একটি মিষ্টি প্রেমের গল্প

লেখক : মাসুদ ইসলাম

আজ সাইফের মনটা কেমন যেন বিষন্ন লাগছে। অথচ কিছুদিন আগেও সব ছুটির দিন গুলি ছিল তার কাছে ঈদের মত। মনের বিষন্নতা কাটাতে নিজেই গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যায় লং ড্রাইভে।
গাড়িতে এংরি বার্ড নাটকের তাহসানের প্রেম তুমি গানটি লো ভলিউমে বাজতেছিল। গানের প্রতিটি কথা যেন কুমকুমের জন্য সাইফের কথা। দুই বছরের সফল প্রেমের পর বিয়েতে আবদ্ধ হয় তারা। বিয়ের পর দুই বছরও স্থায়ী হলনা তাদের সংসার।
সেই সুখকর মুহুর্তের সেই দিনের সন্তান সম্ভাবা কুমকুমের করা ফোনের কথা মনে পড়ে যায় সাইফের।
– হ্যালো মাই ডিয়ার। অফিসে আসতে না আসতেই ফোন।
– তুমি আর দেরী করো না। তারাতারি বাসায় চলে আস। মনে হচ্ছে খুব শীঘ্রই তুমি তোমার সন্তানের মুখ দেখতে যাচ্ছ। খুব ব্যাথা উঠেছে। আমি আর পারছি না। তুমি এখনি চলে আস।
তাদের ছেলে আর অল্প কিছু সময় পরেই এই পৃথিবীর মুখ দেখতে পাবে এই খুশীতে তার যেন আর তর সইছে না। প্রথম বাবা হতে যাওয়ার অনুভূতি যেন তাকে বারে বারে আবেগাপ্লুত করে দিচ্ছে।
কুমকুমকে হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে আনার পর চিকিৎসকেরা তাকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায়। কারণ কুমকুমের গর্ভের সন্তান গর্ভাশয়ে উল্টাভাবে অবস্থান করায় জটিলতা দেখা দেয়। এসময় কুমকুমের প্রচণ্ড রক্ত ক্ষরণ হতে থাকে। সাথে খিচুনিও। অপারেশনে সাইফের ছেলে সন্তান বেঁচে গেলেও চিকিৎসকেরা কুমকুমকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়।
সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় প্রাণপ্রিয় স্ত্রী’র পরপারে চলে যাওয়ায় সাইফ তার সন্তানের প্রতি একেবারে আকর্ষন বোধ করতে পারে না। সেই সময়ে তার সন্তানকেই তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর ঘাতক বলে মনে হতে থাকে।
কুমকুম এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে ৭ বছর হল। তার বিদায়ের পর সাইফ আর কাউকে তার মনে জায়গা দেয় নি। একমাত্র ছেলে প্রাঞ্জলের দেখাশোনা করাচ্ছে আয়া দিয়ে। কুমকুম ছেলের নাম প্রাঞ্জল রেখেছিল ছেলের জন্মের আগেই।
———-
বরাবরের ন্যায় আজও সকাল সকাল মুকিতের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। তার মনের মানুষ জুবায়ের ফোন করেছে।
– বাবু তুমি আর কতদিন আমাকে সকাল সকাল ঘুম থেকে তুলে দিবা। তোমার জন্য একটু শান্তিতেও ঘুমাতে পারিনা।
– অনেক ঘুম হইছে। এবার উঠো। আমি জেগে আছি, আর তুমি আরামে নাক ডেকে ঘুমাবা তা হবে না।
– তোমার তো অফিস আছে। আমার যে নেই।
– সেই ব্যবস্থাই করছি।
কথাটা শুনে মুকিত বুঝতে পারলো তার কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা জুবায়ের করছে।
– বাবু তুমি কি আমার জন্য জবের ব্যবস্থা করেছ?
– জ্বি, জনাব।
– ইয়াহু। আমার বেকারত্বের দিন তাহলে শেষ হতে যাচ্ছে।
– হুম।
– আচ্ছা….. কাজটা কি?
– আমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী হিসাবে।
– হুম। তোমার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত সম্পদ বানিয়ে ফেলবে না তো?
– একদম চান্স নেই। তিনি আমাদের মত নন, একেবারে সোজা।
– চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছ।
– মনে কর তাই।
– পুড়লে তোমার কপাল পুড়বে। তোমার স্যার আমার প্রেমে পড়বেই।
– হইছে। এখন এসব বাদ দিয়ে দ্রুত অফিসে চলে আসো। স্যার তোমার সাথে কথা বলে তবে তোমাকে নিয়োগ দিবে।
– ওকে। আমি ৪০ মিনিটের মধ্যে আসছি।
———-
জুবায়েরের কথা মত মুকিত দ্রুত অফিসে চলে আসে। জীবনে প্রথম কাজে যোগদান করবে, সেও তার মনের মানুষের অফিসে। বিষয়টা ভাবতেই মুকিতের মনের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এই জন্য যে, এখন থেকে প্রতিদিন জুবায়েরের সাথে তার দেখা হবে ভেবে।
জুবায়ের এই অফিসে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসাবে আছে। বয়সে জুবায়ের মুকিতের থেকে ৬-৭ বছরের বড় হবে।
মুকিতের সাথে জুবায়েরের প্রথম পরিচয় হয় বাসে। অনেকটা নাটকিয় ঘটনার মধ্যে তাদের পরিচয় হয়। প্রথম পরিচয় থেকেই জুবায়ের মুকিতকে পছন্দ করে। আজ দেড় বছর যাবত তাদের মধ্যে প্রনয় চলেছে।
জুবায়েরের রুমে মুকিত আসতেই জুবায়ের তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে শুরু করে।
– ঐ বদ পোলা। অফিসের মধ্যে এসব কি হচ্ছে।
– কি আর হচ্ছে। আমার জান কে আদর করছি। এই তো। আজ আমার বাবুটা প্রথম কাজে জয়েন করবে আর আমি আদর করবো না, তা কি হয়?
– হইছে। আগে আমার চাকরী নিশ্চিত করে নেই। তুমিই তো বলেছ, তোমার স্যার খুব চুজি আর রাশভারী মানুষ।
– তোমাকে সে নিয়োগ দিবে এটা আমি শতভাগ নিশ্চিত। কারন তুমি যে পছন্দ করার মত মানুষ। ভাগ্যিস, তিনি সোজা মানুষ। নাহলে………
– হইছে। দেখবা এই সোজা মানুষই আমার পিছনে ঘুরবে।
– হাহাহাহাহা। চল তোমাকে স্যারের রুমে নিয়ে যাই।
জুবায়ের মুকিতকে নিয়ে তার স্যারের রুমে গেল।
– স্যার আসতে পারি।
– জ্বি, আসুন।
– ও হচ্ছে মুকিত ইসলাম। ওর কথাই আপনাকে আমি বলেছিলাম।
– ঠিক আছে, আপনি মুকিতকে রেখে আপনার ডেস্কে চলে যান।
মুকিত ভাবছে এমন রসকষ হীন স্যারের সাথে কাজ কিভাবে করবে।
– কি ভাবছেন?
– কিছুনা।
– আপনার চেহারায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মনে মনে কিছু ভাবছেন।
– স্যার আপনি তো কাজ করেই যাচ্ছেন, আমার চেহারা দেখলেন কখন?
– কাজের মাঝেই সব কিছু খেয়াল রাখতে হয়। আশা করি বিষয়টা বুঝেছেন। এবার আপনার নাম, ঠিকানা বলুন।
– আমি মুকিত ইসলাম। স্টামফোর্ড থেকে মার্কেটিং এ বিবিএ করলাম। বাসা জিগাতলায়। স্যার আপনার নাম জানা হল না।
– জুবায়েরের কাছ থেকে জেনে নেন নি? আপনার আগেই জেনে নেওয়া উচিৎ ছিল। এনিওয়ে….. আমি সাইফ হাসান।
– আপনি শুরু থেকে আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছেন তা আমি পালন করবো।
– গুড। আপনার কাজ সম্পর্কে জেনেছেন নিশ্চয়ই।
– জ্বি, স্যার।
– জুবায়ের হয় তো একটা কাজের কথা আপনাকে বলেনি। কারন আমি তাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।
– কি কাজ?
– আমার ছেলেকে প্রতিদিন সকালে স্কুলে দিয়ে আসতে হবে, আর দুপুরে ওকে স্কুল থেকে বাসায় পৌঁছে দিতে হবে। বুঝেছেন?
– জ্বি, স্যার।
– কিছু মনে না করলে এখনই প্রাঞ্জলকে স্কুল থেকে বাসায় দিয়ে আসবেন, প্লিজ।
– কি মনে করবো স্যার। এটা তো আমার দায়িত্ব।
———-
দুপুর ১২ টা বাজে। মুকিত সানিডেইল স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ১২ টা বেজে ১০ মিনিটে স্কুলের সদর দরজা দিয়ে সাইফের মত দেখতে এক ফুটফুটে শিশু বেরিয়ে আসছে। শিশুটিকে দেখে মুকিতের বুঝতে বাকি থাকে না যে ওই হচ্ছে প্রাঞ্জল।
– হাই প্রাঞ্জল বাবু। আজ তোমার আব্বু বেশ ব্যস্ত বলে আমি তোমাকে নিতে এসেছি।
মুকিতের কথা শুনে প্রাঞ্জল ভ্রু দুটি কুঁচকিয়ে তাকিয়ে থাকে।
– বাবা আসেনি বলে কি প্রাঞ্জল বাবুর মন খুব খারাপ?
– বাবুনি তো আমাকে নিতে আসেনা। সবার বাবুনি আসে। আমার বাবুনি খুব পচা।
কথাটি বলেই অবুঝ প্রাঞ্জলের চোখে জল চলে আসে। মুকিতের বিষয়টি এড়ায় না। মুকিতের মনে হয় তার হৃদয়ে কে যেন সূচ দিয়ে খোঁচা দিল।
– তাতে কি হয়েছে? আমি প্রাঞ্জল সোনাকে রোজ স্কুলে দিয়ে যাব, আবার স্কুল থেকে নিয়ে যাব কেমন?
মুকিতের কথায় মাথা নুইয়ে প্রাঞ্জল সম্মতি জানায়।
– আচ্ছা… তোমাকে তো চিনতে পারলাম না?
– আমি হচ্ছি তোমার বাবাই।
– আচ্ছা বাবাই… তোমার নাম কি?
– আমার নাম মুকিত।
– বাবাই। তুমি কি রাজপুত্রের গল্প জান?
– হ্যাঁ, জানি।
– আমাকে একটা রাজপুত্রের গল্প শোনাও না। প্লিজ।
প্রাঞ্জলের আবদারে মুকিত তাকে রাজপুত্রের গল্প শোনায়। যে রাজপুত্র তার মত মাতৃহারা নয় এবং তার মত পিতৃ সোহাগ বঞ্চিত নয়।
সেই প্রথম দিন থেকেই প্রাঞ্জল আর মুকিতের মাঝে বেশ ভাব গড়ে উঠে।
ক্রমেই প্রাঞ্জল তার বাবাই রূপী মুকিতের আদর, ভালোবাসার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তপ্ত বালুর উপর বৃষ্টির ফোঁটা যেমন প্রাণ নিয়ে আসে, তেমনি মুকিতের ভালোবাসা প্রাঞ্জলকে বেশ চাঙ্গা করে তোলে।
———-
প্রাঞ্জলের প্রতি মুকিতের কেয়ারিং সাইফকে বেশ মুগ্ধ করে। সাইফ বাসায় গেলেই প্রাঞ্জল সর্বদা তার কাছে তার বাবাইয়ের গল্প বলবে। সাইফ স্পষ্ট দেখতে পায় প্রাঞ্জলের কাছে এখন বাবুনির থেকে বাবাইয়ের গুরুত্ব অনেক। মাঝে মাঝে ব্যাপারটা সাইফের মাঝে হিংসার সৃষ্টি করে।
– মুকিত, আপনার কাজ কেমন চলছে?
– বেশ ভাল।
– দেখতে দেখতে ছয় মাস হয়ে গেল। প্রাঞ্জল আপনাকে জ্বালাতন করে না তো?
– মোটেই না। ও খুব লক্ষী ছেলে। ওর বাবাই হতে পেরে নিজের কাছেই বেশ ভাল লাগছে।
মুকিতের বলা কথা সাইফের হৃদয় পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়।
– সব সময় কি ওর বাবাই হয়ে থাকতে পারবেন?
মুকিত তার স্যারের কাছ থেকে এমন কথা শুনে মাথা নিচু করে চুপ করে থাকে।
– সরি, আপনাকে বিব্রত করার জন্য।
– ঠিক আছে। কিছু মনে না করলে আপনাকে একটা কথা বলবো।
– বলুন।
– এখন প্রাঞ্জলের গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে। আগামী তিন দিন অফিসও বন্ধ আছে। প্রাঞ্জল আপনাকে খুব ফিল করে। আপনি প্রাঞ্জলকে নিয়ে কক্সবাজার ঘুরে আসুন না। ওর সমুদ্র দেখার খুব সখ।
– প্রাঞ্জল কি তার বাবাই কে ছাড়া এখন কোথায় যাবে?
– জ্বি?
– আপনাকেও আমাদের সাথে যেতে হবে।
– কিন্তু….
– কোন কিন্তু নেই। আমরা আজ রাতেই যাচ্ছি।
———-
খুব ভোরেই প্রাঞ্জল, সাইফ আর মুকিত কক্সবাজার এসে পৌঁছায়। আসার পথে প্রাঞ্জল তার বাবাইয়ের সাথেই থেকেছে। বিষয়টা কখনো সাইফকে আনন্দ দিয়েছে, আবার কষ্টও দিয়েছে।
ভ্রমণের ক্লান্তি যেন প্রাঞ্জলকে ছুঁতে পারেনি। সমুদ্র দেখার এক তৃষ্ণা তাকে জেগে থাকার তাড়না জুগিয়েছে সব সময়। তাই হোটেলে উঠেই তাদের সমুদ্র সৈকতে চলে আসতে হয়।
সৈকতে আসতেই মুকিতের মোবাইলে জুবায়েরের ফোন আসে।
– ইসস! ভেবেছিলাম এই বন্ধে তোমাকে নিয়ে একান্তে সময় কাটাবো। কিন্তু তোমাকে এখন বসের সাথে সময় কাটাতে হচ্ছে। জানো আমার এখন কেন যেন ভয় হয়।
– কেন?
– মনে হচ্ছে সাইফের বাচ্চা তোমার প্রতি দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। যখনই তার রুমে যাই তখনই শুধু তোমার গুণগান।
– ভয় নাকি হিংসা? কোনটা?
– অবশ্যই তোমাকে হারানোর ভয়।
এমন সময় প্রাঞ্জল এসে তার বাবাইয়ের হাত ধরে টানতে থাকে তার সাথে পানিতে নামার জন্য।
– এই শোন। এখন ফোনটা রাখ।
– ধুর শালা। এখন দেখি তোমার সাথে কথাও বলতে পারবোনা। ঠিক আছে ভাল থেক। বাই।
– বাই।
মোবাইল রেখেই মুকিত প্রাঞ্জলকে নিয়ে পানিতে ভিজতে গেল। সমুদ্রের পানির প্রতিটি ছোঁয়াই যেন প্রাঞ্জলকে আরো প্রস্ফুটিত করছে। কখনো প্রাঞ্জল তার বাবাইয়ের গায়ে, আবার কখনো বাবাই প্রাঞ্জলের গায়ে হাত দিয়ে পানি ছুঁড়ে দিচ্ছে। দূরে বীচ চেয়ারে বসে থাকা সাইফ বিষয়টা দেখছিল। কিছুটা হিংসা লাগলো তার মনে। ইচ্ছে হচ্ছে প্রাঞ্জলের বাবুনি থেকে বাবাই হতে।
সাইফ এই প্রথম প্রাঞ্জলকে নিয়ে পানিতে খেলায় মেতে উঠলো। প্রাঞ্জলের সাথে সাইফের আনন্দে মেতে উঠা মুকিতের বেশ ভাল লাগলো। সে পানি থেকে উঠে এসে চেয়ারে শুয়ে পড়লো। ক্লান্তি যেন তাকে ছুঁয়ে গেল। সে বীচ চেয়ারে ঘুমিয়ে গেল।
প্রাঞ্জল সৈকতে বালি নিয়ে খেলতে শুরু করলো। তৈরী করতে লাগলো একেক রকমের অবয়ব এবং প্রাসাদ।
সাইফের সিগারেটের তৃষ্ণা লাগায় চেয়ারে চলে আসলো। এসেই দেখলো মুকিত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। লাল রঙয়ের থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টের সাথে সাদা রঙের টি শার্টে মুকিত কে বেশ লাগছিল। ভেজা দেহের সাথে লেপ্টে থাকা টিশার্ট তার পেটানো শরীরের জানান দিচ্ছিল। টিশার্টটি নাভিমূলের বেশ উপরে উঠে ছিল।
ঘুমন্ত মুকিত যেন তোলপার করে দিচ্ছিল সাইফের অন্তর। সাইফের হাত ক্রমশ ছুঁয়ে দিতে গিয়ে ফিরে এসেছে ঘুমন্ত মুকিতের দেহ থেকে।
ক্রমেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সাইফ। মুকিতের গোলাপী ঠোঁট দুটি ছুঁয়ে দিতে চাইছে সাইফের মন। নিজের সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে যায় সাইফ। সব কিছু বুঝার আগেই ছুঁয়ে দেয় মুকিতের ঠোঁট। মুকিতও অবচেতন মনে সাড়া দেয় সাইফের চুম্বনে। দীর্ঘ চুম্বনের এক পর্যায়ে মুকিত ঘুম থেকে জেগে যায়। সে অনুভব করে তার ঠোঁটে সাইফের ঠোঁট।
মুকিত নিজেকে ছাড়িয়ে সোজা হোটেল রুমে ফিরে যায়।
মুকিতকে চুম্বন করে সাইফের মাঝে যেন এক অন্যরকম ভাল লাগা খেলা করছে। অনুভব করছে মুকিতের প্রতি তার ভালোবাসা।
সিদ্ধান্ত নেয় মুকিতকে তার ভালোবাসার কথা বলার।
———-
বীচ থেকে এসে মুকিত কাউকে কিছু না বলে ঢাকার উদ্দেশ্যে চলে আসে। প্রাঞ্জল আর সাইফ হোটেলে ফিরে রিসিপশনে জানতে পারে মুকিতের চলে যাওয়ার বিষয়টি। সাইফ একের পর এক মুকিতের মোবাইলে ফোন করতে থাকে। কিন্তু প্রতিবারই সুইচড অফ পায়। বাবাইকে কোথাও না দেখে প্রাঞ্জল অস্থির হয়ে উঠে। প্রাঞ্জল তার বাবুনিকে বাবাইকে নিয়ে আসার জন্য তাড়া দিতে থাকে। প্রাঞ্জলের তাড়নায় সাইফ অতিষ্ঠ হয়ে তাকে কষে গালে একটা চড় মারে। চড় খেয়েই প্রাঞ্জল নেতিয়ে পড়ে। নেতিয়ে পড়া প্রাঞ্জলকে দেখে সাইফ এক অজানা ভয়ে ঘাবড়ে উঠে। এ ভয় প্রাঞ্জলকে হারানোর ভয়। দিকবিদিক শূন্য সাইফ দ্রুত হেলিকপ্টারে করে প্রাঞ্জলকে ঢাকা এনে স্কয়ারে ভর্তি করে।
সাইফ বুঝতে পারে এই সময়ে প্রাঞ্জলের পাশে তার বাবাইকে বেশ প্রয়োজন। নাহলে যে কোন ভয়ংকর কিছু হতে পারে প্রাঞ্জলের সাথে। সাইফ আজ তার প্রাঞ্জলের শঙ্কায় জ্ঞানশূন্য হয়ে যাচ্ছে।
সাইফ প্রঞ্জলের বিষয়ে জুবায়েরের কাছে জানায়। জুবায়ের বিষয়টা জেনেই দ্রুত স্কয়ার হাসপাতালে ছুটে আসে।
জুবায়ের হাসপাতালে ছুটে আসলে সাইফ তাকে দ্রুত মুকিতকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে বলে।
– মুকিত যে প্রাঞ্জলের বাবাই। আমি ওর জন্মদাতা হলেও মুকিতই ওর বাবা। প্রাঞ্জলের এই অবস্থায় মুকিতের খুব প্রয়োজন।
– আপনারা গতকালই গেলেন। তিনদিন থাকবেন বললেন। অথচ আজকেই চলে আসলেন। মুকিত তো আপনাদের সাথেই ছিল। ও কোথায়?
– আপনি কিছুই জানেন না?
– কি জানবো? স্যার। কি হয়েছে? আমাকে সব খুলে বলুন।
– বেশ। কক্সবাজারে গিয়ে আমি মুকিতের প্রতি আমার ভালোবাসার বোধকে সামাল দিতে পারি নাই। ওকে আমি কিস করি ঘুমন্ত অবস্থায়। ও এই বিষয়টাকে মানতে পারে নাই। আমাদের কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে আসে।
– আপনি কি মুকিতকে ভালোবাসেন?
– আমি জানি আপনি মুকিতকে ভালোবাসেন। মুকিত এমন একজন ছেলে যে আমাকে তাকে ভালোবাসতে বাধ্য করিয়েছে। প্লিজ। আমার ছেলের জন্য হলেও মুকিতকে এখানে নিয়ে আসুন।
———-
জুবায়ের হাসপাতাল থেকে সোজা চলে যায় মুকিতের বাসায়।
– আমি ঢাকা আসছি এই খবর তুমি জানলে কিভাবে?
– সেটা না হয় পরেই জানো। একটা সত্যি কথা বলবে?
– কি বল?
– তুমি কি শুধু আমায় ভালোবাস?
– এ কেমন প্রশ্ন করছো? তুমিতো জানই।
– তুমি চোখ বন্ধ করে ভেবে আমাকে উত্তরটা দিবে প্লিজ।
– আমি চোখ বন্ধ করে শুধু আমার প্রাঞ্জলকেই দেখতে পাচ্ছি।
– আমি জানি তুমি প্রাঞ্জলকে নিজ সন্তানের মত ভালোবেসেছ। ভালোবেসেছ সাইফকেও।
জুবায়েরের কথা শুনে মুকিত চুপ করে থাকে।
– জানো মুকিত। ভালোবাসা এক অদ্ভুত ব্যাপার। এটা হয়ে যায়। তুমি নিজেও জাননা যে প্রাঞ্জলের সাথে সাথে তুমি কখন সাইফকে ভালোবেসে ফেলেছ। তেমনি সাইফও। আর প্রাঞ্জল তার কথা নাই বা বললাম। তুমি কি জানো তোমার প্রাঞ্জল এখন কোথায়?
– কি হয়েছে প্রাঞ্জলের?
– তোমার উপর রাগ করে সাইফ প্রাঞ্জলকে কষে চড় দেয়। এতে ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এখন অচেতন অবস্থায় স্কয়ার হাসপাতালে আছে।
জুবায়েরের মুখে প্রাঞ্জলের এমন অবস্থার কথা শুনে মুকিতের দুচোখ বেয়ে অশ্রু বন্যা বইতে শুরু করে।
– প্রাঞ্জলের কিছু হলে আমি ঐ খারুস টাকে ছাড়বোনা। ওকে মেরেই ফেলবো।
———-
মুকিত ছুটে আসে স্কয়ার হাসপাতালে প্রাঞ্জলের কাছে। ততক্ষণে প্রাঞ্জলের জ্ঞান ফিরলে তার বাবাইয়ের জন্য অস্থির হয়ে থাকে। বাবাইকে দেখে যেন তার ভয়ার্ত হৃদয়ে সাহস এলো।
– তুমি আমাকে একা রেখে কোথায় গিয়েছিলে।
– কোথাও না। তোমার কাছে একেবারে চলে আসতে নিজেকে গোছাতে এসেছিলাম।
মুকিত প্রাঞ্জলের থেকে উঠে এসে সাইফের কাছে যায়। তার ইচ্ছে করছিল সাইফের গালে কষে চড় দিতে।
– মনের ইচ্ছা কে দমিয়ে রাখতে নেই।
– মনের ইচ্ছা বুঝতে পেরেছ বলেই মাফ পেয়েছ।
– শুধু প্রাঞ্জলকে ভালোবাসলে হবেনা। প্রাঞ্জলের এই বাবুনিটাকেও ভালোবাসতে হবে?
– এহ। আমার বয়েই গেছে।
তারা দুজনেই অট্টহাসিতে একজন অন্যজনকে আলিঙ্গন করে নিল।
*****(সমাপ্ত)***** 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.