সেক্রিফাইস

লেখকঃ সেমিকোলন

১।

অফিসিয়াল ট্যুরে কক্সবাজার যাওয়ার কথা। ভাবছি একটা কমপ্লিট ড্রেস বানাব, সেই উদ্দেশ্যে রেইমন্ড শো রুমে যাওয়া সপ্তাহ তিনেক আগে। ওখানে গিয়েই আমার বয়সি একটা ছেলের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল কয়েকবার। ছেলেটার হাইট মিনিমাম ৬ ফিটের একদিক ওদিক, অফ হোয়াইটে ন্যারো প্যান্টের সাথে ব্ল্যাক শার্ট আর মুখের ফ্রেঞ্চ কাট দাড়িতে অপূর্ব লাগছিল। মনের অজান্তেই দৃষ্টিটা বার বার তার উপর যাচ্ছিল এবং সেও আড়চোখে মাঝেমাঝে তাকাচ্ছিল। ড্রেসের কালার সিলেকশনে যখন দ্বিধাগ্রস্থ আমি, ঠিক সেই মুহুর্তে ছেলেটা পাশে এসে গায়ে একটা কাপড় দিয়ে বলল-
-স্যার, এটাতে আপনাকে অনেক সুন্দর লাগবে।

আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম-
-আপনার থেকেও??

সেও হাসির জবাব দিয়ে বলল-
-আমি সুন্দর নাকি?
-এতদিন জানতেন নাহ?
-কেউ এমন করে বলেনি তো.. ।

প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য কর্তব্যরত কর্মচারীকে কাপড়ের দাম জিজ্ঞাস করলাম। দাম শুনে আক্কেলগুড়ুম, সেলাইসহ মোট ১৪ হাজার! আমার লাইফে কখনো এত টাকা খরচ করে পোষাক কিনি নাই। কাপড়টা সত্যিই পছন্দের ছিল, সাথে ছেলেটির মন রক্ষার্থে মধ্যবিত্ত পকেটের গলায় চুরি বসালাম। আমি টাকা পে করতেই রাজকুমার হাত বাড়িয়ে বলল-
-নাঈম, এখানকার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছি।
– ফারহান, একটা প্রাইভেট ব্যাংকে আছি।
-কোল্ড ড্রিংকস না কফি?
-কফি হলে মন্দ হয় না তবে সুগার ছাড়া।

ঘটনাট এখানেই শেষ হলেও পারত। কিন্তু নাঈমের ব্যাপারটা যেন একটু বাড়াবাড়িই ছিল। ভেবেছিলাম নাঈম ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়েই আমার সাথে এমন সৌজন্যতাবোধ দেখিয়েছিল সেদিন। আমার ধারনাটা যে ভুল তা আজকে বুঝলাম। পোষাকটার ডেলিভারী ডেট ছিল আজ। আমাকে দেখে নাঈম তার আসন থেকে উঠে কোলাকুলি করে বলে,
-কেমন আছেন ফারহান সাহেব??

অবাক সুরে বললাম –
– নামও মনে রাখছেন?
-মনে রাখাটা কি খুব অন্যায়?
-সেটা বলছি না। এখানে প্রতিদিন আমার মত ক্রেতা শতটা আসে। সবাইকে কি মনে রাখা সম্ভব?
-একজনকে তো সম্ভব!

এই বলে দুটো কোল্ড ড্রিংকস দিতে বলল আমার অনুমতির অপেক্ষা না করেই।

কোল্ড ড্রিংকস খাওয়া শেষ হতেই নাঈম তার ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিয়ে আমারটা চাইল। আমি নাঈমকে আমার ভিজিটিং কার্ড দিতে চাচ্ছিলাম না কারন সুন্দরের প্রতি আমার এক ধরনের এ্যালার্জি আজে। তাই সকল প্রকারের সুন্দর থেকে নিজেকে দুরে রাখি। কিছু কিছু ফুল শুধুমাত্র বাগান আর ফুলদানীতেই মানানসই, হাতে নিলে সৌন্দর্য হারায়। নাঈম আধুনিক যুগের আলট্রা মমডার্ন ছেলে। আমরা দুইজন দুই গ্রহের। আমি চাইনা নাঈমের সাথে আমার যোগাযোগটা বাড়ুক তাই মানিব্যাগের চিপাচুপা একটু খোঁজাখুজি করে বললাম-
-সরি, কার্ড শেষ হয়ে গেছে। আমি আপনাকে ফোন করব বলে বিদায় নিলাম।

শো রুমের বাইরে এসে খুব খারাপ লাগছিল, ইচ্ছে করছিল ভিতরে গিয়ে ওকে কার্ডটা দিয়ে আসি পরক্ষনে মনকে শক্ত করে বাইক চেপে বসলাম। বাইক স্টার্ট দিবো এমন সময় ফারহান ডাকে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখি হাস্যজ্বল মুখে নাঈম এগিয়ে আসছে। প্রশ্ন ছুড়লাম,
-লাঞ্চ তাহলে বাসায় গিয়ে করেন??
-কেন, ড্রপ করবেন?
– বাইকের তেল বেশি হয় নাই যে অপচয় করব!
-ওহ!, থাক লাগবে না, দুপুরের খাবার আমি এখানেই খাই।

আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই নাঈম হঠাৎ করে তার হাত থেকে একটা ব্যান্ড খুলে আমার হাতে পরিয়ে বলল-
-ফ্রেন্ডস??
আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়, নাঈমের হাতের স্পর্শে শরীরে অন্যরকমের এক শিহরন বয়ে গেল। সবকিছুই স্বপনের মত লাগছিল। মোবাইলের রিংটোনে স্বম্বিত ফিরে পেলাম। মোবাইল বের করে দেখি বসের ফোন। নাঈমকে বললাম-
– এখন যেতে হবে।
-ওকে যান কিন্তু ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট টা তো অন্তত এ্যাকসেপ্ট করুন!

ওর কথা বলার ধরনে আমি না হেসে পারলাম না, বললাম-
-ওকে, উই আর ফ্রেন্ডস নাউ। হ্যাপি??
নাঈম বাচ্চাদের মত খুশি হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমার শরীরে আরেকবার বিদ্যুৎ খেলে গেল নাঈমের শরীরের স্পর্শে। অবস্থা বেগতিক হবার আগেই ওর বাহু থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম এবং নাঈমের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

২।

ফারহান কে বিদায় দিয়ে নাঈম তার রুমে এসে বসল। সে খুব অস্বস্তিতে আছে। অজান্তেই বারবার বাইকওয়ালা ছেলেটার কথা মনে পড়ছে। যদিও ছেলেটির আহামরি কোন সৌন্দর্য নেই। তবে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বুঝা যায় ওর মত সুন্দর ছেলে পাওয়া দুস্কর। গায়ের রং শ্যামলা, বাঁশির মত লম্বা নাক, ফারহানের চোখের সাথে তুলনা করার মত কোন উপমা নাঈম এই মুহুর্তে খুজে পাচ্ছে না। ছেলেটার চোখেই সে নিজের সর্বনাশটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। ওর চোখের দিকে তাকালে অদ্ভুত এক মায়ার জালে সে জড়িয়ে যায়। ভেবে পাচ্ছেনা ফারহান কেন তাকে তার ভিজিটিং কার্ড দিল না? আসলেই কি ফারহানের কাছে ভিজিটিং কার্ড ছিল না? ভাবনায় ছেদ পড়ল অফিস ডাকে-
-স্যার, দুপুরের খাবার।
-টেবিলে রেখে যাও।

খাওয়ার শেষ করে নিয়ে নাঈম তার পালসার হাকিয়ে টি.এস.সির উদ্দেেশ্য বেরিয়ে পড়ল। অনেকদিন থেকে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া হয়না। টি, এস, সি গেলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হবে। আদনান, দিয়া, অপুদের সাথে আড্ডা দেওয়াও হবে তার সাথে ফারহান নামের ভুতটাকে মাথা থেকেও নামানো যাবে।

টি এস সি এসে নাঈমের সত্যি সত্যি অনেক ভাল লাগছে। নাঈমকে পেয়ে সবাই খুব খুশি। আগে ওরা সবাই একসাথে আড্ডা দিত বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত, নাঈমের জব হওয়াতে ও আর আসতে পারতো না। নাঈমকে দেখে খুশিতে দিয়া মরিচের চা অর্ডার করল। নাঈম বলল-
-তোরা মরিচের চা খা, আমাকে মাল্টা চা দিতে বল।

নাঈম ঝাল খেতে পারে না। ভাত খেতে গিয়ে তরকারীতে একটু ঝাল পেলেই নাঈমের সারা শরীর ঘেমে যায়। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম পড়ে, দিয়া সেটা জানে। তাই সে ফাজলামো করে বলল-
-ঝালের জন্য খাবি না তো? তোর ঝাল লাগলে আমি আমার মিষ্টি ঠোট দিয়ে তোর ঠোট চুষে দিবো নি।
দিয়ার কথায় নাঈম লজ্জায় লাল হয়ে গেল, সেটা দেখে অপু বলল-
-বেচারাকে আর লজ্জা দিস না, দেখ কেমন লাল বাবু হয়ে গেছে।

৩।

মধ্যবিত্ত পরিবারের অতি সাধারন একটা ছেলে আমি। ঘাসের বুকে শিশিরের যে সৌন্দর্য থাকে তাও আমার নেই। মাঝেমাঝে আমার মনে হয় শুধু বঞ্ছিত আর অবহেলিতদের দলে ভীড় বাড়াতেই পৃথিবীতে আগমন। তা না হলে খুব ছোটবেলায় মাকে হারাবো কেন? কষ্টে বুকটা ফেটে যেত যখন দেখতাম আমার কোন বন্ধুদের তার মা আদর করছে। মা’হীন একটা ছেলের শৈশব, কৈশর কিভাবে কাটে তা শুধু ঐ ছেলেটিই জানে। বাবা অবশ্য মায়ের অভাবটা ওভাবে বুঝতে দেয় নাই তবে কোথাও যেন একটু শুন্যতা থেকেই যায়। বাবা মায়ের মত আগলে রাখত কিন্ত মা তো আর নাহ! বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রচন্ড বাস্তববাদী হয়ে গেলাম, না হয়ে অবশ্য উপায়ও ছিল না। বাবা কৃষক পাশাপাশি একটা ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। বাবা তেমন একটা লেখাপড়া করে নাই কিন্তু তার ইচ্ছে ছিল আমি শিক্ষিত হই। ভার্সিটি এ্যাডমিশনে কোথাও চান্স না পেয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম এবং উঠলাম মেসে। জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের শুরু। প্রথমে খুব কষ্ঠ হলেও মানিয়ে নিলাম। একসময় অনার্স শেষ হল, এরমধ্যে ছোটবোন ভার্সিটিতে ভর্তি হল। বাবাকে এতদিন ছোটবোনই দেখাশুনা করত, ও ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়াতে পড়ে গেলাম বিপাকে। এগিয়ে এল বড় আপা। বড় আপার বাসা আমাদের বাসার কাছাকাছি। আপার হাজব্যান্ড এবং আপা আমাকে আস্বস্ত করে বলল আমি যতদিন না পড়াশুনা শেষ করে ভাল জব করছি ততদিন বাবাকে উনারাই দেখাশুনা করবে। বাবাকে নিয়ে যে দুঃচিন্তা ছিল তা কেটে গেল। আমাদের দুইভাইবোনের খরচ বহন করতে বাবার একটু কষ্ঠ হবে ভেবে আমি একটা পার্ট টাইম জবে ঢুকে পড়লাম। ভালই চলছিল দিনকাল।

দু’টা টাকা আয় করতে না করতেই হঠাৎ মাথায় মেস ছাড়ার ভুত চাপল। অনেক খোজার পর একটা ফ্যামিলির সাথে সাব-লেটে উঠে গেলাম। অল্প কয়েকদিনে আমি ঐ পরিবারের একজন হয়ে উঠলাম। প্রথম দিকে হোটেলের খাবার দিয়েই পেট চালাতাম।কিন্তু কিছুদিন পরে আন্টির অনুরোধে ওনাদের সাথেই খেতে লাগলাম।

একদিন গ্রাম থেকে আন্টির ভাই বেড়াতে এল। আমাদের তিন রুমের ফ্ল্যাট। একরুমে আংকেল আন্টি, এক রুমে তার মেয়ে আর অন্যটায় আমি থাকতাম। জায়গা সংকটে আন্টি রাতের বেলা তার ভাইকে আমার রুমে থাকার অনুরোধ করল। আমিও না করতে পারলাম না।

আন্টি চলে গেলে আমি রফিক মামার দিকে তাকালাম। দেখতে শুনতে ভালই তবে একটু শর্ট আর বয়সে মনে হচ্ছে আমার ২-৩ বছরের বড় হবে। ভদ্রলোক খুব মিশুক। হড়হড় করে তিনি উনার জীবনের নানান কাহিনী আমার সাথে শেয়ার করা শুরু করলেন। আমার খুব বিরক্ত লাগছিল কারন উনি কথায় কথায় আমার গায়ে হাত দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে আমি হাই তোলার অভিনয় করে শুয়ে পড়লাম এবং ওনাকেও শুয়ে পড়তে বললাম। ভদ্রলোক শোবার কিছুক্ষণ পরেই নাক ডাকাও শুরু করলেন। শুধু তাই নয়, একটু পরে উনি কোলবালিশ মনে করে উনার একটা পা চড়িয়ে দিলেন আমার শরীরে। আমি চরম বিরক্তিতে পা টা সরিয়ে দিলাম, পা সরিয়ে দিতেই ডান হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। হঠাৎ করেই আমার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। বিরক্তিও ভর করল মুখে, আমি সবসময় একা ঘুমাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ঘুমানোর সময় কারো শরীরের সাথে আমার শরীর লাগলে ঘুম আসে না। সব মহলেই আমি ভদ্র ছেলে বলে পরিচিত। তাই অন্যান্য বন্ধুদের মত প্রেমের নামে মেয়েদের শরীর নিয়ে খেলার সৌভাগ্যটা হয়ে উঠে নি। গভীরভাবে এই প্রথম কেও আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি আস্তে করে রফিক মামার হাতটা সরিয়ে দিয়ে দুইজনের মাঝখানে কোলবালিশটা রেখে পাশ ফিরে শুইলাম, সারাদিন অফিস করে খুব টায়ার্ড ছিলাম তাই ঘুমিয়েও গেলাম তাড়াতাড়ি।

মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে নিজেকে আবিস্কার করলাম রফিক মামার বাহুডোরে। আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। ইতিমধ্যে উনি আমার ঠোট দুটো উনার তার মুখে নিয়ে নিছে। অদ্ভুত এক ভাল লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। এরপর উনি ঠোট ছেড়ে আমার পুরো শরীরে চুমো দিতে শুরু করল। আমি আর বাধা দিলাম না। আমার বাধা না পেয়ে মামার সাহস আরও বেড়ে গেল।আমি উত্তেজিত হলে উনি এক অদ্ভুত উপায়ে আমাকে দিলেন এক স্বর্গীয় প্রশান্তি।

খুব সকালে আমি বেরিয়ে গেলাম কারন আমাকে ৮.৩০ এর মধ্যে অফিসে যেতে হয়। অফিসে এসে স্বস্তি পাচ্ছিলাম না, ঘুরেফিরে মাথায় গতরাতের ঘটনাটা মনে পড়ছে। এটা একটা নিতান্তই দুর্ঘটনা ভেবে ভুলে থাকতে চাইলাম কিন্তু পারলাম না। সারাটাদিন অতিবাহিত করলাম প্রচন্ড অস্থিরতায়। কাজ শেষ হলেও বাসায় না গিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ালাম। নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। আশেপাশে সুন্দর কোন ছেলে দেখলেই আমার দৃষ্টি তার দিগে চলে যাচ্ছিল। চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম নিজের মন আর চোখকে নিয়ন্ত্রন করতে। মাথাটা হালকা করার জন্য ফুটপাতের দোকান থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে অন্যমনস্কভাবে হাটতে হাটতে বাসায় গেলাম। বাসায় গিয়ে শুনি রফিক মামা চলে গেছে। খবরটা শুনে একটু হাফ ছাড়লাম। সময়ের সাথে সাথে ঘটনাটা প্রায় ভুলেই গেলাম। কিন্তু নাঈম সেটা হতে দিল না। ওকে দেখার পর থেকেই বুকের ভিতরটা ধড়পড়িয়ে উঠল। কেন জানি মনে হচ্ছিল ও আমার আত্নার আত্নীয়। মানিব্যাগ থেকে নাঈমের ভিজিটিং কার্ডটা বের করে মোবাইলের ডায়াল প্যাডে নাম্বার টা তুলে ডায়াল করলাম প্রচন্ড উত্তেজনা নিয়ে….পরক্ষনে কেটে দিলাম। ফিরে এলাম বাস্তবে, এ আমি কি করছি?? নিজেকে প্রশ্ন করলাম….অনেক কষ্টে আবেগটাকে নিয়ন্ত্রন করলাম। প্রচন্ড ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নাঈমকে ফোন করলাম না। মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলাম। নিজেকে ব্যস্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। ব্যক্তিগত আর অফিসিয়াল কাজে মন দিলাম বেশি করে।

একদিন ল্যাম্পশেড আর টুকিটাকি কিছু জিনিস কিনতে দোয়েল চত্বর গেলাম। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে ঘুরে জিনিসগুলো দেখছিলাম। হঠাৎ ধপাস্ শব্দে পিছনে ঘুরে দেখি ৪৫-৫০ বছরের এক ভদ্রমহিলা ফুটপাত থেকে মেইন রোডে নামতে গিয়ে পা পিছলে পরে গেছে। আমি দৌড়ে ভদ্রমহিলাকে তুলতে গেলাম কিন্তু তুলতে পারলাম না। লক্ষ্য করে দেখি উনার ডান হাতের কব্জি মচকে ঝুলে পড়ছে, পা ছিলে রক্ত বের হচ্ছে আর ভদ্রমহিলা তা দেখে ভয়ে কেঁদে উঠে বলল-
-বাবা আমাকে একটা সিএনজি ঠিক করে দিবা?

ইতিমধ্যে অনেক লোক জমে গেছে, আমি সিএনজি নিয়ে আসতেই এক লোক বলল আপনার মাকে তাড়াতাড়ি ঢাকা মেডিকেলের ইমারজেন্সিতে নিয়ে যান। উনার কথা শুনে আমার চোখ ছলছলিয়ে উঠল। মায়ের তো সেবা করার সুযোগ পাইনি, কেন যেন উনার সেবা করতে ইচ্ছে করছিল। আমি একজন মহিলার সাহায্য নিয়ে উনাকে সিএনজিতে তুললাম। তারপর মেডিকেলের ইমারজেন্সি ইউনিটিতে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার পা ড্রেসিং করে হাতে ক্রাপ ব্যান্ডেজ লাগিয়ে ঔষধ লিখে দিল আর পরামর্শ দিল রেস্টে থাকার জন্য। আমি ঔষধ কিনে এনে তখনকার ডোজটা খাইয়ে দিয়ে বাকিগুলো উনার ব্যাগে রেখে বললাম-
-আন্টি আপনার বাসার এ্যাড্রসটা বলুন?
-থাক বাবা তোমার আর কষ্ট করতে হবে না, আমি একাই যেতে পারব।
-এটা কোন ব্যাপার না, আপনি ঠিকানাটা বলুন আমি ফ্রিই আছি, বাসায় পৌছে দিয়ে আসি।

ভদ্রমহিলার আপত্তি সত্ত্বেও আমি উনাকে নিয়ে উনা বাসায় গেলাম। কলিং বেল টিপতেই নাঈম দরজাখুলে অবাক হয়ে বলল-
-ফারহান তুমি!

নাঈমকে দেখে আমিও অবাক হলাম, এটা কিভাবে সম্ভব??
আন্টি নাঈমকে আজকের এক্সিডেন্টের ইতিহাস শেষে জানতে চাইল, তুই ওকে চিনিস?

-জ্বী মা চিনি, ফারহান আমার বন্ধু
-আগে তো কখনো দেখিনি?
-ও বাসায় আসতে চায়নি কখনো তাই দেখ নাই।

আমি ভাবতে লাগলাম প্রকৃতির চাওয়াটা বড়ই অদ্ভুত, তা না হলে কেন নাঈমের সাথে আবার আমার দেখা হবে।যাকে আমি এড়িয়ে চলতে চাচ্ছি সেই আমার সামনে এসে তাড়াচ্ছে।
-তুমি কিন্তু রাতে খেয়ে যাবা। আন্টির কথায় ভাবনায় ছেদ পড়ল, বললাম-
-আজকে যাই, আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন তখন একদিন এসে খেয়ে যাব।
-না এখন তুমি যেতে পারবা না বলে নাঈম আমার হাত ধরে টানতে টানতে ওর রুমে নিয়ে গেল। আমি আর বাধা দিতে পারলাম না।

নাঈমের রুমে গিয়ে আমি পুরাই অবাক, ছেলে মানুষের রুম এতো গোছানো হতে পারে জানা ছিল না। বিছানায় গিয়ে বসলাম, নাঈমও আমার গা ঘেসে বসল। ওর শরীর থেকে কড়া বিদেশী পারফিউমের ঘ্রাণ আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। নাঈমই প্রথমে কথা বলল-
-ফোন দাও নি কেন?
নিচের দিকে তাকিয়ে বললাম-
-কার্ডটা হারিয়ে ফেলছি।
– আমার দিকে তাকিয়ে বলতো!

নাঈমের দিকে এই প্রথম ভাল করে তাকালাম। লাল রংয়ের ম্যাগি গেঞ্জি আর হোয়াইট থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টে অপুর্ব লাগছে। ইচ্ছে করছিল তাকে একবার জড়িয়ে ধরি। নিজেকে এবারও কন্ট্রোল করলাম। নাঈমের হাতে আমার ভিজিটিং কার্ডটা ধরিয়ে দিলাম। খাওয়ার রেডি হতে সময় লাগবে খবর এলো রান্না ঘর থেকে। সুযোগ পেয়ে নাঈম ছাদে যাবার অফার করল। ফেলতে পারলাম না।

মনটা আনন্দে ভরে উঠল, ছাদতো নয় যেন আস্ত ফুলের বাগান। নাঈম আমার পুরো ছাদটাই আমাকে ঘুরে ঘুরে দেখাল। টব থেকে একটা নীল অপরাজিতা ছিড়ে আমাকে দিয়ে বলল-
-আমার প্রিয় ফুল।
-প্রিয় ফুল ছিড়লে যে?
-প্রিয় ফুল গাছের থেকে প্রিয় মানুষের হাতেই বেশি মানায়।
-এতো তাড়াতাড়ি কাওকে প্রিয় মানুষ ভাবাটা বোকামী।
-মাঝেমাঝে কিছু বোকামী করতে খারাপ লাগে না।
-তুমিতো ভালই রোমান্টিক!
-তবুও তো মানুষের মন পাই না।

নাঈমের কথা বলার ধরন দেখে আমি হেসে ফেললাম, আমার হাসি দেখে নাঈমও হেসে ফেলল। হাত ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি ইতিমধ্যে রাত ৯ টা বেজে গেছে। নাঈমকে তাড়া দিতেই ও আমাকে নিয়ে ডাইনিং রুমে আসল। আন্টি আর নাঈমসহ ডিনার শেষ করে বের হলাম বাসা থেকে।

রাত ২.৪০ মিনিট, নাঈমের ঘুম আসছে না। বারবার ফারহানের কথা মনে পড়ছে। প্রথন দিনেই নাঈম ফারহানের ভিতরের সত্ত্বাকে পড়তে পেরেছিল। বুঝেছিল ফারহানের ব্যক্তিত্ব, মন মানসিকতা আর দশটা ছেলের তুলনায় ভিন্নতর। তাই মা যখন বলল ফারহান তার জীবন বাচিয়েছে তখন সে খুব একটা অবাক হয় নাই। সে ফারহানেরর প্রতি আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। তার ইচ্ছে করছে এখনই ফারহানকে ফোন দিয়ে চিৎকার করে বলে ভালবাসি, কিন্তু পরক্ষনে কুচকে যায়। ফারহান এটাকে কিভাবে নিবে। নাঈম যৌবনে পা দেবার পর থেকেই উপলব্ধি করে সে পুরুষপ্রেমী। সুন্দরী মেয়ে দেখলেও সে কোন ফিলিংস পায় না। তাই দিয়ার মত সুন্দরী, উচ্চ শিক্ষিত, ভাল মেয়েকেও পাত্তা দেয়নি। নিজেকে এতদিন একপ্রকার গুটিয়েই রেখেছিল। ফারহানই সবকিছু ওলট পালট করে দিল। ফারহানের একটু ছোয়া পাওয়ার জন্য নাঈম তৃষ্ণার্ত চাতকের মত ছটফট করতে লাগল। এভাবে আর না, নাঈম সিদ্ধান্ত নিল ফারহানকে সে তার এই নিষিদ্ধ অনুভুতির কথা জানাবে। তার বিশ্বাস ফারহান তাকে ফিরিয়ে দিবে না কারন ফারহানের চোখেও সে ভালবাসা দেখেছে।বুকে সাহস নিয়ে নাঈম টেক্সট ফারহানকে-
-ভালবাসি!!

নাঈমের টেক্সট পেয়ে অবাক হলাম না, আমারও নিজেরও ঘুম আসছিল না। নাঈমকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে ইচ্ছে করছে। নাঈমের সাথে একটু দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে করল। টেক্সট করলাম-
-প্রমান চাই!
-কি করতে হবে বল?
-আমার প্রচন্ড ইচ্ছে করছে তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে।
-ওকে আমি আসছি, তোমার এ্যাডড্রেস?

এ্যাডড্রেস দেওয়ার বিশ মিনিটের মধ্যেই নাঈম তার পালসার হাকিয়ে আমার বাসায় চলে আসল। ওর পাগলামো দেখে আমি সত্যি সত্যি অবাক না হয়ে পারছিলাম না। সেদিন রাতে অনেক কাছ থেকে একটা মানুষকে দেখেছি। বলা না বলা অনেক কিছুই জেনেছি। নাঈম আমার বুকে মাথা রেখে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
-বাকিটা জীবন এভাবেই তোমার বুকে মাথা রেখে কাটাতে চাই, ঠাই পাবো তো??
নাঈমের কপালে আলতো করে চুমো দিয়ে বললাম-
-সেতো সৌভাগ্য!

আমার জীবনে নাঈম এসে আমাকে অনেক পাল্টে ফেলল। আমি অনেক গোছালো হয়ে গেলাম, না হয়ে অবশ্য উপায়ও ছিল না। নাঈম সবসময়ই আমার খোঁজ খবর রাখত। আমার রুমের এক্সট্রা একটা চাবি ওর কাছে ছিল তাই আমার অনুপস্থিতিতেও নাঈম রুমে এসে হানা দিত এবং প্রতিবারই টুকটাক জিনিস কিনে রুম সাজাতো। আমি বাধা দিলে শুনতো না, বলত এটা তো আমারও রুম। আমার রুমে আমি যা খুশি তাই করব তাতে তোমার কি?? ওর কান্ড দেখে আমি মুখ টিপে হাসতাম। আমার জবের ধরনের কারনে খুব বেশি সময় পেতাম না কিন্তু যতটুকু পেতাম তার সবটুকুই ব্যয় করতাম পাগলাটার পিছনে। দুজনে চষে বেড়াতাম ঢাকার সমস্ত অলিগলি। প্রায়ই নাঈমের পালসার নিয়ে চলে যেতাম লং ড্রাইভে। নাঈম নিজে ড্রাইভিংয়ের তুলনায় আমার পিছনে বসতে বেশি সাচ্ছ্যন্দ বোধ করত। আমি যখন বাইক চালাতাম পাগলাটা পিছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকত আর মাঝেমাঝে আমার ঘাড়ে আলতো করে কামড় দিত, শিহরনে আমার শরীরের সমস্ত লোম তখন খাড়া হয়ে যেত।

স্বপ্নের মত যাচ্ছিল দিনগুলি কিন্তু আমি জানতাম না আড়ালে আমার ভাগ্য দেবতা তখন মুখ টিপে হাসছে। শিশিরের সৌন্দর্য্য যেমন রোদ্রের ঝলকানিতে মিলিয়ে যায়, তেমনি আমার সুখ গুলোও কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায় এক একটা দমকা হাওয়ায়। বাবা হঠাৎ স্ট্রোক করল, খবরটা শুনেই আমার পায়ের নিচটা তলহীন মনে হল। ছুটে গেলাম রংপুর মেডিকেল। গিয়ে দেখি বাবা আই সি ইউ তে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম আমার বাবাই আমার শেষ সম্বল। পরমকরুনাময় আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে বাবা এ যাত্রা বেচে গেলেন। তবে ডাক্তার অনেকগুলো ঔষধ লিখে দিয়ে বললেন- উনি যতদিন বাঁচবে ততদিন এই মেডিসিনগুলো চালিয়ে যেতে হবে। এবং পরামর্শ দিলেন ভবিষ্যতে যেন উনাকে কোন ভাবেই উত্তেজিত না করি। এরপর উনি স্ট্রোক করলে উনাকে বাচানো সম্ভব হবে না। আমি বাবাকে নিয়ে ঢাকা চলে আসলাম, বললাম এখন থেকে তুমি আমার কাছে থাকবে।

নাঈমের সাথে এই কয়দিন সেভাবে যোগাযোগ করতে পারিনি, পাগলাটা গাল ফুলিয়ে আছে। ওকে সবকিছু বিস্তারিত বলার পর ও সহজ হল। আমি বাসায় সবসময় থাকতে পারতাম না তাই নাঈম মাঝেমাঝে বাসায় এসে বাবার দেখাশুনা করত আর ফাজলামো করে বলত আমি অনেক সৌভাগ্যবান, বিয়ের আগেই শশুরের সেবা করতে পারতেছি। আমি তখন ওকে বুকে টেনে নিয়ে সারা মুখে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিতাম। একদিন রাতে অফিস থেকে ফিরতেই বাবা বললেন-
-আমার পাশে এসে বসো, কিছু কথা বলব।
-জ্বী বল!
-এবার একটা বিয়ে কর।
আমি কি বলব ভেবে না পেয়ে চুপ করে রইলাম।
-কিছু বল, চুপ করে আছো কেনো?
– আমি আরেকটু গুছিয়ে নেই।
-আর গুছিয়ে নিতে হবে না, আমার যা আছে তাতেই বাকিটা জীবন বসে বসে খেতে পারবা। আমার একা একা বাসায় দম বন্ধ হয়ে আসে, বাচবই বা আর কয়দিন? বাকিটা সময় বউ আর নাতি নাতনীদের সাথে কাটাতে চাই।

আমি ফোনে কথা বলার ভান করে বাবার সামনে থেকে সরে গেলাম। আমার কানে তখন ডাক্তারের বলা কথাগুলো মনে পড়ল। এর মধ্যে নাঈম ফোন দিলে কেটে দিলাম, বাধ্য হয়ে ও টেক্সট করল কিন্তু আমি রিপ্লে দিলাম না। এভাবে দুইদিন যেতেই তৃতীয় দিন ও আমার অফিসে চলে আসল।

আমি জানি নাঈম অফিসে আসবে তাই আমি প্রস্তুতই ছিলাম। আমাদের যে সমাজ ব্যবস্থা তাতে আমাদের এই নিষিদ্ধ ভালবাসা কখনোই পরিপুর্নতা পাবে না। আর আমার পক্ষে বাবাকে ছেড়ে, এই দেশকে ছেড় নাঈমকে নিয়ে বিদেশে গিয়ে সেটেল্ড হওয়াও সম্ভব নয়। আল্লহর পরেই বাবা-মায়ের স্থান, মাকে তো অনেক আগেই হারাইছি বাবাকে হারাতে চাই না। হ্যাঁ নাঈমকে আমি অনেক ভালবাসি কিন্তু বাবার থেকে বেশি নয়। তাই বাস্তবতায় ফিরে এলাম।

নাঈম অফিসে এসেই রুক্ষতার সুরে বলল-
-সমস্যাটা কি তোমার?
আমি দাতে দাত চেপে অতি কষ্টে বললাম-
-আমার সমস্যাটা তুমি!
নাঈম আমার কথা শুনে অবাক হয়ে বলল-
-কি! তোমার সমস্যা আমি?
-খাটি বাংলা বুঝো না?
-না বুঝিনা, একটু বুঝিয়ে বল।
-তুমি আমার সাথে আর যোগাযোগ করবে না, তোমাকে আমার আর ভাল লাগে না! এখান থেকে চলে গেলেই আমি খুশি হব।

আমার কথা শুনে নাঈম স্থির হয়ে গেল ঠিক যেন মূর্তিমান একজন মানুষ। তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। সে হয়তো জানবে না কোনদিন আমার ঠিক তার মতই কষ্ট হচ্চে। তার থেকেও তাকে বেশী ভালোবাসি আমি। কিন্তু বাস্তবতা আর পরিস্থিতির কাছে আমি নিরুপায়!

নাঈম চোখে কান্না চেপে বেরিয়ে গেল। আমার খুব ইচ্ছে করছিল দৌড়ে গিয়ে ওকে আটকাই কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করলাম। আমি না হয় একজনের ঘৃনা নিয়ে বাকিটা সময় কাটিয়ে দিব, বিনিময়ে ভাল থাকুক বাবা, ভাল থাকুক নাঈম। রাতে বাসায় ফিরে বাবাকে বললাম-

-বাবা বিয়েতে আমার আপত্তি নেই, তুমি মেয়ে দেখতে পার।

বাবা খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, অনেকদিন পর বাবা পরম মমতায় তার বুকে চেপে ধরলেন আমায়। নিঃস্বার্থ মমতার নিজস্ব কোন ঘ্রাণ আছে কি না জানিনা, কিন্তু আমার নাকে ঘ্রান লাগছে। ঠিক যেন ছোটবেলার মায়ের শরীরের সুমিষ্টঘ্রাণ….

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.