টিনের চালে দাঁড়কাক

লেখক: Divuninun Kites

পৃথিবীতে দুই ধরনের বাসা আছে, সুখ বাসা ও দুঃখ বাসা। আমাদের বাসাটা দুঃখ বাসা। সেই হিসেবে এই বাসার রং হওয়া উচিৎ ছিল মারাত্মক কালো। কালো তবে “মারাত্মক”টা দুঃখের বিশেষণ হিসেবে থাকবে। কিন্তু আমাদের বাসার রং ঘিয়া। বাবা দুবছর আগে নব উদ্যমে বাসা রং করিয়েছিলেন। ঘর থেকে বাইরে বের হতে গিয়ে দেখি বাবা বার্জার পেইন্টসের বিজ্ঞাপনের মতো কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখ হাসি খুশি কিন্তু রোদে কপাল ঘামছে আর সামনেই আমাদের বাসা রং করা হচ্ছে। আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, দেখেছিস! বাসাটাকে কেমন জীবন্ত মনে হচ্ছে?

বাবা! অদ্ভুত কথা বলো না প্লিজ। বাসার জীবন থাকে না।
হুম তা ঠিক। তবে একবার দেখইনা কেমন লাগছে!
ভালো লাগছে না বাবা! টিনের চালের জন্য খ্যাত খ্যাত লাগছে।
আরে ছাদ তো হয়েই যাবে। রিটায়ার্ড করলেই দু’হাতে গরগর করে টাকা আসবে দেখিস। তখন দেখবি বাসা ভেঙ্গে নতুন বাসা করা হয়ে গেছে।
বাবা চা খাবে?
দিতে বল এক কাপ।

আমি চা চাওয়ার জন্য রান্নাঘরে গেলাম। সাধারনত আমি রান্নাঘরে আসি না তবে মাঝে মাঝে চা লবনের জন্য আসতে হয়। রান্নাঘরে মা কে পেলাম না একই সাথে আমার আবার ঘরে ঢুকতে ভালো লাগছে না। আমি বেরিয়ে আসলাম।
চা দিতে বলেছিস?
হুম বাবা, এক্ষুনি পাঠাচ্ছে।
বলতে গিয়ে মিথ্যার কোথাটাও বলে ফেলেছি। এতক্ষনে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আমি মারাত্মক মিথ্যা কথা বলি। তবে এখন আর বলি না। যাইহোক আমি এখন দুঃখ বাসার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। বাইরে আসার কারন হচ্ছে হট্টগোল হচ্ছিলো খুব। এটা ১৯৭১ সাল না, বাওয়ান্ন চোষট্টি কোনটাই না। ২০১৫ সাল, সেলফি যুগ। একটু সামনেই এক ভদ্রলোক বিমর্ষ ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তার কোলে একটা বাচ্চা মেয়ে ওনার গলা জড়িয়ে চোখ বুজে আছে। সম্ভবত অসুস্থ হবে। আমি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার মেয়ের কি জ্বর?
উনি কিছুই বললেন না। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে তবুও জিজ্ঞেস করলাম, রিকশা ডেকে দিবো?
উনি আগের মতোই ভাব করলেন জেনো উনি কিছুই শুনতে পাননি।

এমন সময় একটা রিকশা চলে আসল এবং অদ্ভুত পিতা এবং কন্যা তাতে উঠে চলে গেলো। ভেবেছিলাম কোনো মেডিকেলের নাম বলবে বাট ওনারা মহাম্মদপুর হলে রিকশা নিয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার! তবে মানুষ হিসেবে আমরা প্রত্যেকেই অদ্ভুত। তারপরেও একজনের আরেকজনকে অদ্ভুত লাগে। যেমন আমার একটা পোষা মাকড়শা আছে। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অনেকের কাছে অদ্ভুত লাগবে। হয়ত আমার বয়স ষোল হলেও ব্যাপারটা মানা যেত। কিন্তু ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে মাকড়শা নিয়ে পড়ে থাকবে ব্যাপারটা মানা যায়না! আমার মাকড়শা নিয়ে অবশ্য তীব্র’র একটা উক্তি আছে। তবে সেটা একটু অশ্লীল তাই বলতে পারলাম না। তীব্র’র বেপারটাই এখন বলতে ইচ্ছে করছে না। আমি বাইরে বেরিয়েছিলাম কি হলো দেখতে কিন্তু এখন আর বাসায় ঢুকতে মন চাচ্ছে না।আজ ক্লাস ছিল যাইনি। তবে এখন ক্যাম্পাসে চলে যাওয়া যায়। এখন আবার যেতে ইচ্ছে করছে না। এরকম ব্যাপার আমার প্রায়ই হয়। একটা কিছুর উদ্দেশ্যে বের হলে আর সেটা করতে ইচ্ছে করে না। এইটাইপের সিচুয়েশনগুলোতে আমি রাতুলকে ফোন দেই।বেশিরভাগ সময় ফোন ধরবে না তবে দিন ভালো হলে ধরবে।আজকে মনে হচ্ছে দিন ভালো। শুধু ভালো না অতিরিক্ত ভালো। ভালোর আগে ‘অতিরিক্ত’টা বিশেষণ হিসেবে বসবে।

হ্যালো রাতুল!
হুম বল।
আজ লিপুদের বাসায় গিয়েছিলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে পা মচকে ফেলেছি।এতক্ষণ ডাক্তারের চেম্বারেই ছিলাম। এখন ব্যাথার ট্যাবলেট কিনতে লাজফার্মায় আসলাম।ভাবলাম এতো কাছে এলাম শুধু শুধু তোকে একটা ফোন দেই।
তোর ব্যাথা এখন কেমন?
এখন বেশি নেই। তুই কি আসবি?
আচ্ছা দাড়া আসছি।
আচ্ছা আয়।

এখন রিকশায় রবীন্দ্র সরোবর যেতে হবে। সিট! রিকশায় যাওয়া যাবে না তার পকেটে কেবল ২৯ টাকা আছে।আর এক টাকার একটা কয়েন ছিলো কোথাও হয়ত পড়ে গেছে। প্রতিবারই ইচ্ছে করে রাতুলের জন্য সে কিছু নিয়ে যাবে। আহামরি কিছু না। তবে ক্যাটবেরি-কিটক্যাট এইসব আরকি। কিন্তু কখনই নেওয়া হয় না। কলেজে থাকতে অবশ্য রাতুলই এইসব হাবিজাবি দিতো ওকে। স্পেশালি লাল কাগজে মোড়া “কিটক্যাট”।

বাস থেকে নেমে গলা শুকিয়ে গেছে। মাথার উপর মনে হচ্ছে এক কড়াই রোদ। কড়াই বললে ভুল হবে। জ্বলন্ত কড়াই। কড়াইয়ের আগে ‘জ্বলন্ত’টা বিশেষণ হিসেবে বসবে।পাশেই লেবুর সরবত বিক্রি হচ্ছে। পাঁচ টাকা গ্লাস। খাওয়া যাবে না কারন ফেরার সময় সে একটা বিড়ি কিনে ধরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরবে। এখন তার মনে হচ্ছে বাসে অন্ধ লোকটাকে দশ টাকা দিয়ে দেওয়া উচিৎ হয় নি। কিন্তু যখন সে রাতুলের কথা ভাবতে থাকে তখন সে এমন ভুল ভাল কাজ করে ফেলে।এবং প্রতিবারই নিজেকে স্টুপিড বলে গালি দিতে ইচ্ছে করে। বাংলায় কোন গালি নেই, সবই কথা।তবে ইংরেজি গালিগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও তা গায়ে লাগে। এটা অবশ্য আমার কথা না তীব্র’র কথা।
আমার মেজাজ খারাপ হলে আমি কঠিন কঠিন কথা বলি। সেদিন আমি মেজাজ খারাপ করে বলেছিলাম,“তুই বিষ খেয়ে মরে যা”। তীব্র বলল জানিস তোর মধ্য কঠিন ফিলোসফি আছে! এর পর সে এই অদ্ভুত কঠিন কথাটা বলেছিলো।
আবার একবার চা খেতে খেতে তীব্র বলেছিলো, আচ্ছা চল আমরা হারায় যাই!

আশ্চর্য! আমি তোর সাথে হারাতে যাবো কেনো!!ইচ্ছে হলে আমি নিজেই হারিয়ে যাব।
কাধের উপর কারো হাতের স্পর্শে বাস্তবে ছিটকে পরলাম।বাস্তবের আগে কঠিন বসবে।বিশেষণ হিসেবে না,চরম সত্য হিসেবে।বাস্তব সবসময় কঠিনই হয়।
কি রে কেমন আছিস?
ভালো।
অনেকক্ষণ বসে ছিলি না?
কই না তো!
আন্টি কেমন আছে?
ভালো। তুই কেমন আছিস?
ভালো। এই ছেলেটার হাসি মারাত্মক।আমি রবীন্দ্রনাথ না হলে নিশ্চয়ই রাতুলের হাসি নিয়ে একটা কবিতা লিখে ফেলতাম। অবশ্য একদিন লিখতে বসব। রবার্ট ব্রুস যুদ্ধে হেরে হেরে জিতে গেছেন এর পুরা ক্রেডিট একটা মাকড়শার। আমারও মাকড়শা আছে সো রবীন্দ্রনাথ না হলেও রবার্ট ব্রুস অবশ্যই হওয়া যায়।
পায়ের ব্যাথা এখন কেমন?
ভালো।পানি খাব।
তুই বয় আমি নিয়াসছি।
একজায়গায় বসে থাকতে ভালো লাগছে না রে আমিও যাবো। হাত ধর! তোর তো কোনো কাণ্ডজ্ঞানই নেই! আমি একা ভাঙ্গা পা নিয়ে দাঁড়াতে পারছি না।
এমুহূর্তে আমি রাতুলের হাত ধরে হাটছি।এখন মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি আমার একটা পা ভাঙ্গা থাকলে ভালো হতো।
আচ্ছা শোন আমি পানি খাব না। আইসক্রিম খাইতে ইচ্ছা করতেসে।
তুই না সারাজীবন বাচ্চাই থাকবি। খা আইসক্রিম! আমি খাবো না।
নিশ্চয়ই রাতুলের আগের কথা মনে পড়ল। একবার দুজনে আইসক্রিম খাচ্ছি, আমার আইসক্রিম ইচ্ছা করে মাটিতে ফেলে দিয়ে ওর অর্ধেক খাওয়া আইসক্রিমটা চাইলাম। আমি খাচ্ছি এবং রাতুল হা করে চেয়ে ছিলো। আমার জিবনে সুখ মুহূর্ত খুব কম।তবে সে মুহূর্তটাকে সুখ মুহূর্ত বলা যেতে পারে। আমার জিবনের সুখ মুহূর্তগুলো আমি একটা কাল্পনিক বাক্সে জমা করে রাখি। গভীর রাতে সে বাক্স খুলি।বারান্দায় বসে বকুল গাছটার দিকে চেয়ে আমি অদ্ভুত সেইসব সুখ মুহূর্তে ডুব দেই।
রাতুলের পকেটের ফোনের শব্দে বাস্তবে ফিরে এলাম।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমি বাংলামটর মোড়ে হাঁটছি। বাড়ি ফিরতে একদম ইচ্ছে করছে না। এইমাত্র রাস্তার পাশ থেকে দুইটা চিতই পিঠা কিনেছি।সাথে শুঁটকি ভর্তা দেওয়া। খেতে ভালোই লাগছে। রাতুলের সাথে আইসক্রিম, পানি কিছুই খাওয়া হয়নি। ওর একটা ফোন এসেছে ও চলে গেছে। ভেবেছিলাম এবার দেখা হলে অনেক কিছুই বলব। কিছুই বলা হয়নি। প্রতিবার রাতুল সামনে আসলেই সব কিছু জট বেধে যায় সেই জট খুলে কিছুতেই কথা গুছিয়ে বলা যায় না। যাবার সময় রাতুল জিজ্ঞেস করল, তোর কাছে বাস ভাড়া আছে? কি লজ্জার ব্যাপার। সে আমার হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো। আচ্ছা এই চলে যাওয়া নিয়ে একটা কবিতা লিখলে কেমন হয়! সে অনেকদিন ধরেই ভাবছে একটা কবিতা লিখবে। যেমন এই কবিতাটার প্রথম লাইন হবে,
কি অদ্ভুত সুন্দর চোখ তোর!
ধুর আর কিছুই মাথায় আসছে না। কে জানে জীবনানন্দ, নিরমেলেন্দু গুনেরা কবিতা কিভাবে লিখত।কোথায় যেন পড়েছিলাম কষ্ট থেকে কবিতা লেখা যায়। তার মানে আমার এখন কষ্ট হচ্ছে না। একটু একটু শীত পড়েছে হাঁটতে আর ভালো লাগছে না এখন। হাসপাতালে চলে যাওয়া যায়। ফুফুকে বলেছিলাম আজ যাব। আমি হেটে হেটে ঢাকা মেডিকেল যাচ্ছি। এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে রাস্তারও দুই প্রকার সুখ রাস্তা, দুঃখ রাস্তা। যে রাস্তা অন্ধকার, হাটার সময় মন খারাপ করা সৃতি মাথায় ঘুরঘুর করে সেগুলো দুঃখ রাস্তা। আর যে রাস্তায় হাটার সময় কারো আঙ্গুল ধরা যায়,আনমনেই জিজ্ঞাস করা যায় ”আইসক্রিম খাবে?”,সেগুলো সুখ রাস্তা।

আমি হাসপাতালে পৌঁছে গেছি। নিচের ফার্মেসি থেকে দু’টা নাপা কিনলাম। ইদানিং গভীর রাতে প্রচুর মাথা ব্যাথা উঠে। হাসপাতালের বারান্দায় ফুফু বসে আছেন। পান চিবুচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বলে উঠলেন, কি রে মা’রে দেখতে আইতে মন চায়না না! আমি একটু হেসে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছেন? এটা আমার নকল হাসি। গভীর কষ্টে থাকলেও আমার নকল হাসি কখনো ভুল হয় না।
ফুফু বারান্দা থেকে উঠে চলে গেলেন।মেঝেতে চাদর বিছানো আছে। আমি শুয়ে রইলাম। কখন ঘুমিয়েছিলাম কে জানে? ঘুমের মধ্যই টের পেলাম আমার মাথা ব্যাথা শুরু হয়েছে। বারান্দায় টিউব লাইট জ্বলছে।রোগীর আত্মীয়রা সবাই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ কেউ নিচু স্বরে পাশের জনের সাথে হাত নেড়ে নেড়ে আলাপ করছে। সংসারি আলাপ হবে নিশ্চয়ই। হুট করে আমার প্রবল বমি বমি ভাব হলো, আমি ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসে গড়গড় করে বমি করলাম। চিতই পিঠা দুটা ছাড়া কিছু খাওয়া হয়নি এজন্যই বোধহয় একটু কষ্ট হলো। আমার পেছনে একটি মেয়ে ছুটে এলো বুঝতে পারলাম। আপনি ঠিকাছেন তো?,কিশোরী গলা শুনে ফিরে তাকালাম।
মেয়েটার দুই হাতে মেহেদী,চিকন দুটি সোনার চুড়িও চোখে পড়ল। নতুন বিয়ে হয়েছে নিশ্চয়ই। নতুন বিয়ে হওয়া মেয়েদের মধ্য প্রথম কিছুদিন কোনো অদ্ভুত কারনে জগতের সবার জন্য গভীর মমতা থাকে। কে জানে হয়ত তারা সবচেয়ে বেশি সুখে থাকে আর জগতের সবার মধ্য সেই মমতা ছরিয়ে দিতে চায়। মেয়েটার একটু দুরেই তার স্বামী দাঁড়িয়ে আছে। আড় চোখে দেখছেন কিন্তু কিছু বলছে না।
পানি দিয়ে মুখটা ধুয়ে ফেলুন।
জী।
ধুর!দেখুন কি বলছি?সাথে পানি আছে?
জী?

পানি!পানি আছে, সাথে? আসুন আমাদের সাথে। আমি এইমাত্র পানি দিয়ে মুখ ধুয়েছি। ড্রামের পানি দিয়ে মুখ ধুলেই হতো কিন্তু আমাকে মেয়েটা হাতে মিনারেল ওয়াটারের বোতল ধরিয়ে দিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে মুখ না ধুয়ে পানিটা রেখে দিলেই ভালো হতো। পরে খাওয়া যেত। পিপাসা লাগলে হাসপাতালের বাইরে আসাটা বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। মুখ ধোয়ায় এখন শীত শীত করছে। ভোরে হবে মনে হয় একটু পর। মেয়েটা জিজ্ঞেস করল লেবু চা খাবেন? আমি কিছু বললাম না। হাসপাতালের বাইরের টং দোকানে লেবু চা পাওয়া যায় না এই ব্যাপারটা বোধ হয় এনার জানা নেই। এই প্রথম মেয়েটার স্বামী জিজ্ঞেস করল, কিছু খাবেন?
জী না। কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।
একেবারে খালি পেটে থাকবেন না, আবার খারাপ লাগতে পারে। এতক্ষণ এই ভদ্রলোককে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছিল। এখন মনে হচ্ছে অনেক পুরনো। খুব পরিচিত কেউ।
না, ধন্যবাদ, বলে আমি উঠে চলে আসলাম। মেয়েটা তার স্বামীর হাতে এক হাত দিয়ে ধরে রেখেছে। দেখতে ভালো লাগছিলো।
মা কে খুব খুব দেখতে ইচ্ছে করছে! এ কথাটা আমি কাওকে বলতে পারিনা। এখন সকাল হয়ে গেছে ওয়ার্ডে ঢুকতে দেওয়ার কথা।
আমি ওয়ার্ডে ঢুকলাম। আমার দিকে চোখ পড়তেই মা অন্য দিকে তাকালো। মা কে চেনাই যাচ্ছে না। চেহারাটা অনেক ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি পড়ায় চোখগুলো ছোট ছোট মনে হচ্ছে। নার্স এসে আমাকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে গেছে। আবার ঔষধ চেঞ্জ করা হয়েছে। মোটামুটি সুস্থ তবে ইম্পুভমেন্ট কম। আজ কয় দিন ১৩ না ১৪ দিন হবে ঠিক মনে পড়ছে না। আমি ফুফুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঔষধ কিনতে বের হলাম। টাকা দেওয়ার সময় ফুফু বলছিলেন, এইবার সুস্থ হইলে বিয়ে করবি ব্যাডা। ভাসিতিতে পরস চাকরিতো একটা পাবিই। কথাগুলো বলার সময় দাঁত কেলিয়ে কেমন হাসছিলেন। এখানে আর থাকতে ভালো লাগছে না। ঔষধ গুলো কিনে দিয়েই কেটে পড়তে হবে।

তীব্র!
জী।
তীব্র তোমার নাম?
জী।
আগে পরে কিছুই নেই!
সার্টিফিকেটে দেখতেই পাচ্ছেন।
স্ট্রেঞ্জ। সার নেইম, মিডেল নেইম কিছুই নেই?
জী না।
এটা প্রথম ইন্টার্ভিউ না। এর আগেও সে বহু ইন্টার্ভিউ দিয়েছে। কাজ হয়নি। প্রতিবার নাম নিয়েই ঝামেলা শুরু হয়ে যায়। বিসমিল্লাহতে গলদ টাইপ। তার এসির বাতাসে দম বন্ধ বন্ধ লাগছে। এখান থেকে ছুটে পালিয়ে আগে সে পার্কে বসে বাদাম খাবে। এই দুপুরে রমনায় বাদাম বিক্রি করে কি না কে জানে!
তীব্র?
জী স্যার।
তুমি এখন আসতে পারো।
এই ভদ্রলোকের তাকানো দেখেই বোঝা গেছে এখানে তার চাকরি হবে না। মনে মনে একটা গালি দিলো সে, মাদারচোদ একটা!
ম্যাগাজিনের অফিস থেকে বেরিয়েই সে সিগেরেট ধরালো। ধরিয়েই ফেলে দিলো। সিগারেটের গন্ধ সে একদম সহ্য করতে পারে না আর টানবে কিভাবে? তবু প্রচণ্ড রাগ উঠলে সে সিগেরেট ধরায়।

খানকির পোলা! আগে তো সার্টিফিকেট দেখবি! নাম ধুয়ে কি তুই ওইটা চুসবি! মিডিয়া এন্ড জার্নালিজম থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট আর কয়টা পাবি তুই? মাদারচোদ! তোর ম্যাগাজিনে আমি তো পায়ে ধরলেও চাকরি করব না। তোর ম্যাগাজিন টাইটানিকের মতো ডুবুক। জ্যাক আর রোজের যায়গায় তুই আর তোর বৌ মর। মরলেই হবে না… মেজাজ খারাপ করে সে রমনায় ঢুকল। তার গাছের নিচে বসতে ভালো লাগে। গাছের নিচে বসলে অদ্ভুত সব চিন্তা আসে মাথায়! পুরাই অন্য রকম! একবার সে গাছের নিচে বসে আছে,হঠাত কোত্থেকে জেনো দুজন হিজরা আসল টাকা চাইতে। হিজরাদের দেখে মনে হলো আচ্ছা! ধর্মে কেন হিজরাদের কথা নেই! হিন্দুধর্মে হিজরারা রাক্ষসী। আর ইসলাম ধর্ম তো শান্তির ধর্ম। ইসলাম ধর্মে হিজরাদের জন্য কিছু বলা হয়নি। মানে ধর্ম কর্ম সব নারীদের জন্য হিজরারা পল্লিতে থেকে বেশ্যার জীবন জাপন করলে কোন সমস্যা নেই!

এর মধ্যই একজন বলে উঠল ওই সুন্দর পোলা টাকা দে।
টাকা নেই।
দে কইতেছি, ভালো হবে না কইলাম!
দিবো না।
তোর ওইটা… বালের…
মেজাজ খারাপ হলে তীব্রও অনেক বেশি অশ্লীল কথা বার্তা বলে। এর মধ্যেই পার্কে তাদের ঘিরে মানুষ জড় হয়ে গেলো।
তার উদ্দেশ্য হিজরাদের শেষ কথা ছিল,”তুই একটা বেশ্যা, বেশ্যা কতি। তোর টাকায় খ্যাতা পুড়ি”।

এ মুহূর্তে তার মন খারাপ লাগছে।তার উদাস হবার কথা কিন্তু ভয় লাগছে। নামের কারনেই কি না তার রাগ,দুঃখ, আনন্দ সব কিছুই তীব্র। তার সহজে মন খারাপ হয় না। হলেই জগতটা উল্টা পাল্টা লাগে।সব কিছুই উল্টা পাল্টা হয়ে যায়।এর আগে একবার তার এমন মন খারাপ হয়েছিলো। সন্ধ্যা বেলায় সে বরিশালের লঞ্চে উঠে পড়ল। লঞ্চেই এক লোকের সাথে পরিচয় হলো। কথায় কথায় জানতে পারল ওনার আত্মীয়র দুটা কিডনিই নষ্ট। একটা কিডনি লাগবে। তীব্র মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকায় একটা কিডনি দিয়ে দিলো। পৃথিবীতে বোধহয় তার কিডনিই সবচেয়ে সস্তাদরের।

সেই টাকায় সে অনেক কিছু করবে ভেবেছিলো।শত হলেও নিজের টাকা। মিথ্যুকটা খালি সব সময় বাইরে বের হলেই আইসক্রিম আইসক্রিম করত। মিথ্যুকটার সাথে প্রতিদিন বিকেলে হাত ধরে আইসক্রিম খাওয়া যেত,রিকশায় করে ঘুরা যেত। একবার শিশু একাডেমীর সামনে একটা মোমবাতি স্ট্যান্ড দেখেছিলো মাটির। সেতু সেই মোমদানিটা কিনবেই কিনবে। তখন কারো পকেটেই টাকা ছিল না আর লোকটা একশ আশি টাকার নিচে সেটা বিক্রিই করবে না। সে টাকাটা পাওয়ার পর গিয়েছিলো সেই দোকানটায়। বিক্রি হয়ে গেছে তবে সে প্রায়ই গিয়ে খোঁজ নেয় সেরকম মোমবাতিদানি আর এসেছে কি না। অদ্ভুত সুন্দর জিনিষটা।দুটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে তারা দুজনেই হাত বারিয়ে আছে কিন্তু কেউ কাওকে ছুঁতে পারছে না। তাদের না পারার কষ্টটা চোখে মুখে ফুটে আছে মূর্তিদুটির। কিন্তু যখন মোম জ্বালানো হবে তখন মনে হবে এরা একে অপরকে ধরে আছে,ব্যাখ্যাটা আমার না সেতুর দেওয়া। আমার কাছে শুধু পুরুষ মূর্তি দুটির নগ্নতাই চোখে পড়ে।

কি যেন ভাবছিলাম!ও হ্যাঁ, সেবার কোথাও ঘোরা হয়নি। আর হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফেরার পর কেউ জিজ্ঞেসও করল না এই কদিন কোথায় ছিলাম। শুধু পিচ্চি জুই’টা বলল,ভাইয়া তোমাকে অনেক রোগা রোগা লাগছে। জুই আমার দূরসম্পর্কের চাচাত বোন। কেমন বোন জানি না তবে যদি কোনোদিন বলে ভাইয়া, আমি চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তোমার চোখদুটি আমাকে দিয়ে দাও তাহলে আমি সত্যিই আমার চোখ দুটা জুইকে দিয়ে দিবো। কেনো জানি আজ মন খারাপের মাত্রা তীব্রতর হচ্ছে। নামটাতেই সমস্যা।আমার আব্বু আম্মু থাকলে এখুনি আকিকা দিয়ে নেইম চেঞ্জ করে দিতে বলতাম। ব্যক্কল একটা! মানুষের নাম ‘তীব্র’ হয়। সে সবাইকে গালি দিলেও স্যারকে কখনো গালি দেয় না। ভুলে দিয়ে ফেলাতে এখন আরো বেশি খারাপ লাগছে। এই লোকটাই তো তাদের মতো অনাথদের ধরে এনে পরিবার বানিয়েছে, যদিও নকল পরিবার তবুও পরিবার তো। কে জানে আসল পরিবার কেমন হয় নিশ্চয়ই অনেক সুখের!

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আজ সারাদিনে সেতু কিছুই করেনি। সারাদিন ঘুরেছে। আজকে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করেছে সে মৌচাক থেকে মালিবাগ পায়ে হেটে যেতে মাত্র ২১১৮ বার পা ফেলতে হয়। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং! ইদানিং মিথ্যে বলার মতো কাওকে পাওয়া যাচ্ছে না তাই সে কিছু ইন্টারেস্টিং জিনিষ আবিষ্কার করেছে। ইংলিশে ইন্সটেড অফ বলে একটা শব্দ আছে, যার মানে ‘পরিবর্তে’। যদিও শব্দটা সিউর হওয়া যাচ্ছে না। তীব্র থাকলে ওকে জিজ্ঞেস করা যেত। সিউর না হওয়া পর্যন্ত মন উসখুস করবে। তবে পৃথিবীর সব বাজে দিকের একটা ভালো দিক আছে যেমন এখান থেকে তার এখন শাহবাগ যেতে হবে।হাঁটতে আর এক মুহূর্তও ইচ্ছা করছে না।তবে মাথায় কোনো একটা ব্যাপার চলতে থাকলে সে হাঁটতে হাঁটতে তেতুলিয়া পর্যন্ত চলে যেতে পারবে। বাসেও যাওয়া যেত কিন্তু সে দুপুরে পাউরুটি,চা,কলা আর একটা স্টার খেয়ে টাকাটা খরচ করে ফেলেছে।
এই সেতু! সেতু!

রাস্তায় কেউ কখনো আমাকে ডাকে না। পরিচিত কেউ হলে তো আরো আগে পাশ কাটিয়ে ফিরে চলে যাবে। আমার অবাক হতে ইচ্ছে করছে না তবুও অবাক হয়ে ফিরে তাকালাম।
চৈতী তুই?
ওহ বেবি! কল মি চৈত্র। নাম চেঞ্জ করেছি।‘চৈত্র’র মধ্যে একটা আর্ট আছে। বাই দ্যা ওয়ে, তোর এই অবস্থা কেনো! চুল দাড়ি কাটিস না কেনো। তোকে রবীন্দ্রনাখ লাগছে।কোঁকড়া চুলের রবীন্দ্রনাথ। আচ্ছা আর কারো কি চুল বড় ছিল?
হুম, ছিল তো। কাজী নজরুল ইসলাম।
ওহ ইয়েস! ন্যাশনাল পয়েট।
তোর সাইডের চুল গুলি কেটে ফেললি কবে? সুন্দর ছিল তো।
ওহ বেবি! তুই বুঝবিনা। এটা রিহান্নার ডায়মন্ড লুক।
ও আচ্ছা।
আচ্ছা! ক্লাসে আসিস না কেনো?
একটু ফেমেলি প্রব্লেম রে। আমি নকল হাসির চেষ্টা করলাম। হয়েছে কি না কে জানে!
তো তোর বি এফ কেমন আছে!
বি এফ!! কি বলিস তুই!সবাই জানে আর তুই…
অরিন ভালো আছে। ইনফেক্ট আমরা ভালো আছি। নেক্সট মনতেই সিঙ্গাপুর ট্যুরে যাচ্ছি।
কোথায়? আঙ্কেল অ্যান্টির ওখানে?
নো বেইব! ব্যান্ডের সাথে। আমাদের ব্যান্ড ‘চত্রচলন’।
ও আচ্ছা। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম রে। ইদানিং কিছুই মনে থাকে না।
আচ্ছা চল, একটা পার্টিতে যাচ্ছি।তোর ভালো লাগবে।
আচ্ছা চল!
পার্টিটা বেশ জমকালো। ভালোই লাগছে। এখানে নিশ্চয়ই চৈতির ব্যান্ড পারফর্ম করবে।
আসলেই লাইফটা কতো সুখের!
বেইব! আমাদের ভকালিস্ট মিসিং। সেলও সুচড আউট। তুর্যর যায়গায় তুই পারফর্ম করে ফেল! তুই তো ভালোই গাইতে পারিস। ক্যাম্পাসে প্রায়ই শুনতাম।
আমি! কি বলিস এসব?
প্লিজ। নয়ত সেই ইন্সাল্ট হয়ে যাবে আমাদের।
ওকে ট্রাই করছি।
দলছুট ধরিস। পাব্লিক বেশি খায়।
আমি ষ্টেজে উঠলাম। অন্যরকম লাগছে। হুট করে রাতুলকে চোখে পড়ল,লাইট অফ হয়ে গেলো।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।

কান্দো কেনে মন
কান্দিয়া কান্দিয়া যাইব তোমার জীবন রে…
ড্রামস, গিটার সব একসাথে শুরু হয়ে গেলো, সেদিকে আমার খেয়াল নেই।
দুঃখ সুখের দুইটি ধারা বইছে নদীর জল
সুখে পাইব তোমার ডিঙ্গা করি আপন ছল।
তাইতো বলি ওরে ও মন, এ যে কঠিন ঠাই
কোনখানে পাঠাইয়া দিলো দয়া মালিক সাঁই।
কান্দো কেনে মন পাগলা রে।

সেই পারফমেন্স দিলি রে! আমরা তো বুঝতেই পারিনি তুই কার গান তুললি।
অরিন বলল টিযে কে কভার করতেসিস। আগে বলবি না তুই ফুয়াদের গান আপ করবি।
আমি হাসার চেষ্টা করলাম। এবারের টা আসল ছিল।
আমি আসি রে।
খেয়ে যা।
আজ না রে।ভালো থাকিস।
বাই।
পার্টি থেকে বেরহওয়ার আগে রাতুলের হাত ধরে টান দিলাম।সবসময় যেভাবে দিতাম সেভাবে না এটা অন্য ভাবে। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, ভালোই যদি নাই বাসটি স্বপ্ন দেখানোর কি দরকার ছিল! যদি ফাজলামিই করবি বললেই পারতি। আমি খুশি হয়ে সারাজীবন তোর সাথে প্রেমের মতোই নাটক করে যেতাম। যদি ভালোই না বাসতি কি দরকার ছিল হাতটা ধরার? জানিস তোর মতো কেউ আমার আঙুল তার আঙুল দিয়ে জড়িয়ে নেয়নি। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার কি জানিস! আমার যা চাই তার সব তোর মাঝে আছে কিন্তু তুই যা চাস তার কিছুই আমার মাঝে নেই।
এই কথা বলার পর আর রাতুলের দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করছে না। আমি রাস্তায় চলে এলাম।রাস্তায় এসেই একটা কবিতা মনে চায়ের দোকানে বসে লিখে ফেললাম।
কি সুন্দর চোখ তোর!
কিন্তু কি ভুল ছিল আমার।
আমি ভালোবেসেছিলাম,বেঁচে ছিলাম।
মরে গিয়েও বেঁচে ছিলাম হাজারবার।
হাজারবার।

আর লিখতে পারলাম না।এখন রাত কয়টা বাজ? ১টা না দেড়টা? কবিতাটা খুব পরিচিত কাওকে দিতে ইচ্ছে করছে। আচ্ছা তীব্র কেমন আছে? ওর বাসা তো ধানমন্ডিতেই। বাসার নাম্বার কতো ছিলো ২৭/এ না?
আমি তীব্রর বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তীব্র কি দরজা খুলবে! আমার এ মুহূর্তে কোন অনুভূতি নেই তবুও আমি মনে প্রানে চাচ্ছি তীব্র দরজাটা খুলে দাঁড়াক। এটাই কি জীবন?
আমি কলিং বেল টেপার সাথে সাথেই একটা বাচ্চা মেয়ে দরজা খুলে দিলো। মনে হচ্ছে সে আমাকে দেখে কিছুটা আশাহত হয়েছে। অন্য কাওকে আশা করেছিলো হয়ত।
কি নাম তোমার?
জুই।
খুব মিষ্টি নাম।
তীব্র কি বাসায় আছে?
না, ভাইয়া এখনো ফেরেনি।
ও আচ্ছা।
ভাইয়া আসলে কিছু বলতে হবে?
আমি একটু হেসে দিয়ে বললাম ‘না’।
তুমি কি চলে যাচ্ছো?
হুম।
আবার কবে আসবে?
আর আসব না।
ও।
আমি গেটের কাছে আসতেই জুঁই দৌড়ে এলো।
ভাইয়া শুনো, তোমাকে একটা কথা বলি?
বলো।
তুমি অনেক সুন্দর!
এই প্রথম আমার মনে হলো ভালোবাসাটা সর্বজনীন। পবিত্র একটা মায়া।
কিন্তু আমি তোমাকে আর দেখতে পাবো না। আমার চোখে কঠিন একটা অসুখ হয়েছে। আমি খুব শীঘ্রই অন্ধ হয়ে যাবো, কথাটা বলে মেয়েটা একটু হাসার চেষ্টা করল।
আমি পকেট থেকে কবিতাটা বের করে ওর হাতে দিলাম।ও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে বিস্ময়! আমি রাস্তায় চলে আসলাম। হলুদ বাতি,লাল বাতি, কতো রঙের বাতি। ল্যাম্পপোষ্টের নিচের রাস্তাটা গাড় হলুদ।ঘড়ির ডায়েলে এখন রাত তিনটা বাজে।
আমি হাসপাতালে পৌঁছলাম।

হাসপাতালের পরিবেশটা কেমন যেন গুমট লাগছে। আমি বারান্দায় পৌঁছেই দেখি সবাই দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কারো মুখেই বেদনা নেই। মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম মা’র কিছু হয়নি! ফুফা এগিয়ে এসে চিল্লাচিল্লি শুরু করলেন, তোর জন্যই তোর মা মরছে!! হারামজাদা! এক্ষুনি বের হ তুই এখান থিকা!! আমি কিছুই শুনতে পারছি না। মনে হচ্ছে অনন্তকাল থেকে কেবলই দাঁড়িয়ে আছি। ভিড় থেকে কয়জন এগিয়ে এসে ফুফাকে শান্ত করার চেষ্টা করলে উনি আঙুল তুলে চিৎকার করে বলেন “ও সমকামী”। কোথা থেকে যেন সেই মেহেদী পরা মেয়েটি এগিয়ে এসে আমার দু’হাত ধরে বাইরে আস্তে করে বাইরে নিয়ে এলো। পেছন থেকে আমি অট্টহাসি শুনতে পাচ্ছি আর তার মাঝে ফুফার গলা; নরকেও ঠাই হবে না তোর।
এখন আমার কষ্ট হচ্ছে কিন্তু পৃথিবীর কোন বিশেষণ এই কষ্টের আগে বসবে না। আমি আমাদের দুঃখ বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আর ঢুকতে ইচ্ছে করছে না।
বাবা বেঁচে থাকতে সবসময় চাইতেন ভালো স্কুলে পড়ি, ভালো খাই, ভালো কলেজে উঠি এবং একদিন মানুষ হই। মা কখনো ভাত মেখে খায়িয়ে না দিয়ে থাকতে পারত না। শুধু ছোট একটা শব্দে সব কিছু বদলে গেছে। এখন বলতে ইচ্ছে করছে, মা! আমি মিথ্যে বলেছিলাম, সরি। আমি বিয়ে করব,এক্ষুনি করব। প্লিজ তুমি ফিরে এসো! ঠিক বিষ খাওয়ার আগ মুহূর্তে। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমি দুঃখ বাসার দিকে তাকিয়ে আছি। আমাদের টিনের চালে একটা কাঁক বসেছে।
পাশেই সেদিনের বাবা আর মেয়েটিকে দেখলাম। তারা রিকশায় করে ফিরে এসেছে। মেয়েটি বাবার কোলে শুয়ে কাঁদছে। খুব জানতে ইচ্ছে করছে কি হয়েছে? মেয়েটির কি খুব জ্বর? থাক না কিছু কারন অজানাই। জগতের সব কারন জানতে নেই।
আমি হাঁটছি। কোথায় যাবো জানি না। টেকনাফ,তেতুলিয়া,আসাম,মেখালয়,মায়ানমার,মস্কো?
সকালের রোদ উঠেছে! অদ্ভুত সে আলো। আমি তাকিয়ে আছি রোঁদের দিকে।
তুমি চাইলে কাঁদতেও পারো। হাসতে পারো। আমার যে খুব কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে! আমি কি করব বলো?

তীব্র লঞ্চের ছাদে শুয়ে আছে।লঞ্চের নাম এইচ টি হামিদ। লঞ্চের নাম সে খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছে।লঞ্চ কোথায় যাচ্ছে সে জানে না। এখন সব কিছুতেই আগ্রহ লাগছে তার হয়ত শেষ বারের মতো এজন্যই। কাল সারা রাত ধরে সে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে তাঁরা দেখেছে। সেই দিনটার কথা তীব্র’র খুব মনে পড়ছে। হলুদ ল্যাম্পপোষ্টের আলোয় বসেছিল আমরা, আমি অদ্ভুত ভাবে সেতুর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওর হাসি দেখে পৃথিবীতে আরো কিছুদিন বেশি বাঁচতে ইচ্ছে করছিলো। খুব ভালো বন্ধু ছিলাম আমরা। সেই হলুদ আলোর নিচে সেতুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা!তুই কি কাওকে ভালোবাসিস?
হুম, হয়ত বাসি।
কাকে রে!
তুই উত্তর দিলিনা, হেসে দিলি। আমি তোর দিকে অবাক হয়ে চেয়ে ছিলাম। কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। সেদিন আমিও তোর মতো মিথ্যে করে জিজ্ঞেস করেছিলাম,রোমান্স করবি?
কি করব তোর হাতটা ধরতে ইচ্ছে হচ্ছিলো খুব, খুব।
কিন্তু যেদিন গভীর রাতে উইমেন্স মেডিকেল কলেজের ওভারব্রিজের ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসে দুটা সাদা গোলাপ দিয়ে বলেই ফেললাম,
আই লাভ ইউ স্টুপিড! সত্যিই, আই রিলি ডু।
তুই কেবল বললি “ওঠ”। আর কিছুই বলিস নি। আর কখনই আর কিছুই বলিস নি তুই। জানিস আমি তখন বুঝতে পারছিলাম না আমার কেনো কষ্ট লাগছে!খুব খুব কষ্ট লাগছে! নামটাতেই হয়ত যতো সমস্যা! কিন্তু তুই দেখিস পরের জন্মে আমি প্রেমিক হবো। আর কেউ পৃথিবীতে না জন্ম নিলেও দেখিস শুধু তোর জন্য আমি আরেকবার জন্ম নিবো।
এখন তীব্র সকাল দেখছে। কি অদ্ভুত সুন্দর সকাল! পৃথিবীটা সত্যিই খুব সুন্দর!খুব সুন্দর।

……শেষ……

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.