এপারে হৃদয় থাকে

লেখকঃ সজল আহসান

এক.

রবিন মেসে আসার পর থেকে মেস লাইফটা আমার কাছে সার্থক মনে হতে লাগল দিন দিন। রবিনকে প্রথমবার দেখেই আমার অন্তরে বাস করা ভিন্ন পুরুষ যেন জেগে উঠেছিল আমার প্রেমী হৃদয়ে ভালবাসার নিরন্তর আবেগের জন্ম দিয়ে।

দুই.

রাজশাহী ভার্সিটিতে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হবার পর ভার্সিটির অদূরেই বেলাভূমি নামক ছাত্রবাসটিতে যখন উঠেছিলাম তখন কোন ভাবেই সেখানে মন স্থাপন করতে পারিনি। সপ্তাহের সাতদিনের প্রায় চারদিনই নিজ বাসা আঁকড়ে ধরে থাকতাম। বাকী তিনদিন অনীহাকে আঙ্গুল দেখিয়ে, কষ্ট করে রহে সহে, মনের উপর জোর খাটিয়ে থাকতে হত। এর কারণ মেসের খাবারে আমার অরুচি, খাবার গলা দিয়ে নামতোই না। পানসে ডাল,আলুভর্তা,ভাজি এগুলোই নিত্যদিনের তিনবেলার মেনু। যে কটা দিন মেসে থাকতাম খেয়ে কখনোই পেট পুরতো না। সামান্য একটু মুখে দিয়েই ভাতের থালায় পানি ঢেলে দিতাম আর ছুট দিয়ে হোটেলে খেতে বসতাম। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য হোটেলের দামী খাবার যে প্রযোজ্য নয় তা হারে হারে টের পেলাম মাসিক খরচের হিসাব দেখে। তখন মাস শেষে হাতখরচের টাকাটাতে টানাপোড়েন পড়ে যেত। তবুও এভাবেই টলমল করে চলে গেল এক বছর। দ্বিতীয় বর্ষে উঠার পর দুইটা টিউশনির সন্ধান পেয়ে মেস ছেড়ে দিয়ে ভাল কোন ফ্লাটে থাকার সাধ জাগল মনে। আর তা পূরণে টুলেট ফ্লাট খুঁজতে লেগে পড়লাম। কিন্তু সাধ্যের জন্য বাধ্য হয়ে হাল ছেড়ে দিলাম। ফ্লাট রুমের ভাড়া আকাশ ছোঁয়া যা আমার পক্ষে বহন করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। রুমে আমি একাই থাকি। মেসে আসা অবধি আমার রুমটাতে কারো ঠাঁই মিলেনি। রুমটা একবারেই দোতলার কোনার দিকে হওয়াতে রুমটাতে উঠতে অনেকেই অনুৎসাহী। অবশ্য এজন্যই রুমটা ছাড়তে ইচ্ছে করেনা,আমার সবকিছু আমার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে। মেসে সিট খালি থাকলে অনেকেই আসে রুম দেখার জন্য। তবে রুম দেখে কেউ উঠতে চেয়ে উধাও হয়ে যায়, কেউবা মুখ ভেংচি দিয়ে বিদায় নেয়। আজকেও দুজন এসেছে, রুম পর্যবেক্ষণ করে একজনের মন্তব্য আগামীকালকেই উঠবে সে। তখন তাকে স্বাগত জানিয়ে মনে মনে হাসি দিয়ে বলি, দেখা যাবে ভাই, আগে তো আসুন তারপর উঠবেন। আমার এতটা নিশ্চিত হবার কারণ, এভাবে অনেকে রুমে উঠতে চেয়ে তাদের আর পাত্তা পাওয়া যায় না। সবাইতো আমার মত গোয়ার নয়।

পরদিন বিকেলে,
দরজার ওপাশে এক অপরিচিত কন্ঠস্বর শুনলাম,
– আসতে পারি?
আওয়াজ শুনে দরজার দিকে তাকাতেই এক সুদর্শন যুবকের চেহারার কোমলতায় চোখ গেল আটকে আমার। অচেনা সে যুবকের হাতে একটি বড় ব্যাগ, গায়ে নীল রঙের টিশার্ট আর চোখে সানগ্লাস। যেন একপলক দেখেই চোখ বুজে প্রেমে পড়ার মত তার চেহারা আর সম্মোহনী। আমি স্তব্ধ নয়নে তার দিকে তাকিয়ে বললাম,
– জি আসুন ……
সে নিষ্কুলষ, ভুবনভোলানো একটি চমৎকার হাসি দিয়ে বলল,
– আপনি সবুজ ভাই না?
– হুম আপনি?
– আমি রবিন, আপনার রুমমেট।
তার কথা শুনে খানিকটা অবাকস্বরে বললাম,
– রুমমেট মানে এরুমে তো আরেকজন উঠার কথা আজ।
– হ্যা আমিই সেই জন।
আমি আবারও প্রশ্নসূচক ভঙ্গিতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
– মানে…. কাল তো অন্য একজনকে দেখেছিলাম।
সে আবারও মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
– ও ও ও, আপনি মারুফের কথা বলছেন বোধহয়।
– নাম জানি নাহ
– মারুফই হবে, কাল সে এসেছিল রুম দেখতে, আমি আসিনি। ও নিচ তলায় উঠেছে আর আমাকে এখানে আসতে বলল।
– ও……

আলাপন পর্বের পর রবিন ব্যাগ রেখে বিছানা গোছাতে শুরু করল। ভাবলাম তাকে কি বলব আমার সাহায্য লাগবে কিনা? কিন্তু বললাম না, দোটনা আমাকে বলতে দিলনা। কেবল আড়চোখে তার দিকে দৃষ্টি ঠেকিয়ে তার সৌন্দর্যে ডুব দিয়ে ভাললাগার রাজ্যে হারাতে লাগলাম। একজন সুন্দর ছেলেকে দেখে তাকে নিয়ে ভালবাসার স্বপ্ন দেখা আমার সমপ্রেমী মনটার সপ্ত দোষ। যা থেকে আমি বেরিয়ে আসতে পারিনা, জানি আদৌ পারব না। হয়তো এই পুরুষপ্রেমী আবেগ আমার রক্তে মিশে গেছে।
বিছানা গোছানো শেষে রবিন আমার দিকে তাকাতেই চোখ সরিয়ে নিলাম।

– সবুজ ভাই, একটু পানি হবে।

যুবকের মুখে দ্বিতীয়বার সবুজ ভাই ডাকটা কর্ণপাত হতেই বুকের একটা শূন্য জায়গা হঠাৎ পূর্ণ হয়ে গেল। আমি মাথা নেড়ে হ্যা বোধক উত্তর দিয়ে পানির বোতলটা তার হাতের কাছে এগিয়ে দিলাম। পানি খেয়ে রবিন ব্যাগ থেকে ফিট বিস্কুটের একটা প্যাকেট বের করে খুলে আমার সামনে ধরে খেতে বলল। আমি খেতে চাইলাম না, কিন্তু রবিনের জোড়াজুড়িতে দুজনেই প্যাকেটের সব বিস্কুট সাবাড় করলাম।

রবিনের বাড়ি রংপুর, রাজশাহী ভার্সিটিতে বিবিএ প্রথমবর্ষে ভর্তি হয়েছে কয়েকদিন হল। এমনটাই শুনলাম তার কাছে। ব্যক্তিগত থেকে পারিবারিক এভাবেই বিভিন্ন প্রসঙ্গ টানতে টানতে গভির রাত হয়ে গেল সেদিন। আমি চোখবন্ধ করে সৃষ্টিকর্তার নিকট শুকরিয়া আদায় করলাম। জানতাম আমার এ শুকরিয়া অনৈতিক,অযৌক্তিক। কিন্তু তবুও নিজের ভেতর এক অন্যরকম অনুভূতির আবেশ আমাকে ঘিরে রাখল মনের অতলে এক নতুন আশার চর জাগিয়ে। সেদিন থেকেই ওর মন পাওয়াই যেন আমার প্রতিদিনের লক্ষ্য , আশা আর ভাবনায় রুপ নিল। রবিনের আগমনে আমি বাড়ি যাওয়ার কথা ভুলেই গেলাম। সপ্তাহের বদলে মাসে একবার যেতাম তাও দুদিনের জন্য। বাড়িতে বলতাম- পড়াশুনার ভীষণ চাপ থাকতে পারবনা। আর রুমে থাকলে সবসময় রোমান্টিক গান শুনতাম, নাটক দেখতাম। সপ্তাহ অন্তর গানলোডের দোকানে গিয়ে রোমান্টিক নাটক মোবাইলে ভরিয়ে নিতাম। অথচ একটা সময় রোমান্টিকতার ধারের কাছেও ঘেষতাম না, ন্যাকা ন্যাকা মনে হত বলে। নাটক দেখার সময় যখন রোমান্টিক দৃশ্য আসত তখন রবিনের মুখায়ব কল্পনা করতাম আর দৃশ্যটা অনুভব করতাম গভীর ভাবাবেগে। কখনো কখনো ডায়েরী নিয়ে বসতাম, নাটকের যেসব সংলাপ ভাল লাগত সেগুলোকে লিখে রাখতাম। ভাবতাম এভাবেই বলে একদিন রবিনকে প্রোপোজ করব। মাঝে মধ্যে সংলাপগুলো একাই একাই বলে মোবাইলে রেকর্ড করে শুনি, কেমন লাগে শুনতে তা বোঝার জন্য। কিন্তু সাহসের অভাবে ভালবাসার কথাটা অপেক্ষার সাগরে নিমজ্জিত রেখে বুকের শ্বাস টেনে সময়ের কাঁটা গুনতে থাকি। বলি বলি করে সকাল গরিয়ে বিকেল আসে, বিকেল হারিয়ে রাত, রাত ফুরিয়ে দিন। আজ পেরিয়ে আগামীকাল আসে তবুও বুকে চাপা কথাটি বলতে পারিনা।

দিন পরিক্রমায় রবিনের সাথে আমার নিবিড় বন্ধুভাব গড়ে উঠল। দুজনে একসাথে খাই, একজন না খেলে আরেকজনের জন্য অপেক্ষায় থাকি, একসাথে ভার্সিটি যাই, ছাদে বসে সময়জ্ঞান হারিয়ে একটানা গল্পে মেতে উঠি। আর এসবের সমষ্টিগত প্রভাব আমার অন্তরকে রাঙিয়ে দিয়ে বসন্তের নির্মল বাতাসের ন্যায় হূদয়কে রোমাঞ্চিত করে মনে অঝোর প্রেম বইতে শুরু করল। মেসে আমার একটা নাম ছিল দাবারু হিসেবে। দাবা খেলার পারদর্শীতায় আমার সমকক্ষ তেমন কেউ ছিলনা। খরবটি কারো কাছে জানতে পেরে রবিন আমার সঙ্গে দাবা খেলার জন্য উৎসুক ইচ্ছা দেখাত। ওর ইচ্ছায় সাড়া দিয়ে দুজনে দাবা খেলতে বসতাম, কিন্তু রবিনও হেরে যায় আমার কাছে। মাঝে মাঝে সে বাজিও ধরে, হোটেলে খাওনোর বাজি। কিন্তু সেক্ষেত্রেও রবিন পরাজিত হত। আর আমাকে নিয়ে হোটেলমুখী হয়ে টেবিলে বসিয়ে দিয়ে খাবারের ওর্ডার দিত। খেতে খেতে আমি ওর মুখের দিকে চাইতাম আর চুপিচুপি হাসতাম। তবে খাওয়া শেষে বিলটা জোরপূর্বক আমিই শোধ করতাম। পকেটের ব্যাপারে রবিনের মনোযোগ যথেষ্ট, এই কয়েক মাসে তা অনুধাবন করেছি অনেকটা। একটা টাকাও এদিক ওদিক হতে দিত না, এতে বড়ই হিসেবী স্বভাব তার। তবে কখনো পকেটে মল মাস শুরু হলে আমার কাছে ধার নিত। আমিও আমার গচ্ছিত সবটুকু তাকে দেয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতাম। আর তার ফেরত দেবার দিন টাকা নিতে জোর গলায় অপারগতা প্রকাশ করতাম। তখন সে একটা সুরেলা মনমুগ্ধকর হাসি দিয়ে বলত,এটাতে তো শুধু আমারই অধিকার আছে, আমার পকেটেই থাক তাহলে। ওর কথা শুনে আমিও হাসিতে সুর মেলাতাম,পুলক অনুভব করতাম। কিন্তু যখন বিছানা গোছাতে যেতাম বালিশ তুলতেই চোখে পড়ত ওর টাকাটা।তখনমনটা মেঘলা হয়ে যেত,রাগ হত ভীষণ আবার কান্নাও আসত।

তিন,

রবিনের বন্ধু মারুফ প্রায়ই রুমে এসে দুজনে খোশগল্পের আড্ডা জামাত। মাঝে মাঝে আমিও তাদের হাসি ঠাট্টার রসালো আড্ডায় যোগ দিতাম। একদিন তাদের আড্ডায় কথায় কথায় মারুফ রবিনকে বলল,
-রবিন তুই যা সুন্দর দেখতে অথচ প্রেম করতে চাস না। মাঝে মাঝে আমারই তোকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে।
– বলিস কি তুই, তুই কি গে নাকি রে যে আমাকে ভালবাসবি?
– আরে কথার কথা বললাম, তুই গে সম্পর্কে জানলি কীভাবে রে? আমার তো তোকেই সন্দেহ হচ্ছে।
মারুফের কথাটা শুনে রাগান্বিত কন্ঠে রবিন বলল,
– ফালতু, তুই কি আদ্যিকালে পরে আছিস নাকি, দুনিয়ায় কত কি ঘটছে? তাছাড়া লাইফ ওকে চ্যানেলে দেখিসনা,এসব নিয়ে নাটক তো প্রায়ই দেখায়।
– হুম, ভালোই তো জানিস দেখছি। দেখিস মেয়েদের লাইনে ছেলে ডুকে আবার তোকে প্রোপোজ করে না বসে যেন।
-ছিঃ ছিঃ ছিঃ, ইয়াক! এটা হবার আগে যেন আমার মরণ হয়।
-এতে ধীক জানানোর কি আছে। যার যার ভাললাগা তার তার কাছে। সবার চাওয়া ভিন্ন হতেই পারে।
-চুপ কর তো। যত সব আজাইরা প্যাচাল।

রবিন আর মারুফের কথাগুলো নীরব শ্রোতার মত একের পর এক শুনে গেলাম। গে সম্পর্কে রবিনের এরুপ বিরুপ মন্তব্য বিষকাঁটার মত আমার বুকে বিঁধে হৃদয়টাকে ক্ষত বিক্ষত করে দিল। ভাঙা কাঁচের মত মূহুর্তেই চূর্ণ বিচূর্ণ হল আমার সমস্ত আশা, বাসনা, অব্যক্ত আকুলতা। মনে হল আমি যেন জেনে শুনেই বিষ পান করেছি। কিন্তু অবুঝ মনটা নিয়ে অসম্ভবের কাছে মাথা ঠুকে পরাজিত হয়েও কি আশায় যেন বুক বাঁধি। হয়তো ভুল করে ভালবাসি,হয়তো ভুল ভেবে ভালবাসি। তবুও ভালবাসি, নিভৃতে ভালবেসে যাই তাকে ওদের কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই আমি রুম থেকে বেড়িয়ে পরলাম টিউশনিতে যাবার উদ্দেশ্যে। টিউশনি শেষ করে মেসে ফিরতে আর ইচ্ছে হল না। ফোন বন্ধ করে উদাসীন মনে ধীর গতিতে রাস্তায় হাটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে কয়েকজন বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেল। তাদের সাথে আড্ডা দিতে রাত প্রায় ১২ টা বাজার উপক্রম হল। তাড়াতাড়ি করে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে মেসের দরজায় এসে দেখি তালা লাগানো। তখন তালা নেড়ে দুতিনবার শব্দ করতেই রবিন নিচতলায় নেমে তালা খুলে কোন কথা না বলে ফরফর করে রুম ডুকে পড়ল। আমিও রবিনের পা অনুসরণ করে নিঃশব্দে ওর পিছু পিছু রুমে ডুকে পড়লাম। আমি কথার বলার আগেই রবিনের চোখে চোখ পড়তেই চোখাচোখা দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে বলল,

– এতক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনি, রাত কটা বাজে সে খেয়াল কি আছে আর ফোনটাই বা অফ রেখেছেন কেন?
আমি ওর কথার কোনরুপ জবাব দিলাম না। ইচ্ছে করেই চুপ থাকলাম। আমাকে নিশ্চুপ দেখে সে আবার বলতে শুরু করল,
-কথা বলছেন না যে, কি ভাবেন নিজেকে? আপনার জন্য আমি কতটা টেনশনে ছিলাম তা জানেন?মেস বন্ধ হয় রাত ৯টায়, শুধু আপনার জন্যই মেস মালিকের কাছ থেকে জোর করে চাবিটা নিয়ে রেখেছি। নিন খেতে বসুন।
রবিনের কথা শেষে ঠায় দাড়িয়ে আমি নিচু গলায় বললাম,
-আমি খাব না, তুমি খাও।
– বললেই হল, আপনার জন্য আমি না খেয়ে রাত জেগে বসে আছি। বসুন, হাত ধুয়ে নিন …

আমার উপর রবিনের এভাবে জোরালো অধিকার প্রয়োগ জীবনে দ্বিতীয় কাউকে অনুভব করলাম,একটা সময় মাও এভাবেই রাগ ঝেরে হাত টেনে নিয়ে খেতে বসত। পরে রবিন নিজেই আমার হাত ধুঁইয়ে দিয়ে ভাতের থালায় হাতটা বসিয়ে দিয়ে খেতে বলল। আর রবিনকে যেন নতুনভাবে নিরীক্ষণ করতে লাগলাম আমি। তার চোখে মুখে যেন আদুরে প্রেমের ছাপ, এক আনিবার্য টানে ভালবাসার আহবান জানাচ্ছে তার অপলক দুটি চোখ। খাওয়া শেষে দুজনে নিজ নিজ বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আমার চোখজোড়ায় ঘুম ঘুম আবেশ তবুও এই অনাকাঙ্খিত উপহার বিন্দু বিন্দু ভালোলাগা গেঁথে গেঁথে মনের মাঝে যেন গহীন প্রেমের সিন্ধু তৈরী করে সানন্দে নির্ঘুম করে রেখেছে আমায়। মেস লাইফে সেদিনই প্রথম দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম। তারপর থেকে রবিনকে দেখলেই বুকের ভেতরটা নড়ে উঠত, তার সামনে বলা কথাগুলো লাইন ছাড়া হয়ে যেত, তার চোখের পানে তাকালেই চোখের পাতা কাঁপত, হাত পা অসাড় হয়ে যেত। মনের উপর ঐকান্তিক জোর খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, তাকে আমার মনের লালন করা কথাটা জানাবোই। এই আশ্বাসে অনেক প্রকার ছল খুঁজতাম তাকে ভালবাসি বোঝানোর জন্য। তার নিকটে এসে তার হাতটা চেপে ধরে থাকি, তার মাথায় হাত বুলাই পরম আদর দিয়ে, তার সামনে প্রেমের গান গাই, কবিতা পড়ে শোনাই। তবুও সে আমায় বোঝেনা, তার জন্য আমার অন্তরের সমস্ত সীমারেখা ছাড়ানো চোখের অগাধ ভালবাসা সে বোঝেনা।

সময় চলে গেল আমার সাধন হল না। কারন কানে শুধু মারুফকে বলা সেদিনের সেই কথাগুলো ভেসে আসত। মনের কোণে ভয়ে চেপে বসতো, যদি আমার দূর্বলতা ধরা পড়ে তার কাছে? যদি সে জানতে পারে আমি সমকামী। এভাবেই নীরব ভালবাসার সরব দুঃখ হৃদয়ে পুষতে পুষতে সময় অতিক্রম হয়ে যায়। এর মধ্যে রবিন ভার্সিটিতে মিমি নামের এক মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল। সে প্রায়ই আমাকে তার প্রেমিকার গল্প শোনাত যখন আমরা শুয়ে পড়তাম। রবিন অনর্গল মিমির কথা বলতেই থাকত আর আমি বুকের ভেতর থেকে নির্গত দীর্ঘশ্বাসকে গলা টিপে বুকেই চেপে রেখে হু,হ্যা বলে তাকে সাড়া দিতাম। কখনো কখনো অন্তরালে চোখের জল মুছতাম। বলতে বলতে একসময় রবিন গাঢ় ঘুমে বিভোর হয়ে যেত। কিন্তু দুঃস্বপ্নের অন্ধকারে আমার ঘুম হারিয়ে যেত। কি যেন ভাবতাম, ভাবতে ভাবতে অনেক রাত হত। এক এক করে প্রতিটি রুমের আলো নিভে যেত। পুরো শহর ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে নিঃশব্দের শহরে পরিনত হত। শুধু আমি জেগে থাকতাম, আধ আঁধারে চোখ মেলে রবিনকে দেখতাম, কান পেতে ওর নিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনতাম। আর মনে মনে বারবার নিজের ভেতরটাকে বলতাম তোমাকে অনেক ভালবাসি রবিন, অনেক ভালবাসি। কেউ শুনত না তা, রবিনও না। কেবল আমিই শুনি, আমার হৃদয় শুনে।হয়তো অন্তর্যামীও শুনেন আমার গোপনীয়তা।

দুইটা বছর ধরে দুজনে একই ছাদের নিচে জীবনযাপন করেও মনের কাছে দুজনেই যেন দুই জগতের বাসিন্দা। মিমি আর রবিনের প্রেমময় সম্পর্কে যখন বিষাদ ডুকে পড়ত তখন রবিন পড়ার টেবিলে মাথা নিচু করে মনমরা হয়ে বসে থাকত। কারো সাথে কথা বলত না, ভার্সিটি যেত না কখনো রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। তখন ওর কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনাহীন আমিই সান্ত্বনার বানী বক্ত করতাম। ও খেতে চাইত না জেদ করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ত। আমিও ওকে ছেড়ে খেতে পেতাম না, না খেয়েই শুয়ে পড়তাম।

কিছুদিন পর,

বুকে জমা কষ্টের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রচন্ড জ্বরও আমার পিছু নিল। সাথে বমি, মাথাব্যাথার কারনে বিছানা থেকে মাথা তোলার শক্তি মনে সঞ্চার করতে পারছিলাম না। সেদিনগুলোতে রবিনকে এভাবে একান্তভাবে পাশে পাব তা আদৌ ভাবিনি। আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, যথা সময়ে ঔষধ খাওয়ানো, খাবার খাওয়ানো,কপালে জলপট্টি দেয়া সর্বপরি আমার সবকিছুর দায়িত্বই যেন তার কাঁধে নিয়েছিল সে। মাঝে মধ্যে আমার কাছে বসে কপালে হাত দিয়ে আমার শরীরের তাপমাত্রা অনুভব করত। তখন অবচেতন মনেও তার হাতের স্পর্শ পেয়ে জেগে ওঠে তাকে বলি …
– রবিন আমার জন্য এতকিছু করছো কেন?
আমার কথা শুনে রবিন লম্বা ঠোঁট মেলানো হাসি দিয়ে বলে,
– কি যে বলেন,সবুজ ভাই! রুমমেট হিসেবে এটা করা তো আমার কর্তব্য।
-কিন্তু সবাই তো এভাবে করে না।
– সবাই তো আর আমি নয়।
আমি ওর কথার উত্তর না দিয়ে নীরব থেকে যাই। সেও কিছু না বলে দূরে সরে যায়।

জ্বর সেরে উঠার কদিন পরেই বাড়িতে চলে গেলাম। সেবার পারবারিক একটা সমস্যার কারনে প্রায় ২০ দিন পর মেসে এসেছিলাম। আর রুমে ডুকেই আমার বুকের ভেতরটা আঁতকে উঠল। রুমে রবিনের বেডিং পত্র, জামাকাপড়, বইপত্র কিছুরই অস্তিত্ব নেই।রবিনের মেস ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা মনে ঠেস মারতেই আমি উদভ্রান্তের মত রবিনকে খুঁজতে খুঁজতে নিচতলার সিঁড়িতে নামতেই রবিনের মুখোমুখি হলাম।
– সবুজ ভাই আপনি এসেছেন শুনে আপনার কাছেই যাচ্ছিলাম।
– তোমাকে রুমে না পেয়ে তোমার জন্যই নিচের রুমে যাচ্ছিলাম।
– কিছু মনে করিয়েন না। আমি এখন মারুফের রুমে আছি। ওই রুমে একাই থাকে, তাই আমাকে জোর করে এখানে এনেছে।
– ও ও ও
-প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন ভাই।
– ঠিক আছে, আমি কিছু মনে করিনি।

আর কথা টানলাম না, রুমে চলে এলাম নিদারুন কষ্টের অভিশাপ বুকে বেঁধে। ভাবলাম আর অলীক মায়ায় নিজেকে আবদ্ধ রাখবনা, রুম থেকে বের হব না, রবিনের সামনে দাঁড়াব না। পাশের বেডটা দেখলেই মনে হত চির একা হয়ে গেলাম আমি। আগেও একা ছিলাম কিন্তু তখন সে একাকীত্বকে উপভোগ করতাম আর এখন এই একাকীত্বের মাঝে নিজেকে শুধু অসহায় মনে হয় প্রতিনিয়ত। আমাকে রুম থেকে বের হতে না দেখে রবিনই আসত আমার রুমে। ওকে দেখেই আমার সব অভিমান, তাপ, শোক মুহুর্তেই ভেঙ্গে যেত। আশা ছাড়ি তো নেশা ছাড়তে পারিনা, নেশা ছাড়ি তো আশা ছাড়তে পারিনা। আমার অন্তরে বাসকরা ভিন্ন পুরুষ তা ছাড়তে দেয়না। সবকিছু ভুলে হৃদয়ে আবারও অকৃত্রিম ভালাবাসা জাগিয়ে প্রেমের সুধা পান করার আশায় বসে রইলাম। গোপন আঘাত প্রতিঘাতে মন কাঁদত, বুক ভাঙত। তবুও অপেক্ষার শান্ত বানী দিয়ে মনটাকে ক্ষণিক নিশ্চিন্ত করতাম আর প্রশান্ত নয়নে গভীর প্রণয়ের দাবিতে রবিনকে ভাবতাম। এরপর একদিন রাতে শুয়ে পড়ব এমন সময় রবিন আমার রুমে হাজির। ওকে হঠাৎ এতরাতে আমার রুমে দেখে বিস্ময়ময় দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে কৌতুহলী কন্ঠে বললাম,
– তুমি এত রাতে?
– আপনার কাছে শুতে এলাম।
– মানে?
– মানে কিছুই না।
– মজা করতেছো কেন?
– মজা নয়। মারুফের কয়েকজন আত্মীয় এসেছে। আমার বিছানা তাদের দখলে। তাই এখানে এলাম। আপনার কোন আপত্তি নেই তো।
– আপত্তি থাকবে কেন, শুয়ে পড়।

এই প্রথমবার রবিন আর আমি খুব পাশাপাশি, পরস্পরের শরীর ছুঁয়ে শুয়ে আছি দুজনে। ওর শরীরের স্পর্শী টানে আমার পিপাসিত মনে নিবিড়ভাব জমা হয়ে প্রবল ধারার উচ্ছ্বাসের মত আমাকে শিহরত করতে লাগল। এতদিনের সাধ মিটিছে ভেবে আমার চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেল। মাঝরাতে রবিনের হাতটা আমার কোমড়ে আঁচড়ে পড়তেই আমার অনুভূতি যেন পাথর প্রায়। তখন ওর বুকে লুটে পড়তে ব্যাকুলতায় ছটফট করতে লাগলাম। কিন্তু ব্যর্থ হলাম, কানে কানে সেই কথাটাই শূল হয়ে ঠুকত। তখন নিজেকে সংযত করে শক্ত হয়ে শুয়ে থাকি। আমার ঘুম আসেনা। প্রিয় মানুষকে এত কাছে পেয়েও দুই হৃদয়ের দূরত্ব আমাকে দূরে ঠেলে দেয়। অনুচ্চারিত প্রেমকষ্টে নিঃস্বরে হৃদয়টা কেঁদে ওঠে।

চার

সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার পরও বারবার কিসের টানে যেন একটা অসম্পূর্ণতা আমাকে গিলে খাচ্ছে। বইপত্র, পোশাক, বেডিংপত্রসহ অন্যান্য ব্যবহৃত জিনিস এখন ব্যাগের মধ্যে থেকে কক্ষ ত্যাগের প্রহর গুনছে। তবে সব প্রস্তুত করে আমি নিজেই যেন অপ্রস্তুত। এক কাল্পনিক চাওয়া পাওয়ার সমীকরণ মেলাতে আশার খেরোখাতা নিয়ে বসে আছি। আজ শ্রাবণ মাসের শেষদিন। শ্রাবণ হয়তো আবার ফিরে আসবে পরের বছর বৃষ্টি হয়ে আকাশের বুকে। কিন্তু আমি আর কখনো ফিরবনা প্রিয় স্মৃতিভরা এই মেসটিতে,কখনো ছুঁয়ে দেখতে পারবনা আমার বোবা কান্নার সাক্ষী জানালাটা, বিনিদ্ররাতে ছুটে গিয়ে ছাদের কোণে বসে আকাশ দেখতে পারবনা। আমার পাঁচবছরের বাসভূমি বেলাভূমি মেসটিতে আজকের দিনটি আমার জীবনের শেষ দিন। গতকাল প্রকাশিত মাস্টার্সের রেজাল্ট আমার জন্য বিদায় বার্তা নিয়ে এসেছে।

আজ সন্ধ্যায় রাজশাহী ছেড়ে আমাকে চট্টগ্রামে পড়ি জমাতে পাড়ি হবে। বাইরে অবিরাম ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে বৃষ্টির ফোঁটা শেষবারের মত গাঁয়ে মাখার জন্য ছাদে উঠে দাড়ালাম। ছাদ থেকে ভেজা শহরটাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটা আস্তে আস্তে আমার শরীরের প্রতিটি পশম ভিজিয়ে স্যাঁতস্যাঁতে টিশার্টটাকে জড়িয়ে ধরেছে। পায়ের নিচে ছিপছিপে জমা জল। এত জলের মাঝেও আমার চোখদুটোতে যেন ক্ষরা আর বুকে প্লাবনের স্রোত। এখন শুধু বুকটাই কাঁদে চোখদুটো কাঁদেনা। বুক পর্যন্তই কষ্টটা ওঠা নামা করে শুধু। কিছুক্ষণ পর রবিন ছাদে এসে আমাকে ভিজতে দেখে বলল,

– সবুজ ভাই আপনি এখানে কেন ?
আমি পিছন ফিরে রবিনকে দেখে একটা ফ্যাকাসে হাসি দিয়ে বললাম,
– এমনিতেই, ভিজতে ইচ্ছে হল তাই এলাম।
-জ্বর আসবে তো আপনার।
– আমার আবার জ্বর! শরীরের অসুখ ঔষুধে সেরে যাবে কিন্তু মনের ….
– কি হয়েছে আপনার, আপনি কেমন যেন হয়ে গেছেন এখন!
– মানুষের প্রতিটা সময় কি আর একরকম থাকে, থাকেনা। জানো রবিন মাঝে মাঝে আমার মনে হয় পৃথিবীতে মায়া বলতে কিছু নেই। হৃদয় বলতে কোন শব্দ নেই। মনে হয় আমি কারো নই, কেউ আমার জন্য নয়। কোনদিন হবে কিনা তাও জানিনা।
– আমি বুঝতে পারতেছি ভাই, আপনার খুব মন খারাপ। আজকেই কি চলে যাবেন?
– হ্যা, আজ সন্ধ্যায়।এখান থেকে ঢাকা তারপর চট্টগ্রাম।
– আপনাকে খুবই মিস করব ভাই।

রবিনের কথাটা বুকের ভেতরে কেমন যেন চিনচিনে ব্যাথা জাগিয়ে তুলল। কোন কথা আসল না, শুধু বড় বড় দুটো নিঃশ্বাস ছাড়লাম। আমার নীরবতাকে টেনে পরক্ষণে রবিন আবার বলল,
– ভাই এখন আমার একটা ইচ্ছের কথা শুনবেন ,
– কি ইচ্ছে?
– ইচ্ছে হচ্ছে, মিমির সাথে বৃষ্টিতে ভিজি, ভেজা শরীরে তাকে বুকে জড়িয়ে রাখি।
– তাই, আমার কি ইচ্ছে হচ্ছে জানো?
– কি?
– না কিছু না….
– আপনার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে, ঘরে যান প্লিজ।

আজ শেষদিনে রবিনের শেষ অনুরোধটা মেনে নিয়ে চলে যেত ধরলাম। ওকে আর বলতে পেলাম না, আমার সব ইচ্ছে, স্বপ্ন শুধু তাকেই ঘিরে। বলতে পেলাম না ওর হাতটা চেপে ধরে আমার অনেকক্ষণ ভিজতে ইচ্ছে হচ্ছে, ওর ভেজা ঠোঁটে ঠোঁট মেলাতে, বুকে মাথা রেখে ভেজা শরীরের উষ্ণতা পেতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমার ইচ্ছেগুলোর অপেক্ষা কোনদিন শেষ হবেনা আমি জানি। হয়তো বুকে আটকা থাকতে থাকতে একদিন মরে যাবে তারা। আমার ভালবাসা আর ভালবাসার সন্ধান পেল না, রবিনের ভালবাসা পাওয়ার আগেই আমি ভালবাসাকে হারিয়ে ফেলেছি। আর আমার হৃদয়টা তার অজান্তেই তার দখলে চলেগিয়ে আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। শেষ দিনেও আমারশ্বাস থেকে নতুন আশা বেরিয়েআসছে। দূর থেকে থেকে রবিনকে তৃষ্ণার্ত চোখে দেখছি, যদি সে ছুটে আসে আমার কাছে, যদি আমাকে বুকে টেনে নিয়ে বলে, সবুজ আমি তোমাকে ভালবাসি,তোমার পাশে থাকতে চাইl

কিন্তু হায়! আমার এ আশায় যে অযাচিত, অপূরণীয়। রবিন আর আমার দিকে ফিরে তাকায় না। সে বৃষ্টির কাছেতার দেহমন সঁপে দিয়েছে, বৃষ্টিস্নানে মগ্ন তার সময়। আমি তার পিঠ দাড়ানো ভেজা শরীরটার দিকে তাকিয়ে এক পা দুপা
করে পিছিয়ে যাচ্ছি। আমার থেকে একটু পরেই হারিয়ে যাবে পাঁচ বছরের চেনা ঠিকানা, হারিয়ে যাবে রবিন নামে হৃদয়ে বাসকরা এই প্রিয় মানুষটি। কিন্তু আমার ব্যথিত অনুভবে, নীস্তব্ধ হৃদয়ে সে চিরদিনের অপেক্ষা হয়ে বেঁচে থাকবে। তাইতো হৃদয়টা এপারে রেখে শুধু অপেক্ষা নিয়েই চলে যাচ্ছি তাকে ছেড়ে অনেক অনেক দূরে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.