অন্তর্দহন

লেখক :- অ আ

চোয়াল দুটি ভেঙে এসেছে বোধয়। সাথে চোখেও মনে হয় কেমন ক্লান্তির ছবি ফুটে গেছে।আজকাল চোখের নিচে ডার্ক স্পট দেখে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করছে,

‘নাওয়া খাওয়া কি ছেড়ে দিয়েছিস?’ 

ঘরের খেয়ালী মানুষগুলো ঔষুধ-পথ্যের জন্য ছুটোছুটি করে। আমার তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই যেন করা হয় না।তাদের এতসব যত্নের পরেও আমার রোগ সারে না।জোঁকের মত চেপে থেকেই যায়। আমার কেবল তোমার যত্নের অভাবটাই বোধ হতে থাকে। তোমার বুকের গলি থেকে না আসা কথাগুলোর জন্যই আজকাল আমাকে অনিদ্রা পেয়ে বসেছে।মায়া থেকে না হোক, কেবল তোমার মুখের শব্দ গাঁথুনিতে তৈরি কথাগুলোই আমার চোখ বুজার শক্তি জোগাতো 

লোকসমাজ জানে না হয়ত তোমার আমার অসম এই প্রেমের গল্প।এই ব্যবচ্ছেদের কাহিনী তাদের চোখে পড়ে না কখনো।তবুও আমার কণ্ঠনালীতে এসে আঁটকে থাকা শব্দগুলো চিৎকার করে বলতে চায়,

‘মানুষটা আমার প্রাণের মাঝে বসা।’

আমার অনুভূতিরা বিষাদের আরাধনা করে তোমাকে প্রভু করে! এরা এতটা ধর্মবিরুদ্ধও বা হলো কী করে! মৃত্যুর ভয় নেই এই অনুভূতিগুলোর? এমন জ্বলনের পরেও এদের পরজগতের জ্বলনের ভয়টা হয় না কেন জানি। তুমি কখনো টের পেয়েছিলে এপাড়ের দাবদাহের তাপাংশ?

একটা সময় তোমার জন্যে আমার কেমন অস্পৃশ্য সব অপেক্ষা ঘিরে থাকতো! অসভ্য বর্বরের মত সংসারের সমস্ত চিন্তা-ভাবনাকে মাড়িয়ে আমি ছোট-ছোট সব বার্তার প্রতীক্ষায় বেলা গুণতাম। আর দশটা প্রেমিকের মত আমার প্রেমিকটাকেও মধ্যরাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে দেখার আশায় দোরে দাঁড়িয়ে ইতিউতি করতাম।

একটা সময় ছিল আমি,যখন আমি জগতের সমস্ত কাজকর্মকে একপাশে সরিয়ে রেখে তোমার ফোনের অপেক্ষা করতাম।ফোনের ওপাশে তোমার সেল নাম্বারটা ব্যস্ত থাকতো-তুমি শত ওজর দেখাতে,বলতে অফিসের ফোন এসেছে,আম্মু ফোন দিয়েছে,ভার্সিটির ফ্রেণ্ড ফোন করেছে।আর আমি কেমন অবলীলায় সেসব বিশ্বাস করে যেতাম।তখন বোকা ছিলাম নাকি তোমাকে একটু বেশিই ভালবাসতাম তা আজও বুঝে উঠতে পারিনি।

বার্থডে,ভ্যালেন্টাইন্স ডে,প্রমিস ডে কত কিছুই পার হয়ে যেত।অথচ তুমি নানানসব ছুতো দেখাতে।আমি তোমার মুখের কথা গুলোকেই বেদবাক্যের মত মেনে নিতাম। বছরের ৩৬৫ দিন হতে যে কোন একটা দিনের কোন এক হলদে বিকেলে তুমি আমার হাত ধরে হাঁটলেই আমার পুরো বছরের ভালবাসার তৃপ্তি এসে যেত। লোভীর মত তোমাকে বারোমাস কাছে পাওয়ার বাসনা আমি করিনি, মাঝেমাঝে অনিচ্ছাতেও যদি বলতে,

‘খাবার খাওনি কেন?তাহলে আমিও খাব না’- 

তখন আমার পুরো বছরের বেঁচে থাকার রসদ জোগাড় হয়ে যেত।

ভালবাসার জন্যে কি আমি খুব কাঙাল ছিলাম? তোমাকে হারানোর এত ভয় কেন কাজ করত আমার মধ্যে? নাকি প্রচণ্ড ভীতু ছিলাম? আমার যখন মনে হত তুমি হারিয়ে গেলে আমার পৃথিবীতে অন্ধকার নেমে আসবে,কেউ আর তখন ঠোঁটে তর্জনী আঙুল ঠেকিয়ে বলেনি, ‘আমি আছি তো।’

তোমাকে খুইয়ে ফেলার ভয়টা কাজ করত যখন তোমাকে অনুপস্থিত অবস্থায় দেখে ফেলতাম কখনো কখনো। তবে প্রশ্ন করতাম না,

‘রিকশার পাশের সিটে কাকে সাথে নিয়ে ঘুরছো?’

তুমি বলতে তোমার মন জুড়ে নাকি আমারই বসবাস।আর আমিও বোকার মত তোমাকে নিয়ে আসা সন্দেহ গুলোকে মস্তিষ্কে ঢুকতে দিতাম না।দুরদুর করে তাড়িয়ে দিতাম।আমার সাথে রাখা ছলনামাখা সম্পর্কই ছিল হয়ত তোমার।কিন্তু তবুও ‘আমার কেউ আছে’ কথাটা ভাবার অধিকারটুকু আমার ছিল।

সেবার যখন তোমার ঘরে অন্য একটা মেয়ের স্থায়ী নিবাস তৈরি হলো- তখন আমার কেবল মনে হচ্ছিল তুমি কখনোই আমার ছিলে না।যখন ‘আমি তোমার’ বলতে তখনও না,আজ যখন তোমার ঘরে অন্য কারোর বসবাস এখনও না।তবে তখনকার তোমার সাজিয়ে গুছিয়ে বলা মেকি কথাগুলোকে খড়কুটো ধরেই আমি ভেবে নিতাম তুমি আমাকেই ভালবাসো।

তোমার বলা মিথ্যে কথাগুলোই তো আমার নিজের আমিকে বোঝানোর উপায় দিতো যে তুমি আসলেই আমার।

কিন্তু আজ দেখো, সেই খড়কুটো গুলো আঁকড়ে ধরার সুযোগটুকুও আর রাখোনি।কিছু কিছু কথা খুব তীব্র হয়- যেগুলো বক্ষকে বিদীর্ণ করে মনের দেয়ালের পলেস্তারা স্পর্শ করে যায়।সেদিনের বাতাসের সাথে ভেসে আসা ‘ওর বিয়ে হয়ে গেছে’ কথাটাও কি তেমন ছিল না?

আমার মনে তোমার বসবাস বলে বলে কেমন নির্মম এক বিচ্ছেদই না ঘটালে কোমল এই সম্পর্কটার।কিন্তু তোমার আমার বিচ্ছেদ তো ঘটেনি।কেবল তোমার সেল নাম্বারটা ডায়াল লিস্টে তলিয়ে গেছে- আর কেবল ঘনঘন কারো নাম্বার ওয়েটিংয়ে আছে শোনা হয় না।

নতুন সংসারে তুমি অন্য কারো চুলে মুখ ডোবালেও আমি  এখনো সেই পুরোনো অভ্যেসে মনে করে নিই- তুমি বুঝি অফিসের কাজেই আটকে আছো। আচমকাই যখন স্মৃতিকাতর মনটা তোমার পানে দৌড়োয়,আমি তখন বাচ্চা সামলানোর মত করে মনকে বলি- ‘নির্লজ্জ-বেহায়া কোথাকার!’

তুমি জানো না, তোমার দু’মিনিটের ভয়েস কল দেওয়াটা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার দলিল হয়ে গেলেও আমার অনুভূতি চুপসে যায়নি-কেবল শিথিল হয়ে পড়েছে তোমাকে বলব বলব করে না বলা কথাটা।তোমার আমার মধ্যকার ভৌগলিক দূরত্বটা দু’তিন কিলোর বেশি না হলেও আমাদের মধ্যকার এই অলিখিত দূরত্বের পরিমাণটা আমার কাছে বিশাল মনে হয়।

তোমাকে কখনো শোনানো হয়নি,দিন আর রাতের সবটুকু জুড়ে তুমি কেমন ধোয়ার মত আমার শ্বাসপ্রশ্বাসে জড়িয়ে থাকো।

দেখো,দুঃস্বপ্নের মত সেই দিনটির পর কতগুলো দিশাহীন বেদনাতুর দিন আর জেগে থাকা রাত পার হয়ে গেল,অথচ আমার মনে হয় তুমি বুঝি কোথাও লুকিয়েছ! এই আসবে বলে। এ কি আমার মনকে বোঝানোর পায়তারাই কেবল?

আচ্ছা এপাড়ের খুপরী ঘরের ব্যথাগুলোর পায়চারির শব্দ কি তোমার ঘর অব্দি পৌছায়? বাকহীন ভাষাগুলো কি ভেসে যায় তোমার এলাকা অব্দি?

এসব ছাড়ো।আমার ব্যথা,আমার একাকীত্ব,আমার শূন্যতা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।

তুমি জানো,আমার কোন শূন্যতা নেই।কিভাবেই বা হবে, আমার সমস্ত শূন্যতা জুড়েই যে তোমার বিচরণ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.