অপুর অপেক্ষা

লেখকঃ সন্নিহিত রেনেসাঁস

১.
অপু রুম অন্ধকার করে বসে আছে। হাতের সাদা কাগজটাকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করছে। তার খুব রাগ হলে সে কাগজ ছিঁড়ে। ছোট হবার ফলে
সে কারো উপর রাগ প্রকাশ করতে পারে না। তাই কাগজ ছিঁড়ে নিজের রাগ কমায়। খুব বেশি রাগ হলে ডায়রীতে উল্টাপাল্টা অর্থহীন শব্দ লিখে। তারপর সেগুলোকে কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরোটুকরো করে ছাদ থেকে ফেলে দেয়। একসাথে অনেকগুলো কাগজ যখন উপর থেকে ভাসতে ভাসতে নিচে পড়ে তখন তার রাগ কমে।

আজ সে রাগ করেছে বাপির উপর। তার ঘরে কোথাকার জংলী আর উটকো একটা লোককে থাকতে দেয়া হয়েছে। ঐ লোকটা মুখের সবকটা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে তার প্রিয় ঘরটাকে দখল করে বসে আছে।
আর সে বসে আছে তার লিভিংরুমে। বাইরের লোককে তো আর অন্দরের কোন কামরা অবশ্যই দেয়া যাবে না।
তাই তাকে ছাদের রুমটা দেয়া হয়েছে। আর ঐ রুমটা অপুর প্রিয় ঘর।
আজ অপুর ঘরে অন্য লোক। এটা ভাবতেই রাগে দাঁতে দাঁত চাপে। ও আরো জোরে কাগজ ছিঁড়তে থাকে।

২.
অপু এবার এস.এস.সি দিবে। আজকালকার ছেলেপেলেরা এই বয়সে বন্ধু, খেলা আর মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। আর কারো বাধ্য তো হতেই চায় না।
অপু ঠিক তার উল্টো। অপুর তেমন বন্ধু নেই। খেলাধুলা তার অপছন্দ। আসলেই কি অপুর বন্ধু নেই?
বাপি তাকে কারো সাথে মিশতে দেয় না। থার্ডক্লাস ছেলেদের সাথে তার মতো হাইক্লাস ছেলের নাকি মিশতে নেই।
ও জানে বাপি এটা ইচ্ছা করেই করছে। তার ক্লাসের সামি?

ও তো হাইক্লাস ফ্যামিলির ছেলে। কিন্তু ওর তো প্রায় গোটা দশেক বন্ধু। স্কুলে ওরা একসাথে আড্ডা দেয়, হাসাহাসি করে। কে কার প্রেমে পড়েছে, কার পছন্দের মেয়েটা কেমন এইসব আজেবাজে ব্যাপার নিয়ে পড়ে থাকে।
ওরা অধিকাংশ অতি সাধারণ পরিবারের। কৈ ওর বাবা মা তো নিষেধ করে না। তাহলে ওর বেলায় এত নিয়ম কেন?

ওকে সবসময় বাচ্চাদের মত চোখে চোখে রাখা হয়। ছুটি হলেই গাড়িতে চড়ে বসতে হয়। ওকে বাইরে কোচিং পর্যন্ত করতে দেয় না।
ক্লাসের দুজন টিচার এসে বিকালে পড়িয়ে যায়।
অপুর কোন অবসর নেই। রুটিনে ছক কাটা তার জীবন। অর্থের প্রাচুর্যের মধ্যেও সে কেমন অসহায়ের মতো। কিন্তু অপু চায় অন্যদের মতো স্বাধীন হতে। খাঁচা বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পেতে।
বাপিকে সে খুব ভয় পায়। তার কথার একটু নড়চড় হয় না। সবাই তাকে বাঘের মতো ভয় পায়। মা ও। সে একপ্রকার নিরুপায় হয়ে এই বন্দী জীবনে অভ্যস্ত। তাদের প্রকান্ড বাড়ি আর বাড়ির ছাদেই অপুর জীবনের সীমানা।

আজ সেই ছাদটাও ওর কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হল। সে মারা গেলেও ঐ জংলী লোকটার আশেপাশে যাবে না। তাই ছাদেও যাবে না। অপুর করার কিছু নেই। তার খুব রাগ হচ্ছে। নিজেকে তুচ্ছ লাগছে। কান্না পাচ্ছে। কিন্তু অপু কাঁদে না। ছেলেদের নাকি কাঁদতে নেই।

৩.
গতকাল সন্ধ্যায় কবির এই বাড়িতে উঠেছে। কবিরের বাবা অপুর বাপির খুব বিশ্বস্ত কর্মচারী। সে তার বিজনেসের সাথে জড়িত। তার ছেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২য় বর্ষে পড়ে। হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তুঙ্গে। তাই স্যারকে হাতেপায়ে ধরে তার বাড়িতে থাকার অনুমতি নিয়েছে।
এখানে অনেক শর্ত মেনে কবিরকে থাকতে হবে। তারপরও বিপদের মধ্যে থাকার চেয়ে থাকা খাওয়ার এরকম রাজকীয় জায়গা পেয়ে মন্দ লাগছে না। এই বড়লোকদের বড় ব্যাপার। সে মহা আনন্দে আছে।

মুখ ফুটে কিছু না চাইতে হাজির হয়। প্রতি সপ্তাহে খরচার জন্য একহাজার টাকা করে পাবে। আর কি চাই। তবে বাড়ির মালিক লোক সুবিধার না।
কবিরকে বাড়িতে ওঠার আগে পুরা দুই ঘন্টা লেকচার দিয়েছে। অনেক নিয়ম নিষেধ বলা হয়েছে যা না মানলে তাকে চলে যেতে হবে। মহা যন্ত্রণা। তবে ভালো লাগছে। রুমের সামনে বিশাল ছাদ। ছাদ ভর্তি গাছ। দোলনা। রাতটা চমৎকার কেটে যাবে।

ও কাল আসার সময় একটা ছেলেকে নামতে দেখেছে ছাদ থেকে। ছেলেটা নামার সময় ওকে ভেংচি দিছে। বাচ্চাদের মতো দেখতে। ওর চেয়ে অনেক ছোট। তবে চেহারায় আকষর্ণ চরম।
কেন ওকে পোলাটা ভেংচি দিল সেটা দুবার ভাবা হয়েছে। কোন কারন খুঁজে পায় নি। তবে এখন বুঝতে পারছে। ঐ ছেলের পড়ার ঘরে ওকে থাকতে দেয়া হয়েছে। এ জন্যই
ছেলেটা রেগেছে। এই এক রুমেই যা আসবাব আছে তাতে কবির অবাক।
সে মনে মনে হাসল। চাইলে ওরা দুজনই তো একসাথে থাকতে পারত। কিন্তু কি জানি কি?

৪.
সন্ধ্যায় অপুর ছাদে হাঁটাহাঁটির অভ্যাস। ওর অস্থির লাগছে। ওই বদ লোকটা ছাদে। কাল এসেছে থেকে ছাদেই আস্তানা গেড়ে বসে আছে। কোথাও যাচ্ছে না। তার রাগ বেড়ে যাচ্ছে। সে কবিরকে তাড়ানোর উপায় খুঁজছে আর আনমনে ছাদের দিকে যাচ্ছে।
ছাদের দরজার কাছে গিয়ে সে চমকে ওঠে ! ওর দোলনায় বসে লোকটা গান শুনছে। কি অনধিকার চর্চা ! কবিরকে এখনি ভাগিয়ে দিতে পারলে ভাল হত। কিন্ত পারছে না। রাগে, দুঃখে চলে এল।

অপুর মা নিঃশব্দে ঘরে ঢোকে। ঘরের ফ্লোর ভর্তি কাগজ। সে অবাক হল। শান্ত গলায় বলল-
অপু হোয়াট ইজ দিস? এত কাগজ কেন রুমে? তুমি রুমটাকে ডার্টি করেছ কেন? তুমি বড় হচ্ছ। এখনো চাইল্ডিশ বিহেভ করছ।
অপুর খুব বলতে ইচ্ছা করল, মম! তোমরাই আমাকে চাইল্ডিশ করে রেখেছ।
কিন্তু ও কিছু না বলে বুয়াকে ডেকে রুম পরিস্কার করে দিতে বলল। অপু মায়ের সঙ্গেও রাগ করল। তার বোঝা উচিত ছিল।
মা চলে গেল। অপু ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে একটা মিশন আছে তার।

রাতে কবির অপুর পড়ার টেবিলে একটা নোটবুক পেল। তাতে অপুর কিছু না বলা দুঃখের কথা লেখা আছে। আর পেল অপুর অনেক ছবি।
অপু ছেলেটা বড় দুঃখি। বাবা মা সন্তানকে জন্ম দিলেই তাদের দ্বায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অর্থ দিয়েই সন্তানের সব চাহিদা পূরণ করা যায় না। সন্তানকে ভালোবাসতে হয়, সন্তানের বন্ধু হতে হয়। পাশে থাকতে হয়। তা না হলে, সন্তানের সাথে
পিতামাতার অদৃশ্য দুরত্ব তৈরী হয়ে যায়। সন্তান হয়ে পড়ে একা।
কবির অপুর প্রতি একটা মায়া অনুভব করতে পারে। ছেলেটা একা একা কষ্ট পাচ্ছে।

৫.
অপু খুব সকালে উঠল। পূর্ব আকাশটা আঁধার কাটিয়ে সবে মাত্র রক্তিম আভা ছড়াতে শুরু করেছে। পাখিরা ডাকছে। বাকি পৃথিবী এখনো গভীর ঘুমে। অপু ফ্রেশ হয়ে ছাদে গেল। এবারো সে চমক খেল। কারণ ছাদে ঐ লোকটা দাড়িয়ে আছে। আশ্চর্য !
সেদিন তো লোকটাকে জংলীই মনে হয়েছিল। এলোমেলো চুল, মুখ ভর্তি দাড়ি ছিল আর ঢিলেঢালা একটা টি শার্ট পড়ে
এসেছিল। আজ তো সব পরিপাটি দেখাচ্ছে। চেহারাও তো মন্দ না।

আর বয়স তো অত না। বড় জোর ভার্সিটিতে পড়ে। কবির খালি গায়ে, পরনে হাফ প্যান্ট। কেমন ফর্সা পিঠ। ওর লজ্জা লাগল। আগে কখনো কেউকে এমন উদোম গায়ে দেখেনি। অপু ওর মিশনের কথা ভুলে গেল।
এটা হতেই পারে না। বুড়া আর ছোড়া যাই হোক যে তার একমাত্র সঙ্গী ছাদটাকে দখল করেছে তাকে তো তাড়াতে হবেই।
ও প্রস্তুতি নেয়। কবির অপুকে দেখে ফেল। গুড মর্নিং জানায়। কোমল হাসিতে অপুকে ডাকে।

সে দ্বিধায় পড়ে গেল। ছুটে চলে যেতে ইচ্ছা করছে। আবার যেতেও পারছে না। অন্তত নিম্নতম ম্যানারটা তো শো করতে হবে। কেউ তাকে হাসিমুখে গুড মর্নিং বলছে আর সে কিছু না বলে চলে যেতে পারে না।
কবির আবার ডাকে।

কি অসহ্য ! মনে হচ্ছে অপুই এ বাড়ির অতিথি আর ঐ লোকটা মালিক। কেমন নির্দ্বিধায় ওকে ডাকছ। কিন্তু ও যেতে পারছে না কেন? ওর রাগ হতে লাগল। কিছু একটা খুব দ্রুত বলা উচিত। এই
সামান্য ব্যাপারে ও কিনা বোকার মত দাঁড়িয়ে আছে।

অপু সিদ্ধান্ত নিল এবং ছাদে ঢুকল। বলল-” বাপি আপনাকে এই রুমটাতে থাকে দিয়েছে, ছাদে না। ছাদটা আমার। আপনি ছাদে কখনো আসবেন না। আপনার সীমানা এই রুম অব্দি। ওকে?”
কবির একটা হাসি দিল। কিছুই বলল না।
অপু তো অবাক ! সে একে এত কিছু বলল, তবু লোকটা কিছু বলছে না।
অপু এমনভাবে বেড়ে উঠেছে যে, সামান্য কয়েকটা কথাতেই তার এতকিছু মনে হচ্ছে। তার রাগ হল কবিরের নির্লিপ্ততা দেখে। অপুদের ছাদটা বড়। চাইলেই তারা সমঝোতায় আসতে পারে। কিন্তু ও তা করবে না। কখনো না।

৬.
অপু একা বসে কবিরের আচরণ নিয়ে ভাবতে লাগল। অত্যন্ত গো বেচারা টাইপের। চেহারায় কোমলতা আছে। তবে চোর চোর ভাব। একদিন নিশ্চই ওর কিছু নিয়ে কেটে পড়বে।
ছিঃ ছিঃ। ও এগুলো কি ভাবছে।
কবির অপুকে বেশ পছন্দ করে ফেলল। ওকে স্বাভাবিক করতে একটা চিরকুট লিখে পাঠাল-
“অপু আমার উপর খুব রাগ করেছ? করাই উচিত। আমি অনাহুতের মতো তোমার ঘরটা দখল করে ফেলেছি। কিন্তু করেছি তোমার বাপির কথায়। তবে এটা তো তোমারই ঘর। তুমি আসবে। আমরা বন্ধু হব। দেখ আমি তোমার একাকীত্ব দূর করে দেব।”

কবিরের বুদ্ধি কাজ করল। অপুর রাগ চলে গেল। চিরকুট পরে অনুশোচনা আর লজ্জিত হল। পরিবর্তে অন্যরকম একটা ভালোলাগা তৈরী হল।
সন্ধ্যায় অপু কফি বানিয়ে ছাদে উঠেছে। সকালে কবিরকে কিছু কড়া কথা সে বলেছে। সরি বলা উচিত। কিন্তু সরি বলা যাবে না। তাই কফি। কফি দিয়েই সরির কাজ সারবে।
রুমে ঢুকে দেখল কেউ নেই। কবির কি তবে চলে গেল? তাহলে ঐ চিরকুট?

অপু ছাদে হাঁটছে। সন্ধ্যা শেষ। কবির আসে নি। সে অপেক্ষা করছে।
আকাশের আবীর রঙ মিলিয়ে যাচ্ছে। সব পাখিরা ঘরে ফিরে গেছে। গা শীতল করা মৃদু বাতাসে ওর চুল উড়ছে।
সে অধীর হয়ে আছে। কবির আসলে তাকে চমকে দেবার ব্যাবস্থা করেছে। সে কবিরের চোখ বন্ধ করে ঘরে নিয়ে যাবে। চোখ খুললেই একগাদা গোলাপ আর সরি কার্ড অপেক্ষা করবে। তারপর ওরা বন্ধু হবে। গল্প করবে। অপু কবিরকে ওর না বলা কথাগুলো বলবে।
কিন্তু কবির আসছে না। অপু অপেক্ষা করছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.