বাজলো তোমার আলোর বেণু

লেখক :- ধ্রুব

পুরো বাড়িটা আলোয় সেজে আছে। চারদিকে কতো রোশনাই। উঠোন থেকে দোতলার চিলেকোঠা পর্যন্ত লাল, নীল, হলুদ ছোট ছোট লাইট দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। শুধু দোতলার পশ্চিমের ঘরটায় আলোর কোনো ছিটেফোঁটা নেই। গুমোট অন্ধকার ঘরটাকে এক নিস্তব্ধতার আবরণ দিয়ে যেন ঘিরে রেখেছে। কে বলবে কাল এই ঘরের মানুষটারই বিয়ে হতে চলেছে!

•••

দেখতে দেখতে ছয়টা বছর পার হয়ে গেছে। দ্বীপের জীবনের এক বিভীষিকাময় অর্ধ যুগ। সন্ধ্যাবেলা তুলসি তলায় প্রদীপ দিয়ে কোনো এক পুরনো কাজগের খোঁজে ট্রাঙ্ক ঘাঁটতে গিয়েই মা প্রথম ডায়েরিটা খুঁজে পেয়েছিলো। গোটা গোটা অক্ষরে প্রতি পৃষ্ঠা জুড়ে শুধু একটিই নাম “রূপায়ন”। দ্বীপের সমস্ত অব্যক্ত কথার আশ্রয় ছিলো সেই ডায়েরি। রূপায়নকে নিয়েই যে তার অপূর্ণ সত্ত্বা পূর্ণ হয়ে উঠবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না নি তার প্রতিটি বর্ণে, শব্দে, বাক্যে। মা সবকিছু জেনে নিশ্চুপ ছিলো। বাবাও বাড়ি ফিরে সেদিন তাকে বলেনি কিছু। তবে কিছু একটা ঘটতে চলেছে তার জীবনে এইটা দ্বীপ বুঝে গিয়েছিলো। সারারাত দু’চোখের পাতা এক হয়নি তার। রূপায়নকে সব জানানো দরকার। কিন্তু উপায় ছিলো না। নিয়তি সহায় ছিলো না দ্বীপের।

ভোর হতেই জেঠু এসে হাজির। দ্বীপকে নাকি তার সঙ্গে নিয়ে যাবে। এখন থেকে দ্বীপ ওর জেঠুর কাছেই থাকবে। আকাশ পাতাল তোলপাড় করে বলেছিলো দ্বীপ, “না। আমি যাবো না কোথাও।”

বাবার পা ধরে সেদিন বারবার কাকুতি মিনতি করেছিলো ও। চিৎকার করে বলেছিলো “বাবা, এমন কাজ করোনা তুমি! এমন শাস্তি দিওনা। সরিয়ে দিওনা আমাকে রূপের কাছ থেকে!” নাহ, তার বাবা শোনেনি তার কথা। নীরবে উঠে এসে মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়েছিলো দ্বীপ। যে মা দ্বীপের সবচেয়ে আপন সবচেয়ে কাছের সে মা পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো তার থেকে। আট বছরের ছোট বোনটা এসে ছলছল চোখে বলেছিলো “দাদা, তুমি এমন কি করেছো যে মা বাবার কাছে এমন করে কাঁদছো? তুমি কি খুব বড় পাপ করেছো?”

কোনো উত্তর দিতে পারেনি দ্বীপ।

জেঠুর সাথে চলে এসেছিলো সেদিন। রূপায়নকে শেষ দেখাটাও দেখতে পারেনি। জানাতে পারেনি ওর সাথে কি ঘটেছে। তবে মনে মনে একটা বিশ্বাস দ্বীপ রেখেছিলো “তার রূপ কখনো তাকে ভুল বুঝবে না। তার প্রতি রূপের ভালোবাসা কমবে না কখনো।”

বাবা মার ভাষ্যমতে দ্বীপের এই ছেলেমানুষি খেলা নাকি রূপায়নের কাছ থেকে দূরে গেলেই দ্বীপ ভুলে যাবে। সতের বছরের কিশোর জীবনে নাকি অনেকেই এরকম ছেলেমানুষিতে হারহামেশাই মত্ত হয়ে ওঠে! কিন্তু আসলেই কি তাই? দ্বীপ কি এই ছ’বছরে তার রূপকে একদিনের জন্য হলেও ভুলতে পেরেছে? না পারেনি। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে যখন একসময় হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো তখনও কেউ বুঝলো না যে দ্বীপের আসল অসুখটা মনের।

আস্তে আস্তে দিন বয়ে চলে। নতুন স্কুলের টিফিন পিরিয়ড, ক্লাস ব্রেকে কাটাকাটি খেলা, তেঁতুল চাটনির ভাগ নিয়ে খুনসুটি, ছুটির ঘন্টায় একা বাড়ি ফেরা সবকিছুতেই রূপের সাথে পুরনো স্মৃতি নিয়ে দ্বীপ এগিয়ে চলে। রূপায়নেরও কি দ্বীপের মতো এভাবেই দিন কেটে যায়? দ্বীপের জানা হয়ে ওঠে না। 

স্কুল শেষ করে কলেজ জীবন; তারপর ভার্সিটির গণ্ডিতে আবদ্ধ দ্বীপ ছ’বছরে একটিবারের জন্যেও রূপায়নের দেখা পায়নি। যাওয়া হয়নি তার নিজের বাড়িটাতেও। ঐ যে ফেরার সময় মা মাথায় হাত ঠেকিয়ে দিব্যি কেটে দিয়েছিলো, তা মাথায় ঘুরপাক খায় দ্বীপের। ও যেন কখনো রূপায়নের সামনে না যায়। দ্বীপ কথা রেখেছে ওর। তবে রূপের প্রতি ওর ভালোবাসা? যেইটা তো আর দিব্যি দিয়ে আটতে রাখতে পারেনি কেউ। কেউ পারবেও না কখনো…

তবে দ্বীপের জীবনে আবারো এমন তোলপাড় নেমে আসবে তা কখনো ভাবেনি ও। কাওকে বিয়ে করে তার সাথে প্রতারণা করার মতো একটা কাজ দ্বীপ কখনো করতে চায়নি। বাবা মার মুখ রাখতে এতবড় একটা পাপ সে কি করে করবে! মুখ ফুটে নিলীমাকে সবকিছু বলতে গিয়েও বলতে পারেনি দ্বীপ। সেই অপরাধবোধ দ্বীপকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে সবসময়।

•••

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ আসছে। বাইরে থেকে দাদা সম্বোধনে দ্বীপকে ডাকছে তার ছোটবোন। কোনো সাড়া নেই দ্বীপের। “দাদা, দরজা খোলো। বসার ঘরে সবাই তোমাকে ডাকছে। তোমার আংটির মাপটা ঠিক আছে কিনা তা দেখে নেবে একবার!” এবারেও কোনো সাড়া নেই দ্বীপের। বাইরে কড়া নাড়ার শব্দটা আর পাওয়া যাচ্ছে না। বিরক্তিতে চলে গেছে বোধহয় ছোটবোনটা। বিছানার ঠিক মাঝখানে দ্বীপ বসা। অন্ধকারে ঠিক দেখা যাচ্ছে না ওর মুখটা। পাশে সেই পুরনো ডায়েরিটা। জেঠুর সাথে বাড়ি ছাড়ার আগের রাতে মা’র ঘর থেকে লুকিয়ে এনে নিজের কাছে রেখেছিলো দ্বীপ। ডায়েরিটা রোজ বুকে জড়িয়ে ঘুমায় ও। কাঁপুনি ধরা শরীরে দ্বীপের ডান হাতের ব্লেডটা এগিয়ে যাচ্ছে বাম হাতের শিরার দিকে। সারা শরীর ঘামে জবজবে হয়ে গেছে। সে যে কোনভাবেই নীলিমার জীবনটা নষ্ট করতে পারবেনা। রূপের জন্য ওর ভালোবাসা যে মিথ্যা না সেইটা তো ও ভালো করেই জানে। ওর মনের মধ্যে শুধু একটিই কথা “রূপ, ক্ষমা করে দিস আমাকে!”

ব্লেডটা শিরায় কেটে বসার আগেই সম্মোহন ফিরে এলো দ্বীপের। ফোন বাজছে। হাত থেকে ব্লেডটা বিছানায় পড়ে গেলো। বালিশের নিচ থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে স্ক্রিনের উপর নিলীমার নাম্বার। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নিলীমার হাসি। “এই যে হবু জামাই আমার… কি করা হচ্ছে শুনি! একটু বেরিয়ে আসুন বাহিরে। বড্ড ইচ্ছে করতেছে ফুচকা খেতে। আমাকে নিয়ে চলুন!” দ্বীপ কোনো উত্তর না দিয়ে ফোন রেখে দিলো।

দ্বীপ এখন রূপের সামনে দাঁড়িয়ে। পাশে নিলীমা আকাশ ছোঁয়া হাসি হাসছে। একটু দূরে রূপায়ন অপলক চোখে তাকিয়ে আছে ওর দ্বীপের দিকে। ছ’বছর পরেও দুজন দুজনকে চিনতে একমুহূর্ত দেরি হয়নি কারোর। নিলীমা দ্বীপের দুই হাত ধরে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঠোঁটে হাসির রেখা ঝুলিয়ে বলছে, “আশীর্বাদের পরে যখন আমি তোমার জেঠুর বাড়িতে প্রথম এসেছিলাম সেদিনই তোমার ডায়েরিটা আমি পেয়েছি। তুমি ছিলে না সেদিন ঘরে। তাই জানো না কিছুই। তবে আজকের এই দিনটা আনার জন্য কতোটা কাঠখড় পুড়িয়েছি আমি তা আর নাই বলি। তুমি রূপায়নের সাথে যাও। আমি এদিকে সব সামলে নেব।”

দ্বীপের চোখের কোণে জল এসে জমেছে। নিলীমাকে কিছু বলার ভাষা দ্বীপের কাছে নেই। নিলীমার হাতে আলতো চাপ দিয়ে ও রূপায়নের দিকে পা বাড়িয়েছে। দুজনের আলিঙ্গন শেষে রূপ আর দ্বীপ হেঁটে চলেছে তাদের ভালোবাসায় গড়া নতুন পৃথিবীতে পাড়ি দেবে বলে। অন্ধকারে হাতে হাত রেখে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে ওরা দুজন। দ্বীপ পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখছে নিলীমাকে। মেয়েটা আবারো আকাশ বাতাস ধ্বনিত করে চারদিকে আলো ছড়িয়ে হেসে চলেছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.