অবুঝ আঁধারে কেন মরা কাঁদা

লেখকঃ অরিয়ন অরিয়ন

ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিক। আসি আসি করতে করতে শীত এরই মধ্যে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে।
ফুলজান বেওয়া, আয়েশা, লক্ষ্মী আর মদীনাদের তিনদিন ধরে ছুটি। কিছু কিছু রাতে শীতের প্রকোপ বেড়ে যায়। তাদের অবশ্য এতটা শীত লাগেনা। আসলে তাদের শীত লাগতে নেই। দিনের পর দিন উলঙ্গ থাকতে থাকতে যাদের চামড়াই শরীরের কাপড় হয়ে গেছে তাদের গরম-শীত থাকতে নেই। তবু কোন কোন রাতে শীতের অত্যাচার এমন বেড়ে যায় যে তখন মনে হয় বাইরে বরফ পড়ছে।

ফুলজান হাতের সাথে হাত ঘঁষতে ঘঁষতে শরীর খানিকটা গরম করতে চেষ্টা করে। তারপর হাতদুটো গালে লাগিয়ে বলে, “ওই সুরমী। দেখ্ না বাইরে কি বরাক টরাক পড়ে?”
এত বড় আগুনের পরও যে ঢাকা শহরের শীত কমেনি, সেটাই তাদের আলোচনার বিষয়।
গত তিনদিন তাদের অঘোষিত ছুটি। কোন অফিসার আসছে না, নতুন কোন উপায়ে তাদের অত্যাচারও করছে না। কেমন একটা অবিশ্বাস আর বিস্ময় কাজ করে তাদের মধ্যে। কিন্তু অবিশ্বাস্য ব্যাপারই তাদের কাছে আশীর্বাদ। বিশ্বাস হোক আর না-ই হোক —- তাতে কী! এই কয়েকটা দিন যদি একটু বসে থেকে শরীরে কাপড় জড়িয়ে রাখা যায় তাহলে বিশ্বাসে অবিশ্বাসে কী আসে যায়?

ফুলজান কিছুটা বুঝতে পারে। তার বিশ বছরের শহরে থাকার অভিজ্ঞতা তাকে আন্দাজ করিয়ে দেয়। সে সহজেই বুঝতে পারে : যুদ্ধের অবস্থা বিশেষ সুবিধার না। তার চেয়েও বড় কথা এই ক্যাম্পের শয়তানগুলোর নিজেদের মধ্যে কোন ঝামেলা হয়েছে। এবং ঝামেলা গুরুতর।

গত কয়েকদিনের থমথমে আবহাওয়ার মধ্যে কোর্ট মার্শাল কথাটা কয়েকবার শুনেছে। সবার মাঝে গোপন করার ফিসফিসানি আর চাপা ব্যস্ততা। লুকাতে চেষ্টা করছে সবাই। কিন্তু সেই ব্যর্থ চেষ্টা তাদের বিকারকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। ফুলজানের অভিজ্ঞ চোখকান কে ফাঁকি দিতে পারেনা । কিন্তু এমন একটা ভাণ করে থাকে যে সে চোখেও দেখে না,কানেও শোনে না । এইতো গতকাল সেদিন অফিসারদের একজন চিৎকার করছিল “লা’নত, লা’নত ” বলে ।
ফুলজান তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে । কথাগুলো বলেই আড়চোখে অফিসার তার দিকে তাকালো । ফুলজান মরা কাঠের মত দাঁড়িয়ে , মুখেও কোন নাড়াচাড়া নেই । বড় বড় চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল নির্লিপ্ত উদাসীনতায় । কিন্তু মনে মনে হাসে । এদের উপর লা’নত আসবে না তো কাদের উপর আসবে ?
.

চারদিনের মাথায় ঘটনা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হল । টিঙটিঙে সিপাহী আশরাফ ক্যাম্পের সবাইকে সুর করে নির্দেশ শুনিয়ে গেলো । অনেকটা গুনগুন করে বাদশাহি এলান পড়ার মতন —- গড় গড় করে উর্দু – ইংরেজি মিশিয়ে । উচ্চপদস্থ অফিসার থেকে কুক – বাবুর্চি – মালী —- এমনকি বন্দী মেয়েদের ঘরে পর্যন্ত বলে গেলো : “মিলিটারি এ্যাক্ট এন্ড রেগুলেটরি অর্ডার নং… সোবাহান বেলুচ কি গাদ্দারী কেস । আজ বিকেলে কোর্ট মার্শাল । সকলে উপস্থিত থাকতে বাধ্য ।
ফুলজানের মাথা কেমন চক্কর দিয়ে ওঠে । সোবাহান বেলুচ ? আহা , বড় ভালা একটা অফিসার । দিল-দরিয়া বাচ্চা একটা পুলা । শয়তানদের মধ্যে থাকলেও মনটা নরম আছে । এই ছেলের গাদ্দারী কেস !

*
শরীরে তিন মগ পানি কোন মতে ছিটিয়ে গোসল শেষে সামান্য দুই টুকরা কাপড় দিয়ে শরীর ঢেকে সবাই একত্র হয় । ফুলজান , কুলসুম , আয়েশা , মদীনা , লক্ষ্মী , রূপালী, সুরমা । শরীর ঢেকে রাখার কোন চিন্তাই নেই ফুলজানের । বুকের কাপড় সরিয়ে চুল মুছতে শুরু করে । সবাই চোখ নামিয়ে নেয় , শুধু মদীনা একটু অনুযোগ তোলে , “খালাম্মা ! তুমি যে কী ! “
– কি ? কি আবার ? কী আর বাকি আছে ? কী দেখবি লা ? আমার গতরে কি আর আছে । এই রোজ কেয়ামতের সময় লাজ -শরম দিয়াই বা অইবো! “
একপাশের চুল সরিয়ে অন্যপাশের চুলে হাত দেয় । চুলও বেশি নেই আজকাল । ভালোই হলো । একসময় চুল কোমড়ে পড়তো । দানবদের টানাটানিতে চুল যেতে যেতে কয়েক গোছা পাটের আঁশ হয়ে গেছে ।
চুল মুছতে মুছতে তার কণ্ঠে উত্তেজনা ফুটে ওঠে , “কিরে । সন্ধ্যা সময় যাইবিনা ? “
সামান্য সময়ের এই আসরে ফুলজানই একমাত্র বক্তা , বাকি সবাই শ্রোতা ।
আয়েশা ক্লান্ত মুখে বসে আছে , চোখের নিচে কান্নার ছাপ স্পষ্ট । লুকানোর কোন চেষ্টা করছে না । সুরভী মেঝেতে পা দিয়ে কি যেন একটা আঁকতে চেষ্টা করছে । আর বাকি সবাই ফুলজানের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে ।
ফুলজান গলা খাদে নামিয়ে আনে । তারপর মেয়েলী ফিসফিস গলায় বলে , “সোবাহান বেলুচের কাহিনী কী বল্ তো? অত ভালা একটা মানুষ । কেয়ামতের সময় অবশ্য ভালা মানুষেরাই বিপদে পড়ে । এখন তো রোজ কেয়ামত হাশর । এই দেখনা , লক্ষ্মীর মতন ভালা মেয়েছেলে কেউ আছে ? তবু লক্ষ্মীর কত কষ্ট ! “বলতে বলতে গলাটা ধরে আসে তার । লক্ষ্মীও মাথা নিচু করে রাখে ।
“যাউকগা । সোবাহান বেলুচের গাদ্দারী কেস । আমার কী মনে হয় জানোস ? সোবাহান সাব পালাইতে চাইছিল । পালাইবো না ? এই বিশ পঁচিশ বছরের পোলা এই নরক গুলজার সহ্য করতে পারেনাই ।
ওই মদীনা । তুই যাইবি তো ? এখন দুইটা পাকনা চুল এনে দে ! “

মদিনা পাকা চুল বেছে দেয় , চুল তুলে ফেলার সময় বড়ই আরাম পাওয়া যায় । আরামে চোখ বন্ধ করে ফুলজান সোবাহানের কথা চিন্তা করে । মনের মধ্যে কেমন ভয়ও হয় । জানোয়ারগুলোকে সে দুচোখে দেখতে পারেনা, কিন্তু সোবাহানের কথা আলাদা ।

প্রথমদিন ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে সে প্রায় চেতনা হারিয়ে যখন শুয়ে মরার চিন্তা করছে , তখন সোবাহান বেলুচ পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে । ফুলজানের তখন ভেতর বাহির কোন বোধ নেই । মাথার ভেতর শুধু ভোঁতা ধরণের একটা শব্দ হচ্ছে । পাকিস্তানী কুত্তারা একের পর এক এসেছে আর তার শরীর আছড়িয়ে কামড়িয়ে রেখে গেছে । নতুন একজন এসেছে দেখে সে চোখ বন্ধ করে আবার ক্ষত বিক্ষত হওয়ার প্রস্তুতি নিল । প্রবল ভয়ের আতঙ্ক নিয়ে দুমিনিট চোখ বন্ধ রাখা দুবছরের সমান । দ্বিধা আর আতঙ্ক নিয়ে ধীরে ধীরে সে যখন চোখ খুললো তখন দেখলো
মানুষটা একটা আপেল হাতে নিয়ে বসে আছে , আর হড়বড় করে কি যেন বলতে চাইছে ।

অফিসার দেখতে বেশ ছোট । গায়ের রং আপেল নাশপাতির মত । চটের বেড়া দেওয়া অন্ধকার ঘরে ভাল করে দেখা যায়না । তবু যতটুকু বুঝতে পারল তাতে মনে হল, কত আর বয়স হবে ? কাশেমের সমান সমানই হবে বোধহয় । ভাবতে ভাবতে তার ঘেন্নাই হল । হাজারহোক এই লোক পাকিস্তানি অফিসার । তার কাশেম আর যাই হোক,এদের মত খারাপ না ।

ছেলেটা তখনো একভাবে বলছে । ফুলজান প্রথম প্রথম ধরতেই পারেনি কিসব শব্দ বলছে । উর্দু না । সে চালিয়ে নেওয়ার মত উর্দু জানে । বেশ কয়েকবার শুনে শব্দগুলো ধরতে পারলো , “মাইজি, আপেল বাওয়ার ? বাওয়ার ? আপেল ! আপেল ! বাওয়ার মাইজি? “

ফুলজানের তখন চোখ খোলবারও শক্তি ছিল না । তবু শরীরের সবটুকু শক্তি এককরে উঠে বসলো । কারণ , তার মনে হচ্ছিল আপেলটায় বিষ মেশানো আছে সেজন্যই উঠলো । প্রবল ঘৃণা নিয়ে আপেলটার দিকে তাকালো । তারপর খপ করে কেড়ে নিয়ে কামড় বসালো । মন থেকে সে চাইছে আপেলে যেন বিষ মেশানো থাকে আর সেটাতেই যেন মৃত্যু হয় । এমন অত্যাচারের চেয়ে মরণ কত ভাল !
কয়েক কামড় খেয়ে সে একটু প্রকৃতিস্থ হল , তারচেয়েও বেশি নিশ্চিত হল । তার কেন যেন মনে হতে লাগল সে মারা যাচ্ছে । সে সত্যিই মারা যাচ্ছে । আপেলে বিষ মেশানো থাকতেই হবে , আর সে নিশ্চয়ই মারা যাবে ।

মরার আগে সে সামনে বসে থাকা ছেলেটার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো । কেমন শান্তশিষ্ট হয়ে ছেলেটা বসে আছে । দেখলে মনেই হয়না এরা পাকিস্তানি । ফুলজান নিজেও পাকিস্তানী । কিন্তু এই পরিচয় সে ঘৃণা নিয়ে মুছে ফেলেছে ।
সামনে বসে থাকা ছেলেটাকে তার জাঁদরেল অফিসার বলে মনে হল না । বসে থাকার মধ্যে কেমন শান্তশিষ্ট ভাব । আচার ব্যবহারেও মনে হয় শান্তশিষ্ট । শেষ পর্যন্তও ফুলজানের মনে হচ্ছিল আপেল নিতে গেলে এই নচ্ছার অফিসার তাকে চড় থাপ্পড় দিবে । আশ্চর্য ! মানুষটা মারেনি । সারাক্ষণ সেই অদ্ভুত শব্দগুলো বলছিল ।
ফুলজান সেদিন মারা যায়নি । আপেলে বিষ মেশানো ছিলনা বলেই সে মরেনি । আজকে সেই ভাল অফিসার মানুষটার কোর্ট মার্শাল দেখার জন্যই বোধহয় সে বেঁচে ছিল । এমন মানুষের কোর্ট মার্শাল হবে? ফুলজানের বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে , ” আল্লাহ । ও আল্লাহ । তুমি কি কানা ? তুমি কি কিছুই দেখোনা ? “

*

মাঠের একপাশে গোল করে সবাই দাঁড়িয়ে আছে । সামনের দিকে লম্বা করে চেয়ার পাতা — অফিসারদের জন্য । তাদের চারপাশে গোল করে সৈনিকরা দাঁড়িয়ে । এক কোণায় মেয়েদের জায়গা । মাঠে আসার জন্য তাদের শরীরে লুঙ্গি
উঠেছে ।
গোলের ঠিক মাঝখানে সোবাহান বসে আছে । তার পাশে , মাথা নিচু করে আরেকজন ।
ফুলজান খুব গভীরভাবে সোবাহানের মুখ দেখতে চেষ্টা করে । মুখটা নিচু করা । দেখা যায়না । নইলে সোবাহানের মুখ দেখে বুঝতে চেষ্টা করতো কাশেম শেষসময়ে কিরকম চিন্তিত ছিল।

সোবাহানের মুখ দেখা যাচ্ছে না ঠিকই , তবে সমস্ত শরীরের পাথরের মত স্থিরতা সবার চোখে পড়ছে । স্থির শরীরে এক হাত দিয়ে বসে বসে ঘাস তুলছে ।
হ্যান্ড মাইকে কয়েকবার ‘এটেনশান, এটেনশান ‘ অর্ডার ভেসে এলো , আর সাথে সাথে বেলম্যান তিনবার ঘন্টা বাজালো । সবাই স্থির চোখে সামনের অফিসারদের দিকে তাকিয়ে আছে । মৃদু অস্পষ্ট অস্ফুট একটা গুঞ্জন উঠলো চারপাশে । ফুলজান কান খাড়া করে অপেক্ষা করে । সুরভী তার অভ্যাস অনুযায়ী এখানেও পা দিয়ে কিছু একটা আঁকতে চেষ্টা করছে । মাঠের ঘাসের মধ্যে কিছুই আঁকতে পারছে না ; তবু পা চালাচ্ছে । মদীনা হাত দুটো বুকের উপর ভাঁজ করে রেখে সোবাহানের দিকে তাকিয়ে আছে । লক্ষ্মীর চোখ তখনো টলমল । কি জানি কোন দুঃখের কথা তার মনে পড়ে গেছে । ফুলজান শুধু মন দিয়ে উর্দু বুঝতে চেষ্টা করে ।
অফিসার মাত্র কয়েকটা লাইন বলে । তাদের হাতে বেশি সময় নেই । এখনি বের হতে হবে । বাইরে অবস্থা বিশেষ ভালনা । ভাল হবে কিভাবে ? আল্লাহর গজব আসছে যে । কিছু গাদ্দার পাকিস্তানের পতনের জন্য এমন গাদ্দারী কাজ করছে । ছেলে ছেলে মিলে সহবাস ! বেঈমান ! গজব তো আসবেই !


ফুলজানের মাথা ঝিমঝিমিয়ে ওঠে । অফিসার এইসব কি কয় ? ছেলে ছেলে সহবাস ? এইজন্যই কোন মেয়েকে অত্যাচার করেনি সোবাহান ? প্রবল ঘৃণায় ফুলজানের ভেতরটা বিষিয়ে ওঠবে কিনা সে নিজেই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যায় । ফুলজান আর কিছু শুনতে পায়না । ততক্ষণে সোবাহানের বিচার শেষ ।
মেজর আসলাম তার খসখসে পুরুষালী গলায় বলে , “জাং মে হোতা হ্যায় এ্যায়সা জো লাড়কী বহুত জরুর । তোমার মেয়ে দরকার ? শরীর দরকার ? তাহলে বাঙ্গালি মেয়েরা আছে । জেনারেল নিয়াজী বলেছেন , এনজয় দ্য বাঙ্গালি বিউটি । কই মুশকিল নেহি । এরা গণিমত এর মাল । আল্লাহ কি তরফ সে… পবিত্র পাকিস্তানি জিহাদি দের জন্য … কিন্তু সোবাহান কেন ছেলের কাছে গিয়ে আল্লাহর গজব আনবে ? মেয়ের অভাব ছিল ক্যাম্পে ? লূতের কওমের অভিশাপ আনবে ! তাই তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যু । এবং সেই মৃত্যু বাঙ্গালির মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর ।

এমন মৃত্যু হবে যাতে আর কেউ এমন কাজের সাহসও না করে ।
মৃত্যুদণ্ড শুনেও সোবাহানের মধ্যে কোন ভাবান্তর হয়না । আদেশ শুনে স্থির পাথর শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ায় , মুখটা উপরে তুলে একবার আকাশের দিকে তাকায় , খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে , তারপর মেরুদণ্ড সোজা করে দৃপ্ত অফিসারের ভাঙ্গিতে হেঁটে যায় । গর্বিত এক প্রেমিক হেঁটে যায় তার প্রেমিকের কাছে । সামনে গিয়ে আরেকজন পুরুষের ঘাড়ে হাত রাখে , দুটো হাত অন্য একটা পুরুষের গালে পরম মমতা আর ভালবাসায় লেগে থাকে । ফুলজান অবিশ্বাস্য কিন্তু মোহাবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে থাকে । তার হঠাৎ কেন যেন মায়া অনুভব হয় ।
দুজন মানুষের দিকে সমস্ত ক্যাম্প তাকিয়ে আছে । সবার মনে উৎকণ্ঠা — কখন কেমন নৃশংসভাবে এদের মৃত্যু হবে ?
কিন্তু আসামী দুজনের চোখ মুখ ভাবলেশহীন । দেখলে মনে হয়না এদের মৃত্যু নির্ধারিত হয়ে গেছে । মনে হয় , বিদায়বেলা শেষবারের মত পূর্ণপ্রেম দিয়ে তৃপ্তি ভরে পরস্পর কে দেখছে ।
মুহূর্তের মধ্যে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে । ঘাড়ের পাশে সোবাহান একটা চুমু দেয় সকলের সামনে । হয়তো “ফেয়ারওয়েল কিস ” করারও ইচ্ছা ছিল , কিন্তু সেই সুযোগ আর পায়না । পেছন থেকে ছুটে আসে একজন সেপাই । সেই টিঙটিঙে সেপাইটা, যার আদিমতার নিষ্ঠুরতায় মেয়েরা মরে গেছে অনেক আগেই । সেই টিঙটিঙে নেকড়ে উন্মত্ত হয়ে সরিয়ে নেয় সোবাহান কে । অফিসারের গায়ে হাত দেওয়ার ধৃষ্টতা সবাই ক্ষমা করে দেয় । ফুঁসতে ফুঁসতে সেই টিঙটিঙে চিৎকার করে , “বেঈমান ! জানোয়ার ! আল্লাহর আরশ আর তোরা কাঁপাতে পারবিনা । পাপী মুনাফিক । লা’নত পড়ুক তোদের উপর । “

*

ডিসেম্বরের ষোল তারিখ অর্ধনগ্ন দুজন রমণী ব্যাকুল হয়ে ছুটেছিল মাঠের এক কোণায় —- যেখানে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল সোবাহান বেলুচ আর তার প্রেমিককে ।
সোবাহান বেলুচের ছয় ফুট শরীর সেদিন উলঙ্গ করে মাঠের চারপাশে ঘুরানো হয়েছিল , তারপর ব্লেড দিয়ে মাছের মতন ছিড়ে ছিড়ে তার সাদা শরীরটা রক্তাক্ত লাল করেছিল ।
বেয়নেট চার্জ করা শরীর থেকে প্রত্যেকটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আলাদা করে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল গর্তের ভেতর । মুরতাদদের জানাজাও হয়নি ।
ফুলজান কখনো মানতে পারেনি । সোবাহান কে তার বিশেষ পছন্দ ছিল । এমন একটা ছেলে এমন লানতি কাজ কারবার করতে পারে — সেটা নিয়ে তার খেদের শেষ ছিল না ।
মদীনার মনে হয় মাথা খারাপ হয়ে গেছে । নইলে কি আর ফুলজানের সাথে একচোট লেগে যায় ?

এত বড় একটা খারাপ ঘটনা দেখার পরও মদীনা রাত্রেবেলা বলল , “খালাম্মা , সোবাহান সাব তো আমাদের ক্ষতি করে নাই । করসে ? কও ? বলো , সে তোমার শরীর কামড়ে দিয়েছে ? চুল ছিঁড়েছে ? তোমার বুক থেকে রক্ত জড়িয়েছে কখনো ? তাইলে ? তাইলে এত ঘেন্না ক্যান ? পাপী আমরা সবাই । এই সবগুলা কুত্তাই খারাপ । আমার শরীরে যারা আঁচড় দিয়েছে তাদের আল্লাহ মাফ করলেও আমি দাবী ছাড়তাম না । কিন্তু সোবাহানের উপর আমার কোন দাবী নাই । কুত্তাগুলার চেয়ে সোবাহান সাব সারাদিন দিন রাত ভালা । জানো , সোবাহান যতবার আমার ঘরে আসতো , আমারে সালাম দিতো , পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করতো , সাহস দিতো , বলতো —সব শেষ হয়ে গেলে আমি যেন সব ভুলে যাই । নতুন করে সব শুরু করি , ঘর সাজাই —-
–‘শফিক তোমাকে ভালবাসে? ‘
–‘হুঁ ‘
— তাহলে আমি বলছি , সে তোমাকে মেনে নিবে । তোমার তো কোন দোষ নেই । চিন্তা করোনা ।
চরম দুর্দিনেও মদীনার মুখ উজ্জ্বল হয়ে যেতো — ‘আসলেই মেনে নিবে? ‘
— বলছি তো , মেনে নিবে । ভালবাসা এমনি হয় । সব ধুয়ে মুছে সব মেনে নিতে পারে । আচ্ছা , তোমাদের দেশ তো স্বাধীন হয়েই যাবে । বেঁচে থাকলে ফিরে যাবো । তোমাদের সেই নতুন সংসারে আমাকে কখনো দাওয়াত দিবে ? নাকি বাধ্য হয়ে যুদ্ধে এসেছি বলে ঘৃণা করবে ? মদীনা , আমি বেলুচিস্তানি । তোমাদের মতই স্বাধীনতা চাইছি অনেকদিন । তবু আমাকে ঘৃণা করবে ? … “
সেই মানুষটাকে মদীনা কোনমতেই ঘৃণা করতে পারেনা । মদীনা ঘৃণা করবে না । সে টের পাচ্ছে তার ভেতরে আরেকজন বেড়ে উঠছে । এতদিন সবটুকু ঘৃণা নিয়ে তাকে অনুভব করতো । সেই প্রাণটাকে আজকে একটু সহ্য করতে পারছে । ভালয় ভালয় সেই শিশু পৃথিবীতে আসলে তাকে মারবে না । নাম রাখবে সোবাহান বেলুচ্চি । তারপর এতিমখানায় দিয়ে দিবে ।

‘…খালাম্মা , এরপরও ঘেন্না করবা এই মানুষটারে ? মেয়েরা তোমরা কী কও? “
ফুলজান এসব কিছু বুঝেনা । হয়তো বুঝতে চায়না । দুপাতা ইংরেজি পড়া মদীনা উঁচুদরের কথা বলে । কিন্তু মদীনার হিসাব খুব সরল-সোজা । তার মন কোনভাবেঈ ভুলতে পারেনা ওসব করা যে কবীরা গুনাহ !
তবু মনে মনে ফুলজান হেরে যায় । তার মন সেই হেরে যাওয়া উপভোগ করে । পাপ পুণ্য হিসাবের ভিত নড়ে ওঠে তার । ভালমন্দ আল্লাহ বিচার করবো । তাতে তার কি ? মনের সাথে অসম এক যুদ্ধে লিপ্ত হয় ফুলজান বেওয়া ।
ডিসেম্বর মাসের ষোল তারিখ অর্ধনগ্ন দুজন রমণী —- ফুলজান আর মদীনা — ছুটে গিয়েছিল মাঠের কোণায় — যেখানে কয়েকদিন ধরে পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রস্রাব করছিল ।

মুক্তিবাহিনী সম্মানের সাথে মা বোনদের যখন মুক্তি দিয়েছিল, তখন শরীরে শতচ্ছিন্ন লুঙ্গি জড়িয়ে ফুলজান, মদীনা দৌঁড়েছিল ।
পাকিস্তানিদের প্রবল ঘৃণার প্রস্রাবের সাথে কেন দুজন বাঙ্গালি রমণীরর ভালবাসারর চোখের পানি মিশেছিল কেউ জানেনি । বিশেষ করে ফুলজান এমন আহাজারি করবে কেউ কল্পনাও করেনি । আহাজারির কারণ অবশ্য কেউ জিজ্ঞেসও করেনি । সবাই বুঝে নিয়েছে ।সবাই বুঝে নিয়েছে ধর্ষিত ফুলজানের মন নির্দোষ ভালবাসা কে গ্রহণ করেছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.