অনন্ত তুমি

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

আমাদের পরিবারে মোটের উপর চার জন সদস্য৷ আমি, বাবা,মা আর কাজের খালা আয়মন বিবি।
আমার নাম সাহিল। তবে বাড়ির সবাই টুনু বলে ডাকে। কেন ডাকে তা জানি না।কেউ যখন আমাকে টুনু বলে ডাকে তখন রাগে আমার মাথা গরম হয়ে যায়। তবো ও কিছু করার নেই৷ বাল্য নাম বলে কথা।
আমি এইবার এইচ এস সি দিব। আমার বয়স ১৭ গিয়ে আঠারো হল। মেয়ে হলে আঠারো ছিল বিয়ের বয়স৷ ছেলে বলে আরো তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষা করতে আমার অসহ্য লাগে।
বাবা বলেন আমি খুব দ্রুত বড় হয়ে গেছি। মা বলেন আমি বড় হচ্ছি আর অকর্মার ঢেঁকি হচ্ছি। আমার অবশ্য তা মনে হয় না। মনে না হওয়ার পিছনে ও কারন আছে। সেই কারন আরেক দিন বলবো। আজ আমার অনেক কাজ।
সবার আগে তো স্যারের কোচিং সেন্টারে যেতে হবে। সেখানে ম্যাথ আর ফিজিক্স পড়বো। স্যারের নাম মাহবুব। মাহবুব স্যারের বাইশ মিনিটের একটা ভিডিও ক্লিপ আছে গত বছরের ব্যাচ উর্মিলার সাথে। সেখানে তার পারফরমেন্স বেশ উপভোগ্য। ভিডিওটা উর্মিলা নিজে আমাকে দিয়েছিল তার বদনাম করার জন্য। বদনাম করতে আমার কাহিল লাগে। তাই ক্লিপটা সযত্নে রেখে দিছি। উর্মিলা প্রায় কল করে বলতো, কিরে বদনাম যে হল না৷ আমি বলতাম, হচ্ছে। একদম ছড়িয়ে দিয়েছি৷ ভিডিও এখন লোকের হাতে হাতে। দুদিন পরে দেখবি বদনামে ডুবে যাবে।
ঐদিন আকাশে হালকা মেঘ ছিল।যেতে যেতে নামলো ঢল। অগ্যতা প্রবল বর্ষণে আটকা পরে গেলুম কোচিং রুমে৷ একা ছিলাম তাই ক্ল্যাশ অফ ক্ল্যানে মন দিলাম। হঠাৎ স্যারের আগমন। বসতে বসতে বলল,
-সাহিল, আর কেউ আসেনি?
-জি না, তবে এসে যাবে।
স্যার আমার ঠিক পাশে এসে বসলো।একদম শরীরের সাথে শরীর লাগিয়ে। তারপর উরুতে হাত দিয়ে টিপ দিয়ে বলল
-তা, পড়াশোনা কেমন চলছে?
তার মতিগতি আমার সুবিধার ঠেকলো না।আমি আমার উরু হতে তার হাতটা সরিয়ে বললাম
-ভালই চলছে, তবে আপনার ভিডিও টা দেখার পরে আর মন দিতে পারছি না পরাশোনায়।
কথাটা শোনেই ওনি বিব্রত হয়ে গেল। চোখ মুখ শুকিয়ে শীতল গলায় বলল
-কিসের ভিডিও? কী ছাইপাঁশ বকছো।
-উর্মিলার সাথে করা আপনার হার্ডকোর থ্রিপল এক্স এর ভিডিও।
বলেই উঠে বের হয়ে এলুম।এইবার ভয়ে ভয়ে মর শালা। মেয়ে খেয়ে তুর স্বাদ মিটে না আবার আসিস ছেলে খেতে। শালা বাইসেক্সুয়্যাল।
বাসায় ফিরে রাগে মাথা গরম হয়ে গেল৷ কত বড় সাহস শালার৷ আমার গায়ে হাত দিল৷ আমাকে কি উর্মিলার মত বোকা পেয়েছে নাকি?মেরে পিঠের চামড়া ছাড়িয়ে দেওয়া উচিত।
সারা দিন আর রুম থেকে বের হলাম না৷ সন্ধ্যায় বের হয়ে বাজারের দিকে চাচ্ছিলাম।আমি, ওমর আর রাজু। এমনিতে আমি খুব চিল্লায় কিন্তু আজ মন খারাপ। তাই চুপ করে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা ফিল্মি ঘটনা ঘটলো। কারো সাথে ধাক্কা খেলুম৷ দুজন দুদিকে ছিটকে পড়লাম। ওমর আর রাজু দুজন দুদিকে গিয়ে আমাদের তুলল। যার সাথে ধাক্কা খেয়েছি ওনি ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছরের তরুণ। তবে বয়সটা বুঝার উপায় নেই। ত্রিশ ও হতে পারে আবার চল্লিশ ও।এত জোরে ধাক্কা কেন খেলাম? ওনি কি দৌড়ে আসছিলেন। আমি এগিয়ে কাছে যেতেই মুগ্ধ হলাম।বাহঃ পুরুষ মানুষ ও এত সুন্দর হয়? আমি তো এত সুন্দর নয়। সরি টরি বলে লোকটা চলে গেল।
যেতে যেতে রাজু আর ওমরের কাছে আজকের ঘটনাটা বললাম। সব শুনে রাজু বলল
-শালার ব্যাডা মাইয়াখোর জানতাম। এখনো ও দেখি পোলা ও খায়তে চায়৷ চান্স দিলেই পারতি।
বলেই হু হু করে আসতে লাগলো।
সকালে ঘুম ভাঙলো এগারোটার দিকে। রাতে কিছু থ্রি এক্স ডাউনলোড করেছিলাম। তাই ঘুমাতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। ঘুম ভাঙলো বাপজানের গালাগালিতে। ঘুম থেকে উঠে মোবাইলটা হাতে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। বের হয়ে সোজা কিচেনে। ইতিমধ্যে বাপজান চলে গেছে। একটা রুটিতে একটু জেলি লাগিয়ে মুখে দিয়ে সোফায় বসে টিভিটা চালাতেই আয়মন বিবির আগমন
-আফনেরে ডাহে৷
-কে ডাকে?
-আমি কেমনে কমু?
-যাও, আসছি।
-এখনি যান।
-দূর বাল।
রুটিটা মুখে ঢুকিয়ে ড্রইং রুমে যেতেই দেখি গতকালকের ভদ্রলোক।। কুট সুট পরে একদম সাহেব সেজে এসেছে।
-আরে আপনি৷ আসুন আসুন।
ওনি লজ্জিত ভঙ্গিতে সোফায় বসতে বসতে বললো
-ইয়াকুব ভাইয়া তোমার কী হয়?
– আমার বাবা।
-বাসায় নেই?
-উহু। বাসায় নেই।
-আসলে বলবা আমাকে কল দিতে।
-আপনি বসুন, আমি আম্মুকে ডেকে আনি।
-না না, ভাবিকে ডাকতে হবে না৷ আমি এখন আসছি।
-আচ্ছা,আরেকবার আসবেন।
ওনি চলে গেলেন। যেতেই আম্মু আসলেন।
-কে এসেছিল?
-নাম জানি না।
-নাম টা ও জিজ্ঞেস করিস নি? কী জন্য এসেছিলো?
-আব্বুর কাছে
আমি চলে এলাম।এত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না। বই নিয়ে বসতে হবে। আগামী পরশু দিন থেকে এক্সাম।
আমার যা প্রস্তুতি! রসায়নে ফেইল ও যেতে পারি। ফেইল যাইলে আবার বাপজান আমায় আস্ত রাখবে না।
মাঝে মাঝে আমি কেমন অস্থির হয়ে যায়৷ ভেতরে বাহিরে সর্বত্র কেমন না পাওয়ার ঝড় শুরু হয়ে যায়। সেই ঝড়ের উৎস অজ্ঞাত ছিল এত কাল। কিন্তু, ঐ ভদ্রলোককে দেখার পর মনে হচ্ছিল, সেই ঝড় কেন ই আসে। নাভী মূলের নিচ হতে টান টান ভাল লাগা আরম্ভ হয়৷ বুকের দুই পাশে কেমন কোমল সুড়সুড়ি। ভেতরে বাহিরে ভয়ানক ভালবাসা৷ এ যেন তরুণ হওয়ার আলামত৷ পড়তে বসে ভাবতে শুরু করে দেই। আজ কেন এমন অনুভূতি৷ সবার ই কি এমন হয়?
দুই মাস টানা এক্সাম দিয়ে নেতিয়ে গেছি। এখন ভর্তি টেস্টের প্রস্তুতি। বাপজানে কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দিল৷ আমার মন কিন্তু ইতিমধ্যে পাগল প্রায়৷ কার যেন খোঁজ করি সারাক্ষণ।ভেতরে কেমন নেশা নেশা যৌবনের কিশলয়ের উঁকি ঝুঁকি। রাতে হাতগুলা স্থির থাকে না৷
সন্ধ্যার দিকে রুমে দরজা জানালা বন্ধ করে বই নিয়ে বসে যায়। আজ আর বইগুলো ছোঁয়ে ও দেখিনি। সোফায় বা ছড়িয়ে ডরিমন দেখছিলাম৷ হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ৷ আয়মন খালা দরজা খোলে দিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে কী বলল কিছুই বুঝতে পারিনি।পিছনে কারো পায়ের শব্দ শুনে ঘুরে তাকাতেই হৃদয়ে ধক করে শব্দ হল। আরে, এই যে ঐ দিনের ভদ্রলোক।কত সুন্দর তার অবয়ব। কত সুন্দর তার মুখশ্রী। কত মুগ্ধকর তার আঁখি পল্লব।
– টুনু, ভাইয়া বাসায় নেই?
টুনু?ইসস!তার কন্ঠ এই নামটা কত মিষ্টি শুনালো।অথচ অন্য কেউ ডাকলে মাথা নষ্ট হয়ে যায় রাগে৷
আমি বাকরুদ্ধ ছিলাম। সে আবার প্রশ্ন করলো,
-ভাইয়া কি বাসায় নেই?
আমি পুতুলের মত তাকিয়ে থেকে উত্তর দিলাম
-না নেই৷ আপনি এসে বসুন।
ওনি ঠিক আমার পাশে এসে বসলেন। বসতেই আমার শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো।আমি উঠে সোজা আম্মুর কাছে চলে গেলাম।
আম্মু রান্না ঘরে কী যেন করছিলেন।
-আম্মু ওনি এসেছেন।
-কে এসেছেন?
-জানি না। তুমি দেখো গে।
-তা, তুর কী হল? চেহারা এমন বাদরমুখো করে রেখেছিস কেন?
আমি সোজা রুমে চলে গেলুম।আয়নায় নিজেকে দেখতেই লজ্জা পেলুম।ছিঃএসব কী করছি আমি মেয়েদের মত? ভেতরে কেমন ধকধক৷ যেন কেউ প্রবল ঘোরে মৃদাঙ্গ বাজাচ্ছে।
ওনি চলে যাওয়ার পর রুম থেকে বের হলাম।আম্মু তখন সিরিয়াল দেখছিলো সিরিয়ালের নাম ‘দিয়া অর বাতি হাম’।আমি পাশে গিয়ে বসে বললাম
-ওনি কে?
-সান্ধিয়া
-আহা..সিরিয়ালের নয়৷ এসেছিলেন যে, ঐ লোকটা।
-তুর বাবার পরিচিত।
-কেন এসেছিলো?
-দাওয়াত দিয়ে গেলো।
-কিসের?
-এত জানি না।
-নাম কী ওনার?
-সুমন
সুমন!!আহ!!কি সুন্দর নাম। কত সুন্দর উচ্চারণ। মনে হল যেন এই নামটা আমার সহস্র জন্মের চেনা। আনন্দে ভেতরটা নেচে উঠলো।সোজা ছাদে চলে গেলুম। সন্ধ্যার আকাশ৷ সহস্র তারার মেলা। মিটমিট আলোর স্নিগ্ধতায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।ভেতরে এক নির্মল পুলক অনুভব করলাম। নিজেকে প্রশ্ন করলাম,
-আমি এমন কেন করছি? আমি কি মেয়ে হয়ে যাচ্ছি? ইসসস৷ আগে তো এমন হয়নি? আমি একজন পুরুষের প্রেমে পড়লাম? লোকে শুনলে বলবে কী?
রাতে আয়মন বিবির কাছে সুমন সাহেবের সম্পুর্ণ পরিচয় পেলুম। ভদ্রলোক অবিবাহিত। শুনেই ভেতরে আনন্দের ঝনঝন শব্দ হল। এক সময় আমাদের বাড়ির সাথে ভাল সম্পর্ক ছিল। ধীরে ধীরে কমে গেছে। যেমন আন্দাজ করেছিলাম, বয়স ত্রিশ বত্রিশ এর মধ্যে হবে।
আমার তো ১৮ তে এসে ঠেকেছে৷ নিজের চেয়ে এত বড় কারো প্রতি মুগ্ধ হয়ে গেলাম? এ কেমন অসুগ ইশ্বর?
আজ সুমন সাহেবের বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়ার দিন৷ গতকাল সারা রাত ঘুম হয়নি। ছটফটিয়েছি। সকাল থেকেই চুল কেটে, দাঁড়ি কেটে প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি৷ বাবা আসলেন দশটার দিকে৷ সাথে দুনীয়ার মিষ্টি, ফলমূল। গাড়ি বোঝায় করে ছুটলাম কথিত আত্নীয়ের বাড়ি৷ ভেতরে কেমন একটা খুশি তা বুঝানোর ভাষা নেই।
গাড়ি থেকে নেমেই মুগ্ধ হয়ে গেলুম।একতালা তিন চার রুমের একটা বাড়ি। চারদিকে গাছপালা ঘেরা। বাড়ির পিছনে বাধায় পুকুর৷ পুকুরের চারদিকে ছোট ছোট গাছ৷ সম্পুর্ণ বাড়িটা ই সবুজ৷ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলাম।
ঐ দিনটা ছিল আমার জীবনের সেরা একটা দিন। সাদা পাঞ্জাবী পড়া যে লোকটা একা এত বড় বাড়িতে থাকে৷ যে আমাদের নিজ হাতে এত কিছু রেধে খাওয়ালো, সেই লোকটার প্রেমেই আমি পড়েছি।
সুমন সাহেব আমাকে সারা বাড়ি দেখালেন৷ তার পাশাপাশি আমি হাঁটছিলাম। সে আমার পাশে৷ শেষ দুপুরের আলো এসে পড়েছিল আমার চোখে মুখে৷ আমি বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিলাম৷ সে হেসে হেসে কথা বলছিল৷ তার হাসিতে ছিল আনন্দ৷আমি তার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর হু হ্যা করেই দিচ্ছিলাম৷ এক সময় মন থেকে প্রশ্ন করলাম
-আপনি বিয়ে করেন নি কেন?
আমার প্রশ্ন শুনে কয়েক সেকেন্ড নিরব রইলেন৷ তারপর অনেকটা আনইজি হয়ে বলল
-ইচ্ছে করেনি।
আমি আর কথা বাড়াইনি। এড়িয়ে গেছি। সে আমাকে প্রশ্ন করলো
-তা তুমি কাউকে পছন্দ টচন্দ কর নাকি, টুনু?
-হুম করি৷
বলে চলে আসলাম।প্রতিত্তোরে সে কি বলে তা শোনার কোনো আগ্রহ ছিল না আমার।তার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা, তার বিচলিত চেহারা দেখার কোন আগ্রহ ছিল না৷ শুধু মনে হয়েছিল, আমি কষ্ট পাচ্ছি৷ খুব কষ্ট৷ কষ্টের উৎস অজ্ঞাত৷ তবে আমি পাচ্ছি৷
মাঝখানে কিছু দিনের মধ্যে আমি তার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে ঢুকে গেলাম। একদিন ভয়ে ভয়ে ম্যাসেজ করেই দিলাম।
-হ্যালো
-হাই
-আমি সাহিল।
-জানি।
-কেমন আছেন?
-ভালো।
তার সংক্ষিপ্ত ও আগ্রহহীন চ্যাট আনাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছিলো৷ রাতে ঘুম হতো না৷ তার সমগ্র প্রোফাইল ঘুরে বেড়াতাম। আপলোড করা প্রতিটি ছবি আর স্ট্যাটাস বারবার পড়তাম। চ্যাটে ব্লু মার্ক দেখে নক দিতাম কিন্তু তার উত্তর না পেয়ে নিরাশ হয়ে যেতাম।
মাঝে মাঝে কষ্ট আর হতাশায় ভেতরটা মরে যেত৷ ভালবেসে না পাওয়ার কষ্টের এত তীব্রতা আমার অজ্ঞাত ছিল৷
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকতেই তার ম্যাসেজ
-সাহিল..। তুমি কি আজ একবার আমার বাসায় আসবে? কিছু কথা বলার ছিল৷
ম্যাসেজ পেয়ে আমি আর দেরি করিনি।নিজেকে গুছিয়ে সোজা গাড়িতে চড়ে বসে তার বাড়ি৷ আমি যখন পোঁছলাম তখন সকাল দশটা।একটা ফুল হাতার নীল রঙের শার্ট পড়ে দাঁড়িয়ে ছিল৷। তাকে দেখেই হৃদয় ধকধক করে উঠলো। একদিকে তাকে দর্শনের আনন্দ অন্য দিকে কী বলবে তা নিয়ে অস্থিরতা৷ ভেতরটা যেন ভাল লাগা মন্দ লাগার ঢেউয়ে উত্তাল। তার পিছনে পিছনে গিয়ে বসলাম। আমাকে বসিয়ে রেখে তিনি ফিরলেন দুই কাপ কফি নিয়ে৷আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। দৃষ্টি আটকে দিয়েছি তার অবয়বে৷
-এইভাবে তাকিয়ে কেন?
আমার হুশ ফিরলো। কফিটাতে চুমুক দিতে দিতে সে আবার বলল
-তুমি আমাকে এত মেসেজ কেন কর?
আমি এই প্রশ্নের ও উত্তর না দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উত্তর না পেয়ে সে উপদেশের স্বরে বলল
-তুমি ভুল পথে পা বাড়াচ্ছো টুনু।
আমি উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম । উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করলাম
-কোনটা ভুল? আপনাকে ম্যাসেজ করা নাকি আপনার জন্য ছটফট করা৷ ভালবাসাটাকে আপনারা ভুল বলেন নাকি?
রাগে আর কষ্টে আমি তখন আমার ছিলাম না।
সে মুচকি হেসে আমার হাতটা টেনে ধরলো।
-শান্ত হয়ে বসো৷ আমি কী বলি শোনো৷
-বলেন
-দেখ সাহিল, তোমার সবে আঠারো বয়স৷ বড় হয়েছো মাত্র৷ এখন তোমার চিন্তা ধারা আবেগ প্রসূত৷ আমি তোমার চেয়ে বয়সে দ্বিগুন বড়৷ আমি মানছি আমি হোমোসেক্সুয়্যাল। না হয় তোমাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে গেলাম। ভালবাসলাম৷ কাছে থাকলাম। কিন্তু আমাদের বয়সের এই তফাৎ কাটাতে কাটাতে আমাদের সারা জীবন লেগে যাবে ।
আমি কিছু বললাম না৷ তার কথাগুলো শুনে সোজা বাড়ি চলে এলুম৷ আমাকে বড় কিছুর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে৷ যে কোন কিছুর মূল্যে হলে ও তাকে আমার চাই।
সবার আগে ফেসবুক আইডিটা ডিএক্টিব করলাম।তারপর রুমের দরজা বন্ধ করে ফুল ভলিউমে ক্লাসিক গান ছেড়ে দিলাম পিসিতে৷ছেড়ে দিয়ে বই নিয়ে বসলাম।গান শুনতে শুনতে পড়তে বসা। আমি আগামী অনেকগুলো দিন তার কোন খবর নিবো না। তার কথা ভাববো না৷ তাকে আমার গুরুত্বটা বুঝতে হবে৷ তাকে রোজ ভোরে গুড মর্ণিং,রাতে গুড নাইট জানাব না। তার অপেক্ষায় যখন কেউ আর বসে থাকবে না, ভালবেসে গুরুত্ব দিবে না, ঠিক তখন হবে তার প্রকৃত বিসর্জন।অতি সহজে লব্ধ বস্তু কমদামী ই মনে হয়৷ আমাকে দামী হতে হবে৷ সহজ লভ্য হলে চলবে না।
বেচারা সুমন সাহেব৷ দুদিন আমার বিরহ সহ্য হল না আবার মুখে বড় বড় কথা৷ গোসলে ছিলাম।কল করতেই বুঝে গেলাম এটা তার কল৷ একমাত্র তার রিংটোন ই ভিন্ন। বের হলাম না৷ ফোন ও ধরলাম না। দশ থেকে বারোটা কল আমি অবহেলা করেছি। এখন তার অবহেলার দিন। অনেক সয়েছি আমি৷ এইবার তার পালা।
এরপরের দিন সকালে সে এসে হাজির। আমি ঘুমিয়েছিলাম।আম্মু এসে কয়েকবার ও যখন ডেকে তুলতে পারেনি, তখন সোজা সে এসে হাজির৷ তার পায়ের শব্দেই আমার হার্ট স্পীড বেড়ে গেল। লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াসরুমে ঢুকে গেলাম। আমার নাগাল পাওয়া চাট্টিখানি কথা না।
ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করে সে চলে গেল ফোনে একটা মেসেজ ছেড়ে
-এত অবহেলা কাম্য নয়।
আমি রিপ্লে দেইনি। অবহেলার কী দেখেছেন ওনি? আরো তো অনেক বাকি।
এর দু দিন পরে কোচিং সেন্টার থেকে বের হতেই দেখি বাইক নিয়ে ওনি দাঁড়িয়ে। চোখে কালো গ্লাস,কালো টি শার্ট, হাতে রেপটেড করা একটা প্যাকেট। আমি তাকে দেখে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছিলাম।কিন্তু ওনি ঠিক ই দেখে ফেললেন৷ নাম ধরে ডাক দিতেই আমি এগিয়ে গেলাম।
-আরে আপনি? কিসের জন্য এলেন?
-গাড়িতে উঠো।
-আমি গাড়িতে উঠি না।
-উঠবে নাকি জোর করে উঠাতে হবে।
অগ্যতা আমাকে গাড়িতে উঠতে হল।চোখ বন্ধ করে বসে রইলুম৷ কোথায় যাচ্ছি৷ কেন যাচ্ছি তা কিছুই জানি না। ভেতরের খবর ভেতরে জানে৷ বাহির তখন স্বাভাবিক। নিজেকে এতটুকু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো কে জানতো।
গাড়ি থামলো তার বাড়ির সামনে৷ চোখ খোলেই দেখি আমরা এসে গেছি৷ আমি নামলাম।তাকে অনুসরণ করে সোজা তার শোয়ার রুমে। এতক্ষণে আমার মন মস্তিষ্ক সব নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে গেছে।
সে আসলো। খালি শরীর৷ তার সূঠাম দেহ, ঘামে ভেজা লোমশ শরীর৷ ধবধবে ফর্সা শরীরে কালো পশম। আমার হার্টস্পন্দন কয়েক গুণ বেড়ে গেল৷ সে ধীরে ধীরে আমার কাছে গিয়ে এল। আজ তার চোখে লজ্জা নেই, সম্মানবোধ অথবা সম্মান হারানোর ভয় নেই। প্রেম উপচে পড়া দৃষ্টি। সে এগিয়ে এসে চোখে চোখ রেখে আমার ঠোটে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল
-আই লাভ ইউ টুনু
আমি তখন কাঁপছিলাম।সে আমাকে শক্ত করে ধরে বলল
-আমি তোমায় ভালবাসি৷ তুমি বাসো না?
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম।আমার তখন বলার মত ভাষা ছিল না। ঝাপটে তার বুকের উপরে পড়লাম।সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শোয়ে দিল। আমার উপরে শোয়ে আমার ঠোটে, চোখে, গলায় চুমু খেতে লাগলো। আমি শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে রইলাম।
প্রেমে আমরা দুজন ঘেমে একাকার৷ এতক্ষণ এই রুমে যা ঘটেছে তার নাম কী দিব? চাহিদা নাকি প্রেম? আজ আমি তাকে পেয়েছি। বিছানায় রক্তে রঞ্জিত হয়ে আমার ভালবাসার প্রমাণ দিয়েছি। তার চোখের জলে আমার ভালবাসা দেখেছি।
হে ইশ্বর, আমি তাকে পেয়েছি। ভালবেসে পেয়েছি। তাকে যেন না হারাতে হয়৷

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.