আত্মালোচনা

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

সেদিন একটিবারের জন্য মাকে দেখেছিলাম।  তারপর আর দেখা হয়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা খুব একটা দূরের পথ নয়। ট্রেনে উঠলে তা দু এক ঘন্টার পথ।তবো ও কেন জানি মাকে দেখতে তেমন ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখন মায়ের কথা মনে পড়ে। ছোট সময়, আমি তখন থ্রী ফোরে পড়ি। মা নিজ হাতে খাবার মুখে তুলে দিতে দিতে অনেক মজার মজার কথা বলতো। সেই মজার কথা গুলো মনে নেই। মায়ের মুখটা মনে আছে। হাসিমাখা মুখটা হঠাৎ একদিন মিলিয়ে গেল। মা বদলে যাচ্ছিল। বাবার সাথে রোজ ঝগড়া হত, রোজ অবশ্য না। বাবা আসতো সপ্তাহে দু তিন দিন। আমরা তখন সিলেট থাকতাম। মৌলভীবাজার শহরে। আজ এত কিছু মনে পড়ে না। একদিন ঘুম ভেঙে দেখি মা ব্যাগ গুচ্ছাচ্ছে। সেই দিন আমরা ঢাকা চলে যায়। আমার স্কুল নিয়ে আমার চিন্তার শেষ ছিল না। বার্ষিক পরিক্ষা শুরু হওয়ার কিছু দিন বাকি ছিল। ট্রেনে সারা পথ মা কাঁদছিল। আমি জানালা দিয়ে বাহির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এক সময় ঘুমিয়ে গেলাম।
আজ ও ট্রেনে ঘুমালে সেই দিনটার কথা মনে হয়। কত কষ্ট পেয়েছিল সেই দিন আমার মা তা আজ বুঝতে পারি। আর যখন বুঝতে পারি তখন বুকের ভেতরটায় ভয়ানক ব্যথা হয়। সেই ব্যথাটা কিছুতেই কমে না।
ঢাকা গিয়ে নানা বাড়িতে উঠলাম। মায়ের কাছ থেকে দিন দিন দূরে চলে যেতে লাগলাম। মাকে দেখতাম সারাদিন নিজের ঘরে বসে থাকতো। ছোট মামা আমাকে নিয়ে খেলতো। বড় মামা কলেজ থেকে ফিরে আমাকে গোসল করিয়ে দিত, নানু মুখে ভাত তুলে দিয়ে খায়য়ে দিত। কিন্তু মা!তার সাথে আমার কোন কথায় হত না। রাতে মামাদের সাথে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতাম।স্বাধীন আর মুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। পড়াশোনা কিছু নেই।
একদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে দেখি সারা বাড়ির মানুষ ব্যস্ত। আমি একা একা সারা বাড়ি ঘুরি। সবাই কী কী কাজ করে ভাল করে লক্ষ্য করি। পাশের বাসার এক খালা ডেকে নিয়ে বলল, আরাফ তুই জানিস আজ কী? আমি বললাম, না তো খালা। আজ কী?খালা ফিক করে হেসে বললেন, আজ তুর মায়ের বিয়ে। বিয়ে! আমি দৌড়ে মায়ের কাছে গেলাম। মাকে তখন দুটা মেয়ে সাজাচ্ছিল। কী সুন্দর ই না লাগছিল আমার মাকে।
মায়ের বিয়ের পর পর আমি অসুস্থ্য হয়ে গেলাম।খুব অসুগে পড়ে তখন বিছানায়। সিলেট থাকতে যখন জ্বর হত তখন মা আমার অনেক যত্ন নিত। আমি মায়ের সেই যত্নটার শুন্যতায় আরো ও অসুস্থ্য হয়ে পড়লাম। একদিন বাবা এল আমাকে নিয়ে যেতে,আমি বললাম যাব না। বাবা আমাকে জোর করে নিয়ে গেল।রাস্তায় সারাপথ আমি কাঁদছিলাম।এক সময় ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম থেকে জেগে দেখি এক মহিলা তার পরম মমতার হাত দিয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আমি জেগে উঠি। পানি খেতে চাই। একটা ছেলে আমাকে পানি এনে দেয়। আমি কাঁপা হাতে পানি খেতে গেলে ঐ মহিলা পানি খায়য়ে দেন। মহিলাটি আমার আম্মু। লোকে যেমন বলে সৎ মা,তেমন। ছেলেটা আমার ভাইয়া। লোকে বলে সৎ। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টায় তাদের পেয়েছিলাম।সৎ যদি এত মমতাময়ী আর উদার হয় তবে আপন সম্পর্কগুলোর চেয়ে সৎ ই ভাল।
বড় হতে লাগলাম। আমি তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। পাশে তিতাস নদী। বিকেলে ভাইয়ার সাথে নদীর পাশে গিয়ে বসে থাকতাম। পড়াশোনায় ভাল ছিলাম। আমাদের ক্লাসে এক শিক্ষক ছিলেন। আমরা তাকে রিনাদি বলে ডাকতাম। আমাকে তিনি প্রচন্ড আদর করতেন। প্রায় বাসা থেকে এটা ওটা বানিয়ে এনে বলতেন,খেয়ে বলতো আরাফ, কেমন হয়েছে? আমি খেতাম কম। বন্ধুরা খেত বেশি। খেতে ভাল হত। এক সময় আমার স্কুল জীবন শেষ হল। মাধ্যমিক পড়ার জন্য ভর্তি হলাম শহরের স্কুলে। গ্রাম ছেড়ে গিয়ে শহরে উঠলাম।বেশ বড় সড় একটা বাড়ি। গাছ গাছালিতে ভরা।
যেই বছর আমি এইটে ঠিক সেই বছর বাবা আরেকটা বিয়ে করলেন। আমার মন খারাপ হল। ভাইয়া সেই একি বছর কানাডা চলে গেলেন। আম্মু ও অসুস্থ্য হয়ে গেল। বাবা কম আসতেন। এত বড় বাড়িতে আমি, আম্মু আর আমাদের এক খালা ছাড়া কেউ নেই।
মাঝে মাঝে ছোট মামা আসতেন।ছোট মামা যেদিন আসতেন সেদিন আমার আনন্দের অভাব হত না। আমি সারা দিন মামার সাথে ঘুরতাম। নদীর পাড়ে যেতাম, নৌকায় চড়তাম। এক সময় মামা ও বিয়ে করে ফেললেন। কাজ থেকে সুযোগ পান কম তাই আসতে পারেন না। মামা ব্যতিত, মায়ের বাড়ির আর কারো সাথে দেখা বা কথা বলা নিষেধ ছিল আমার জন্য। মার কথা প্রায় মনে হত। মাঝে মাঝে লুকিয়ে চলে যেতাম। যিনি মায়ের স্বামী, ওনি খুব ভাল লোক। থেকে যেতে বলতেন। কিন্তু আমি তখন আম্মুকে ছাড়া কিছুই বুঝতাম না।
এক সময় বড় হয়ে গেলাম। শৈশব আর কৈশরের দুঃখ ভুলে যাব ভেবেছিলাম কিন্তু ঠিক তখন ই ধাক্কা লাগার মত আমি আবিষ্কার করলাম আমি গে। 
ছেলেদের ভাল লাগতো। মহল্লার বড় ভাই ফারাভী। আমি নাম ধরে ডাকতাম।বিকেলে ক্রিকেট খেলতাম। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি।যৌনতার ধারা তখন আমার রক্তে রক্তে প্রবাহিত। ফারাভীর সাথে আমার যে আন্তরিকতা ছিল তা রূপ নিল ভয়াল ভালবাসায়। আর সেই ভালাবাসা এক রাতে যৌনতা হয়ে ধরা দিল। আমরা থেকে কম করে হলে ও পাঁচ বছরের বড় ফারাভীর সাথে এক রাতে যে নিষিদ্ধ যৌনতার চর্চা করেছিলাম, সেই যৌনতা ই আমার প্রকৃত পরিচয়। ভালবাসার মত অনেক কিছুই ওর মাঝে ছিল। সবচেয়ে বেশি যেটা ছিল সেটা ছিল ওর ভেতরকার ভালমানষিটা। আমার খেয়াল ওর মত আর কেউ রাখতো না। আমি ও ওকে চায়তাম।খুব  বেশি। 
আসলে নিয়তি যেখানে মর্মম সেখান থেকেই আমার জীবন শুরু। এক সময় ফারাভী পাড়ি দিল ইতালি। আমি এক মহা শুণ্যতায় পড়লাম।আর সেই শূণ্যতার থাবা গিয়ে পড়লো আমার হৃদয়ে।
২০১৫ সালে, আমি তখন এইচ এস সি দিচ্ছিলাম। শুরু থেকেই শরীরটা খারাপ ছিল। এক্সাম চলাকালে আরো খারাপ হয়ে গেল। দীর্ঘ দু বছর ফারাভীর সাথে আমার যোগাযোগ নেই। ও কল করলে ও আমি রিসিভ করিনি। এক সময় ওর কল করা বন্ধ হয়ে গেল। আমি ও ধীরে ধীরে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টায় ছিলাম। আর ঠিক তখন ই আমার রসায়ন পরিক্ষার এক দিন আগে আমি হার্টের ব্যথায় আক্রান্ত হয়। খুব অল্প বয়স ছিল। এই বয়সে হৃদরোগ হওয়ার কথা না। কিন্তু আমার হল। সেই সাত আট বছর থেকে যন্ত্রনা আর যন্ত্রনা পেতে পেতে আমার হৃদয়টা কেমন পঁচে গিয়েছিল। ঢাকা হৃদরোগ ইনস্টিটিউডে ভর্তি ছিলাম দীর্ঘ দু মাস। অনেক কষ্টের পর বেঁচে উঠেছিলাম। আসলে বাঁচাটা জরুরি ছিল না। তবো ও বেঁচে গিয়েছিলাম। কারন আরো অনেক কষ্ট পাওয়া বাকি ছিল। 
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়,’আল খিদমাহ ডাগায়নেস্টিক সেন্টার’ নামের একটি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের দায়িত্বে ছিল জাহিদুল ইসলাম নাহিদ। অল্প বয়স,দেখতে মুগ্ধকর। যখন অসুস্থ্য ছিলাম তখন তার দায়িত্বেই চিকিৎসা হয়েছিল আমার। তার গাম্ভীর্যতা,বচন ভঙ্গি আর আমার প্রতি তার আগ্রহ আমাকে তার প্রেমে পড়তে বাধ্য করে। গে ছিলাম, সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া স্বাভাবিক ছিল। আমি নিজের অজান্তেই তাকে ভালবেসে ফেলি। সেই ভালবাসার না ছিল কোন ভবিষ্যত না বাস্তবতা। এক তরফা ভালবাসা বলতে যা বোঝায় তাই ছিল। কিন্তু আমি ছিলাম নাছোড়বান্দা। ভালবাসা আমাকে পাগল প্রায় করে দিয়েছিল।সে স্ট্র্বেইট নাকি গে তা সব ভুলে বসেছিলাম। 
নাহিদের বাড়ি মূলত কুমিল্লায়। এই শহরে সে একা থাকতো গত বছর জয়েন হওয়ার পর থেকেই।দু তিন মাস হল ওর মা আর ছোট বোন ও এখানে।রাতে ঘুম হত না, সারাক্ষণ তার কথা মনে হত। বুকে তখন কম্পন হত। আমি সকালের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে যেতাম। যখন ভোর হত তখন অল্প কিছু মুখে দিয়ে তার চেম্বারে ছুটে যেতাম।তার কম্পাউন্ডার মুস্তাক ভাই। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। রোগীর খুব একটা ভিড় থাকলে ওনার সাথে গল্প করতাম আর আড় চোখে নাহিদকে দেখতাম।ভাল লাগতো ওকে দেখতে। রোগীর ভিড় কমে গেলে ওর কাছে চলে যেতাম।আমাকে দেখে ওর চোখ ভরে উঠতো। সেই চোখে আমার প্রতি প্রেম দেখতে পেতাম।চোখ দুটি আমারে সাহস দিয়ে বলতো, এগিয়ে যাও। আমি তাকে ন্যাকা ন্যাকা কন্ঠে বলতাম
-গতরাতে খুব জ্বর এসেছিল স্যার।একটু ছোঁয়ে দেখুন জ্বরে গা কেমন পুড়ে যাচ্ছে।
সে মুচকি হেসে বলতো,
-আমি তো জ্বরের ডাক্তার নয়। ফরহাদ হোসেন স্যারের কাছে রেফার করে দিচ্ছি।
আমি লাগবে না বলে উঠে যেতাম। আমার রাগ দেখে সে হাসতো। মুচকি হাসি দেখে ছুটে যেতাম আবার ও, গিয়ে বলতাম
-আপনি এমন কেন বলুন তো?
সে বলতো কেমন?
আমি বলতাম
-বাবা জর্দার মত।
সে হাসতো। আমি বাড়ি ফিরে আসতাম।মাঝে মাঝে মনে হত সে আমাকে আস্কারা দিচ্ছে। আমার পরক্ষণেই ভাবতাম আমি অসুস্থ্য বলে হয়তো সে মেনে নিচ্ছে। যাই ভাবতাম না কেন, ভালবাসা তাতে কমতো না। বেড়েই যাচ্ছিল। এক পাক্ষিক ভালবাসার যন্ত্রনা যে এত ভয়ানক হয়ে ধরা দিবে তা কে জানতো? 
একদিন রাতে তার কথা প্রচন্ড রকম মনে পড়ছিল। রাত তখন দুইটা ছুটে গেলাম তার বাসায়। যেতে সময় নিল পনের মিনিট। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর তখন নিরব। অস্থির এক তরুণ ভালবাসার টানে ছুটছে। দারোয়ান কাকা ঘুমিয়ে ছিল। আমি তাকে ডেকে তুললাম। সে গেইট খোলে দিল। আমার বুক কাঁপছিল। কাঁপা কাঁপা পায়ে তার রুমে ঢুকে গেলাম। ভেবেছিলাম তাকে ঘুমে পাবো। সে জেগে ছিল। ভূত দেখার মত চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলো
-এত রাতে তুমি?
আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম উত্তর না দিয়ে। সে আবার প্রশ্ন করলো
-কী হল? উত্তর দাও। কেন এলে?
আমি সোফায় বসতে বসতে বললাম,
-আপনাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তাই।
সে আমার কথা শুনে হেসে ভেঙ্গে পড়ল।
-পাগল হলে তুমি? যাও, বাসায় যাও
আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললাম,
-তায়লে আসি ডাক্তার সাহেব।
সে ইতস্ত করতে লাগলো। আমি জানি সে আমাকে আটকাতে চেষ্টা করবে। আমি পা বাড়ালাম। দেখলাম সে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ইতস্ত করে বলল
-কিছু খাবে? চা অথবা কফি?
আমি মুচকি হেসে থেমে গিয়ে বললাম
-হুম খাবো। আইসক্রিম।
-এত রাতে আইস্ক্রীম কোথায় পাবো?
-জসিম কাকার দোকান এখনো খোলা।
-ঠিক আছে, আনাচ্ছি।
আমি বসে রইললাম। আমার পাশে সে বসলো। আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তার অদ্ভুত চোখ জোড়া, তার পেশিবহুল শরীর, নেশাময় অবয়ব সব কিছু আমাকে উত্তেজনায় কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিল। দাঁতে দাঁত চেপে ও যখন প্রায় ব্যর্থ তখন অনর্থের ভয়ে ছুটে বের হয়ে এলাম। সে তাকিয়ে ছিল। আটকালো না। সে ও হয়তো বুঝতে পেরেছিল ।
একটানা তার চ্যাম্বারে আর যায়নি। বাসায় ও না। নিজেকে আটকে রাখার চেষ্টা করতেছিলাম। একপাক্ষিক প্রেম বয়ে নেওয়ার মত শক্তি আমার ছিল না। সারাদিন রুমে বসে থাকতাম। আমার আম্মু তখন ইতালি। বাবার দুই নম্বর বউ একজন মাঝ বয়সী মহিলা। আমি তারে ‘এই যে’ ছাড়া আর কিছুই ডাকতে পারতাম না। সারাদিন তার সাথে হিন্দি সিরিয়াল দেখতাম। মাঝে মাঝে ওনার প্রিয়ে শাবিব হানের ছবি দিলে তা ও গিলতাম। ওনি দু পা ছড়িয়ে বসিয়ে বিড়ি টানতো। আমি উদাস মনে গালে হাত দিয়ে তা দেখতাম। সাপ্তাহ খানেক ভাল ই চলছিল।
একদিন রাতে মোবাইলে তার কল আসলো। স্কীনে তার নামটা ভেসে উঠাতেই কাঁপতে লাগলাম। রিসিভ করে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম
-স্যার, কী জন্য কল করলেন?
ঐ পাশ থেকে তার ভরাট গলাটা শোনা গেল। 
-বাসায় আসো তো একবার।
বলেই কেটে দিল। আমি তখন আমার বাবার দুই নম্বর বউয়ের সাথে বসে বসে চিড়া খায়তেছিলাম। পড়নের কাপড় পড়েই চলে গেলাম।সে দরজা খোলে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার জন্য তার অপেক্ষা দেখে আমি প্রশান্তি পেলাম। তাকে অনুসরণ করে তার রুমে গেলাম। দুইটা বাটিতে আইস্ক্রীম রাখা। তার পাশে একটা গিফট বক্স।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। সেই দিন অনেক কথা বলেছিলাম কিন্তু ভালবাসি সেটা বলা হয়নি।গিফট বক্সটা খোললাম, সেখানে শ্বেত পাথরের রবি ঠাকুরের একটা মূর্তি আর তার নৌকা ডুবি। ছোট একটা চিরিকুট। তাতে লেখা, Try to be normal. try to be my pleasure.
কী বুঝাতে চাচ্ছে সে? আমি বুঝতে চাইনি। এর দু দিন পরে আমি কিছু গিফট কিনলাম। রাত তখন একটা বিশ। বিল চাপতেই সে দরজা খোলে দিল। আমাকে দেখে মুচকি হেসে বলল
-এত রাতে কেন আশা হল?
-ঋণ শোধিতে।
-কিসের ঋণ?
-বলছি।আগে ঘরে যায়?
-ও, হ্যা আসো।
আমি প্রস্তুত ছিলাম। যা হওয়ার হবে। মনে যা আছে, মুখে তা আনতেই হবে। হয় একেবারে শুন্য না হয় কিছু হলে তো পাব ই। আমি গিফটা হাতে দিতে দিতে বললাম
-আমি গে।
সে চমকালো না। পালঠা উত্তরে বলল
-বেশ। কোন সমস্যা?
-আমি আপনাকে ভালবাসি।
এইবার সে লজ্জা পেল। লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল
-আমাদের বয়সের তফাতটা দেখেছো?
-না দেখিনি। ইচ্ছে হয়েছে, ভালোবেসেছি। ভালবাসা বয়স দেখে করে সেটা শুনিনি।
-যাও বাসায় যাও।
-যাচ্ছি।
গিফটগুলো হাতেই ছিল। দেয়ালে ছুড়ে মারলাম। দেয়ালের ঝুলানো ঘড়িতে গিয়ে পড়ল। ঝনঝন শব্দে কাচটা ভেঙ্গে গেল। আমি আর পিছনে তাকালাম না। বাসা থেকে বের হয়ে সোজা নিজের রুমে।
এর দু দিন পরে সে কল দিল। পাঁচ বার কেটে দেওয়ার পর অবশেষে ধরলাম।
-বলেন
-আমি তোমাকে ভালবাসি আরাফ।
-মিথ্যা কথা(আমার চোখে তখন পানি)
-সত্য
-কসম
-কসম।
-আমি আসতেছি।
-আসতে হবে না। দরজা খোল। আমি দরজায়।
দরজা খোলেই দেখি সে দাঁড়িয়ে। দু হাত বাড়িয়ে আছে। আমি চোখ মুছে ঝাঁপিয়ে পড়লাম তার বুকে।
সারা জীবনের দুঃখ কষ্টের শেষ হল বুঝি। তার পরে ও মনের কোথায় যেন একটা না পাওয়া, একটা যন্ত্রনা রয়ে ই গেছে। সম্পর্কের শেষটা কি হল সেই গল্প আরেকদিন করবো। আজ তাহলে আসি? টা টা। 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.