বিহাইন্ড দ্য ক্লাউড

লেখক :- রবিনসন ক্রুস

– বিকাল ৫টা,পার্কের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন মানুষ,বিভিন্ন রঙের পোশাক জড়িয়ে।নানান বয়সের মানুষ,শিশু,কিশোর,তরু­ন,প্রবীন সবাই এই একটা পার্কেই জড় হতে থাকে বিকেল গুলোতে।ঢাকার বাইরের শহর বলেই হয়তো এটা সম্ভব, নয়ত ছুটির দিনে কাপলদের জন্য বাকিরা সুযোগই পেতো।’ নায়েত্রা ‘ নীল শাড়ি পড়া,ঠোঁটে গাড়ো লাল লিপস্টিক,হাতভর্তি লাল কাচের চুড়ি,কপালে লাল টিপ,সাথে খোপায় একটা লাল জবাও গুঁজেছে।বসে আছে পার্কের এক পাশে,একা একটা বেঞ্চে। পাশ থেকে বহুলোক হেঁটে যাচ্ছে,আঢ় চোখে অনেকে যুবক ওর দিকে তাকাচ্ছেও।আসলে যেভাবে নীল পরীর মতো ও সেজেছে,তাতে তাকানোরই কথা।ওর একটু একটু বিরক্তোও লাগছে।

– উহু!সায়ান যে কেনো এত দেরি করছে।অসহ্য,সবসময় এরকম টাই করে..

অসস্থি নিয়ে,মনে মনে কথাগুলো বলছিলো নায়েত্রা।কিছুক্ষন পর,’সায়ান’ এক গুচ্ছ জায়ভারা ফুল হাতে হাজির।এসেই কানে হাত দিয়ে সরি বলতেছিল।

– হোয়াটস রং উইথ ইউ সায়ান?হেই,ইটস ফোর্থ ইয়ার,এন্ড লং টাইম।বাট,ইউ আর সেইম লেজি গাই!

– সরি নায়েত্রা!প্লীজ..এই কান ধরে উঠা বসা করছি। আর হবে না..

– থাক,আর পটাতে হবেনা।লোক ভীড় করুক,এসব চাইনা।

রাগ-অভিমানের পালা শেষ।রাগ অবশ্য নায়েত্রার মানায়,চার বছর পার হয়ে গেল।অথচ,সায়ান সবসময় এরকম দেরি করে আসে।

– তারপর,অনেকক্ষন বসে ছিলা না?

– আই তোমার লজ্জা করে না,হবু বউ কে এভাবে পার্কে একা বসায়া রাখো..?

– সরি,বাট তুমি আসলেই আমার যোগ্য।অন্য কেউ হলে এই অলস কে ছেড়ে চলে যেত।নেভার লীভ মি সুইটহার্ট! 

নায়েত্রা ওর কথাগুলো শুনে আনমনে হয়ে গেল।কি যেন ভাবনায় ডুবে গেল..

– এই কি ব্যাপার!মন খারাপ করে দিলাম নাকি?

– সায়ান তোমার মনে আছে,আমাদের প্রথম পরিচয়?

– থাকবে না কেন,১৯৮৫ সালের ১৪ এপ্রিল।

ওদের পরিচয়টা পহেলা বৈশাখের দিন একটা গ্রাম্য মেলায়।সায়ান সে বছর এইচ.এস.সি প্রথম বর্ষ,আর নায়েত্রা এস.এস.সি দিবে সামনের বছর।নায়েত্রা সেইবার বৈশাখে ওদের স্কুল থেকে একটা বড় গ্রাম্যমেলার আয়োজন করেছিলো,তার একজন স্বেচ্ছাসেবক ছিলো।যেহেতু,ওরা দশম শ্রেনীর,তাই বেশিরভাগ কাজই ওদের করতে হয়েছে।আর ও বেশ ভাল পুতুলো বানায়।ওরা হিন্দু,বাড়ির পাশেই একটা কুমোরটুলি আছে।সেখানেই মায়ের সাথে যেত মাঝেমধ্যে বেড়াতে।শখের বসে কিভাবে যেন শিখে ফেললো।ওর মা অবশ্য যেত,কুমোরটুলির ছেলে-মেয়েদের পড়াতে।উনি ওখানকারই একটা কলেজের শিক্ষিকা।যেসব ছেলে-মেয়ে অসহায়,কাজের জন্য পড়তে পারেনা।তাদেরকে সে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠদান করেন।

তো,পহেলা বৈশাখের দিন মাটির পুতুলের তাবুতে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে নায়েত্রাই কাজ করতেছিল।সায়ান বন্ধুদের সাথে ঘুরতে ঘুরতে তাবুটিতে ডুকল।হঠাৎ,ওর চোখে একটা পুতুল বাধলো।পুতুলটা একজন নারীর, বন্ধুক হাতে একজন বীরাঙ্গনার মূর্তি।সায়ানের মুখ থেকে বেরিয়ে আসল,’ ওয়াও,ইটস বিউটিফুল!’

– এটা কে বানিয়েছে?

– জ্বী, আমি!

– আপনিই মেকার,আপনিই বিক্রেতা?

– আসলে ব্যাপার টা তা না।আমি এখানে একজন স্বেচ্ছাসেবক।আর পুতুলটা স্কুলের কমিটির একজন হয়ে আমার কন্ট্রিবিউশন ছিল।এখানের অনেকগুলোই আমার বানানো।

– ও রিয়্যালি!সত্যিই অসাধারণ। আমি এটা নিতে চাই।

সায়ান পুতুলটা কিনে সেদিন চলে আসছিলো।কিন্তু,সাথে কিছু মায়ায় নিয়ে এসেছিলো সেদিন।অবুজ চোখের মায়া,মিষ্টি একটা কন্ঠের মায়া,আর তার দুরন্ত রুপের।এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল,ভুলতে পারেনি ঐ মায়া।বরং,সায়ান আরো জড়িয়ে গেল নায়েত্রার মায়ায়।পরের সপ্তাহে ওদের কলেজে ‘ বক্তৃতা প্রতিযোগিতা ‘ ছিল।বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে।স্বেচ্ছাসে­বক হিসাবে ওদেরকেই থাকতে হলো।নায়েত্রার মা অবশ্য এই কলেজেরই শিক্ষিকা।প্রতিযোগিতা­ চলছে,কোনায় এক পাশে বসে আড্ডা মারছিলো সায়ান আর ওর বন্ধুরা।এক পর্যায়ে সায়ান মাইকে একটি কন্ঠস্বর শুনল,যা ছিল সেদিনের মেলায় দেখা সেই মেয়েটির।দৌড়ে মঞ্চের সামনে গিয়ে দেখলো সত্যিই তাই।কি অপরুপ সুন্দরী, আর বিদ্রোহী কন্ঠে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে চলছিলো।সায়না এবার পুরোপুরি এই মেয়ের প্রেমে ফিট হয়ে গেল।নজর রাখতে ছিলো নায়েত্রার উপর,কোথায় যায়।অনুষ্ঠান শেষে দেখল, নাসরিন ম্যামের সাথে নায়েত্রা একটা রিকশায় চলে যাচ্ছে।ও খুব দ্রুত দৌড়ে সেখানে দাড়িয়ে থাকা ওরই কিছু বান্ধবীর কাছে জিজ্ঞেস করল,’ আচ্ছা,নাসরিন ম্যামের সাথে ঐ মেয়েটা কে রে?’ ওর বান্ধবীরা বলল,’ ওর নাম নায়েত্রা,ম্যামেরই একমাত্র মেয়ে।’

সায়ান মনে মনে খুশি হলো।কিন্তু,কিভাবে ওর সাথে পরিচিত হবে।নাসরিন ম্যাম ওদের ইংরেজি পড়াতো,এবং খুব দয়ালু ছিলো।এরপরই সায়ান বুদ্ধি এটে ফেলল।ইচ্ছা করেই প্রায় গ্রামার ভুল করত ক্লাসে।তো ম্যাম একদিন,ওর সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করল।জানতে পারলো ওর গ্রামারে প্রচুর সমস্যা।ও ম্যামকে অনুরোধ করল,ওকে সাহায্য করতে,এবং বাড়তি পড়ানোর জন্য। কিন্তু ম্যাম আলাদা টিউশন করায় না,তাই ওকে ওর সমস্যা গুলোকে মার্ক আপ করে,সপ্তাহে দুই দিন বিকালে ম্যামের বাসায় যেতে বলল।এবার সায়ানের খুশি আর আটকায় কে।শুরু হল ওর টিউশন,আর নায়েত্রার সাথে কথা বলার সুযোগ খোঁজা।কিন্তু,দুই সপ্তাহ গেল,নায়েত্রা কখনো ওর রুম থেকেই বের হয়না।একদিন অবশ্য ছাঁদে ফুলগাছে পানি দিতে দেখেছিল।তার পরের দিন বিকালে যখন সায়ান পড়তে যায়,সেদিন ও একটু অসুস্থ ছিল।দুপুর থেকেই মাথা ব্যাথা ছিলো,তারপরো গেল।ম্যাম ওর এটেনশনলেস ব্যাপার টা ধরে ফেলল,

– সায়ান,কি হয়েছে তোমার?টপিক বুজতে সমস্যা হচ্ছে?

– ম্যাম,দুপুর থেকেই মাথা ব্যাথা করছিল।

– আচ্ছা তাহলে আজ থাক,তুমি বসো আমি চা বানিয়ে আনছি।চা খেলে একটু ভাল লাগবে।

নায়েত্রাও রুম থেকে বেরিয়ে আসলো তখন..

– মা,তুমিও রেস্ট নাও।আমিই চা করে আনছি।

এই প্রথম নায়েত্রা,সায়ানের সামনে আসতে চলেছে।সায়না ভীষন উওেজিত,কিছুটা ভীতোও বটে।নায়েত্রা চা নিয়ে এসে মা এবং সায়ান কে দিলো।ও নিজেও এক মগে চা নিলো।সায়ান সৌজন্যে মূলক,ধন্যবাদ দিলো।এরমধ্যে নায়েত্রার মা ওদের কথা বলতে বলে,সে নিজের কাজে গেল।নায়েত্রাই হঠাৎ বলে উঠল,

– কোন টপিক শিখছিলেন আজ ভাইয়া?

– আহ!ন্যারেশন,কিন্তু আমি বুজতেছি না এটা।

– আমি সাহায্য করতে পারি সমস্যা না থাকলে।মা আমাকে এটা বেশ ভালভাবেই শিখিয়েছিল।

নায়েত্রা সেদিন সায়ানকে টপিক টা বুজিয়ে দিয়েছিলো ভাল করে।

পরের দিন সাইকেল নিয়ে নায়েত্রার স্কুলের সামনে হাজির সায়ান।স্কুল ছুটি হলো,বান্ধবীদের সাথে বের হয়ে আসছিলো নায়েত্রা।পিছন থেকে রাস্তায় ডাকলো সায়ান।

– আরে ভাইয়া আপনি?

– কালকে টপিকটা বুজিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

– না না ঠিকাছে।এটা এমনকি..

– ও একটা কথা,আমি কিন্তু তোমাকে আরো অনেক আগেই দেখেছি।প্রথম মেলায় তোমার বানানো একজন বীরাঙ্গনার পুতুল কিনেছিলাম।তারপর বক্তৃতা প্রতিযোগিতায়, তুমি বেশ ভাল স্টোরি টেলার।

– বাহ,আপনি দেখছি অনেক জায়গায় তাহলে আমায় খেয়াল করেন।

এরপর ধীরে ধীরে ওদের ফ্রেন্ডশীপ টা বেড়ে ওঠে।নায়েত্রাকেও বিভিন্ন সাহায্য করত ও।কখন যে দুজন দুজনকে ভালবেসে ফেলেছিল ওরা বুজতেই পারেনি।নায়েত্রার মা জানে ব্যাপারটা।সে কখনো বাধা দেয়নি,সায়ান ভাল পরিবারের ছেলে।তাছাড়া মেয়ে সুখী হোক,সেটাই চায় সে।

এভাবেই পার হয়ে গেছে চার বছর।এখন,সায়ান বিবিএ ৩য় বর্ষ,নায়েত্রা ২য় বর্ষ আইন নিয়ে পড়ছে।দুজনেই এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে,তাই ওদের সম্পর্কটা বেশ গভীরই ছিলো।সবসময় দুজন দুজনার পাশপাশিই পথ চলার চেষ্টা করেছে।

হঠাৎই,নায়েত্রার ঝাঁকুনিতে সায়ানের ভাবনায় ছেদ পড়লো।

– কি সাহেব,জিজ্ঞেস করেছি মনে আছে কিনা!তাতেই আপনি নস্টালজিক হয়ে গেছেন।

– কিছুটা,কত ছেলেমানুষী ছিলো সেসব দিনগুলোতো।এখন আমরা কত বদলে গেছি তাইনা?

– সায়ান,এটা সময়ের দাবী।যেটা বদলানোর সেটা বদলাবে।যেটা বদলানোর না সেটা বদলায়নি আমরা,সেটা আমাদের ভালবাসা! 

– ইওর ম্যাজেস্ট্রি প্রিন্সেস নায়েত্রা!নাউ লিসেন,কালকে আমার সাথে বাসায় যাবে, বাবা-মা তোমায় দেখতে চেয়েছে।

– তুমি বাসায় বলেছো,কই বলোনিতো আগে?

– হাহা,সারপ্রাইজ!!চলো আইসক্রীম খাই…

দুজন আইসক্রীম খেতে খেতেই পার্কটা ঘুরে দেখছিল।সায়ানের বাবা ঢাকাতেই বড় ব্যবসা করে।কয়েকটা শাড়ি হাউজের মালিক।ওগুলোই দেখাশোনা করে।সায়ানের মা গ্রামেই থাকত,সায়ান ঢাকায় ভর্তি হওয়ার পর পুরোপুরি সব গুছিয়ে ঢাকায় চলে এসেছে।

পরের দিন,নায়েত্রা গেল সায়ানদের বাসায়।ওর পরিবারের সবাই ওদের দুজনের বেশ প্রশংসা করল।সায়ানের বাবা নায়েত্রার মাকে আসার জন্য অনুরোধ করল,তার ব্যস্ততার কারনে।নাসরিন বেগমের অবশ্য সমস্যা নাই,ঢাকায় তার বোনেরা থাকে,আর মেয়ের সুখের জন্য এটুক করাই যায়।দুই পরিবার মিলে ওদের এনগেজমেন্ট এর ডেট ফাইনাল করে ফেলল,সায়ানের বাবা কার্ড ছাপাতেও দিয়েছে।এর ভিতরেই কেন জানি,সায়ানের বাবা একটু গ্রামে খোঁজ নিল নায়েত্রার পরিবারের সম্পর্কে। এবং পরের দিনই নায়েত্রাকে বাসায় নিয়ে আসতে বলল সায়ান কে।বেশ আনন্দেই আসল ওরা,নাস্তা শেষে সায়ানের বাবা খুব শান্ত দৃষ্টিতে নায়েত্রার দিকে তাকালো এবং বলল,

– নায়েত্রা,নিঃসন্দেহে তুমি সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতী মেয়ে।তাই তোমার মাকে ডেকে পাঠায়নি,ব্যাপার টা তুমিই বুঝবে।

– কি হয়েছে আংকেল?

– আমরা তোমাদের সম্পর্কটাকে কে কোন পরিনতি দিতে পারছি না।ধর্ম আলাদা,এটা আমাদের সমাজে অনেক সমস্যা আর সমালোচনার জন্ম দিবে।

বাবার মুখে এসব কথা শুনে,সায়ান বেশ অবাক..

– বাবা,হোয়াট আর ইউ টকিং এবাউট? আর ইউ ক্রেজি?

– তোমার কথা না বললেও চলবে।

– কি বলতেছে তুমি এসব,যখন ডেট ফাইনাল করেছো,ম্যামকে আসতে বললা,তখন এসব ভাবোনি।এখন বিয়ে ভেঙে দিলে তোমার মান যাবে না?

– দ্যাটস নান ইওর বিজনেস,আই কান হ্যান্ডেল ইট প্রোপ্রালি!

– বাট,ইটস মাই লাইফ!( সায়ান খুব জোরে এবং রাগে কথাটা বলল)…

নায়েত্রা কি বলবে বুজতে পারছেনা,শুধু বাবা-ছেলের কথা শুনছে।সায়ানের বাবা ছেলেকে ধমক দিয়ে বলল,’ তার মা একজন বীরাঙ্গনা, তার মা কে পাকিস্তানিরা ২৫ মার্চ রাতে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো,এবং যুদ্ধের শেষে নাকি তার জন্ম।তার বাবার কোন ঠিক নেই।’নায়েত্রা চিৎকার দিয়ে উঠলো,’ এনাফ ইজ এনাফ,ইউ অলরেডি ক্রোস ইওর লাইন!’নায়েত্রা চলে যাচ্ছে,এই প্রথম ওর মায়ের পরিচয়ের জন্য চোখে জল আসলো,অথচ এতদিন এই পরিচয়ের জন্যই গর্ব করত।ও কখনো ভাবেই নেই এরকমটা কখনো হতে পারে।সায়ান পিছু ডাকলেও,সারা দেয়নি।আজ যে সারা দেবার দিন নয়।

বাসায় গিয়ে ওর মাকে সব খুলে বলল।এবং এই সম্পর্ক ও আর আগাতে চায়না সেটাও বলল।নাসরিন বেগম যথেষ্ট জ্ঞানী মহিলা।সে মেয়ের রাগ বুজতে পেরে তাদের সাথে একবার কথা বলতে চাইল,নায়েত্রাই বাধা দিয়ে বলল,’ যারা আমার মা কে সম্মান করতে জানে না,যারা একজন বীরাঙ্গনার চরিত্রে কলঙ্ক একেঁ দেয়,তুমি যাবে মা এইসব অসভ্যদের সাথে কথা বলতে,তুমি না মা যুদ্ধ করেছে দেশের সম্মানের জন্য!’মেয়ের কথা শুনে,থেমে যায় নাসরিন বেগম।নায়েত্রা তো তারই মেয়ে,সৎ কথা বলা তো তার রক্তে বইছে।সায়ানের সাথে নায়েত্রার একবার দেখা হয়েছে মাঝে,সায়নোও চায়না আর আগাতে।নায়েত্রা সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছে,ওর মুখে এসব শুনে।যে সায়ানকে ও চিনতো সে আসলেই ওর সায়ান ছিল না।

প্রায় দুমাস কেটে গেল,নাসরিন বেগমের কলেজে রি-ইউনিয়ন।এখন সে প্রিন্সিপাল, তাই খুব সুন্দর করেই সাজায় প্রোগ্রামটা।ছাত্র-শি­ক্ষদের পূর্নমিলনী, এখানে সবাই তাদের অভিজ্ঞতা, গল্প শেয়ার করে।সায়ান, নায়েত্রা দুজনেই ওর মায়ের কলেজে পড়েছে তাই ওরাও আমন্ত্রিত। নায়েত্রা প্রায় দু মাস পর সায়ানকে টেক্সট করল,’ রি-ইউনিয়নে এসো,তোমায় খুব দেখতে ইচ্ছে করছে!’সায়ানো রাজি হলো।এটাই সবথেকে বড় সুযোগ তার মায়ের কলঙ্ক মোছার।নাসরিন বেগমের কাছ থেকে সেইসব দিনগুলো নায়েত্রা অনেক আগেই শুনেছিল।কিন্তু কখনো কাউকে জানাতে হয়নি।আজ ও জানাবে,যে মা কখনো মঞ্চে পদক নিতে যায়নি,তাকে সে বলতে বাধ্য করবে কি ঘটেছিল সেদিন। ওর মায়ের সাথে যারা যুদ্ধ করেছিল তার একজন মজিদ,কলেজের সিন্ডিকেট সদস্য।তাই তাকেও ব্যাপারটা বুজিয়ে বলল,এবং সেদিনের অনুষ্ঠানে থাকতে অনুরোধ করল।

খুব হাসি-খুশিতেই অনুষ্ঠান শুরু হলো,সায়ান শুকিয়ে গেছে অনেক,নায়েত্রাকে এক পলক দেখলো।মেয়েটা দিব্যি চঞ্চল, যেন আজ ওর ঈদ।অনুষ্ঠানের এক পর্বে শুরু হল শিক্ষক,শিক্ষার্থী ও সিন্ডিকেট সদস্যদের অভিজ্ঞতা শেয়ার পর্ব।মঞ্চে নাসরিন বেগম,এই প্রথম সে তার কাজের বাইরে,নিজের ব্যক্তি জীবন কে তুলে ধরছে,’এতদিন আপনারা সবাই আমাকে একজন মমতাময়ী শিক্ষিকা দেখেছেন,আর জানেন আমি একজন বীরাঙ্গনা। কিন্তু কখনোই,এর পেছনের গল্পটা কাউকে বলিনি,কেননা যুদ্ধ করেছিলাম দেশকে বাঁচাতে,নিজেদের সম্মান বাঁচাতে,পদক আর মাসিক ভাতার জন্য নয়।

অথচ,কিছুদিন আগেই আমার এই পরিচয়ের জন্য আমার মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেছে,সেদিন নিজেকে ভীষন অসহায় লেগেছিল,এটা ভেবে যে এই দেশ আমায় এটা ফিরিয়ে দিবে।আপনাদের কাছে স্বাধীনতার এতো বছর পর এটাই ছিল পাওয়ার?’..

এবার মঞ্চে মজিদ সাহেব,সে নাসরিন বেগমের গল্পটাই তুলে ধরছে,’ আসলে আমার অভিজ্ঞতা জুড়ে নাসরিন ই রয়েছে,ও আমাদের ছোট বোনের মতো ছিলো,আমাদেরই এলাকায় রফিক ভাইয়ের সাথে ১৯৭১ সালের জানুয়ারী মাসে বিয়ে হয়েছিল তাদের।সেদিন ২৫ মার্চ রাতে অসংখ্য মা,বোনদের সাথে পাকবাহিনীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল নাসরিনকেও।আমরা ওদেরকে তার কিছুদিন পরই পাক বাহিনীর ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করেছিলাম।তখনই শুনেছি, ওরা অনেক মেয়েকে অত্যাচার করে মেরে ফেলেছিলো,কিন্তু নাসরিন অন্তঃসত্ত্বা ছিল বলে ওর গায়ে হাত দেয়নি,কিন্তু খাবার,পানি না দিয়েই ভীষন অত্যাচার করত,জুতা থেকে শুরু করে ওদের পোষাকো পরিষ্কার করাতো।যেদিন ওদের সবাইকে উদ্ধার করে আনলাম,ফিরে এসে রফিক ভাইয়ের কাছে আর আমরা ফিরিয়ে দিতে পারেনি নাসরিনকে।সেদিন রাতেই মেরে ফেলেছিল রফিক ভাইকে।এই যন্ত্রণা সহ্য না করতে পেরে, নাসরিন আমাদের অনুরোধ করল,আমাদের সাথে যুদ্ধে নিতে।আমাদের নিষেধ ও না মেনেই আসল আমাদের সাথে।প্রথমদিকে অবশ্য কয়েকটা অপারেশনেও ছিল,পরবর্তীতে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর নেয়নি। কিন্তু তবুও ও আমাদের সাথেই ছিল।বলা যায়,আমাদের মুক্তিক্যাম্পের খাবার রান্না বান্নার কাজটা নাসরিনই চালাতো।খুব ভাল লিখত ও,বিভিন্ন কবিতা,গল্প বলে ভাইদের সাহস জুগিয়েছিল এভাবেই।ও একজন নারী,যে দেশকে ভালবাসে,নিজের স্বামী-সন্তানকে ভালবাসে।আজ আমরা ওর সম্মান না রাখতে পারলে,সেটা আমাদের ব্যর্থতা,কোন বীরাঙ্গনার নয়।’

সকল শিক্ষার্থী, অতিথি কড়তালি দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,’ আমরা আপনাকে ভালবাসি ম্যাম,আমরাও হতে চাই আপনার মতো।’

নাসরিন বেগমের চোখে জল,নায়েত্রা হাসছে,আজ ওর ভীষন খুশি লাগছে।

সায়ান নায়েত্রাকে পেছন থেকে হাতটা ধরে টেনে নিয়ে বলল,

– আমার ভুলটা বুজেছি,আমি থাকতে চাই তোমার সাথে।

– হু!সায়ান তুমি একটা ভীরু,কাপুরুষ, তোমার রক্তে রক্তে বয় গ্লানি।

-আমাকে কি আরেকটা বার সুযোগ দেয়া যায়না?

– তোমার পরিবার তোমায় খুব ভালবাসে,আমিও আমার মা কে খুব ভালবাসি।ভেবো না আমি ভাল থাকবো।জানো সায়ান,প্রতিটা মেঘের পিছনে একটা আলো থাকে।যখন মেঘ করে,তখন আমরা সবাই অন্ধাকারটাকেই দেখি,মেঘের পরে যে আলোটা আছে,তার খোঁজ খুব কম মানুষই রাখে।এন্ড ইউ আর অন অব দেম,ইউ ডোন্ট ফাইন্ড দ্য লাইট বিহাইন্ড দ্য ক্লাউড! ‘

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.