তৃতীয় পক্ষ

লেখকঃ সজল আহসান

বছরের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ ট্রান্সফারের চিঠি মেজাজটাই বিগড়ে দিল। সবেমাত্র অফিসের এক কলিগের সাথে চোখাচুখির আঠালো আবেশে নিজেকে ভাসাতে শুরু করেছি। স্যারের তা বুঝি আর সহ্য হলনা। তাই হাতে চিঠি ধরিয়ে দিয়ে আমায় তাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আসলে আমার কপালে ভালবাসার ছিটে ফোঁটাও লেখা নেই। তাই যে ডাল ধরি সে ডাল থেকেই ভেঙ্গে পড়ি।

তবে ট্রান্সফারের কথা শুনে মনটা যতটা বিষণ্ন হবার কথা ছিল খামটা খুলে জায়গার নাম দেখে নিমেষেই ভাঙ্গা থেকে চাঙ্গা হয়ে গেল মনটা। খুলনাকে বিদায় জানিয়ে প্রিয় শহর রাজশাহীতে পাড়ি জমাব এবার। এতদিন থেকে মেসের পানসে খাবার গলাধকরণ করতে করতে মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ ভুলতেই বেসেছি। যাক রেহাই মিলল অবশেষে। নিজ বাসা থেকে অফিস করার মত সুবিধে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ারই মত। চলতি মাস শেষ হতে আরও সাত দিন বাকী। এর মধ্যে তল্পতল্পা গুটিয়ে অফিসের সবার থেকে বিদায় নিয়ে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে বাসে উঠলাম। কতদিন পর বাড়িতে পা পড়বে আমার। দূরে থেকে প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে করা ফোনালাপ কতটুকুই বা মনটাকে, চোখদুটোকে স্বান্তনা দিতে পারে?
লম্বা বাস জার্নি শেষে স্ট্যান্ডে পৌছালাম রাত্রি পৌনে ১০টায়। তারপর ব্যাগ হাতে নিয়ে রিকশায় উঠলাম আপন ঠিকানার পথের কোলে। চলতে চলতে বাড়ির সামনে এসে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে রিকশা থেকে নামলাম। অনেক দিন পর বাড়িটাকে দেখে মনের মাঝে সারি বেঁধে সুখানুভূতির আনাগোনা শুরু হল। বাড়ির সদর দরজায় পা রাখতেই দেখি মা গেটের সামনে কাঁধ রেখে আমার আসার অপেক্ষায় আনমনা হয়ে ঠায় দাড়িয়ে।

সত্যি মা যেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার, সর্বশ্রেষ্ঠ দর্শনমুখ। আমাকে পলক দেখামাত্রই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে হু হু স্বরে কাঁদতে শুরু করল। আসলে মায়েদের মন আল্লাহ তায়ালা যে কোন মমতা দিয়ে গড়েছেন তা একমাত্র তিনিই জানেন। আমারও দুচোখের কোণা দিয়ে কখন যে অবলীলায় জল গড়িয়ে পড়ল তার ঈষৎ টেরও পেলাম না। বাবা উঠোনে দাড়িয়ে আছেন। মায়ের কান্না শুনে মিতা ও মিনি ভাইয়া ভাইয়া বলে ডাক ছেড়ে ঘর থেকে এক ছুটে আমার নিকটে চলে এল। মিতা ও মিনি আমার দুই জমজ ছোট বোন। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বলতে আমরাই পাঁচজন। দুবছর যাবত আমি ব্যাংকে চাকরীরত। আর দাদু ,দাদীমা আমার জ্ঞান হবার পর পরই ইহকাল ত্যাগ করেছেন। দাদুর মুখচ্ছবিটা খুব একটা মনে নেই। তবে দাদীমাকে মাঝে মধ্যেই স্বপ্নে দেখি। এখনো তার মুখখানা স্পষ্ট চোখের সামনে গড়াগড়ি করে। মায়ের রান্না করা মুখরোচক খাবারে তিনবেলা ভুরিভোজ, গ্রামের ধূলিবালির পরশ, গাছপালার নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাসে সজীবতা ফিরে পাওয়া, সবার সঙ্গে হাসি ঠাট্টায় দিনমান যাপন এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল কয়েকটা দিন।

নতুন মাসে যুক্ত হলাম রাজশাহীর অফিসে। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষদের সাথে পরিচয় অতঃপর প্রথমদিনটা বেশ ভালভাবেই অতিবাহিত হলেও বাড়ী থেকে অফিসের দূরত্ব বেশী হওয়ার কারনে দীর্ঘ যাতাযাতের প্রভাবে শরীরের উপর একপ্রকার প্রসার পড়ে গেল। এমনিভাবে একটা সপ্তাহ অফিস করার পর অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করলাম। আমার অসুস্থতা দেখে মা আমাকে অফিসের কাছাকাছি বাসা ভাড়া নিতে বলল। আমি অনীহা প্রকাশ করলাম। তাছাড়া ব্যাচেলরদের বাসাভাড়া দিতে চায়না বাড়িওয়ালারা। অন্যথায় মেস ছাড়া কোন উপায় নেই। পরক্ষণে মা একটু উৎসাহ নিয়ে বলল, তোর বাবার কাছে শুনেছিলাম তোর অফিসের কাছাকাছি তার কোন এক চাচাত ভাইয়ের বাসা। সেখানে উঠলে কেমন হয়?
আমি বললাম, তারা কি ভাববে?
মা বলল, তারা যাই ভাবুক, আগে তোর বাবার সঙ্গে কথা বলে নিই।
পরদিন বাবা তাদের সঙ্গে তাদের বাড়িতে আমার থাকার ব্যাপারে সলাপরামর্শ করলেন। একপ্রকার ঠিকঠাক হয়ে গেল সেখানে ওঠার বিষয়। আমি যাওয়ার সবকিছুর বন্দোবস্ত করে বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাবার চাচাত ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। তাদের বাড়িতে ওঠার পর তারা বেশ যত্ন আত্তি করল আমায়। আমার রুম গোছানো, বেডিং ঠিক ঠাক করা, খাওয়ার ব্যাপারে খুঁটিনাটি যাচাই করা সবকিছু তদারকি করতে লাগলেন চাচী।

ওদের পরিবারটা অতি ছোট। আমি আসা অবধি সদস্য সংখ্যা মাত্র তিনজনই আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। চাচা, চাচী এবং তাদের একমাত্র ছেলে ফাহিম। ফাহিম দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। দুদিনে যতটুকু দেখলাম তাতে তাকে বেশ বুদ্ধিমান আর মিশুক স্বভাবের মনে হচ্ছে। আর সে খুব ভ্রমন প্রিয়াসী।

একটা সপ্তাহ পার হয়ে গেল। এতিমধ্যেই মনে হচ্ছে তারা আমার কতটা আপন। এতটা গুরুত্বের আদলে গড়া সম্পর্ক, আসলে সেখানে কোন রক্তের টান লাগেনা আত্মার টানেই যেন এক অদৃশ্য বাঁধন।

আজ অফিস থেকে ফিরে রাতে ঘরে বসে কিছু অফিসিয়াল কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি তাই বাইরে যাওয়ার জো মেলেনি। রাত পৌনে ১০টার দিকে ও পাশ থেকে ফাহিমের ডাক শুনতে পেলাম।
*সজল ভাইয়া আসতে পারি?
**হ্যা ফাহিম আসো।
*ডিনার করবেন না? মা আপনাকে ডাকছে।
** এইতো একটু কাজ বাকী আছে শেষ করেই যাচ্ছি।
*আচ্ছা ঠিক আছে। ওহ! ভুলেই গেছিলাম আপনাকে বলতে, কাল ফাহাদ আসছে।
** কোন ফাহাদ? চিনলাম না তো।
*আপনি তো ওকে দেখেননি চিনবেন কি করে। ফাহাদ আমার খালাতো ভাই। সে এখান থেকেই লেখাপড়া করে। কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে বেড়াতে গেছে। আমরা দুজন একই ক্লাসে, একই বিভাগে,একই কলেজে পড়ি।
**ও তাই নাকি! কাল ফাহাদ হলে আমার সাথে মিট করিয়ে দিও।
*ঠিক আছে ভাইয়া।
কথার মাঝখানে ফাহিমের ফোন বেজে উঠল। সে বলল ফাহাদের ফোন। তারপর কথা বলতে বলতে ওর রুমে দিকে চলে গেল। আমিও কাজ শেষে খেতে গেলাম।

পরদিন,
অফিস শেষে রুমে প্রবেশের পথে ফাহিম সামনে হাজির। সাথে একজন সুদর্শন যুবক। আমি মনে মনে ফাহাদকে অনুমান করতেই ফাহিম বলে উঠল
*সজল ভাইয়া ও ফাহাদ, ফাহাদ ওনিই আমাদের সজল ভাইয়া।
ফাহিম সম্ভবত আমার কথা আগে থেকেই ফাহাদকে অবগত করেছে। ফাহিম একটা মৃদু হাসি দিয়ে আমার সাথে হ্যান্ডসেক করল। আমি খুব ক্লান্ত থাকায় তাদের রাতে আমার রুমে আসতে বললাম গল্প করার জন্য। রাতে দুজনে চলে এল আমার রুমে। কথায় কথায় অনেকটা সময় পার হল তাদের সঙ্গে। তবে তাদের দুজনের বন্ধুত্বময় সম্পর্ক দেখে আমি ষোলআনায় মুগ্ধ। তাদের খুনসুটি আর হাতাহাতি সবই প্রত্যক্ষ আর উপভোগ করলাম বেশ। গল্পের ভাঁটায় আমাদের পেটের ক্ষুধা কোথায় যেন চাপা পড়ে গিয়েছিল। অবশেষে চাচীর ডাকে আমাদের খোশগল্পের ইতি ঘটল।

পরদিনে সকালে,
অফিস যাওয়ার আগে বাথরুমে ঢুকবো গোশল করার জন্য। কিন্তু বাথরুম ওপাশ থেকে লক করা। দরজায় টোকা দেয়ার সাথে ফাহিমের কন্ঠ শুনতে পেলাম।
*কে?
** ফাহিম আমি সজল।
* ও ভাইয়া একটু অপেক্ষা করেন, আমরা গোশল করে যাচ্ছি।
** তোমরা দুজনেই ভেতরে নাকি?
*জি ভাইয়া।

আমি আবার আমার রুমে ফিরে গেলাম। ১৫ মিনিট অপেক্ষার পর বাথরুমে তাকিয়ে দেখি এখনো লক করা। এভাবে ৩০মিনিট। তবু তাদের বের হওয়ার খবর নেই। এদিকে অফিসের সময়ও ধেয়ে আসছে। মেজাজ আমার তুঙ্গে চড়ে ঘুরঘুর করে ঘুরছে এদের কান্ড দেখে। যেন মনে হচ্ছে দশবছর ধরে এরা আবগাহনে নিজেদের ব্রত রেখেছে। করবই না শালার গোশল। কয়লাপোড়া রাগ নিয়ে শার্ট প্যান্ট পরিধান করে অফিসের কাগজপাতি গোছাতে লাগলাম। এমন সময় চাচী ঘরে এল।
* সজল গোশল করলা কখন?
**গোশল করিনি চাচী।
*তাহলে রেডি হলে যে?
*অফিসের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া ওরা সেই কখন থেকে বাথরুমে, বের হওয়ার নাম নাই।
* ওরা এখনো বাথরুমে! দাড়াও ওদের স্বাদের গোশল করাচ্ছি।

চাচী তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে ওদের গালি দিতে দিতে বাথরুমের দিকে ছুটলেন। চাচীর একটা ডাকেই দেখি কাজ ফায়সালা হল। দুজনেই সুর সুর করে বেড়িয়ে এল। তারপর আমার দিকে এসে ছোট্ট করে একটা সরি বলে দুজন নিজ নিজ রুমে গমন করল।

রাতে ডিনার শেষে ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন শরীরটা বিছানায় মিলিয়ে দিয়ে রবীন্দ্র সংগীত শুনছিলাম। এসো এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে। এমন সময় হুর হুর করে ফাহিম আর ফাহাদ আমার ঘরে ঢুকে পড়ল। তাদের হঠাৎ রুমে দেখে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম,

* তোমরা এত রাতে?
দুজনেই চুপচাপ, ফাহাদ ফাহিমকে চোখ টিপে দিচ্ছে। সেই দৃশ্যও ধরা পড়ল আমার চোখে।
* কি ব্যাপার চুপচাপ কেন?
** ভাইয়া আমাদের ক্ষমা করে দেন প্লিজ। সকালের ঘটনার জন্য আমরা দুঃখিত।
* ওকে ওকে, এটা কোন ব্যাপার না। কিন্তু তোমরা পুরুষ মানুষরা মেয়েদের মত এতক্ষণ বাথরুমে থাক কেন?
** ইয়ে মানে, এমনিতেই। গল্প করছিলাম আর গোশল করছিলাম।
* ও, আচ্ছা। যাও এখন অনেক রাত হয়েছে।
** ধন্যবাদ ভাইয়া, এমনটা আর হবেনা। গুড নাইট।
দুজনে আবার এক ভো দৌ দিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। আমিও আর গানে কান না দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টায় মত্ত হলাম। কিন্তু কেমন যেন একটা সন্দেহর বাতাস আমার মনে বসে আমার ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। তবে আমি ঠিক আন্দাজ করতে পারছিনা এই সন্দেহটা কিসের? পরে ভাবনাটাকে কোন রকমে বালিশ চাপা দেয়ায় নিদ্রাসক্ত চোখদুটোর জাগরণ ঘটল আলোকিত সকালে। আজকে আর গতকালের মত সমস্যার সম্মুখীন হতে হলনা। যাক দুষ্টু দুইটা বোধহয় পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত। গোশল শেষ করে নাশতা খেয়ে রেডি হতে হতে ভাবলাম আজ তিনদিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে যাব। তাই ল্যাপটপ নিয়ে ছুটির এ্যাপ্লিকেশন লিখতে বসলাম। ঠিক তখনই ওপাশ থেকে চাচীর কন্ঠস্বর কানে পৌছালো
* সজল, আসব?
**হ্যা চাচী আসেন।
* কিছু বলবেন?
** হুম, আজ সকালের ট্রেনে আমি আর তোমার চাচা কয়েকদিনের জন্য গ্রামে একটা কাজে যাব। তাই বাসা আর দুষ্টু দুইটার দায়িত্ব তোমাকে দিয়ে যেতে চাই। তুমি কি বল?

চাচীর কথা শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। তবে কি আর করা, আমিও তো বর্তমানে তাদের বাড়ির একজন সদস্য। তাদের সমস্যা মানেই তো আমার সমস্যা। তাই চাচীকে বললাম
* কি কি করতে হবে চাচী যদি একটু বলতেন।
** এই নাও বাড়ির চাবি। ফ্রীজে মাছ, মাংস, ডিম,তরকারি সবই আছে আর রান্নাঘরে রাইসকুকার, প্রেসারকুকারও আছে। যা যা লাগে দেখে শুনে রান্না করিও। কোন কিছু লাগলে একটু বাজার থেকে এনে নিও।
* আচ্ছা চাচী।
**সাবধানে থাকিও তোমরা আর ঐ দুষ্টু দুইটার প্রতি নজর রাখিও। গেলাম।

রান্নার কথা শুনে আমার গলা শুকিয়ে কাট প্রায়। এই একটা ব্যাপারকে আমি ভীষণ ভয় পাই। অবশেষে সেটাই জুটল আমার কপালে। তবে বিজ্ঞানের যুগে আছি বলে চিন্তাটা একটু কম। তা না হলে কি যে করতাম আল্লাহই জানেন। চাচা চাচী বিদায় হবার পর ফাহিম, ফাহাদের রুমে গেলাম তারা কলেজ যাবে কিনা জিজ্ঞেস করার জন্য। তারা বলল আজ কলেজে যাবেনা। আমি বাড়ির একটা চাবি ফাহিমকে দিয়ে আরেকটা চাবি আমার কাছে রেখে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। অফিসের লাঞ্চ টাইমের আগে আজ অনেকদিন পর রিয়া ফোন করেছিল। রিয়া আমার পূর্বের অফিসের কলিগ। যার প্রতি আমার ভালোবাসাটা শুধু চোখাচুখিতেই সীমাবদ্ধ ছিল কখনো সামনাসামনি বলার সাহস পাইনি। স্ক্রিনে ওর নামটা দেখে প্রবল উৎসাহ নিয়ে ফোনটা পিক করেছিলাম। কিন্তু ওর কথা শুনে মনটা ভেঙ্গে গেল। সামনের সপ্তাহে ওর বিয়ে, ছেলে বিজনেসম্যান। আমাকে ফোন করার উদ্দেশ্যে বিয়ের খবরটা জানানো। রিয়ার সঙ্গে কথা বলার পর সবকিছুকেই যেন ফিকে মনে হচ্ছে, কাজে কিছুতেই মন বসাতে পারছিনা । তাই লাঞ্চ টাইম শেষের পর স্যারের কাছে অনুরোধ করে জোরপূর্বক ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে এলাম।

তারপর গেটের তালা খুলে রুমে ব্যাগটা রেখে বাথরুমের দিকে যাচ্ছিলাম ফ্রেশ হবার জন্য। কিন্তু হঠাৎ ফাহিমের রুমে একপলক পড়তেই যা দেখলাম তাতে যেন আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। বিছানায় ফাহিম, ফাহাদ দুজনেই পুরোপুরি নগ্ন অবস্থায়। ফাহাদের নগ্ন উপুর হওয়া শরীরের উপর ফাহিম সমস্ত শরীর দিয়ে যৌনকর্মের প্রক্রিয়া চলাচ্ছে। তারাও আমাকে দেখে রীতিমত অপ্রস্তুত, হতভম্ব। শরীরে কাপড় টেনে নিবে না বিছানা থেকে নামবে তা ঠিক করতে পারছেনা। আমি কিছু বললাম না চুপচাপ মাথা নিচু করে বাথরুমে চলে গেলাম। ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে আমি বাকহীন দাড়িয়ে আছি ওদের দুজনের ঐ দৃশ্যটা আমার চোখের সম্মুখে বারবার চরকির মত ঘুরছে। পুরুষে পুরুষে এ যৌনতা কীভাবে সম্ভব? আমি কোন প্রশ্নের উত্তরের সীমা খুঁজে পাচ্ছিনা। এটাকেই কি সমকাম বলে, সমকাম সম্পর্কে আমি খুব একটা জানিনা। কথাটার সাথেই শুধু পরিচয় আছে। কিন্তু স্বচোক্ষে দেখা বিশ্বাস না করার মত এমন দৃশ্য আমার এই ২৮ বছরে দেখা প্রথম অভিজ্ঞতা। ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বাড়িয়ে ফাহিমের রুমের কাছে এসে মাথা নিচু করে যাচ্ছিলাম। রুমের সামনে আসতেই আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে দুজনেই হুমড়ি খেয়ে আমার পায়ে লুটে পড়ল।
* কি হল তোমাদের, পা ছাড়, পা ছাড়।
** ভাইয়া আমাদের ক্ষমা করেদিন, আমরা জীবনেও আর এই কাজ করবনা। দয়াকরে আজকের ঘটনাটা কাউকে জানাবেন না। তাহলে আমরা কাউকেও মুখ দেখাতে পারবনা ভাইয়া। বলেই তারা হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করল। আমি দুজনকেই আমার পা থেকে তুলে ফ্রেশ হতে বলে আমার রুমে চলে এলাম।তিনদিন কেটে গেল। ফাহিম আর ফাহাদ এখন আর খুব একটা আমার রুমে আসেনা কিংবা আগের মত খুব একটা কথাও বলেনা আমার সাথে।

ওদের দুজনকেও একসাথে দেখিনা সেদিন থেকে, যে যার মত কলেজ, কোচিং যাচ্ছে, নাওয়া খাওয়া করছে। চাচা চাচী এখনো গ্রাম থেকে ফিরে নি। বাড়িটাকে কেমন যেন একটা নীরবতা ঘিরে রেখেছে। নাহ এভাবে আর চলা যায়না। ওদের দুজনেরই সাথে পৃথক পৃথক ভাবে কথা বলতে হবে আমার। এজন্য নিজেই প্রথমে ফাহাদের রুমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ওর রুমের সামনে গিয়ে ওকে একটা ডাক দিলাম।
*ফাহাদ ঘরে আছ?
** জি ভাইয়া, ভেতরে আসেন………বসেন।
*লেখা পড়া কেমন চলছে?
** জি ভালো।
* তোমার সাথে কিছু কথা বলতাম
** বলেন ভাইয়া কি বলবেন?
* আচ্ছা ফাহিমের সাথে তোমার সম্পর্কটা কি?
** সে আমার কাজিন।হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন ভাইয়া?
* তা তো জানি। আর কি সম্পর্ক তোমাদের? খোলাখুলি বলো, আমি কাউকে কিছু বলবনা।
** আসলে ভাইয়া আমি নবম শ্রেনী থেকে ওকে ভালবাসি।
*সে কি তোমাকে ভালবাসে?
** তা জানি নাহ। তবে আভাস পাই।
* কিভাবে আভাস পেলে?
** সে তো আমাকে ছাড়া একমূহুর্তও চলতে পারেনা। ওর সব গোপনকথা আমার সঙ্গে শেয়ার করে। তাছাড়া পালাপাশি রুমে থাকা সত্ত্বেও প্রায় সময় সে আমাকে কয়েকবার ভালবাসি কথাটা মেসেজে পাঠিয়েছে এবং বিশেষদিনগুলোতে সারাদিনটা আমার সাথে কাটানো, গিফ্ট দেয়া এসব কি তার ভালবাসার প্রমাণ নয়।
* বুঝলাম, এখন তাকে নিয়ে তোমার ইচ্ছা কি?
** ওকে সারাজীবনের জন্য আমার পাশে চাই।
* কিন্তু এটা তো কখনো হবার নয়। এই দেশ, সমাজ, জাতির কাছে আদৌ এ সম্পর্ক গ্রহনযোগ্য হবেনা।

ফাহাদের মুখ থেকে আর কোন কথা বের হলনা। তার চোখ দিয়ে ঝরঝর জল পড়তে শুরু করল। আমি তার কান্না থামিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে এলাম। এরপর আমার গন্তব্য ফাহিমের রুম। ফাহিমের কাছেও আমার এসব প্রশ্নই ছিল। তার উত্তর শুনে আমি অবাক হব না মুগ্ধ হব ঠিক বুঝে উঠতে পারলামনা। সত্যি কতটা ভালবাসা থাকলে দুটি মানুষের মনের কথা এক হয় তারই এক অদ্ভূত উদাহরণ পেলাম এদের দুইজনের কথা শুনে। ফাহিমের সাথে কথা বলার পর আবার গেলাম ফাহাদের রুমে।
* ভাইয়া আবার আসলেন, কিছু বলবেন?
**হুম, ফাহিমের সাথে তোমার ব্যাপারে কথা বলে এলাম।
* কি বলল সে ভাইয়া, কি বলল?
** আসলে কি বলব তোমায়, সে তো তোমাকে মোটেও ভালবাসেনা আর সে চায় তুমি তার থেকে যতটা দূরে থাক ততটাই তার ভাল।
* ভাইয়া সে কি সত্যিই এভাবে বলেছে?
** হ্যা রে ভাই আমি কি মিথ্যা বলব তোমাকে।

ফাহাদকে ফাহিমের মতামত জানানোর পর ফের ফাহিমের কাছে গেলাম। আর অনুরুপ ভাবে ফাহিমকেও ফাহাদ সম্পর্কে অবগত করলাম। ফাহিম কথাগুলো শুনে নিস্তব্ধ হয়ে গেল, বিষণ্নতার ছাপে তার চোখে মুখে ফ্যাকাশে ভাব চলে এল।

আমার মাধ্যমে দুজন দুজনের সম্পর্কে জানার পর দুজনকে একসঙ্গে কিংবা কথা বলতে দেখিনি। তাদের চলাফেরা দেখলে মনে হয় যেন দুজনের মাঝখানে একটা বড় দেয়াল দাড়িয়ে দুজনকে আলাদা করেছে। আমি নিশ্চুপ দর্শকের মত তাদের এসব কান্ড কারখানা উপভোগ করছি। রাতে শুয়ে পড়ব এমন সময় ফাহাদ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমার রুমে প্রবেশ করল। ওকে দেখে বললাম,
* কি হয়েছে ফাহাদ কাঁদছো কেন?
** ভাইয়া আপনি ঠিকই বলেছিলেন, ফাহিম আমাকে ভালবাসেনা। আজ ওকে একটা মেয়ের সঙ্গে রিকশায় ঘুরতে দেখেছি। ও তো এমন ছিল না।
*এটাই সত্য, তোমাকে মানতে হবে ভাই।

পরেরদিন, অফিস থেকে ফেরার পর ফাহিমের কাছে ফাহাদ সম্পর্কে অভিযোগ শুনলাম। ফাহাদ পার্কে কোন এক ছেলের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে ঘুরছে। আমি প্রতিত্তর দিলাম না,শুধু চুপচাপ শুনে গেলাম।

দুইদিন পর,
ফাহাদ আর ফাহিমের চোখের দিকে আর তাকানো যাচ্ছেনা। দুজনের চোখের নিচে কালো ছোপ পড়ে গেছে।সত্যি আমি অভিভূত এদের ভালবাসা দেখে, একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষকে এতটা ভালবাসতে পারে! না এদের ভালবাসার পরীক্ষা নেয়াটা অতিরঞ্জিত হয়ে যাচ্ছে। একটা কিছু করা দরকার। রাতে দুজনকেই ডাকলাম আমার রুমে। দুজনেই আমার রুমে এসে যোজন যোজন দূরত্ব নিয়ে বসে পড়ল।
* শোন তোমাদের এখানে ডাকার একটাই উদ্দেশ্য, কাল আমরা তিনজন শালবনে ঘুরতে যাব।
ফাহিমঃ ফাহাদ গেলে আমি যাব না।
ফাহাদঃ তুই গেলে বুঝি আমি যাব?
* চুপ কর দুজন। আর কোন কথা নয়। কাল তিনজনই যাচ্ছি। that’s final.

সকালে তিনজনই বাসে করে রওনা দিলাম শালবনের উদ্দেশ্যে। যাত্রাপথে দুজনকে কারো সঙ্গে কথা বলতে শুনিনি।

প্যাচটা বেশ ভালোভাবেই লাগছে দুজনের মাঝে। ভাঙ্গাতে পারব কিনা কে জানে? শালবনে নেমে নীরব মনে তিনজন হাঁটতে শুরু করলাম। আমি মাঝে মধ্যে কিছু কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দি করে রাখছি। হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায়ে গভীর অরণ্যের ভেতর প্রবেশ করলাম আমরা। ভাবলাম এই সুযোগ আমার উদ্দেশ্য হাসিলের। দুজনকেই থামিয়ে দুজনের মুখোমুখি দাঁড় করালাম।
* ফাহিম তুমি ফাহাদের দিকে চেয়ে বল তুমি তাকে ভালবাস না। কোন মতেই চোখ সরানো যাবেনা।
* ফাহাদ তুমিও বল চোখ না সরিয়ে।
দুজন দুজনের সামনাসামনি নির্বাক দাড়িয়ে। আর আমি তৃতীয়পক্ষ হয়ে অপেক্ষায় আছি তাদের মন থেকে উদ্ভূত মুখের নিঃসৃত সত্যি কথাটা শোনার জন্য।
একে একে ৫ মিনিট, ১০ মিনিট, ১৫ মিনিট পর্যন্ত পার হয়ে গেল কিন্তু কারও মুখ থেকে একটা কথাও বাহির হলনা। অবশেষে আমিই মুখ খুলতে বাধ্য হলাম।

*তোমরা দুজনকে এতটা ভালবাসা কিভাব? আমিতো অবাক এবং হতবাক হয়ে যাই। এতটা সময় নিয়েও কেউ কাউকে বলতে পারলে না তোমরা দুজন দুজনকে ভালবাসা না। আসলে এটাই সত্যিকারের ভালবাসা। কারণ প্রিয় মানুষটির চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ কখনো মিথ্যা বলতে পারেনা। আর তোমরা দুজন দুজনকে যে কারনে ভুল বুঝে আছ আসলে সেটা মিথ্যা। আমিই ফাহিমকে বলেছিলাম ফাহাদকে দেখিয়ে রিকশায় তার কোন মেয়ে বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে। আর ফাহাদকেও বলেছিলাম কারো সঙ্গে ঘুরতে। সত্যি কথা বলতে কি, একটা ছেলে আরেকটা ছেলেকে কতটা ভালবাসতে পারে তা পরীক্ষা করার জন্য এমনটা করেছি আমি। তোমাদের ভালবাসার কাছে আমার সব পরীক্ষা অকৃতকার্য হয়েছে। তোমাদের ভালবাসাই জয়ী। তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ দুজন দুজনকে ভালবাসি কথাটা বল একবার। আমি প্রাণভরে শুনতে চাই।

ফাহিম ফাহাদের হাত ধরে তাকে কাছে টেনে নিয়ে দুজনেই তাদের ভালবাসার কথাটা জানিয়ে দিল। পরে তারা আমার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। তাদের এই মিল দেখে আমার মনের মাঝে যেন একটা অজানা আনন্দ শির শির করে বয়ে যেতে লাগল। আমি জানিনা এ সম্পর্কের সমীকরণ কি হবে? শুধু জানি এ মিলন দুটি মনের পবিত্র ভালবাসার মিলন, দুটি মানুষের হূদয়ের অদেখা বন্ধন। তারা দুজনে হাতে হাত রেখে সবুজ গহীন অরন্যে এগিয়ে যাচ্ছে। তার আমি তৃতীয়পক্ষ হিসেবে পিছন থেকে তাদের শুভ্র ভালবাসার সাক্ষী হয়ে অপলক তাকিয়ে আছি এক হয়ে যাওয়া দুটো হাতের দিকে।
(গল্পের সব চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.