অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তন

লেখকঃ ধ্রুব ইসলাম

১.

তাকে এ জীবনে আবারও দেখব সে কথা স্বপ্নেও ভাবি নি। একুশটা বছর কেটে গেছে, গুণে গুণে সাত হাজার ছ’শ সত্তুরটা দিন। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে তাকে স্মরণ করেছি, ঘুমের মাঝে স্বপ্নেও তার চেহারাটা ভেসে উঠেছে মানসপটে।

তখন চাকরির বয়স দুবছর। প্রেস্টিজিয়াস জব। ভাল মাইনে, অফিসের কাজে প্রায়ই দেশের বাইরে ট্যুর। ভালোই কেটে যাচ্ছিল। বিয়ে করেছি ছ’মাস।

বড় অদ্ভুত সে সময়, স্বপ্নের মত। বউকে মনে হত এক আশ্চর্য উপহার। নানা ছুতোয় অফিস থেকে আগে আগে বের হয়ে যেতাম, বউকে দেখার জন্যে। ইচ্ছে হত সারাক্ষণ বউয়ের হাত ধরে বসে থাকি। বাসায় ফিরে বউয়ের পিছে পিছে ঘুরতাম- রান্নাঘর, বসার ঘর, বারান্দা যেখানেই ও যেত আমি অনুসরণ করতাম। অবাক মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকতাম, একটা মানুষ কিভাবে এত অসাধারণ হয়। ওর চেহারা, হাঁটাচলা, কথা বলার ধরণ, ওর সবকিছু আমাকে দিনে দিনে এক মায়ার বাঁধনে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিচ্ছিল।

পিঠাপিঠি ছোটবোন আমাকে দেখে মুখটিপে হাসত। মা বিরক্ত হতেন। দুমাসের মাথায় আমরা আলাদা বাসা নিই, একরকম সংগ্রাম করেই। ভয় হত ওরা মোহনাকে আমার থেকে কেড়ে নেবে। ও হ্যাঁ, আমার বউয়ের নাম ছিল মোহনা। যে মোহনায় আমি এসে মিলেছিলাম সাগরে গিয়ে পড়ব বলে।

বিয়ের আগে কোন নারীর সংস্পর্শে আসি নি। মোহনা ছিল আমার জন্য নতুন এক অধ্যায়। এই যুদ্ধে কোন অস্ত্র আমার জানা ছিল না, প্রতিরোধের কোন ঢাল ছিলনা আয়ত্বে । মোহনার একের পর এক মোহ-বাণে আমি পর্যদুস্ত হয়ে গেলাম। বিয়ের ছ’মাসের মাথায় সম্পূর্ণ হেরে গিয়ে আমি এক পরাধীন জীবন কাটাতে লাগলাম। মোহনার প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম। বাসায় ফিরে ফোন বন্ধ করে রাখতাম, যদি বন্ধুরা চা-আড্ডার আসরে ডাক দেয়!

আমাদের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। অফিসের তখন বৃহস্পতি চলছে। তরতর করে বাড়ছে ব্যবসা। সবার ইনক্রিমেন্ট। নভেম্বরে অফিসে একটা বড় রদবদল হল। এতদিন আমি ছিলাম একমাত্র একাউন্টস অফিসার, নতুন একজন এসে যোগ দিলেন সহযোগী পদে।

অফিসের প্রথম দিনে তিনি সবার সামনে নিজেকে ইনট্রোডিউস করলেন। নাম সাইদুর রহমান। বয়সে আমার থেকে তিন চার বছরের বড়ই হবেন। পরিচয়ের পর সবার সাথে হাত মেলালেন। কেন যেন আমার বেলায় হাতের সাথে সাথে বুকও মেলালেন, একসাথে কাজ করতে হবে বলেই হয়ত। আমার রুম শেয়ারড হয়ে গেল নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট একাউন্টস অফিসারের সাথে।

সাইদুর সাহেব বয়সে বড় হলেও অফিসে যেহেতু আমার জুনিয়র, আমাকে আপনি করেই বলেন। আমিও আপনি ডাকি। তবে এক সপ্তাহ বাদেই আমি সাইদুর সাহেব বাদ দিয়ে সাঈদ ভাই বলা শুরু করলাম, উনি আমাকে ডাকতেন বড়ভাই।

আমি অফিসে বসে প্রতিঘন্টায় একবার মোহনার সাথে ফোনে কথা বলতাম। সাঈদ ভাই চলে আসায় একটু অস্বস্তি হতে থাকল। অবশ্য কিছুদিনের মধ্যে সেটা কেটে গেল। উনি আমাকে প্রচুর খ্যাপাতেন এই নিয়ে। মাঝে মাঝেই আমাকে ‘আঁচলে বাধা স্বামী’ বলতেন। সেগুলো আমার চামড়া ভেদ করত না। মোহনার সাথে ঘন্টায় একবার কথা না বললে আমার বুকের মধ্যে ধড়ফড় করত। হিসাবের কাজে ভুল হয়ে যেত।

সাঈদ ভাই আমাকে ছাড়া কখনও নিচে চা খেতে নামতেন না। দুজন মিলে চা খেতাম, সাথে টুকটাক গল্প। উনিও আমার মত বেনসন টানতেন। যা গল্প হত তার সবই প্রায় আমার বউকে নিয়ে। আমি এতটাই মোহাবিষ্ট ছিলাম যে ভীষণ নগ্ন ভাবে বউয়ের প্রশংসা করতাম। সেটা যে দৃষ্টিকটু তা আমার খেয়ালই হত না। উনি অবশ্য উনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিচ্ছুটি বলতেন না। প্রশ্ন করলেও এড়িয়ে যেতেন। তবে উনি যে বিবাহিত সেটুকু জানতে পেরেছিলাম।

২.

একদিন বিকেলে সাঈদ ভাই জোর করে আমাকে শাহবাগ নিয়ে গেলেন। আমি এক কথায় না করে দিয়েছিলাম বাসায় যেতে দেরি হয়ে যাবে বলে। মোহনাকে কিছুতেই আমি একটা মিনিটের জন্যও হারাতে পারি না। কিন্তু উনি আমাকে হাত ধরে টেনে রিকশায় তুললেন, আমি বাধ্য হলাম সাথে যেতে।

শাহবাগ পৌঁছে আমাকে উনি টি এস সি তে নিয়ে বসালেন। ভার্সিটি লাইফে কত সময় এখানে বসে কাটিয়েছেন সেটাকে একটু বাজিয়ে নিতেই নাকি আমাকে নিয়ে আসা। উনি একের পর এক গল্প বলে যেতে লাগলেন, আমার কান দিয়ে মনে হয় কিছু ঢুকল না। ফাঁকে ফাঁকে চা-সিগারেট চলছিল। মোহনার জন্য আমার বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করছে।

দুঘন্টা পর ছাড়া পেয়ে আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। রিকশাওয়ালাকে দুরন্ত চালাতে বলে আমি মোহনার আঁচলে ফিরে গেলাম।

আরেকদিন বললেন, চলেন সংসদ ভবন থেকে ঘুরে আসি। সঙ্গে সঙ্গে মোহনার ছবি আমার মনে ভেসে উঠল। আমি মিথ্যা করে বললাম, বাসায় কাজ পড়ে আছে। উনি ঘটনা বুঝতে পেরে ঠোঁট বাঁকালেন। তবে সেদিনের মত ছেড়ে দিলেন আমাকে।

দেখতে দেখতে আমাদের বিয়ের প্রথম এনিভার্সারী চলে আসল। অফিসের সবাইকে দাওয়াত করলাম বাসায়। সাঈদ ভাই ও আসলেন। বিকেলে কেক কাটা, রাতে ডিনার। সব মোহনার নিজ হাতে বানানো। সবাই মোহনাকে প্রশংসার তোড়ে ভাসিয়ে দিল, কিন্তু সাঈদ ভাই মুখটি পর্যন্ত খুললেন না। বাকি সবার সাথে ঠিক যেন মিশতেও পারছিলেন না তিনি।

মোহনার প্রতিটা প্রশংসা যেন আমারই এক একটা জয়। গর্বে আমার বুক ফুলে গেল। আমি পরম আত্মতৃপ্তিতে ভাসতে লাগলাম।

এই এক বছরে আমার রুটিনের একটুও এদিক ওদিক হয় নি। অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা বাসায় চলে আসি। বন্ধুদের সাথে প্রায় কোন সম্পর্কই নেই। জীবন জুড়ে কেবল মোহনা আর মোহনা।

এনিভার্সারীর ঠিক সাতদিন পর সাঈদ ভাই আমাকে নিয়ে ধানমন্ডি লেক এ গেলেন। জোর করতে হয় নি এই বেলা। উনার কন্ঠে কিছু একটা ছিল, আমি রাজি হয়ে যাই।

উনার জীবনের অনেক কিছু শেয়ার করলেন সেদিন আমার সাথে। উনার পারিবারিক জীবন সুখের নয়, বউয়ের সাথে বনিবনা নেই। প্রতিদিন ঝগড়া ঝাটি লেগেই থাকে। একারণেই উনি বাসায় সহসা ফিরেতে চান না। অফিস থেকে এখানে সেখানে ঘুরে রাত করে বাসায় যান।

সেদিন থেকে সাঈদ ভাইয়ের প্রতি আমি কিছুটা সিমপ্যাথি – এমপ্যহথি বোধ করতে থাকি।শুরু হয় আমার জীবনের নতুন এক অধ্যায়। আমি জানতাম না আমার জীবন এভাবে বদলে যাবে।

৩.

সাঈদ ভাইয়ের সাথে সপ্তাহে অন্তত তিনদিন করে বাইরে যেতে থাকলাম। টি এস সি, শাহবাগ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক, শহরের নতুন নতুন রেস্তোরাঁ, সংসদ ভবন সব জায়গা চষে বেড়াতে লাগলাম। আবিষ্কার করলাম, যে মানুষটা অফিসে প্রায় কারো সাথেই কথা বলে না, সে আসলে খুব ভাল গল্প করতে পারে। উনার পছন্দের গান, মুভি, খাবার সবকিছুই অবাককরা ভাবে আমার সাথে মিলে যাচ্ছে। গল্প করতে করতে রাত ন’টা বেজে যায় তবুও যেন কথা শেষ হত না আমাদের।

আমি বাসায় ফিরেও বউয়ের কাছে সাঈদ ভাইয়ের গল্প করতাম।আমরা একই জায়গায় বারবার ঘুরতে যেতাম, তবু একটুও অবসাদ লাগত না। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা বলে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দিতাম। একদিন সাঈদ ভাইয়ের সাথে বার এ গেলাম। বেশ কয়েকবার দেশের বাইরে গেলেও সে ই আমার প্রথম মদস্পর্শ।

সাঈদ ভাই একবার অফিস থেকে তিনদিনের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি গেলেন। আমি যেন পাড়হীন অথৈ সাগরে পড়লাম। অফিসে পুরোটা সময় অস্থির লাগে। বিকেল বেলাটা ভীষণ খালি খালি মনে হয়। প্রতিটা কাজে বিতৃষ্ণা লাগে। আমি একা একা শহরের রাস্তায় ঘুরলাম সে ক’দিন।

মাসখানেক পরে আবার অফিস ট্যুর পড়ল। এবার সিঙ্গাপুর। অফিস থেকে আমাদেরকে দুটো অপশন দেয়া হল, একটা, কমদামি হোটেল- সবার জন্য আলাদা রুম। আর দ্বিতীয়টা, দামি হোটেল, সেক্ষেত্রে বেড শেয়ার করতে হবে। সবাই নির্দ্বিধায় দ্বিতীয় অপশন বেছে নিল।

রাতে আমার সাথে থাকার ব্যবস্থা হল সাঈদ ভাইয়ের। সারাদিনের ধকল শেষে খুব ক্লান্ত তবুও ঘুম আসছিল না। একই বিছানায় উনার সাথে কেমন অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল। টুকটাক গল্প করে আমরা ঘুমিয়ে গেলাম।

পরদিন সেমিনার; আমার প্রেজেন্টেশন ছিল। সবার প্রশংসা পেলাম, সাঈদ ভাইও দিল খুলে প্রশংসা করলেন। লাঞ্চ শেষে আর কোন কাজ নেই, আমরা দুজন খুব ঘুরলাম। সেদিনও ঘুরাঘুরির ক্লান্তি নিয়ে দুজন হোটেলে ফিরলাম। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলাতেই ঘুম। দুজনেই মদ খেয়েছি বেশ খানিকটা।

মাঝরাতে কেন যেন ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার। ঘরে হালকা নীল আলো জ্বালানো। ঘরটাকে স্বপ্নের মত মনে হতে লাগল। পাশে সাঈদ ভাই মরার মতো ঘুমাচ্ছেন। উনি ঘুমিয়েছেন খালি গায়ে। ছয় ফুটের মত লম্বা পেটানো শরীর। আগে বোধহয় জিম করতেন, বুকের আর কাঁধের গঠন দেখে বোঝা যায়। কেমন বাদামি মোমের মতন গায়ের চামড়া, পেটে কিছুটা মেদ জমেছে। উনার পাজামা নেমে গেছে নাভির নিচে পর্যন্ত। বুকে পাতলা লোম। পেশীবহুল বাহু কেমন শৈল্পিকভাবে কাঁধের সঙ্গে মিলে গেছে। আমার শরীরে কি যেন খেলে গেল, আমি সাঈদ ভাইকে জড়িয়ে ধরলাম। উনার ঠোঁটের সাথে ঠোঁট চেপে ধরলাম।

আচমকা সাঈদ ভাই সজাগ হয়ে গেলেন। উনার চোখ বিস্ফোরিত, ‘ইফতেখার ভাই, এ কি করছেন?’ আমি লজ্জা পেয়ে সরে আসলাম। ‘সরি’ বলে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়লাম। উনিও আর কিছু বললেন না। বালিশে মাথা রেখে আবারও ঘুমিয়ে পড়লেন।

সিঙ্গাপুরে আরও একটা দিন, আরও একটা রাত আমরা থাকলাম, একই ঘরে। আমি সাঈদ ভাইয়ের চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না, লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছি। নিজেই জবাব খুঁজে পাচ্ছিলাম না কি করলাম এটা! কেনই বা করলাম? মনে হাজারো প্রশ্ন নিয়ে সেরাতে বিমানে চড়লাম।

দেশে ফিরে আমাদের বন্ধুত্ব বেশ খানিকটা আড়ষ্ট হয়ে গেল। দুজনের কথা হয় খুব কম। নিদারুণ লজ্জায় আমি কিছু বলতে পারি না, সাঈদ ভাইয়ের পক্ষ থেকেও সহজ হওয়ার কোন পদক্ষেপ দেখি না। অফিস চালানোর জন্য যেটুকু না বললেই না সেটুকুই কথা বলি আমরা। অফিস শেষে বাইরে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

আমি কিছুতেই স্বস্তি পাই না। সাঈদ ভাইয়ের সাথে কথা বলার জন্য মন ইতিউতি করতে থাকে, ইচ্ছে করে উনার সাথে ঘুরতে যাই, খেতে যাই কোন রেস্তরাঁ তে। কিন্তু কিছু বলতে পারি না, আর কিইবা বলব, আমি নিজেই বুঝতে পারি না এসব কি হচ্ছে। সাঈদ ভাইয়ের জন্য কেন আমার এরকম লাগবে? বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবথেকে কাছের যে বন্ধু তার সাথেও শেষ দেখা হয়েছে বছরখানেক আগে। কই তার জন্য তো এমন লাগে না। তাহলে সাঈদ ভাইয়ের জন্য এমন লাগবে কেন? না থাকল বন্ধুত্ব।

একমাস কেটে গেল। সাঈদ ভাই এখনও আমাকে দেখলে মুখ শক্ত করে রাখেন। নিতান্ত প্রয়োজন বাদে কথা বলেন না, বললেও হ্যাঁ-হুঁ দিয়ে সারেন।

৪.

তারপর একদিন, আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেপ্টেম্বর এর ২৫ তারিখ, আমি আর সাঈদ ভাই দুজনেই নিজের নিজের টেবিলে কাজ করছি। অফিস প্রায় শেষের দিকে, সাঈদ ভাই আমাকে হঠাৎ বললেন, ‘ইফতেখার সাহেব কক্সবাজার যাবেন?’

আমি মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলাম না, উনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। উনি ফের বললেন, ‘কক্সবাজার যাবেন? শুধু আপনি আর আমি। দুজনেরই তো অনেক ছুটি জমা আছে।’ জানি না কেন যেন আমার শরীরে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল। মনে হল দীর্ঘদিনের একটা চাপা পাথর বুকের উপর থেকে সরে গেল। আমি দ্বিতীয় কোন চিন্তা না করে রাজি হয়ে গেলাম।

মনের মধ্যে কোথাও অপরাধবোধ কাজ করছিল কিনা জানি না, মোহনাকে মিথ্যা বললাম। বললাম অফিসের কাজে চট্টগ্রাম যেতে হচ্ছে। একটু মন খারাপ করলেও মেনে নিল ও।

নির্দিষ্ট দিনে যখন কক্সবাজার পৌঁছলাম তখন দুপুর। হোটেল ঠিক করা ছিল না। দেখেশুনে হোটেল পছন্দ করলাম, ততক্ষনে বিকেল হয়ে গেছে। ফ্রেশ হয়ে দুজনে ছুটলাম বিচের দিকে।

রাতে রুমে ফিরলাম অনেক দেরি করে। দরজা বন্ধ করার পর থেকেই বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল আমার। ঘরে পিনপতন নীরবতা, কেউ কোন কথা বলছি না। অস্বস্তি দূর করতে আমি টিভি ছেড়ে দিলাম।

এখনও আমার স্পষ্ট মনে আছে, সে স্মৃতি কখনও ভুলবার নয়। বাইশ বছরেও এতটুকু মলিন হয় নি, মনে হয় এইত সেদিনের ঘটনা। সাঈদ ভাই বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমে গেলেন। ফিরে এলেন দুমিনিট বাদে, আমি বিছানায় বসা, টিভির দিকে চোখ।

উনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি দম বন্ধ করে ফেলেছি। সাঈদ ভাই দুহাতে আমার মুখখানা তুলে কতক্ষণ ওইভাবে চেয়ে থাকলেন। হঠাৎ গাছের ডালে বসে থাকা মাছরাঙা যেভাবে পুকুরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, উনি আমার দুই ঠোঁটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। নিচের ঠোঁটখানা উনার মুখের মধ্যে চালান করে দিলেন নিমেষেই। মনে পড়ে, এতটুকু বাঁধাও আমি দেই নি। কুসুমের মত গলে গিয়েছিলাম সেদিন।

এত ভাল লাগছিল, সাঈদ ভাইয়ের ঠোঁটদুটোকে মনে হচ্ছিল রসের আধার। যতই লেহন করি অমিও সুধা যেন এতটুকুও মলিন হচ্ছিল না। সেদিন ক্ষুধার্ত ভিখিরির মত সাঈদ ভাইয়ের সারা শরীরে জিহ্বা চালিয়েছিলাম। দুটো পুরুষ শরীর যে এভাবে মিশে যেতে পারে সেটা ছিল আমার ধারণার অতীত। অথচ সেদিন দক্ষ খেলোয়াড়ের মত উনার শরীর আমি চষে বেড়ালাম।

বোকার মত প্রশ্ন করলাম, এই কদিন আমাকে এমন কষ্ট দিলেন কেন? স্বভাবিক কথাবার্তা তো চালিয়ে যেতে পারতেন!

সাঈদ ভাই তার বিশাল বুকের মধ্যে আমাকে আরও খানিকটা পিষে নিয়ে বললেন, তোমার পরীক্ষা নিচ্ছিলাম, ইফতি বাবু। আমার নিজের সাথেও কিছু বোঝাপড়া ছিল।

কক্সবাজার থেকে ফিরলাম ৪ দিন পর। প্রতিটা দিন সকাল বিকেল রাত সৃষ্টির আদিমতম খেলা খেলে গিয়েছি নতুন নতুন নিয়মে।

ঢাকা ফিরে যখন মোহনার সামনে দাঁড়ালাম, একরাশ অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করে নিল। কিন্তু আমি তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। চারপাশ বিচার করবার শক্তিটুকু আমার ছিল না। সার্বক্ষণিক এক ঘোরের মধ্যে থাকতাম। যতক্ষণ অফিসে থাকতাম মরুভূমিতে পিপাসার্ত মুসাফিরের মত সাঈদ ভাইয়ের সাথে মুহূর্তগুলোকে পান করতাম।

অফিস শেষে ঘুরে বেড়ানো নিয়মিত রুটিনে পরিণত হল। বাইরে গিয়ে একমুহূর্ত কেউ কারও হাত ছাড়তাম না। জীবনটাকে মনে হচ্ছিল রঙিন বর্ণালী।

এতকিছুর পরও অতৃপ্তি কাজ করত। দুজন যখন বাসার পথ ধরতাম ভেতরটা ছিঁড়ে যেত। যদি সম্ভব হত নিজের কিছু অংশ সাথে করে দিয়ে দিতাম। শারীরিক মিলনের সুযোগ খুব কমই হত। অপূর্ণতা নিয়েই আমরা ভালবেসে যাচ্ছিলাম।

হঠাৎ একটা সুযোগ চলে আসল। আমি আর মোহনা যে বাসায় থাকতাম তার উপরের তলায় একটা ফ্ল্যাট খালি হল। সাঈদ ভাই সে বাসায় উঠে পড়লেন। আমরা দুজনেই তীব্র খুশি হলাম। তখনও জানি না কি দুর্ভাগ্য অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

একসাথে অফিসে যাই, অফিস থেকে ফিরিও একসাথে। বাসায় কিছুক্ষণ মোহনাকে সময় দিয়েই আমি উপর তলায় চলে যাই। মাঝরাত পর্যন্ত চলে আমাদের কথা, আড্ডা। সাঈদ ভাইয়ের বউ মাসের বেশিরভাগ দিনই মায়ের বাড়িতে থাকতেন। তাদের কোন ছেলেমেয়েও ছিল না। পুরো বাসাটা আমরা দখল করে নিতাম। আমরা দুজন দুজনকে উপভোগ করতাম।

মোহনার সাথে আমার কথাবার্তা কমই হয়। সে মুখ ফুটে কিছুই বলে না তবে তার আচরণে বোঝা যায় আমাদের দুইজনের এই অবিরাম মাখামাখি সে ভাল চোখে দেখছে না। এর মধ্যে একদিন জানাল, সে গর্ভবতী। সত্যি বলতে, পৃথিবীতে আমারই এক নতুন সত্তা জন্ম নিচ্ছে এ সংবাদে আমি খুশি হলাম না। মনে হচ্ছিল একরাশ নতুন ঝামেলার উদয় হচ্ছে। মুখে কিছু না বললেও মোহনা ব্যাপারটা বুঝতে পারল, সে বুদ্ধিমান মেয়ে।

আমার জীবনযাপনে কোন পরিবর্তন হল না। এই সময়টাতে আমার মোহনার পাশে থাকবার খুব দরকার ছিল। কিন্তু আমি সাঈদ ভাইয়ের প্রেমে অন্ধ হয়ে ছিলাম, স্বামী হিসেবে করণীয় কিছুই পালন করলাম না। আমার বুদ্ধি লোপ পেয়েছিল।

আমি ঘরে ফিরতাম মাঝ রাতে। মোহনা ওই অবস্থায় বাসায় আক্ষরিক অর্থেই একা পড়ে থাকত। আমি আত্মসুখে এতটাই মশগুল ছিলাম এ নিয়ে সামান্যতম অপরাধবোধ কখনও কাজ করে নি। বাসায় ফিরলে পরে ও নিষ্পলক চেয়ে থাকত আমার দিকে। এখন বুঝি কি লেখা থাকত সে দৃষ্টিতে কিন্তু তখন পড়ে দেখবার অবসর হয় নি, অথবা প্রয়োজন বোধ করি নি।

সাঈদ ভাইয়ের বউ বাসায় না থাকলে ঘরে ফিরতে আমার আরও দেরি হত। আদিম খেলা চলত গভীর রাত পর্যন্ত। সাঈদ ভাইয়ের শরীরের প্রতি যে নিঃসীম আকর্ষণ তাকে ছিন্ন করে আমি মোহনার কাছে ফিরতে পারতাম না।

৫.

সবকিছুই, যার শুরু আছে তার শেষ আছে। হয়ত নিষিদ্ধ প্রেমের সমাপ্তি তার সূচনাতেই লেখা থাকে। অবধারিত দুর্ঘটনার বীজ বপিত ছিল সেই ঘটনাময় প্রথম মিলনক্ষণটিতে। আমাদের এই অভিসারও একদিন সমাপ্তিতে আসল। কিন্তু প্রস্তুত ছিলাম না আমরা কেউই, যে দুর্ঘটনার সম্মুখীন আমরা হলাম তার জন্য তো নয়ই।

ও ছিল প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সরাসরি আমাকে কিছু বলত না। মনে মনে হয়ত সন্দেহ করত, তবে আমার এ পরিবর্তন কোন নারী সংসর্গে নয় জেনে হয়ত নিজেকে কিছু একটা বুঝিয়ে শান্ত করত। কিন্তু সেদিন ও তার সমস্ত ভদ্রতার বাঁধ ভেঙ্গে ফেলল, ব্যক্তিস্বাধীনতার ফাঁকা গরিমা সেদিন কোন প্রতিরোধ করতে পারল না।

মোহনার তখন অ্যাডভান্সড প্রেগন্যান্সি। সাঈদ ভাইয়ের বউ সেদিন বাসায় ছিল না। রাত দুটো বেজে গেছে। কিন্তু আমাদের অমিওসুধাপান যেন শেষ হচ্ছিল না কিছুতেই। সাঈদ ভাইয়ের ঠোঁট, কপোল, বাহু, বুক, উদর, ঊরু সব যেন মনে হচ্ছিল অনাঘ্রাত। ওই বাহুডোর ছিঁড়ে আমি আসতে পারছিলাম না কোনমতেই। মোহনা কয়েকবার ফোন করে ফেলেছে বাসায় আসার জন্য। আমরা অগত্যা উঠলাম। চরম বিরক্তি দুজনের মধ্যেই।

সাঈদ ভাই আমাকে এগিয়ে দিতে আসলেন নিচের তলায়। অত রাত, সিঁড়িতে কেউ নেই। একতলা নিচেই আমার বাসা। অর্ধেক সিঁড়ি নেমে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম, বাকি পথটুকু কিছুতেই আসতে ইচ্ছে করছে না। যদি পারতাম দুজনে এক শরীর হয়ে মিশে যেতাম।

আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম সাঈদ ভাইয়ের বুকে। ওর ওষ্ঠাধর আমার দখলে নিয়ে নিলাম। এতরাতে কেউ আসবে না। সময়জ্ঞান লোপ পেয়েছিল, মনে কামনা এ চুম্বন যেন অনন্তকাল স্থায়ী হোক। কতক্ষণ ওভাবে ছিলাম জানি না, একসময় আলাদা হলাম দুজন।

ঘুরে দাঁড়াতেই সহস্র বজ্রাঘাতে আমি অবনীল হলাম। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে মোহনা, আমাদের দিকেই দৃষ্টি। ওই আধোছায়াতে ওর মুখটা স্পষ্ট নয়, কিন্তু সে দৃষ্টির অর্থ পড়ে নিতে আমার একটুও অসুবিধা হয় নি। ততক্ষণে সাঈদ ভাইও মোহনাকে খেয়াল করেছেন, উনি প্রস্তরমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনজনের কারো মুখে কথা নেই। আমি আস্তে আস্তে মোহনার দিকে পা বাড়ালাম।

সেদিন মোহনার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। ভদ্রতার মেকী মুখোশ খুলে সে বলেই ফেলল, কি পেয়েছ তুমি এই সাঈদ ভাইয়ের মধ্যে? আমিও নিজেকে একই প্রশ্ন করলাম। মোহনা আমার স্ত্রী; ব্যক্তি হিসেবে অসাধারণ সে। তবে কেন? কেন? নিজেকে বা বউকে, কাউকেই জবাব দিতে পারি নি সেদিন।

৬.

দুদিন অফিস গেলাম না। ঘর থেকেও বের হলাম না। তৃতীয় দিনে অফিস গিয়েছি, ঘন্টাখানেক বাদেই বড় সাহেবের ঘরে ডাক পড়ল। যেতে গিয়ে দেখি সাঈদ ভাই ওখান থেকে বের হচ্ছেন। চোখাচোখি হল, কোন কথা হল না।

বড় সাহেবের মুখ থমথমে। উনি বললেন,

– ইফতেখার সাহেব, আপনি বুদ্ধিমান মানুষ। আপনাকে আমি কেবল দুটি কথাই বলব…..এক, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, উনি গতকাল অফিসে এসেছিলেন। আর দ্বিতীয়টি হল, আপনি অফিসে একজন খুব ভাল এমপ্লয়ী ছিলেন। এত দ্রুত আপনাকে আমাদের হারাতে হবে ভাবি নি।

ওইদিনের পরে আর সাঈদ ভাইয়ের সাথে কোন কথা হয় নি। উনি দুদিনের মধ্যেই বাসা ছেড়ে চলে যান। আমি নতুন চাকরি নিয়ে যাই চট্টগ্রাম, সাঈদ ভাই কোথায় চাকরি নেন কখনো জানার সুযোগ হয় নি।

মোহনার সাথে বিয়েটা আমার টিকে যায়। সেই প্রথম বছরের ভালবাসা আর কখনো ফিরে আসে নি, কিন্তু আমারা চালিয়ে নিয়েছিলাম। একধরণের অভ্যস্ততায়, পারস্পরিক নির্ভরতায় আমাদের সংসার চলতে থাকে। আমাদের সন্তানদেরকে বড় করতে আমরা একরকম মানিয়ে নেই নিজেদেরকে। এভাবেই পার করে দেই একুশটা বছর। আমার পদস্খলন হয়ত হয় নি আর কখনো, কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হত, আই এম লিভিং সামওয়ান এলসে’স লাইফ।

৬.

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিলাম, এখন মনে নেই কয়দিন আগে। শুনেছি চারদিন অজ্ঞান ছিলাম। বড়সড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায় পথে। তারপর কিছু মনে নেই আর। জ্ঞান ফিরে নিজেকে আবিস্কার করি হাসপাতালের আই সি ইউ তে।

আমার আই সি ইউ তে দশটা বিছানার ছয়টিতে রোগী। এর মধ্যে আমি আর আরেকজন বিছানায় বসতে পারি, বাকি চারজন অজ্ঞান। আই সি ইউ এর ভেতরটায় কেমন শান্তি শান্তি পরিবেশ, ডাক্তার খুব শান্তভাবে রোগী দেখেন। হয়ত মরণাপন্ন রোগী ভেবেই ভাল ব্যবহার করেন। বিকেলে একঘন্টার জন্যে মোহনাকে, আমার ছেলে দুটোকে দেখতে পাই।

গতরাতে আমার ডানপাশের বিছানার রোগী মারা গেলেন। আমি খুব আগ্রহভরে মৃত্যুর সাথে ডাক্তারের লড়াই দেখলাম। ডাক্তার যখন হেরে গেলেন আমি তার চোখের ভাষা পড়বার চেষ্টা করি। সে চোখে কেবল অভ্যস্ততাই লেখা ছিল।

সকালে ওই বিছানায় নতুন রোগী আসল। দুঘন্টা ডাক্তার তাকে নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকলেন। রোগীর অবস্থা স্ট্যাবল করে ডাক্তার নার্স যখন সরে গেলেন আমি বিছানায় উকিঁ দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম।

আমার হাতপা ঠান্ডা হয়ে গেল। একুশ বছরে মানুষের চেহারা নিশ্চয় অনেক বদলায়। কিন্তু যাকে প্রতিনিয়ত ঘুমে ও জাগরণে স্মরণ করেছি, হৃদয়ের মাঝে জমিয়ে রাখা ছবি প্রতিদিন বের করে দেখেছি, ধূলো মুছেছি, তাকে, সে যে অবস্থায়ই হোক না কেন, চিনতে এক মুহূর্তের বেশি দেরি হবে, তা কিভাবে হয়!

তবুও আজ আমি অস্থির হলাম না। ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, উনার কি হয়েছে?

– লাং ক্যান্সার উইথ ব্রেইন মেটাস্টেসিস। ক্যান্সার টা ব্রেইন এ এমনভাবে ছড়িয়েছে আমরা তার জ্ঞান ফেরাতে পারছি না।

আমি কোন উত্তর দিলাম না। আর কোন প্রশ্নও করলাম না। অদৃশ্য ঈশ্বরের দিকে চেয়ে আমি বাঁকা হাসি দিলাম।

বহুদিন আগে এক ডাক্তার আমাকে বলেছিল, ইফতেখার সাহেব। স্মোকিং টা ছেড়েই দেন। দুইজন স্মোকারের একজন স্মোকিং রিলেটেড অসুখে মারা যায়।

নাহ! আমার স্মোকিং রিলেটেড কোন অসুখ কখনো হয় নি। না হার্টের কোন অসুখ, না ফুসফুসের কোন রোগ। কখনও অসুস্থই হই নি। কিন্তু আমি তো ছিলাম দুইজনের একজন মাত্র। আর আমরা দুজনেই খুব স্মোকিং করতাম। ওয়ান অফ আস হ্যাভ টু পে দ্য প্রাইস।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.