চড়ুই পাখির বাসা

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

এক গ্রীষ্মের গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে মাঠ থেকে যখন আবির বাড়ি ফিরলো তখন বাড়ি ভর্তি মানুষ দেখে তার চোখ কপালে গমন করল।আজ তার মিনু দিদিকে দেখতে এসেছে।হয়তো মিনু দিদির বিয়ে হয়ে যাবে। তখন আবির একা হয়ে যাবে। বাবার দেখা শোনা ই কে করবে?  তা ভেবে আবিরের মন খারাপ হল।এত মন খারাপ হল যে সামনে ইন্টারমিডিয়েটের ফাইনাল পরিক্ষা সত্ত্বে ও সে বই নিয়ে না বসে সোজা চলে গেল আলালদের বাসায়। আলাল আবিরের বেস্ট ফ্রেন্ড। রাতে দুজন আড্ডা মেরে, পশ্চিম পাড়ার শশ্মান ঘাটে গাঁজা খেয়ে যখন বাড়ি ফিরলো তখন রাত বারোটা।চেয়্যারম্যান এনায়েত সাহেব ছেলের জন্য বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে যখন ঘরে ফিরে গেলেন তখন আবির ফিরে এসে মিনু দিদিকে নিচু স্বরে ডাকতে লাগলো।
মিনু তখন খাবার গরম করছিল রান্না ঘরে। গেইট খোলে ভাইকে দেখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল
-আয় ভাই, খেতে আয়।
আবির ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলো
-বাবা কি জেগে আছে আপু?
-হুম।তুই চুপ করে খেয়ে ঘুমিয়ে যা।
আবির বাড়িতে পা দিতে না দিতে ই বাবার ডাক আসলো
-মিনু
মিনু ভয়ার্ত কন্ঠে জবাব দিল
-জি বাবা
-আবিরকে আমার রুমে পাঠাও৷
আবির আর ডান বামে না তাকিয়ে বাবার রুমের দিকে চলে গেল। ঘড়িতে তখন মধ্যরাত। আজ আবিরের কপালে শনি বিরাজমান।
-আসবো বাবা?
-হুম,আসো। এসে বস।
আবির বাবার সামনের সোফাটায় বসলো। বাবা তার সম্মুখে খাটের উপর। দুই মিনিট নিরব থেকে, গলা ঝেড়ে,ভারি কন্ঠে আবিরকে প্রশ্ন করলো
-কোথায় ছিলে সারা দিন?
আবির গরমে ঘামছিল৷ তার উপরে ভয়। সব মিলিয়ে পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ।
-ইয়ে মানে… আমি… বাবা আর হবে না।
ঠিক সেই সময় মিনুর প্রবেশ। সে ভয়ার্ত কন্ঠে বলল
-বাবা, আজ ছেড়ে দেন না। রাত অনেক হয়েছে।
চেয়ারম্যান সাহেব মিনুর দিকে তাকিয়ে ইশারায় বসতে বলল।
-শোনো আবির, তুমি এখন বড় হয়েছো৷ তোমাদের মা মারা যাওয়ার পরে খুব কষ্টে তোমাদের বড় করেছি। সামনে তুমি ইন্টারমিডিয়েট দিবে। যেখানে তোমার উচিত বই নিয়ে বসা সেখানে বন্ধুদের  সাথে আড্ডা দিয়ে, মাঠে খেলে, বাজারের টঙ্গে সময় কাটাচ্ছো।
-আর হবে না বাবা।
-আমার কথা শেষ হয়নি। আজ তোমার বোনকে দেখতে এসেছিল। তোমার কি থাকা উচিত ছিল না? অথচ তুমি ছিলে না। তুমি এখন বড় হয়েছো৷ তোমার দায়িত্ব বেড়েছে। তুমি যদি নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে এত বেখবর থাকো তবে এত সই সম্পত্তি কে দেখবে? নিজেকে সামলাও।
-আর হবে না বাবা। প্লিজ বাবা। তুমি কষ্ট পেয়ো না।
আবিরের চোখে পানি দেখে চেয়ারম্যান সাহেবের মন নরম হয়ে গেল৷ তিনি ছেলেকে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। নাহ,তার ছেলে বড় হয়েছে। আরেকটু আন্তরিক তার ও হওয়া উচিত।
চেয়ারম্যান এনায়েত সাহেবের এক ছেলে এক মেয়ে৷ তিনি লাগাতার তিনবার চেয়ারম্যান। সম্মান, প্রতিপত্তি কোন কিছুর অভাব নেই৷ সুখের ও কমতি নেই৷ বয়স কিঞ্চিৎ হয়েছে। মেয়েটার বিয়ে দিতে পারলে চিন্তামুক্ত। বিপত্নীক লোক হিসেবে ছেলে মেয়ে দুটিকে মানুষ করতে যতেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে ওনার৷
গ্রামের নাম বাসুদেব। আগামী সপ্তাহ মিনুর বিয়ে।বর আমেরিকা প্রবাসী।  তাদের সম্পুর্ণ পরিবার ই আমেরিকা থাকে।পরিবার বলতে বর,বরের মা, আর এক ভাই। আগামীকাল তারা আসবে। বিয়ের আগ পর্যন্ত এখানেই থাকবে। বিয়ের কিছুদিন পর আমেরিকা চলে যাবে।
যারা দেশ ছেড়ে বিদেশে পড়ে থাকে আবির তাদের দু চোখে দেখতে পারে না। ইচ্ছে করে সব কটাকে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দিতে। আলালের অবশ্য বিদেশের প্রতি ই আগ্রহ বেশি।সেটা নিয়ে প্রায় তর্কাতর্কি হচ্ছে তাদের মধ্যে।
ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল আবিরের। তবো ও কিছুক্ষণ বিছানায় শোয়ে রইল।মিনু এসে কয়েকবার ডেকে যাওয়ার কথা কিন্তু আজ আসলো না।আজ বাড়িটা খুব লোকারণ্য। চম্পা খালার সাথে আরো দুজন মহিলা উঠানে বসে কী যেন কুঠছে। মিন্টু কাকাকে দেখা যাচ্ছে ছাগল নিয়ে যাচ্ছে। আবিরের বুঝে আসলো না। বিয়ে তো আরো তিন  সপ্তাহ পরে। আজ এত আয়োজন কেন? হাত বাড়িয়ে টিশার্ট টা শরীরে দিয়ে বের হতেই তার চোখ চরাক গাছ?ওমা, এরা কারা? মিনুর শুশ্বড় বাড়ির লোক নয়তো? আসলো কবে?
আবিরকে দেখে ওর বাবা ইশারায় কাছে ডাকলে।বাবার সাথে দুইজন ছেলে ও একজন মহিলা বসা। আবির কাছে যেতেই ওনি আবিরের দিকে ইশারা করে বলল
-এই হল আমার ছেলে আবির।
আবির তাদের দিকে তাকিয়ে সালাম দিল। কেউ ই সালামের উত্তর দিল না। হয়তো তারা অভ্যস্ত নয়। অথবা উত্তর জানে না।
মিনুর বর হচ্ছে লম্বা ছেলেটা। বয়স পঁচিশ ও হতে পারে আবার ত্রিশ ও। সৌন্দর্যতায় বয়স ঢাকা পড়ে গেছে। বর যেমন ই হোক, বরের ছোট ভাই আরো সুন্দর। যে ই দেখে সে ই হা করে তাকিয়ে থাকে। মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।
লম্বা, ফর্সা,সুঠাম। আবির প্রথমে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। বয়সে তার চেয়ে চারপাঁচ বছরের বড় হতে পারে তবে সৌন্দর্য! আবির অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। এক সময় চোখে চোখ পড়তেই লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল।বরের নাম জামিল আর তার ছোট ভাইয়ের নাম অনন্ত।
অনন্ত ঐখানকার একটা ভার্সিটিতে ফিজিক্স পড়ছে। বাংলাদেশে ই ছিল এত দিন। তিনচার বছর হবে আমেরিকায়।বড় ভাইয়ের বিয়ে, তাই সব ছেড়ে ছুড়ে চলে এসেছে। আবিরের সাথে তার কথা হল সন্ধ্যার দিকে। আবির তখন রান্না ঘরে মিনুর সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।ঠিক সেই সময় অনন্ত এসে রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে গলা ঝেড়ে শান্তস্বরে বলল
-পানি হবে? খাবার পানি?
আবির আর মিনু দুজন ই ফিরে তাকাল৷ মিনু মুচকি হেসে বলল
-আসো, ভেতরে আসো।
আবির তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টি আটকে গেল। এশ রঙের ট্রাউজার, আর ব্লু টি শার্ট, চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা,কুকড়ানো চুলে যে ছেলেটা দাঁড়িয়ে তার উপর কিঞ্চিৎ ঈর্ষা হল তার৷ ইস! এত সুন্দর কেন ছেলেটা।
অনন্ত ও আবিরের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার দৃষ্টি ও আটকে গেল। মনে হল ইশ্বর কোন চক্রান্ত শুরু করে দিয়েছে তাদের নিয়ে। প্রথম দর্শনেই এই দুই তরুণের চোখে মুখে এত মুগ্ধতা কেন?অনন্ত আবিরের দিকে তাকিয়ে হ্যালো বলে হাত বাড়িয়ে দিল। আবির সেই হাতে হাত মিলাতেই তার শরীর কেঁপে উঠলো। অনন্তের ও একি রকম।
মিনু এনে পানি দিল৷ অনন্ত পানি খেয়ে চলে গেল। আবির ও কোন শব্দ না করে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে গেল। আজ তার মনে প্রচন্ড অস্থিরতা৷ এ অস্থিরতার উৎস কোথায়?
আবির সারা দিন বাহিরে বাহিরে ই থাকে। মিনুর বর যে নাকি দুদিন পরে আবিরের দুলাভাই হবে তার সাথে আবিরের তেমন কথা হয়নি। অনন্তের সাথে দু একবার কথা হয়েছিল। তা ও হাই হ্যালো টাইপের।
বিকেলে আবির বাড়ি ফিরলো বৃষ্টিতে ভিজে। বারান্দার ওপাশে মিনু আর জামিল দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।আবিরকে আসতে দেখে মিনু লজ্জায় ভেতর রুমে চলে গেল। জামিল আবিরকে দেখে উল্লাসিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো
-এই যে শালা বাবু, কোথা থেকে আসা হল।
আবির জড়তা মেশানো কন্ঠে উত্তর দিল
-খেলার মাঠে ছিলাম।
-যাও যাও ভেতরে গিয়ে ফ্রেশ হও।
আবির কল তলে যেতেই খেয়াল করলো অনন্ত বৃষ্টিতে ভিজছে। দু হাত উপরে দিয়ে, মাথা তুলে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে। আবির অনন্তকে দেখে বরফের মত শীতল হয়ে গেল।
তার ফর্সা শরীরে কালো হালকা পশমে জলবিন্দু জমেছে, সেই বিন্দু মুক্তার মত চিকচিক করছে,গভীর নাভীর তলদেশ হতে বাহিত পশম রেখায় জলস্পর্শ। কালো রঙের শর্টসে আর উদ্যম খালি শরীরে অনন্তকে দেবমূর্তি মনে হল আবিরের কাছে।ইচ্ছে করছিল একবার ছোঁয়ে দিতে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আবির যখন কল তলায় গিয়ে দাঁড়ালো তখন অনন্ত চোখ খোলল। চোখ খোলে আবিরকে দেখেই তার ভেতরে তান্ডব শুরু হল। প্রেম অথবা কামে তার ভেতর মুর্ছায়িত৷ সে ডান বাম না ভেবে সোজা আবিরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।মুচকি হেসে প্রশ্ন করল
-বৃষ্টি তোমার ভাল লাগে?
 আবির অবাক হয়ে পালটা প্রশ্ন করল
-কেন বলেনতো?
-না, তুমি লম্বা সময় ধরে ভিজছো তো তাই জিজ্ঞেস করছিলাম।
-আপনি ও তো ভিজছেন
-আমার তো ভাল লাগে। বাংলাদেশের বৃষ্টিতে অন্যরকম একটা মজা আছে।
-কী জানি, আমি বুঝি না।
আবিরের উত্তর শুনে অনন্ত অকারণেই হেসে উঠলো। বৃষ্টির শব্দে অনন্তের হাসির শব্দ মিলে অদ্ভুত স্বর সৃষ্টি হল৷ যার সাথে আবিরের এই প্রথম পরিচয়। এত মুগ্ধতায় এই প্রথম সে আকৃষ্ট হয়েছে।
আবির আর অনন্ত যখন ধীরে ধীরে কাছে আসছিল ততই মিনুর বিয়ের দিন নিকটে চলে আসছিল।
একদিন সন্ধ্যার দিকে আবির বই নিয়ে বসেছিল। বিয়ের বাকি দু দিন। মেহমান আসতে শুরু হয়েছে।এমন আত্মীয় ও আসছে যাদের সে কোন দিন চোখে ও দেখিনি।পরিক্ষার পড়া কিছুই পড়া হচ্ছে না। সারাক্ষণ অনন্তের কথা মনে হয়৷ প্রতি দু মিনিট পর পর তাকে দেখার জন্য ছুটে যাচ্ছে।
অনন্ত রুমে শোয়ে স্কাইপে কথা বলছিল। হঠাৎ ভেতরটা তার কেমন করে উঠলো৷ অনন্তকে দেখার জন্য ছটফট করতে লাগলো।সে ফোনটা রেখে সোজা আবিরের রুমে চলে গেল৷ আবির তখন ফিজিক্স বইটা নিয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে অন্ধলার দেখছিল। পেছন থেকে নিশ্চুপে অনন্ত গিয়ে দাঁড়াল।
-কী দেখো?
কন্ঠস্বরে আবিরের ভেতরটা ধক করে উঠল।এক প্রকার বিষণ্ণ কন্ঠে জবান দিল
-অন্ধকার দেখি।
-অন্ধকারে দেখার কী আছে?
-অনেক কিছুই আছে। আপনার দেখার আগ্রগ থাকলেই দেখতে পারবেন।
-তুমি কি আমাকে তুমি করে বলতে পারো না?
-আপনি কি আমার সমবয়সী?
-তুমি করে বলতে কি সমবয়সী হতে হয়?
-হুম। হয়।
অনন্ত আবিরের হাতটা টেনে এনে চাপ দিয়ে, শক্ত করে ধরে বলল
-তোমার চোখ সুন্দর।
-আর আপনার সব সুন্দর।
-হা হা হা
-হাসেন কেন?
-তোমার কথা শুনে
কী হল কে জানে? দুজনের চোখ আটকে গেল দুজনের দিকে। ইচ্ছে হল, অনন্তকাল এইভাবে হাত ধরে বসে থাকতে।ভেতরে শুরু হল কম্পন। অনন্তের শরীর মনের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। সে ঝোকেঁ নিজের ঠোঁট দিয়ে আবিরের ঠোট ছোঁয়ে দিল। চুমু খেল সে আবিরকে। সাথে সাথে আবিরের সারা শরীর কেঁপে উঠল৷ দ্বিতীয়বারের চুমুটা খেল আবির। এই প্রথম, কোনো নরের স্পর্শ আবিরের ঠোটে। আবির দৌড়ে ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেল। অনন্ত তাকিয়ে রইল দেয়ালের দিকে।
এর পরের দিন আবির আর অনন্তের একদম কথা হয়নি। রাত গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো, আবির বাড়িতে ফিরেনি। অথচ কাল তার মিনু দিদির গাঁয়ে হলুদ।অনন্ত সারা বেলা কাটালো ছটফট করে।কবে আসবে আবির৷ গেল রাতের ঘটনার জন্য সে অনুতপ্ত কি না সেটা জিজ্ঞেস করার আছে তার। এমনটা কেন হবে? তাহলে কি অনন্তের প্রতি আবিরের কোন অনুভূতি নেই?
আবির যখন বাসায় ফিরলো তখন রাত নয়টা। চেয়ারম্যান সাহেব নানা কাজে ব্যস্ত ছিলো। এত বড় আয়োজন একা সামলাতে সামলাতে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।আবিরকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে ডেকে নিলেন নিজের রুমে।সারাদিন কোথায় ছিল বা কী করেছিল আজ এসব কিছু ই জিজ্ঞেস না করে সোজা প্রশ্ন করল
-তুমি কি অনন্তের সাথে রুম ভাগ কারতে পারবে?
আবির মাথা নেড়ে হ্যা সম্মতি দিয়ে বের হয়ে গেল৷ খাবার টেবিলে ও সে কোন কথা বলেনি। মিনুর মন ও বেশ খারাপ। তাকে সব ছেড়ে যেতে হবে।ভাইকে খাওয়ানোর সময় তার চোখ ও পানিতে ভরে এল। আবির দেখে ও না দেখার ভান ধরে চলে গেল। তার ভেতরটা ও কেমন ছটফট করছিল। সারাদিন আলালদের বাড়িতে পড়াশোনা করে সে ক্লান্ত। পরিক্ষা নিকটে। মিনু দিদির মান রাখতে হলেও তাকে ভাল করতে হবে৷
কলতলায় যেতেই খেয়াল করলো অনন্ত দাঁড়িয়ে। কৃষ্ণপক্ষের রাতে সব অন্ধকার।সে ঠিক অনন্তের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। অনন্ত ফিরে তাকায়নি।সে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুটা মুচকি হেসে, প্রফুল্ল কন্ঠে প্রশ্ন করল
-তুমি আকাশ পছন্দ কর?
আবিরের কন্ঠে তুমি সম্বোধন শুনে অনন্তের মন হেসে উঠল।
সে আবিরে দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল
-না। আমি আকাশের রঙ পছন্দ করি।
-আকাশের রঙ তো আকাশী।
-না, আকাশের রঙ তুমি।
-আবির?
-হুম।
আবির হেসে উঠল। তার হাসির শব্দ শুনে মিনু বের হয়ে  পিছন থেকে আবিরকে জড়িয়ে ধরলো। তার মনটা ভাল হয়ে গেল ভাইয়ের হাসির শব্দে।
বোনের স্নেহ আবিরের মনটা আরো ভাল হয়ে গেল৷সে অনেক দিন পরে আনন্দের নিঃশ্বাস ছাড়লো।
আবির তার রুমে বসে কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সেই সময় নিঃশব্দে অনন্ত তার পিছনে এসে দাঁড়ালো। তার হাত দুটি পিছনে রাখা। অনন্তের আগমনে আবিরের হৃদস্পন্দনে অদ্ভুত পরিবর্তন। সে পিছন ফিরে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
-আজ আমার সাথে থাকতে হবে তোমার।
অনন্তের চোখে মুখে আনন্দের বলি রেখা।সে বিছনায় বসতে বসতে বলল
-তারমানে, তুমি আমার শরীর ঘেঁষে থাকবে?
-না তো। আমি সোফায় থাকবো।
-না৷ দুজন এক সাথে৷
আবির এগিয়ে এসে বলল
-আমি বেড শেয়ার করে থাকতে পারি না।
-থাকতে হবে।
আবির চোখ মুখ শক্ত করে অনন্তের দিকে দু মিনিট তাকিয়ে থেকে হেসে উঠলো। সাথে সাথে অনন্ত ও হেসে উঠলো।
অকারণে এত হাসি মনে হয় আবির প্রথম হাসলো।সারা রাত দুজন কথা বলে কাটিয়ে দিল।অনন্ত বলল কম, আবির শোনলো বেশি৷ কথা বলতে বলতে কখন যে ভোর
হয়ে এলো সে খেয়াল কারো ই ছিল না।
আজ মিনুর গাঁয়ে হলুদ। আবির আর অনন্ত দুজন সারাদিন অনেক কাজ করেছে।মেহমানদের সমাদর,স্টেজিং। যখন সন্ধ্যা নামলো তখন সারা বাড়ি আলোয় আলোকিত হয়ে গেল। বর আর বধূকে যখন স্টেজে উঠানো হল তখন তাদের পাশাপাশি দেখে চেয়ারম্যান সাহেবের চোখে পানি চলে এল। মুগ্ধ হলেন তার ছেলে আবিরকে দেখে। পায়জা, পাঞ্জাবীতে মুগ্ধকর লাগছিল আবিরকে৷
অনন্ত রুম থেকে বের হতে ই দেখে আবির ও বের হচ্ছে৷ দুজনের সৌন্দর্যে দুজন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। এ যেন পরম মঙ্গলময় দৃষ্টি৷আবির এগিয়ে গেল অনন্তের দিকে৷ কিছু বলতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় আবিরের বন্ধু বান্ধব এসে তাকে টেনে নিয়ে গেল। তাদের বায়না আবিরকে নাচতে হবে। আবির ভয়ে ভয়ে একবার বাবার দিকে তাকাল৷ চেয়ারম্যান সাহেব চোখের ইশারায় সম্মতি দিল। আবির বাবার অনুমতি পেয়ে নাচতে লাগলো। আজ সে অনেক খুশি৷ সে আজ খুব নাচবে। গেল মাসে জুনায়েদের বোনের বিয়েতে খুব নেচেছিল। সে দিন পরের আনন্দে নেচেছিল, আজ সে নিজের আনন্দে নাচবে।
অনন্ত কিছু সময়ের জন্য মুগ্ধ হয়ে পাথরের মত দাঁড়িয়েছিল আবিরের নাচ দেখে।নাচ শেষ হতেই সে তাড়াহুড়ো করে রুমের ভেতরে ঢুকে গেল।অনন্তকে এইভাবে যেতে দেখে আবির ও ছুটে গেল। আবিরকে রুমে ঢুকতে দেখে অনন্ত তাকে জড়িয়ে ধরলো।সে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। এমনটা কেন ঘটলো তার কারন ও জানতে চাইনি।
দিনগুলো চলে গেল দ্রুত।আজ তাদের ফিরে যাওয়ার পালা। সকাল থেকেই আবিরের মন খারাপ। সকাল থেকেই নিজের চোখের পানি লুকাতে সে ব্যস্ত।ঐদিকে অনন্তের ও কাটছে অস্থির এক সময়৷ সে চলে যাবে আজ। আর কখনো আসা হয় কি না সে জানে না। আবিরকে তার ছেড়ে যেতে হবে৷ এতগুলো দিন চলে গেলো অথচ মনের কথাটা মুখে ও আনতে পারেনি। চলে গেলে হয়তো আবির তাকে ভুলে যাবে।মনের রাখার মত কিছু ঘটেও নি তাদের মাঝে।তারমানে অনন্ত আবিরকে হারাবে৷
মিনুরা চলে গেল রাতের ফ্ল্যাইটে৷ শেষ মূহুর্ত অবধি আবির ভেবেছিল অনন্ত তাকে কিছু বলবে৷ কিন্তু সে কিছু বলেনি। অনন্ত ও অপেক্ষায় ছিল আবিরের কিছু বলার। অথচ সারাক্ষণ পাশাপাশি বসে,নিশ্চুপ অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করা হয়ে উঠেনি। শেষ বারের মত যখন আবিরকে জড়িয়ে ধরেছিল তখন তার বুক ফেটে কান্নার উদ্রেক হয়েছিল।এত লোকের ভিড়ে অনন্তের খুব অসহায় লাগছিল নিজেকে।মনে হচ্ছিল নিজের সুখ, শান্তি সব ছেড়ে সে চলে যাচ্ছে।আর কোন দিন, কোন কালে তাদের দেখা হবে না।
আবির পরিক্ষায় বসলো। টানা পরিক্ষা দিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিল সে। এই সময়ের মধ্যে অনন্তের সাথে তার কোন প্রকার যোগাযোগ ছিল না। যদি ও মিনুর সাথে কথা হত। কিন্তু পরিক্ষার ব্যস্ততায় সেই কথা বলা ও বেশি একটু হয়নি। পরিক্ষার দিনগুলোতে আবিরের কথা মনে হলে ও পড়াশোনার প্রেসারে তা ভুলে থাকা যেত৷ কিন্তু ইদানিং, সারাক্ষণ ই তার কথা মনে পড়ছে। বাড়ি, বারান্দা,কল তলা, নিজের ঘর, বৃষ্টি সব কিছুতেই তার স্মৃতি।প্রায় সময় মনে হত একটু কথা বলতে। এত দিনের পরিচয়ে স্কাইপ বা ফেসবুক কোন আইডির খবর ই নেওয়া হয়নি।
অনন্তের রাতে ঘুম হচ্ছে না।সে বুঝতে পেরেছে ঠিক কী পরিমাণ ভাল সে অনন্তকে বাসে। সারাক্ষণ হৃদয় জুড়ে আবিরের জন্য একটা হাহাকার। তার ক্লাসে মন বসে না,বাসায় থাকা যায় না। এত বড় সুন্দর গোছানো শহরটাতে নিজেকে বড্ড একা আর অসহায় লাগে। সব কিছুতেই যেন আবিরের চেহারা ভেসে উঠে।বিকলাঙ্গ মানুষের মত সারাদিন রুমে বসে বিয়েতে তুলা আবিরের ছবিগুলো দেখে আর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। আগে তো কখনো এমনটা হয়নি।বুদ্ধিশুণ্য হয়ে পড়েছিল অনন্ত৷ নাহ,তাকে কিছু একটা করতে হবে৷ এবং দ্রুত।  এইভাবে বেঁচে থাকার মানে হয় না।
সকাল থেকেই আবিরের মনটা ভাল। অকারণেই ভাল। ঘুম থেকে জেগেই মনে হয়েছিল আজকের দিনটা ভাল যাবে। হালকা নাস্তা করে সে চলে গেল গ্রামের শেষের খালপাড়ে। খালপাড়ের পুরানো বটগাছটার শিকড়ে বসে খালের ঐ পাড়ের গরুর পালের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল৷ ঠি সেই সময়টাতে পিছন থেকে আলাল এসে বলল,
-কিরে, তুই এখানে? দৌড়ে বাড়ি যা।  মিনু দিদি আসছে।
-ধুর,আসলে বলে আসবে না?
-আমি কি জানি? আমাকে তুর বাসার কাজের ছেলেটা বলল তুকে জানায়তে৷
আবির আর না থেমে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। দরজায় পৌঁছে ই সে দেখে মিনু দিদি, দুলাভাই সোফায় বসে আছে৷ বাবা ও এখানে৷ অনন্ত? সে আসেনি? জিজ্ঞেস করবো? এসব সাত পাঁচ ভেবে তাদের সাথে মিনিট পাঁচেক  কথা বলে নিজের রুমে এসেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
এ যে অনন্ত! চেহারা এত শুকিয়ে গেছে? দাঁড়ি গোঁফ বেড়ে গেছে। কাটার নাম নেই। সে এগিয়ে গেল। অনন্ত আবিরকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো।তার চোখে মুখে অনেক দিন পর প্রশান্তির ছাপ। অনেক দিন পর তার হৃদয় জুড়ে ভাল লাগার আভা।অনন্ত প্রশ্ন করল
-কেমন আছো তুমি?
-ভাল ছিলাম না।
-কে?
-তুমি বুঝো না?
-বুঝি।
বলেই সে আবিরকে জড়িয়ে ধরলো। অনেক দিন পরে হৃদয়ে উঠা ঝড়টা থেমে গেছে। অনেক দিন পর হৃদয় প্রকৃত জনের স্পর্শ পেয়েছে।
আবির চুমু খেলে অনন্তের ঠোঁটে। অনন্ত সে চুমুটাকে দীর্ঘস্থায়ী করল আরো আবেগে। আবির অনন্তের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল
-আমি তোমাকে ভালবাসি
-আর আমি তার চেয়ে বেশি।
দুজন দুজনকে নিয়ে বিছানায় পড়ে গেল। বুকে মাথা রেখে বলে যেতে লাগলো দীর্ঘ দিন ধরে না বলা কথা। হৃদয় খোলে বলতে লাগলো ভালবাসার যত অভিযোগ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.