অসময়ের সময়

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

আমরা থাকি তিন তালায়। নিচ তালায় বাড়ির মালিক বাবার বন্ধু আবিদ সাহেব থাকেন। ওনি বাবার বন্ধু পাশাপাশি বাবা ওনার কর্মচারী ও।দু তালায় কেউ থাকে না। আবিদ সাহেবের লাইব্রেরী সহ অফিস। আমি তমাল। ইন্টারে পড়ছি। বাড়িতে আমি, মা, বাবা আমার ছোট বোন ইশা আর কাজের মেয়ে রুপসী।
রুপসী নামেই রুপসী। চেহারায় রুপের ছিটে ফুটা ও নাই। তার সবচেয়ে বদ গুন যখন তখন হাসা। এই হাসির কারনে অনেকবার তার চাকরি গেছে। দু দিন যেতে না যেতে আবার তাকে আনতে হয়েছে। আমার বোন ইশা সারাদিন একটা পুতুল নিয়ে আছে। বেনী বাধে ,বিয়ে দেয়, আর আমাকে দাওয়াত দেয়। আমি দাওয়াতে না গেলে কথা বলা বন্ধ করে ও দেয়। আমার মা বোকা ধরনের মানুষ। রান্নায় ওনার খুব সখ। সপ্তাহে দু একদিন ওনার নব নব রান্না থাকবে। সে খাবারটা যতেষ্ট মন দিয়ে বানানোর পরে ও কুখাত্যেই পরিণিত হবে। সবাই মুখে না দিলে ও আমাকে মুখে দিতেই হবে। দিয়ে বলতে হবে, উ,খুব ভাল হয়েছে। আরো কিছু প্রশংসা শুনার পর মা বলবেন,তোর বন্ধুদের ডেকে আন,তারাও খাক।

আমি বলব মা, আবিদ সাহেবকে দিলে কেমন হয়? মা বলবেন চাচা ডাকতে পারিস না? আমি কিছু বলব না। চুপ করে মুচকি হাসবো। আর মনে মনে বলব যাকে ভালবাসি তাকে চাচা কেন ডাকব? নাম ধরে ডাকব। কিন্তু নাম ধরে ডাকার মত সাহস আমার নেই। আবিদ সাহেব বিরাট ধনী। এই যে এত সম্পত্তি, এত ব্যবসা সব তার বাবার। ওনি কেবল তা বাড়াচ্ছেন। কিভাবে তা আমি জানি না। আমি শুধু জানি দু তালায় ওনার একটা লাইব্রেরি আছে। সেখানে মোটামোটা অনেক বই। আর ওনি সারাদিন ঐ বই পড়ে সময় কাটান। বাবা বলেন পৃথিবীর এমন কোন জিনিস নাই যা তিনি জানেন না। আমি এই মানুষটার প্রেমে পড়েছি দু বছর আগে আর আজো প্রেমে পড়ি। প্রতি দিন। আবিদ সাহেবের বয়স চল্লিশ।

এলোমেলো কাল ঘন চুল। সেই চুলে কলপ দিতে হবে না কোন দিন। গভীর চোখ যেই চোখে রাজ্যের মায়া। চোখ তুলে কথা বলা যায় না। যে চোখে রাগ নেই,মায়া নেই কিন্তু প্রশান্তিতে ভরা সেই চোখের দিকে তাকানো খুব জ্বালার।
ওনার সুঠাম, পেশীবহুল শরীর মনে হয় না আর কিছু দিন পরে ওনাকে বৃদ্ধ রোগে
ধরবে। একটা সুতি সাদা পাঞ্জেবী,সাদা পায়জামা, আর চিকন ফ্রেমের চশমা ওয়ালা লোকটা যখন লাইব্রেরীতে বসে বই পড়েন তখন আমি শতবার শত বাহানায় উপর নিচ করি। একবার ঐ অপুর্ব মুর্তি দর্শনের জন্যে যে আমার মন কেড়েছে। আজ শুক্রবার। সপ্তাহের এই দিন আমাদের ঘরে ভাল কিছু রান্না হবে। বাবা সকালেঈ বাজারে চলে গেছেন, ঐদিকে রুপসীকে ধরছে জ্বীনে।

 সারা সকাল জুরে একপাটি জুতা চাবিয়ে যাচ্ছে। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। নয়টার দিকে মা ডেকে তুলল, এই তমাল ওঠ, দেখ এসে রুপসীকে জ্বীনে ধরছে। যানা বাপ একবার ডেকে নিয়ে আয় মসজিদের হুজুরকে। আমি চমকালাম না,ওঠতে ওঠতে বললাম,জ্বীন ধরেছে বুঝলা কেমনে? মা বলল,জুতা খাওয়া দেখেয় বুঝেছি। আমি একটা হাই তুলে বললাম,জ্বীন জুতা খায়?
আগে বলবা না তাহলে জুতা ফেলে না দিয়ে জ্বীনকে দিয়ে দিতাম। মা কিছু না বলে
চলে গেল। ঘুম থেকে ওঠার পর আমার খুব আবিদ সাহেবকে দেখতে ইচ্ছে হল।
বুকটা কেমন শা শা করছিল ওনাকে দেখার জন্যে। নিচে ব্রাশ না করেই ছুটে গেলাম। আমার স্বপ্ন পুরুষ কেন যে এত বই পড়ে? আমি সোজা ডুকে গেলাম রুমে, ওনি চোখ বই হতে না তুলেই বলল, কি চায় তমাল বাবুর? আমার বড় ইচ্ছে হল বলি, আপনাকে চায়।
কিন্তু বলা গেল না। শুধু বললাম,একটা ফোন করব।
ওনি বলল কর। যত ইচ্ছে কর।
আমি সহজ ভঙিতে ওনার সেলফোনটা হাতে নিলাম, একটা ফুটফুটে মেয়ের ছবি ছিল ওয়েলপেপারে।
আমি বললাম, এটা কে?

আবিদ সাহেব বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে বলল কোনটা?
আমি বললাম মোবাইলের মেয়েটা?
উনি খুব উদাসীন ভাবে বলল, উ,ওটা! ওটা কেউ না বলেই আবার পড়তে শুরু করল।
আমার কেন জানি খুব রাগ হল। ফোনটাকে ছুড়ে ভেঙে ফেলতে মন চায়ল। তাই ছুড়ে ফেলে হনহন করে হেঁটে চলে আসলাম।
ওনি ডাকলেন ও না আর ফিরে ও দেখলেন না কি ভাঙল।

সন্ধ্যায় বাবা ফিরলেন হাসিমুখে। তার হাতে একটা প্যাকেট। আমি পড়ছিলাম। ওনি ঘরে ঢুকেই বলল দেখ তমাল আবিদে তোকে সেলফোন দিছে। আমি মুখ না তুলেই বললাম লাগবে না। ফেরত দিয়ে দাও।
বাবা যেন আকাশ থেকে পড়ল এমন ভাব করে বলল,কি বলস! না নিলে আবিদ কষ্ট পাবে। আমি নিলাম।
রাত একটা। ফোনটাকে প্যাকেট হতে বের করলাম, চালু করলাম। তারপর দু তলায় সিড়ির কাছে চলে গেলাম। আমি জানি আবিদ সাহেব এখনো পড়ছে। আমি ফোনটা কানের পাশে নিয়ে এমন ভাবে কথা বলছি যেন,আবিদ সাহেব শুনে।
রুমা!

শুন কাল আমি ক্লাসে আসব না। কষ্ট পেও না সোনা। একদিনই তো। হ্যা, আমার তো অনেক কষ্ট হবে। তুমি জান না তোমাকে না দেখে আমি থাকতে পারি না। না শুনা ভালবাসি তোমায়। কাল একটু সমস্যা আছে। আচ্ছা সোনা রাখি। আই লাভ ইউ।
যা ভেবেছিলাম তাই। আবিদসাহেব বের হয়ে আসলেন। আমাকে বললেন,তমাল শুনে যাও তো। আমি স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে গেলাম। ওনি আমাকে বসতে বলে, বুকশেলফে বই খোঁজতে লাগল। আমি বসে ওনাকে দেখছিলাম। সাদা পাঞ্জেবীতে ওনাকে যেন স্বর্গীয় আত্মা মনে হচ্ছে। এত যার রুপ সে কেন আজো অবিবাহিত! হয়তো আমার হবে বলে। হয়তো আমি ওনাকে চাইব বলে। ওনি এসে বসলেন আমার মুখমোখি। আমি তাকিয়ে আছি ওনার দিকে।

ওনি বেশ বিব্রতভাব নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন, তমাল আমি জানি তুমি কি চাও, আমি এটাও জানি তুমি স্বাভাবিক নও। তুমি হোমোসেক্সুয়্যাল। যাকে বলা হয় বাংলাতে সমকামী। কিন্তু, তমাল তুমি যা ভাবছ আমি তা নয়। আমি তোমাকে পছন্দ করি কিন্তু তুমি যা চাও তা হততো উচিত নয়। আমি কি বলতে যাচ্ছি বুঝতে পারছ?
আমি চোখ না নামিয়ে রেখে বললাম হ্যা পারছি।
আশা করি নিজেকে পাল্টে ফেলবে?
জ্বী পাল্টে ফেলব। বলে মোবাইলটা ওনার সামনের টেবিলে রেখে বের হয়ে এলাম। ওনি কিভাবে তাকিয়ে আছে তা দেখার বড় শখ ছিল। কিন্তু তাকায়নি। ওনাকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে। আমি গে। তাহলে ওনি কি?
আমি ওনাকে ভালবাসি তার মানে এই নয় ওনি এই ভাবে আমার ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করবে।

সকাল থেকেয় আমার মনটা ভাল নেই। কলেজে যায়নি। আর যেয়েও কি হবে? আকাশের যা অবস্থা না যাওয়ায় ভাল। শোয়ে ছিলাম।
রুপসী রুমে ঢুকল, তার হাতে দু পাটি জুতা। দেখেই বুঝা যাচ্ছে জ্বীন তাকে ছাড়েনি। ভাইজান,
হি হি হি হি আপনাকে ডাকে হি হি হি।
বলেই হি হি হি করে হেসে চলে গেল। বুঝলাম না, কে ডাকে! তবুও ওঠলাম। হয়তো মা
ডাকছে।
কিন্তু না, গিয়ে দেখি আবিদ সাহেব, বসে আছি। রুমে বাবা ও আছে। দু জনে কথা বলছে। আবিদ সাহেবকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে তিনি উত্তেজিত সাথে কারো জন্যে অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত।।
আমি জানি কেন আমাকে ডাকা হয়েছে। গত তিন দিন আমি নিচে নামি না। কয়েকবার আবিদ সাহেব আমায় খবর পাঠিয়েছে কিন্তু যাইনি।
রাগে যায়নি যে তা নয়, আমি যাইনি এই জন্যে যে, আবিদ সাহেব বুঝুক আমি তার কে?
বাবা আমাকে ডাকছ?

বাবা ফিরে তাকালেন না। কিন্তু আবিদ সাহেব তাকালেন। আমি দেখলাম এক জোড়া চোখ আমায় দেখছে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে। যে চোখ জোড়াতে ভালবাসার সিন্ধু আর না বলতে পারার তীব্র যন্ত্রণা। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। তাকানো উচিত হবে না। নেশা লেগে যাবে। বাবা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, আমি ডাকি নি। আবিদ ডেকেছে। তুই যা ওনার সাথে।
আমি কিছু না বলে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালাম। আবিদ সাহেব, দরজা খোলে বের হয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। আমি যন্ত্রের মত সাদা পাঞ্জেবীওয়ালাকে অনুসরণ করছি। নিচ তলায় ওনার বাসায় গেলাম।
ওনি ইশারায় আমাকে বসতে বলল, আমি না বসে দাঁড়িয়ে রইলাম। অপেক্ষা করছি আবিদ সাহেবের মুখ থেকে কিছু শুনার। আমি দাঁড়িয়ে আছি। ওনি বসলেন, হাতে একটা বই, ইংরেজী। আমাকে আবার বসতে বললে আমি বসলাম। এত দিন একবার ও নিচে নামনি যে?
আমি উত্তর দিলাম না। তিনি আবার প্রশ্ন করল,
-রাগ করেছ?
-না।
-তাহলে তমাল বাবু গত তিন দিনে একবার ও আসেনি কেন কোন বাহানা নিয়ে? আমি তো খবর ও পাঠিয়েছিলাম।

আমি এইবার ওনার দিকে তাকালাম। তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। হেসে বললাম,
-আমি স্বাভাবিক হয়ে গেছি। তাই আসিনি বলে তাকিয়ে রইলাম ওনার দিকে। ওনি আমার
স্পষ্ট উত্তরে হক চকিয়ে গেছেন। চোখ ফিরিয়ে নিল।
-ভাল লাগে না আমাকে এখন আর?
-না।।
-কেন?
-বললাম না স্বাভাবিক হয়ে গেছি। ওনি আবার হকচকিয়ে গেল। এইবার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠল। ওনি চোখ ফিরিয়ে নিতে চায়ল। কিন্তু আমি তাকিয়ে ছিলাম। আমি উঠে দাঁড়ালাম। তাহলে যায় চাচা? ওনি বেশ বিব্রত হয়ে হয়ে তাকাল আবার দিকে। এইবার বুঝি কেঁদেয় দিবে। এত বড় মানুষ কাদঁলে খুব অসুন্দর লাগবে দেখতে তাই চলে আসছি। ওনি মাথা নিচু করে বসে ছিল। দরজার কাছাকাছি আসার পর, আবিদ সাহেব ওঠে দাঁড়াল। খুব কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলল,
আমায় একবার ছোঁয়ে দেখবে না তমাল? আমার হাতটা ধর একবার।
আমি ফিরে তাকালাম। ওনি তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

ওনারসাদা পাঞ্জেবীতে ওনাকে স্বর্গীয় আত্মা মনে হচ্ছে। আমি এগিয়ে গেলাম। চুপচুপ ওনার বুকে ঝাপিয়ে পড়লাম। আবিদ সাহেব দু হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আকাশে চাঁদ ছিল। বড় একটা চাঁদ। তার আলোতে তিনতলা বাড়িটা আজ আলোকিত। আমি আবিদের হাতটা ধরে দাঁড়িয়ে আছি বারান্দায়। সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি চাঁদ দেখছি। বুঝতে পারছি আবিদের চোখে পানি। এই পানি আনন্দের, এই অশ্রু পাওয়ার, এই জল একাকিত্বের সমাপ্তির। আবিদ আমার কানের পাশে একটা চুমু খেল। আমার মনে হল আমি আজ স্বর্গে পা রাখছি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.