পহেলা বৈশাখ

লেখকঃ শুভ্র ভাই

ট্রেন থেকে ঝপাৎ করে লাফিয়ে নামলো অদ্রি। ফেসবুক প্রোফাইল নাম অদ্রি রাজ। সামনে গিটার বাড়িয়ে ধরে প্রশস্ত হাসি দেওয়া বর্তমান প্রোপিক টাতে লাইকের সংখ্যা টু পয়েন্ট থ্রি কে। এর মধ্যে লাভ রিয়াক্ট আছে দুইশো আটাত্তরটি। নাহ অদ্রি সেলেব্রিটি টাইপ কেউ নয়। খুবই সাদাসিদে একজন মানুষ, ফেসবুকের কল্যাণে আজ এত ফ্যান ফলোয়ার জুটেছে। বুয়েটে পড়ে, ফোর্থ সেমিস্টারের পরীক্ষা দিয়ে রাতের ট্রেনে বাড়ির উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলো। ভোরেই সুন্দরবন এক্সপ্রেসের খুলনা রেলওয়ে স্টেশানে পৌঁছানোর কথা ছিলো। কিছুটা দেরি হয়ে গেছে ইশ্বরদীতে রাজশাহী গামী একটা ট্রেনকে সাইড দিতে গিয়ে। বাঙালি জীবনে ট্রেন আর পাংচুয়াল পার্সনের মূল্য একই বলা যায়। টাইমলি এসেছো তো বসে থাকো লেট লতিফের জন্যে।

গেট ক্রস করার সময়ে লোকটির সাথে আবার চোখাচোখি হলো। স্টিল ফ্রেমের চশমা পরা লোকটি দেখতে সুদর্শন বটে। বয়স কত হতে পারে। ৩০-৩৫ হবে। বয়স, ওজন এগুলার ব্যাপারে সে এক্যুরেট ধারণা করতে পারেনা অথচ সে এমন অনেক লোককে দেখেছে যারা জবাই করতে নিয়ে যাওয়া ছাগল দেখে বলে দিয়েছে কয় কেজি গোশত হবে। লোকটা বারবার তাকাচ্ছে কেন? ট্রেনে তারা একই বগিতে ছিলো। বারবার তাকাতে দেখে সেও কয়েকবার তাকিয়েছে। কিন্তু চেনা মনে হলো না। এরকমটা অনেক সময় হয়। অচেনা কাউকে খুব চেনা চেনা মনে হয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় চেনা কেউ নয়। লোকটা কিছু বললো না দেখে অদ্রি নিজে থেকে কিছু বললো না। চলার পথে এরকম হয়ে থাকে।

ছিমছাম খুলনা শহর এখন ইজিবাইকের শহর। ইজিবাইকের দঙ্গল মাঝে মাঝে ট্রাফিক জ্যাম বাঁধিয়ে দেয়। সব কিছুরই ভালো মন্দ দুটি দিক আছে। অদ্রিদের বাসা ছোট বয়রায়। স্টেশন পেরিয়ে রাস্তায় আসার মুখে এক ঝাঁক ইজিবাইক চোখে পড়লো। ড্রাইভার মামারা সমানে চেঁচাচ্ছে সোনাডাঙ্গা সোনাডাঙ্গা, নিরালা নিরালা, দৌলতপুর দৌলতপুর। অদ্রি বয়রার ইজিবাইক খুঁজে উঠে বসতে চোখে পড়লো সামনে ইজিবাইকে ড্রাইভারের পাশে বসা সেই স্টিল ফ্রেমের চশমা। তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই মৃদু হাসলো।

বাড়িতে পৌছাতেই মা বললেন দ্রুত ফ্রেশ হয়ে এসে খেতে বস। তারপর কথা হবে। অদ্রি মনে মনে ভাবছে কথা হবে! খেয়ে দেয়ে নাক ডাকিয়ে দেবো ঘুম। ফোনে সকাল বিকাল তিনবেলা কথা হচ্ছে তাও আম্মার এখন সামনে বসে কথা বলা চাই। আত্মীয় স্বজন এমনকি গ্রামের সবার খবর পাওয়া যায় আম্মার কাছে। তোয়ালে দিয়ে মাথা ঘাড় মুছতে মুছতে ডাইনিং টেবিলে এসে বসতেই আম্মা খাবার বেড়ে দিলেন। অদ্রির প্রিয় দেশী মোরগের মাংস, টেংরা মাছ দিয়ে ঝিঙে সহ গোটা চারেক আইটেম আম্মা রান্না করে ফেলেছে সকালে। কোনটাই ফ্রিজের নয় দেখলে বোঝা যাচ্ছে। সাত সকালে এত দ্রুত এসব কিভাবে করা সম্ভব তা শুধু আম্মারাই জানেন।

“আম্মা কাঁচা ঘুমটা ভাঙায় দিলেন!” ঘুম জড়ানো স্বরে অনুযোগ করে অদ্রি। “রাখ তোর কাঁচা ঘুম। এই নিয়ে তিনবার ডাকলাম। সকাল দশটায় শুইছিস। এখন বাজে চাইরটে। কতকাল ঘুমাইসনে! ওঠ। আর কত ঘুমাবি। আছরের আজান দিলো বলে।” উঠতে না ইচ্ছে করলেও অদ্রি ওঠে। না উঠে উপায় নেই। দুই মিনিট পর পর আম্মা এসে ওঠ ওঠ করে যাবেন। আম্মার উপর অদ্রির রাগও হয়, মায়াও হয়। খেয়ে দেয়ে বেলকনিতে রাখা চেয়ারে সে যখন শরীর এলিয়ে বসলো তখন মাগরিবের আজান পড়ছে। ওয়াইফাই কানেক্ট করতে গিয়ে হয় না। চেঁচিয়ে মাকে ডাকে, “আম্মা ওয়াইফাই এর পাসওয়ার্ড আবার চেঞ্জ করছো?”
” না করে কি করবো? বাড়ির সামনে পোলাপাইনের বসে বসে মোবাইল টেপা দেখলেই বোঝা যায়। আমরাও স্পিড পাইনা। তোর আপার সাথে প্রতিদিন ভিডিও কলে কথা না বললে ভালো লাগেনা। তার উপর বাইধা গেলে কেমন লাগে।”
” ওরা পাসওয়ার্ড কই পায় এত?” অদ্রি জানতে চায়।
” শুনিছি ওয়াইফাই অফিসের লোকেরা মাসে এক দেড়শো টাকা নিয়ে পাসওয়ার্ড কয়ে দেয়। ভালো কথা। ব্লুটুথ হেডফোনটা কাজ করে না। তোর আব্বাকে বলছি। সে রাজ্যের কাজ দেখায়। বাসায় অফিস মাথায় করে আনে। বাইরে গেলে আনিস তো একটা ভালো দেখে যাতে চার্জ বেশি থাকে। ও হেডফোনের দড়ি দড়ার যুগ আছে নাকি এখন।”
” নতুন পাসওয়ার্ড কি?”
” আমার অত মনে থাকেনা। দাঁড়া। খাতাখান নিয়ে আসি। ওখানে তোর আব্বা লিখে রাখছে।
সারাদিন ফেসবুকে ঢোকা হয়নি। কানেক্ট করতেই একগাদা নোটিফিকেশন আসতে লাগলো। মিনিট দুয়েক পরে থামলো। কোন এক স্বপ্নে দেখা আকাশ নামের আইডি একাই তার পুরাতন ছবিতে লাইক মেরে ভাসিয়ে দিয়েছে। রাগও হয় আবার হয় না। এরা আছে বলেই তার ছবিতে এত এত লাইক। প্রোপিকটা লাভ রিয়াক্টের সংখ্যা এখন ২৮৩। অদ্রি যদিও মুখে বলে থাকে এসব লাইক কমেন্টসকে সে থোড়াই কেয়ার করে কিন্তু মনে মনে ঠিকই একটা অন্য রকম এক্সপেকটেশন কাজ করে। ছবিতে আরো আরো লাইক কমেন্টস পড়ুক এটা সে সবসময় চায়। ইদানিং ডিএসএলআরে তোলা এবং ঘষামাজাবিহীন কোন ছবি সে আপ করেনা ফেসবুকে।

মেসেজবক্সে ঢুকলো। একই ধরণের মেসেজে সয়লাব ইনবক্স। হাই হ্যালো, কি করছেন, কই থাকেন। ইদানিং গে গুলা খুব জ্বালাতন শুরু করেছে। মেসেজ রিকোয়েস্টে তাদের অশ্লীল মেসেজ প্রায়শই পাওয়া যায়। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানে সে এদের রিপ্লাই না করা ভালো। অনেকে ফেইক আইডি দিয়ে আসে, কেউ রিয়েল আইডি দিয়ে। কেউ মার্জিত, কেউ ভয়ংকর রুচিহীন। একটা মেসেজে অদ্রির চোখ আটকে গেলো। ” হ্যালো অদ্রি, আপনার শহরে আপনাকে স্বাগতম। জানিনা আমাকে আলাদা করে চিনতে পারবেন কিনা। দীর্ঘদিন আপনার সংগে ফেসবুকে বন্ধুত্ব আমার। আপনার লেখা স্ট্যাটাস গুলো নিয়মিত পড়ে থাকি। বেশ গভীর আপনার ভাবনাগুলো। অন্যকেও ভাবতে বাধ্য করে। বলতে পারেন আপনার গুণমুগ্ধ ভক্ত। আপনার সংগে কাকতালীয় ভাবে দেখা হয়ে যাবে বলে ভাবিনি। আপনার যদি আপত্তি না থাকে তবে আপনার সুবিধামত সময়ে আমরা এক সাথে বসে কফি খেতে পারি।”

অন্যরকম মেসেজ। কিন্তু পুরোটাই মাথার উপর দিয়ে গেলো। আইডি নাম কিশোর হায়দার। স্ক্রল করে উপরে গেলো। হ্যা। আগেও তার সাথে চ্যাট হয়েছে। তবে আহামরি কিছু নয়। হ্যালো কেমন আছেন, কি করছেন টাইপ। ফ্রেন্ড সিন্স ২০১৫। বাহ। অনেক পুরাতন বন্ধু। সে ম্যাসেঞ্জারের ডান পাশের মেন্যু থেকে ভিউ প্রোফাইলে চাপতেই প্রোফাইলটি চলে এলো। একি! স্টিল ফ্রেমের চশমা যেন তার দিকেই তাকিয়ে হাসছে। চশমু তাকে যদি চিনেই থাকে তবে কথা বললো না কেন। নাকি এ সেই ক্লাসের লোক যারা মুখে বলতে পারেনা কিন্তু লেখার হাত ভালো।

মেসেঞ্জারে ফিরে লোকটাকে রিপ্লাই দিতে যাবে এমন সময় রাস্তায় বেশ শব্দ করে টায়ার বাস্টের শব্দ হলো। সেদিক থেকে চোখ ফেরাতে তার ফোনে ক্ষীন শব্দ হলো, “হ্যালো!” একি চশমুকে সে ফোন করলো কখন!
– হ্যালো। স্যরি, উইদাউট পারমিশন মেসেঞ্জারে কল দিয়ে ফেললাম। বিরক্ত করলাম নাতো?
– নো নো ইটস ওকে। যদিও আমি কল এক্সপেক্ট করিনি। ভেবেছিলাম টেক্সটে রিপ্লাই দিলেও দিতে পারেন।
– আরে কি বলেন। কেন রিপ্লাই দেবো না। ঠিকই রিপ্লাই দিতাম। আমি সব সময়ে রিপ্লাই দেওয়ার চেষ্টা করি এজ আর্লি পসিবল। কিন্তু অনেক বন্ধুই অভিযোগ করে থাকে যে আমি সময়মত রেসপন্স করিনা।
– ভালো আছেন? বাড়িতে এসে নিশ্চয়ই ভালো লাগছে?
– ভালো আছি। বাড়ি মাত্রই অন্যরকম ভালোলাগা। আপনি কেমন আছেন?

নাহ। চশমুটা ফোনে ভালই কথা বলে। গতকাল এত ক্ষ্যাত এটিট্যুড দেখালো। কখন যে চল্লিশ মিনিট পার হয়ে গেছে অদ্রি টের পায়নি। আম্মার ডাকে ফোন রাখলো। আগামীকাল তাদের দেখা হচ্ছে হোটেল ক্যাসল সালামে।

বাসা থেকে বেরিয়ে ইজিবাইক নিতে যাবে এমন সময় রুবেলের সংগে দেখা। রুবেল অদ্রির কলেজ ফ্রেন্ড। রোমিও টাইপ বয়। বিএল কলেজে ভর্তি হয়েই সে ইন্টারমিডিয়েট পড়া এক মেয়েকে বিয়ে করে ফেলে। তাই নিয়ে কত মামলা মোকদ্দমা। এখন সব মিটে গেছে। রুপসা যাচ্ছে সে। রূপসাতে তার শ্বশুর বাড়ি। অদ্রিকে জোর করে সে ডাকবাংলায় নামিয়ে দিয়ে গেলো তার বাইকে করে। কিছুটা সময় নিয়ে বের হয়েছিলো সে।

জলিল টাওয়ার থেকে আম্মার জন্য ব্লুটুথ হেডসেট কিনলো। এমন সময়ে মোবাইল বেজে উঠলো। চশমুটার ফোন,
– হ্যালো অদ্রি সাহেব, আপনি কি বের হয়েছেন?
– জ্বি বের হয়েছি।
– আপনি কি ফ্রি আছেন?
– মানে? বুঝতে পারিনি!
– না কম্পিউটারের দোকানে আপনার কোন কাজ আছে কিনা!
– ওহ। কোথায় আপনি? দেখছিনাতো!
– বেশ স্মার্ট আপনি। অন্যেরা হলে জিজ্ঞেস করতো, আপনি কিভাবে জানলেন আমি কম্পিউটারের দোকানে!
– আমি হয়তো অন্যদের মত নই। এবার বলুন কোথায় আপনি?
– পেছনে ঘুরুন।
ঘুরতেই মার্কেটের করিডোরের শেষ মাথায় চশমুটাকে দেখতে পেলো অদ্রি। ছয় ফিটের মত লম্বা। ডার্ক ব্লু জিন্সের সংগে আকাশী নীলের শার্টে চশমুকে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে। অদ্রির হঠাৎ মনে হলো, এরকম ম্যানলি ছেলেদের সিনেমায় না নিয়ে কেন যে পরিচালকেরা সব লিপস্টিক মার্কা ছেলেদের নায়ক বানায়!
– আপনি এখানে?
অদ্রি জানতে চাইলো।
– ফ্রাংকলি বলতে, কিছুটা আগেই চলে এসেছি। তাই ভাবলাম জলিল টাওয়ারে ঘোরাঘুরি করা যাক।
– হা হা হা। আমার ক্ষেত্রেও সেম বলতে পারেন। কোথায় বসা যায়?
– ক্যাসল সালামে বসার কথা ছিলো।
– এক জায়গায় বসলেই হলো।
– হাদিস পার্কের দিকে যাবেন? বেশ ডেভেলপ করেছে।
– যাওয়া যায়। লাস্ট টু ইয়ারে খুলনা শহরে সেভাবে ঘুরিনি বলা চলে। নিজ শহরেই অতিথি হয়ে গেছি।
– তাহলে ফ্রি থাকলে বলুন, আপনার শহরকে আমিই ঘুরে দেখাই।
– আপনার সম্পর্কে সেভাবে কিন্তু জানা হলো না। প্রোফাইলে দেখলাম জব করেন। কিন্তু কি জব?
– গভমেন্ট জব।
– কোন সেক্টরে?
– প্রশাসনে।
– ক্যাডার?
– ক্যাডার ছাড়াও প্রশাসনে অনেক জব আছে ভাইয়া।
– স্যরি।
– ইটস ওকে। আমি ৩৩ তম বিসিএসে উত্তীর্ণ।
– হুউম। জিনিয়াস।
– আপনার মত নই।
হাঁটতে হাঁটতে তারা পিকচার প্যালেসের মোড় পেরিয়ে হাদিস পার্কে এসে পৌঁছেছে। আসলেই অনেক উন্নয়ন হয়েছে পার্কটার। কিন্তু আগের মত ভ্রাম্যমাণ মানুষেরা এখানে ওখানে শুয়ে আছে। অদ্রি প্রতিবাদ করে।
– আচ্ছা ব্যাপার কি। আপনি শুরু থেকেই আমাকে ফুলিয়ে যাচ্ছেন।
– আহা! আহত হলাম। একজন গুণমুগ্ধ ভক্তের ফিলিংস আপনি কিভাবে বুঝবেন।
– গুণমুগ্ধ ভক্ত? আমার? এবার কিন্তু সত্যিই বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে।
– আমি যা ভাবি তাই বললাম।
– আচ্ছা আমাকে বলেন, ট্রেনে তো ঠিকই চিনেছিলেন। কথা বলেন নি কেন?
– সত্যি বলতে কি, নেভার মাইন্ড, আপনার স্ট্যাটাস পড়ে আমার মনে হয়েছিলো আপনি কিছুটা ম্যুডি হতে পারেন। ফেসবুক সেলেবদের মধ্যে এটা খুবই কমন। তাই কথা বলিনি। মুগ্ধতাটা নষ্ট হোক সেটা আমি চাইনি।
– হেই ম্যান। আম নট এনি সোশ্যাল সেলেব্রিটি।
– সে আপনার উদারতা। তবে স্বীকার করছি। আমার ধারণা রং ছিলো। আপনি ফ্রেন্ডলি এবং মিশুক।

কথা ছিলো কফি খাওয়ার। ডিনার শেষে অদ্রিকে যখন বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলো তখন রাত সাড়ে দশটা। অদ্রি তাকে বসে যেতে বলায় কিশোর বললো, “একই শহরে আছি যখন তখন যাওয়া তো হবেই একদিন। কাল দেখা হচ্ছে তো?” অদ্রি কি বলবে। দুজনের চোখের প্রত্যাশার রঙ যখন একই তখন দেখা তো হবেই।

দেখা তাদের হতেই থাকলো মুজগুন্নীর পার্কে, রুপসা নদীর বুকে নৌকায়, কফি ক্লাবের চিপা টেবিলে। আম্মা একদিন গজগজ করছে দেখে অদ্রি জিগালো, কি হইছে?
– কেয়ামত মনে হয় আইসা পড়ছে।
– কথা কইতেছিলা আপার সাথে। আপা কি আম্রিকা থেকে কিয়ামতের খবর জানাইছে।
-তোর আপাদের পাশের বাড়িতে যে নেলসন রা থাকেনা”
অদ্রির আম্মা এমনভাবে বললো যেন নেলসনরা তাদের বয়রার বাসার প্রতিবেশী আর তাদের খুব চেনা।
– হুম। কি হইছে নেলসনদের?
– ওদের বড় ছেলে শ্যন একটা বেটার সাথে বিয়া করছে। আর ওরা মাইনা নিছে।
– মাইনা নিছে তাইলে তোমার সমস্যা কি।
– এসব পাপের কথা শুনলে মেজাজ কি ঠিক থাকে।
– আম্মা, আমি যদি একটা পোলারে বিয়া কইরা আনি। তখন কি করবা।
– সব কিছু নিয়া মজা করবিনা অদ্রি। পোলা বিয়া করবি, হিজড়ারা করে পোলা বিয়া। দাড়া পাশটা দিয়া নে। পরদিনই তোরে বিয়া দেবো টিংকির সাথে।
– এহ টিংকি আমার জন্যে বসে আছে। তুমি জানো না কুয়েটের এক ছেলের সাথে তার লাইন। তার বাড়ির লোকেও জানে।
– ওহ আল্লাহ কি কইস। আজকালকার মেয়েগুলাও দেখি সব সেয়ানা। কেয়ামত কি আর এমনি আগোয় আইছে।

পহেলা বৈশাখের দিন খোলা জিপ সাঁসাঁ করে ছুটছে। ড্রাইভিংয়ে কিশোর। পাশে বসেছে অদ্রি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কে পাশ কাটিয়েছে অনেক আগে। রাস্তার দুপাশে এখন গ্রামীণ আবহ। একটা ব্রিজ পেরিয়ে গেলো জিপটি। এদিকের পথটা অদ্রির অতটা চেনা নয়। তাদের গন্তব্য কোন এক ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। মাঠের মধ্যে বসেছে মেলাটি। মানুষের হট্টগোলে গমগম করছে চারিপাশ। সেই সাথে আছে নাগরদোলার ক্যাঁচকুচ, বাঁশির প্যাঁ পু, বাচ্চাদের বায়না কান্না, কিশোরির কাঁচের চুরির রিনিঝিনি, মাটির টেঁপা পুতুল। বাতাসা, জিলিপি, গজা, ভাজার গন্ধে মিষ্টি হয়ে উঠেছে বাতাস। হঠাৎ দুষ্ট কালবৈশাখী আকাশের কোনায় হেসে উঠলো। সবাই পালিয়ে যাওয়ার আগেই সে খলখলিয়ে হাসতে হাসতে পানি ছিটিয়ে ভেজাতে লাগলো। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। কিশোর বললো, আশেকি ২ সিনেমায় এরকম বৃষ্টির মধ্যে একটা রোমান্টিক সিন আছে দেখেছো?
– আমরা বোধ হয় অতটা সাহসী নই।
– আমাদের কাছে কিন্তু জ্যাকেট নেই।
হেসে উঠলো দুজন। একে অন্যের হাত ধরে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে জিপের হুডের উপর বসে রইলো দুজন। কিশোরের কাঁধে অদ্রির মাথা। অদ্রির আঙুলে পরিয়ে দিয়েছে কিশোর একটা আংটি যাতে আর্ধেকটা লাভ সাইন আকা। বাকি অর্ধেক কিশোরের আঙটিতে। প্যান্টের ডান পকেটে নিশ্চুপে ভিজছে অদ্রির সার্বক্ষণিক সংগী মোবাইল ফোনটি যাকে ছেড়ে সে টয়লেটে পর্যন্ত যেতো না। অদ্রি এবং কিশোর জানেনা কিন্তু মহাকাল জানে জীবনের আরো চল্লিশ বছর বিভিন্ন ঘটন অঘটনের মধ্য দিয়ে তারা দুজন একসাথে বৈশাখমাস দেখার সুযোগ পাবে। সে গল্প না হয় তোলাই থাক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.