চন্দ্রকথা

লেখকঃ এক্সট্রিম নয়েজ

সকাল সকাল বিরক্তিমাখা চেহারার সাথে অতি কষ্টে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন বাশার আলী। চায়ে লিকার নেই বললেই চলে, একদম পাতলা, পানি পানি। ইচ্ছে হচ্ছে কাপ সহ ছুড়ে ফেলে দিতে। অনেকটা সালসার মত করেই গলা দিয়ে নামাচ্ছেন। অন্য কোন দিন হলে আজ সিয়ামের মা’কে একগাদা আজেবাজে কথা শুনতে হত। কিন্তু আজকের দোষ বাশার আলীর নিজেরই। গতরাতে সিয়ামের মা বলেছিল চা পাতা নেই। সে শুনেও না শোনার ভান করেছিলেন। পকেটে টাকা না থাকলে পুরুষ মানুষের অনেক কিছুই এড়িয়ে যেতে হয়। গ্যাস্ট্রিকের জন্য রোজা রাখতে পারেন না তিনি। তাই বলে এখন এই পানসে চা’ও সহ্য করার মত না। মনোযোগটা এই বিশ্রী চা থেকে সরাতেই পাশে পড়ে থাকা মাস খানেকের পুরানো যুগান্তরটা টেনে নিয়ে পুরাতন খবর গুলোকে এমন ভাবে চোখ গুলিয়ে পড়তে লাগলেন যেন একটু পরেই তাকে এখান থেকে প্রশ্ন করা হবে।

বাড়ির ভেতর ঢুকেই বাবাকে বারান্দায় বসে থাকতে দেখে ঘাবড়ে গেল শাওন। এখন নিশ্চিত জেরা করা শুরু করে দিবেন। বাবাকে প্রচণ্ড ভয় পায় শাওন। কেন যেন তার সামনে মুখ থেকে কথাই বের হয় না। তবে সিয়াম ভাইয়া অনেক কথাই বলে ফেলে বাবার সাথে। তার অনেক সাহস, বড় বলেই হয়ত। শাওন আলগোছে বাবাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। পত্রিকায় মুখ ডুবিয়ে রেখেই থমথমে গলায় বাশার আলী হাঁকিয়ে উঠলেন, “সাত-সকালে কোথায় যাওয়া হয়েছিল?” শক্ত হয়ে দাড়িয়ে গেল শাওন। কি বলবে খুজে পাচ্ছিলো না, আগে থেকেই কিছু একটা ভেবে আসা উচিত ছিল। সত্য তো কোন ভাবেই বলা যাবে না। উত্তর না পেয়ে আবারো হাঁক ছাড়লেন বাশার আলী, “কিরে, কথা বলছিস না কেন?”
“হাঁটতে গিয়েছিলাম।” – নতমস্তকে জবাব দিলো শাওন।
কথাটা শুনে ভ্রু কুচকে কয়েক সেকেন্ড শাওনের দিকে তাকিয়ে রইলেন বাশার আলী। তারপর আবার পত্রিকায় মাথা ডুবিয়ে বিড়বিড় করলে বলতে লাগলেন, “লাট সাহেবের বেটার সকাল সকাল হাঁটতে যাওয়া লাগে। যত্তসব ছাগলের পাল নিয়ে বাস করি আমি। যা গিয়ে বড় গাধাটাকে ঘুম থেকে উঠা।” – খেঁকিয়ে উঠলেন বাশার আলী।

বাবার ধাতানি খেয়ে দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়ল শাওন। সিয়াম এখনো ঘুমোচ্ছে। বিছানার এক কোনায় জড়সড় হয়ে বসে ঘাটের পায়া থেকে আসা ঘুন পোকার কড়কড় শব্দটা লক্ষ্য করছিল শাওন। ওর খুব কান্না পাচ্ছে। কেন যে বাবা ইদানীং এত খারাপ ব্যাবহার করে সে ভেবে পায়না। ক’দিন আগেও বাবা কত্ত আদর করত ওকে। ওর সব চাহিদা গুলো মুখ ফুটে বলার আগেই পূরণ করে দিত। আর এখন! একটু কিছু হলেই শুধু আজেবাজে কথা বলে। গত রাতেও ঈদের শপিং এর কথা বলতেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন, “প্রত্যেক ঈদে ঈদে কিসের শপিং! তোদের কি ন্যাংটা রাখি নাকি আমি!” কি বিশ্রী পরিস্থিতি। ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া একটা ছেলের জন্য এটা অপমানজনকই বটে।

দুপুর হতে হতেই শান্তা এসে হাজির। বাশার আলীর বড় মেয়ে। বিয়ে হয়েছে বছর খানেক হল। ছেলে মালয়েশিয়া থাকে, অবস্থাশালি ভাল। মেয়েকে অনেক আদর করেন বাশার আলী। কিন্তু আজ মেয়ের আগমনে তেমন আনন্দিত মনে হল না তাকে, বরং আগের থেকেও গোমড়া হয়ে গেলেন। বাড়িতে এসেই শান্তা টের পেল সংসারের দুরবস্থা। রাত পোহালে ঈদ আর এখনো এ বাড়ির কারো জন্য একটা নতুন সুতো আসেনি জেনে অনেক খারাপ লাগছিল শান্তার। বাবাকে বলার সাহস না পেয়ে মায়ের হাতে সিয়াম আর শাওনের শপিং এর জন্য কিছু টাকা তুলে দিলো। কিন্তু একথা শোনামাত্র অগ্নিমুর্তি ধারন করলেন বাশার আলী। মেয়ের টাকা তো ফিরিয়ে দিলেনই সাথে স্ত্রী আর মেয়েকে উদ্দেশ্য করে অজস্র কটূবাক্য নিক্ষেপ করলেন। তার মতে তিনি এখনো পঙ্গু হয়ে যাননি যে মেয়ের টাকায় ঈদ করতে হবে। বরং তাদের প্রতি দয়া দেখাতে কড়া ভাবে নিষেধ করলেন মেয়েকে। বাবার এই আচরণে আহত হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাদতে লাগলো শান্তা। বাশার আলীর স্ত্রীও রান্নাঘরে বসে আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে ইফতারের আয়োজন করতে লাগলেন। এদিকে বাশার আলী রেগেমেগে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতেই বাড়ি থেকে ছুটে বের হয়ে গেলেন।

শাওন সকাল থেকে বাড়িতেই আছে। এখানে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটা ঘটনাই সে দেখেছে। কিন্তু সিয়াম সেই সকালে ঘুম থেকে উঠেই কোথায় যেন চলে গেছে। কখন ফিরবে তারও কোন খবর নেই। সংসারের কোন কিছুই তাকে স্পর্শ করে না। যেন সে কিছুই দেখে না, জানে না। নিজের মতই থাকে। শাওনেরও মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় ভাইয়ের মত আত্মভোলা হয়ে যেতে। কিন্তু সে পারে না। ঘরের প্রতিটি ছোট ছোট ব্যাপারও তাকে আঘাত করে বসে। বারান্দায় গিয়ে বোনের কাধে হাত রাখে শাওন। শাওনকে দেখেই জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেদে উঠে শান্তা। “বাবা কেন এমন হয়ে গেল রে শাওন!” বোনের কথার কোন জবাব দিতে পারে না শাওন। তারও খুব ইচ্ছে করে আজ কাঁদতে, কেঁদে হালকা হতে ইচ্ছে করছে।

ইফতারের পর ঘন ঘন বাইকের গিয়ারের শব্দ শুনে রাস্তার পাশের জানালা খুলেই পাখি ভাইকে দেখতে পেল শাওন। সন্ধ্যা বেলাতেও একটা মোটা সানগ্লাস পড়ে আছে পাখি ভাই। তা দেখে এই মন খারাপের বেলাতেও খানিক হাসি পেয়ে গেল শাওনের। হাতের ইশারায় শাওনকে বাহিরে আসতে বলে শার্টের কোনা দিয়ে সানগ্লাস পরিস্কার করতে লাগলেন পাখি ভাই।

পাখি ভাইকে আবার নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। এই সেই পাখি ভাই যে বছর দুয়েক আগে শুভ নামের একটা ছেলেকে ভালবেসে সর্বহারা হয়েছিল। নদীর জোয়ার ভাটার মতই মানুষের জীবনে ভালবাসার গমন আগমন ঘটে থাকে। কাউকে হারালে একদিন তার শূন্যস্থান পূরণ করতে অন্য কেউ চলে আসে। তেমনি শুভর অভাব ঘুচিয়ে দিয়ে পাখি ভাইয়ের জীবনে এসেছিল শাওন। ওদের সম্পর্কটাও স্থাপিত হয়েছিল অনেকটা রহস্যজনক ভাবেই। বছর খানেক আগে কোন এক সন্ধ্যায় শাওনে মজেছিল পাখি ভাই। ওর সাথেও দেখাটা হয়েছিল সেই স্টেশনেই, আর সেখান থেকেই শাওনের পিছু লেগেছিল পাখি ভাই। প্রায়ই শাওনের বাসার জানালার সামনে দড়িয়ে থাকা, হঠাৎ শাওনকে দেখলে “কেমন আছো শাওন?” বলেই একগাল হাসি দিয়ে উত্তরের অপেক্ষা না করে দ্রুত চলে যাওয়া। রাস্তা ঘাটে দেখলেই অতি আবেগের সাথে কুশলাদি জানতে চাওয়া। জোর করেই মাঝে মাঝে এটা ওটা কিনে দেয়া। শাওনের কাছে খুবই অস্বস্তিকর লাগতো এসব। কিন্তু সে কিছু বলত না দুটি কারনে, প্রথমত পাখি ভাই এলাকার অনেক পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাছাড়া শাওনের ধারনা ছিল পাখি ভাই হয়ত তার বড় বোন শান্তাকে পছন্দ করে। তাই শান্তাকে পটানোর জন্যই হয়ত তাকে হাত করতে চাচ্ছে। কিন্তু সে অবাক হল তখন যখন শান্তার বিয়ে হয়ে গেল এবং এ নিয়ে পাখি ভাইয়ের মধ্যে কোন অনুভূতিই দেখলো না। শান্তা চলে যাওয়ার পরেও যখন পাখি ভাই তার সকল কর্মসূচি অব্যাহত রাখলো, তখন শাওনের মনে অনেক বড় কৌতুহলের জন্ম নিয়েছিল যে এই লোকটা আসলে চায় কি! এই কৌতুহলকেই একদিন অনেক সাহস করে প্রশ্ন হিসেবে পাখি ভাইয়ের সামনে হাজির করে শাওন। উত্তরে একগাল হাসি আর লজ্জার সাথে পাখি ভাই যা বলেছিল তাতে রীতিমত পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার মত অবস্থা হয়েছিল শাওনের। তবে এবার পাখি ভাইয়ের ক্যালকুলেশন আর লক্ষ্য ঠিক নিশানাতেই ছিল। শাওন নিজেও যে তার ভেতরে সমপ্রেমের বীজ লালন করে তা সে নিশ্চিত না হলেও আন্দাজ করতে পেরেছিল। সেই থেকেই সে শাওনের পিছু লেগেছিল। পাখি ভাইয়ের ধারনা, যে কাউকে কিছু দিন খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষন করলে তার ব্যাপারে অনেক কিছু আশঙ্কা করা যায়। তার পছন্দ অপছন্দ সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়। শুভকে হারানোর পর থেকেই সে এই পর্যবেক্ষনের চর্চা করে তার নিঃসঙ্গ সময়টা কাটাতেন। তার মাঝেই একদিন আবিষ্কার করে ফেলেন শাওনকে। ফলশ্রুতিতে দিন দুয়েক পর তার ভালবাসায় সায় দেয় শাওন। সেই থেকে দুজন দুঃখী মানুষের এক অধ্যায়ে পাঠ শুরু। মিনিট পাঁচেক বাদে শাওন বাসা থেকে বের হলে তাকে পেছনে বসিয়ে দ্রুত গতিতে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পরে পাখি ভাই। কোথায় যাওয়া হচ্ছে জানতে ইচ্ছে হলেও জিজ্ঞেস করলনা শাওন। সে শুধু জানে এই একটা মাত্র মানুষ যে তার সব দুঃখ কষ্টের দাওয়াই। যার সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্তই এককেটা স্বর্গ সুখের উপলব্ধি।

বাবুবাজার ব্রিজের ওপারে আরেকটা চার তলা বাড়ি আছে পাখি ভাইদের। পুরো বাড়ীটাই ভাড়া দেয়া। তবে বাড়ির ছাদে ছোট একটা ঘর আছে। পাখি ভাই মাঝে মাঝে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেয় এখানে। ছাদের এক কোনায় অনেক গুলো বড় বড় টবে ফুল গাছ লাগানো। ভাড়াটিয়ারা মাঝে মাঝে পানি ঢেলে দেয় তাতে। সেই ফুলগাছ গুলোর পাশেই একটা ক্যাম্পখাটে বসে আছে শাওন আর পাখি ভাই। তাদের দুইজনেরই একই সমস্যা। কেউই খুব বেশি কথা বলতে পারে না। কিছুক্ষন চুপচাপ থাকার পর পকেট থেকে লাইটার বের করে একটা সিগারেট ধরালেন পাখি ভাই। তখন নিরবতা ভেঙে শাওন বলল, “আপনাকে না সিগারেট ছাড়তে বলেছিলাম।”
“তোমাকেও তো বলেছিলাম আমাকে আপনি আপনি না করতে।” ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল পাখি ভাই।
“আপনার সিগারেট থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়, আমি আপনি করে বললেতো আর দুর্গন্ধ হয় না।”
“তুমি আপনি করে বললে একটা পর পর গন্ধ ছড়ায়, সেটা সিগারেটের থেকেও জঘন্য। হয় আপনি বলা ছাড়ো, না হয় সিগারেটের গন্ধ উপভোগ করো। হেহেহে” জোকারের মত হাসতে থাকে পাখি ভাই। শাওন তখন কিছুটা বিরক্তির ভাব করে চুপ হয়ে থাকে।
“আচ্ছা কালকে তো ঈদ তাইনা?” সিগারেট পায়ের তলায় চেপে ধরে বলে পাখি ভাই।
“হ্যা তাইতো মনে হচ্ছে। ওই যে দেখছেন না ওই বাড়ির ছাদে ছেলেমেয়েরা আনন্দে লাফালাফি করছে, তার মানে চাঁদ দেখা গেছে। কাল ঈদ।” একটু দুরের একটা বাড়ির দিকে ইশারা করে বলল শাওন। এদিকে কপালে হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ খুজতে লাগলো পাখি ভাই। “কই চাঁদ তো দেখি না” একটু হতাশ ভঙ্গিতে বলল সে।
“চাঁদ তো আপনার জন্য এখনো আপনার জন্য বসে আছে ওখানে! যারা দেখার তারা দেখলেই হবে, আপনি না দেখলেও চলবে।”
“না না কি বলো, চাঁদ দেখতে হবে না! অবশ্যই দেখতে হবে। টিভিতে কেউ একজন ঘোষণা দিবে যে চাঁদ দেখা গিয়েছে, আর সেটাই কি বিশ্বাস করবো নাকি, নিজে দেখতে হবে না!” খানিকটা ন্যাকামো করেই বলল পাখি ভাই। তার এই মেকি ন্যাকামো দেখে হাসি পেয়ে যায় শাওনের। “ঠিক আছে আপনি যখন চাঁদ দেখেননি, তাহলে আপনাকে কাল ঈদ করতে হবে না। বাসায় শুয়ে ঘুম দিয়েন।” – শাওন বলল।
“একা একা ঘুমাতে পারবো না। তুমি যদি সাথে ঘুমাও তাহলে এক ঈদ কেন এমন অনেক ঈদ ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিবো আমি।” বলেই চুমু খাওয়ার ভঙ্গিতে শাওনের দিকে মুখ বাড়িয়ে দেয় পাখি ভাই। হাত দিয়ে তার মুখ ঠেলে ধরে শাওন বলে, “উহ! আপনার মুখে গন্ধ, যান এখান থেকে!”
“আচ্ছা ১ মিনিট বসো, আসছি আমি।” বলেই ঘরের ভেতরে চলে গেলেন পাখি ভাই। ফিরে এলেন পরমুহুর্তেই। হাতে একটা প্যাকেট। শাওনের হাতে দিয়ে বললেন, “এই নাও।”
“কি এটা?”
“তোমার ঈদের উপহার।”
“বাঃ বাঃ তা কি আছে এর ভেতর?”
“বলব কেন, নিজেই খুলে দেখো।”
প্যাকেট খুলতেই ভেতর থেকে একটা পাঞ্জাবী বের হয়ে এলো। আবছা আলোয় সঠিক রঙটা বোঝা না গেলেও, গলা থেকে মাঝ বরাবর সরু এমব্রয়ডারির কাজটা বোঝা যাচ্ছিল স্পষ্ট। এর মধ্যেই পাখি ভাই বলে উঠল, “আচ্ছা আমার গিফট কই? তুমি আমাকে গিফট দিবে না?”
হঠাৎ করেই হতভম্ব হয়ে গেল শাওন। তার নিজের সেই ক্ষমতা নেই পাখি ভাইকে কিছু দেয়ার মত। ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল শাওনের।
“কি ব্যাপার! মন খারাপ করে ফেললে কেন! আমি তো স্রেফ মজা করে বললাম। আমার আসল গিফট তো তুমি।” বলেই শাওনকে জড়িয়ে ধরল পাখি ভাই। “উঃ তোমার মুখে গন্ধ, ছাড়ো আমাকে।” বলে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো শাওন।
“যাক শেষ পর্যন্ত তুমি করে বলতে পারলে তাহলে। এখন তো আর ছাড়ছিনা, আমার গিফট আমি উসুল করেই ছাড়বো।”
অতঃপর কিছু মধুর সংঘর্ষ হয়ে গেল দুজনের মাঝে।

রাত ১০টার দিকে বাড়িতে ফিরলেন বাশার আলী। দুহাত ভর্তি শপিং ব্যাগ আর পেছন পেছন সিএনজি ওয়ালা এসে দুটো বড় বাজারের ব্যাগ বাড়ির ভেতরে দিয়ে গেল। বারান্দায় বসে মায়ের মাথার চুল আচড়ে দিচ্ছিলো শান্তা। বাবাকে হঠাৎ এত কিছু নিয়ে আসতে দেখে অবাক হয়ে উঠে দাড়ালো শান্তা। বাশার আলীর স্ত্রীও মাথা গোছাতে গোছাতে এগিয়ে এলেন। মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বাশার আলী বললেন, “এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? বাজারের ব্যাগ দুটো ভেতরে নিয়ে রাখ। আর সিয়াম শাওন কই?” বাবার মুখটা হাসি হাসি দেখে ভাল লাগছিল শান্তার। দৌড়ে বাজারের ব্যাগ ভেতরে রেখে এসে জানালো সিয়াম শাওন কেউ এখনো ফেরেনি। বাশার আলী তাগিদ দিয়ে বললেন, “সিয়ামকে ফোন করে তাড়াতাড়ি আসতে বল। আর ওকে বল শাওনকে খুজে দেখতে কোথায় গেছে।”
“আচ্ছা তা দেখছি, তার আগে বলো তুমি এত কিছু কেনার টাকা পেলে কই, তোমার কাছে না টাকা ছিল না!” বিস্ময়ের সাথে বলল শান্তা। সেই সাথে উন্মুখ দৃষ্টিতে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো তার মা।
“আরে টাকা থাকে না আবার আসে, এটাই নিয়ম। এই নে এটা তোর জন্য আর এটা তোর মায়ের জন্য। খুলে দেখতো পছন্দ হয় কিনা।” বলে স্ত্রী আর কন্যার দিকে দুটি শাড়ীর প্যাকেট এগিয়ে দিলেন।
শান্তার মা সাধারনত কথা কম বলেন, কিন্তু এখন আর চুপ থাকলেন না। “তুমি সত্যি করে বল তো এত কিছু কেনার টাকা পেলে কই!” বলে স্বামীর দিকে এক নজরে তাকিয়ে রইলেন।
স্ত্রীর থেকে আর লুকাতে পারলেন না বাশার আলী। তার শাড়ীর প্যাকেটটা খুলতে খুলতে বললেন, “অফিসের কয়েকজন মিলে একটা সমিতি করেছিলাম। সেখানে হাজার বিশেক টাকা জমেছিল। ভেবেছিলাম শান্তার ছেলেমেয়ে হলে তখন ওর পেছনে খরচ করবো সেটা। আবার ভাবলাম ছেলেমেদের মন খারাপ করে টাকা জমিয়ে রেখে কি করবো। সেটা আবারো জমানো যাবে। শান্তা তো আর এখনি মা হচ্ছে না।” লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলে শান্তা।
“শান্তা তুই তো বিয়ের আগে অনেক সুন্দর পায়েস রান্না করতি। শ্বশুর বাড়ী গিয়ে আবার সব ভুলে যাসনি তো? সব কিছু কিনে এনেছি, সকাল সকাল সেইরকম একটা পায়েস রান্না করতো মা, কতদিন হল তোর হাতের পায়েস খাইনি।”
মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় শান্তা। স্বামীর কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শান্তার মা। শান্তার চোখ থেকেও দুফোটা আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে নীরবে।

এরই মধ্যে ঘরে এসে ঢুকলো শাওন। এসেই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল সে। শাওনকে দেখে বাশার আলী ডেকে তার জন্য আনা জামা প্যান্ট হাতে দিয়ে বললেন, “দেখ তো পছন্দ হয় কিনা? আর সব কিছু সাইজ মত হয় কিনা দেখ। আর দেখতো জুতোটা ঠিক আছে কিনা, তুই এটার কথাইতো বলেছিলি তাইনা? নাইক না কি বলে এটাকে। দেখ মাপ ঠিক আছে কিনা, নাহলে বদলে আনা যাবে পরিচিত দোকান থেকে নিয়েছি।” জুতোর বাক্সটা খুলতে খুলতে বললেন বাশার আলী। কিন্তু এর কোন কিছুর দিকেই মন নেই শাওনের। তার দৃষ্টি বাবার আনন্দ মাখা মুখের উপর। এসব পেয়ে শাওন যতটা না খুশি তার চেয়ে বেশী খুশি আজ তাকেই মনে হচ্ছে। আজ বাবাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে খুব শাওনের। নিজেকে আর নিয়ন্ত্রনে না রাখতে পেরে সত্যিই বাবার গলা জড়িয়ে ধরে “সরি বাব” বলে কেঁদে ফেললো শাওন। হাসি হাসি মুখে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বাশার আলী বললেন, “ধুর বোকা ছেলে, বাচ্চাদের মত কাঁদিস কেন? বড় হয়েছিস না!” এদিকে দুই মা মেয়েও নিজের চোখ মুছে নিলেন। এক ফ্রেমে একটি অশ্রুসজল সুখি পরিবারের দৃশ্য। আর এই পরিবারেরই আরেক সদস্য সিয়াম নীরবে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছে সেই দৃশ্য। তারও ইচ্ছে করছিল শাওনের সাথে বাবাকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু কিছু দৃশ্য দুর থেকে দেখার মধ্যই বেশি সুখ। আর এই সকল সুখ ছায়ার মাঝে সবার অন্তরালে রয়ে গেল আরেকটি সত্য, সবার জন্য কেনাকাটা করলেও নিজের জন্যে কিছুই কিনেননি বাশার আলী। তবুও আজ পরম সুখের অনুভূতি তার সর্বাঙ্গে উজ্জ্বল।

***সমাপ্ত***

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.