অপরাহ্ন

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

আমার কথা বলি। আমি নিজের কথা বলতে পছন্দ করি। আমার কাছে নিজের সব কিছুই ভাল লাগে। আমার হাসি, আমার কান্না,আমার বেঁচে থাকা।
আমি নিলয়। আমার বাবা মা আমার নাম রেখিছিল লোকমান। ছি! কী বিশ্রী নাম। আমি সেই নাম পাল্টে নিলয় রেখে দিয়েছি। লোকে কত কথা বলল। বলল বাবা মার রাখা নাম পাল্টাতে নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার বাবা মা তো আমাকে জন্ম দিয়েই ক্লান্ত। চার ভাই চার বোনের সংসারে আমি সবার ছোট। ছোট বলে ই পরিবারের অভাবটা আমাকে বেশি ই স্পর্শ করেছিল। যখন স্কুলে ছিলাম তখন, খাতার অভাব,কলমের অভাব, স্কুল ড্রেসের অভাব। সব কয়টা ভাই বোন মাঝ পথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল। আমি ছাড়েনি। এই যে, আমাকে বড় হতে হবে। বড় হওয়ার জন্যেই তো এত কাঠ খড় পুড়ালাম।
নিজের হাতে নিজেকে বড় করা খুব সহজ কাজ নয়।সহস্র বাধা,বিপত্তি আর মানসিক অশান্তির পরে আজ যে এই তৃপ্তি আর সফলতা তার সকল অবদান আমার।লোকে বলে আমি অহংকারী, বলে আমি স্বার্থপর, কতকে হিংসুটে ও বলে। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি যেমন ই হয় না কেন, আমি আমাকে ভালবাসি। এবং খুব ভালবাসি। এই যে নিজের প্রতি এত ভালবাসা তার নাম কী?
আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে আমার নিজের বাড়ি আছে, নিজের ব্যবসা আছে। আমার জীবনের ত্রিশ বছর বয়সে যা যা করেছি তা কেবল আমার সদিচ্ছার ই ফল। বড় ভাইদের কাজ দিয়েছি। বোনদের স্বামীদের সুবিধা দিয়েছি। এখন আর আমাদের দুঃখ নেই। অথচ এমন একটা সময় ছিল যখন পেটভরে খাবার স্বপ্নের মত মনে হত। খুদের আর মোটা চালের ভাত ও অমৃতের মত লাগতো।আজ আমার অবস্থা পাল্টেছে। তা শুধুমাত্র আমার পরিশ্রমে। তাই এই সফলতা আমার। একা আমার।
তাই আমি আমাকে ভালবাসি। আর কারো প্রতি আমার ভালবাসা আসে না। আমার দুইটা ইটকল,রাইস মিল,ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে দুইটা শপিং মল আর এই পাঁচতলা বাড়ি, তার সব আমার। আমি মারা যাওয়ার পরে তা কে পাবে তা নিয়ে সবাই ভাবছে ভাবুক। আমি ভাবি না। আমি অবিবাহিত। কোন দিন বিয়ে করবো না। আমি একা আছি, ভাল আছি। তা নিয়ে কোন আক্ষেপ নেই। লোকের এত আক্ষেপ, এত হায় হুতাশনের কিছু ই আমাকে স্পর্শ করতে পারে না।
বড় আপা প্রায় বলেন, বিয়ে করার কথা। আমি তাকে থামিয়ে দেই। বিয়ে করার মানে হল নিজের গৌরব ক্ষুন্ন করা। যা আমি হতে দিব না। আব্বা আম্মা কেউ ই আমার সাথে থাকে না। মূলত তারা আমাকে পছন্দ করে না। কেন করে না, তার উত্তর আমি জানি। জানার পরে ও চুপ থাকি। থাকুক, যে যার মত।
ঐদিন সিলেট থেকে ফেরার পথে ঝড় শুরু হল। গাড়ি থামিয়ে পাশের গ্রামে গিয়ে উঠলাম।গ্রামের নাম শশই।রাস্তার মাঝে গাছ ভেঙ্গে পড়েছিল। সরাতে সরাতে ঘন্টা লেগে যাবার কথা। এই সময়টা গাড়িতে বসে থাকতে বিরক্ত লাগছিল। তাছাড়া অনেক দিন পরে বৃষ্টিতে ভিজতে ও খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। গাড়ি থেকে নেমে সোজা হাঁটা ধরলাম গ্রামের মাটির রাস্তা দিয়ে। বৃষ্টির পানিতে সারাপথ পিচ্ছিল আর চলার অযোগ্য ছিল।
মাঝে মাঝে নিজেকে কেমন তুচ্ছ মনে হয়। মনে হয়, আমি আগের মত ই আছি। সাধারণ হতদরিদ্রের মত। এক সময় অভাব ছিল তাই কষ্ট ছিল। আজ অভাব নেই তবো হৃদয় জুড়ে কেবল কষ্ট আর কষ্ট। বাবা মার ঘৃণার কষ্ট, একাকিত্বের কষ্ট, ভালবাসাহীনতার কষ্ট। সেই কষ্ট দূর করার জন্যেই গ্রামের রাস্তায় নেমে যাওয়া। সাধারন মানুষ হয়ে। কোট, টাই বুট গাড়িতে রেখে। মেরুন রঙ্গের শার্ট গায়ে দিয়ে কাদায় মাখামাখি হয়ে হাটছিলাম।প্রবল বর্ষণের ঝাপটায় মাঝে মধ্যে কেঁপে উঠছিলাম।হঠাৎ করেই পিছন থেকে কেউ একজন বলে উঠলো, ঐ দিকে যাবেন না প্লিজ। আমি ফিরে তাকালাম। একটা বিশ বাইশ বছরের ছেলে। ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে। বাতাসে তার ছাতা কয়েকবার উল্টে যাওয়ার কথা ছিল। আমি তার কথা না শোনার ভান করে আবার হাটা দিলাম সামনের দিকে। সে আবারো আমাকে বাঁধা দিল সামনের দিকে না যাওয়ার জন্য। এইবার আমার রাগ হল খুব। আমি প্রশ্ন করলাম,
-কেন যাব না?
সে স্পষ্ট স্বরে মুচকি হেসে উত্তর দিল,
-আপনি ফসলের জমি দিয়ে হাঁটছেন। সামনের জমিগুলোতে সকালে ধানের বীজ ফেলেছে। তাই বলছিলাম, ঐ দিকে না গিয়ে রাস্তা ধরে হাটুন।
আমি ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম আমার ই মতিভ্রম। ভাবতে ভাবতে কখন যে পথ ছেড়ে ক্ষেতে এসে উঠেছি।
গাড়িতে এসে বসলাম।হাঁটু অবধি কাদা। ড্রাইভার আমাকে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।কিছু বলল না। রাস্তা পরিষ্কার। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। ড্রাইভার আমার আদেশের অপেক্ষায়। আমি নিজের অজান্তেই ছেলেটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।কিন্তু কেন?
বাড়ি ফিরে মনটা খালি হয়ে গেল। ভাবতে লাগলাম পুরানো দিনের কথাগুলো।বাবার আদরের কথা, মায়ের ভালবাসার কথা। বড় ভাই, ভাবি, দিদি, ছোটকির কথা। এত বড় পরিবার ছিল আমাদের। সবাই কত খুশি ছিলাম। অথচ আজ কিছু ই রইল না। সব যেন ঝড়ের মত তছনছ হয়ে গেছে।
বিকেল হলে মনটা অস্থির হয়ে যায়। এত বড় বাড়িতে একা একা ঘুরাঘুরি করি। ছাদে যাই, বই পড়ি। অফিসের ফাইল দেখি। নিজেকে ব্যস্ত রাখি। তবো ভাল লাগে না। মনের মধ্যে যে ভয়ানক শূণ্যতা তা দূর হওয়ার কোন নাম ই নিচ্ছে না।
সন্ধ্যায় বের হলাম বাইকটা নিয়ে।বের হতেই বিদ্যুৎ চলে গেল। আকাশে মেঘ। বৃষ্টি নামবে নামবে করছে। হঠাৎ সামনে একজন এসে আকস্মিক দাঁড়ালো। অন্ধকারে চেহারাটা বুঝার উপায় নেই।সে সামনে এসে খুব ক্লান্ত স্বরে বলল
-একটু সদর হাসপাতালে পৌঁছে দিবেন? প্লিজ
আমি দ্বিধা করলাম না। বাইকে উঠিয়ে নিলাম।বিশ মিনিটের পথ দশ মিনিটে অতিক্রম করে হাসপাতালে পৌঁছতেই তার চেহারা পরিষ্কার হয়ে এল।ছেলাটা আজ ক্লান্ত। চেহারায় হতাশা আর অসহায়ত্ব। সেদিন যেদিন দেখেছিলাম সেই দিন অন্য রকম লাগছিল। আজ অন্য রকম।আমার মনে হল আমার সাহায্যের দরকার। আমি তার সাথে ভেতরে গেলাম।তার বলতে হল না।ভেতরে যেতেই দেখলাম বারো তেরো বছরের একটা শিশু। মাথা থেকে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে।প্রাণ যায় যায় অবস্থা। নিজের অজান্তেই ভেতরটা কেঁদে উঠলো।এখানে থাকলে মারা যাবে। যা করার শিঘ্রই করতে হবে।
ছেলেটার নাম রাজভি।খুব অসহায় ছিল সে। নিজের জন্য না। যে মেয়েটাকে বাঁচানোর জন্য ওর এত ছটফটানি ছিল সেই মেয়েটা ওর কেউ ছিল না। আমি অবাক হয়ে ছিলাম পরের জন্য কাউকে এত কষ্ট পেতে দেখে।মেয়েটাকে শহরের ভাল হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করিয়েছিলাম, রোজ দু বার করে খবর নিয়ে ছিলাম। যতবার ই যেতাম রাজভিরের সাথে কথা হত। এতিম অসহায় একটা মেয়ে।ওর জন্য ওর আবেগ, সুস্থ্য করার জন্য এত দৌড়ঝাঁপ আমাকে মুগ্ধ করলো। নিজের জন্য সবাই ব্যস্ত। আমি ও। রাজভিকে দেখলাম, পরের জন্য এত কষ্ট পেতে। হাসপাতালের বিল,ঔষধ, কিছু ফলমূল আর জামা কাপড় কিনে দিয়ে মেয়েটাকে বস্তিতে পৌঁছে দিলাম।মেয়েটা থাকে ওর বৃদ্ধা নানা নানীর সাথে। হাতে কিছু টাকা দিয়ে রাজভিরকে নিয়ে যখন গাড়ি করে বাড়ি ফিরছিলাম তখন রাজভির অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর চোখে আমার চোখ পড়তেই ভেতরটা পূর্ণতায় ভরে গেল। মনে হল এই ছেলেটাকে আমি চিনি। জানি। অনেক জনমের পরিচয় আমাদের।
আজকাল সারাক্ষণ ই রাজভির কথা মনে হয়। অফিসের কাজের সময়, যখন একা থাকি।গতকাল ছাদে বসে পাখিদের খাবার নিচ্ছিলাম।সেই সময় কাজের ছেলেটা এসে বলল, নিচে আমাকে কেউ ডাকছে। আমি নিচে নামতেই দেখলাম রাজভি দাঁড়িয়ে। হাতে কিছু ফুল, আর কী কী যেন।নীল রঙের পাঞ্জাবিতে ওকে বেশ মানিয়েছে। অথচ নীল রঙটাই আমার সবচেয়ে অপছন্দের। আজকে নীল রঙটাকেই সুন্দর লাগছিল। মনে হচ্ছিল পৃথিবীতে নীল রঙ ই একমাত্র রঙ।ওকে বসতে বললাম। আমার সামনে বসলো। ফুল গুলো আর চকলেটের প্যাকেটগুলো হাতে দিতে দিতে বলল
-এত উপকার করলেন যে দেওয়ার মত কিছুই ছিল না। তাই এই তুচ্ছ উপহার গুলো যদি গ্রহণ করেন।
আমার দীর্ঘ ত্রিশ বছর বয়সে এই প্রথম কেউ ফুল দিল।ভেতরটা আনন্দে আন্দোলিত হচ্ছিল বারবার। ফুলগুলো নিতে নিতে বললাম
-কী খাবে বল।
-না, কিছু খাবো না। আপনাকে আমার বাসায় নিমন্ত্রন দিতে এসেছি।
-কিসের জন্য?
-নিমন্ত্রনের জন্য কারন লাগে না।সখ্যতা লাগে। আশা করি সেটা আপনি দেখাবেন।
-কবে যেতে হবে?
-আজ সন্ধ্যায়।
-আমি যে চিনি না।
-আমি এসে নিয়ে যাবো।
রাজভি চলে গেল।নিজেকে প্রতিষ্টিত করেছি অনেক দিন। কারো নিমন্ত্রণে, কারো সখ্যতায় সারা দেইনি।নিজেকে একা করে রেখেছি। এটাকে আত্ম অহংকার বলতে পারো, বলতে পারো একঘেয়েমি। যে যাই বলুক। আমি এমন ই ছিলাম।আজ রাজভিরের নিমন্ত্রণে সারা দেওয়ার জন্য মনটা সাঁই দিল। মনে হল হাজার হাজার নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা গেলে ও ওর নিমন্ত্রণে যেতেই হবে।
সন্ধ্যা তখনো হয়নি। আমি রাজভির জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছি। প্রতিটা মিনিট, প্রতিটা মূহুর্ত ওর অপেক্ষায় নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম।ও এল মুচকি হেসে। হাসিতে প্রাণোচ্ছলতা। আমার দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখে হাসতে লাগলো। সেই হাসিতে মুগ্ধতা। সে হাসিতে আর কী কী ছিল তা আমি জানি না। জানার চেষ্টা করিনি।
গ্রামের শেষে তাদের বাড়ি।নিরিবিলি বাড়ি। রাজভির বাবা মা বেঁচে নেই। বড় আপার বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ভাইয়ার সাথে থাকে। সুখি পরিবার। যে পরিবারে শত অভাবের পরে ও আত্মতৃপ্তি আছে।গাছ পালা ঘেরা চার রুমের একটা দালান।আমি যে রুমটায় বসলাম সেটা রাজভিরের। গুছানো, ছিমছাম রুম। আমার এত বড় বাড়িতে ও আমি এত সুখ পায়নি যতটুকু সুখ রাজভিরের এই ছোট্ট রুমটাতে।
খাওয়া দাওয়া শেষে ও এলো আমাকে এগিয়ে দিতে।গ্রামের সরু পথ, আষাঢ়ের পূর্ণিমা, আর নিস্তব্ধ লোকালয়। যেতে যেতে সব বললাম ওকে। মনে হল, সব বলা যায়। আমার কষ্ট,আমার একাকিত্ব, সফল হওয়ার পরে ও এত হতাশা, বাবা মায়ের দূরত্ব। সব বললাম।সব শুনে ও শক্ত করে আমার হাতটা ধরলো। মনে হল যেন, দীর্ঘকাল আমি এই হাতটার অপেক্ষায় ছিলাম।ক্লান্ত স্বরে আমাকে জিজ্ঞেস করলো
-আপনি কি চান সব ঠিক হয়ে যাক?
-হুম। চাই
-তাহলে আমার উপরে আস্তা রাখুন।
-তুমি পারবে? যা আমি পারেনি।
-আপনি আর আমি আলাদা ব্যক্তি। তাই হয়তো পারবো। চেষ্টা করে দেখতে পারি।
প্রাইভেটকারে উঠার পরে, ও আমার হাতটা ছাড়লো। মনে হচ্ছিল, আরো কিছুক্ষণ থাকি। আর একটু সময় অবধি সে বসুক আমার পাশে। কিন্তু রাত অনেক। তাকে বিদায় দিতেই হবে।
দু দিন পরে হাতের কাজগুলো সেরে বাসায় ফিরে ক্লান্ত। এই দুই দিনে রাজভিরের সাথে কথা হয়নি। গতকাল ফোন দিয়েছিলাম।উঠায়নি। হয়তো ব্যস্ত ছিল। আমার ও মন ভাল না। আজকাল কাজ কামে একদম মন বসে না।সারাক্ষণ ই রাজভির খেয়াল।গতরাতে ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলাম।স্বপ্নে দেখলাম ও আমার বুকে মাথা রেখে শোয়ে আছে।আমি ওর চুলে বিলি কাটছি। স্বপ্নে দেখেই নিজেকে খানিকক্ষণ বকলাম।ছি!এ কী ভাবছি আমি ওকে নিয়ে। ও জানতে পারলে কী ভাববে?লজ্জায় অফিসে হাসি চলে এলো।
দুপুরের খাবার প্রায় ই বাহিরে খাই। আজ বাড়িতে খেতে ইচ্ছে হল। ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে বসতেই সদর দরজার কলিং বেল বেজে উঠলো।আয়া দরজা খোলে দিয়ে চুপ করে এসে পাশে দাঁড়ালো। তার মুখ হাসি হাসি। হাসার কারন বুঝতে পিছনে ঘুরেই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।এ কি!বাবা মা। আমার বাড়িতে? খাবার রেখে দৌড়ে গিয়ে তাদের জড়িয়ে ধরলাম।বার্ধক্য তাদের দুর্বল করে নিয়েছে অথচ আমার মনে হল আমার বাবা মা আজো আগের মতই। শত অভাব, অনটন আর পরিশ্রমে যারা আজ ক্লান্ত। অভিমানে যারা তাদের ছেলের দিকে ফিরে ও তাকায়নি। বার বার বলেছিলাম এসে থাকার জন্য। তারা আসেনি। গ্রামের একটা কুঠি ঘরে যারা দিন যাপন করতো।আমার আলিসান বাড়িতে তাদের পবিত্র পা পড়েনি কোন দিন। আজ হঠাৎ তারা উপস্থিত। আনন্দে কেঁদে দিলাম।
পিছনে রাজভির দাঁড়িয়ে ছিল। ওর দিকে চোখ পড়তেই বুঝতে পারলাম এই সুন্দর মিলন দৃশ্য দেখে সে মুগ্ধ, অভিভূত।
এর পরের দিন ভাইয়া ভাবিরা এসে গেল। ভাতিজা ভাতিজি তে আমার সারা বাড়ি পূর্ণ হয়ে গেল। আনন্দে পাঁচ তলা বাড়ি আজ আর খা খা করে না।এত দিনে মনে হল আমি সুখি। হতাশা, ক্লান্তি, কষ্ট সব দূর হয়ে গেল।
জীবনের বিষণ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।রাজভির কে আমি ভালবেসে ফেললাম।যতটুকু ভাল নিজেকে বাসি ততটুকু। যে রাজভির আমার ভাঙ্গা পরিবারটা জোড়ে দিল, যে রাজভির শুধু আমার সুখের জন্য টানা রাত বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে থেকে আমার বাবা মায়ের মন গলিয়েছে। সেই রাজভির কে আমার প্রয়োজন। লোকে হয়তো বলবে আমি সমকামী। লোকে বলবে আমি আত্ম সম্মান বিলিয়ে দিয়েছি। তাতে আমার কিছু আসে যায় না। যে আত্ম সম্মানের ভয়ে নিজেকে একা করে রেখেছিলাম, সেই আত্মসম্মান কে বলি দিয়ে রাজভির কে আমি চাই । হ্যা, তাকে আমি বলবো যে আমি তাকে ভালবাসি।
সিদ্ধান্ত তো নিয়ে ই নিয়েছিলাম।অপেক্ষা ছিল শুধু রাজভিরকে বলার। ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছিলাম।রাজভির যদি আমাকে ফিরিয়ে দেয় তবে? রাজভির যদি বলে যে সে কোন মেয়েকে ভালবাসে তবে? চিন্তায় সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকতাম।
রাজভির সে দিন এক পিচ্চিকে দিয়ে চিঠি পাঠালো।মাঝে মাঝে ও খুব হাস্যকর কাজ করে। ঐ দিন মাঝ রাতে ফোন দিয়ে বলল, আইসক্রিম খাবে। আমি আইসক্রিম কিনে সোজা ওর বাসায়। আইসক্রিম কম খেলো, আমাকে তাকিয়ে দেখলো অধিক। ও মাঝে মধ্যে আমার দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে। তখন আমার ভেতরটা কী যেন করে। আমি বুঝতে পারি না।
সেদিন বৃষ্টি নামলো।দুই কিলো পথ হেটে, বৃষ্টিতে ভিজে চলে এলো।চোখ মুখে সে কি আনন্দ!এত অল্পতে, এত সীমিত সুখে রাজিভির কে আনন্দিত হতে দেখেছি।তাই হয়তো আমি ওর জন্য পাগল। এত মুগ্ধতা ওর জন্য আমার।
চিঠিটা খোলতেই গোলাপের পাপড়ি ঝড়ে পড়লো। দু লাইন লেখা ছিল ‘নদীর তীরে আসেন। আমি বসে থাকবো। সুন্দর দেখে একটা গোলাপ নিয়ে আসবেন’
আমি কিছু বুঝিনি। মন্ত্রমুগ্ধের মত গোলাপ নিয়ে নদীর তীরে ছুটে গেলাম।তখন অপরাহ্ণ।সূর্য তখন ডুবতে বসেছে। নদীর ঘোলাটে পানিতে সূর্য রঙিন আলো ছড়িয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে ডুবে যাচ্ছিল।রাজভির আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।আনন্দের সাথে জিজ্ঞেস করলো
-গোলাপ এনেছেন?
আমি গোলাপটা তার হাতে দিতে দিতে বললাম
-নাও। কেন আনতে বললে?
-আজ আপনি আমাকে প্রপোজ করবেন।
আমি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে হাটু ঘেরে বসে, মুচকি হেসে পকেট থেকে আংটি বের করে বললাম,
-তুমি কি আমার হবে?
রাজভির হাত বাড়িয়ে দিল। আমার চোখে পানি। আমি ভাবিনি এমন হবে। চিৎকার করে বললাম,
-রাজভির, আই লাভ ইউ। আমি তোমাকে ভালবাসি।
রাজভির আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি ও আপনাকে ভালবাসি।
সূর্য ডুবে গেল। নদীর তীর অন্ধকার। আমি রাজভিরের হাত ধরে বসে আছি। মনে হচ্ছিল আমার জীবনের সব কষ্ট সমাপ্ত হল। ইশ্বর নিজের হাতে রাজভিরকে গড়েছে আমার জন্য। আমি ওকে ভালবাসি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.