৪৮ ঘণ্টা

লেখকঃ Divuninun Kites

আমাদের দেখা হলো মিতুলদের আড্ডায়, প্রেম হলো, সেক্স হলো। হ্যাপিলী এভার আফটার। এটা সত্য না। সত্যটা হলো, আমাদের প্রথম দেখা মিতুলদের আড্ডায়। আমি সবসময়ই একটু চুপচাপ টাইপের মানুষ। তাই অতো একটা আড্ডা দেওয়া হয় না। তবে সেদিনের আড্ডায়ই প্রথম দেখি ওকে। ডায়রেক্ট প্রপোজ। আমি এক কোনায় চুপচাপ বসে ছিলাম। আমি সবসময় চুপচাপই বসে থাকি। কেউ কিছু বললে হু-হ্যাঁ করে চালিয়ে দেই। ও এসেই আমার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে প্রপোজ,

-তোমাকে আমার ভাল্লাগসে, আই লাভ ইউ
আমি নির্বিকার চেয়ে আছি। হার্ট বিট ফাস্ট হয়ে গেছে। এভাবে কেউ কোনোদিন প্রপোজ করে নি। কি করব বুঝতে পারছিলাম না।
তারপরের কথা, কিভাবে ও নাম্বার পেলো জানি না। একদিন হুট করে কল-
-মৃদুল বলছো!আমি ঈশান।
-কোন ঈশান?
-ঐদিনের আড্ডায় পরিচয় হয়েছিলো। চিনতে পারছো?
-ও আচ্ছা। কেমন আছো?
-আজকে বাসা খালি তুমি আসবে? সেক্স করব তোমার সাথে।
-আমি স্ট্যাচু হয়ে গেছি।

আমার ধারনাও ছিলোনা কেও এভাবে সেক্স অফার করতে পারে। আমার মাথা গরম হয়ে গেলো। ইচ্ছে মতো গালাগাল করে ফোন রেখে দিলাম।

মাথা ঠাণ্ডা হওয়ার পর ক্ষমা চাইতে আমিই ফোন দিলাম। সে দিব্বি ফোন ধরে বলল বলো! যেন সে জানতই আমি ফোন দিবো। আমার কি হলো জানি না, আমিই ঠিকানা নিয়ে ছেলেটার সাথে দেখা করতে গেলাম। কেনো যেন ছেলেটাকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো খুব। ও বলল বসুন্ধরা রেসিডেন্সিয়ালে আসতে। সেদিন দ্বিতীয় বারের মতো দেখলাম সাধাসিধে একটা ছেলে দারিয়ে আছে। চোখে দিব্যি চঞ্চলতা।
-অনেক্ষণ ধরে ওয়েট করছিলে না! সরি।
-হুম। চলো।
সে আমাকে সবুজ কাশফুল গুলোর মাঝে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-সুন্দর না!
আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। আমিই বিস্ময় ভেঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম,
-তুমি না বলেছিলে বাসায় নিয়ে যাবে।
-আরে ধুর! বাসায় কে যায়। কোন সুন্দর জিনিস একা দেখতে নেই, তোমাকে দেখাতে ইচ্ছে করল তাই নিয়েএলাম।
তার কথাইয় আমার একদম মনে হচ্ছিলনা এসব কোনো ফ্লাটি-লাইন। মনে হচ্ছিলো খুব সত্যি। তারপর ও আমাকে সামনেই একটা ঘাসের প্রান্তরে নিয়ে গেলো। বলল বসো। আমাকে বসতে বলে নিজে শুয়ে পড়ল। তারপর আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
-তুমিও চাইলে ট্রাই করতে পারো।
-শার্টে ময়লা লাগবে।
ও আমার কথা শুনে হো হো করে হেসে দিলো।—
-আমি ভদ্র ছেলে। কিছু করব না, ট্রাস্ট মি!

আমাদের দুজনের প্রিয় অভিনেত্রী রায়মা সেন। সখ, কানে হেড ফোন লাগিয়ে বই পড়া এইসব অইসব কিভাবে মিলে গেলো কে জানে? কিভাবে যেন আমরাও মিলে গেলাম। ওর সাথে কথা না বললে ঘুমই আসত না। খুব ভালো দিন কাটছে আমদের, ঝগড়া হচ্ছে, অনুনয় হচ্ছে, ভালোবাসা হচ্ছে। এখন আমি ওকেই ভালবেসে ফেলেছি। কিন্তু একটা ব্যাপার আমি জানতাম না কিন্তু মিতুলরা জানতো।একদিন আমি ওর সাথে ঘুরতে বেরিয়েছি, রিক্সায় আমরা। আমার সিগেরেট খাওয়ার বদ অভ্যাস আছে। আমি সিগেরেট আমি পকেট থেকে সিগারেট বের করতেই ও প্যাকেট ধরে ফেলে দিলো।
-নিজেকে অনেক কুল ভাবো না! কেন সিগারেট খাবা!! তুমি আমাকে ভালবাসতে ভালবাসতে শিখিয়েছ, তুমি কাওকে মরতে শিখাতে পারো না। তোমাকে দেখে আরও হাজার জন সিগেরেট খাবে। তাদের মধ্যে একজন মারা যাবে।
-ওকে বাবা খাব না।
আমি মনে মনে ভেবেই পাইনি একটা ছোট ব্যাপারে এতো ওভার রিয়েক্ট করার কি আছে।

কিছুদিন পরের কথা, রাত তখন ২ টা হবে। আমি ওর সাথে ফোনে কথা বলছি। ওর রাত বিরাতে কবিতা শোনানোর বদ অভ্যাস আছে।
-একটা কবিতা শুনবে?
-হুম শুনছি।
– “তুমি কি জানো আমি তোমাকে ঠিক কতটা ভালোবাসি?
তোমার জন্য সক্রেটসের নীল হেমলক চুমুক, প্রখর রৌদ্র জ্বালা রাতে জোনাকির বাঁশি। শুনতে পাও তুমি? শরীরে ঝি ঝি ধরে থাকা নার্ভের মতো…
অন্ধকারের কৌটা গুনে রাখা বুক সেলফের মতন, মৃত্যুর পরের পরের দিনের জন্যও,
রয়ে যাবো আমি, অন্ধকার তেপান্তর”

হুট করে ওর কথা বন্ধ হয়ে গেলো!!
হ্যালো !হ্যালো!!ওপাশ থেকে আওয়াজ শুনছি ঠিকই কিন্তু ও কথা বলছে না। আমি লাইন কেটে আবার কল দিলাম। রিং হচ্ছে কেউ ধরছে না। এভাবে ১২ বার কল রিং হওয়ার পর আমি ওর বাসায় চলে গেলাম। ওর বাসা আমার বাসা থেকে দূরত্ব ১০ মিনিটের। এতো রাতে আমি রিকশা পাচ্ছিলাম না। আমি যখন ওর বাসার সামনে তখন ওকে এ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছে। ওর কোনো ভাইবোন নেই। ও একাই থাকে। আমি আঙ্কেলের কাছে ছুটে গেলাম কি হয়েছে জানার জন্য! আঙ্কেলে আমাকে বলল, তুমি ওর বন্ধু তোমার জানা নেই! ওর ব্রেন ক্যান্সার। আমি কি বলব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। মূর্তির মতো দাড়িয়ে আছি। হাসপাতালে যখন পউছলাম। ডাক্তার নির্বিকার-
ওর লাস্ট স্কেনে ধরা পরেছে ৭৫ ভাগ ছড়িয়ে পরেছে ক্যান্সার। ব্রেন হেমারেজ হয়ে গেছে। এখন কমায় আছে, কি হবে বলা মুশকিল। আপনাকে ৪৮ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। তারপর বলা যাবে কি হয়।
ঘড়ি কাঁটা যখন ভোর পাঁচটার ঘরে তখন ঈশানের জ্ঞান ফিরে। আমি তখনো তার পাশে বসা। চোখ খুলে আমাকে বলে,
-কবিতার বাকিটা শুনাবে না?
চোখে আমার আকুতি। দু চোখ গড়িয়ে জল পরছে। মিশে যাচ্ছে রাত্রির অন্ধকারে। ওপাশে হাসপাতালের সস্তা বিছানায় শুয়ে তাকিয়ে আছে ও আমার দিকে। মুখ হাসি হাসি চোখে সেই চঞ্চলতা।
আমি আবৃতি করে যাচ্ছি ওর কবিতার পরের অংশ_
“অন্ধকার তেপান্তর- রাত্রি হয় ভোঁর
শহরের শেষ ট্রাম লাইটটিও নিভে যায় তারপর
শুকনো পাতা মুড়িয়ে, ঢেকে যায় কুয়াশার চাদর।।
ভালোবাসায় জিবনের এতো দেরি হলো কেন তারপর”
শেষ লাইনগুলো ও আমারসাথে ধিরে ধিরে বলে গেলো।আমাদের গল্প এখানেই শেষ না। আমরা তারপরেও আরও একটি শরৎ একসাথে কাটিয়েছি। একসাথে সবুজ কাশফুলের মাঝ দিয়ে দৌড়িয়েছি। তবে আমি আমার জীবনের সেই ৪৮ ঘণ্টায় আটকে আছি। কি হবে বলা মুশকিল! আমাকে সারাজীবন বাকী ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।
এই ৪৮ ঘণ্টা কখনো শেষ হবে না আমার জীবনে।
শুধু জানি ও বেঁচে আছে আমার কাছে, আমার সাথে।

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.