কনট্রাস্ট প্রিন্সিপ্যাল: মানুষকে ইনফ্লুয়েন্স করার কৌশল

লেখকঃ অন্যস্বর

মানুষ সব কিছুর মান বিচার করে তুলনীয় অন্য বস্তুর সাপেক্ষে। যেমন পুঁজিবাদ অপেক্ষাকৃত ভাল, সাম্যবাদের তুলনায়। “আগে কি সুন্দর দিক কাটাইতাম” অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় অতীত ভালো। দেবী ছবিটা ততটা ভাল না- উপন্যাসটার তুলনায় ইত্যাদি।

কনট্রাস্ট প্রিন্সিপ্যাল হলো এমন একটা ধারণা বা বলা ভাল কৌশল যা দুইটা তুল্য বস্তু বিচার করার মানুষের যে সহজাত ক্ষমতা সেইটাকে প্রভাবিত করে। এই ধারণা অনুযায়ী দুইটা তুলনীয় বিষয়ের মধ্যে যদি পার্থক্য অনেক বেশি হয় তাহলে, এই দুইটা বিষয় একসাথে মানুষের সামনে প্রেজেন্ট করলে সে তুলনীয় দ্বিতীয় বিষয়ের পার্থক্য, প্রথম বস্তুর সাপেক্ষে অতিরঞ্জির করবে।

উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা সহজে বোঝা যাবে। ধরুন আপনি প্রথমে হাল্কা জিনিস যেমন হুমায়ুন আহমেদের একটা বই হাত দিয়ে তুললেন,তারপর যদি পাঁচ কেজি ওজনের ডাম্বেল তুলেন তাহলে ডাম্বেলটা তার একচুয়াল ওজনের তুলনায় বেশ ভারী মনে হবে। অন্য সময়ে শুধুমাত্র ঐ ডাম্বেলটি তুললে কনট্রাস্ট প্রিন্সিপ্যাল কাজ করবে না, অর্থাৎ ডাম্বেলটি তার প্রকৃত ওজনের অতিরিক্ত ভারী মনে হবে না।

আমি একবার বিয়েবাড়িতে মিষ্টি খাওয়ার পরে চা খেয়েছিলাম।সবার চায়ে চিনি ‘ঠিকঠাক’ মনে হলেও আমার চা পানসে লাগছিল কারণ মিষ্টি খাওয়ার ফলে জিহ্বায় চিনির মৃদু মিষ্টি স্বাদের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গেছিল। এটাও কনট্রাস্ট প্রিন্সিপ্যালের প্রভাব।

আরেকটা মজার উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক।
তিন বালতি পানি নিন, একটাতে ঠান্ডা পানি,আরেকটাতে গরম এবং অন্যটাতে রুম টেম্পারেচারে। এবার এক হাত ঠান্ডা পানিতে এবং অন্য হাত গরম পানিতে ডুবান।অল্প কিছুক্ষণ পর দুই হাত তুলে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে ডুবালে দেখবেন যে হাত ঠান্ডা পানিতে ডুবানো ছিল তা গরম অনুভব করছে এবং অন্য হাত ঠান্ডা অনুভব করছে। অর্থাৎ একই তাপমাত্রার পানিতে শুধুমাত্র পূর্বোক্ত ভিন্ন অভিজ্ঞতার কারণে আপনার হাত ঠান্ডা এবং গরম অনুভব করছে।

মানুষের অনুভূতিকে ম্যানিপুলেট করবার এই যে কৌশল এইটাকে ব্যবহার করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ক্রেতাদের এক্সপ্লোয়েট করে।

Influence: The Psychology of Persuasion বইতে লেখক রবার্ট বি সিলদিনি ফিল নামে একজন রিয়েল এস্টেট সেলসম্যানের উল্লেখ করেছেন যিনি গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমারদের প্রথমে কতগুলো বাজে বাড়ি দেখান।এই বাড়িগুলো বিক্রির উদ্দেশ্যে দেখানো হয় না, এগুলোকে বলা হয় ‘সেটআপ প্রোপার্টি’। লেখক জানাচ্ছেন সস্তা মানের বাড়িগুলো দেখানোর ফলে কাস্টমাররা হতাশ হলে, পরে ফিল মোটামুটি ভাল মানের বাড়িগুলো দেখায়। এতে করে বিক্রির সম্ভাবনা বাড়ে কারণ আগের বাজে বাড়িগুলোর তুলনায় পরের বাড়িগুলো কাস্টমারের কাছে অত্যন্ত উঁচু মানের বলে বোধ হয়।

ধরুন আপনি নিউ মার্কেটে গেলেন কাপড় কিনতে। আপনি জিন্স প্যান্ট এবং টি শার্ট কিনবেন, সেক্ষেত্রে দোকানদার আপনাকে কোন আইটেম প্রথমে দেখাবে?
অবশ্যই প্রথমে প্যান্ট দেখাবে,কারণ সাধারণত প্যান্টের দাম টি শার্টের থেকে বেশি। ধরা যাক দরদাম করে আপনি ৮০০ টাকায় প্যান্ট কিনবেন বলে ঠিক হলো, এখন দোকানদার যদি আপনাকে এক্সপেনসিভ মুল্যের ৬০০ টাকার টিশার্ট দেখায় তাহলে এই দাম আপনার প্যান্টের তুলনায় অতিরিক্ত মনে হবে না।

মোবাইল ফোন বিক্রেতারাও কনট্রাস্ট প্রিন্সিপ্যাল তাদের কাস্টমারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। ফোন বিক্রির পরে বিক্রেতারা আলাদা ভাবে ইয়ারফোন, ফোন কভার, গরিলা গ্লাস ইত্যাদি বিক্রির চেষ্টা করে। কৌশলটা এই – ১৫ হাজার দামে স্মার্টফোন কেনার পরে ৫০০ টাকার ইয়ারফোন, ২০০ টাকার ফোন কভার ইত্যাদি খুব স্বল্প মূল্যের মনে হয়।ফলে এইসব অতিরিক্ত পণ্যাদি কিনতে কাস্টমারেরা প্রলুব্ধ হয়।

Stumbling on Happyness বইতে সাইকোলজিস্ট ড্যানিয়েল গিলবার্ট কনট্রাস্ট প্রিন্সিপ্যালের সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন।

ধরুণ আপনি বন্ধুর বাড়িতে ডিনারের দাওয়াতে যাবেন,পশ্চিমা এটিকেট অনুযায়ী আপনার বন্ধু আশা করে আপনি মদের বোতল নিয়ে যাবেন। এইটা পশ্চিমে কমন সিনারিও। তাই মদের দোকানীরা চড়া দামে মদ বিক্রির জন্য ট্রিকের আশ্রয় নেয়।তারা সস্তা, মাঝারি দামের পাশাপাশি খুব দামী মদ পাশাপাশি রাখে। আপনি দোকানে গিয়ে দেখলেন পাঁচ ধরনের মূল্যের ওয়াইন দোকানে আছে। ধরুন সেগুলোর দাম যথাক্রমে ১০৳, ৩০৳, ৫০৳, ৮০৳ এবং ১০০৳।আপনি কোন দামের ওয়াইন কিনবেন? নিশ্চই সস্তারটা কিনবেন না, মাঝারি দামেরটাও বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে যেতে আপনার লজ্জা লাগবে। চড়া মূল্যেরটা না কিনলেও চলে, ফলে আপনি ৮০ টাকা দামের ওয়াইন কিনবেন বলে ঠিক করলেন। কিন্তু এইটা আপনি নিজে ঠিক করলেন না,দোকানদার আপনাকে কৌশলে করালো।

১০০ টাকার ওয়াইন, ওই দোকানের ‘সেটআপ’ প্রোপার্টি,অত দামে ওয়াইন সাধারণত কেউ কেনে না। তারপরেও দোকানদার দামী ওয়াইনটি রাখে কারণ এটার উপস্থিতি ৮০ টাকার ওয়াইন কিনতে ক্রেতার উপরে চাপ সৃষ্টি করে। যদি ১০০ টাকার ওয়াইন দোকানের সাজানো না থাকতো তাহলে আরো অনেকের মতো আপনিও হয়তো ৫০ টাকার ওয়াইন কিনে নিয়ে যেতেন কারণ সেক্ষেত্রে তা হতো মাঝারি মানের (৩০৳) চেয়ে দামী ওয়াইন।

এবার, প্রতিকূল পরিস্থিতি কিভাবে মোকাবিলা করা যায় কনট্রাস্ট প্রিন্সিপ্যালের সাহায্যে, তার একটা নমুনা দেখবো নিচের চিঠিতে এবং এই দিয়েই লেখাটা শেষ করবো

চিঠিটা জনৈক কলেজ ছাত্রী তার বাবা-মাকে লিখেছে।

প্রিয় বাবা ও মা,

কলেজে ভর্তি হয়ে বাড়ি ছাড়ার পরে তোমাদের সময়মত লিখতে পারি নি বলে সরি। কথা দিচ্ছি এখন থেকে নিয়মিয় লিখবো। এই চিঠিটা পড়ার আগে তোমরা বসো, প্লিজ; কিছু জরুরী কথা আছে।

আমি বর্তমানে সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছি প্রায়।মাথায় খুলির আঘাত পুরোটা সেরেছে,চোখে এখন ঠিকঠাক দেখি,শুধু মাঝেমধ্যে একটু মাথা ব্যথা করে,এই যা। মাথা ফাটল কিভাবে? এখানে আসার পরপরই রুমের জানালা দিয়ে লাফ দিয়েছিলাম- ডর্মিটরিতে আগুন লাগলে। সৌভাগ্যবশত রাস্তা থেকে একজন আমাকে লাফ দিতে দেখে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে এবং এম্বুলেন্স ডাকে। হাসপাতালে সে আমাকে নিয়মিত খোঁজ নিত। এমনকি বিশ্বাস করবে না আমার থাকার জায়গা ছিল না বলে সে আমাকে তার এপার্টমেন্ট শেয়ার করতে বলে। যদিও রুমটা বেসমেন্টে,তারপরেও অনেক সুন্দর!

ছেলেটা খুব ভালো- ফলে ক্রমে আমি তার প্রেমে পড়ে যাই এবং আমরা বিয়ে করার ডিসিশন নেই। আমরা খুব শীঘ্রই বিয়েটা সেরে ফেলতে চাচ্ছি কারণ আমি প্রেগনেন্ট।

হ্যাঁ, আমি প্রেগনেন্ট। আমি জানি এটা শুনে তোমরা অনেক খুশী হয়েছো, আমি এও জানি আমাকে যেমন ভালবাসতে, আমার সন্তানকেও তেমন করে তোমরা স্নেহ করবে। কিন্তু একটা ছোট্ট সমস্যা দেখা দিয়েছে- তোমাদের জামাইর সংক্রামক যৌনরোগ আছে এবং যেমনটা তোমরা আশঙ্কা করছো তা আমার শরীরেও ছড়িয়েছে। ফলে বিয়ে প্রেগনেন্সি ইত্যাদি নিয়ে আমি একটু ঝামেলায় আছি।

এখন, যা বলি শোন- আমার মাথা ফাটে নাই, ডর্মিটরিতে আগুন লাগে নাই, বিয়ে করছি না, আমি প্রেগনেন্টও নই, যৌন রোগ টোগ কিছু হয় নাই, এমনকি আমার বয়ফ্রেন্ডও নাই। যেটা হয়েছে, আমি হিস্ট্রিতে B পেয়েছি এবং লিটারেচারে F. বাকি নাম্বারগুলো মার্কশিটে দেখে নিও।

তোমাদের

ক্যামেলিয়া

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.