হৃদয়ের গহীনে ভালবাসার ছোঁয়া

লেখকঃ সবুজের নীলাকাশ

প্রথম অংশ,

বিকাল ৫.৩০, চার তলা অফিস থেকে নামতে নামতেই বাস মিস করে ফেলল সায়ন।তার অফিস সংলগ্ন এলাকাটিতে বাস পাওয়া বড়ই দুষ্কর। একবার মিস হল তো আধঘণ্টা বা একঘণ্টায়ও বাসের নাগাল মেলে না। যদিও মাঝে মধ্যে দু’একটি ট্যাক্সি আর রিকশা শো শো করে আসা যাওয়া করছে।কিন্তু অফিস থেকে সায়নের বাড়ির দূরত্ব একটু বেশী হওয়াতে বাসই তার যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন। সায়ন বাসের অপেক্ষায় অফিসের সামনের রাস্তাটাতে ভাবুক মনে পায়চারী করছে।আজ লাঞ্চ টাইমের পর একটু দেরীতে অফিসে ঢোকার কারণেই সমস্ত কাজ গুছিয়ে সবার শেষে বের হত হল তাকে।তবে এতে কোন আফসোস বা ক্ষোভ কোনটাই নেই সায়নের। কারণ তার মনটা আজ ভীষণ ভাল।

ইচ্ছা পূরণের যে কি আনন্দ তা শিরা, উপশিরা, ইন্দ্রিয়ানুভূতি দিয়ে প্রতিক্ষণ উপলব্ধি করছে সে।অবশেষে ৩৫ মিনিট পর বাস চলে আসায় সায়নের অপেক্ষার অবসান ঘটল।সায়ন বাসে উঠে জানালার পাশে বসে একরাশ স্বস্তি নিয়ে উৎফুল্ল মনে বাইরে তাকিয়ে আছে। অনেক দিন পর আজ তার একটা কাঙ্ক্ষিত আশা পূরণ হয়েছে। তাই তার অনুভবে অণুমাত্র আনন্দের কমতি নেই।

আজ সায়ন একজনকে ছ্যাকা দিতে পেরেছে। এ নিয়ে তিনজন হল।কয়েকমাস সম্পর্ক করার পর স্বার্থসিদ্ধি হলে কোন একটি ছোট্ট ইস্যুকে সামনে টেনে এনে তুমুল ঝগড়া বাঁধিয়ে কাউকে ছ্যাকা দেয়ার মাঝে পৈশাচিক আনন্দ খুঁজে পায় সে।বাসযাত্রা শেষ করে কিছুক্ষণ হাঁটার পর সায়ন বাসায় পৌঁছে মোবাইল আর ব্যাগটা সোফায় রেখে গুণগুণ করতে করতে ওয়াশ রুমে ঢুকে পড়ে।

ফ্রেশ হয়ে আবার গুণগুণ স্বর নিয়ে সোফায় বসে তার মাকে চেঁচিয়ে বলে,
-মা….. এক কাপ চা দাও তো।
-তুই এসেছিস বাবা।একটু বস আমি চা টা গরম করে নিয়ে যাচ্ছি। (রান্নাঘর থেকে)
-ঠিক আছে মা।

সায়ন রিমোটটা হাতে নিয়ে টিভি অন করে একটার পর একটা চ্যানেল পাল্টাতে থাকে।হঠাৎ তার মোবাইলের স্ক্রিন জ্বলে ওঠে।সায়ন তাকিয়ে দেখে ম্যাসেজে এসেছে। ম্যাসেজটা দেখার জন্য ফোনটা হাতে নিয়ে ২১টা মিসডকল আর ৮টা ম্যাসেজ দেখে অবাক হয় সে । ফোনটা সাইলেন্ট থাকার টেরই পায়নি সায়ন। একটু কৌতূহলী দৃষ্টিতে অপশনে ক্লিক করে দেখল সবগুলোই রাফির কল,সাথে মেসেজগুলোও।প্রতিটা মেসেজে লেখা ছিল,প্লিজ ফোনটা ধরো, একবার আমার কথাটা শোন এরকম।সায়ন মেসেজগুলো দেখে ক্ষুব্ধ মনে ফোনটা আবার সোফায় ছুঁড়ে রেখেদিল।

এই সেই হতভাগা রাফি, যার সঙ্গে কয়েকঘন্টা আগে সম্পর্কের ইতি টেনেছে সায়ন।রাফি ঘরের দরজা আবদ্ধ করে সায়নের জন্য অঝোরে অশ্রুপাত করছে আর সাথে সায়নের নাম্বারে একটানা কল দিচ্ছে কখনোবা মেসেজও। কিন্তু কোন সাড়া পাচ্ছে না সায়নের।
এদিকে সায়নের ফোনটাও অনবরত বেজেই চলছে।শুধু একজনেরই ফোন- রাফি।এক সময় বিরক্ত হয়েই কলটা রিসিভ করে সায়ন অতি কর্কশ স্বরে বলল,

-সমস্যা কি তোমার,আমাকে বারবার বিরক্ত করছো কেন?
– প্লীজ সায়ন এমন কর না আমার সাথে। (ফোনের অপর প্রান্তে কান্না ভেজা কণ্ঠে বলল রাফি)
সায়ন তখন ভাবখানা এমন নিলো যেন সে কিছুই জানেনা।
-কেমন করছি আমি!
-কতক্ষণ থেকে তোমাকে ফোন দিচ্ছি ধরনা কেন?
-কেন ধরবো তোমার ফোন ।আজ তো আমাদের সম্পর্কের ব্রেকআপ হয়েছে।

আর তখনকার মূহুর্ত থেকে আমাদের সব কথা শেষ হয়ে গেছে।আর কোন কথা থাকতে পারে না আমাদের মাঝে,ওকে।
-প্লিজ,আমাকে একটু বোঝার চেষ্টা কর ।আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি,তোমাকে ছাড়া বাঁচব না আমি।
-আমার কিছুই করার নেই।আমি আর তোমাকে ভালবাসিনা। (ভাবাবেগহীন স্বরে বলল সায়ন)
-আচ্ছা, আমাকে আর ভালবেসো না অন্তত আর একটাবার আমার সাথে দেখা কর প্লিজ। আমি আর কোনদিনও তোমাকে বিরক্ত করব না,কথা দিলাম।
-ঠিক আছে,আগামীকাল বিকাল ৫টার পর আমাদের সাক্ষাৎ হবে। কিন্তু মনে রেখো এটাই শেষ, এরপর থেকে আমাদের পথ ভিন্ন হয়ে যাবে কেমন।
-আচ্ছা। তুমি যা বলবে তাই হবে।

দ্বিতীয় অংশ,

দুই বছর আগের কথা যখন সায়নের মন ছিল শান্ত ধারার মত স্বচ্ছ, ভালবাসার পবিত্রায় পূর্ণ ছিল তার সমস্ত হৃদয় ।তখন ভার্সিটিতে পড়ার সময় তার পবিত্র ভালবাসাকে আলিঙ্গন করে সায়ন একটি মেয়েকে ভীষণ ভালবাসত।
ভালবাসার স্নিগ্ধ অনুভূতি দিয়ে তার হৃদয়ে সেই মেয়েকে নিয়ে সে প্রতিনিয়ত বুনত হাজার রঙের স্বপ্নমালা।

কিন্তু একদিন সেই মেয়েটি সায়নের পবিত্র ভালবাসাকে ডিঙিয়ে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে দুজনের সম্পর্কের ডগায় পা মারিয়ে তাকে জানিয়েই বিয়ে করে স্বয়ং তার এবং তার বাবার মায়ের পছন্দের ছেলেকে।সেই থেকে প্রেম ভালবাসার প্রতি সায়নের চরম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা ।

এরপর থেকে সায়ন আর চায়নি কারো মিথ্যা ভালবাসায় প্রবঞ্চনার শিকার হতে।তাই ভালবাসা নামক সম্পর্কটাকে ছুটি দিয়ে সে প্রতিজ্ঞা করে
ভালবেসে আর কষ্ট পাওয়া নয় এবার সে জীবনটাকে শুধু উপভোগ করবে।

যদিও সায়ন নিজেকে সমপ্রেমী মানতে নারাজ। তবুও ছেলেদের প্রতি মৃদু ভাললাগা তার মনের কোণে ডু মারত।তবে সে ঐ ভাললাগার অভিব্যক্তি দেখাত না।বিভিন্ন অজুহাতে মনের মাঝেই চেপে রাখত। কিন্তু বিশ্বাস ঘাতকতার অসহ্য গ্লানি তাকে প্ররোচনা দিতে লাগল সব রকম সম্পর্কে জড়ানোর জন্য।

এর নিমিত্তেই সায়ন বিভিন্ন সাইট থেকে সমপ্রেম সম্পর্কে জেনে একটি আইডি খুলল।অতঃপর অল্প কয়েকদিনেই অনেক ফ্রেন্ডও হল তার।আর তখন থেকে শুরু হল ভালবাসার নামে মিথ্যে সম্পর্ক তৈরির অভিনব খেলা।ছেলেদের পটানোর জন্য অদম্য হল সে।কিন্তু কিছুতেই কিছু হলনা।

এরপর হঠাৎ একদিন একটি আইডি নাম দেখে সায়ন প্রবলভাবে অভিভূত হল।
মুগ্ধতার খাতিরেই সেই আইডির ইন বক্সে হাই বলে নক করল।কিন্তু কোন সাড়া পেলনা।পরক্ষণে আবারও নক করল।

তিন মিনিট পর সেই আইডি থেকেও হাই সম্বোধনে রিপ্লে এলো। রিপ্লে দেখে সায়ন সময়ক্ষেপণ না করে আইডির মালিককে সমপ্রেম বিষয়ে নানা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।এভাবে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্তর বিনিময়ের মাধ্যমে সেদিন প্রায় দুঘণ্টা চ্যাটিং হয় দুজনের মধ্যে আর সায়ন খুঁজে পায় তার পাতানো ভালবাসার সঙ্গী রাফিকে।কাল পরিক্রমায় তাদের সম্পর্ক এক পর্যায়ে ইন্টারনেটের গণ্ডি থেকে ফোনালাপে চলে আসে।তদুপরি পাশাপাশি জেলার বাসিন্দা হওয়ায় দুজন একান্তভাবে দেখা করারও সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর প্রথম দেখাতেই দুজন দুজনকে ভীষণভাবে পছন্দ করে ফেলে।

এই ভাললাগার সাপেক্ষে তাদের সম্পর্ক ভালবাসার স্তরে ঠাঁই পায়। প্রতিদিন চ্যাটিং,ফোনালাপ আর কদাচিৎ একসঙ্গে হওয়া এভাবেই দুজনের পরিপূর্ণ ভালবাসা বেশ ভালভাবেই পার করল প্রায় ছয়টা মাস। কিন্তু রাফির প্রতি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ার প্রবণতাটা সায়নের চিত্তে বিরূপ ভাব জাগাতে লাগল।
ভাবনাকে প্রশ্রয় দিয়ে সে সিদ্ধান্ত নীল, যে করেই হোক এই সম্পর্কটার ইস্তফা দিতে হবে।এই প্রেক্ষিতেই সম্পর্ক ভাঙ্গার সিদ্ধান্তকে মনে ধারণ করে রাফির সাথে দেখা করতে চায় সায়ন।রাফিও তার দেখা করার প্রস্তাবে রাজি হয়।

পরদিন লাঞ্চ বিরতির সময় সায়ন একটি পার্কে রাফির জন্য অপেক্ষা করে।
কিন্তু প্রায় ৫০ মিনিট অপেক্ষার পরও রাফির কোন পাত্তা নেই,ফোনেও পাচ্ছেনা তাকে।

তবে রাফি আর তার সম্পর্ক সমাপ্ত করার ক্ষেত্রে রাফির এই বিলম্ব হওয়াটা সায়নের পরিকল্পনায় অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করে দেয়। অবশেষে ১ ঘণ্টা পর রাফি সায়নের সামনে হাজির হয়। এদিকে সায়নের অফিসের লাঞ্চ বিরতির নির্ধারিত সময়ও শেষ হয়ে যায়। তখন সায়ন নীরস পাষাণ আচরণের ভঙ্গি নিয়ে সম্পর্ক ভাঙ্গার অভিলাষে রাফির সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করতে শুরু করে। দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হতে থাকে।এক পর্যায়ে রাফিকে সম্পর্ক শেষ করার কথাটা অবজ্ঞা স্বরে ব্যক্ত করে দিয়ে রাফিকে রেখে সেখান থেকে চলে যায় সায়ন।

তৃতীয় অংশ,

রাত ৮টা, সারাদিন অফিসের পর বাসায় ফিরে ফ্রেশ না হয়েই ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেয় সায়ন।রাফির অনুরোধেই আজ বিকালে দেখা করেছে দুজন।শেষ বিদায়ে রাফি সায়নের হাতে একটি প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। প্যাকেটের কথা মনে পড়তেই সায়ন বিছানা থেকে চট জলদি উঠে প্যাকেটটা হাতে নিয়ে খুলে এর ভেতরে একটি সোনালী রঙের ব্রেসলেট আর একখানা চিঠি পেল। তারপর চিঠিটা মেলে পড়তে শুরু করল সে…

প্রিয় সায়ন,
আমি জানিনা তুমি কীভাবে এতটা বদলে গেলে।আমাকে ফিরিয়েই যখন দিলে তবে এসেছিলে কেন আমার জীবনে?হয়তো আমি তোমার অযোগ্য।তবে বিশ্বাস কর আমি শুধু তোমাকেই ভালবাসি এবং বাসব।আমি জানিনা ভবিষ্যতে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে।

তবে তোমার স্মৃতিটুকুকেই যতনে রাখব আমার ভবিষ্যতের সঙ্গী হিসেবে।আমাদের আর দেখা হবে কিনা জানিনা।তাই আমার ভালবাসার শেষ স্মৃতি হিসেবে তোমাকে একটি ব্রেসলেট দিলাম।দয়াকরে সেটাকে অবহেলা করো না।খুব ভালো থেকো, শুভময় হোক তোমার বর্তমান আর অনাগত ভবিষ্যৎ।

ইতি
রাফি

চিঠিটা পড়ার পর হিতাহিত ভাবনাগুলো ভেতর থেকে আবির্ভূত হয়ে সায়নের বিবেককে দংশন করতে লাগল।একটা নৈতিক বোধ অবিরাম আবর্তিত হয়ে তার মনে জমাট বাঁধতে লাগল। কিন্তু যা শেষ হয়ে গেছে তাকে আবার সামনে টেনে এনে সায়ন তার ভাবনাগুলোকে দীর্ঘায়িত করতে চায় না।তাই সব ভাবনাকে তুচ্ছজ্ঞান করে অবজ্ঞায় বালি চাপা দিয়ে আবার পূর্ণউদ্যেমে মরিয়া হয়ে পড়ল প্রেমিক প্রেমিকা পটানোর নিত্য খেলায়।

কখনো রিয়েল লাইফে মেয়েদের পিছনে লাগা কখনোবা গে আইডিতে ছেলেদের পেছনে লাগা,দুটিই সমান তালে চলতে লাগল দিনকে দিন।এভাবেই কেটে গেল প্রায় দুমাস। তবে যত দিন যাচ্ছে সায়নের সংবেদনশীল মনটা রাফির শূন্যতাকে ততই অনুধাবন করছে ।সায়ন চেষ্টায় মগ্ন হলো রাফির স্মৃতিগুলো ধামাচাপা দেয়ার জন্য। কিন্তু মন যেখানে অধরা সেখানে শাসন বারণের প্রশ্নই আসে না।

কি ফেইসবুক কি ফোনালাপ সবকিছুতে যেন রাফিকে হারানোর বেদনা সায়নের অনুভূতিতে মৌনতার চাদর মুড়িয়ে দিতে লাগল।বর্তমানের আবর্তনে বিলুপ্ত হওয়া কিছু অতীত জাগ্রত হয়ে তাকে অবিরাম পিছুটানতে লাগল ।সায়ন ভেবে পেত না, যে সায়ন একদিন কোন মেয়েকে সর্বস্ব উজাড় করে
ভালবাসত সেই সায়ন আজ একটা ছেলেকে একইভাবে
গভীর অনুরাগে অনুভব করছে।

সায়ন তখন রাফির দেয়া ব্রেসলেটটা হাতে নিয়ে হৃদয় জড়ানো মমতায় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আনমনে সেটিতে হাত বুলাতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে রাফিকে একটা ফোন দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করল।যেই ভাবা সেই কাজ সে রাফির নাম্বারে ডায়াল করল।কিন্তু রাফির ফোন বন্ধ পেল।
ফোনে না পেয়ে ফেইসবুকে নক করার মনোবাসনা করল সায়ন।তারপর তার আইডিতে লগইন করেই রাফির ইনবক্সে গেল মেসেজ করার জন্য। কিন্তু এখানেও রাফি ইনএ্যাকটিভ। তবুও সায়ন হাই বলে নক করল। উত্তরের জন্য সে কমপক্ষে ২ ঘণ্টার মত অপেক্ষা করল কিন্তু কোন সাড়াই মিললো না।

এমন করেই কেটে গেল ২দিন। ফোন কিংবা ফেইসবুকে কোন মাধ্যমেই রাফির সাড়া না পেয়ে এক প্রকার ঘাবড়ে গেল সায়ন।
সেদিন রাতে রাফিকে নিয়ে
একটা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে চমকে ওঠে সে।

এক গ্লাস পানি খেয়ে সাথে সাথে মনস্থির করল আগামীকাল সকালেই রাফির বাসায় যাবে সে তার সাথে দেখা করার জন্য।পরদিন অফিস বাদ দিয়েই সায়ন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ল রাফির বাসার উদ্দেশ্যে।প্রায় ১২টা নাগাদ রাফির বাসার সামনে পৌছালো সে।যদিও অনেক দিন আগে রাফি সায়নকে দেখিয়েছিল তাদের বাড়িটা। তবুও একটু সংকোচ নিয়ে কলিং বেলে চাপ দিল সায়ন।দুবার চাপার পর ১৯-২০ বয়সী একজন যুবক দরজা খুলে বলল,

-কাকে চান?
-এটা তো রাফিদের বাসা তাইনা?
-হুম।
-রাফিকে একটু ডেকে দেয়া যাবে?
-রাফিকে ডেকে দেব মানে! ( বিস্মিত হয়ে বলল ছেলেটি)
-হ্যাঁ,ও কি বাসায় নেই?
– আপনি কিছু জানেন না?
-কি জানব? ( কৌতূহলী আবেগে বলল সায়ন)
-আসলে রাফি আর এই পৃথিবীতে নেই।
-মানে? ( অবাক হয়ে কিছু না শোনার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল সায়ন)
-হ্যাঁ , তার মৃত্যুর আজ প্রায় মাস দুয়েক হয়ে গেল।

কথাটা সায়নের মর্মমূলে আকস্মিকভাবে চরম আঘাত করল।তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।মূর্তির মত নির্বাক হয়ে সে ভাবতে লাগল সে কি সত্যিই পৃথিবীতে আছে!
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নিচু স্বরে বলল,
-রাফির কি হয়েছিল?
-রাফির মৃত্যুটা স্বাভাবিক ভাবে হয়নি,ও আত্মহত্যা করেছিল।কিন্তু কেন করেছিল সেটা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি।

কথাগুলো শোনার পর সায়ন আর কিছুই বলল না।ছেলেটি সায়নকে ভেতরে যেতে বলল।কিন্তু নিরাশার গভীর গর্তময় বেসামাল কষ্ট ,শোকাতুর অনুভূতি আর বিষময় অপরাধ বোধকে সাথে করে নিস্তব্ধ, নির্বিকার হয়ে সেই পথেই পিছু হাঁটল সায়ন।বাসায় ফিরে দরজা বন্ধ করে বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে কাঁদতে শুরু করল সে।

সায়নের কান্নাজড়িত চিৎকার শুনে তার মা হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এসে দরজায় ধাক্কা দিয়ে সায়নকে ডাকতে লাগল। ক্ষণিক ক্ষণ কাঁদার পর সায়ন দরজা খুলে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল।ছেলের চোখে জলের একাকার কান্না দেখে তার মাও চোখের জল স্থির রাখতে পারল না।সায়নের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে বাবা কাঁদছিস কেন?আমার সোনা বাবা বল আমাকে।

সায়ন একসময় মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলল, আমার খুব প্রিয় একজন বন্ধু মারা গেছে মা। বলে আবারও ডুকরে কাঁদতে শুরু করল।
তার মা তখন তাকে এটা ওটা বলে সান্ত্বনা দিতে লাগল আর তাকে নামায পড়ে আল্লাহর কাছে দোআ চাইতে বলল।সায়ন তৎক্ষণাৎ চোখ মুখ মুছে গোসল সেরে ওযু করে নামায পড়ার জন্য মসজিদে রওয়ানা দিল।

সায়নের মনে সর্বক্ষণ একটাই অনুশোচনা উদ্ভূত হয়ে ব্যথাতুর দহনে তার হৃদয়ে তপ্ততা ঢেলে দিতে লাগল।রাফির মৃত্যুর জন্য সেই দায়ী,তার বিশ্বাসঘাতকতাই রাফিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।এমন ভাবনাগুলো তাকে চোরাবালির মত গ্রাস করতে লাগল দিনের পর দিন।
এভাবেই কেটে গেলে কয়েকদিন।এরপর থেকে শুধু অফিস,বাড়ি আর মসজিদ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল সায়নের বিষাদ বন্দি জীবন।

তবে মাঝে মাঝে ফেইসবুকে ঢুকত সায়ন। কিন্তু আগের সেই উদ্যম কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।আর কিছুই ভাল লাগে না তার।কখনো বিনিদ্র রাত্রিতে রাফির রেখে যাওয়া কিছু স্মৃতি নীরব সাক্ষী হয়ে ঠুকরে পড়ে তার গহীন অনুভবে,কখনো অন্তরালে থাকা কষ্টগুলো দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নির্গত হয় ,কখনোবা মুনাজাতে বসে অবিরল ধারায় গাল বেয়ে নোনাজল ঝড়ে।

এরপর একদিন সন্ধ্যায় সায়নের মা সায়নকে একটি উড়োচিঠি দিয়ে বলে, –দেখতা বাবা চিঠিটা কার?দরজার সামনে পেলাম।শুধু তোরই নাম লেখা। কে পাঠিয়েছে,কোথা থেকে পাঠিয়েছে কিছুই লেখা নাই।
সায়ন চিঠিটা হাতে নিয়ে চমকিত দৃষ্টিতে খামটার এপিঠ ওপিঠ অবলোকন করতে লাগল। কিন্তু কিছুই পেল না তার নামটা ছাড়া।

সে খামের ভেতরে সবুজ রঙের একখানা কাগজ পেল।সেখানে লেখা- আমি আছি তোমারই অপেক্ষায়।
লেখাটা পড়ার পর আচমকা অবাক হয়ে কাগজটির দুপাশে চোখ বুলাতে লাগল সায়ন কিন্তু আর কিছু পেল না।চিঠিটা সায়নের ভাবনায় গভীর চিন্তার চাপ ছড়িয়ে দিল।কিন্তু এর
কোন সীমারেখা খুঁজে পেল না সে।হয়তো কেউ মজা করেই তাকে পাঠিয়েছে পরে এমনটা ভেবে চিঠির ব্যাপারটা হেঁয়ালি করে এড়িয়ে গেল সায়ন।

১ সপ্তাহ পর,ঠিক মাঝ দুপুরে অফিসে অবস্থান কালীন সায়নের মোবাইলে একটি অজ্ঞাত নাম্বার থেকে মেসেজ এলো।মেসেজে লেখা ছিল- জানি আবার দেখা হবে।
মেসেজটা দেখে সায়ন সাথে সাথেই নাম্বারটা ডায়াল করল।কিন্তু সুইচ অফ।এবার এই ব্যাপারটা তাকে সন্দিহান করে তুলল।তবে এক অজানা বৃত্তেই আবিষ্ট থাকতে হল সায়নকে।

চতুর্থ অংশ,

২ মাস পর।আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালবাসা দিবস। প্রেমিক প্রেমিকাদের একটি অন্যতম বিশেষ দিন। কিন্তু সায়নের কাছে সব দিনই যেন সমান হয়ে গেছে এখন।বিশেষ বলে তার জীবনে যেন কিছুই অবশিষ্ট নেই।
বসন্তের পড়ন্ত বিকেলে খুব স্মৃতিময় একটি জায়গায় বসে আছে সে। প্রায় সময়ই অফিস শেষ করে এখানে অকারণেই উদাস মনে বসে থাকে সায়ন।কারণ এখানেই প্রথম আর শেষ দেখা হয়েছিল সায়ন আর রাফির।সায়নের আর ইচ্ছা নেই কোন প্রকার রিলেশনে জড়ানোর এবং এটা কতটুকু বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত সেটা ভাবারও চেষ্টা করেনি সে।

হঠাৎ তার ঘাড়ে একটা হাতের স্পর্শ পেয়ে পেছনে তাকিয়ে ভূত দেখার মত চমকে উঠল সায়ন।একটা অবিশ্বাসের ঘোরে ঘোলাটে হয়ে গেল তার চোখ।সায়ন চোখ ঘোচলিয়ে হা হয়ে আবার দেখতে লাগল।

স্বয়ং রাফি তার সামনে একগুচ্ছ টুকটুকে লাল গোলাপ নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। *এটা কীভাবে সম্ভব,আমি ভুল দেখছি না তো।* নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল সায়ন।তখন রাফি ভ্রু কুঁচকে সায়নকে বলল,
– কি কেমন চমকে দিলাম?
-তু…তু…তুমি। ( আমতা আমতা করে বলল সায়ন)
-হুম,আমি মরিনি আর কখনো মরার চেষ্টাও করিনি।
-তাহলে ঐ ছেলেটা যে বলল…..

রাফি তখন সায়নের পাশে এসে বসে বলল,
-ও আমার চাচাতো ভাই জিম। আমি জানতাম তুমি আমার খোঁজে আমাদের বাসায় আসবে তাই ওকে আগে থেকেই সব শিখিয়ে দিয়েছিলাম।আমাদের বাসার সামনে এসে তুমি যখন কলিং বেল চাপ দিলে তখন উপর থেকেই সব দেখে জীমকে জলদি করে পাঠিয়ে দেই তোমার কাছে।

-ও ও ও সব তাহলে তোমার চাল। নাটের গুরু একটা।
– এখন সব আমার দোষ ।তুমি বোধ হয় কিছুই করনি না?
-তুমি হয়তো জানো না এ কয়েকটা দিন কিভাবে কেটেছে আমার।
-আমি জানি আমার মৃত্যুর কথা তোমাকে কতটা শক দিয়েছে,তারপর আমার উড়োচিঠি, মেসেজ তোমাকে কতটা উত্তেজিত করেছে সব জানি।
-তার মানে চিঠি আর মেসেজ প্রাপক তুমি?
-হুম….
-সত্যি এর জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে।
-তুমি তো সবই পার ।দাও শাস্তি দাও আমাকে। আমি মাথা পেতে নেব তোমার সে শাস্তি।
-জানো আজ নিজেকে খুব মিথ্যেবাদী রাখাল মনে হচ্ছে ।
-কেন,কেন কেন???
-কেন আবার রাখালের গল্পটা পড়নি। দুইবার মিথ্যে বলে বাঘ বাঘ করে যখন চিৎকার করল তখন গ্রামবাসীরা এসে কিছুই পেল না।আর যখন সত্যি সত্যি বাঘ এল তখন কেউই বিশ্বাস করলনা ।

-তারপর আবার কি,রাখাল বেচারা গেল বাঘের পেটে। আর সেই রাখালের মতনই তোমায় যখন সত্যি সত্যি ভালবাসতে চাচ্ছি তখন তোমার বিশ্বাসই হচ্ছে না।মানুষ সব সময় এক থাকে না রাফি।
-ওরে আমার সোনারে।দেখি কোথায় রাগ হচ্ছে তোমার।

বলেই সায়নের বুকে মাথা গুঁজে দিল রাফি।সায়নও তার হৃদয়ের সবটুকু ভালবাসা দিয়ে রাফিকে বুকে আগলে নিলো।

সত্যিকারের ভালবাসা এমনই হয়।যেখানে শত বাঁধাও কোন কারণ হয়ে সামনে দাঁড়াতে পারেনা।হৃদয়ের অদৃশ্য টানেই দুটি মানুষের সে ভালবাসার কোন না ভাবে মিলন হবেই।

* সমাপ্ত *

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১৫ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৫।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.