এস এম এস

লেখকঃ আনন্দ ধারা

(একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
উৎসর্গঃ আমার ময়নাপাখিটাকে

১।
সন্ধ্যা ৭ টা, তুহিনের ফোন বেজে ওঠে। রিফাতের কল।
– হ্যালো রিফাত? বল।
– আমি রিফাতের আম্মু
– আসসালামু আলাইকুম আন্টি
– দেখো তুহিন আমি চাই না তুমি আর আমার ছেলের সাথে মেশো।
– কেন আন্টি? কি হয়েছে।
– আমি চাই না রিফাতও তোমার মত হয়ে যাক। ও আমার একমাত্র ছেলে, ওর একটা ভবিষ্যত আছে।
– আন্টি আমি বুঝতে পারছি না কি হয়েছে, আপনি এসব কেন বলছেন? আমি কি অন্যায় কিছু করেছি?
– দেখো তুহিন, আমরা সব জানি। আমাদের মোবাইলে এস এম এস এসেছে তোমার ব্যাপারে। তুমি ছেলেদের সাথে … ছিঃ কুয়েতে তো তোমাকে ভালো ছেলেই ভাবতাম! ভালো পরিবারের ছেলে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এসব! ছিঃ তুমি আর কখনো আমাদের বাসায় আসবে না। রিফাতের সাথেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না।
– জ্বি আন্টি।

ফোনটা রেখেই ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো তুহিন। দর দর করে ঘেমে যাচ্ছে সে
এই শীতের সন্ধ্যায়। কী হলো এটা? মাথা কাজ করছে না। শহীদের সাথে কথা বলা
দরকার।

শহীদের পরামর্শে রাত ১১টার দিকে রিফাতকে ফোন দেয় তুহিন,
– দোস্ত, কি হইছে?
– তোর নামে আজে বাজে কথা লেখা এস এম এস আসছে আব্বু আম্মুর মোবাইলে।
– কি লেখা?
– লেখা তোর চরিত্র ভালো না। ছেলেদের সাথে উলটা পালটা কাজ করে বেড়াস। মানুষের বাসায় গিয়ে এটা ওটা সরাস।
– তোকে কিছু বলছে দোস্ত?
– বলছে তোর সাথে আর না মিশতে। তুই যেন আর বাসায় না আসিস।
– দোস্ত, আমি তো তোর বাসায় তিন-চারদিন রাতে থেকেছি, তাও তোর জোরাজুরিতেই। তোর বাসা থেকে কি তখন কিছু চুরি গেছে?
– না, কিন্তু…
– কিন্তু কি?
– কিন্তু, আম্মু হয়তো তোর আর আমার ব্যাপারটা ধরতে পারছে।
– কিভাবে?
– আমি সকাল সকাল গোসল করি না। কিন্তু তুই যতবারই এসেছিস সকালে আমরা দুজনই গোসল করে ঘর থেকে বেরিয়েছি। আর তুই তো জানিস, আমি কাপড় ধুতে পারি না। আম্মুই ধোয়। ওয়াশরুমে রাখা কাপড় থেকেও কিছু সন্দেহ করতে পারে। আর এস এম এস গুলো আসার পর তার ধারনা হয়তো আরো পোক্ত হইছে।
– (দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে) এখন বল তুই কি চাস?
– দোস্ত, আমরা আর না দেখা করি। আম্মু খুব রাগ করছে।
– ঠিক আছে। (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) তোর যা ইচ্ছা। আমি চাই না আমার কারনে তোর বাসায় কোন সমস্যা হোক।

২।
– কে এই এস এম এস দিতে পারে?
– তুই কত গে পার্টিতে যাস, দেখ এদের মধ্যে কে না কে শত্রুতা করে এসব করছে।
– না না মামা। ওরা ক্ষতি করলে আমার করবে। রিফাতের বাবা-মা’কে এস এম এস দিয়ে এসব জানাবে কেন? রিফাতের বাবা-মা জানলে ওদের কি লাভ?
– লাভ তো আছেই। তোর থেকে রিফাতকে দূরে সরিয়ে দেয়া। তুই তো আবার রিফাতকে খুব পছন্দ করিস।
– কিন্তু আমি যে রিফাতকে পছন্দ করি, সেটা তো রিফাতই জানে না। অন্যরা কিভাবে জানবে?
– কি জানি? থাক বাদ দে, যা হবার হইছে। চল গুলশানের দিকে যাই। আজকে বাইরে ডিনার করবো।

শহীদ তুহিনের মন ভালো করার জন্য তাকে ভালো একটা রেস্টুরেন্ট-এ নিয়ে যায়। তুহিনকে সে খুব ভালবাসে। তাদের সম্পর্ক প্রায় পাঁচ মাস। শহীদ বয়সে আট বছরের বড় হওয়ায় তুহিন তাকে মামা ডাকে। তাদের সম্পর্কটাকে সমাজের চোখে বৈধতার স্বীকৃতি দেয়ার জন্য তুহিনের মা’কে বোন বানিয়েছে শহীদ।

শহীদের সাথে তুহিনের পরিচয়টা অন্যরকমভাবে। একদিন বিকেলে পার্কে হাঁটছিল তুহিন। কুয়েত থেকে ফিরেছে মাত্র কয়দিন হয় তখন। হঠাত দেখে দুজন মাঝ বয়সী লোক পার্কের এক কোনায়। তাদের মধ্যে একজনের হাত-পা নাচানো দেখে তুহিনের বুঝতে বাকি থাকে না এরা কারা। আরো শিওর হওয়ার জন্য বারবার তাদের আসে পাশে হাঁটতে থাকে, আর কান খাড়া করে শোনে ওদের কথা। কম বয়সী একটা ছেলেকে বারবার নিজেদের সামনে আসতে দেখে লোক দুটোর মনেও কৌতুহল জাগে। রতনে চিনে ফেলে রতনকে। মেয়েলি ধাঁচে কথা বলা লোকটা কথা বলতে বলতে বুঝিয়ে দেয় তুহিনকে তাদের আসল পরিচয়।

সেদিনের মত চলে আসে তুহিন। মনে মনে তো খুব খুশি। কুয়েতে তেমন কিছু হতো না কারো সাথে। দেশে এসেও অনেকদিন কিছু হয় না। বাসার কাছে যদি এদের কাউকে পাওয়া যায়, মন্দ কি?

পরদিন আবারো পার্কে যায় সে বিকেলে। দেখে লোক দুটোও আছে, ঠিক আগের যায়গায়। এবার নিজের পরিচয় দেবার পালা। মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে যায় তুহিনের। ফোনে কথা বলার ভান করে সামনে দিয়ে হেটে যায় লোকদুটোর। বলতে থাকে, “টপ না বটম, টপ না বটম? আচ্ছা, ঠিক আছে। আসতেছি”। বলেই হেটে চলে যায়। লোকদুটোরও বুঝতে বাকি থাকে না।

পরদিন বিকেলে আবার যায় পার্কে, আবারো দেখা। এবার মেয়েলি ধাঁচের লোকটা ডাক দেয় তুহিনকে। কথা শুরু। মেয়েলি ধাঁচে কথা বলা লোকটা আরিফ, আর আরেকজনের নাম শহীদ।

প্রথম দিন দেখেই শহীদের ভালো লেগে যায় তুহিনকে। সুকৌশলে আরিফের থেকে সরিয়ে রাখে সে তুহিনকে। বেশ কিছুদিন একসাথে ঘোরাফেরা, খাওয়া-দাওয়া। তারপর একদিন সুযোগ বুঝে তুহিনকে বলে ফেলে সে, “ভালবাসি” তুহিনের শহীদকে খুব একটা ভালো লাগতো না। তারপরেও দেশে একটা পরিচিত লোক থাকলে ভালো গাইডেন্স পাওয়া যাবে। নতুন নতুন ছেলেদের সাথে পরিচিত হওয়া যাবে। আর কাউকে মুখের উপর না করে দেয়াটাও অশোভন। চলুক না, যে ক’দিন চলে। এই ভেবে রিলেশন নামক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে সে বয়সে আট বছরের বড়, বিবাহিত, এক সন্তানের জনক শহীদের সাথে।

৩।
সম্পর্কটা আরো মাস তিনেক চলার পর তুহিন বুঝতে পারে শহীদের সাথে থাকাটা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। দৈহিক, মানসিক কোন দিক থেকেই সে শহীদের কাছে প্রশান্তি পায় না। প্রায়ই এটা নিয়ে ঝগড়া ঝাটি হয় তাদের মাঝে। সম্পর্কটার ইতি টানতে চায় তুহিন, কিন্তু শহীদ একরোখা। যত যাই হোক, সম্পর্ক চালিয়ে যাবেই।

হঠাত একদিন রিশাদ ফোন দেয় তুহিনকে। তার কাছে কিছু এস এম এস এসেছে তুহিনের নামে। তুহিন চোর, কুয়েতে থাকতে ছেলেদের সাথে সেক্স করে বেড়িয়েছে। এখন দেশে এসেও এসব করে বেড়াচ্ছে। এরপর এক এক করে আইমান, রুম্মান, আসিফ, কুয়েতের সব বন্ধুরা ফোন দিতে থাকে তুহিনকে। কি হচ্ছে এসব? কারা পাঠায় এসব এস এম এস? তুহিনের কাছে কোন উত্তর নেই।

প্রচন্ড ভেঙ্গে পড়েছে তুহিন। শহীদকে ফোন দেয় সে। দেখা করতে চায়। শহীদ ছাড়া আর কে বুঝবে এখন তাকে?
– আবারো এস এম এস এসেছে, এবার আমার কুয়েতের সব বন্ধুদের কাছে। আমি কি করবো মামা? (বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে তুহিন)
– কি বলিস? আচ্ছা কে করতে পারে এমন বল তো?
– আমি কিচ্ছু জানি না। তুমি কিছু একটা করো, বলেই কাঁদতে কাঁদতে শহীদকে জড়িয়ে ধরে তুহিন। শহীদই তার শেষ আশ্রয়স্থল।

৪।
পেরিয়ে যায় আরো কয়েকটা মাস। এর মধ্যে বাংলাদেশের অন্য সব বন্ধুদের কাছেও এস এম এস যাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো সব এস এম এস এর বিষয়বস্তু প্রায় একই থাকে, তুহিন চোর এবং সমকামী। আরো মজার বিষয় হলো কার কাছে কি এস এম এস গেলো তার একটা কপি তুহিনের কাছেও আসে। হাজার বার ফোন দিয়েও ওই নাম্বারে কাউকে পাওয়া যায় না। ফোন বন্ধ থাকে। মাঝে মাঝে নাকি তার বন্ধুদের কাছে ফোন আসে ওই নাম্বার থেকে, কিন্তু কোন কথা বলে না।

এভাবে এস এম এস পেতে পেতে তার বন্ধুরা ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না। এক এক করে কুয়েতের, বাংলাদেশের, সব বন্ধু হারিয়ে ফেলে তুহিন। এর মাঝে শহীদের সাথে নানা টানা-পোড়েনও চলছে। কুয়েতে থেকে দেশে এসে ডিপ্লোমা কোর্স করার পর হন্যে হয়ে একটা চাকরি খুজতে থাকে তুহিন। বাবার উপর বোঝা হয়ে থাকা আর নয়। কলেজের বান্ধবী শিলার কল্যানে খুব ভালো একটা জায়গায় চাকরি হয়ে যায় তুহিনের। বস আমিনুল সাহেব শিলার পরিচিত। খুব ভালো মানুষ। তুহিনকে নিজের ছেলের মত আদর করেন।

চাকরি হওয়ায় দারুন খুশি তুহিন। শহীদকে ডিনার করায় ভালো একটা রেস্টুরেন্ট-এ। ডিনার করতে করতে বলে,
– আমি খুব খুশি। এমন একটা জবই আমি চাচ্ছিলাম।
– আমিও খুব খুশি তোর জন্য।
– কর্পোপোরেট জব, আহা! কত ফিটফাট ছেলেদের সাথে উথা-বসা করবো! ভাবতেই ভালো লাগছে!

শহীদের চেহারার রঙ বদলে যায়। তুহিন বুঝতে পারে, কাজ হয়েছে। শহীদকে রাগিয়ে দিতে খুব ভালো লাগে তার। পরে অবশ্য গান শুনিয়ে রাগ ভাঙ্গাতে আরো বেশি ভালো লাগে।

বাসায় ফেরার পথে শহীদকে বলে,
– দেখো, তুমি তো জানো আমি এসব তোমাকে রাগানোর জন্য বলি। আমি যতই কর্পোরেট লেভেলে মিশি না কেন, আমি তোমারই থাকবো। আমার সব বিপদে আমি তোমাকেই পাশে পেয়েছি। দেশে ফেরার পর থেকে তুমিই তো ছায়ার মত আমার পাশে ছিলে। আমার নিজের মামাও হয়তো আমার জন্য এত কিছু করতো না। তাই যতই ঝগড়া করি না কেন, তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। প্লিজ রাগ করো না!
– না,না! রাগ করিনি। আমি জানি তুই আমাকে ছেড়ে যেতে পারবি না।
– হুম। আচ্ছা শোনো, কাল থেকে কাজের চাপ বাড়বে। বাসায় ফিরতে রাত আটটা বেজে যেতে পারে। সপ্তাহ দুয়েক এরকম একটু চাপ থাকবে কাজের। আমি কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায় বের হতে পারবো না অফিস থেকে এসে। খুব টায়ার্ড থাকবো। তুমি কিছু মনে করো না প্লিজ
– না, ঠিক আছে। উইকেন্ডে তো দেখা হবেই।

৫।
মাস খানেক খুব সুন্দরভাবে চাকরি করতে থাকে তুহিন। হঠাত একদিন আমিনুল স্যার তুহিনকে রুমে ডেকে বলেন,
– দেখো বাবা, আমার একটা সুনাম আছে। আমার এতদিনের অর্জিত সুনাম আমি তোমার জন্য বিসর্জন দিতে পারি না।
– আমি কিছু বুঝতে পারছি না স্যার! কি হয়েছে?
– আমি নাকি টাকা খেয়ে তোমাকে চাকরি দিয়েছি? তোমার সাথে নাকি আমার অবৈধ সম্পর্ক আছে, এসব কি এস এম এস আসে আমার কাছে তুহিন?
– স্যার, বিশ্বাস করেন, আমি কিচ্ছু জানি না এসবের। অনেকদিন থেকেই এ ধরনের এস এম এস আসছে আমার পরিচিতদের মোবাইলে। কে বা কারা আমার নাম্বার হ্যাক করে এই কাজটা করছে।
– দেখো তুহিন, আমি এসব ঝামেলার মধ্যে জড়াতে চাই না। তোমাকে চাকরিতে রাখলে আমার নামে ঘুষ নিয়ে চাকরি দেয়ার অপবাদ দিয়ে পেপারে লেখালেখি করার হুমকি দেয়া হচ্ছে। ভালো হয় তুমি তোমার ঝামেলা মিটিয়ে আসো। তখন যদি আমাদের কোন পোস্ট খালি থাকে আমরা ভেবে দেখবো।

চাকরি হারিয়ে উদ্ভ্রান্তের মত হয়ে পড়ে তুহিন। বাসায় বললে বাবার কটুক্তি শোনা ছাড়া উপায় থাকবে না। হত বিহবল হয়ে শহীদকে ফোন দেয় সে।
– আমিনুল স্যারের কাছেও এস এম এস এসেছে। চাকরিটা চলে গেলো। (বলতে বলতে দু’চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে তুহিনের)
– ভয় পাস না। আমি তো আছি। চল বাইরে কোথাও থেকে ঘরে আসি।
– না, যাবো না। আগে এর একটা ব্যবস্থা করতে হবে এবার। এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না।
– কি করতে চাস?
– কি করবো তুমি বলো!
– আচ্ছা দেখি। র‍্যাবে আমার এক পরিচিত লোক আছে। দেখি তাকে দিয়ে কিছু করতে পারি কিনা।
– আমিও যাবো।
– না না, তোকে নেয়া যাবে না। ওর সাথে আমার অন্যরকম একটা সম্পর্ক ছিল এক সময়। লোকটা সবার সাথে দেখা করতে চায় না।

৬।
র‍্যাবে ফোন দেয়ার পর কিছুদিন এস এম এস আসা বন্ধ হলো। এদিকে পরম আরাধ্য চাকরিটা হারিয়ে তুহিন দিগ্বিদিক শুন্য। শহীদের সাথেও খিটিমিটি লেগেই থাকে সবসময়। কিছুটা মুক্তি পাবার আশায় জুয়েল ভাইকে ফোন দেয় তুহিন। তাকে সব কিছু খুলে বলে। জুয়েল ভাই তুহিনের আপন ভাইয়ের মত, মত বললে ভুল হবে। আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশি কিছু।

জুয়েল ভাই দেখা করতে বলেন। শহীদকে নেয়ার ইচ্ছা না থাকলেও শহীদের জোরাজুরিতে তাকে নিয়েই জুয়েল ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যায় তুহিন।
– জুয়েল ভাই আমি এখন কী করবো? আমার সব এক এক করে শেষ হয়ে গেল। এখন বাকি আছে শুধু বাবা-মা। তাদের কাছেও যদি এইসব এস এম এস আসা শুরু করে, মরে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোন পথ থাকবে না।
– তোর বাবা-মা’র কাছেও যাবে।
– মানে?
– হ্যাঁ। তুই দেখিস! বাবা-মা হচ্ছে ট্র্যাম্প কার্ড, সব শেষে বাবা-মাকে এস এম এস পাঠাবে দেখিস।
– কিন্তু আমার কথা হচ্ছে কে করতে পারে এই কাজ? কার কাছে আমার সব নাম্বার এক এক করে চলে যাচ্ছে?
– সেটা তো আমি জানি না। তোকেই খুজে বের করতে হবে।

জুয়েল ভাইয়ের সাথে দেখা করে ভয়টা আরো বেড়ে গেল। কিন্তু কে সে? কেনই বা এমন করছে তার সাথে? তুহিন হাজার ভেবেও কোন কুল কিনারা পায় না।

৭।
কথায় আছে -যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যে হয়। ক’দিন পরই বাসায় এস এম এস আসা শুরু করলো। তুহিন ভয়ে চুপসে গেছে, কি হবে এখন? বাবা কি বাসা থেকে বের করে দেবেন?

যাচ্ছেতাই বলে গালাগাল করলেন বাবা। মা ওই সময় বাবাকে জোর করে ঘরে নিয়ে না গেলে হয়তো বাবা বেরই করে দিত তাকে বাসা থেকে। কিন্তু বাবার কঠিন কঠিন সব কথার মধ্যে একটা কথা ধক্‌ করে বুকে এসে লাগলো তুহিনের। “তুই কার কাছে ঘরের এত সব কথা বলে বেড়াস? আমি তোদের সাথে কিরকম আচরণ করি না করি, বাইরের লোক জানলো কিভাবে? কিভাবে সেইসব কথা এস এম এস-এ লিখে মানুষজন?”

আসলেই তো! তুহিন ভেবেছিল সবার কাছে যেসব এস এম এস আসে, বাবার কাছেও সেগুলোই এসেছে। কিন্তু এখন দেখে যাচ্ছে, বাবা যেসব এস এম এস এর কথা বলছেন, সেসব কথা শুধু একজনেরই জানার কথা।

৮।
শহীদকে ফোন দিল তুহিন। দেখা করবে। দুজন পার্কে গিয়ে বসে। সেই পার্কে যেখানে তাদের প্রথম পরিচয় হয়।
– আমি বুঝতে পেরেছি কে এই এস এম এস গুলো পাঠায়।
– কে? কে পাঠায়?
– তুই। (রেগে গেলে শহীদকে তুই করে বলে তুহিন)
– আমি???
– হ্যাঁ, তুই। আমার কাছে প্রমাণ আছে।
– এটা তুই বলতে পারলি তুহিন? আমি তোর এই সমস্যা সমাধান করতে র‍্যাব-এ পর্যন্ত ফোন দিলাম! আর তুই?
– তুই র‍্যাব-এ ফোন দিস নি। দ্যাখ আমার কাছে সব প্রমাণ আছে। আমি রিফাতকে পছন্দ করতাম সেটা তুই জানতি। তাই রিফাতকে আমার জীবন থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য তুই প্রথম রিফাতের বাসায় ফোন করিস। এরপর যখন দেখলি কাজ হয়েছে, রিফাত আমার থেকে দূরে সরে গেছে, তখন তুই এক এক করে আমার কুয়েতের সব বন্ধুকে দূরে সরিয়ে দিলি। এরপর আমার কলেজের বন্ধুদেরও। শুধু এই কারনে, যেন আমি পুরোপুরি তোর উপরেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। আমার যেন কোন বন্ধু না থাকে। এরপর তুই আমিনুল স্যারকেও এস এম এস দিলি। আচ্ছা, তুই না বলে আমাকে ভালবাসিস? আমার চাকরি পাওয়াতে খুব খুশি হয়েছিলি? তাহলে কিভাবে পারলি এটা করতে? আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পরে খুব চিন্তা করে বের করলাম, তুই এটা করেছিস কারন ওই চাকরিটা করার কারনে আমি তোকে বেশি সময় দিতে পারতাম না। আর তাছাড়া তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না। ভেবেছিলি আমি ওই চাকরিটা করলে ভাল ভাল ছেলেদের সাথে মিশবো আর তোকে ছেড়ে দেবো। আচ্ছা তাও না হয় করলি, মানলাম। আমার প্রতি অন্ধ ভালবাসা থেকেই না হয় করলি। কিন্তু আমার বাসায় এস এম এস পাঠানোর আগে একবারও তোর বুক কাঁপল না? তুই না আমার মা’কে বোন ডাকতি? আমার ছোট বোনটা বছরের বেশিরভাগ সময়ই অসুস্থ থাকে। তাকে নিয়ে মায়ের টেনশনের শেষ নেই। নিজেও অসুস্থ। তাছাড়া আমার বাবা কেমন রগচটা মানুষ সেটাও তুই জানিস। কিভাবে পারলি তুই এটা? (বলতে বলতে রাগে – ক্ষোভে তুহিনের চোখে পানি চলে আসে)
– আমি এসব কিছুই করিনি তুহিন। যে আমি তোর জন্য এত কিছু করলাম, আফসোস, সেই তুই আমাকে অবিশ্বাস করলি!
– ন্যাকা সাজবি না, আমার কাছে প্রমান আছে দেখেই বলছি।
– কি প্রমান আছে তোর কাছে? আর আমি এতজনের নাম্বার কোথায় পাবো?
– আমার মোবাইল থেকে। তুই জানিস আমার মোবাইলে আমি লক দিয়ে রাখি না। তোর পাশে নিশ্চিন্তে রেখে কতবার তোর বাসায় ঘুমিয়েছি, এর মধ্যেই তুই এই কাজটা করেছিস। কত বিশ্বাস করে তোকে আমার বাসায়, আমার আত্নীয় স্বজনদের বাসায় বেড়াতে নিয়ে গেছি! আর তুই আমার সাথে এমনটা করলি?
– এটা প্রমান না। প্রমান দে।
– সব চেয়ে বড় প্রমান তোর সাথে আমার ঝগড়া শুরু হলেই এস এম এস আসা শুরু করতো আমার পরিচিতদের মোবাইলে। আমি ভয়ে তখন আমার কষ্টের কথা শেয়ার করতে তোর কাছেই আবার ফোন দিতাম। ঝগড়া মিটিয়ে তোর কাছে একটু স্বস্তি পেতে চাইতাম। আর তোর কাছে ফিরে গেলেই এস এম এস আসা বন্ধ হয়ে যেতো। আবার ঝগড়া হলে আবারো শুরু হতো এস এম এস। ইশ! কিভাবে পারলি এত নিষ্ঠুরভাবে আমার ক্ষতি করতে?
– এটা কোন যুক্তিসঙ্গত প্রমান হলো না।
– শোন হারামি, ঘুমন্ত মানুষকে জাগানো যায়, কিন্তু যে জেগেও ঘুমিয়ে থাকার ভান করে, তাকে আর জাগানো যায় না। তোমার এস এম এস পাঠানোর স্টাইল আমার জানা আছে। আমাকে পাঠানো এস এম এস এর সাথে ওইসব এস এম এস গুলো মিলিয়ে দেখলেই দুই-এ দুই-এ চার মিলে যায়। অনেক আগেই সন্দেহ হয়েছিল, কিন্তু বারবার মনকে বুঝ দিয়েছি তুই আমাকে ভালবাসিস। আমাদের মধ্যে যাই হোক না কেন, এমন কি ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও তুই আমার এত বড় ক্ষতি করতে পারবি না। কিন্তু গতকাল বাবার কাছে আসা এস এম এস দেখেই আমার এতদিনের সব সন্দেহ সঠিক হয়ে গেছে। বাবা আমাদের সাহে কেমন আচরণ করেন এটা আমি শুধু তোকেই বলেছিলাম, অনেক বিশ্বাস করে বলেছিলাম। সেটাও তুই বাবার কাছে পাঠিয়ে দিলি। তুই আমার সেই বিশ্বাসের এই প্রতিদান দিলি!
– আমি কিছু করিনি।
– দ্যাখ, তুই শুধু স্বীকার কর যে কাজটা তুই করেছিস। আমি তোর সাথে সম্পর্ক না রাখলেও সত্যটা স্বীকার করার জন্য তোকে মাফ করে দেবো।
– আমি এসব কিছু করিনি।
– আবারো মিথ্যা! যাক, আমার আর কিছু বলার নাই। আর কোনদিন আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবি না।

তুহিন সরে আসে শহীদের কাছ থেকে, চিরজীবনের জন্য। এস এম এস এর পরিমান বেড়ে যায় হু হু করে। চেনা জানা সবার কাছে এস এম এস আসতে থাকে। সবাই জিজ্ঞেস করে তুহিনকে, কিরে? কি হচ্ছে এসব? কে পাঠাচ্ছে এসব এস এম এস? তুহিন কোন জবাব দিতে পারে না। ভেঙ্গে পড়ে রীতিমত। তুহিনের পাশে এসে দাঁড়ায় তার মমতাময়ী মা। ছেলের বন্ধু-বান্ধব, আত্নীয় স্বজনকে জানায় তাদের এক দূর সম্পর্কের আত্নীয় শত্রুতা করে এই কাজটি করছে। তুহিনের মায়ের মুখে এই কথা শুনে সবাই মেনে নেয় ব্যাপারটা, আর পরিসমাপ্তি ঘটে নিষ্ঠুরতম এক ভালবাসার।

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.