অস্ফুট পাতার আর্তনাদ

লেখক :- প্রলয় স্রোত

আমি একটি পাতার গল্প বলব, শুনতেই অদ্ভুৎ শুনায়, তাই না? কোটি কোটি মানুষ আর অগণিত অমানুষের ভীড়ে কিনা; একটি পাতার গল্প করাও যায়? হয়তো যায় আবার অনেকখানি যায় না, কিন্তু তবুও আমি করব। কে জানে হয়তো শুকিয়ে জীর্ণ হয়ে যাওয়া পল্লবের আত্মা; আমার এ গল্প কথনে দুদণ্ড দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুক্তি পেয়ে যাবে।

বেশতো শুরু করা যাক শেষ হয়ে যাওয়া এক পাতার গল্প দিয়ে। আমি যে পাতার গল্প করছি তার জন্ম হয়েছিল কোনো এক বসন্তে। অন্য অনেক বসন্তের ভীড়ে, অন্য অনেক পত্রের সাথে সে জন্মেছিল কোনো এক মার্তৃবৃক্ষে। প্রচন্ড রকম সবুজ ছিল তার গায়ের রঙ। সে গায়ের রঙ আর বাড়ন্ত শরীর দেখে মার্তৃবৃক্ষ ধরেই নিয়েছিল এই সদ্যোজাত সেই মাকে সুখী রাখবে, খাদ্য তৈরীতে এবং বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে অহর্নিশ।

আমার গল্পের নায়ক যে পল্লব; সে নিজেও খুশি এবং কোথাও গোপনে হয়তো অহঙ্কারী ছিল তার ক্লোরোফিল কনিকার প্রাচুর্যময় সবুজাভ দেহ নিয়ে, সব অনুষ্ঠানে তার সরব উপস্থিতি এক উজ্জ্বল সোনালি ভবিষ্যৎবাণীর আভাস দিচ্ছিল। কিন্তু সে জানত না, জানত না তার আশেপাশের কেওই; গর্বিত এ গল্পের নায়কের বুকের মধ্যখানে খুব ছোট্ট করে এক সোনালি বিন্দুর জন্ম হয়েছে। সে পত্রসমাজের যে সমাজব্যবস্থা সেখানে সোনা সোনা পাতাকে শাপ-শাপান্ত আর দংশিত করা হয়েছে বারবার। সহসা এ অভিশাপ বাণীর কথা আবিষ্কার করে আমাদের কিশোর নায়ক এবং তার পরপরই সে আবিষ্কার করে তার সোনালি রংয়ের উজ্বল অভিশপ্ত বিন্দুগুলোকে। মুহুর্তে ভয়ে সে কুকড়ে যায়, অজানা আশঙ্কায়, অনাগত বিপদের চিন্তায় তার বৃষ্টিতে ভিজা হয় না, প্রস্বেদন হয় না, সালোকসংশ্লেষণের সময় ভালোভাবে খাবার প্রস্তুত করা হয় না। যে পাতার এক উজ্জ্বল সোনালি ভবিষ্যৎ ছিল, তা ধীরে ধীরে ফিকে হতে থাকে, আর ধীরে প্রস্ফুটিত হতে থাকে তার সোনা সোনা গায়ের রঙ। সবুজাভ ঘেরা পাতাবনে সোনালি পাতাকে বড্ড চোখে ধরে। যে পাতাগুলো সবচেয়ে বয়োজ্যষ্ট, যারা স্থান করে রয়েছে বৃক্ষের মগডালে, যারা মলিন এবং কালিমার মাঝখানে একটি রঙ ধারণ করেছে এবং যাদের উপর পাখি বসে গান গায় না, বসবেও না কোনোদিন। হঠাৎ তারা এক সভা ডাকে। উদ্দেশ্য একটাই, প্রকৃতিতে সৃষ্টি হওয়া প্রকৃতবিরুদ্ধ এ পাতাকে পাতাবন ছাড়তে হবে। আমাদের গল্পের নায়ক প্রতিবাদ করে উঠে, সে আঙুল তুলে দেয় পশ্চিম দিকের গোলাপ বাগানের দিকে। “গোলাপের রঙ তো গোলাপি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তবুও তো নীল গোলাপ, লাল গোলাপ, কালো গোলাপ আমরা দেখি। কই তবুও তো তার সৌন্দর্য, তার সম্মান ম্লান হয়নি এতটুকু, তাহলে কেন শুধু একটু ভিন্ন হওয়ার জন্য, একটু বৈচিত্র্য আসার জন্য আমাকে ছাড়তে হবে, আমারই নিবাস।” তার এ অকাট্য যুক্তিতে কেঁপে কেঁপে উঠে ঐতিহ্যের বাহকরা, চিৎকার দিয়ে পশ্চিমা গোলাপের অপসংস্কৃতিকে প্রাচ্য আর দক্ষিণে না আনার জন্য গজগজ করতে থাকেন পাতাবনের ঈশ্বরের চেয়েও জ্ঞানী বৃদ্ধ পত্ররাজিরা। এরপরই সভা সমাপ্ত হয়। কিন্তু অলিখিত ভাবে হলেও আমাদের পাতার সাথে সমস্ত পাতাবন সম্পর্ক ত্যাগ করে। কেও তার সাথে আর গল্প করে না। সে নায়কের বৃক্ষ মাতা তাকে ত্যাজ্য করেছে বহুদিন আগে। আমাদের সোনালি আভা বিধৌত পাতা হলুদ হতে থাকে। আমাদের নায়কের বড্ড অসুখ হয়।

একদিন আকাশ কালো করে এক ঈগল উড়ে বেড়ায় পত্রবৃক্ষের উপর। ছোটবেলা থেকে সবাই শুনে এসেছে ভীষণ দর্শন এই ঈগল শান্তির বাহক, তার তীক্ষ্ণ চাপাতির মত বাকানো নখ থাকলেও সেই নখ শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো কাজে আসে না। বরং তীক্ষ্ণ মধুর মত কণ্ঠ থেকে মধু ঝরে ঝরে দিকে দিকে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়। তাই ভীষণ দর্শন ঈগল নিয়ে কেও ভীত হয় নি, ভীত হয় নি আমাদের শীর্ণকায় আর দুর্বল নায়কও। কিন্তু হঠাৎ, অকষ্মাৎ শান্তির বাহক অসুস্থ নায়কের ঘাড়ে যাকে পুস্তকের ভাষায় বলা যায় পত্রমঞ্জুরী; তার উপর ঝাপিয়ে পরে। চাপাতির মত নখ দিয়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেয় আমার নায়ককে। খণ্ড-বিখণ্ডিত নায়ক বাতাসে ভাসতে থাকে। ভাসতে ভাসতে একসময় সে মাটিতে পরে যায়। যে মাটি থেকে জন্ম হয়েছিল তার মায়ের, যে মাটি থেকে খাদ্য আর সার নিয়ে জন্ম হয়েছিল তারও। সেই মার্তৃভূমি তার অভাগা এক সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে। পরম আদর আর ভালোবাসায় তাকে গ্রহণ করে নেয়। আমাদের পাতা বনে আর কোনো বৈচিত্র্য নেই, সেখানে একঘেয়ে সবুজ আর সবুজ। সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তার জন্মের সময়, জন্মের পরে অথবা মৃত্যুর আগে এবং পরে কোথাও কোনো পাতা সুখী বা মলিন হয় নি, কোথাও বাজে নি ঢাকঢোলের আওয়াজ, স্বর্গ থেকে হয়নি পুষ্পবৃষ্টি, কেঁপে উঠেনি বসুন্ধরা। বিশেষত্বহীন এপাতাকে তবুও আমি খুব কাছ থেকে চিনি, কারণ এ পাতার আত্মা এখন আমার শরীরে বাস করে।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

আমি একটা পাতার ছবি আঁকি 

পাতাটা গাছ হয়ে যায়। 

মাথা ভরা সবুজ কচি পাতা 

গাছটাকে ছাতা মনে হয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.