

There is one comment

  1. সবুজ আহমেদ

    আসলেই এমন কিছু অব্যক্ত কষ্ট বুকের মধ্যে পুষে জীবন কাটাতে হয়। কষ্টে বুক ফাটে তবু অন্যদের হাসিতে হাসার চেষ্টা করি৷

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.