অপ্রেম পত্র

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

লোকে প্রেম করে৷ প্রেমে পড়ে। প্রেমে যখন পত্র লিখে তখন তাকে প্রেম পত্র বলে। আমি যে মানুষটাকে ভালবাসতাম তার প্রতি আমার কোন প্রেম নেই৷ আচ্ছা,প্রেম না থাকাটাকে কি অপ্রেম বলে? যদি তাই হয় তবে আমি তার কাছে যে পত্র লিখি তার নাম কি অপ্রেম পত্র? গতরাতে একটু ও ঘুম হয়নি৷ রাত জেগে তার কাছে অপ্রেম পত্র লিখিছি। মানুষটা কেমন আছে জানি না৷ কোথায় আছে, কার পাশে শোয়ে আছে সেটা ও অজ্ঞাত৷ এত রাত, নির্ঘুম রাতে আমি মানুষটার কথা ভেবে পত্র লিখি৷ পত্র লিখতে লিখতে সকাল হয়ে যায়৷ আমি বইয়ের ভেতর সেই পত্র তুলে রাখি৷ অনেকগুলো পত্র জমা পড়ে আছে। আজ তার একটা পত্র খোলে পড়তে লাগলাম।

প্রিয় নাহিদ,
নিরব ভাইয়া ঐদিন বলেছিল অন্যের বিয়ে দেখে আমার হিংসে হয় কিনা? আমি উত্তরে বলেছিলাম হ্যা হয়। খুব হিংসা হয়৷ অন্যের বিয়ে, আংটি বদল, মাথার পাগড়ি, হাতের কাংলা আর সাদা ধুতি দেখে আমার খুব হিংসে হয়৷ হবেই না কেন,আমার ও তো শখ হয়৷ কারো বর হতে। কারো বলছি কেন? গেল চার পাঁচটা বছর ধরে তো এই স্বপ্নটাই দেখে আসছি যে, আমি তোমার বর হব। স্বপ্নগুলো কত চমৎকার করে ভেঙ্গে গেলো। তুমি সেই ভাঙ্গার শব্দ পেয়েছিলে কি?
তুমি হয়তো চিঠি হাতে পেয়ে ভাববে এই যুগে কেউ হাতে লিখে নাকি? কীবোর্ডে কয়েকটা বর্ণ টিপলেই তো মনের কথা স্কিনে ভেসে উঠে৷ জানো ই ত, আমি একটু ভিন্ন রকম। অন্য রকম আমার স্বভাব৷ তাই আজ চিঠি লিখছি। ছোট মামা আমাকে খুব দামী একটা খাতা দিয়ে বলেছিল, রেখে দে। আমি রেখে দিয়ে ছিলাম৷ আজ তুলে, লিখতে বসলাম। হাতের লেখা খুব বিশ্রি হয়ে যাচ্ছে, তাই না? বাংলা তো আজকাল খুব কম লিখি তাই হয়তো।
আচ্ছা বাদ দাও এসব। কেমন আছো বলতো?কতদিন হয়ে গেল তোমাকে দেখি ই না। এমন তো কথা ছিল না। নাকি এমনটাই হওয়ার ছিল? কী জানি। এখন তো আর এসব নিয়ে ভাবি না৷ তোমাকে নিয়ে ভেবে কোনকালেই বা অন্ত পেয়েছিলাম?
একটা সময় তুমি বেশ গম্ভীর ছিলে৷ একটা কথা বললে হু হা করে উত্তর দিতে। আমি বিরক্ত হতাম। বিরক্ত হয়ে যখন কথা বলা বন্ধ করে দিতাম তখন তুমি বলা শুরু করতে৷ কত অদ্ভুত ছিল সেই সব কথা বার্তা৷
গেল পূজাতে কলকাতার সোমনাথ দাদা এসেছিল।তুমি তার কাছে কী বলেছিলে মনে আছে তো? বলেছিলে আমরণ আমার পাশে থাকবে।এখনো তো বেঁচেই আছি, তবো ও ছেড়ে দিলে?
সেদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল।ঘুম ভাঙতেই ভেতরটা কেমন বিষাদে নীল হয়ে গেল।তোমার চেহারা, তোমার সাথে কাটানো দিনগুলো চোখের সামনে কেমন জীবিত হয়ে ভেসে উঠলো৷
এই তো সেদিন তুমি আমার রুমের সামনে এসে কল করে বলতে বের হও, আমি দাঁড়িয়ে। আমি বের হয়ে আসতাম। তুমি মুচকি হেসে বলতে, একবার জড়িয়ে ধরবে না? আমি তোমায় জড়িয়ে ধরতাম৷ সুখে, আনন্দে ভেতরটা ভরে উঠতো।
যেই আমি তোমার সাথে একদিন কথা না হলে মৃত প্রায় হয়ে যেতাম, সেই আমি আজ দিনের পর দিন তোমার সাথে কথা না বলে বেঁচে আছি। এমনটাই কি ভাগ্যে ছিল? প্রতিটা ভালবাসার মৃত্যু ই কি এভাবেই হয়?
শ্রী রামচন্দ্রের গল্প পড়েছিলে? সে ছিল অযোদ্ধার রাজা, দশরথের পুত্র৷তাকে বলা হত পুরুষোত্তম। সম্মানিত পুরুষ৷ পিতৃবচন রক্ষার জন্য বনচারী হল। রাবণের রাজ্য জ্বালিয়ে কীভাবে নিজের ভালবাসার মানুষটাকে উদ্ধার করেছিলো সেই গল্প মেঘনাদ বধে পড়েছিলে নিশ্চয়। যেই সীতার জন্য তার এত সংগ্রাম, এত লড়াই, সেই সীতাকেই তিনি বিসর্জিত করলেন সম্মানের জন্য৷ হায়রে সম্মান।
সারা জীবন শিব হতে চেয়েছিলাম।কিন্তু নিয়তি দেখো, আমাকে সীতা বানিয়ে দিল। তুমি তো সম্মান রক্ষার জন্যই আমাকে ত্যাগ করলে৷ আমি তো ভেবেছিলাম তুমি সতীর মত দক্ষরাজার বিরোদ্ধে গিয়ে তোমার শিবকে গ্রহণ করবে। কে জানতো, যে একদিন আমি বাণের জলে ভেসে ভেসে বিসর্জিত হব?
বিসর্জিত হয়ে ভালই হয়েছে। তোমার সম্মান বেঁচে গেলো।তোমাকে তোমার পরিবারের কাছে ছোট হতে হয়নি। তোমার প্রফেশনের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে৷
আমাদের প্রথম দৈহিক মিলনের কথা তোমার মনে আছে? হা হা হা হা। আজো মনে হলে হাসি আসে। দুজন আনাড়ি মানুষ এক হতে গেলে যা হয় আর কি৷বাদ দেই সেই সব কথা। কী বল?
রাত তিনটা বেজে গেলো। আমাকে ঘুমাতে যেতে হবে, বাসার সবাই এখন ঘুমে৷ আমি ই একমাত্র জেগে আছি। কাকার বাসাটা ইদানিং অসহ্য লাগে। চলে যেতে পারলে বাঁচি।কিন্তু যেতে পারছি না। যেতে হলে সবার আগে আমার স্থায়ী একটা বাসস্থান প্রয়োজন৷যেটা আদৌ সম্ভব নয়৷ কী যে অসম্ভব অসহায়ত্ব, তা যদি তুমি বুঝতে।
নাহিদ, সত্য করে একটা কথা বলতো, তুমি কি আমাকে ভালবেসেছিলে? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তুমি ঠিক আমাকে ভালবাসোনি। তোমার বিয়ের কথাবার্তা যখন হচ্ছিল তখন আমি কিছুই জানতে পারিনি৷ না তুমি জানিয়েছিলে না অন্য কেউ। বিয়ের তারিখ ফিক্সড হওয়ার একদিন আগে তুমি পাশে বসে মিনমিন করে বলেছিলে৷ প্রথমে ভেবেছিলাম আমাকে রাগানোর জন্য বলছো৷ পরক্ষণেই যখন তোমার চোখের দিকে তাকালাম তখন ই বুঝতে পারলাম।এই চোখের ভাষা যে আমার অনেক চেনা। ঐ দিন নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে বলেছিলাম, বিয়ে করে ফেলো।মনে হলে আজো অসহ্য যন্ত্রনা শুরু হয়৷ যা লিখে বুঝানোর ক্ষমতা বিধাতা পুরুষ কাউকে দেয়নি৷
দুটি প্লাটিনামের রিং কিনেছিলাম।বড় ইচ্ছে ছিল আংটি বদলের। তা তো হল না।আংটি দুটি এখনো ড্রয়ারে পড়ে রয়েছে।থাকুক পড়ে।
তোমার বিয়ের কার্ড এল। দামী কার্ড। আমার জন্য না, আব্বুর জন্য৷আমি কার্ডটা খোলে ও দেখলাম না৷ সোজা চুলায় দিয়ে দিলুম। আম্মু হয়তো কিছু বুঝতে পেরেছিলো। তার ছলছল চোখে কি আমার বুক ফাটা কষ্টটা ধরা পড়েছিল? বিয়ের দিন আমি চলে গেলাম কুমিল্লাতে৷ বাড়ি থাকলে হয়তো মারা যেতাম৷ তাই সোজা তোমার বাড়ি চলে গেলুম। তোমাকে বর বেশে সাজতে দেখার শখ হল আমার৷তোমার আম্মু, আপু,চাচাত চাই বোনের সাথে কত সহজেই মিশে গিয়েছিলাম।বিশ্বাস কর, ঐদিন আমি একটু ও কষ্ট পাইনি। কষ্ট তো তখন পেয়েছিলাম যখন রাত দুইটাই আমার কাধে মাথা রেখে বলেছিলে, তোমার মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে৷ আমাকে ছাড়া বাঁচা যাবে না৷
ডাক্তার সাহেব, এতটা ফিল্মি তো তুমি নও৷ তাই মুখের কথাই মনের কথা ভেবে ঐ রাতে যে কী পরিমাণ কষ্ট পেয়েছিলাম তা যদি তুমি জানতে।
বাসর রাতে লোকে কী করে? তুমি কী করেছিলে?এসব ভাবলে কষ্ট নয় হাসি আসে৷ সেক্সে যে এত আনাড়ি সে কীভাবে তার রাতগুলো পার করে ভাবতেই অবাক লাগে৷ নাকি, তুমি আর আনাড়ি নও। কী জানি? কতদিন হয়ে গেল, তোমাকে তো ছোঁয়ে ই দেখি না৷
আচ্ছা নাহিদ,আমার কথা তোমার মনে পড়ে না? যখন মনে পড়ে তখন কি কষ্ট লাগে? তোমার ভেতরে কি চিনচিন ব্যথা হয়, আমার মত?
ডাক্তার সাহেব, বড় মুখ করে তো একদিন ভরা পূর্ণিমার রাতে তিতাসের তীরে বসে, বলেছিলেন, ছেড়ে যাবেন না৷ আমি ছেড়ে দিলে ও না৷ অথচ আজ দেখো আমি কেমন একা হয়ে গেছি৷ এত একা যে ল্যাম্পপোষ্টের আলোতে ও আমার ছায়া পড়ে না। তুমি ছেড়ে দিলে আমায়।
খুশির খবর কী জানো? বাবার সাথে আমার সম্পর্কটা ঠিক হয়ে যাচ্ছে৷ একদিকে যখন ভাঙন অন্যদিকে গড়া। ইদানিং বাবা কল দিচ্ছেন দিনে দু একবার করে৷ আমি ও কথা বলি৷ দূরত্ব অনেক হয়েছে৷ তিনিও ভেঙ্গে পড়েছেন৷ আমি ও। তাই আর দূরত্ব বাড়াচ্ছি না।
ঘুম আসছে না। ছোট কাকার জন্য বউ দেখা হচ্ছে। বেচারা! এইবার বাধা পড়বে৷ তনুশ্রী আন্টির বিয়ে হওয়ার পরে কেউ ভাবেনি যে সে আবার বিয়ে করবে৷ কিন্তু এইবার সম্মতি দিয়েছেন৷ সবাই ভাবছে আমি রাজি করিয়েছি৷ আসলে তা নয়। একা থাকতে থাকতে সে ও হাপিয়ে উঠেছে। অনেক তো হল। এইবার তার সংসারি হওয়ার পালা৷তাই, আমি বলতেই রাজি হয়ে গেল৷
আমি ও হয়তো একদিন তোমাকে ভুলে নতুন কাউকে ভালবাসতে শুরু করবো। আবার কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবো৷ তার জন্য আংটি কিনবো, বর সাজবো আর রাত জাগবো। তখন হয়তো পড়তে পড়তে তোমার কথা মনে পড়বে না,মাঝরাতে কেঁদে ঘুম থেকে জেগে উঠবো না৷ আমি তখন তোমাকে ভুলে যাব৷ স্মৃতিতে নাহিদ নামের ব্যক্তির সাথে জড়িত কোন কিছুই আর থাকবে না৷
জনাব জাহিদুল ইসলাম নাহিদ, আপনার স্ত্রী সন্তান নিয়ে ভাল থাকুন, সুখে থাকুন। আমি বেছে নিলাম আমৃত্যু কষ্টের পথ৷
ঘুমাতে যাচ্ছি৷ ঘুম আসবে না জানি৷ তবো বিছানায় যায়৷ কিছুক্ষণ আগে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন হল৷ঢাক ঢোলের শব্দে তিতাসের পাড় মুখরিত৷
দুর্গা প্রতিমার মত আমার ও একদিন বিসর্জিত হতে ইচ্ছে হয়৷ আচ্ছা, আমার বিসর্জনে তুমি নাচবে তো?
অনেক তো হল পাগলের মত ঘুরাঘুরি৷ যাযবরের জীবন। অনেকেই বলে স্থির হতে। বলতো, কী নিয়ে স্থির হয়? যে ছেলের মা থেকে ও নেই, বাবার সাথে তিক্ততা, পরের ঘরে বড় হয়। সেই ছেলে কী করে স্থির হয়?
তবো ও চেষ্টায় আছি। হয়তো কোন একদিন, কেউ না কেউ আমার হাতটা ধরে আবার বাঁচতে শিখাবে৷ থাকি না অপেক্ষায়। আরো কিছুটা কাল।
আর কিছু লিখবো না। ফজরের আজান হচ্ছে৷ আরো একটা রাত গেল নির্ঘুম। তুমি ঘমাও, আমি কল্পনায় তোমায় দেখি। কে যেন বলছিলো, তুমি খুব শুকিয়ে গেছো? তা বললে কী হয় ডাক্তার বাবু? আপনার পরিবারের জন্য হলেও আপনার যত্ন নিতে হবে। নিজের খেয়াল নিবেন৷
ইতি,
অযাচিত আমি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.