হোমো হিমু

লেখকঃ আনন্দধারা

(হুমায়ূন আহমেদ স্যারের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, তার অমর চরিত্রকে নিজের গল্পে ব্যবহার করার জন্যে। আশা করি হুমায়ূন ভক্তরা আমার এই ইচ্ছাকৃত ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)

উৎসর্গঃ আমার হুমায়ুন ভক্ত ভাইটাকে… ভালোবাসি ভাইয়া, এত্তগুলা ভালোবাসি।

১।

রমনা থানা, রাত ৩ টা

– এত রাতে তুই পার্কে কি করছ?
– জ্বি, কিছু করি না। ঘুরি।
– হারামজাদা, ফাইজলামি পাইছোছ? মনে করছ আমি কিছু বুঝি না! বল! সত্যি কথা বল!
– সত্যি বলছি আজগর সাহেব, আমি ঘুরতে এসেছিলাম পার্কে।
– রমনা পার্কে মাইনসে ঘুরতে আসে সকালে না হয় বিকালে। খুব বেশি হইলে রাত ১০ টা পর্যন্ত থাকে মানুষজন। আর তুই আইছোস রাত তিনটা বাজে! ফাইজলামি!
– ফাইজলামি না ওসি সাহেব। আমি সত্যিই ঘুরতে এসেছি। আমি শুনেছি রমনা পার্কের বকুলতলায় নাকি সমপ্রেমীদের মিলনমেলা বসে সন্ধ্যার পর। তাই সেটা দেখতে এসেছি।
– সমপ্রেমী? এইটা আবার কি জিনিস? হো! হো! হো! বুচ্ছি। তুই তাইলে পোলা লাগাইতে আইছোস! কিন্তু ওই মাগীগুলা তো এতো রাত পর্যন্ত থাকে না। যার যার ভাতার নিয়া ১০ টার মধ্যেই পার্ক থেইকা বাইর হইয়া যায়।
– আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন আজগর সাহেব? ওরা মাগী হতে যাবে কেন? ওরা পুরুষ। পুরুষ হয়ে পুরুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। তাছাড়া আমি যতদূর শুনেছি ওরা এখানে আসে সঙ্গী খুঁজতে, টাকার বিনিময়ে দেহ বিক্রি করতে নয়।
– বাল শুনছোছ হারামি! মাগী গুলার মাইয়া মানুষ দেখলে সোনা খাড়ায় না, পোলা দেখলেই ফাল দিয়া উঠে। এগুলার কাছেও তো যাওয়া যায় না। কোনদিন আমার গায়ে না হাত দিয়া ফালায়। তাই আমি ওইদিকে কখনো যাই না। আজকে রাতে গেছিলাম স্যারের কড়া নির্দেশে। সামনে পহেলা বৈশাখ, রাতে কেউ বোম টোম ফালায়া গেছে কিনা সেটা দেখার জন্য। আসল কথায় আয়, তোরে দেইখা তো মনে হয় না তুই মাগী লাগাইতে গেছোস অতো রাতে। ঘটনা কি সত্যি কইরা ক! ক্যান আইছিলি রমনায় এত রাতে। নাইলে কিন্তু রিমান্ডে নিয়া আচ্ছা মতো ডলা দিমু।
– আজগর সাহেব, আমি মিথ্যা বলি না।
– এহহহ আসছে মহাপুরুষ! মিথ্যা বলেন না। তোর বাপ তোরে মহাপুরুষ বানাইতে চাইছিল তো, হের লাইগা কয়া দিছে মিথ্যা কওন যাইবো না।
– ঠিক ধরেছেন। কিন্তু বাবার সে চেষ্টা সফল হয় নাই। আমি মিথ্যা বলি।
– ফাউল পেচাল বন, রোকন! এই ব্যাটাকে লকাপে ঢুকাও। এর মহাপুরুষগিরি আমি ছোটাচ্ছি।

চাইলে ফুপা সাহেবকে ফোন দিয়ে বেচে যেতে পারতাম, কিন্তু অনেকদিন পুলিশের ডলা খাওয়া হয় না। তাই ইচ্ছা করেই আর ফোন দিলাম না ফুপা সাহেবকে। সকাল সাতটায় আমাকে ছেড়ে দেয়া হলো। গাল আর কানের নিচটা এখনো ব্যথা করছে। যাক ঘুমটা ভালো হবে। ব্যাথায় আমার ঘুম ভালো হয়।

– আজগর সাহেব, একটা চা পাওয়া যাবে?

৪৮ বছর বয়সী ওসি আজগর আলী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন হিমুর দিকে, এক কাপ চা দিতে বলেন।

– আপনাদের চা’টা দেখি আর আগের মত নাই।
– মানে?
– মানে এর আগে চা’টা অনেক মিষ্টি হতো, খাওয়া যেতো না। সাথে মাছিও থাকতো একটা। আসাদ সাহেবকে বলতে হবে সব থানায় যেন মাছিওয়ালা চা পাওয়া যায়।
– আসাদ সাহেব কে?
– আসাদ সাহবেকে চেনেন না? আপনার তো চাকরি চলে যাওয়া উচিত। ডিএমপি কমিশনার মোঃ আসাদুজ্জামান মিয়া।
– মানে? কি বলছেন আপনি?
বুঝতে পারলাম কাজ হয়েছে। ওসি আজগর আলী ঢোক গিলতে শুরু করেছে। তার স্বাস্থ্যবান শরীর দরদর করে ঘেমে যাচ্ছে।
– ইয়ে মানে আপনি স্যারকে চেনেন?
– জ্বি। আমার দূর সম্পর্কের ভাই হন।
– স্যার, প্লিজ আমার চাকরিটা খাবেন না। বউ-ছেলে নিয়ে এই বয়সে রাস্তায় নামতে হবে। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। এই কে আছিস? স্যারের জন্য কফি নিয়ে আয়!
– কফি আনতে হবে না আজগর সাহেব। আপনি আপনার ডিউটি করেছেন। অত রাতে কেউ পার্কে ঘোরাঘুরি করলে তাকে গ্রেপ্তার করাই উচিত। আমি আপনার উপর সন্তষ্ট। তবে একটা কথা।
– জ্বি স্যার বলেন।
– আপনার ছেলেটার প্রতি কোন অন্যায় করবেন না।

ছেলের ব্যাপারটা অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মত লেগে গেছে। জানতাম না উনার যে ছেলে আছে। মাঝে মধ্যে মানুষকে ভড়কে দেয়া আমার পুরনো অভ্যাস। আর এই মানুষটাকে ভড়কে দেয়াতে খুব মজা পাচ্ছি। উনাকে ভড়কে দেয়াতে কোন মিথ্যাও বলা লাগেনি। ঢাকার অধিবাসী হয়ে ডিএমপি কমিশনারের নাম জানবে না এমন লোক পাওয়া দুষ্কর, আর সূরা হুজুরাতে আল্লাহ্‌ তা’লা বলেছেন মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। তাই ডিএমপি কমিশনারকে আমার ভাই বলাটাও মিথ্যা বলা হয় নাই।

– মানে স্যার? ঠিক বুঝলাম না।
– আপনার ছেলে একজন সমপ্রেমী, সে একটা ছেলেকে খুব ভালবাসে। তাই তাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবেন না। আসি।
বের হয়ে এলাম থানা থেকে। শেষ কথাটা বলা ঠিক হয়নি। আজগর সাহেবের চোয়ালটা নিচে নেমে এসেছিল। কথা বলতে পারছিলেন না। মাঝে মাঝে আমার কী যেন হয়। হড়বড় করে কি সব কথা বলে ফেলি।

২।

সেদিন আর বকুলতলায় যাওয়া হয়নি বলে ঠিক করলাম আজ সন্ধ্যায় আবার যাবো। আজগর সাহেবের কথা অনুযায়ী সন্ধ্যার দিকে গেলে তাদের পাওয়া যাওয়ার কথা।
সূর্য ডোবার একটু আগেই অস্তাচল দিয়ে ঢুকে পড়লাম রমনায়। গোধূলির আলোয় অসাধরণ মায়াবি একটা আবেশ চারদিকে। মনটাই ভালো হয়ে গেলো। একা একা হাঁটছি। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই বকুলতলাটা কোন দিকে?” খুব অবাক হলো। পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলো কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলল, “ওইদিকে”। ভদ্রলোকের দেখানো ওইদিকে চলে এলাম হাঁটতে হাঁটতে।

ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। খালি পায়ে হাঁটতে দেখে সাধারণত সবাই অবাক হয়ে তাকায় আমার দিকে। কিন্তু এখানে যারা তাকাচ্ছে তাদের দৃষ্টি সম্পূর্ণই অন্যরকম। এদের দৃষ্টি আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত যায়, তারপর আবার মাথা থেকে নেমে পেটের নিচ পর্যন্ত এসে থেমে যায়। কয়েকজন একসাথে ছিল। আমি পাশ দিয়ে যেতেই গান ধরলো, “রসিক দিলকা জ্বালা, ওয় হলুদ কুর্তাওয়ালা… দিলি বড় জ্বালারে পাঞ্জাবিওয়ালা…”

না হেসে পারলাম না। হাসিমুখে তাকালাম চার-পাঁচজনের ছোট্ট দলটার দিকে।

– তাকাইছেরে, তাকাইছে!

ইশারায় কাছে ডাকলো। আমি কাছে যেতেই আমাকে ঘিরে নাচ শুরু করলো হাতে তালি দিয়ে। ভালোই লাগলো এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়ে। বসে পড়লাম ওদের পাশে।
আমার দুইপাশে দুইজন গা ঘেঁসে বসে পড়লো। একজন জিজ্ঞেস করলো,

– কতি না পান্থি?
– মানে? ঠিক বুঝলাম না।
– আরে বাবা, টপ না বটম? (পাশের জনের প্রশ্ন)
– আমি সত্যি আপনাদের কথা বুঝতে পারছি না।
– বুঝতে পারছেন না? ওই মৌসুমি খোলতো প্যান্টটা। খোমায় টাকলেই সব কিছু কিলিয়ার বুঝতে পারবো ব্যাটা।

কথা শেষ না হতেই মৌসুমি নামের ছেলেটা আমার পাঞ্জাবিটা সরিয়ে প্যান্টের বেল্টে হাত দিলো। আমি বাধা দিতেই পাশে বসা ছেলেটা শক্ত করে হাত দুটো চেপে ধরলো আমার। বেল্ট খুলে ফেলল, প্যান্টের হুক খুলতে যাবে তখনই আমি হ্যাচকা টানে সড়িয়ে দিলাম ছেলেটার হাত। উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম।

– আমি এখানে এসব কিছু করতে আসিনি।
– কইরা দেখেন, ভালো লাগবো। ফিরিতে খোমায় টাক দিয়া দিমুনে। আর জিনিস ভাল হইলে বাসায়ও যাইতে পারি।
– ধন্যবাদ, দরকার নেই। আসি।
দ্রুত হাঁটা শুরু করলাম। এখান থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হবে। একজন পেছন থেকে ডাকলো,
– এইযে, শুনছেন?
– আমাকে বলছেন?
– জ্বি আপনাকেই, একটু দাঁড়ান। ভয় নেই। কথা দিচ্ছি।

“ভয় নেই, কথা দিচ্ছি” শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। ভদ্রলোক এগিয়ে এলো আমার কাছে।

– আপনি বোধহয় এখানে নতুন, তাই না?
– জ্বি।
– কেন এসেছেন জানতে পারি?
– দেখতে এসেছি।
– কি দেখতে এসেছেন?
– শুনেছি এখানে নাকি সন্ধ্যার পর সমপ্রেমীদের মিলনমেলা বসে, তাই দেখতে এসেছি।
– সমপ্রেমী? হা হা হা!
– হাসছেন যে?
– গে-এর বাংলা বানিয়েছেন সমপ্রেমী? ভালই তো! এই পর্যন্ত আমার শোনা সবচেয়ে ভাল বাংলা ছিল সমকামী। তাও কাম শব্দটা থাকায় শব্দটা আমার ঠিক পছন্দ হতো না। আপনি সুন্দর একটা নাম দিলেন। “সমপ্রেমী”। ভালো লাগলো। তা আপনি কি সমপ্রেমী? মিস্টার…
– হিমালয়। সংক্ষেপে হিমু।
– বাহ সুন্দর নাম। বললেন নাতো, আপনি কি সমপ্রেমী?
– জ্বি না।
– তাহলে এখানে এসেছেন কেন?
– দেখতে।
– ও আচ্ছা। আপনাদের মতে সো কল্ড সমপ্রেমীরা তো চিড়িয়া। আর রমনার বকুলতলা হচ্ছে সেইসব চিড়িয়াদের চিড়িয়াখানা। ভালো! দেখেন।
– ব্যাপারটা তা নয়। আপনি আমাকে ভুল বুচ্ছেন। আমি রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াই। বিভিন্ন জিনিস দেখি, সেখান থেকে শিক্ষা নেই জীবনের।
– তা সমপ্রেমীদের থেকে কী শিক্ষা নেবার আছে আপনার জানতে পারি?
– এইযে তাদের ভিন্নধারার ভালো লাগা, সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করা, এইসব আরকি!
– ও আচ্ছা!
– আপনার সাথে বসে একটু কথা বলতে পারি?
– জ্বি পারেন। চলেন একটু আলোর দিকে গিয়ে বসি। এখানে বসলে অনেকে অন্যকিছু ভাবতে পারে।

কথা প্রসঙ্গে জানলাম ভদ্রলোকের নার মুস্তাকিম। ধানমন্ডিতে থাকেন। এখানে এসেছেন বিশেষ একটা কারণে। অন্য মানুষদের মত শয্যাসঙ্গী খুঁজতে নয়, স্মৃতিচারণ করতে। তার ভালবাসার মানুষটার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে কিছুদিন পর। তাই এখানে এসেছেন স্মৃতি রোমন্থন করতে। রমনাপার্কেই দুই বছর আগে তাদের সাক্ষাত হয় এমনি এক সন্ধ্যায়।

৩।

সপ্তাহ খানেক ঢাকার বাইরে ছিলাম, বাদলের জোড়াজুড়িতে তার সাথে সিলেট যেতে হয়েছিল। তার আবার ইদানিং পীরভক্তি শুরু হয়েছে। শাহজালালের মাজার জিয়ারত করলে নাকি সে ফুলকে বিয়ে করার ব্যাপারে ফুপা সাহেবকে রাজি করাতে পারবে।
বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই মেসের ম্যানেজার বলল,

– হিমু সাহেব, আপনার যন্ত্রণায় তো সবাইকে মেস ছেড়ে দিতে হবে দেখছি!
– কেন কেন?
– রমনা থানার ওসি আজগর সাহেব আপনার সাথে দেখা করতে এসে ফিরে গেছেন বেশ কয়েকবার। কি ব্যাপার ভাই? কোন ঘটনা ঘটাইছেন?
– ও আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি উনার সাথে কাল দেখা করবো।

৪।

থানায় ঢুকতে না ঢুকতেই আজগর আলী সাহেব তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এলেন, যেন আমি এই এলাকার এম পি।

– স্যার, প্লিজ আসেন। আপনি কেন আসতে গেলেন কষ্ট করে? আমি তো আমার ফোন নাম্বার দিয়ে এসেছিলাম। আমাকে ফোন দিলেই হতো, আমি চলে যেতাম দেখা করতে।
– সমস্যা নেই, বলেন কি ব্যপার?
– স্যার যদি একটু অনুমতি দিতেন, আপনার সাথে বাইরে কোথাও গিয়ে বসতাম।
– কোথায় যেতে চান?
– স্যার, আমার পরিচিত খুব ভালো চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আছে। আমাকে ২০% ডিসকাউন্ট দেয়। যদি আপনার আপত্তি না থাকে সেখানে গিয়ে একটু বসতাম।

ওসি আজগর আলী সাহেব আমাকে নিয়ে এলেন মিডনাইট সান নামক রেস্তোরাঁয়। দিনের বেলা মিডনাইট সান-এ খেতে কেমন যেন লাগছিল। তবে খাবারের আয়োজন নেহায়েত মন্দ না। প্রথমে থাই স্যুপ আর ওয়ান্থন। এরপর বিফ সিজলিং, চিকেন ফ্রাই আর ফ্রায়েড রাইস। সাথে ভেজিটেবলও একটা ছিল। তবে এদের স্যুপটা ভালো। মুস্তাকিম সাহেবের সাথে একবার আসতে হবে স্যুপটা খাওয়ার জন্য।
খাওয়া শেষে কোল্ড ড্রিঙ্কের অর্ডার দিয়ে আজগর সাহেব তার কথা শুরু করলেন,

– স্যার খুব বিপদে পড়ে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।
– কি বিপদ?
– স্যার, আপনি তো জানেন কি বিপদ
– আমি আপনার বিপদের কথা কি করে জানবো?
– না স্যার, আপনি জানেন।
– সত্যি বলছি আমি জানি না।
– স্যার আপনি মজা করছেন আমার সাথে।
– আমি মজা করছি না আজগর সাহেব, তবে দুঃখিত। সেদিন মজা করে বলেছিলাম যে আসাদুজ্জামান সাহেব আমার দুঃসম্পর্কের ভাই হন। আসলে উনি আমার কেউ না।
– তাহলে যে বলেছিলেন আমার ছেলে সমপ্রেমী, সেটাও কি মজা করে?
– জ্বি।
– হতেই পারে না স্যার। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করবো না আপনার কথা। আমার স্যার একটা মাত্র ছেলে, এই বছরই ডাক্তারি পাশ করলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে। আমার খুব ইচ্ছা ছেলেটাকে আমার বোনের মেয়ের সাথে বিয়ে দেই। আমার বোন ফুল ফ্যামিলি সহ কানাডায় সেটেল্ড। কিন্তু ছেলে নাকি বিয়ে করবে না। আমরা বেশ কিছুদিন থেকেই চাপ দিচ্ছিলাম, কিন্তু সে শুনছিল না কিছুতেই। বলতো পড়াশোনা করতে বাইরে যাবে, এখন বিয়ে করবে না। কতভাবে যে বুঝিয়েছি! কোন কাজ হয় না। এদিকে আমার বোন তার মেয়ে নিয়ে হাজির। এই মাসের শেষ শুক্রবারেই আকদ। ছেলে আমাদের কথা না শোনায় শেষে বাধ্য হয়ে তাকে ত্যাজ্যপুত্র করার হুমকি দিলাম বিয়ে না করলে।
– তারপর?
– তারপর আর কি? ছেলে রাজি হলো বিয়েতে। কিন্তু তার মুখের হাসি আর নেই। ঠিক মতো খায় না, হাসে না, কথাও বলে না আমাদের কারো সাথে। আমি তো ওর ভালই চাই বলেন?
– হুম। তো আমি কি করতে পারি?
– আপনি সেদিন যে বললেন “আমার ছেলে সমপ্রেমী, তাকে যেন জোর করে বিয়ে না দেই” কথাটা শোনার পর থেকে মনটা খচ খচ করছে।
– হুম।
– মনে হচ্ছে আমার ছেলেটা কি আসলেই সমপ্রেমী? যদি হয়েও থাকে সেক্ষেত্রে আমার কি করা উচিত? আমি ওর সুখের জন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি আছি। যদি সে চায় একটা ছেলের সঙ্গে…
– এখন কি করতে চান?
– স্যার, সেটা জানার জন্যই তো আপনার কাছে আসা। আমার এখন কী করা উচিত?
– দেখেন আজগর সাহেব, আপনাকে আমি খুব অল্প সময় ধরে চিনি। মাত্র দুইবার দেখা হয়েছে। এই দুইবার সাক্ষাতেই মনে হয়েছে আপনি খুব ভালো একজন মানুষ। আপনার ছেলেকে আপনি অনেক বেশি ভালবাসেন। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার ছেলেও তার বাবা-মা’কে অনেক ভালবাসে। তাই নিজের শত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আপনাদের খুশির জন্য বিয়েতে মত দিয়েছে। আমি সত্যিই জানিনা আপনার ছেলে সমপ্রেমী কিনা। সেদিনের সেই কথার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে ছেলের সুখের দিকে তাকিয়ে এই বিয়েটা বন্ধ করে দেন। তাকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই কেন সে বিয়ে করবে না বা সে সমপ্রেমী কিনা। কিছু কিছু কথা বাবা-মা’কে কখনো জিজ্ঞেস করতে হয় না। বুঝে নিতে হয়। তার কাছে যেয়ে মাথায় হাত রেখে বলেন, “বাবা, তোর এখন বিয়ে করতে হবে না। যখন ইচ্ছা হয় করিস, আর ইচ্ছা না হলে করিস না। আমরা কখনো জোর করবো না” দেখবেন আপনার ছেলের মুখের হাসি ফিরে এসেছে।

আজগর সাহেবকে অনেকটা আশ্বস্ত মনে হলো। নিজের মনটাও অনেক ফুরফুরে লাগলো অনেকদিন পর। কারো মুখে হাসি ফোটানো আসলে খুব কঠিন কাজ নয়। দরকার শুধু একটু সাহস দেয়া, একটু ভালবেসে পাশে দাঁড়ানো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.