একটা ছেলে একা

লেখক :- অরণ্য রাত্রি 

ঘর টা খুব সুন্দর করে সাজানো। নীল রঙের দেয়াল। এক কোনায় একটি বিছানা । তাতে নীল চাদর বিছানো। মনে হয় আকাশের সমস্ত রঙ এই ঘরে এনে রাখা হয়েছে। ঘরটি যার সে জানালা দিয়ে প্রায়ই আকাশ দেখে। এই আকাশ টা যখন কালো হয়ে যায় , বৃষ্টি হয়ে মেঘ গুলো যখন ঝড়ে পড়ে তখন সে জানালা বন্ধ করে দেয়। এই বৃষ্টি এক সময় তার অসম্ভব প্রিয় ছিল। কিন্তু এখন সে বৃষ্টি হলেই ছুটে ঘরের ছাদে যেতে পারে না। ভিজতে পারে না। তার ছাদে যাওয়া নিষেধ।অভিমানে ক্ষোভে সে এখন বৃষ্টি দেখে না। জীবনের সমস্ত রঙ আস্তে আস্তে তার জীবন থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।
নিয়ন একজন মানসিক রোগী ।মারাত্মক বিষণ্ণতা তার জীবনের সমস্ত রঙ মুছে দিয়েছে। জীবনের সমস্ত কিছু থেকে তার আগ্রহ চলে যাচ্ছে । কোন কিছুই তার ভাল লাগে না।জীবনটা অর্থহীন লাগে। ২ বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। তাই একা একা তার ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ। প্রকৃতির সান্নিধ্য তাকে কিছুটা হলেও শান্তি দেয়। কিন্তু এখন তো তার সব জায়গায় একা একা যাওয়া নিষেধ।ইচ্ছে করলেই প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া যায় না।একাকীত্ব তার এই অসুখ কে আরো তীব্র করেছে।
বাবা ব্যবসায়ী। সারাদিন ব্যস্ত। মা নেই। মারা গেছেন সেই ছোট বেলায়। কোন বন্ধু নেই। বিশাল বাসায় ২ই জন কাজের মানুষ আর নিয়ন…………

আনিস সাহেব অফিসে বসে আছেন। একটু আগেই একটা জরুরি মিটিং সেরে এসেছেন। কিন্তু আজকে খুব অন্যমনস্ক ছিলেন মিটিঙে। হবেই না বা কেন? নিজের ছেলে অসুস্থ থাকলে কি ব্যবসায় মনোযোগ দেয়া সম্ভব?ছেলে ছাড়া তার কেই বা আছে? রুনু তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে প্রায় ১০ বছর। তখন নিয়নের বয়স ছিল ১০। এখন বয়স ২০। ছেলে টি প্রচণ্ড বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। এই ১০ বছর তিনি ছেলের খোঁজ সেভাবে রাখতেন না। যখন টাকা লেগেছে তিনি দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ছেলে কিভাবে বড় হয়েছে বুঝেন নাই। নিয়নের জীবনে একটি মাত্র বন্ধু ছিল। সজীব । কিন্তু সজীব ক্যান্সারে মারা গেল। তারপর থেকেই নিয়নের জীবন বন্ধুহীন । এই সময় মা বাবার সান্নিধ্য লাগে। কিন্তু মা নেই। আর তিনি সারাদিন ব্যস্ত।নিয়ন আস্তে আস্তে ভার্সিটি যাওয়া ছেড়ে দিলো । সারাদিন বাসায়। তিনি কিছুই জানতেন না। তিনি বুঝলেন যখন নিয়ন ৫০ টি ঘুমের ওষুধ খেয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিল।নিয়ন সে যাত্রায় বেঁচে গেলো।নিয়ন কে সাইক্রিয়াট্রিস্ট দেখালেন। ডাক্তার বললেন বিষণ্ণতা কাটাতে হলে একাকীত্ব কাটাতে হবে। আর নিয়ন এর মাঝে সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি প্রবল। তাকে সব সময় চোখে চোখে রাখতে হবে। কিন্তু একাকীত্ব দূর করা কিভাবে সম্ভব। তিনি ব্যবসার কাজে এত ব্যস্ত থাকেন যে ছেলে কে সবসময় এত সঙ্গ দেয়া সম্ভব হবে না। প্রতি দিন এই একই কথা ভাবেন। কিন্তু কোন ফলাফল নেই। চিন্তায় অস্থির লাগে।তার একটা মাত্র ছেলে।
হটাত ফোনের শব্দে আনিস সাহেব বাস্তব জগতে ফিরে এলেন। রিসেপশন থেকে ফোন এসেছে।
স্যার একটা ছেলে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে। বলছে আপনার বোনের ছেলে।
কি নাম?
রনি
পাঠিয়ে দাও,
আনিস সাহেব ভাবছেন তার বোনের কথা। ৫ বছর কোন যোগাযোগ নেই।রনি তখন ভার্সিটি তে পড়তো। এতদিন পর হটাত রনি কেন তার কাছে? তার কেমন বিরক্ত লাগছে। নিজের ছেলের চিন্তায় অস্থির। এখন বোনের ছেলে কে নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আছে?
রনি দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো। আনিস সাহেব রনির দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলেন। মফঃস্বলে বড় হওয়া সত্ত্বেও কাপড় চোপড়ে অনেক স্মার্ট। দেখতে যথেষ্ট সুন্দর। কেউ একবার দেখলে দ্বিতীয়বার চোখ ফেলতে বাধ্য।
স্লামালিকুম মামা।
কেমন যেন জড়তা কাজ করছে রনির মাঝে। কি বলবে বুঝতে পারছে না। এত দিন পর মামা কে দেখছে। এমনিতেও আগেও আনিস সাহেব কে সে ভয় পেতো। খুব বেশি কথা কখনই বলতো না।
কি রে কেমন আসিস রনি? বুবু কেমন আসে?
মামা ভাল আসি। আম্মা ভাল কিন্তু বাতের ব্যথা টা বেড়েছে।
সেই ব্যথা এখনো যায় নাই? ডাক্তার দেখাস না?
রনি চুপ করে রইলো। কি বলবে? ভাল ডাক্তার দেখানোর মত অবস্থা এখন আর তাদের না।পাড়ার ডাক্তার দেখায়। তাতে ভালো হচ্ছে না। উপায় না দেখে সেই জোর করে এসেছে আনিস সাহেবের কাছে।
রনি বস।
চেয়ার টেনে বসলো রনি। পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে আনিস সাহেব কে দিলো। আনিস সাহেব প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে চিঠি খুললেন। বোনের সাথে তার সম্পর্ক কখনই খুব একটা ভালো ছিল না। তাই সেইরকম টান তৈরি হয় নাই।
রনি বুঝতে পারছে আনিস সাহেব তাকে পছন্দ করছে না। কিন্তু ভার্সিটি শেষ করে এখন কোন চাকুরী পাচ্ছে না। কিন্তু বাসার উপার্জনের রাস্তা নেই। বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই। গ্রামের কিছু ধানী জমি আর শহরের ছোট বাসা টা ভাড়া দিয়ে যা আয় হয়। কিন্তু মার অসুখ বেড়ে যাওয়ার পর এই টাকায় চলছে না।মার কষ্ট চোখে দেখা যায় না। তাই জোর করেই মামার কাছে এসেছে সাহায্য পাওয়ার আশায়।মা না করেছিল।সে শুনে নাই। কিন্তু মনে হয় না কোন কাজ হবে।
চিঠি পড়লেন আনিস সাহেব। যা ভেবেছিলেন তাই। রনি কে চাকুরী দেয়ার অনুরোধ । কিন্তু চাকুরী কি ছেলের হাতের মোয়া। তিনি নিজের কোম্পানি তে আত্মীয়স্বজন কে চাকুরী দিতে চান না। ভাবছেন কি করবেন। হটাত মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো। এটা খুব ভাল একটা বুদ্ধি। আগে ভাবেন নাই কেন ভেবে আফসোস করছেন। কিন্তু ছেলেটা কি পারবে?
প্রস্তাবটা শুনে রনি খুব একটা খুশি হল না। কিন্তু কি আর করা। মায়ের চিকিৎসা আগে। আনিস সাহেব তার জন্য চাকুরী খুঁজবেন। এই কয়দিন রনি আনিস সাহেবের বাসাতেই থাকবে। নিয়ন এর সাথে থাকবে। নিয়ন কে দেখে রাখবে। বন্ধুত্ব করবে। তার একাকীত্ব দূর করবে। আর আনিস সাহেব বেশ মোটা অঙ্কের টাকা দিবেন হাত খরচ হিসেবে।রনি নিরুপায় হয়ে রাজি হয়ে গেলো।

অফিস থেকে বের হয়ে রনি দেখলো আকাশ কালো। বৃষ্টি পড়বে যে কোন সময় । রাস্তা ধরে হাঁটছে। সামনেই বসুন্ধরা সিটি। আনিস সাহেব বেশ ভালো অঙ্কের টাকা দিয়েছেন কাপড় চোপড় , জুতা কিনার জন্য। নিয়ন কে মুগ্ধ করতে হবে। নাহলে বন্ধুত্ব হবে কিভাবে। নিয়ন যখন ক্লাস এইটে পড়ে তখন শেষ দেখেছিলো রনি , নিয়ন কে। ধব ধবে ফরশা কিউট একটা ছেলে। এখন নিশ্চয়ই বড় হয়ে গেছে। চেহারায় বাচ্চা সুলভ ভাবটা আর নিশ্চয়ই নেই। রনি সমকামী। নিয়ন যে সমকামী সে ধারনা করে। কারন শেষবার যখন রনি নিয়ন কে দেখেছিল তখন নিয়নের চোখে মুখে ছিল তাকে নিয়ে মুগ্ধতা। রনি মনে মনে ভাবে নিয়ন সমকামী হলে তাকে আবার মুগ্ধ করতে বেশি সময় লাগবে না। এত কাপড় চোপড় কেনার কোন প্রয়োজন ছিল না।
বসুন্ধরা সিটি থেকে সরাসরি ধানমন্ডি তে আনিস সাহেবের বাড়িতে গেলো রনি। গেটে আটকালো না। আগেই বলা আছে।
কলিং-বেল টিপতেই বাসার কেয়ার টেকার দুলাল দরজা খুলল। দুলাল সুটকেস টা নিয়ে একটা ঘরে নিয়ে রাখলো। ডাবল বেড। সমস্ত ঘরটাই নীল। দুলাল বলল
ভাইয়া আরো ঘর খালি আছে। কিন্তু স্যার আপনাকে ছোট ভাইয়ের সাথে এক ঘরে থাকতে বলেছেন।
রনি খুব বিরক্ত। একা ঘুমিয়ে তার অভ্যাস। এখন আরেকজনের সাথে ঘুমানো । কি আর করা। কম্প্রোমাইস করতে হবে।চাকুরী বলে কথা।
নিয়ন আমার সাথে ঘুমাবে?
ছোট ভাইয়া? সে তো চায় কেউ সবসময় তার সাথে থাকুক। আপনি থাকলে আরো খুশি হবে। এত দিন তো আমরাই দেখে রেখেছি। এখন তো আপনার দায়িত্ব ।
কোথায় সে?
বাগানে।
আচ্ছা আমি বাগানেই যাই।
ভাইয়া
জি বলুন
আপনাকে কিছু তথ্য দেই ছোট ভাইয়া সম্পর্কে
কি?
উনি কিন্তু মাঝে মাঝে খুব বেশি কথা বলেন। জিনিস পত্র ভাংচুর করেন। আর মাঝে মাঝে সুইসাইড করতে চান। আপনার খেয়াল রাখতে হবে।
সুইসাইড এর কথা শুনে রনি একটু ভয় পেলো। সে পারবে তো দেখে রাখতে?
করিডোর ধরে হাঁটছে রনি। দেয়ালে অসংখ্য সুন্দর পেইন্টিং। মামা সৌখিন মানুষ। বাড়ি সুন্দর করে সাজানো। বারান্দায় একটা শ্বেত পাথরের রক। সেখানেই বসে আছে নিয়ন। সাথে পোষা কুকুর মিকি। দূরে বাগানের মালী। তার উপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে নিওনের উপর চোখ রাখার জন্য।
নিয়ন কে দেখে রনি অবাক। এ কি অবস্থা। শুকিয়ে গেছে। চোয়ালের হাড় বের হয়ে গিয়েছে।চোখের নিচে কালি। চামড়া ফ্যাকাসে সাদা। নিয়ন রনি কে দেখে চিনতে পারলো।
আরে রনি ভাইয়া তুমি?কত দিন পর?
রনি হাসলো ।
তুমি তো বড় হয়ে গিয়েছ নিয়ন। তোমাকে তো দেখেছিলাম যখন তুমি স্কুলে পড় ?এখন কি কর?কোথায় পড় ?
কোথাও পড়ি না। বাসাতেই থাকি।,
রনি খুব অবাক। সারাদিন একা এই এতো বড় বাসায় একা থাকলে বিষণ্ণতা হবেই। নিয়ন কে জোর করে হলেও ভার্সিটি পাঠানো উচিত।
আমি কয়েকদিন তোমার বাসাতেই থাকবো ।চাকুরী না পাওয়া পর্যন্ত। তোমার ঘরেই থাকবো। তোমার অসুবিধা হবে না তো ?
তোমাকে বাবা পাঠিয়েছে আমার উপর চোখ রাখার জন্য । তাই না?
রনি চুপ।
ভাল হল । আমি একা তো। এখন একজন মানুষ হল যার সাথে গল্প করতে পারবো। আর বুঝলাম বাবা অন্তত আমার জন্য কিছুটা হলেও ভাবে।
রনি হেসে বলল
তোমার তো অনেক বুদ্ধি ।ঠিক ধরে ফেলেছো
নিয়ন বলল
আসলেই আমার অনেক বুদ্ধি। আমার ঘরে থাকলে টের পাবা। এখন ঘরে গিয়ে রেস্ট নাও। অনেক দূর থেকে এসেছ। আমি মিকির সাথে আরো কিছুক্ষণ খেলে আসছি।
ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে রনি ভাবছে ছেলেটা আসলেই অসুস্থ। একাকীত্ব ছেলেটিকে অসুস্থ করেছে। নিয়নের জন্য মায়া হচ্ছে।আর সে তো টাকা নিচ্ছে। সে তার কাজ দায়িত্ব নিয়ে করবে। নিয়ন কে সুস্থ করে তুলতে হবে।

১ সপ্তাহ হয়ে গিয়েছে নিয়ন আর রনি একসাথে থাকছে। ইতিমধ্যে রনি অনেক ব্যবস্থা নিয়েছে যা নিয়ন কে অনেকটাই সুস্থ করেছে। নিয়ন ঠিক মত ওষুধ খেতো না। তার ওষুধ খাওয়ানোর দায়িত্ব রনির। প্রতিদিন রনি নিয়ন কে নিয়ে সিনেমা দেখে। তাকে সিনেমা-ভুখ বানিয়ে ফেলছে। গল্পের বই পড়ে শোনায়। কখনো বারান্দায় বসে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসে রনি। সব মিলিয়ে নিয়ন এখন অনেক ভালো। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার অনুমতি নেই। কিন্তু নিয়ন কে এখন বাইরে নিয়ে যাওয়া খুব জরুরি। চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে থাকলে কখনই সুস্থ হবে না নিয়ন।
একদিন তুমুল বৃষ্টি শুরু হল । সাথে শিলা পরছে।নিয়ন বায়না ধরলো ছাদে যাবে। বৃষ্টি তে ভিজবে। কত দিন বৃষ্টি তে ভিজে না। শিল কুড়োয় না। এখন তো সে অসুস্থ না। আত্মহত্যার চেষ্টা সে করবে না কথা দিলো। রনি বুঝলো । কিন্তু বাসার কাজের লোক ২ জন আপত্তি করতে লাগলো। বলল আনিস সাহেবের নিষেধ আছে। কিন্তু রনি কারো কথা না শুনে নিয়ন কে নিয়ে গেলো ছাদে। এত খুশি নিয়ন কে কখনই হতে দেখে নাই রনি। নিয়ন বৃষ্টিতে ভিজছে।রনি দাঁড়িয়ে দেখছে। এক পর্যায় নিয়ন এসে রনির হাত ধরে বৃষ্টিতে নিয়ে গেলো। রনি নিয়মের চোখের দিকে তাকালো । তাতে মুগ্ধতা আর কাম।হটাত কি হল। নিয়ন রনির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখলো। রনির জানি কি হল। সেও মন্ত্রমুগ্ধের মত নিয়ন কে জড়িয়ে ধরে নিয়নের ঠোঁট চুষতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর ২ জনেরই যেন হুশ আসলো যে তারা যা করছে ভুল করছে। নিয়ন এক দৌড়ে ছাদ থেকে নেমে নিজের ঘরে চলে গেলো।
সেই দিনের ঘটনা ২ জনের কেউই আর কখনই তুলল না। এমন ভাব করতে লাগলো যেন কিছুই ঘটে নাই।
ডাক্তার দেখিয়ে এসে সেইদিন নিয়ন খুব খুশি।
জানো ? ডাক্তার তো আমাকে দেখে অবাক । কিভাবে আমি এতো তাড়াতাড়ি এতো সুস্থ হলাম। আমি বলেছি সব আমার নতুন বন্ধু রনির অবদান। ও না থাকলে আমি কোন দিন সুস্থ হতাম না।
রনি হেসে বলল
আমি তো কিছুই করি নাই। আমি জাস্ট তোমার বন্ধু হয়েছি। আর আমি অনেক সুখী তোমার মত বন্ধু পেয়ে। আমরা চিরদিন বন্ধু থাকবো
নিয়ন কি জানি বলতে গিয়ে থেমে গেলো । হটাত করে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল
তোমাকে আসল কথাই বলা হয় নাই।
কি কথা?
ডাক্তার বলেছে তোমার সাথে আমি বাইরে যেতে পারবো। কই যাই বল তো ?
চল প্ল্যান করি।
পরের দিন তারা বের হল। প্রথমেই শপিং করতে চায় নিয়ন। কতদিন সে মনের শখ মিটিয়ে কিছু কিনে না। বসুন্ধরায় গেলো তারা। সবার জন্য উপহার কিনলো নিয়ন। রনি কে খুব সুন্দর টাইটানের একটা ঘড়ি কিনে দিলো। লাঞ্চ করলো ধানমন্ডির কমিক ক্যাফে তে। তারপর গেলো বলাকায় সিনেমা দেখতে। একটা খুব ভাল বাংলা মুভি এসেছে। সেটা দেখলো। রাতে ঘণ্টা ধরে রিকশায় ঘুরলো । জীবন টা কে অনেক সুন্দর মনে হচ্ছে নিয়নের। রনির দিকে তাকালো নিয়ন। বাতাসে উড়ছে রনির চুল। রনি নিয়ন এর দিকে তাকিয়ে হাসলো । ভুবন ভুলানো হাসি। এই হাসিতেই তো পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। হাসলে রনির গালে টোল পড়ে। নিয়নের ইচ্ছা করছে ছুঁয়ে দেখতে। নিয়নের মনে হল সে বুঝি রনি কে ভালবেসে ফেলেছে।
রাতে বাইরে ডিনার করে বাড়ি ফিরলো তারা । আনিস সাহেবের জন্য গিফট কিনেছে নিয়ন। দামী একটি কলম। কলম পেয়ে আনিস সাহেব খুশি হলেন। কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি খুশি হলেন নিয়ন কে হাসতে দেখে। কৃতজ্ঞতার চোখে তাকালেন রনির দিকে। দুই জনই বেশ পরিশ্রান্ত। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লো তারা। কিন্তু কেন জানি ঘুম আসছে না কারো । নিয়নের ইচ্ছা করছে ২ জনের মাঝের ব্যবধান অতিক্রম করতে। রনিও আজকে কেমন জানি ঘোরের মাঝে আছে। নিয়নের বাচ্চা-সুলভ আচরণ , প্রাণ চাঞ্চল্য তাকে মুগ্ধ করেছে। নিয়ন কে কাছে পেতে ইচ্ছে করছে ।এক সময় নিয়ন ২ জনের ব্যবধান অতিক্রম করে কিস করলো রনি কে। আগুনে ঘি ঢালা হল। সারা রাত পাগলের মত প্রেম করলো ২ জন। অনেক দিনের তৃষ্ণা ২ জনের।২ জনেই ভালবাসার সুধা পান করলো উন্মুখ হয়ে। যখন ভোর হয়ে এলো তখন ঘুমালো তারা পরিশ্রান্ত হয়ে।
ঘুম থেকে নিয়ন উঠলো ১১টার দিকে। অনেক ভালো ঘুম হয়েছে। ঘুম থেকে উঠে রনি কে খুঁজলো । ঘরে নেই। নিয়ন আজ তাকে বলবে তার ভালবাসার কথা। সে রনি কে ভালবেসে ফেলেছে। কিন্তু কোথাও নেই রনি। না বাগানে । না ছাদে। কোথায় গেলো ? কক্ষনো না বলে তো যায় না কোথাও। ঘরে এসে দেখলো আলমারিতে রনির কোন কাপড় নাই। হটাত একটা চিঠি দেখলো টেবিলের উপর।কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠি খুলল নিয়ন
নিয়ন
তুমি আমাকে ক্ষমা কর। গত রাতের ঘটনা আমি মেনে নিতে পারছি না। তাই চলে গেলাম। দোষ তোমার না। আমার । আমি বার বার একই ভুল করছি। তোমার সাথে প্রতারণা করছি যেমন তেমনি প্রতারণা করছি আমার ভালবাসার মানুষের সাথে। আমি সাব্বিরের কথা বলি নাই তোমাকে ।আমরা ২ জন ২ জনকে ভালবাসি। এখানে থাকলে আমি বার বার ভুল করবো । প্রতারণা করা হবে তোমাদের ২ জনের সাথেই। তাই চলে গেলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিও। সারা জীবন এখনের মত হাসি খুশি থেকো।
রনি
চিঠি পড়ে কিছুক্ষণ পাথরের মূর্তির মত বসে রইলো নিয়ন। চোখ থেকে ২ ফোটা পানি পড়লো চিঠির উপর।


সারাদিন সাব্বিরদের বাসার ছাদে আড্ডা দেয় সাব্বির আর রনি। ১ মাস হল রনি ঢাকা থেকে চলে এসেছে। নিয়ন কে খুব মিস করে। সাব্বির এর কাছে আসলেই সে শুধু মানসিক শান্তি পায়। তারা ২ জনই হতাশ। কারো চাকুরী নেই। বেকার। সংসার চলে না। সাব্বিরের খুব শখ চা বাগানে চাকুরী করার। সে নাকি একবার চা বাগানে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছে । এত সুন্দর।আর এদিকে রনির এমন কোন শখ নেই। একটা ভাল বেতনের চাকুরী হলেই হল।
এক রাতে হটাত আনিস সাহেবের ফোন আসলো রনির মোবাইলে। রনি ফোন ধরবে কিনা ভাবছে। পরে ভাবলো ফোন না ধরা চরম বেয়াদবি হয়ে যাবে।
হ্যালো স্লামালিকুম মামা
বাবা রনি
জি মামা বলেন
তুমি একবার আসবে ঢাকায়?
কিন্তু মামা।
আমি জানি তুমি আসবে না। নিয়ন আমাকে না করেছে তোমাকে আসতে বলার জন্য। কিন্তু ছেলেটা আমার আর বেশি দিন নেই এই পৃথিবীতে। আমি চাই এই কয়টা দিন আমার ছেলেটা একটু শান্তি পাক।
কি বলছেন মামা ?
নিয়নের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছে। আগামী শনিবার ওকে নিয়ে সিঙ্গাপুর যাবো। তুমি এই কয়টা দিন ওর সাথে থাকবে?
অবশ্যই মামা
আমাকে একটা ভার মুক্ত করলে তুমি। কি চাও তুমি বল
রনি ভাবলো নিয়নের সাথে থাকার জন্য সে কিছু নিবে তা কিভাবে হয়? কিন্তু হটাত তার মনে পড়লো একটা কথা। তার একটা জিনিস চাওয়ার আছে।
মামা আমার জন্য না। আমি যদি আরেকজনের জন্য চাই ?
তোমার যা খুশি , যার জন্য খুশি চাও। আমার সামর্থ্যে থাকলে দিবো।
আমার এক বন্ধুর চা বাগানে চাকুরী করার খুব শখ।
তোমার বন্ধুর বায়ডাটা আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। আমি দেখছি।
মামা তাকে আমার কথা বলা যাবে না
আচ্ছা ঠিকাছে। তুমি যা চাও।

বাস থেকে নামতেই রনি নস্টালজিক হয়ে গেলো। নিয়ন এর সাথে ঘুরার দিনটার কথা মনে পড়ে গেলো।সেই রিকশা ভ্রমণ । আহা কি সুন্দর দিনটাই না গিয়েছে। একটি স্বপ্নের দিন। নিয়নের ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে ভাবলেই বুকে কেমন কষ্টের অনুভূতি হয়।নিয়নের তো চিকিৎসা হবে সিঙ্গাপুরে। নিশ্চয় ভাল হয়ে যাবে। কিন্তু যদি না হয়…… আর ভাবতে পারে না রনি।
বাড়ি তে ঢুকতেই কেমন বিষাদের অনুভূতি । সবার মন খারাপ।আগে সারা বাড়ি কেমন জমজমাট ছিল। এতো গুলো কাজের মানুষ। অথচ এখন একদম নীরব । নিয়নের ঘরে ঢুকে দেখলো নিয়ন ঘুমোচ্ছে । শুকিয়ে গেছে আরো । রনি ভাবলো বসার ঘরে যেয়ে অপেক্ষা করবে। নিয়নের ঘুম ভাঙলে কথা হবে। ঘর থেকে বের হতেই পিছন দিক থেকে ডাকলো নিয়ন
রনি এতদিন পর কি মনে করে?
তোমাকে দেখতে এসেছি
করুণা করতে এসেছ? নাকি বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে এসেছ?
কি বল এসব?
দেখা হয়েছে না?এখন যাও
তুমি চিৎকার করছো কেন?
আমার ইচ্ছা । তুমি যাবা কিনা বল
সবাই ছুটে এলো চিৎকার শুনে। রনি বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।
রাস্তা ধরে হাঁটছে রনি। কষ্ট হচ্ছে বুকে। নিয়ন তার সাথে এত দুর্ব্যবহার করবে ভাবে নাই। ভাবছে বাড়ি ফিরে যাবে। বাস স্টেশনে যেয়ে টিকেট কাটতেই সাব্বির এর ফোন
রনি তুমি জানো না আজকে কি ঘটেছে
কি?
আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
মানে
আমার একটা চা বাগানে ম্যানেজারের চাকুরী হয়েছে।হটাত করেই একটা ফোন আসলো ঐ চা বাগান থেকে।
রিয়েলি
রিয়েলি।তুমি খুশি হয়েছ রনি?
অনেক অনেক খুশি।
আমি কালকে বাড়ি আসবো । তারপর সেলিব্রেট করবো ।
ফোন রাখার পর মন টা খুশি হওয়ার বদলে খারাপ হয়ে গেলো । কথা সত্য সে নিয়নের সাথে দেখা করার বদলে এই খুশি কিনেছে।নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে।

পরেরদিন রনি সাব্বির এর বাসায় যেয়ে দেখলো চারিদিকে উৎসব ।সাব্বিরের মা তো রনি কে দেখে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লো
কই ছিলা বাবা? আজকে সাব্বিরের আক্দ । আর তুমি নাই। জানো তো কালকেই একটা চাকুরী পেয়েছে সাব্বির। চা বাগানে। চাকুরী ছিল না দেখে বিয়েটা হচ্ছিলো না। আমি বাবা বউ ছাড়া সাব্বির কে চা বাগানে পাঠাবো না। তাই আজ আক্দ করায় দিচ্ছি। প্রোগ্রাম পরে।
রনির মাথায় যেন বাজ পড়লো । এ কি শুনলো । দৌড়ে গেলো সাব্বির এর ঘরে। সাব্বির গান শুনছে । কোন চিন্তা ভাবনার চাপ নেই চেহারায় ।
কি শুনছি?
ঠিক শুনেছ। আমি বাইসেক্সুয়াল। তার উপর চা বাগান নির্জন জায়গা । একা থাকতে পারবো না। তাই বিয়ে করছি
আমার কি হবে?
তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড থাকবা।যেমন ছিলে ঠিক তেমনি। আর আমি বলি কি তুমিও একটা বিয়ে করে ফেলো ।
ছিঃ মানুষের সাথে এই প্রতারণা আমি করবো না।
তাহলে কি তোমার জন্য আমিও সারা জীবন বিয়ে না করে থাকবো ? সমাজ আমাকে ছাড়বে? আর চা বাগানে তুমি আমার সাথে কি পরিচয়ে থাকবে?
আমি থাকবো কে বলেছে?
তাহলে আমি একা থাকবো ?
একা থাকবা কেন? বিয়ে করে বউ নিয়ে থাকো
প্রচণ্ড ক্ষোভে রাগে দুঃখে রনি বের হয়ে এলো সাব্বির এর বাসা থেকে।সে এখন সম্পূর্ণ একা। কেউ নেই। হাঁটছে। রাত হয়ে এলো । রাস্তার সোডিয়াম বাতি গুলো জ্বলে উঠেছে। কেন জানি সাব্বিরের থেকে নিয়নের কথাই বেশি মনে পরছে।খুব জানতে ইচ্ছা করছে নিয়ন কেমন আছে।

আজ কাল রনি ঘরেই সময় কাটায় । বিকেলের দিকে একা একা নদীর ধারে ঘুরে আসে। একটা চাকুরীর ইন্টারভিউ দিয়েছে। হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সে আশায় আছে সে। ছোট চাকুরী কিন্তু ঘরের কাছে। সাব্বির সিলেট চলে গিয়েছে বিয়ে করে। সেদিনের পর আর একদিন ও কথা হয় নাই সাব্বিরের সাথে রনির।সাব্বির আর তার জীবনে আসবে বলে মনে হয় না। নিয়ন একদিন ফোন দিয়েছিল সিঙ্গাপুর থেকে। সে সরি বলল সেদিনের জন্য আর বলল সে সুস্থ হয়ে উঠেছে । দেশে ফিরেই রনি কে তার বয় ফ্রেন্ড কে নিয়ে দেখা করতে হবে। সে নিজে রান্না করে খাওয়াবে। রনি বলতে পারে নাই তার বয়ফ্রেন্ড নাই। সে একা। কিন্তু নিয়ন সুস্থ হয়ে উঠছে শুনে রনির সে দিন টা খুব ভাল কেটেছিল। চিৎকার করে এই খবর সবাইকে দিতে ইচ্ছা করছিলো …। এরকম মাঝে মাঝে কিছু খুশি নিয়ে রনির একলা জীবন কেটে যাছে জীবনের নিয়মে।
পরিশিষ্ট
১ মাস পর বিমানে নিয়নের লাশ দেশে ফিরে। এয়ারপোর্টে রনি উপস্থিত ছিল। নিয়ন ভাল হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু হটাত করেই আবার অসুস্থ হয়ে পরে।
রনি একটি ছোট চাকুরী পেয়েছে। তা দিয়ে চলে যায় মা ছেলের জীবন ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.