পিছুটান

ঘাসফড়িং

হাতঘড়িটার দিকে বার বার তাকিয়েই যাচ্ছি। আর চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে রাস্তার এদিক ওদিক দেখছি। এমন বৃষ্টি আর কখনওই দেখিনি আমি। এই বৃষ্টিও কি বুঝে গেলো নাকি আমার বিপদ। যার ফলে ইনিও আপদ হয়ে হাজিরা দিচ্ছে।

সকাল থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিলো। কিছুক্ষণ পর পর বিজলির সাথে বজ্রপাতে আওয়াজ দূষণ হতো, হয়েই যাচ্ছে এখনও। এখনতো আরও বেড়ে গেল দেখছি।মুষলধারে বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে।কোন কমতি দেখছিনা। কি করবো , ছাতা দিয়েও তো এই বৃষ্টি ঠেকানো যাবেনা। কুমিল্লা মেডিক্যালের পড়ুয়া ছাত্র আমি। এটা ছাড়া আর বলার মতো কিছু পাচ্ছিনা।আর থার্ড ইয়ারে পড়ছি এবার।মেডিক্যালে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হলাম আর আকাশ বাবাজিরও বুক ভরা কান্নায় চারিদিক ভাসিয়ে দেওয়ার সময় হল।আর একটু এভাবে বৃষ্টি হলে রাস্তাই মনে হয় পানিতে ডুবে যাবে। আমাদের মেডিক্যালের সব ছাত্র্ ছাত্রিই এই পথ দিয়ে চলাচল করে।একদম সেইফ একটা রাস্তা । বাসের টিকিট কেটে বসে আছি সেই কখন থেকে।

আমারই অপরাধ হয়েছে, বাড়ি থেকে অনেক দেরি করে বেরিয়েছি। এসেই দেখি আমাদের প্রত্যেকদিন সময়কার বাসটা ছেড়ে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত ফিরতি বাসটা আসছেই না। বেরিয়ে গিয়ে যে কোন্ও একটা ছিএনজিতে উঠবো সেরকম সুযোগটাও নেই। এত্ত বৃষ্টি যে আশে পাশের কিছু দেখাও যাচ্ছে না , ঘোলাটে লাগছে । আর তাছাড়া বিশ্ব রোডেও পৌছতে পারবোনা। কারণ এখান থেকে সেই রাস্তা খানিকটা দূরই বলা চলে। আর তাই এখন যাত্রী ছাউনিতে আমি আর কয়েকজন বাহিরের লোক বসে আছি। কলেজের কাউকেই দেখতে পাচ্ছিনা। দেখবোই বা কীভাবে ? সবাই তো চলে গেছে।

আমার সহ্য শক্তি খুব কম। খুউব……….। এমন মনে হচ্ছে যেন শরীরে কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।মাথা থেকে পা পর্যন্ত রক্ত একদম টগবগ করছে। এতোটা উত্তেজিত হওয়ার পিছনে অবশ্য কারণ্ও আছে।

মেডিক্যালে ফাইনাল টেস্ট পরীক্ষা।আজ্ই প্রথম পরীক্ষা।আর প্রথম দিনেই এত বড় বাঁধা ! ফার্স্ট ভাল যার সব ভাল তার। এই যা, মাথাটাই গেছে। মুরুব্বিদের প্রাচীনকালীয় প্রবাদ্ও ভুল বানিয়ে ফেলছি। কবে আবার ফার্স্ট ভাল যার, তার সব ভাল হলো? শেষ ভালো যার তারই না সব ভালো।

আমার বেলায় ফার্স্ট্ই হবে। আজ যদি পরীক্ষা কোন কারণে মিস হয় তাহলে

কি জানি হয় কে জানে? মনে হয় আমাকে তাড়িয়েই দেওয়া হবে। হাতের ফাইলটা নিয়ে দাঁতে দাতঁ কামড়িয়ে কপালে দুটো বারি দিলাম।

এবার আর থাকতে পারছিনা। চোখ দিয়ে জল্ই বেরিয়ে পড়লো দেখছি।

ভ্রম করে কোথা থেকে যেন একটা সাদা জীপ চলে এলো। একদম ধবধবে সাদা গাড়িটার রং। বৃষ্টিতে ভেজার ফলে আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে ।

গাড়িটা দেখে সাথে সাথেই দাড়িয়েঁ পড়লাম বসা থেকে। পা দুটোর গতি একদম বাড়িয়ে দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে এলাম। যাত্রি ছাউনিটার অনেকটা দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি।

গাড়ি তার কাচঁটা নামাচ্ছে দেখছি। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে বলেই হয়তো। সামনের অংশের আয়নাটা নিচের দিকে নেমে গেলো। হাসোজ্জল দুটি চোখ দেখা যাচ্ছে । ধীরে ধীরে সমস্ত মুখটাই পরিষ্কার হয়ে আমার সামনে ভেসে উঠলো। তিলকেরও কোন খুঁত দেখতে পেলাম না মুখটায়। চোখের পাপড়ি গুলো খুব লম্বা মনে হচ্ছিল । ভ্রু গুলো বোধহয় কি একটা যাদুবিন্দু ! এত মায়াবী দেখাচ্ছিলো। ছেলেটার ডাকে জেগে দেখা কি একটা স্বপ্ন্ই না যেন ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম।

তুমি কি মেডিক্যালে যাবে? প্রত্যাশিত একটা প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে ভারী মাথাটা ঝাকাঁলাম।

-তাহলে উঠে পড়ো।

যলদি করে ফাইলটা মাথার উপর দিয়ে যতোটা বাঁচা যায় বৃষ্টির কবল থেকে সেই চেষ্টা করে গাড়িতে উঠে পড়লাম।

ভাপটা ভাপটা লাগছে নিজেকে। কেমন একটা স্তব্ধ হয়ে গেলাম যেন।ছেলেটার প্রশ্ন শুনে কিরকম একটা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল নিজের মধ্যেই । মনে হয়ে যেন অপ্রস্তুত অবস্থায় কোন ইন্টারভিউ দিচ্ছি।

-কোন ইয়ারে পড়ছ?

-জ্বি থার্ড ইয়ারে।

-বাসায় কেন? তুমি কি বাসা থেকে আসা যাওয়া কর?

-হুম।

কে যেন উত্তর গুলো দিয়ে দিচ্ছে মনে হচ্ছে। কোথাও যেন ডুবে গেলাম। টেনে তুলা দরকার । বুদ্ধি থেকে শুরু করে একদম শক্তি পর্যন্ত সবকিছু এভাবে লোপ পেয়ে গেলো কেন কিছুই বুঝতে পারছিনা। ছেলেটি কথাগুলো বলছে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শ্রবন করে যাচ্ছি। দেখেই মনে হচ্ছে ভদ্র কোন ফ্যামিলির হবে। ছেলেটাকেও খুব ভাল মনে হচ্ছে । ব্যাক্তির কথার উপরও নাকি অনেক কিছু নির্ভর করে। আর আমি যতোই অপদার্থ হ্ইনা কেন চোখ দেখে অনেক কিছু বুঝে নেওয়ার মতো একটা পদার্থ আমার মধ্যে আছে।

-ও… তো তোমার নামটা কি ?

-জ্বি আমার নাম জিসান।

গাড়িতে হাত চালিয়ে যাচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর পর আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন গুলো করে যাচ্ছিল ছেলেটা। সাথে সামনের রাস্তার দিকেও নজর ফেলছিল।

আমার অস্থিরতা ক্রমশ বাড়তে বাড়তে এখন সর্বোচ্চ উচ্চসীমায় আছে।

মেডিক্যালের সামনে আসতেই ঢপ করে বেরিয়ে পড়লাম গাড়ি থেকে। দ্রূত গতিতে হেঁটে এগিয়ে যেতে লাগলাম।বারান্দায় কিছু ছাত্র ছাত্রী ঘুরা ফেরা করছে। এতোটা তাড়াহুড়োতেই ছিলাম যে ছেলেটাকে একটা ধন্যবাদও দেইনি। অনেক পিছনে ফেলে এসেছি।

আহারে… ! ছেলেটা কি না কি জানি মনে করে নিলো কে জানে? হয়তো আমারদিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল পিছন ফিরে ছোট্ট একটা ধন্যবাদ দেব বলে।পিছন ঘুরে দেখি গাড়ির গ্লাসটা উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।কিই বা করার ছিলো বৃষ্টি পড়ছে দাঁড়িয়ে ভিজতেও পারবোনা,তাই ছুট দিয়েই বৃষ্টি থেকে কিছুটা দূরে চলে এলাম।অন্তত ধন্যবাদ টুকুও তো দেওয়ার উচিত ছিল।

ফিরে দৌড়ে যেতে যেতেই গাড়িটা স্টার্ট হয়ে গেলো।

কি একটা বাজে কাজই না হলো।ছেলেটা এতবড় একটা উপকার করলো আর আমি কিনা একটা ধন্যবাদ পর্যন্তও দিলাম না! ছি!নিজেকেই গালি দিতে লাগলাম।

-কি রে,আজ এভাবে ভয় পেলি যে!

-ক্ই?আমি আবার কখন ভয় পেলাম।

-তুই না।চাপা মেরেই জিততে পারবি। আর কিচ্ছু লাগবেনা।অপারেশন থিয়েটারে মৃত ব্যক্তির দেহের কিছু অঙ্গ জীবন্ত কোষের ফলে নড়ে উঠে আর তুই তা দেখে ভয় পেলি।

নিলয়,আমার সবথেকে কাছের বন্ধু।ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার পথে কথা বলতে বলতে হাঁটছিলাম।গাড়িতে উঠার পরও আমার মুখ থেকে সেরকম কোন কথাই বেরচ্ছেনা।নিলয় নিজে নিজেই বকবক করে যেতে লাগলো।আমাকে চুপ দেখে ধাক্কা মেরে জিজ্ঞেস করতে লাগলো আমি এমন অদ্ভুত নীরবতা পালন করছি কেনো। কি আর বলবো,মাথাব্যথা করছে বলে কাটিয়ে দিলাম।কিন্তু আমি তো জানি সত্যটা।

-এই জিসান!এই?

-হ্যাঁ বল।আমি কি কালা নাকি রে। শুনছি তো।

-ক্ই শুনতেছোত?আমি তোকে কিছু জিজ্ঞেস করছিলাম।বল দেখি কি জিজ্ঞেস করেছি।

ঢিপ মেরে গেলাম।ভিতরে ভিতরে প্রচন্ড হাসি পাচ্ছিল।কি বলব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

-হয়েছে।আর মিছে কথা কওয়া লাগবেনা আপনার।

-আচ্ছা বল।কি জিজ্ঞাসা করছিলি।

-মেডিক্যালে আসলি কি করে?তুই তো বাড়িতেই ছিলি।যখন আমরা বাসে।তোকে ফোন দেওয়াতে সেই সময় বললি যে তোরা যা।আমার লেট হবে।

-ও।হ্যাঁ,চলে গিয়েছিলাম।ফিরতি বাসে।

-ফিরতি বাসে মানে?দ্বিতীয় গাড়িতে করে গেলি কিভাবে?সেটা তো আমাদের মেডিক্যালের সময়সীমার বাইরে।মানে আরো আধঘন্টা পরে আসে সেই বাসটা।

-আরে এসেছিল।তোর কি হলো আমি বুঝতে পারছিনা।যেভাবে খতিয়ে দেখছিস মনে হয় পাত্র দেখতে এসেছিস।

-আমার কিছু হয়নি।বল তোর কিছু হয়েছে।তোর পাশের সিটে বসতে আমার ভয় লাগে।তোর বাচালপনা যে কাউকেই পাগল করে দেবে।এত্ত বেশি কথা বলিস তুই।আর আজ তুই এতো চুপচাপ!

-কেন কি হলো।এটাই তো ভাল।তুই না সবসময় বলিস,”তুই চুপ করবি।এতো কথা বলিস কীভাবে?আমাকে তো পাগল করে দিবি।”তাহলে তো আজ তোর খুশি হওয়ার কথা।

বলেই হো হো করে হেসে উঠলাম।

-আচ্ছা যা!বলার দরকার নেই।তোর যদি সত্যিই মাথাব্যথা থাকে তাহলে আমার কাছে নাপা আছে।খেয়ে নে তবুও আমার কাছ থেকে কিছু লুকোবিনা।

খচখচ করে নিলয় তার ব্যাগের সাইড পকেট থেকে একটা ট্যাবলেট বের করলো।

হায় হায়!এবার কি তাহলে এই ট্যাবলেটটা খেতে হবে।শুধুমাত্র একটা কথা ঢাকার জন্য!

-আরে তুই এসব কি করছিস।এই ওষুধ লাগবেনা।আমি বাচাল নই।আমার মনে হচ্ছে তুইই বাচাল।এত অস্থির হচ্ছিস কেন কিছুই বুঝলাম না।

-তোর না মাথাব্যথা!নে ধর,ট্যাবলেট টা খেয়ে নে।

পিছনের,সামনের,পাশের সিটের লোকগুলো সেই কখন থেকেই আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল।মনে হচ্ছিল যেন এখনই ধমক দিয়ে থামিয়ে দেবে আমাদেরকে।এবারও দেখলাম কিছু লোক ড্যাব ড্যাব করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।অগত্যা মুখে পুরে দিলাম ট্যাবলেট।নিলয়ের হাত থেকে ঝাঁকুনি মেরে বোতল থেকে পানি খেয়ে নিলাম।

আচ্ছা ছেলে মনে হয় নিলকে।প্রকৃতপক্ষে আমার খুব কেয়ার করে নিলয়টা। অন্যকোন বন্ধনে আমাদের বন্ধুত্ব পা দেয়নি।সেই ইন্টার থেকে একসাথে পথচলা আমাদের।কাঁধের উপর চেপে বসে একসাথে জীবন পার করেছি।হাসির কথা তাইনা!

হুম,কাঁধের উপরই।

অগনিত রাতে আমরা এভাবে রাস্তায় ঘুরেছি।পর পর একে অপরকে কাঁধে চড়িয়ে দীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দিয়েছি।

গাড়ি স্ট্যান্ডে চলে এসেছে।হুরহুরি দিয়ে একে একে গাড়ি থেকে নেমে যাচ্ছে।আমি আবার সেই আগের মতোই সিটে বসে আছি।নিলয়ের ধাক্কায় বাস্তবে ফিরে এলাম।

গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে এগোচ্ছি।বাসায় ফেরার তাগিদেই হেঁটে চলছি।বেখেয়ালী পথ চলাটা যে বিপজ্জনক সেটা একটা সাইকেলের আঘাতে বুঝতে পারলাম।

-এই তোর হইছেটা কি?

পায়ের দিকে তাকিয়ে ব্যথায় আহ উহ করে উঠছি।

-আরে! কিছুই না।

-হুম।আর তাই ওই সাইকেলের চাকা তোর পায়ের উপর দিয়ে যায়!

নিলয়ের প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারবনা।একটা মুখ আমার পথচলা এভাবে স্থগিত করে দিয়েছে।এতোটা উদাসীন করে দিয়েছে আমাকে।ঘোর লাগিয়ে দিয়েছে আমার মধ্যে।কিন্তু আমি তো নিজেকে পাল্টে নিয়েছি অনেকটা।আমি খুব আবেগী ছিলাম অতীতে।ইমোশনাল যে কষ্টের মাত্রা বাড়ানোর অন্যতম উপায় তা অনেক আগেই টের পেয়েছি।যার ফলে নিজেকে বাস্তববাদী করতে শিখে গেছি।আগে এরকম কাউকে দেখলেই ক্রাশ খেতাম।রাস্তায় বেরোলে দু-তিনটা ক্রাশ একদম অনিবার্য থাকতো আমার জন্য।কিন্তু গত দুবছর ধরে শুধরে নিয়েছিলাম পুরোপুরি।এখন আর আগের মতো এমন ডুবে যেতাম না।ক্রাশই আমাকে দেখলে ভয় পেত।কিন্তু আজ কি হল?এমনটা হলো যে!

ছেলেটি যখন গাড়িটা হ্যান্ডেল করছিল তাকিয়ে ছিলাম ছেলেটার প্রশস্ত সেই বাহুদ্বয়ের দিকে।শার্টের পর্দা ভেদ করে মনে হয় বেরোতে চাইছে মজবুত সেই পেশি।পুরো সিটটা জুড়ে সেই সুদর্শন চওড়া বুকটাই দখল করে নিয়েছিল। মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি ছিলো।যা আমার সবচাইতে দুর্বলভাললাগার স্থান।দীর্ঘ একটা নাসিকা। এত সুন্দর করে স্রষ্টা তার সৃষ্টিকে রূপ দেয়!

বিস্মিত দুটো চোখ ছিলো, হাজার বছর ধরে চেনা; ঠিক এমনই মনে হচ্ছিল । ইচ্ছে করছিল ঠোট দুটো ছুঁইয়ে দেই চোখের পাতায়।এতোটা আবেগ আপ্লুত হয়ে যাচ্ছি কেন বার বার? চোখগুলোতেই কি আমার সর্বনাশ লুকিয়ে আছে !

“প্রহর শেষে রাঙা আলোয় সেদিন চৈত্রমাস,

তোমার চোখেই দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।”

এতটা অতিক্রম হলো কেন নিজের মধ্যে , বুঝে উঠতে পারছি না।সংযত করে নেওয়ার ক্ষমতা তো আমার আছে। নিজেকেই আজ খুব অচেনা মনে হচ্ছে।

-কি হলো?ভাত খেতে আয় ।

-আসছি আপু।তুমি যাও।

-না চল।সেই কখন থেকে তো বলেই যাচ্ছিস ‘আসছি আপু , তুমি যাও।’ এখনও গিয়েছিস!

-আহা আপু , আর একটু।এইতো শেষ হলো বলে।

-এত পড়ে কি করবি ?রাতদিন পড়ালেখার চাপ মাথা থেকে না কমালে তোর ব্রেইনে আঘাত হানতে পারে।

বলেই আপু হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। পড়া অসম্পূর্ণ রেখেই টেবিল থেকে উঠে গেলাম।ইনি আমার আপু।আমার অস্তিত্ব জুড়ে যার বসবাস।আমিও আমার আপুর দুচোখের মনি।সবচাইতে কাছের বন্ধু , কাছের মানুষ , অতি নিকটে যে ব্যাক্তিটির স্থান তিনি হলেন আমার এই বোনটি। আমাকে একা ফেলে কখনও ভাতের লোকমা মুখে তুলেছে বলে মনে হয়না। এতো ভালবাসা আমার জন্য আজীবন শেষ হবে বলেও মনে হয় না।শেষ করতে চাইলেও শেষ করতে পারবেনা।আমার পেট থেকে পিঠ পর্যন্ত সবকথা তার আয়ত্তে।এমন কিছু নেই আমার সম্পর্কে যে আপু এখনও সে সম্বন্ধে অনবগত।

টেবিলে বসে খেতে খেতে বাবা চলে এল।

মার তো এক প্রশ্ন্ই থাকবে,এতো দেরি হলো যে।

আমাদের পরিবার ছোট্ও নয় আবার বড় পরিবারও বলা যায় না।আমি আর আমার বোন, আর বাবা-মা। পুরো কুমিল্লায় সেনানিবাসের ত্রিসীমানায় এমন কোন লোক নেই মনে হয়, যে সিরাজ চৌধুরী নামে আমার বাবাকে চিনে না।বাবার অনেক বড় ব্যবসা।সমস্ত জেলার মধ্যেও ধরা যায়,সবচাইতে উন্নতমানের হার্ডওয়্যারের মালামাল আমাদের দোকানে পাওয়া যায়।অতিরিক্ত বেচাকেনা হয়।পাইকারি মালামাল বিক্রয়ের মধ্যে আমাদের দোকান্ই সেরা।নিজের সম্পর্কে বেশি কিছু আমি কখনোই বলিনা।আমার সম্পর্কেও বেশি এগোইনা।কারণ আমি নিজ গুন সম্বন্ধে আত্মবিশ্বাসী নই।তারপরও আজ অনেকটা বলে দিলাম দেখছি।

বাবাকে খুব শ্রদ্ধা করি আমি।সাথে মাত্রাতিরিক্ত ভয়ও পাই।কিন্তু মায়ের বেলায় ঠিক উল্টো।তবে মায়ের প্রতি আমার অফুরন্ত ভালবাসা।কতসব ভাবনার জালে পেঁচিয়ে যেতেই বাবার ডাকে ছুট পেলাম।

-কিরে,ভাতের প্লেটে কি আকঁছিস এসব! খা।

-হুম।খাচ্ছি।

মা এনে আরোও তরকারি ঢেলে দিলো প্লেটের মধ্যে।আমি হা করে মার দিকে তাকালাম।মা মুখের ইঙ্গিতে বলতে লাগল, নে খা।

-তুমি এটা কি করলে?আমি তো আর খেতে পারবোনা।

-কেনো?বেশি খেয়ে ফেলছিস নাকি !

বলেই আপু হেসে উঠলো।

খাওয়া শেষে ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম।

এই সময়টাতে আমার অনলাইনে ঘাটাঘাটি করাটাই কাজ।মেডিক্যালেও তেমন একটা চাপ দেখছিনা।তাই অনলাইনেই পড়ে থাকি দিনের এক-প্রথমাংশ।ফেইসবুকে আমার একটা আলাদা জগত আছে।যেখানে আমি আমার অব্যাক্ত ভাললাগার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি।বুকের গন্ডিতে এসে দলাপাকানো সব ভাবাবেগ মুক্ত করে দিতে সক্ষম হই।কিছু লেখালেখি করি নিজের ফেইসবুক ওয়ালে।

ছোট্ট অনুচ্ছেদের ন্যায় হঠাত্ হঠাত্ কখনো চিরকুট লিখে বসি অজানা কারো উদ্দেশে।আবার কখনো কবিতা লেখি বসি ধ্রুব তারার প্রেমের কাহিনি নিয়ে। এর মাঝেই খুঁজে ফিরি নিজেকে। যে চে কারো সাথে কথা বলাটাও আমার অপছন্দ।এখানে বাস্তব জীবনের সাথে খাপ খাওয়ানো কেউ নেই।এটা ভার্চুয়াল জগত।শুধুমাত্র চ্যাটেই সীমাবদ্ধ থাকে যার পথচলা।ফল,

সম্মুখ জীবনের অলি-গলির কারো সাথে পরিচিত হওয়া আর এই ভার্চুয়াল লাইফে হৃদয়ের সবকথা উজাড় করে দেওয়ার সমান।তবুও মুখোমুখি পরিচয়ের সম্পর্ক ভার্চুয়াল জগতের উপরোক্ত সম্পর্ক থেকেও আরো অটুট।

তাই কারো সাথে পরিচিত হওয়ার কথাও মাথায় আনিনা।

-আজ তোমাদের একজন নতুন মুখের সাথে পরিচয় করিয়ে দেব।’সৌরভ’ আজ ট্রান্সফার হয়ে আমাদের কুমিল্লা মেডিক্যালে এসেছেন।

তোমাদের সিনিয়র স্টুডেন্ট।এবার ওর মেডিকেলে শেষ ইয়ার।

আমাদের স্যার এসব বলতে বলতেই সেদিনের সেই চেনা মুখটা আমাদের সামনে এনে ভাসিয়ে তুললেন।আচমকা এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে বুঝতেই পারিনি।শরীরটা ক্রমাগত ঘাম দিচ্ছে কেন জানি! আমি কোনদিক ফিরে দাঁড়িয়ে আছি সেটাই স্থির করতে পারছিনা।দিক্বিদিক অন্ধকার দেখতে লাগলাম।সবার সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে আমার পালা আসতেই কি হলো বুঝতে পারলাম না।কার কোলে জানি ঢলে পড়ে গেলাম।

জ্ঞান ফেরার পর অচেনা সেই মানুষটার কোলে আবিষ্কার করলাম নিজেকে।উষ্ণ তাপে ভিজে আছে কোলটা।গায়ে একটা নেশা ধরানো গন্ধ মিশে আছে। ঘোরলাগা সেই পারফিউম বেহুঁশ করাতে যথেষ্ট।যে কাউকে নয় , আমাকে।

ভাললাগার একটা আবেশে জড়িয়ে যাচ্ছিলাম।চোখ খুলে দেখি

এখনও পানি দিয়ে যাচ্ছে নিলয়।

-এই কিরে, আমাকে কি পানিতে ডুবিয়ে দিবি নাকি?

হতভম্ব হয়ে ওনার বন্দিদশা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম।ব্যাচ ভর্তি স্টুডেন্টস সব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । লজ্জা বোধ হলো নিজের মধ্যে। আমাদের শ্রদ্ধেয় ভাজন জাকির

স্যার এগিয়ে আসলেন আমার দিকে।

-জিসান , কি হলো তোমার? অসুস্থ থাকলে মেডিক্যালে না আসতে।

এতোটা ঝুঁকি নিয়ে কে আসতে বলল!

-না স্যার । আমি ঠিক আছি। তবে হঠাত্ কি হল বুঝতে পারলাম না। মাথাটা গতানুগতিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ ভেদ করে ঘুরার ফলে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।

এই যা ! এটা কি বলে দিলাম । এখন যদি স্যার জিজ্ঞেস করে বসে মাথা কেন ঘুরলো তোমার ? মনে মনে ভেবে নিজেই নিজের জিভ কেটে দিলাম।

কিন্তু না , স্যার তেমন কিছুই বললেন না।

-হুম , একেই তো অসুস্থতা বলে। ওকে। তুমি আজ বাড়িতে চলে যাও। এ অবস্থায় এখানে এটেন্ড করার প্রয়োজন নেই ততটা। বাসায় চলে যাও।

-জিসানকে বাসায় দিয়ে আসবে কে?বলতে বলতে স্যার কার দিকে যেন আঙুল তুলার ইতস্তত করছিলেন।

হঠাত্ সৌরভ গলা ছেড়ে বলে উঠল।

-স্যার আমি জিসানকে বাসায় পৌছে দিচ্ছি।

-হ্যাঁ যাও। আমি তোমাকেই বলব ভাবছিলাম।

নিলয় এগিয়ে এসেছিল । কিন্তু ওর কাজটা সৌরভ কেড়ে নেওয়াতে পিছু হটলো সে। মুখে বিষন্নতার ছাপ একে গেল।

-ফ্যামিলিতে কে কে আছে তোমার ?

-এই , বাবা-মা আমি আর আপু। আপনার ?

-আমার পরিবারে আমি আর বাবা মা।

-ও… তাহলে একমাত্র সন্তান ?

-হুম। সেরকমই ।

– তো আপনার বাবা কি করে বললেন না তো!

-বাবা প্রফেসর। মা-ও প্রফেসর।

অবাকচিত্তে কপালে ভাঁজ পড়ে গেল আমার।

-ও.. তাহলে প্রফেসর+প্রফেসর= ডক্টর ।

-বুঝলাম না। মানে কি?

-এতে না বুঝার তেমন কিছুই নেই। ওকে? মানেটা হলো প্রফেসরদ্বয় বাবা-মা উভয়ে একত্রে সন্তানকে ডক্টর বানাচ্ছেন ।

হো হো করে হেসে উঠলো সৌরভ।

আমি আড়চোখে সেই হাসিটায় নজর দিচ্ছি।

-আর তাই তুমি বললে প্রফেসর+প্রফেসর=ডক্টর ? তুমি তো খুব হাসাতে পারো। আচ্ছা এই যে আমি তোমাকে তুমি করে বলে যাচ্ছি তাতে তুমি মাইন্ড করছো?

-আপনি আমার সিনিয়র। তুমি বলাটাই উত্তম ।

গাড়ি চালাতে চালাতে এসব জিজ্ঞাসা করছিলো সৌরভ। আর কিছুক্ষণ পর পর আমার দিকে তাকাচ্ছিলো।

-আচ্ছা আপনি থাকেন কোথায় সেটা এখনও জানা হলোনা।

অতঃপর তার মুখ থেকে শুনলাম।

ব্রাহ্মন বাড়িয়ায় থাকেন। সিলেট মেডিক্যাল থেকে অনেক টাকা ব্যায় করার পর কুমিল্লাতে ট্রান্সফার হয়ে এসেছেন।

যেন বাবা মার আশপাশেই থাকেন।

আর এতেই পরিষ্কার হচ্ছে যে ধনীর দুলাল।

হঠাত্ সেদিনের কথা মনে পড়তেই লাফিয়ে উঠলাম।

-আর একটা কথা। আপনাকে সেদিন বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।থ্যাংক ইউ।আপনি সেদিন যদি গাড়ি নিয়ে না আসতেন তাহলে দজ্ঞজজ্ঞ একটা ব্যাপার ঘটে যেত।

আচ্ছা এই গাড়ি কার? আপনাকে সেদিন্ও দেখলাম এই গাড়িটাই ড্রাইভিং করছেন।

-ও। এই গাড়ি আমারই। এখানে কলেজ হোস্টেলেই এসে উঠেছি। আর এই গাড়ি নিয়েই ব্রাহ্মন বাড়িয়ায় মাঝেমধ্যে যাতায়াত করি।

কথা বলাকালীন সময়টা কীভাবে কেটে যায় টের পাওয়া যায় না। আর আমাদের বাসা থেকে মেডিক্যাল ততটা দূরেও নয়।

-থামান থামান। বাসার কাছে এসে পড়েছি।

কর্কশ আওয়াজে গাড়ি থেমে গেল। নেমে গেলাম গাড়ি থেকে। গ্লাসের ফাঁক দিয়ে একটা হাসি দিয়ে বিদায় নিলাম সৌরভের কাছ থেকে। মুচকি একটা হাসি ফোটে উঠলো তার মুখে।

সেই হাসি আমার মুখেও প্রষ্ফুটিত হচ্ছিল। আপুর দুষ্টুমি মাখা প্রশ্নে তা টের পেলাম।

-কিরে? আজ খুশি খুশি লাগছে।

-ক্ই। কিছু না তো। হাসবোও না নাকি !

আমার কিছুই আপুর অজানা নয়। আমার সবকথার সাক্ষী আপু। খুব ভাল বন্ধু যেরকম হয়। কিন্তু আমার ভেতরের সেই গোপন নিষিদ্ধ সত্ত্বার কথা আদৌ সে জানে না। যার ফলে আমি এখনও একটা অস্থিরতায় ভুগি। ভারি পাথর চাপা যন্ত্রণায় ভুগি ।

রাতের খাবার শেষে বিছানায় এসে ধপাত করে শুয়ে পড়লাম। গাড়িতেই নাম্বারটা চাইতাম।কিন্তু এরকম অভ্যাস তৈরি করিনি।গায়ে পড়ে সৌরভের থেকে নাম্বার চাইতে ছোট মনে হচ্ছিল নিজেকে।কেন,ওনিও তো চাইতে পারতেন।

তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিলাম। সারাদিনের ব্যস্ত দুচোখ একটু বিশ্রামের খুজঁ করছিলো।হঠাত্ করেই ফোনের স্ক্রিনে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসলো।আমি বড্ড ঘুম কাতুরে।আবার অত্যাধিক কৌতহুলীও।আর তাই অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসাতে ঘুম দুচোখ থেকে সরে গেল।ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা পরিচিত কন্ঠে ভেসে এলো -‘হ্যালো’।

ফোন রিসিভের প্রথমেই সালাম দিয়ে জবাব চাইলাম, আমার স্বাভাবিক যেই অভ্যাস।

-হ্যালো কে বলছেন?

-হ্যালো জিসান, আমি তাজুল স্যার ।

-ও স্যার আপনি! কেমন আছেন ?

-এইতো ভাল্ই।তোমার খবর কি?

-মোটামুটি।তো স্যার আপনি এখন কোথায়? আমেরিকায় ?

-না।নাম্বার দেখতে পাচ্ছো না।

লজ্জায় গলার আওয়াজ ভেঙে এলো।

-ও হো। স্যার খেয়াল করিনি। তা দেশে ফিরলেন কবে?

-এই গত পরশুই।তোমার সাথে দেখা করবো ভাবছিলাম।কিন্তু ঝামেলায় পেঁচিয়ে যেতে আর সেটা হয়ে উঠছেনা। তোমার মেডিক্যালের কি অবস্থা ?

-আছে।ভালোই চলছে।স্যারের ফোন করাতেই হতবাক বনে গেলাম। আমার বাবার খুব ভাল বন্ধু । আর আমাদের মেডিক্যালের অতি আপন একজন ডাক্তার ছিলেন। গভর্মেন্টলি ভাবে এখন আমেরিকায় আছেন। আমার প্রতি স্নেহের মাত্রাটা বরাবর হয়তো বেশিই ছিলো। আর তাই দেশের বাহিরে থাকাবস্থায়্ও খোঁজ নিতে ভুলেন নি।

স্যার সবসময়ই বলেন, আংকেল কেন বলি ওনাকে? কিন্তু আমি সেই ডাকটাই উপেক্ষা করতে পারিনি। মেডিক্যালে স্যার বলাতে স্বাভাবিক অবস্থায়্ও তাই বলি।

-হুম। স্যার বলাটা আর গিলতে পারলেনা।

বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন স্যার ।

-আচ্ছা তোমার ফ্যামিলির সবার অবস্থা কেমন?

-ভালোই স্যার । আপনার মামনির শরীর কেমন?

-আমার মামনি তো সবসময় তোমার চিন্তাতেই ব্যস্ত থাকে। আবারও খিলখিল করে হেসে উঠলেন স্যার । সাথে আমিও আমার হাসি দমিয়ে রাখতে পারিনি। ফেটে পড়লাম প্রচন্ড হাসিতে।

স্যারের মেয়ে । ওনার সাথে এখন আমেরিকাতেই থাকেন। আর ওকেই স্যার সবসময় মামনি বলে ডাকেন। খুব আহ্লাদের তো তাই।প্রায়শ্ই আমাদের বাসায় আসতো রিয়া। স্যারের মেয়েটার নাম রিয়া। আমার খুব ভাল লাগতো এই নামটি। আর তা একদিন তাকে বলাতেই তার মুখখানা একদম কমলালেবুর মতো ফুলে উঠলো। সমস্ত মুখটায় কেমন লজ্জার লাল রঙ একে গেল। আমি আর আপুও স্যারের মেয়েকে এইভাবে কুয়ারা করে ডাকি। কিন্তু মেয়ে তো ডিঙিয়ে গেছে আমাদের সবাইকে। এবার মনে হয় ইন্টার কমপ্লিট করেছে। মাঝে মাঝে আমাকে আর স্যারের মেয়েকে নিয়ে খুব রসিকতা করেন স্যার । ওনার ভিতরে কি মতলব আছে তা টের পাওয়া অবশ্য খুব মুশকিল। আমার প্রতি স্যারের স্নেহ, মমতা আর ভালবাসা সবার থেকে উর্ধ্বে। সেটা অবশ্য অনেক আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছি। আর তাই স্যার প্রকারান্তর আমার বাবার মতোই।

স্কলারশিপের কথা বলেছিলেন তিনি। ওনাদের ওখানে প্রায় বছরই সরকারি ফাউন্ডেশন কর্তৃক বিভিন্ন দেশের জন্য সেই স্কলারশিপ আয়োজিত হয়।

আমাদের মেডিক্যাল কলেজ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সবগুলো মেডিক্যাল কলেজেই এই স্কলারশিপ অনুষ্ঠিত হয়। আমাকে প্রায়্ই বলেন, আমি কেনো তাতে অংশগ্রহণ করিনি গত বছর। কিন্তু আমার ভিতর কিসের যেনো একটা ভীতি কাজ করে। হয়তো ভাবি টিকবো না, আর নয়তো অন্যকিছু । তবে ঠিক আন্দাজে নিতে পারিনা। এবার মেডিক্যালে আমার দ্বিতীয় বছর চলছে। স্যারের কথায় বুঝলাম ওনি এবারের কম্পিটিশনে আমাকে অত্যধিক চাপ্ই দিচ্ছেন । স্যারের এরকম শাসন্ই বলে দেয়, আমার প্রতি ওনি কতটুকু দায়িত্বশীল।

-এবার কিন্তু অবশ্যই তুমি এতে উপস্থিত থাকবে। আর তুমি কি অবুঝ ! তোমাকে এত কেন বোঝাতে হয় আমি নিজেও জানিনা।

গলার স্বরটা উপদেশ আর অনুরোধের মিশ্রণে মিশ্রিত হয়ে যায় । স্যার বলতে থাকে,

-তুমি যদি ভাল একটা পজিশনে না দাঁড়াতে পার, লেখাপড়ার মতন্ই লেখাপড়া না করতে পারো তাহলে তুমি তো সবার মত্ই সাধারণ কেউ হয়ে গেলে! কিন্তু আমি চাই তুমি অন্যতম একজন হ্ও। আর সেই প্রতিভা তোমার মধ্যে খুব বেশিই আছে।

অধিক অবজ্ঞা স্যারের প্রতি ঘৃনারই বহিঃপ্রকাশ ধরে নিতে পারেন তিনি। স্যার তো আমার ভালর জন্য্ই বলছেন । আর সাথে আমার বাবা মা থেকে শুরু করে সবাইই চান আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যত্। সুতরাং আমিও অনুমতি দিলাম।

পূর্বকার ক্ষণে তেমন একটা পিছুটান অনুভব করতাম না। কিন্তু এখন মনে হয় থেকে যাবে। কিন্তু কে সে? সৌরভ?

-কনগ্রাচ্যুলেশনস ।তোমাকে বলেছি না, তুমি দাও। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তুমি স্কলারশিপ পাবেই। দেখলে তো!

চারদিকে শুধু কনগ্রাট-কনগ্রাটে মাতিয়ে তুলছে সবাই ।

-স্যার আপনার অবদানেই সব।

বাসাভর্তি কলরব। মা রেফ্রিজারেটর থেকে মিষ্টি নামিয়ে এনেছেন খানিকক্ষণ হয়েই গেল । সবার মুখেই গজগজ করছে। আপু মনে হয় সবথেকে বেশি প্রফুল্লিত হয়েছে। তাজুল স্যারের অনুরোধ বা আদেশ বলি সেই মোতাবেক হারমোনিয়াম নিয়ে মেঝেতে বসে পড়েছে আপু। আপুর গানের গলা খুব ভালো।স্যার আমাদের বাসায় আসলেই একটি গান শুনাই চাই আপুর মুখ থেকে।

টনটনে গলায় আপু সুর ধরলে আমি তবলা নিয়ে বসে পড়তাম। কিন্তু আজ দেখছি তবলা তাজুল স্যারের দখলে। সবাই তো অবাক ! আরো অবাক হলাম প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বাজকের বাজানোতে। স্যার এরকম তবলা বাজানো কোথা থেকে শিখলো বাসার সবার মুখে রটে গেল।আমি অবশ্য বাবার কাছ থেকে শিখেছিলাম ।

সবথেকে বেশি গর্বিত মনে হচ্ছে বাবা আর মা-কে। আনন্দে বুকের ভেতর কেমন একটা চাপা শ্বাস নিচ্ছিলাম। খুব খুশি লাগছে।আর এত কিছুর পিছনে আমার স্কলারশিপ এতটা ভূমিকা পালন করছে।

মেডিক্যালে আসার পর সবাই আমাকে একটা আলাদা আগ্রহ নিয়ে দেখতে শুরু করল। মনে হলো যেন নতুন কাউকে দেখছে। আগের জিসান আর নেই।

তবে দুটি মুখে কিছুটা কালো মেঘ অন্ধকারে ছেয়ে দিচ্ছিল মনে হচ্ছে । নিলয় তো আমার পরম কাছের বন্ধু । তার স্বাভাবিক ভাবেই এরকম হবে। খুব কাছের একজন মানুষ তাকে ছেড়ে চলে যাবে বলে মনে হয়। কিন্তু অপরজনের বিষণ্ণতাটা কেন জানি আমাকে খুব আঘাত করছে। সুখের আঘাত। আমি তো এটাই চাইতাম। আমি যতটা ভালবাসি তাকে ঠিক আমার ভালবাসার অনুরূপ বিন্দুমাত্র বাসলেও আমার অতৃপ্ত আত্মা প্রশান্তি লাভ করবে।

সৌরভের চোখ গুলো ছলছল সম্পন্ন ছিল। আমার দুচোখ বেয়ে জল বেরিয়ে এসে পড়েছে ক্ষণ হবে।

-তোকে অসম্ভব মিস করব। ফোন করে খোঁজ নিস। বিদেশি হয়ে গেলে তো পাল্টে যাবি!

-আরে এসব কি বলছিস ! তোর কথা মনে পড়বে না তো কার কথা পড়বে বল? তোকে নিয়মিত ফোন করব আমি।

নিলয়ের সাথে কথা বলতে বলতে মেডিক্যাল থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম ।

অদ্ভুত একটা টান পিছনের দিকে ঘাড় টেনে দিচ্ছিল। মেডিক্যালের বারান্দায় বারবার নজর ছুড়ছিলাম। সৌরভকে দেখা যায় কিনা । কিন্তু আমার টান কি এতটাই ভিত্তিহীন ছিল? সে কোথায় ?

বারবার পিছু ফিরছিলাম আর সামনে পা বাড়াচ্ছিলাম। কয়েকবার নিলয়ের প্রশ্নের ধাক্কাও খেলাম। ইতিউতি করছি কেন।

গাড়িতে উঠে পড়লাম।

সাদা এপ্লোনে এটা কে?

গাড়ির জানালা দিয়ে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে ।

আড়ালে! খুবই আড়ালে। দেখা যাচ্ছিল আমার ভালবাসার ছায়ামূর্তি। আড়ালে ছিল কেন সে, ভয়ে, নাকি সংকোচে?

কিন্তু সংকোচ থাকবে কেন তার ভেতর। আমার চোখের ভাষা কি সৌরভ বুঝতে পারেনা! আমি তো তার হৃদয়ের কথা পর্যন্ত্ও পড়ে নিয়েছি। আমি বহির্মুখী ,কিন্তু ভালবাসার অন্তর্মুখী দুটি চোখ দিয়ে ।সৌরভ কেন তা পারছেনা।

নাকি আমার মঙ্গল কামনাই রয়েছে এর পেছনে।যেন আমার পিছুটান না থাকে। যার ফলে আমার আমেরিকা যাওয়া নাও হতে পারে । বুক ফেটে নাছোড়বান্দা দুঃখ গুলো বেরিয়ে আসতে চাইছে। সমস্ত আবেগ, যন্ত্রণা , ভালবাসার গুল্মগুলো গলায় এসে দলাপাকিয়ে যাচ্ছে ।

অসহায় অশ্রুবাষ্প হয়ে হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে । কেউ দেখতেও পাচ্ছে না। ভেতরের কষ্ট গুলোও এভাবে মিশে গেছে চোখ থেকে প্রবাহিত ধারার সঙ্গে। তাই এই কষ্ট বোঝে নেওয়া কারো সাধ্য নেই। এটা একান্তই আমার । আমার নিজস্ব।

কাল হয়তো চলে যাব। দূরে কোথাও। হয়তো বলছি কেন? আজব মনে হচ্ছে তাইনা ! আসলে কালকের ভরসা দেবার মত কেউ নেই।

বিপরীত দিকে মার চোখগুলো ক্রমশ কেমন যেন লাল হয়ে যাচ্ছে । অথচ কাল এই মুখট প্রস্ফুটিত ছিল। খুব।

আপুকে তো ঘর থেকে বের হতেই দেখতে পাচ্ছিনা। শুনেছি পুরুষদের মন কঠিন হয় অধিকন্তু । সেই তুলনায় নারীরা ঠিক উল্টো হয় নাকি! আর তাই মা-বোনদের নারিতে আঘাত করছে আমার চলে যাওয়া । বাবা ঠিকই আছে। হয়তো নেই।

তবে চাহিদার বশত হয়ে তাকে পড়ে থাকতে হচ্ছে ব্যবসার ললাটে। অবশ্য এ নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই।

মার ঘরে উঁকি দিলাম। কিসের নামাজ পড়লেন? এখন কোন নামাজের সময় হলো! তাও কি ভুলে যাচ্ছি নাকি। পরে সময় করে দেখে নেব এখন নামাজের ওয়াক্তটা ঠিক কিসের! নাকি নফল পড়েছেন কে জানে। নফল পড়তে তো নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়না।

আপুর ঘরে দরজা বন্ধ কেনো?

বালিশে মাথা ঠুকে কাঁদছে হয়তো।

ছাদে এসে দাড়িঁয়ে আছি।চারদিকে নিস্তব্ধতা। থমথমে একটা পরিবেশ ।সুনসান নীরবতা চারপাশে । কিন্তু হালকা চৈতী একটা বাতাস ব্ইছে। শরীর জুড়িয়ে দেবার মতো। কয়টা বাজবে ,হয়তো ১১টা কিংবা ১২টা। পকেটে হাত ঢুকিয়ে কার্নিশ ধরে শূন্যের দিকে তাকিয়ে আছি।অনেক দূর পর্যন্ত যতটুকুই দেখা যাচ্ছে সেটুকু রাস্তার ল্যামপোস্টের আলোতেই স্পষ্ট হয়ে আছে।দুয়েকটা কুকুর কিছুক্ষণ পরপর ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠছে।আচ্ছা কুকুরদের কি ঘুম পায়না?তারা এতো রাত পর্যন্ত্ও যে বাইরে ঘোরাঘুরি করছে! আর এভাবে হুঙ্কারই বা দেয় কেন? কিছু কি দেখতে পায় কুকুর গুলো?

ছোটবেলায় মার মুখে শুনেছিলাম ভূত-প্রেত চোখে পড়লে নাকি কুকুরদের হাক-ডাক উঠে পড়ে।কিন্তু সেরকম হাক-ডাক তো নেই।তাহলে ?

থাক, এসব নিয়ে ভাবনার পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।এমনিতেই চিন্তা করার শক্তি অনেকটা লোপ পেয়ে যাচ্ছে।সর্বদাই যে কল্পনার রাজত্বে বসে আছে।সৌরভের কথা মনে হতেই চোখের কোণায় দুফোটা জল জমে গেল। সামনে কেউ থাকলে হয়তো চিকচিক করা আঁখি দেখেই বুঝে যেত যে আমি কাঁদছি। কিন্তু আমি বুঝলাম কি করে, যে আমার চোখে জল?

কি আজব প্রশ্ন তাই না? আমার ভেতর বলে দিচ্ছে আমার কষ্ট কোথায় এসে জমছে।চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে কষ্টরা ভীড় জমাতে শুরু করেছে ছোট্ট দুটো চোখে।

রাস্তার পাশে পরিচিত কাউকে দেখলাম মনে হল। একটু গলা বাড়িয়ে নিচের দিকে আবারও তাকাচ্ছি।কিন্তু লোকটা আমাকে দেখার পর কেমন জানি চোর চোর হয়ে গেল মনে হচ্ছে।বারংবার আমার দিকে তাকাচ্ছিল।

আঁধারের আশ্রয় নিয়ে লুকিয়ে পড়লো আঁধারে।

দৃষ্টি ঘোলাটে হওয়ার কারণে ধরতে পারিনি সে কে হবে।কিন্তু অন্তঃপর্দা বলে দিয়েছে।সে কে হতে পারে।ছোটে দৌড়ে গেলাম নিচে।খুব তাড়াতাড়িই নিচে চলে এলাম মনে হল।অদ্ভুত তাইনা? বটেই।হবেই তো।অদ্ভুত এক টান আছে যে লোকটার প্রতি।সেটাই তো খুব প্রবল।

গেইট ধরে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিন্তু সৌরভকে আর দেখা যাচ্ছে না।এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে।এমন যদি হত, দেখতাম আমি হাঁটছি আর পায়ের মধ্যে এসে একটা লাল গোলাপ ঠেকলো। হকচকিয়ে উঠে আমি সেই গোলাপটা হাতে নিতাম। বুঝে যেতাম সৌরভ্ই এসেছিল। কিন্তু সত্যিই কি সৌরভ এসেছিল? অন্যকেউও তো হতে পারত।আবার নাও হতে পারত। সৌরভকে অবশ্য জিজ্ঞেসা করতে পারতাম না যে ওই ঠিক ওখানে ছিল কিনা,গোলাপটাও ঠিক ওর ছিল কিনা।

লজ্জা পেতাম।

থাক , বাস্তব নিয়েই থাকি। চারদিকে আবারও চোখ বুলালাম।কিন্তু জনমানব হীন লাগছে পরিবেশটা।ফিরে যাব ভাবতেই ফোনে টিংটিং আওয়াজ হল। পকেট থেকে ফোন বের করে আনলাম।মেসেজ এসেছে হয়তো।সাধারণত আমার মেসেজ পড়া হয়না।হয়না কেন, দিনে শতাধিক মেসেজ্ও হয়তো আসে।আর এই মেসেজ পড়া এককথায় অকাজ না করার জন্য একবার ঝামেলায় পড়েছিলাম।একবার নয়, কয়েকবারই।

কলেজে পড়াবস্থায় জ্যোতি আমাকে প্রোপজ করেছিল।জ্যোতি আমার ইন্টার ক্লাসমেট ছিল।আমাকে মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে নানান এস্এম্এস করত।সাথে একদিন প্রোপজ্ও।কিন্তু আমি সেসব দেখিনি।পরে কলেজের সবগুলো মিলে আমাকে প্রকট লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল।

কিন্তু আজ কেন হঠাত্ মোবাইলটা হাতে নিলাম।আর মেসেজ আসাতেই।

অদ্ভুত কিছু!

“জানি তুমি বুঝতে পারবে।আর আমার খুঁজে আমার পিছনেই দৌড়বে।হয়তো এরকমভাবে আমার অনুভূতিটাও বুঝে গেছ।তোমাদের বাসার পিছনের পার্কটায় থাকব।”

অদ্ভুত তো, সত্যিই অদ্ভুত। অদ্ভুত এক টান। সেই অদ্ভুত টানের জোরেই এরকম হল।নয়তো এই মেসেজ কেন চোখে পড়বে !আর এই অদ্ভুত মেসেজ্ই বা কে করল?

পা চলতে শুরু করে দিল সামনের দিকে।এগিয়ে যেতে থাকলাম।অজানা এক আশায়, অজানা ভরসায় হেঁটে চলছি।

আমি সৌরভের প্রেমে পড়ে গেছি। ভালবাসা জন্মেছে জন্ম-জন্মান্তরের।কিন্তু সে তো আমার মতো হবেনা।আমি সাধারণ ব্যক্তিত্বের একটা মানুষ।অসাধারণ কিছু নেই আমার মাঝে।আমার মত এরকম কাউকে সৌরভ ভালবাসবে!

আমি কিসের নেশায় এরকম উড়োচিঠির পিছনে ছুটছি!

আমি ভালবাসি সৌরভকে। জীবন – ভালবাসার পাল্লাতেই সৌরভ্ই সেই পাল্লায় ভারী।

সে তো আমাকে ভাল বাসেনা, বাসে কিনা তা আমি জানিনা।

তবে তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য্ও আমি আমার প্রতি তার ভালবাসা দেখেছি। কিন্তু সেটা কি আমার মতোই ছিল। রূপের গুনে মুগ্ধ হয়ে?

সেই ভরসাতেই এগোচ্ছি।

সময়টা বসন্ত কাল চলছে।পার্কটার দুপাশে দু’টো কৃষ্ণচূড়া।পুরো পার্কটা জুড়ে রেন্ট্রি গাছেই ছেয়ে আছে।প্রকান্ড সেই রেন্ট্রি গাছের নিচে অনেক সময় পার করেছি। একাকীত্বের ছিল সেই সময় গুলো। কৃষ্ণচূড়া গাছটায় লাল কৃষ্ণ ছাড়া তেমন কিছুই চোখে পড়েনা।গাছের নিচে ফুলের পাপড়ি পড়ে বিছিয়ে আছে।

পার্কে এত রাতে কেউ ঢুকেনা।এটা পার্ক নয়।সাধারণ কোন একটা জায়গাও বলা যেতে পারে।সহসাই এটা ক্ষণ কি ক্ষণ উন্মুক্ত থাকে।খচখচানি আওয়াজ বেড়ে গেছে।পার্কে ঢুকাতেই পায়ের তলায় বুনোপাতার কলকলানি শুরু হয়ে গেছে।

বিশ্বাসেই সব ভিত্তি।সৌরভ এখানে আসবে তা হয়তো বিশ্বাসে ঢুকেনি।আর তাই চোখের সামনে দেখাতে বিশ্বাস্ই হচ্ছে না।নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি।সাথে গলার স্বর এবং নিশ্বাস পর্যন্ত্ও স্থির হয়ে গেছে।

-হাই।

হাত কচলাতে কচলাতে একটু এগোলাম।

-হাই। আপনি এত রাতে এখানে?

অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে গেল মনে হয় আমার এরকম প্রশ্নে।ভেবেছিল হয়ত আমি এসেই তাকে বলব “এত রাতে আমাকে ডেকেছেন কেন?”

তাই তার উত্তরটাও আমার প্রত্যাশিত উত্তর হলনা।

-এমনি।এমনিই এসেছিলাম।ভাল লাগছিলনা তাই ভাবলাম বাহির থেকে একটু ঘুরে আসি।

চোখ কখনও মিথ্যে বলেনা।তবে গলার স্বর মিথ্যে বললে ভয় পায় বোধহয়। কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠে।লজ্জাও পাচ্ছিল মনে হয়।তাই সঠিক কথাটা বের হচ্ছে না।সৌরভ তো সুপুরুষ।সে কেন লজ্জা পাচ্ছে!

আমার মা সবসময়ই আমাকে বলে, আমি প্রচন্ড ভীতু, কাপুরুষ।আমি স্বাভাবিক অবস্থাতেও নার্ভাস হতে সময় নেইনা।

-আচ্ছা তুমি এতো রাতে এখানে কি করছ?

খুব জেদ হচ্ছে সৌরভের উপর।সত্যটা তো বলছেইনা উল্টো আমার উপর এক্ই প্রশ্ন প্রয়োগ করছে! আমি মিথ্যে বলবনা।

-কে যেন একটা মেসেজ করল।বলল এখানে তাকে পাওয়া যাবে।কিন্তু এখানে তো আপনাকে আর ছাড়া আর কাউকেই দেখতে পাচ্ছিনা।

দুষ্টুমির আভাস পেলাম সৌরভের হাসিতে।তাই কালবিলম্ব না করে মেসেজকৃত নাম্বারটায় ফোন দিলাম।

সঙ্গে সঙ্গেই সৌরভের মুখের সেই হাসি চলে এল আমার চেহারায়।তার মুখ কেমন জানি হয়ে গেল।রিংয়ের আওয়াজ হচ্ছে সৌরভের ফোনে।

আরো একটু এগিয়ে গেলাম সৌরভের দিকে।

-আমি নিজে ভীতু হলেও ভীতু লোক কখনওই পছন্দ করিনা।কেন ডেকেছেন বলুন।

চুপ থাকা আমার পছন্দ না।সোজাসাপটা কথা বলা সত্য বলা।চুপ থাকার চেয়ে অনেক ভাল।

-আসলে তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল। বলব ভাবছিলাম কিছুদিন ধরে।কিন্তু সময়্ই যেন আসেনি। আর সত্যি বলতে গেলে তুমি কাল আমেরিকায় চলে যাচ্ছো। কেন জানি খুব কষ্ট হচ্ছিল।তাই ভাবলাম তোমার সাথে কথা বলি। ভাল লাগবে।

খুব ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল নিজেকে।

ভালবাসার মানুষের কাছ থেকে তো এটুকুই প্রত্যাশা করে পৃথিবীর সব যুগল।

সৌরভ আবারও বলতে থাকল,

আর জিসান তুমি আরো কিছু সত্য জানোনা।যা তোমাকে এখন না বলাই শ্রেয়।তবে এটুকু বলব আমি তোমাকে ভালবাসি কিনা জানিনা।তবে তোমাকে ছাড়া আমি আমার জীবন কখনওই সাজাতে পারবনা।তোমাকে আমার খুব প্রয়োজন।

মনে হচ্ছিল অনেকটা স্বপ্ন্ই দেখছি। হঠাত্ করেই এখন জেগে যাব আর এই ভালবাসার গল্পটা এখানেই ভেঙে যাবে। কানের পর্দা ভেদ করে কথাগুলো হৃদয়ের একদম মধ্যিখানে গাথঁছিল।

আমার মত করেই সৌরভ আমাকে ভালবেসেছে।ঠিক আমার মনের মতো। কিন্তু এমন কি আছে আমার মধ্যে , যা সৌরভকে এতটা উতলা করে দিল আমার প্রতি।এ তো পরম প্রাপ্তি।জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো।

হঠাত্ করেই জিজ্ঞেস করে ফেললাম।

-আচ্ছা সৌরভ তুমি আমার মাঝে এমন কি দেখলে, যার ফলে এতোটা ব্যাকুলতায় ভোগছো?

– বলব।তোমাকে সবকিছুই বলব।কিন্তু তোমাকে কথা দিতে হবে তুমি চিরদিন আমারই থাকবে।

ইচ্ছে করছিল প্রবল বেগে ঘাড় নেড়ে বলি হ্যাঁ ।’এটাই তো আমি চাই।’

জড়িয়ে ধরি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সৌরভকে।কিন্তু অদ্ভুত একটা কিছু তাকে জড়িয়ে ধরতে দিচ্ছে না।আমার ইচ্ছেতেই হয়তো।

সৌরভ আমাকে অনেক ভালবাসে।তা আমি বুঝতে সক্ষম হয়েছি।আমার ধারণা শক্তি প্রবল।কতটা সাহস জুগিয়ে সৌরভ তার মনের কথা জানাল।আর তা প্রকৃত ভালবাসার জোরেই।

আমি হয়তো কোনদিন্ও তা পারতাম না। তাই বলে কি আমি তাকে ভালবাসিনা! বাসি।নিজেকেই ভাবি সৌরভের মধ্যে।

হাত দুটো সৌরভের হাতে তুললাম। কোমল একটা চাহনি দেখে বুঝে গেছে সৌরভ।আমি তাকে ঠিক কতোটা ভালবাসি।পরম ভালবাসায় পরিপূর্ণ ছিল সেই দৃষ্টি।ছলছল দু জোড়া চোখ কথা বলছে।চোখের কথোপকথন হৃদয়ের গভীরের সব অনুভূতি, গভীরের সব ভালবাসা দিয়ে হয়।

চেপে ধরলাম সৌরভের দু হাত।চোখের ভাষাতেই বলে দিলাম।কখনওই ছেড়ে যাবনা তাকে।এতোটা ভালবাসা আর কোথায় পাব?…..

-মা এত্ত কিছু লাগবে না।তুমি এসব কি করছ! আহা! ছাড়ো এবার।

-এই চুপ কর।

ধমক দিয়ে বসিয়ে দিল মা।সেই কখন থেকেই ব্যাগের মধ্যে নানান কিছু পুরে দিচ্ছে।পিঠে-পুলি থেকে শুরু করে কিচ্ছু বাদ দেয়নি।বিকেলের দিকে ফ্লাইট। তাজুল স্যার সেই সকাল থেকেই তাড়া দিচ্ছেন।ঘড়ির দিকে তাকাতেই চোখ ছানাবড়া।

বাবা কাঁধে হাত রেখে সারারাত উপদেশ শুনিয়েছেন।কিন্তু এদিকে আপুর রাগ্ই যেন ভাঙছিলনা।সেই সকালে প্রায় একঘণ্টার মত বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল।এত কাঁদতে পারে আমার বোনটা।খুব পারে।

আমারও খুব কষ্ট হবে এই রত্নটাকে ছেড়ে থাকতে।কিন্তু আমি ঠিকই তাকে ছেড়ে থাকব।বাবার চোখে কখনও জল দেখিনি। কিন্তু আজ কেন জানি বাবার চোখদুটো ফুলে কেমন লাল রং ধারন করেছে।

বেরিয়ে পড়ব এখন।

মা খুব ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদছেন।মা’র জলে ভরা দুটো চোখ দেখতে খুব কষ্ট হচ্ছিল।ধৈর্যের ফলে তা আটকে রাখছি। নিলয় এসে মায়ের বুক থেকে ছুটিয়ে নিল আমাকে।

ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি।তাজুল স্যার ভেতরেই রয়ে গেলেন। হয়তো বাবার সাথে কথা বলছেন ।

বাবা জিনিসটাই এরকম। খুব উপদেশ করলেন। জীবন পরিচালনার জন্য । কিন্তু মায়ের আদেশগুলো ছিল সব আমাকে ঘিরে।”ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করিস।নিয়মিত ফোন্ও করিস বাবা।আর শরীর খারাপ লাগলে একমুহূর্ত দেরি না করে আমার কাছে ফোন করবি।আর ওষুধ রাখবি সবসময়।”

‘মা’ এরকমই হয়।

গাড়িতে উঠে পড়েছি।কিছু সময়ের ব্যবধানে পৌছে যাব এয়ারপোর্ট।

নিজেকে একদিক থেকে খুব বোকা আর অসহায় মনে হচ্ছিল।এতোটা ভেবে নিয়েছিলাম! অথচ কতটা ভিত্তিহীন ছিল।

সৌরভ এত সুন্দর করে ভালবাসার কাব্য বলতে পারে জানতাম না।কিন্তু এরকম বানোয়াট্ও যে তাও জানতাম না। একটাবার দেখা পর্যন্ত করলো না!

নিজের উপর খুব ঘৃণা হচ্ছিল।

খানিকক্ষণ হল এয়ারপোর্টে পৌছেছি।ওয়েটিং সিটে বসে আছি।আরো আধঘণ্টা রয়েছে।পাক্কা আধঘণ্টাই।

মোবাইলটা হাতে নিয়ে ঘাটাঘাটি করছি। তাজুল স্যার পাশে বসে আছে।ওনার মত করে কি সব ভাবছেন।টিকিট সংগ্রহের জন্য ভেতরে ঢুকলেন।

ঘাড়ের কাছে খুব তীব্র এক পুরুষালি মুখ এসে ঠেকল। গরম নিশ্বাস বেরচ্ছে। খোঁচা খোঁচা দাড়ির ঘর্ষণের ফলে অদ্ভুত এক ভাললাগার জগতে হারিয়ে যাচ্ছিলাম।

হতভম্ব হয়েই পিছনে ফিরলাম।

হাসবো না কাদঁবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত হাসিরই জয় হল।

তত্ক্ষণাত্ নিজের উপর আবারও খুব ঘৃণা জন্মে গেল। আমি এতটা আত্মবিশ্বাসহীন!

আমি ঠিক ছিলাম না।সত্যিই ঠিক ছিলাম না।

না হয় সৌরভের এই অফুরান ভালবাসা উপলব্ধি করতে পারতাম।

-সৌরভ তুমি !

হাত ধরে টেনে নিল আড়ালে।

চারদিকে কোলাহল । অরাজকতার ঝাঞ্চাল।

ইচ্ছে করছিল ইচ্ছের মতো করে পরিবেশটাকে এক গহীন অরণ্যে রূপান্তরিত করি। দেয়ালে গিয়ে ঠেকলাম। সৌরভ আলপিনের মত আমার দুহাত চেপে ধরল । তার হাতের স্পর্শ আমার জন্য স্বর্গীয় অনুভূতি ছিল। ছিল স্বর্গীয় সুখ।

অবাক জগত থেকে ফিরে এলাম।

-তোমার জন্য্ই এখানে আসা। জানতাম তুমি খুব কষ্ট পাবে। তবুও দিয়েছি। হয়তো এটুকুই ভেবেছ যে, তোমার প্রতি আমার ভালবাসার কমতি ছিল। থাক, আমার সম্পর্কেই না হয় ভেবেছ। কিন্তু তোমার মুখের ঐ এক ফোটা হাসি ফোটানোর জন্য আমি পৃথিবীর সব ত্যাগ করতে পারি। তোমার হাসিই যে ভুবন পরাজিত কারী।

সেস্থলে জীবন ত্যাগ তো কিছুই নয়।

নয়তো এই সুখটা পেতেনা। তোমাকে চমকে দিতে চেয়েছিলাম।

সৌরভের কথাগুলো মন্ত্রের মতো দু কানে বিধঁছিল। তার মুখে প্রস্ফুটিত হাসি থাকলেও বিদায়ীক্ষণের জন্য চোখগুলো ছলছল করছিল।

কোন কিছু ভাবার সুযোগ নিলাম না। বাঁধ ভেঙে গেল সবকিছুর। হু হু করে কেঁদে উঠলাম। শরীরের শেষ প্রান্তের সবটুকু শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। ইচ্ছে করছিল লুকিয়ে নেই সৌরভকে বুকের ভেতর।যারা সত্যিকার ভালবাসার সাক্ষী , তারাই বলতে পারে এই ক্ষণটার মর্ম। ভালবাসায় পরিপূর্ণ দুটি বুকের সংস্পর্শ যে কতটা মধুর ! কতটা প্রশান্তিদায়ক ।

ঘাড় থেকে মুখ ছুটিয়ে আনলাম।সৌরভের নেশা ধরানো একটা অলৌকিকতা আছে। তার গরম নিশ্বাসে মাতাল হয়ে যাচ্ছিলাম । যদিও তা স্বল্প সময়ের।

সৌরভ আলতো করে দুহাতে চেপে ধরল আমার দুচোয়াল ।

তার হাতের স্পর্শ আমার কাছে অমৃতের

ন্যায় ছিল। পাগল করে দেওয়া সেই ঠোটের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছি। পৃথিবীকে থামিয়ে দিতে মন চাইছিল। এমন একটা পরিবেশ এমন মধুরিমার জন্য তৈরি নয়। এই ভালবাসার জন্য নির্জন, খুব নির্জনতার প্রয়োজন।

হাটুগেড়ে বসে পড়ল সৌরভ।

এসব কি করছে ও।শুনেছিলাম সৌরভের মধ্যে কিছুটা পাগলামি আছে। কিন্তু এখন তো দেখছি কিছুটা নয়। চারদিকে লোকজন গিজগিজ করছে। যদিও এই স্থানটা কিছুটা নিরিবিলি ।

হাতে ছোট্ট একটি রিং পড়িয়ে দিল সৌরভ। জলজল করছিল। হীরের হয়তো। পাশ থেকে একটি ছোট্ট বক্স তুলল সৌরভ।রঙিন , নীল কাগজে মোড়ানো ।আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল,

-এটা তোমার জন্য জিসান। শুধুই তোমার জন্য । আমার কাছ থেকে তোমার প্রাপ্তির পাল্লা অনেক ভারি যে।সব জমিয়ে রাখব তোমার জন্য । অনু পরিমাণ ভাগের ভাগীদারও কেউ হবেনা। সাত জন্মেও হতে পারবে না।

চোখ থেকে জল বেরচ্ছে । অনেকক্ষণ সময় নিয়েই।টপটপ করে বেয়ে বেয়ে পড়ছে। দুহাতে চোখের জল মুছে দিচ্ছে সৌরভ। তার আঁখিযুগল্ও খুব রক্তিম ছিল। সারারাত কেঁদেছে হয়তো। কিন্তু আমার সম্মুখে কাঁদছে না। যেন আমি ভেঙে না পড়ি।

এতো ভালবাসা ! কোথায় রাখব এই মানুষটাকে।

-তুমি এরকম কাঁদছ যে! জিসান শোনো, মাত্র দুবছরের জন্য্ই তো যাচ্ছ। দেখতে দেখতেই পার হয়ে যাবে এই দিনগুলো । তুমি ঠিক দেখো।

আমি চোখের ভাষা পড়তে পারি। তাই সৌরভ মিথ্যে বলছে তা বুঝি। আমার উপর সে কতটা আস্থাশীল।

এতো ভালবাসা কোথায় পাব?…

-আমি ভেঙে পড়ছিনা সৌরভ। তোমার ভালবাসার জন্য আমাকে মৃত্যুও বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। এত ভালবাসা যার জন্য তাকে কি কিছু গ্রাস করতে পারে, গ্রহণ করতে পারে?

আমি আজীবন তোমারই থাকব।

সৌরভের মুখে মিষ্টি সেই হাসি ।

স্যার ডাকা শুরু করলো। ফোনের স্ক্রিনে কল ভেসে উঠছে। সৌরভকে ছাড়তেই দিচ্ছিল না পাগল মনটা। তার চেয়েও অধিকপাগলামো করছে হয়তো সৌরভ। কিন্তু অপ্রকাশ্যে। হাত থেকে ছুটিয়ে আনলাম। খুব অদ্ভুত কষ্ট হচ্ছিল । কিন্তু বাস্তব কাউকেই ছাড়েনা। আর আটকে রাখতে পারলনা সৌরভ। ঝরঝর করে কেঁদে উঠল। পৃথিবীর বুকে এই প্রথম্ই হয়তো অচেনা পর কোন মানুষের চোখের জল দেখতে পেয়ে এতটা কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু পর বলছি কেন? সৌরভ তো আমার অস্তিত্বেই মিশে গেছে। সে আবার পর হয় কীভাবে ?….

১০

হঠাত্ কোন অচেনা জায়গায় অপরিচিত পরিবেশে আমার এক অদ্ভুত ভাললাগা বিরাজ করে। সবকিছুই কেন জানি খুব অদ্ভুত ভাল লাগে। কিন্তু পরক্ষণেই আসল রূপ দেখা দেয়। একটুও মন বসাতে পারিনা। মায়ের জন্য , আপুর জন্য বাবার জন্য খুব কষ্ট হয়। আমার ব্যস্ত নগরীর কথা খুব মনে পড়ে। ওখানকার আমার হাঁটাচলা থেকে শুরু করে সবকিছুকেই খুব মিস করি। প্রচন্ড রকমভাবে ভেঙে পড়ি। এখানে এসে স্যারের ফ্ল্যাটে উঠেছি। খুব বড় এক ফ্ল্যাট। আমার দাদী দেখলে একে এককথায় প্রাসাদ্ই বলে ফেলত। কিন্তু আমি আমার দাদীকে দেখিইনি। শুনেছি দাদীদের আদর নাকি খুব মিষ্টি হয়। কিন্তু আমার ভাগ্যে তা জুটেনি।

স্যারের ফ্যামিলি আমাদের মতোই খুব ছোট। এক মেয়েই, আর ওনার স্ত্রী ।ছেলে নেই একটিও। অবশ্য এতে তার কোন আক্ষেপ্ও নেই। ছেলে সন্তান নাকি বাবা মা-কে খুব জ্বালাতন করে। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

এখানে এসে আমার দীর্ঘমেয়াদি অভ্যেসটা পাল্টাতে হলো। এখানে স্যার ডাকাটা আমার পক্ষে খুবই অপমানজনক। আর তা স্যারের মেয়ের মুখ থেকেই শুনেছি। রিয়া বলছিল,

-জিসান ভাই, আপনি আব্বুকে স্যার বললে পাবলিক ভাবতে পারে আপনি আব্বুর কর্মচারী ।

পরে ভেবে দেখলাম যে কথাটা অনেকংশেই সত্য। আমার আবার বদভ্যাস হলো এটা যে, আমি একটা কিছু করতে বা বলতে বলতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেটাকে দমিয়ে রাখতে পারিনা। আর যদিও চাপাই তাতে মনে হয় অত্যন্ত ধৈর্য থাকা দরকার ।

রিয়া দেখতে খুব সুন্দর হয়েছে। বিদেশে থাকে বলেই মনে হয়। প্রায় তিন বছর আগে দেখেছিলাম তখন এতটা সুন্দর লাগেনি। চেহারার মধ্যে অমায়িক একটা সৌন্দর্য ধারন করে রেখেছে সে। যা মহাপুরুষকেও ব্যাকুল করতে সক্ষম।

কিন্তু আমি তাতে গলছিনা। কখনও গলিওনি কোন মেয়ের রূপে। আমি তো আমার সৌরভের মাঝেই মিশে গেছি। আমার সবকিছুই এখন ওর দখলে।

সৌরভ আমাকে খুব ভালবাসে। কিন্তু এখনও তা স্পষ্ট নয়। একবাক্যে তার মুখ থেকে এই কথাটা বের হয়নি “আমি তোমাকে ভালবাসি” জিসান। তারপরও কি একটা কিছু বলে দিচ্ছে ভালবাসার গল্প।

-বাবা জিসান, গোসল শেষ হলে চলে এস। তোমার আংকেল ডাকছে।খেতে আসো।

-আপনি যান আন্টি। আমার আসছি।

চলে গেলেন। তাদের পোশাক-আশাক কেমন অদ্ভুত। আন্টি একটা সাধারণ টপ জামা পড়ে আছে। কিন্তু খুব লম্বা । অথচ আমার মায়ের বয়সী। আমার মা তো সবসময়ই শাড়ী কাপড় পড়ে। কত্ত ভাল লাগে! তবে এটা আমার দেশ নয়। এখানের সবকিছুই এমন হবে।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছি। কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছে। কিন্তু সবাই আমাকে তাদের পরম আপন্ই ভেবে নিয়েছে। কিন্তু আমার বদভ্যাসের মধ্যে এটাও একটি। বিনা কারণে লজ্জা পাওয়া ।

খাবার শেষ করে উপরে চলে আসলাম। রুমে এসে মায়ের সাথে কথা বললাম। আপুও তো খুশিতে চিত্কার করছে। কিন্তু এতোটা উত্ফুল্ল কেন? একমাত্র ভাইটি আমেরিকায় আছে বলে !

আমার রুমটা চমত্কার ভাবেই গোছানো। ওয়ারড্রোব থেকে শুরু করে কিচ্ছু বাদপড়েনি।ওয়ারড্রোবের ভিতর হতে ব্যাগ নামিয়ে সৌরভের দেওয়া বক্সটা নামালাম।

খাটের উপর শুয়ে বক্সটা খুলছি।

খুব সুন্দর করে দুটো বয় ডল একপাশে কাত করানো।আরেকপাশে একটা ছোট্ট লাভের ট্যাডি।কিছু গোলাপের পাপড়ি পড়ে আছে চারপাশে।সাথে দুটো গোলাপও রয়েছে।আমার পছন্দের কাতারে গোলাপ্ই সবার প্রথম।এক এক করে সবগুলো উপহার বের করলাম।

উপহার বলবো না।এগুলো আমার ভালবাসার নিদর্শন।এত কিছুর মধ্যে কোথাও আমার চোখ আটকায়নি।কিন্তু সাদা একটি কাগজে এসে চোখ আটকে গেল।হাতে নিয়ে কাগজটির ভাঁজ খুললাম।

পড়তে শুরু করলাম।খুব দীর্ঘ একটা চিরকুট।

খুব বড় সারপ্রাইজ আমার জন্য এখানেই অপেক্ষা করছিল।

“প্রিয় জিসান,

তুমি জানো, এই ‘প্রিয়’ নামটা উচ্চারণ করেও আমি আমার ভেতরের আবেগের একটুখানিও প্রকাশ করতে পারছিনা। এতো ছোট্ট নামে তোমাকে ডাকা যায় না। অসম্ভব । তোমাকে কিছু একটা বলে সবসময়ের জন্য আমি ডাকব। যা শুধু তোমার আমার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তোমাকে যে অনেক বেশি ভালবাসি। জানি, এই চিঠিটা যখন পড়বে তখন তোমার আমার মানচিত্রের দূরত্বটা অশেষ থাকবে। কিন্তু তুমি এটা ভাবলে ভুল করবে। তুমি আমার মাঝে সবসময়্ই আছো। আমার দেহে তোমার বসবাস। চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেও। যতদিন আমি এই পৃথিবীতে জীবিত রয়েছি।

তোমার জন্যই আমার সৃষ্টি।তোমাকে প্রথম কবে দেখেছি জানো,পহেলা বৈশাখে।পুরো কুমিল্লা সেদিন বৈশাখের আমন্ত্রণে ব্যস্ত।

আমি তোমার সাথে কিছুটা মিথ্যে বলেছি।যদি সত্যটা বলে দিতাম তাহলে তোমাকে এতটা চমক দিতে পারতাম না। আমি কুমিল্লাতেই থাকি।তা তোমার অজানা।

সেদিন পহেলা বৈশাখে লোকজের ভীড়ের চোটে আমি গাড়ি এক্সিডেন্টে মারাত্মক ভাবে জখম হই।হাসপাতালে নেওয়ার মতোও কোন লোক ছিলনা।মাথায় আঘাতের ফলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। আমার শরীর ভিজে উঠছিল রক্তে।আমি প্রচণ্ড ব্যথায় রাস্তার একপাশে পড়ে কাতরাচ্ছিলাম।তখন তোমাকে দেখতে পেলাম। আমার পাশে এসে বসে তুমি চিত্কার করে সাহায্য চাইছিলে।তোমার চিত্কার আমাকে ব্যাকুল করে দিয়েছিল সেই সময়েই।একটা অচেনা মানুষের জন্য এমন হাহাকার কজন্ই বা করে!তোমার হুঙ্কারের ভাবাবেগ আমি বুঝে গিয়েছিলাম।

তোমার প্রচেষ্টায় হাসপাতালে স্থানান্তরিত হই।জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়িনি তখন্ও।মেডিক্যালে আনতেই আরও অবাক হ্ই তুমি আমার মতো মেডিক্যালেরই ছাত্র। তোমার কথোপকথন শুনে বুঝতে পেরেছিলাম।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম সবাই আমার পাশ ঘিরে আছে। আমার বাবা মা আত্মীয়।খুব আদরের কিনা। কিন্তু তোমাকে দেখলাম না।তুমি কোথায় তা জানতে চেষ্টা করি।ডাক্তারের মুখ থেকে সেদিনের বাণীই ছিল আমাকে পাগল করে দেওয়া।একটা মানুষের হৃদয়ে এত ভালবাসা থাকতে পারে অবিশ্বাস্য ছিল আমার ।দু-ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন ছিল আমার । ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তুমি একাই সেই দু-ব্যাগ রক্ত দাও। তত্ক্ষণাত্ প্রয়োজন ছিল যার। না হয় আমাকে বাঁচানো কষ্টকর ছিল। কিন্তু আমাকে রক্ত দিয়ে তুমি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়। তুমি খুব তাড়াতাড়িই হাসপাতাল থেকে চলে গিয়েছিলে। আমার জ্ঞান ফিরতে খুব দেরি হচ্ছিল বোধহয়। তুমিই আমার সর্বনাশ ডেকেছিলে। তোমার প্রতি জন্মান্তরের ভালবাসা জন্মে যায় সেদিনই । পাগলের মতো ছটফট করতে থাকি। তোমার আড়াল হয়ে যাওয়া আমি কোন ভাবেই সহ্য করতে পারছিলাম না। বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা। প্রথম দর্শনেই যে এতোটা ভালবাসা জন্মাতে পারে তা তোমাকে না দেখলে হয়তো কখনওই বুঝতে পারতাম না। আমার চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারনা সবকিছু তোমাকে ঘিরেই ছিল সেদিন । আজ্ও সেরকম আছে। আজীবন থাকবেও জিসান।

ইতি

তোমার সৌরভ”

চিঠিটা পড়ার পর যার পর নাই অবাক হলাম।কপালে হাত পড়ে গেল। তাহলে গত তিনমাস পূর্বে যেই লোকটাকে বাঁচিয়েছিলাম সেটা সৌরভ ছিল!রক্তাক্ত হয়ে থাকায় আমি তার মুখাবয়ব নেহের করতে পারিনি।আর সেদিন খুব তাড়া ছিল আমার।আর তাই তাড়াহুড়োতেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করি।আর চলেও আসি সৌরভকে হাসপাতালে রেখে।

স্রষ্টা এভাবেও কোন ভালবাসার সূচনা করতে পারে ! হতবাকচিত্তে চোখ দিয়ে জল চলে এসেছে। বিস্মিত হয়ে পড়েছি কিছুক্ষণের জন্য । আমার আগেই সৌরভ আমার জীবনে এসেছিল? চিঠিটা বুকের মধ্যে গুজে দিয়ে অনবরত কাঁদতে লাগলাম।

১১

সৌরভটা যে কি করে, আস্ত একটা পাগল। এত্ত ই-মেইল করে কেউ? আর ফোন করেছে তো সেরেছে। আর ছাড়ার নামগন্ধ্ও নেই। দিনে ব্যস্ততার ফাঁকেও আমাকে ফোন করতে ভুলেনা। আর এটাই তো সত্যিকারের ভালবাসা । শত ব্যস্ততার মাঝেও মনে করিয়ে দেওয়া ।

সেদিন রাতে ফোন করে এই যে কথা বলা শুরু করে দিল ঠিক সকাল করেই ছাড়লো। কেউ এতো কথা বলতে পারে, আর ব্যালেন্সের হিসেব তো করে লাভ্ই নেই।

সৌরভের করা ই-মেইল গুলোতে অবসর সময়ে চোখ বুলাই। তখন খুব ভাল লাগে।

পুরনো কয়েকটি ই-মেইল এখন আবার পড়া হচ্ছে।

“প্রিয়তম,

সম্প্রতি তোমার কথা খুব মনে পড়ে। হাসছো বোধহয় কিরকম মন্ত্রীদের মত কথা বলি।

সারাদিন রোগী দেখা শেষ করেই তোমাকে নিয়ে বসি। ডাক্তার হয়েছি বলে আমার কাছে সবাই রোগী।কিন্তু তোমার কাছে যে আমিই রোগী।আর আমার ডাক্তার তো তুমি। তোমার ভালবাসাইতো আমার ওষুধ । এখন প্রায়শ্ই আমার খুব কষ্ট হয়। জানো, তোমাকে খুব কাছ থেকে পেতে ইচ্ছে করে। তোমার ঐ ঠোটে ঠোট রাখতে ইচ্ছে করে খুব। সেই কবে একবার রেখেছিলাম বলো তো। বড্ড তেষ্টা পেয়ে আছে।

ইতি

তোমার অপেক্ষায়।”

“প্রিয় অস্তিত্ব ,

হাসি পায় আমার এমন অদ্ভুত ডাক শুনলে। পাক, তোমার হাসি ফোটানোর জন্য্ই তো আমার সবকিছু। তবে ঠিক নামেই ডেকেছি। পরে সময় করে ভেবে নিও। আর জানো, কাল তোমাকে স্বপ্নে দেখেছিলাম । দেখলাম যে, তোমাকে নিয়ে অনেকদূরে একটা নির্জন জায়গায় চলে গেছি আমি। সেখানে শুধু চারদিকে ফুলের সুবাস। অসংখ্যক প্রজাতির প্রজাপতিরা উড়ছে।

ছোট্ট একটা বসতি আমাদের জন্য।আর তার একপাশে নীল স্বচ্ছ পানির একটা নদী রয়েছে।নদীর তলায় একদম বালু পর্যন্ত দেখা যায়।সেখানে পাড়ে বসে পানিতে পা ডুবিয়ে তুমি আর আমি সূর্যাস্ত দেখি।আমার কাঁধটাকে তুমি একদম কিনে নিয়েছো।সারাক্ষণ কাঁধে মাথা রেখে আমাকে খুব জ্বালাচ্ছিলে।তবে আমার খুব ভাল্ই লাগছিল সেসব।

আর যখন সন্ধ্যা হল, তখন চারদিক জোনাকিতে ভরে গেল।তারা আমাদের ভালবাসার সাক্ষী হতে চাইল।অনুমতি দিলে তুমি। জোনাকিরা হেসে খেলে তাদের ক্ষমতা দেখাল।তুমি খুব লাফাচ্ছিলে জোনাকি দেখে।আমি এক পাশে দাঁড়িয়ে তোমার হাসি মুখের রস আস্বাদন করছি।”

পুনশ্চঃ জিসান , বাবা আমার জন্য মেয়ে খুঁজছে।কিন্তু আমি তার কথায় না করে দিয়েছি।তুমি প্লীজ আমাকে ভুল বোঝোনা।আগের মতো তেমন ই-মেইল করতে পারিনা।

উত্তর লিখতে লিখতেই রাত পেরিয়ে যায়।

তবে ইদানীং সৌরভের ই-মেইলে নতুন একটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়।

আমার প্রথম থেকেই একটা ঘটকা ছিল আংকেলের প্রতি।আংকেল আমাকে ইশারা ইঙ্গিতে অনেক কিছু বোঝাতে চেষ্টা করেন কিন্তু আমি বুঝেও না বুঝার ভান করে থাকি।আংকেল খুব লজ্জিত হন সেসব নিয়ে।কিন্তু আমি নিরুপায় ।

আংকেল রিয়াকে আমার হাতে তুলে দিতে চান।এই কয়েকদিন হল আমি তা টের পেলাম।ওনার মেয়ের জন্য সহস্র ছেলেই রয়েছে।আমি তো তাদের তুলনায় কিছুই না। কিন্তু আংকেল তারপরও এমন কেন করে আমি জানি না।আমি সত্যিই জানি না।

চারদিকে অন্ধকার , নীরব নিস্তব্ধতা।বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে আছি।

আমাদের দেশে মনে হয় এখন দিন।আর চার ঘণ্টা আগে সেন্ড করা হয়েছে।তাহলে মনে হয় রাতেই করেছিল।

সৌরভের কয়েকদিনের ই-মেইল গুলোতে তীব্র ভয় আর বিষণ্ণতা লক্ষ করি।এখনও একটা ই-মেইল পড়ছি শুয়ে শুয়ে।

“জিসান,

আমি আর পারছিনা। বাবাকে নিয়ে আজ হাসপাতালে এসেছি।জানিনা এটা বাবার নাটক না অন্যকিছু।তোমাকে ভীষণ মিস করছি।”

পুনশ্চঃ বাবা অত্যধিক চাপ দিচ্ছে বিয়ের জন্য।মেডিক্যাল শেষ হয়েছে দুবছর হতে চলল তিনি এখন আমার বিয়ে দিতে চাইছেন।

তুমিই বা কি করতে পারবে।তোমাকে এসব বলে তো আরও বাড়তি চিন্তায় ফেলে দিচ্ছি।কিন্তু বিশ্বাস করো।বাবা আমার উপর একপ্রকার বলপূর্বক এমন করছে।

আমার ডাক্তারী পড়া শেষ হতে আর দুমাস রয়েছে। কিন্তু ইচ্ছে করছে এখনই দেশে ফিরে যাই।সৌরভের প্রতিটা ই-মেইলে আমি আকণ্ঠ চিত্কারের শব্দ শুনি। তীক্ষ্ম সেই হুঙ্কার শুধু আমিই শুনতে পাই।

এদিকে আংকেলকে সামলানোও আমার খুব দায় হয়ে পড়ছে। সেদিন সম্মুখ প্রস্তাবে না করে দেওয়াতে রিয়া বোধহয় খুব কষ্ট পেয়েছিল। চোখেও জল দেখেছিলাম।

আর আংকেলের তো মুখে স্পষ্ট লজ্জার ছাপ দেখতে পেয়েছিলাম আমি। কিন্তু কিছু করার ছিলনা আমার । কিছু করতে পারব্ওনা। এ নতুন করে বলার কিছু নেই। বাবার সমতুল্য একজন মানুষকে প্রত্যাখ্যাত করা যে কতটা নির্লজ্জতা গ্রহণ করতে হচ্ছে, তা শুধু আমিই জানি।

বাড়িতে ফোনে অনেক কথা হয়। আপুর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।এককথায় হঠাত্ করেই। দু একদিনের মধ্যেই হয়তো হয়ে যাবে। মা চাইছে যেন আমি ফিরলেই বিয়েটা হউক কিন্তু বাবা অত্যন্ত চাপ দিচ্ছে । হঠাত্ কি হল বুঝতে পারছিনা। আপুর সাথে ফোনে কথা বলতে চাইলে বাবা নিষেধ করে।

-হ্যালো মা, কেমন আছো?

-এইতো ভাল্ই।তোর শরীর কেমন?

-আমি ঠিক আছি। আচ্ছা মা আপুকে ফোনে পাইনা কেন?

-আর বলবিনা।তোর বাবা একদম হঠাত্ করেই কেমন যেন পাল্টে গেল। বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।আমার কাছেও কিছু বলতে চাইছেনা।আচ্ছা যাই হোক। তুই সেসব নিয়ে চিন্তা করিসনা।ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করিস।কেমন ?

-আচ্ছা মা।

-আচ্ছা এখন রাখ।

পুনশ্চঃ মা কেমন একটা তাড়াহুড়ো করেই ফোনে কথা বলল।তবে সেটা বিশেষ কিছু নয়।একটা বিষয় ভাবিত করল যে ফোনের ওপাশে কারো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আভাস পেলাম।আপু বোধহয়।

১২

আজ্ও দুটো ই-মেইল করলাম। বিগত দুসপ্তাহ ধরেই এরকমটা হচ্ছে । কোন এনসার পাচ্ছিনা সৌরভের কাছ থেকে। আজও অনুরূপ।কিন্তু কোন রেসপন্স পাইনি অপর প্রান্ত থেকে।

আজ আমি দেশে ফিরব।খুশিতে বুক ফেটে যাচ্ছে।

আংকেল মনে মনে আমাকে খুব ঘৃণা করছে তা আমি বুঝতে পারছি। ওনার সাথে কথা বলার মতোও মুখ নেই আমার।তারপরও হেসেখেলে কথা বলছেন ওনি। এয়ারপোর্টে পৌছে দিয়ে চলে গেলেন। বেশি কিছু বললেন্ও আসার মুহূর্তে রিয়া আবারও কাঁদছিল।প্লেনে উঠে পড়েছি খানিকক্ষণ হলো।

১৩

দেশের মাটিতে পা রাখতেই প্রবল আনন্দে মনটা নেচে উঠলো।বাবা এসেছে এগিয়ে নিতে।ঐ কিছুদূরেই ওদের দেখা যাচ্ছে।সাথে নিলয়টাও আছে।

বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম।নিজের অজান্তেইচোখদুটো ভিজে উঠলো।বোকা নিলয়ও আমাদের এ দৃশ্য দেখে কেঁদে দিল। হাসতে হাসতে নিলয়কে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।সৌরভ আসবে না জানি।তবে বাড়িতে পৌছনোর সঙ্গে সঙ্গেই আমার জন্য সে বিরাট একটা চমক বয়ে নিয়ে আনবে।হয়তোবা এই চমকটার জন্যই গত বারো দিন আমার সাথে কথা বলেনি।ওর সাথে কথা না বলা প্রতিটি দিন আমার মস্তিষ্কে গেঁথে থাকে।

বাসায় পৌছানোর জন্য গাড়িতে চেপে বসলাম।নিলয় বসেছে সামনের সিটে। আমি আর বাবা পিছনে।

জানালা দিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছি।কিছুক্ষণ পর পর আনাড়ী হাতে লেখা বড় বড় ব্যানার আর সাইনবোর্ড গুলো চোখে পড়ছে।মানুষ আর যানবাহন গুলো মনে হচ্ছে দৌড়চ্ছে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে আমরাই ছুটছি। মনটা খুব ফুরফুরে।তবে বুকের মধ্যে কিঞ্চিত্ আতঙ্ক রয়েছে।অজানা এক শঙ্কা ফেদেঁ আছে।

বাসায় পৌছোতে আর বেশি নেই। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম,

-বাবা আপুর খবর কি?

একগাল ঠেলে হেসে দিয়ে বলতে লাগলো,

-ভাল্ই।তোমার কথা প্রায়্ই মনে করে কেঁদে উঠে।

বাবার কথা শুনে গর্বে মনটা ভরে গেল। আমি এমন একটা বোনের ভাই হয়ে জন্মেছি।সত্যিই আমি ভাগ্যবান।শুধুমাত্র বোন্ই নয়, শ্রেষ্ঠ একটা পরিবার পেয়েছি।আদর্শবান বাবা,স্নেহময়ী মা,মিষ্টি একটা বোন।এদেরকে ঘিরেই আমার পৃথিবী।

আর বিশেষ একজন সৌরভ।তাকে আমি গোনায় ধরিনা।সে তো আমার অন্যভুবন।আমার অস্তিত্ব।

-আচ্ছা বাবা আপু এখন কোথায়? আমাদের এখানে?

-হ্যাঁ।এখানেই।সাথে তোমার দুলাভাইও আছেন।তুমি আসবে বলেই ওদের নিমন্ত্রণ করা।

বাবার কথা শুনার পর আরও খুশি হলাম। আজ সত্যিই খুব আনন্দ হচ্ছে।

কর্কশ আওয়াজে গাড়ি থেমেছে।আচ্ছা এমন আওয়াজ হয় কেন গাড়ি থামলে? ধূসর!মিষ্টি একটা শব্দও তো হতে পারতো।গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। সদর রাস্তা আমাদের বাড়ির সামনে দিয়েই চলে গেছে।একদম বিশ্বরোডে পৌছে গেছে।বাসার সামনে পা রাখতেই দমকা একটা বাতাস এলো বোধহয়। রাস্তায় পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলো উড়তে শুরু করলো।হঠাত্ করেই চারদিক নিকষ কালো হতে শুরু করল।আঁধারে ছেয়ে যাবে খানিকক্ষণের মধ্যেই। আকাশের দিকে তাকাতেই সব রহস্য ভেদ হলো।বৃষ্টি হবে হয়তো।খুব মেঘ জমেছে।গাড়িতে বসে থেকে কিছুই আন্দাজে আসেনি।তবে হাওয়ায় অদ্ভুত কিছু একটা ছিল।

বাড়িতে ঢুকতেই মা এসে জড়িয়ে ধরল। পরম আদরে আদরে ভরিয়ে দিল। আনন্দ অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল দু জোড়া চোখ বেয়ে।

আপু দৌড়ে আসতেই কয়েকটা কিল ঘুসি মেরে দিল।খুব অভিমানী আমার এই বোনটা।তবে অভিমানীদের মন্ও নাকি প্রচন্ড ভাল হয়।বুকে চেপে ধরে কি সব বলছিল আপু।

নাকের মধ্যে খুব পরিচিত একটা গন্ধ ভেসে আসছে।

কারো পায়ের আওয়াজ শুনে আপুর ঘাড়ের মধ্যে মাথা গুজাবস্থায় চোখ খুলে সামনের দিকে তাকালাম।লোকটার দিকে চোখ ফেলতেই হৃদস্পন্দন থেমে গেল।নিশ্বাস ক্ষণ অনুক্ষণ গোনতে লাগলো।ক্রমাগত দম বন্ধ হয়ে আসছে।মনে হচ্ছে কেউ আমাকে বোধহীন করে দিয়েছে।দিক্বিদিক অন্ধকারে ছেয়ে গেল।মুহূর্তের মধ্যেই ঘূর্ণনের বেগ বেড়ে যেতে শুরু করলো।একই মুখ,একই লোক দেখার পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লাম।

জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে সেই পূর্বের নিজস্ব রুমেই আবিষ্কার করি।চারদিকে সবাই আমাকে ঘিরে বসে আছে। চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।সৌরভ একদম চোখের দৃষ্টি ছোড়ার দিকেই দাঁড়িয়ে।মা মাথার শিউরে বসে আছে।আপু যে উটকো চিন্তায় ব্যস্ত তা অবশ্য বুঝতে পারছি।

বুকের বামপাশে চিনচিন করে খুব ব্যথা করছে।কেন করছে সেটা ঠিক জানা নেই। হয়তো বড় কোন রোগ বাঁধিয়ে ফেলেছি! আর নচেৎ কেউ বাঁধিয়ে দিয়েছে। সৌরভের দিকে তাকাতেই পারছিলাম না। বুক ফেটে তীব্র কষ্ট মুক্তি পেতে চাইছিলো। কারণ তারা সেখানে আর থাকতে পারছেনা।তীব্রতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। চোখবুজে জলই ফেলে যাচ্ছি।মায়ের প্রশ্নে স্তম্ভিত ফিরে পাই।

-এখন কেমন লাগছে,হঠাত্ এরকম হলি যে।শরীর খারাপ ছিল?বাড়িতে আসতে কি না আসতেই তোর শরীরের উপর দিয়ে এতবড় ঝর যাবে!আমি তোর জন্য মাজারে মানত করে নিয়েছি।তোকে নিয়ে কাল্ই মাজারে যাব।ওখানে গরিব মিসকিনদের অন্তত একবেলা হলেও পেট পুরে খেতে দিবো।

জননী নামক মানুষটাই হয়তো এরকম হয়।খুব অবাক লাগছে মায়ের এত ভালবাসা চোখে পড়ে।এত্ত ভালবাসা তাদের ভেতর কোথায় জমা হয়ে থাকে!

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে মার বক্তব্যের সাথে সহমত জানালাম।

১৪

আপুর মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। শুনেছি বিয়ের পর মেয়েরা নাকি মোটা হয়;কিন্তু আপুর বেলায় এমন বিপরীত কেন?

সৌরভ নিশ্চয়ই আমার বোনটাকে নিপীড়িত করেছে।বাসর ঘরে হয়তো কোন এক সোফায় বসে রাত কাটিয়ে দিয়েছিল।ঘোমটার আড়ালে মনে হয় আড়চোখে দেখে দেখে খুব কেঁদেছিল আমার বোনটি।

এক টেবিলেই সবাই খেতে বসলাম। প্রকৃতির নিয়ম খুব উল্টো।মানুষ যা চায় ঠিক তার উল্টোটা হয়।সৌরভের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইছি।কিন্তু..

সৌরভ আমার চোখের সামনের চেয়ারেই বসল।সেদিকে চোখ রাখতে পারছিনা।বুক ফেটে চিত্কার বেরতে চাইছে।প্লেটের মধ্যে নানান রকম রেসিপির খাবার।কিছু মুখে দিয়েই উঠে চলে আসলাম সেখান থেকে।আপুকে ডেকে এনে দরজা আটকে দিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম,আপুর বিয়ে এমন হঠাত্ করে হল কেন?

-জিসান তুই তো জানিসই।গ্যারেজে যে থাকে,ওই জানোয়ার।

ঠিক চিনতে পা পেরে কপালে ভাঁজ পড়ে গেল।-ঠিক চিনিনি। স্পষ্ট করে বলো ।

-আরে রাসেদ। ওর জ্বালানির মাত্রাটা একটু বেশি বেড়ে গিয়েছিল। সবসময়ই কলেজে যাওয়ার পথে অনেক ভাবেই অপদস্থ হই ওর জন্য । তবে তুই বাড়ি থাকাকালীন সেটা একটু দমে ছিল। কিন্তু তুই যাওয়ার পর থেকেই আমার পিছনে সবসময় লেগে থাকতো।

-তুমি আমাকে সেসব ফোনে কেন বলোনি !

-তোকে বললে তুই কি করতে পারতি, কিছুই না। উল্টো তোর অস্বস্তি বোধ হতো। তাই বলিনি।

-খুব ভাবো আমাকে নিয়ে ।

-হুম।

-আচ্ছা তো এরপর কি হল?

-এরপর আর কি? সেদিন ছোট্ট একটা ছেলেকে দিয়ে বাড়িতে চিঠি পাঠায়। আর তা দুর্ভাগ্যক্রমে বাবার হাতে পড়ে। ব্যাস, বাবা সেদিন খুব বকেছিল আমাকে।থাপ্পড়্ও খেয়েছিলাম বিনা অপরাধে ।

-আর বাবা তাতেই তোমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিল?

-আরে না। বাবা রাসেদের কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। যে, ও কি করে। দেখতে শুনতে ঠিক কেমন। আর তখন আমি বাবাকে সত্যিটা বলতে সাহস পেয়ে সবটা বলি।

বাবা রেখেবেগ আগুন হয়ে যায় । তুই জানিসনা কিছু । তখন কি ঘটেছিল । বাবা থানায় এফায়্যার করতে যায় । খুব কষ্ট থামিয়ে রাখি।

আর ঠিক এর পরেরদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে রাসেদ আমার পিছু পিছু ছুটতে থাকে। আমি তার ডাকে সাড়া না দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আর তখন রাসেদ বদমাশটা আমার ওড়না টেনে ধরে। জানিস, তখন না ভয়ে আমার বুকটা খুব কাঁপছিল। আর সেই সময়্ই সৌরভ আমাকে অপমানের হাত থেকে বাঁচায় । বাবা ও তখন পৌছে যায় সেখানে। সৌরভকে দেখতে এতো ভাল লাগছিল যে কি বলব। সাদা এপ্লোন গায়ে। ঘাড়ে ঝোলানো বস্তুটা দেখেই বুঝে যাই সৌরভ ডাক্তার ।

পরে কীভাবে যেন সব হয়ে গেল ।

আপুর মুখ থেকে কথাগুলো শুনতে কখন যে চোখে জল জমে গেছে টেরই পাইনি।

নির্বাক হয়ে আপুর কথাগুলো শুনছিলাম। আপু সৌরভকে খুব ভালবেসে ফেলেছে।তা আমি টের পাচ্ছি।

-আপু, খুব ভালবাসো সৌরভকে?

লজ্জায় আপু মাথা নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে দিল। আপুর চোখের কোণে চিকচিক জল্ও দেখা যাচ্ছে।সেই জলে মিশে আছে না পাওয়ার বেদনা। ভালবাসার অপ্রাপ্তির এক দুঃসহ যন্ত্রণা। তবুও আমার বোন খুশি। তবে আমি কেন কাঁদছি!

১২

রাতটা বোধহয় অমাবস্যার ! চারদিকে বিদঘুটে অন্ধকার।বৃষ্টিও হবে মনে হচ্ছে।আমার পূর্বেকার অভ্যেস পকেটে হাত ঢুকিয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে আছি। উদ্দেশ্য থাকত, যদি আজ আকাশে একফালি চাঁদ , সাথে থাকত অজস্র তারা। তাহলে তারা গুনতাম। কিন্তু আজ আমি ব্যতিক্রমী কিছু করব। অন্ধকারের মাঝে নিজেকে আওড়াবো। অন্ধকারের প্রত্যেকটা পরমাণু বিশ্লেষণ করব। এই অন্ধকারের মাঝেই নিহিত আমার অপরিসীম সেই কষ্ট গুলো। শুনেছি বেদনার রঙ নীল। কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করিনা। নীল রঙ তো খুব সুন্দর । যা আনন্দ দেবার ক্ষমতা রাখে। তাহলে বেদনার রঙ নীল হবে কেন, যা কষ্টদায়ক।

বেদনার রঙ কালো। এই বেদনাই তো জীবনের সব রঙ মুছে দেয়। আঁধারে ঢেকে দেয় জীবনের প্রতিটি পরিচ্ছেদকে।

উদাহরণ স্বরূপ আজকের এই নিকষ কালো রঙের রাত। তাই বেদনার রঙ নীল হতে পারে না। বেদনাররঙ কালো। খুবই কালো।

নীল রঙ ছিল কোন এক ক্ষণে। যখন এই ছাদ থেকে দেখতে পেতাম আমাকে দেখার জন্য রাস্তার মধ্য থেকে কেউ একজন ইতিউতি করছে । তখন ভালবাসার প্লাবনে চারদিক নীল ছিল।তার জন্য প্রাণপণ একটা তাড়া ছিল নিজের মধ্যে। কিন্তু এখন সেই সময় কখনওই আসবে না। পরজন্মে যদিও তা অবিশ্বাস্য । কিন্তু আমি সেই জন্মের অপেক্ষায় থাকব। যদি সে আমার হয়ে জন্মায় ! এ জন্মে আমার দেহে প্রাণস্পন্দন থাকতে কখনওই তা হবে না। আমিই তা হতে দিতে পারিনা। আমি আমার ভালবাসা ধরে রাখতে পারিনি। আমার ভালবাসায় কমতি ছিল হয়তো। সত্যিকারের ভালবাসার পরিণতি নাকি অবশেষে প্রাপ্তিই হয়। সত্যিই কি তাই! কিন্তু আমার বেলায় এমন কেন হল?

চোখ দিয়ে অবিরত ঝর্নার ধারা প্রবাহিত হচ্ছেই। অশ্রুর সৃষ্টি হল আজ থেকে। কখনওই তার অন্তিম হবেনা। চোখ সবসময়ই অশ্রু ঝরাবে। ঠেকানো আমার পক্ষে সম্ভপর নয়। কখনওই নয়। আমি আমার ভালবাসা পেতে পারি। ইচ্ছে করলেই পেতে পারি। কিন্তু ভালবাসার বিরুদ্ধে যেয়ে ভালবাসা আদায় করার মানে কি হতে পারে ? আমার সবটা জুড়েই তো আমার বোনটি। সে ও তো সৌরভের কাছ থেকে ভালবাসা পাবার ক্ষমতা রাখে। সে তো কোন পাপ করেনি। সব পাপ তো আমার ! আমাকে ভাগ্য সম্পর্কে জানার প্রয়োজন ছিল।

কি সব আবোল তাবোল বলছি হয়তো। তবে হ্যাঁ। সত্যিই জানার দরকার ছিল।

তবে হয়তো ভাগ্য আমাকে এখানে টেনে আনতে পারত না।

পাগল পাগল লাগছে নিজেকে।

কিছুটা পাগল হয়তো হয়েও গেছি। মাথার চুলগুলো টেনে ছিড়ে ফেলার ইচ্ছেটা সেই কখন্ই থামিয়ে দিয়েছি। নিয়ন্ত্রণ করার মতো শক্তি তো আমার ছিল। বরাবরই ছিল। এখন থেকে আরো বাড়িয়ে তুলতে হবে। না হয় আমি হেরে যাব, বাস্তবের কাছে হেরে যাব। প্রশস্ত-গভীর এক গর্তে ফেলে দেব আমার পরিবারকে। আমাকে পিশাচীয় হতে হবে। ভালবাসার করুণ অসহায়ত্ব আমাকে বুকে পাথর চেপে সহ্য করতে হবে। জানি খুব কষ্ট হবে। কষ্ট সহ্য করা আরো অধিক কষ্টের। হৃদয় প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত হবে। তা আমি জানি। তারপরও কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না কাউকে।

ছাদে কেউ উঠলো মনে হচ্ছে ।ছাদের দরজা বন্ধ করার আওয়াজ্ও তো পাচ্ছি। পিছন ফিরে তাকালাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার , কিছু ঠাওর করতে পারছিনা। ওখানে কে হতে পারে । অন্ধকারে কিছু স্পষ্ট না হলেও বস্তুর আবির্ভাব বুঝা যায় । এগিয়ে আসছে আমার দিকে। কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। ঠিক আমার মতোই । আমিও অনুরূপ ভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছি। সেই চিরচেনা দুটি চোখ। আমার সর্বনাশ সত্যিই যে চোখে লুকিয়ে ছিল। রক্তিম হয়ে আছে দুটি চোখ।তবে আগের সেই ভালবাসার ছায়া পড়ে নেই সেই চোখে। ক্রোধ, ঘৃণা ,অভিমান,ভালবাসার তৃষ্ণায় মিশ্রিত হয়ে সেই চোখ এখন ভয়ংকর এক রূপ ধারন করেছে।

কিন্তু এতোটা ক্রোধ কার উপর তার? বা ঘৃণাই জন্মালো কার উপর!

খুব কাছে এসে দাঁড়ালো।নিশ্বাসের গরম তাপ আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।শিহরিত হচ্ছি।

সৌরভ কিছু বলার জন্য উদ্যত হল।আমার জায়গায় অন্যকেউ হলে এখান থেকে এখনই প্রস্থান করত। কিন্তু আমি তা করবনা। সবাই বোকামী করে তাই বলে আমি সেরকম ন্ই।আমার মধ্যে এরকম পরিবর্তন,সৌরভের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে না পারা, এ-সব কিছুই সন্দেহের পাল্লা আরও ভারী করে দেবে। আপু বলবে , “তুই কি সৌরভকে আগে থেকে চিনিস? আর ও তোর সামনে গেলে তুই কেমন জানি হয়ে যাস! ব্যাপার কি বলতো?” এতে তো আমি যা চাই তার বিপরীত হবে। সৌরভ আমার কোনদিনের পরিচিত ছিলোনা। এমন ধারনাই সবার মধ্যে বুনতে হবে।

ঝটকা মেরে সৌরভ আমার দুটো হাত চেপে ধরলো। কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেলাম।

-জিসান, তুমি বিশ্বাস কর আমি নিরুপায় ছিলাম। আমার সামনে কোন রাস্তা ছিলোনা। আমি বাবাকে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু সত্যটা বলতে পারিনি।আমাকে তুমি কখনওই ক্ষমা করবেনা তা আমি জানি। কিন্তু আমার কথাগুলো মিথ্যে ভেবোনা। সেদিন বাবা…..

আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল সৌরভ। আমি থামিয়ে দিলাম। বলতে শুরু করলাম।

-সৌরভ আমাকেও তুমি ক্ষমা করো। আর আমি তোমার কথা বিশ্বাস করেছি।

-জিসান বাবা সেদিন হঠাত্ই খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তার বাবার কথা মতো চলতে বলল। কিন্তু আমার তো তার কথা মেনে নেওয়ার সামর্থ্য ছিলোনা। শেষে বাধ্য হয়ে আমি বিয়ে করতে বাধ্য হই। কিন্তু আমি জানতাম না যে তোমার পরিবারের কেউ একজন্ই আমার শিকার হতে যাবে ।

সৌরভের কথায় টনক নড়ে উঠল।

-শিকার হতে হবে মানে?

-তুমি খুব ভাল করেই জানো জিসান। আমি শুধু তোমাকেই ভালবাসি। আমি সেই জায়গায় ভুল করেও কাউকে ভাবিনা। আর তাই আমি ভেবে নিয়েছি যে বিয়ের পর আমি ডিভোর্স নিবো। এবার সে যেই হ্উক না কেন। কিন্তু …

-চুপ করো তুমি। এমন কথা মুখে আনতে তোমার বাধলোনা ? তুমি এতোটা নিচু মানসিকতার ! ছি ! তুমি আপুকে ডিভোর্স দিবে ? এরকম ভাবনা মাথায় আনলে কি করে? আমি বেঁচে থাকতে তা কখনওই হতে দেবনা।

-কিন্তু জিসান আমি তোমাকে ছাড়া একমুহূর্ত্ও থাকতে পারবোনা। বাঁচতেই পারবোনা তোমাকে ছাড়া।

-সৌরভ এটা আবেগ। এটা একটা মোহ। তুমি বাস্তবতাকে মেনে নিতে শিখোনি। ক’দিন পেরোক। দেখবে সবকিছু মানিয়ে নিতে পারছো। তবে তার জন্য তোমার ধৈর্যের প্রয়োজন । কিছুটা ত্যাগের প্রয়োজন ।

মাথাটা ঝুঁকিয়ে দিয়ে কথাটা বললাম।

-তুমি কাকে ত্যাগ করতে বলছো হ্যাঁ? তোমাকে।

কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকুনি দিয়ে বলতে লাগল,

-তুমি আমার শরীরে প্রত্যেকটা অঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে মিশে আছো।আর তুমি সেটাকে মোহ বলছো!আমার সমস্ত ভাবনার রাজত্ব তোমাকে নিয়ে সাজানো। এসব বললে চরম ভুল করবে।তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি সবকিছু ত্যাগ করতে পারব।সব!তবে তোমাকে আমার চাই। সবসময়ের জন্য একদম আপন করে চাই। পরম আকুলতার ধ্বনিতে কথাগুলো বলছে সৌরভ।বুক ফেটে যাচ্ছে অসীম কান্না জমায়।চোখফেটে সেসব বেরোচ্ছে।

ইচ্ছে করলেই এখন বলতে পারতাম যে তাহলে সাধারণ তোমার বাবার কথার অবাধ্যই হতে পারতে।কিন্তু বাবা-মার কথার অবাধ্য হয়ে কেউ কোনদিন সুখী হয়নি।আর সবার উর্ধ্বেই তাদের স্থান।

সৌরভের গলা ভরাট হয়ে বারবার ঝাঁঝালো কণ্ঠ বের হয়ে আসছিল।প্রচন্ড উত্তেজিত মনে হচ্ছিল তাকে।যে কেউ হঠাত্ করে সব শুনে ফেলতে পারে। শান্ত হতে বললাম সৌরভকে।উত্তেজিত হতে গিয়েও থেমে গেলো সে।আমাকে বোঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে ও।অতিরিক্ত সবকিছুই ক্ষতিকর,বিপজ্জনক।আমি সৌরভের এই অতিরিক্ত ভালবাসার মূল্য দিতে পারছিনা।মাত্রাতিরিক্ত হীনমন্যতায় ভুগছি।

আমাকে সে কতোটা ভালবাসে,আমি বুঝতে পেরেও না বুঝার ভান করে আছি।

আমি জানি সৌরভ আপুকে কোনদিনও মেনে নিতে পারবে না।কিন্তু এটা তো হতে পারেনা।আমার জন্য আমার বোন

জীবনের সাথে এতবড় লড়াই করবে?

-সৌরভ,আমি তোমাকে একটা কথা বলে দেই।তুমি এখন আমার শিকলে নেই। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ তুমি।আর সেই বন্ধনের মূল সূত্র আমার বোন।তুমি আমার আপুকে,স্ত্রী মর্যাদা,ভালবাসা, প্রাপ্য অধিকার সবকিছু দিতে হবে।যেটুকু আমার জন্য গচ্ছিত ছিল।

সৌরভ আতকে উঠে কি সব বলতে যাচ্ছিল।কিন্তু আমি আবারও তাকে থামিয়ে দিয়ে বলতে শুরু করলাম।

-আমি জানি তুমি কি বলবে।তবে আমাকে প্রকৃত ভালবেসে থাকলে বিনাবাক্যে আমার কথা মেনে নেবে। আমার ভাল থাকাতেই তোমার ভাল থাকা হবে।সুতরাং আমার বোনকে তুমি স্বাভাবিক ভাবে সবটুকু ভালবাসা দিলেই আমি ভাল থাকব।

-এসব তোমার মুখের কথা।আমাকে তুমি ভালবাসো।আর ভালবাসার মানুষকে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে সুখী হ্ওয়া যায় না।আর এ জায়গায় যদি অন্যকেউ থাকত তুমি কি এরকম ত্যাগ স্বীকার করতে?কখনওই করতে না।তবে তোমার রক্তের টানে তুমি আমার ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করতে পারো না।

স্তব্ধ হয়ে আছি সৌরভের কথা শুনে। তবুও আমি আমার স্তব্ধতা তাকে বুঝতে দিচ্ছিনা।

-সৌরভ তুমি আর যাই করোনা কেন এতোটা পাগলামো করোনা।আমি তোমাকে ভালবাসিনা।হয়তো কোনকালে ভালবেসেছি।কিন্তু এখন বাসিনা।সৌরভ নামের কোন অধ্যায় আমি আর রাখছিনা।জীবন নামের খাতা থেকে মুছে দিয়েছি সেসব স্মৃতি।

বলেই হনহন করে চলে যেতে উদ্যত হলাম।

পিছন ফিরে সৌরভের উদ্দেশে আবারও বললাম,

– আর শোন,এসব নিয়ে তুমি আর আমাকে কখনও জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। আমি মুক্তি চাই।আর যদি আমার পরিবার সেসব সম্পর্কে কিছু বুঝতে পারে তাহলে আমি তোমাকে কখনওই ক্ষমা করবনা।

মরা কাঠের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে সৌরভ।দরজার কাছে এসে আবারও পিছু ফিরলাম।কিসের টানে?এখনই তো এই মানুষটাকে অমানবিক সব কথাবার্তা বলে এলাম।আর এখন কিনা তার জন্যই কষ্ট হচ্ছে।অদ্ভুত এক মায়া তার প্রতি!

দেওয়ালে রাগের জেরে দু’বার হাত আঘাত হানলো সৌরভ।বুকের ভেতর কোথাও অসহনীয় ব্যথা নাড়া দিয়ে উঠছে।সৌরভের হাতের রক্তও হয়তো এতক্ষণে গড়িয়ে পড়ছে।দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল খুব। কিন্তু আমি সামর্থ্য হীন।সেই ক্ষমতা আমার আর নেই।কেউ বুঝবেও না। কতোটা কষ্ট আমার ভেতরে জমা।

ঝমঝম করে বৃষ্টি নামলো।সাথে সাথেই বিজলি চমকাতে শুরু করল।সেই আলোয় সৌরভের চোখে তীব্র এক প্রতিজ্ঞা দেখতে পাচ্ছি। এই মরণপণ সে কার জন্য নিচ্ছে ? ঠায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজেই যাচ্ছে।অদ্ভুত এক আবেশে জড়িয়ে যাচ্ছিলাম।এগোতে লাগলাম সৌরভের দিকে।থেমে গেলাম। এ আমি কি করছি!নিজেকেই আজ বড্ড অচেনা মনে হচ্ছে।পিছন ঘুরে চলে যেতেই সৌরভ হাত চেপে ধরল।

অন্যহাতে ছাদের দরজা বন্ধ করে দিল। কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি।টেনে হ্যাচঁড়ে নিয়ে ছাদের মধ্যিখানে দাঁড় করালো সৌরভ। চুলগুলো থেকে চুইয়ে চুইয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে সৌরভের।আগের সেই মুখাবয়ব। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল খুব। কিন্তু এমন কেন হল?পৃথিবীর নিয়ম এতো কঠিন কেন,এমন অদ্ভুত কেন?আমার থেকে সেই ক্ষমতা টুকু কেড়ে নিল কেন? পৃথিবীকে অতীতে ঘুরিয়ে দিতে প্রবল ইচ্ছে হচ্ছিল।আগের মতো করে সবকিছু পেতে বড় সাধ জাগছিল।কিছুক্ষণ পরপর বিজলি চমকাচ্ছে।হেলে পড়লাম সৌরভের বুকে।

চিত্কার করে কাঁদতে কাঁদতে লাগলাম।

-সৌরভ এমন কেন হল?তুমি আমাকে এভাবে কেন নিঃস্ব করে দিলে!

হো হো করে কেঁদে উঠছি বারবার।সেই শব্দ বোবা প্রকৃতি ছাড়া কেউ শুনতে পাচ্ছেনা।

আমাকে বুকে শক্ত করে চেপে ধরে শান্তনা দিচ্ছে সৌরভ।

সেই উষ্ণতার স্বাদ আবারও পাচ্ছি।প্রকৃতি আমার অনুকূলে নেই।

কামনার স্রোতে আমি অন্যদিকে ভেসে যাচ্ছি।পাগলের মতো করে ভালবাসতে ইচ্ছে করছিল।সৌরভের ছোঁয়ায় নিজেকে সংযত করতে সক্ষমিত হলাম না। হারিয়ে গেলাম দুঠোটে।রোদে পুড়ে শুকিয়ে যাওয়া সেই বালুকাময় মরুভূমি বৃষ্টি চাইছিল।ভালবাসারসুধা চাইছিল।পিপাসার্ত দুটি দেহ পেচিয়ে যেতে থাকল একে অপরের মাঝে।আমৃত্যু পর্যন্ত ঠিক এইভাবেই সৌরভকে জড়িয়ে ধরে রাখতে ইচ্ছে করছিল।চুমুয় চুমুয় দেহের প্রতিটি লোমকোপ ভিজিয়ে দিতে লাগল সৌরভ।আকাশের বর্ষণে ভিজে দুই দেহ এক দেহে পরিণত হয়ে গেল। আকাশের অশ্রুতে ভিজে দুজন চুপসে যাচ্ছি; কিন্তু ভালবাসা আমাদের জাগিয়ে তুলছে বারংবার।ঝিরিঝিরি বৃষ্টির জলে বস্ত্রহীন দুটি দেহের সীমানা ছুঁয়ে যেতে লাগলো।একে অপরের শরীরের ইঞ্চি ইঞ্চি প্রতিটি স্থান চিনে নিতে লাগলাম। অনু পরমাণুর ন্যায় কোষেও ভালবাসার সেই শিহরণ ব্ইছে। অসম্ভব এক অনুভূতিতে বারবার হারিয়ে যেতে থাকলাম। নিমজ্জিত হলাম ভালবাসার অতল সেই সাগরে।ডুবতে ডুবতে তলিয়ে গেলাম সীমানা স্পর্শিত অন্তিম এক ভূমিতে ।

১৪

এ আমি কি করেছি! আক্ষেপের ছায়া এসে সমস্ত মস্তিষ্ককে নাড়া দিয়ে দিল, ছেয়ে দিল। আমি কার অধিকারে হস্তক্ষেপ করছি তা একবার দেখা উচিত ছিল। আমি তো খুব বড় একটা ভুল করে ফেললাম। এটা কি করে করলাম আমি।

এখনও টপটপ করে বৃষ্টি পড়ছে।

উদোম গায়ে দুটি দেহ একে অপরের সাথে লেপ্টে আছে। কিন্তু এই সম্পর্কের শেষ পরিণত কি? এটা তো ভীষণ অপরাধ ! খুব অপরাধ বোধ হচ্ছে নিজের মধ্যে । সৌরভ টেনে ধরে রেখেছে আমাকে। শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। যেন পালিয়ে যেতে না পারি । কিন্তু আমি কোথায় পালাবো, চাইলেও তো ওর কাছ থেকে পালিয়ে বাচাঁ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদিও চোখের আড়াল হয়ে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। কিন্তু তবুও একটা অদ্ভুত টান আমাকে আমাকে পিছিয়ে দিচ্ছে । এগোতে দিচ্ছে না। কঠিন সেই বাস্তবের মুখোমুখি হতে দিচ্ছে না।

মনে হচ্ছে বুকের মধ্যে দুটো প্রবৃত্তি ঝগড়া বাঁধিয়ে দিয়েছে। একজন বলছে আমি বিরাট অন্যায় করে ফেলেছি; কিন্তু অপরজন তাতে সায় দিচ্ছে না। কারা তারা?

সৌরভের বুক ছেড়ে উঠে বসলাম। সৌরভ হতভম্ব হয়ে আমার পাশে উঠে বসল।

-কি হয়েছৃ জিসান? তুমি কি ব্যক্তিত্ববোধে আক্রমণাত্মক ? আমি জানি, তুমি নিজেকে খুব ছোট মনে করছো। তবে ভুল করছ । আমরা একে অপরকে ভালবাসি। আর ভালবাসায় দৈহিক বন্ধন কোন পাপ নয়। যেখানে হৃদয়ের বন্ধন আবদ্ধ হয়ে আছে।

মাথা তুলে সৌরভের দিকে তাকাতেও খুব লজ্জা লাগছে।

-সৌরভ আমি নিজের মধ্যে ছিলাম না। আর তাই জ্ঞানহীন মানুষের মতোই আমি ভুল পথে পা দিয়ে ফেলেছি।তুমি এটা কক্ষনো মনে রাখবে না, ভুলে যাবে।

আবারও রেগে গেল সৌরভ।ঝাঁকুনি দিয়ে বলতে লাগল,

-তুমি ভুল করেছ?এতো কুত্সিত তোমার ভালবাসা?তুমি আমাকে ভালবাসো। আর আমারই একমাত্র অধিকার তোমাকে একান্তভাবে কাছে পাওয়ার।আর সেটা ভুল নয়।

চুপ করে আছি।সৌরভের কথার স্বরে প্রচন্ড ক্ষোভ ভেসে আসছে। এ দুইদিনে ওর রাগ আর পাগলামোর পরিমাণ সম্পর্কে আমি খুব ভালভাবেই বুঝতে পেরে গেছি।কিন্তু আমার করণীয় কি? এমন দোটানায় কেন ভুগছি আমি !

কিছু না বলেই গা ঢেকে ছাদ থেকে নেমে পড়লাম।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে যেয়েই আপুর চোখাচোখি।আচমকাই শরীরে এক ঝড় বয়ে গেল।খুব বড় একটা অঘটন থেকে আল্লাহ বাঁচিয়েছে।ছাদ থেকে ফিরতে একটু দেরি হলেই তো যা হবার হয়ে যেত।

-কিরে,তোর দুলাভাইও কি তোর সাথে ছাদে ছিল?

আপুর প্রশ্নের জবাবে কি বলব স্থির করতে পারছিনা।হতবাকচিত্তে গলার আওয়াজ একদম লোপ পেয়ে গেছে।

-হ্যাঁ আপু। ছাদেই।

দুষ্টুমির রঙ মাখা একটা হাসি দিয়ে আপু বলল,

-হুম, ছাদে উঠার অভ্যেসটা আর তোর গেলোনা।বলেই আপু সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠল।

১৫

যতদূর চোখ যায় সেদিকে শুধু সবুজ সবুজ।তবে চিরসবুজ নয়।কিছু কিছু গাছের পাতা ঝরে পড়ে একদম শূন্য হয়ে আছে।আমাদের দাড়ানো জায়গা থেকে চোখের দৃষ্টি যতটুকু যায় সেটুকু স্পষ্ট নয়।চোখের দেখা সীমানা দৃষ্টিশক্তির বহির্ভূত-বাইরে।

স্থানটির নাম আদিনা।আমার মা’র মুখ থেকে শুনা।আদিকালের লোকদের মুখে প্রচলিত একটা প্রবাদ ছিল এই স্থানটিকে কেন্দ্র করে।”আদিনা উঠলে,মদিনা দেখা যায়।”

তখন ভাবতাম সত্যিই কিনা! কখনও প্রমাণ করার সুযোগ পাইনি।আজ এসেছি অতীতের কথিত সেই পুরনো মাজারে। এই মাজারটি একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত।চারদিকের সবচেয়ে উঁচু টিলাগুলোর মধ্যে এটাই সবচেয়ে উঁচু । আর এখান থেকে চোখের দৃষ্টি নির্ভরশীল অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায়।এই মাজারে উঠতে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হয়।আর সেই পথটা বেয়ে উঠতে হাতে গোনা ৩০ মিনিট লাগেই তবে যুবক যুবতীদের উপর ।বুড়ো লোকরা একদিন্ও লাগিয়েছে এই মাজারে উঠতে।আবার আরও একটা প্রচলিত কথা আছে।এই সিড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে যে হয়রান হয় ঝিমিয়ে পড়ে তার ভাগ্য খারাপ।এই কথা শুনে আমার খুব হাসি পেয়েছিল।এতো হেঁটে উঁচুতে উঠতে গেলে তো যে কেউই ঝিমোবে। আর এই মাজারে নিয়তসৃষ্ট সব বাসনাই নাকি পূর্ণ হয়।সূতা বেঁধে দিয়ে প্রার্থনা করে কামনা করতে হয় সব কিছু।

মায়েরা সবসময়ই কুসংস্কার একটু বেশি বিশ্বাস করে থাকে।তবে এখানে সেরূপ নয়। এই মাজারের অলৌকিকতা আছে। আর তা আমিও মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করি।

বাড়ি থেকে বের হতে মন চাইছিলনা। তারপরও মা’র নির্দেশে চলে এসেছি।

আমি শেষ সীমানায় উঠে এসেছি। আপু আর মা’ই একদম পিছনে।

সৌরভ বারবার হাঁটুতে ভর করে দম নিচ্ছিল।এতো অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠে সৌরভ !

পুরো পথজুড়েসৌরভের মুখ থেকে একটাও শব্দ বেরোয়নি। কি হয়েছে আজ কে জানে? একদম নিস্তব্ধ হয়ে আছে। চোখদুটো জলন্ত আগুনের মতো জলজল করছে ওর । তবে ওর চোখ আমাকে কিছু একটা বলে দিচ্ছে । সৌরভের চোখে আমি ভয়ংকর এক মরণপণ দেখতে পাচ্ছি। কি সেই পণ?

মা’র হাত ধরে টেনে তুললাম । আপুও চূড়ায় উঠে পড়েছে। এখানে পাহাড়ের চূড়ায় মাজারের একপাশে রান্না করার ব্যবস্থা রয়েছে। কিছু দোকান্ও রয়েছে। মা সেখান থেকে খাবার সামগ্রী কিনে রান্না বসিয়ে দিয়েছে। পাহাড়ে উঠার সিঁড়ি থেকে শুরু করে মাজারের চারপাশে অগণিত এতিম আর অসহায় লোকজন ভিড় জমিয়ে রেখেছে। কারো হাত নেই তো কারো পা নেই। আবার দুটো লোক দেখলাম অন্ধ।

চারদিকে বুনো গাছে ছেয়ে আছে। হাল্কা একটা পরশ বুলানো বাতাস ব্ইছে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নরম সবুজ ঘাস বুনে রয়েছে।

কিছুক্ষণ পরপর কাপড়ের আঁচল দিয়ে মা কপালের ঘাম মুছছিল। কিন্তু কোন ক্লান্তি নেই তার চোখেমুখে । রয়েছে একটা ছোট্ট লক্ষ । এখনই তাকে মাজারে খাবার পরিবেশন করতে হবে।

মা বলল,

-তোরা যা, এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে গাছের মধ্যে সূতা বেঁধে দিয়ে আয়।

আপুর মধ্যে একটা তাড়া দেখলাম। সৌরভকে কিঞ্চিত্ ভয়ের সাথে আপু আমাদের সাথে যেতে বলল। এই ভয়টা ঠিক কিসের? সৌরভের প্রচন্ড ক্ষোভের কারণে ?

বিরাট বড় কয়েকটি গাছ। সমস্ত গাছে লাল-সাদা সুতোয় ঢেকে যাচ্ছে । আর তার একপাশেই জটলা বেঁধে অনেক সূতো রাখা আছে। সেখান থেকে এক এক করে সবাই সূতো নিয়ে ইচ্ছে , আবদার, বাসনা টেনে আনলাম মনের অন্তিম পাড়ে। আর সেখান থেকে মুখ থেকে ফুট ফুট আওয়াজে বাসনার বাক্য উচ্চারিত হচ্ছে । খুব করে চাইব। ঠিক কি চাইব নির্দিষ্ট করতে পারছিনা।

‘হে আল্লাহ, তোমার কাছে একটা প্রার্থনাই করি। সবার ভাল হয় যাতে সেরকম করেই বাস্তবতা তৈরি কর। সৌরভকে আপুর সান্নিধ্যে এনে দাও। আপুর ফোলে উঠা দুটো চোখে প্রাপ্তির হাসি তুমি ফুটিয়ে দাও।’ কোথাও একটু ঘাটতি রয়ে গেল মনে হচ্ছে । গভীর থেকে বলতে গিয়েও মন কোথায় যেন সায় দিচ্ছে না।

নিজের জন্য কি চাইব?

‘সহ্য শক্তি বাড়িয়ে দিও। আর আমার সৌরভকে সুখে রেখ।’

আরও কিছু বলার আগেই আপুর ধাক্কায় স্বাভাবিকতা ফিরে পেলাম।

-এত কি চাস? তোর আবার এতো বাসনা কোত্থেকে ?

বলেই খিলখিল করে হাসতে লাগল আপু। খুব অবাক লাগছে। শত কষ্টের মাঝেও আমার বোনটি নিজেকে কীভাবে স্থির রেখেছে। কারো মনে বিন্দুপরিমাণ সন্দেহ নেই ওদের দাম্পত্য জীবন নিয়ে । কাউকে বুঝতেই দিচ্ছে না। মুখে হাসি ফুটিয়ে রেখেছে ! তাহলে আমি কেন এভাবে ভেঙে পড়ছি !

মাজারে স্থায়ী ভাবেই সবরকম সরঞ্জাম থাকে। আর বিশেষ করে প্লেট। গরীব লোকগুলো প্লেট পেতে বারান্দায় বসে পড়েছে। তাদের মুখ দেখলেই অধীর আগ্রহ কাকে বলে টের পাওয়া যায় ।

রান্না শেষে আমি আর মা সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিলাম। প্রবল উচ্ছাসের মিশ্রণে খুব আনন্দ বোধ হচ্ছিল ।

আপু তো এখানেই ছিল। কোথায় গেল? আর সৌরভকেও তো দেখতে পাচ্ছিনা। গেল কোথায় দুটো ! হঠাৎের মধ্যেই হাওয়া!

মা বারান্দাতেই কাজ সম্পাদন করছে। আমি ওদের খুঁজে মাজারের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়েছি খানিকক্ষণ হল। সামনের দিকে হেঁটে চলছি পাহাড়ের পাদদেশে । কিন্তু ওরা কোথায় ? মাজার থেকে গাছের সীমানা পেরিয়ে এখন খুলা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। হাসির শব্দে কিছুদূরে নজর ছুড়লাম। সৌরভ আপুর হাত ধরে কি খুশি মনেই না হেঁটে চলছে। অনিন্দ্য সুন্দর একটা হাসি ফুটে আছে আপুর মুখটায়। কিন্তু সৌরভের মুখের হাসিতে কেমন একটা ভয় মেশানো। খুব ভাল লাগছিল আপুর মুখে হাসি দেখে। কিন্তু পরক্ষণেই কেমন একটা হিংসাত্মক ভাব মোচড় দিয়ে উঠল বুকের মধ্যে ।

ওরা দুজন পাহাড়ের একদম পাড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । আমি কিছুটা পিছনে।আমি ওদের পিছনে সেটা হয়তো এখনও তারা টের পেয়ে উঠেনি। থাক, টের না পাওয়াই ভাল। আমাকে দেখলে চেপে ধরা দুটো হাত লজ্জা পেয়ে ছুটে যাবে। আমি চাই চেপে ধরে রাখুক। এরকম ক্ষণ্ই তো সারাজীবন অম্লান থাকার প্রত্যাশা করি।

কিন্তু একটা সংকোচ সেই কখন থেকেই মনের মধ্যে জেকে বসে আছে। সৌরভের মধ্যে এমন আমূল পরিবর্তন ! হঠাত্ কি হল?

ফিরে যাব ভাবছিলাম। কিন্তু অদ্ভুত একটা টান যেতে দিচ্ছে না। ওরা দুজন হাঁটতে হাঁটতে পাহাড় চূড়ার একদম শেষ সীমায় পৌছে গেছে। এতো ধারে যাচ্ছে কেন ওরা? পড়ে যাওয়ার ভয় নেই !

আপু বোকার মত হাসতে হাসতে সামনের দিকে এগিয়েই যাচ্ছে । সৌরভ আপুর থেকে সামান্যতম পিছিয়ে ।

চারদিকে অপরূপ-মনোরম প্রকৃতি দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল আপু। হাতদুটো উজাড় করে মেলে দিয়ে প্রাণভরে প্রশান্তি নিচ্ছে।

হঠাত্ করেই সৌরভের মুখের হাসি স্তব্ধ হয়ে গেল। পেশিবহুল দুটো হাত মারাত্মক কিছু একটা ঘটানোর জন্য কম্পিত হয়ে আপুর পিঠে ঠেকল।

শিরা-উপশিরায় , শরীরে ধমনীতে প্রপাতিত রক্ত চরম উত্তেজনায় চেচিয়ে উঠল।

‘আপু’ ! বলে চিত্কার করে উঠলাম। মুহূর্তের মধ্যেই আপুর শাড়ির আচল ধরে সৌরভ আপুকে ধরে নিল। প্রচন্ড হেচকা টানের ফলে উপচে এসে দুজন পাহাড়ের উপর পড়লো। দৌড়ে এগিয়ে গেলাম।

হৃদয়ের সমস্ত ঘৃণার চোখে সৌরভের দিকে তাকালাম। ভয়ে তার চোখদুটো জড়োসড়ো হয়ে আছে। পলক পড়া বন্ধ করে দিয়েছে। হাত-পাকিছুটা কাঁপছে সৌরভের তা আমি টের পাচ্ছি। আপুর মধ্যে সর্বোচ্চ অস্থিরতা আর মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে ফিরে আসার প্রবল সংমিশ্রণ দেখছি। খুব জোরে শ্বাস নিচ্ছিল।

গলার সবটুকু আওয়াজ ছেড়ে দিয়ে বললাম,

-এটা তুমি কি করতে যাচ্ছিলে সৌরভ?

আমাদের দুজনের চোখের ভাষা আপু পড়তে পারেনি। মুখের ভাষায় সে অবাক হয়ে গেল।বলল,

-এই তোর কি হয়েছে? পাগল হলি নাকি! সৌরভ আবার কি করল? ও তো আমাকে …. কি বলব? সৌরভ যদি আজ আমাকে পিছন থেকে না আটকিয়ে ধরত তাহলে এতক্ষণে হয়তো এই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যেত।

আমার চিত্কার শুনে মা এসে উপস্থিত হল। বেশকিছু লোকজন জড়ো হতে শুরু করে দিয়েছে। ঘৃনার উত্তেজনায় তৈরি এক ঘোর থেকে স্তম্ভিত ফিরে পেলাম। নিজেকে যতটা পারি সংযত করতে চেষ্টা করছি।

মিথ্যের আবর্তনে আবর্তিত হতে যাওয়া এই খাটি সত্যের প্রকৃত প্রত্যক্ষদর্শী আমি। কিন্তু আমি এখন কি করতে পারি। সৌরভ এমন কিছু করতে যাবে আমি তা কল্পনার কল্পনাতেও ভাবিনি। এতো বড় জঘন্য একটা কাজ ! ছি! মনে তিরস্কৃত করছি সৌরভকে। এখন আমি সবার সামনে কিছুই বলতে পারবনা, যে সৌরভ কি করতে যাচ্ছিল। খুব কষ্টে চেপে গেলাম দলাপাকানো সবকটা বাক্য।

১৬

রাগে, ঘৃণায় কিছুই ভাবতে পারছিনা। সৌরভ এমন কিছু করার ভাবনা মাথায় আনলো কি করে ! এতোটা অসৎ মন মানসিকতা তার মধ্যে?

সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। নিস্তব্ধ একটা পরিবেশ, শব্দহীন এক ক্ষণ। চারদিকে সুনসান নীরবতা। ছাদের এক কোণে আমি দাঁড়িয়ে আছি। সৌরভকে ছাদে আসতে বলেছি। খানিকটা সময় হয়ে এল কিন্তু সৌরভ এখনও আসছে না। হঠাত্ করেই কারো হাঁটার শব্দ পেয়ে পিছন ফিরলাম।

ঘাড় ঝুঁকিয়ে রেখেছে নিচের দিকে। প্রচন্ড ভয় মেখে আছে মুখে ফলে চুপসে গেছে একদম দুচোয়াল। স্থির হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইল। রাগে-ক্ষোভে,ঘৃণায় শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলাম সৌরভের গালে। হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখ ভর্তি জল দেখা যাচ্ছে । কিন্তু আজ একটুও মায়া হচ্ছে না । কিছু বলার আগেই সৌরভ জড়িয়ে ধরল আমাকে। খুব জোরে চেপে ধরে রেখেছে। তার কান্নার আওয়াজ চারদিকে ভেসে যাচ্ছে । গলতে গিয়েও গললাম না। ঠেলে বুক থেকে ছাড়িয়ে দিলাম। এতো কিছুর পরও অদ্ভুত একটা জিনিস লক্ষ করলাম। আমার চোখেও পানি চলে এসেছে। ভিতরের সব প্রশ্ন বাধঁ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে।

-তোমার এই মুখটা দেখতেও আমার রুচিতে বাঁধছে। তুমি , তুমি এরকম ?কিছু করবে আমি স্বপ্নেও কোনদিন ভাবিনি। এটা তুমি কেন করতে যাচ্ছিলে ! তুমি জানোনা আমার বোনকে কতোটা ভালবাসি।

গাল বেয়ে চোখের জল গড়াচ্ছে।মুছে দিতে দিতে বললাম,

-তুমি কি ভেবেছিলে ? আপুকে সরিয়ে দিলেই তোমার আমার ভালবাসার বাঁধা থাকবে না। ভুল ভাবছো তুমি । এখন যেই প্রাচীর আমাদের মধ্যে তাতে তোমার জন্য এখনও আমার চোখের জল বেরোয়। কিন্তু তুমি যে কাজটা করতে যাচ্ছিলে তাতে আমি তোমাকে খুন করতেও দ্বিধা করতাম না। তোমার প্রতি জন্মান্তরের ক্ষোভ আর ঘৃণা জন্মাচ্ছে আমার ।

সৌরভ একদম নির্বাক হয়ে সব শুনছিল। মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরোচ্ছে না। চুপ করে কি একটা ভাবছে। চোখেমুখে সেই ভাবনার আংশিক প্রতিফলন হয়ে আছে।

-তুমি আর যাই ভাব জিসান, তোমাকে আমার চাই-ই।সেটা আর যে কোন মূল্যেই।

-এখনও তুমি এরকম চিন্তা পোষণ করছ?

-হ্যাঁ ,করছি। আমি জানি, তুমি কোনওদিন আমার হবে না। যতদিন তোমার বোনকে আমি আমার জীবন থেকে না সরাতে পারছি। আর ডিভোর্স হলেই তা হয়ে যেত । কিন্তু তুমি সেটাও হতে দেবে না। আর তাই আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। আমি আমার ভালবাসা আদায় করতে জীবন নিতে এতটুকুও ভাববোনা।সে যাই হউক।

ঝড়ের বেগে হনহন করতে করতে চলে যাচ্ছে সৌরভ।

সৌরভের মুখ থেকে এমন কিছু শুনার জন্য কখনও প্রস্তুত ছিলাম না।তাও আমার চোখে চোখ রেখে কথাগুলো বলল সৌরভ!

আমি সবসময়ই চাইতাম, আমার জীবনে এমন কেউ থাকবে যে আমাকে খুব ভালবাসবে। কিন্তু এরকম পাগলের মত ভালবাসা ! এরকম তো চাইনি! এটা তো আমার জীবন বিষিয়ে দিবে। অন্ধকারে ঢেকে দেবে দেখছি আমার পরিবারকে । এখন আমি কি করব ! সৌরভকে যে করেই হউক থামাতে হবে। বোঝাতে হবে সবটুকু। পিছন থেকে আবারও ডেকে ফিরালাম সৌরভকে। প্রাণপণ দিয়ে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করছি।

-সৌরভ, এতটা পাগলামো করোনা। তুমি এরকম কখনওই করতে পারোনা।

তোমার কাছে করজোড়ে মিনতি করি।

-তাহলে তুমি আমার হাত ধরো। কথা দাও আমার সাথে পৃথিবীর শেষ সীমায় যেতেও সংকোচ করবে না। সারাজীবনের জন্য আমাকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচতে হবে। কথা দাও।

হাত তুলে ধরল সৌরভ।

মনে হচ্ছিল পায়ের নিচ থেকে মাটি আলগা হতে শুরু করে দিয়েছে। ক্রমশ চারদিক কেমন ঘুরছে। পিছু হটলাম সৌরভের এমন দোটানার প্রশ্নে।

সৌরভ আবারও এগিয়ে এল।

-কি হল, কথা দাও।তোমার সামনে দুটো পথ উন্মুক্ত।হয়তো আমার সাথে দেশ ছাড়বে। নয়তো আমার যা করার আমি করব।

করণীয় কি?আমি কি করব। চারদিকে ঘোর অন্ধকার দেখছি।

-সৌরভ প্রীজ বুঝতে চেষ্টা কর। তুমি তো আমাকে ভালবাসো।আর আমার সবকিছুকেই তোমার প্রাধান্য দেয়া উচিত।আর তার মধ্যে আমার পরিবার, আমার বোন সবার উর্ধ্বে। তুমি আমার বোনের কিছু করতে পারোনা।

-হা হা হা।

অট্টহাসিতে ফেটে পড়লসৌরভ।

– হা। ভালবাসা । ভালবাসা কাকে বলে তুমি জানো? তুমি আমাকে ভালবাসতে না? আমার ভালবাসার কি মূল্য দিলে তুমি ! তুমি তোমার বোনের সুখের জন্য আমার ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করছো!

-সৌরভ এসব কিছু ভাগ্যের নিয়মেই হয়ে যাচ্ছে-হচ্ছে । এতে আমার বা তোমার কিচ্ছু করার নেই। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আমাদের মেনে নিতে হবে।

-না। কখনওই না। আমরাই আমাদের ভাগ্য গড়ি। আমি তোমাকে ভালবাসি জিসান। খুব বেশি ভালবাসি। ভাগ্যের পাল্লায় আমি তোমাকে তুলে দিতে পারবনা।

আমার দুগালে সৌরভ তার কোমল দুটি হাত দিয়ে চেপে ধরল। চোখে তার পরম ব্যাকুলতা । আকুতি জড়িত কন্ঠে বলতে লাগল, জিসান ‘আই রিয়্যেলি লাভ ইউ’।

-একে ভালবাসা বলেনা সৌরভ। তুমি আমার চাওয়া পাওয়ার কোন মূল্য দিচ্ছো না।একে ভালবাসা কখনওই বলেনা।

খুব জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে সৌরভ ছেড়ে দিল আমাকে।ওর পাগলামোর পরিমাণ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে।দিক্বিদিক নিকষ কালো আঁধারে ছেয়ে যাচ্ছে আমার।

ছাদ থেকে নেমে গেল সৌরভ।খুব ভয় করছে আমার।হঠাত্ করে যেকোনো সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে।তা আমি টের পাচ্ছি।কেন জানি মনে হচ্ছে সৌরভ বেশিক্ষণ বাঁচবে না।কেন জানি মনে হচ্ছে মরে যাবে সৌরভ।মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে সে দাঁড়িয়ে আছে।

চুপচাপ নিঃশব্দে পা টিপেটিপে মৃত্যু এগোয়।তার আওয়াজ খুব ক্ষীণ কিন্তু অত্যন্ত তীক্ষ্ম।তা আমি টের পাচ্ছি।

১৭

ঘরে এসে পায়চারি করছি।অস্থিরতার বেগ ক্ষণ অনুক্ষণ প্রবল বৃদ্ধি পাচ্ছে । জানালা দিয়ে সৌরভ আর আপুর ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে আছি। নিজেকে যতোটা পারি শান্ত করে বিছানায় এসে পড়লাম।বালিশে মাথা কাত করে দিয়ে ভাবনার জালে পেঁচিয়ে যেতে যেতেই একসময় দুচোখ বুজে এল।

খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে সৌরভকে নিয়ে।ও কি সত্যিই এমন কিছু করতে পারবে!শুনেছিলাম ও পাগলামো একটু বেশিই করে।কিন্তু তাই বলে এতোটা! ছটফটানির পরিবর্তনটা ক্রমশ বাড়ছে। খুব ভয়ে ভয়ে আপুর ঘরের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।পর্দাটা সরিয়ে সন্তর্পণে ভিতরে দৃষ্টি ছুড়লাম।বেঘোরে ঘুমোচ্ছে আপু।কিন্তু এরকম দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে হবে তা কখনওই হয়তো ধারণা করিনি।সৌরভ ঘুমন্ত আপুর বুকে চাকু বসিয়ে দিয়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছে আপুর সমস্ত শরীর।ভেতর থেকে দানবাকৃতির এক চিত্কার বেরিয়ে এল সাথে সাথে।

‘আপু’ বলে চিত্কার করে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলাম।

গলার ভেতর শুকিয়ে কাষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে। মা এসে উপস্থিত।খুব জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করে দিয়েছি।মনে হচ্ছে বুকের মধ্যে কেউ ভারি এক পাথর আটকে দিয়েছে।যা সরবার নয়।চাইলেও কেউ সরাতে পারবে না।এভাবে চিত্কার করে উঠাতে মা’র কিছুটা অবাক লাগছে।গ্লাস থেকে ঢকঢক করে পুরোটা পানি খেয়ে নিলাম।কি হয়েছিল মা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন।দুঃস্বেপ্নর কথা বলাতে শান্তনা দিতে শুরু করলেন।শুইয়ে দিয়ে দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

বিছানা থেকে উঠে বসলাম।এরকম একটা দুঃস্বপ্ন আমি দেখলাম কেন? সত্যিই কি এরকম কিছু ঘটতে যাচ্ছে?

নিজেকেই প্রশ্ন করতে লাগলাম।যদি সত্যি হয়ে যায় এ স্বপ্ন!

দম বন্ধ হয়ে আসছে।মনে হচ্ছে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেওয়ারও কোন স্থান নেই পৃথিবীতে।অবশেষে পেরে উঠতে না পেরে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়লাম।উদ্দেশ্য সৌরভকে দেখব।

দরজা ঠেলে প্রবেশ করলাম আপুর ঘরে।বাহির থেকে খোলা যে দরজা।তাহলে সৌরভ কি ঘরে নেই।যথাসাধ্য নীরবতার সঙ্গে আপুর ঘরের একপাশে আড়াল হয়ে পড়লাম।নিষ্পাপ একটা মুখ।দেখতে কতোই না সুন্দর!এই মুখটাকেই কেউ হত্যা করতে চায়!পাশে একটা ছোট্ট টেবিল পাতা আছে।তাতে কিছু ফল,কাঁটার জন্য ছুড়ি আর একটা জগ রয়েছে।সাথে একটা গ্লাসও।কিন্তু সৌরভ কোথায়?

মুহূর্তের মধ্যেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল সৌরভ।দরজা বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় এসে বসে পড়লো।ওর চোখ আজ রক্তপিপাসু।নিষ্ঠুরতা আর পাষন্ডতার মুখোশে আবদ্ধ।খুব সাবধানে সৌরভের কার্য সম্পাদন দেখে নিচ্ছি।বিছানার পাশ থেকে দুহাতে একটা বালিশ তুলে নিয়ে আপুর মুখের দিকে ঝুঁকছে।কিছু বুঝে উঠার আগেই সৌরভ আপুর মুখের মধ্যে বালিশ চেপে ধরল।দম বন্ধ হওয়াতে ছটফট করতে লাগল আপু।তাত্ক্ষণিক আমার চিন্তা করার শক্তি লোপ পেয়ে গেল।কিছু না ভেবেই ছুটে গিয়ে টেবিল থেকে ছুড়িটা নিয়ে সৌরভের পিঠে বসিয়ে দিলাম।

পরিবেশ ভারী হয়ে আছে।কিছু মুহূর্তের জন্য পলক পড়ছে না কারো চোখের।মূর্ছা যাওয়ার মত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আপু।নেই কোন নিশ্বাসের শব্দ।স্তব্ধ হয়ে গেছে চারপাশ।মেঝেতে ঢলে পড়ে গেল প্রাণহীন একটা দেহ।রক্তে লাল হয়ে গেল সেই মেঝে।

এ আমি কি করলাম।আচমকাই শরীরটা কেমন হিমশীতল হয়ে আসছে।শরীরের রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।হাত-পা জমে আসতে শুরু করলো।

প্রচন্ড চিত্কারে জড়িয়ে ধরল আপু সৌরভকে।মা-বাবা এসে উপস্থিত।

দুদিকে নজর দিয়েই হয়তো সব বুঝে গেছেন।ডানহাতে আমার রক্তে মাখা একটা ছুড়ি।পাশেই লুটিয়ে পড়ে আছে এই ছুড়ির আক্রমণের শিকার।

বাবা-মা দুজনেই সৌরভের পাশে বসে পড়ে চিত্কার জুড়ে দিয়েছে।খানিকক্ষণ হল তাদের চিত্কারের প্রকৃতিও মর্মাহত।

শার্টের কালার ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে আপু জবাব চাইতে লাগল।এ কাজ আমি কেন করলাম।কি বলব আমি।সে প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।কোনদিন হবেওনা।বিমূর্ত প্রতিকের মতো দাঁড়িয়ে আছি। মা এসে কয়েকটা চড় বসিয়ে দিয়েছে।আপু অনবরত কেঁদেই চলেছে। তার চোখের জলে অফুরান ঘৃণা মিশে আছে। যা পূর্বে আমার প্রতি ভালবাসাই ছিল। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো খুব তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে।

সকাল হয়ে এসেছে। সমস্ত রাজ্যের লোকের সমাগম আজ আমাদের কুটিরে। ‘খুনী’ ভেবেই সবার নজর আমার দিকে। আমি সেই মরাকাঠের ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। বাহিরে পুলিশের গাড়ির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু আমি আজ হুমায়ুনের মজিদ। যার কোন অনুভূতি নেই,ভাললাগা নেই। অনুভূতি হীন একটা দানব আমি।

পুলিশের দুটো কর্মকর্তা এসে হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিচ্ছে। মা এখনও ধাক্কাচ্ছে আমাকে। তার প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।আমি নিশ্চুপ-নিষ্ঠুর ।

টেনে হ্যাচঁড়ে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিয়েছে পুলিশ আমাকে। গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা ঐ রক্তাক্ত দেহ আমাকে টানছে।

এতকিছুর পরও আমার অদ্ভুত লাগছে । ভীষণ অদ্ভুত লাগছে। আমি যে তার হত্যাকারী। কিন্তু তার জন্যই কষ্ট হচ্ছে ।

দুচোখ ফেটে গাল বেয়ে ভালবাসার অশ্রু ঝরে পড়ছে।

নির্মমতার মুখোশ আজ আমাকে কঠিন ভাবে ঢেকে ফেলেছে।

কি এমন চেয়েছিল সৌরভ !

শুধুই তার জিসানকে। খুব একা, খুব নির্জন এক প্রকৃতিতে আমাকে নিয়ে ভালবাসার ঘর সাজাতে। হাতে হাত রেখে পথ চলতে, ভালবাসার নায়ে পাড়ি জমিয়ে অচিন দ্বীপে ভিড়তে। কিন্তু আমি এতটাই অক্ষম ছিলাম তার এই চাওয়া- পাওয়ার কোন মূল্য দিতে পারলাম না।

নিষ্পাপ এক ভালবাসার কাঙালকে হত্যা করলাম আমি।

কখনওই পরজন্মে বিশ্বাসী ছিলাম না। কিন্তু আজ থেকে আমি আবার জন্ম নেওয়ার প্রার্থনায় ব্রত হব। আমাকে যে আবার আসতেই হবে। একান্তই সেই মানুষটার হয়ে । যখন ভালবাসা আমাদের বন্ধন হয়ে আমাদের আঁকড়ে ধরবে। আমি তো তার মাঝেই হারিয়ে গেছি। বেঁচেও মরে গেছি বারবার। আমি হাজারবার জন্ম নেব। একবার নয় , বারবার তোমার ভালবাসা কাঙাল হবো।

গাড়ি স্টার্ট হয়ে যাচ্ছে । বুক ফেটে জন্মান্তরের কান্না গুলো বেরিয়ে যাচ্ছে ।

আর কখনওই মা খাবারের প্লেট ভর্তি করে তুলবেনা। চিন্তিত দেখলে কেউ এসে জিজ্ঞেস করবে না ,’কি হয়েছে ভাই’ ? পিঠ চাপড়ে কেউ উপদেশ শুনাবেনা। সে ক্ষমতা আমি হারিয়ে ফেলেছি। এতকিছুর ধামাচাপায় যেই নিদারুণ সত্যটা ঢেকে আছে তা কি আদৌ কেউ জানে , জানবে কখনও ? চিরকাল অজানাই থাকবে। চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছে চিরচেনা দুটো চোখ। গাড়ির কাঁচের ফাঁক দিয়ে দেখা উজ্জ্বল দুটো চোখ। সদ্য প্রস্ফুটিত হাসোজ্জল সেই মুখটা থেকেও আমি বিদায় হয়ে যাচ্ছি।

আর কখনওই ঘাড়ের কাছে এনে মাথা গুজে দিবেনা কেউ। খোঁচা খোঁচা দাড়ির শিহরণ জাগানো সেই স্পর্শও আমায় কখনও ছুবেঁনা।

অদ্ভুত এক মায়া আমাকে টেনে নিচ্ছে। চাতকের মত ঘাড় বাঁকা করে তাকিয়ে আছি রক্তাক্ত সেই মানুষটার দিকে।অদ্ভুত সেই মায়া আমার ঘাড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে। ওই লাশের পাশেই যে আমার সব রেখে এসেছি। হৃদয় পড়ে আছে ওখানে।

যদিও গাড়ি চলছে সামনের দিকে। আমি তাকিয়ে আছি। দৃষ্টিশূন্য হয়ে আসছে দেহটা। আমি তবুও তাকিয়ে আছি । যদিও এক নিষ্ঠুর দেহ অন্যদিকে ভেসে যাচ্ছে ।কিন্তু অদ্ভুত টান আমার হৃদয় টেনে নিচ্ছে সৌরভের কাছে।

“সমপ্রেমের গল্প” ফেসবুক পেইজ হতে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.