তোমায় ভুলা হলো না

লেখক :Anonymous writer

ভূমিকাঃ

এক সপ্তাহ হলো UK থেকে বাড়ী ফিরেছি। বাড়ী ফেরার কোন ইচ্ছেই ছিলো না। ভেবেছিলাম UK তেই কাটিয়ে দেবো বাকী জীবনটা। কিন্তু বাড়ীতে ফোন করলেই মা কান্নাকাটি করে। আমাকে দেখতে চায়। শত হলেও আমি তার এক মাত্র সন্তান। তাই মায়ের কান্নাকাটি থামাতে শেষে আসতে বাধ্য হলাম। তবে মাত্র ১ মাসের জন্য।
আসার পর শুরু হয়েছে আরেক ঝামেলা। মা তার ছোট বোনের মেয়েকে আমার জন্য পছন্দ করেছেন। তাকে নাকি আমার বিয়ে করতে হবে!
এখন মনে হচ্ছে বাড়ীতে আসাটাই বোকামো হয়েছে।
—————————-

১.
বিকেলবেলা হাটতে হাটতে গ্রামের মাঠের সামনে পৌঁছে দেখতে পেলাম কয়েকটা ছোট ছোট ছেলে ক্রিকেট খেলছে। ওদের দেখে একটু সামনে যেয়ে দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখতে দেখতে চোখের সামনে স্মৃতির পর্দা নেমে আসলো, আমাকে দেখাতে লাগলো আমার অতীত জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো-
খেলা-ধুলা আমার কখনই ভালো লাগতো না। কিন্তু তারপরও বার বার ছুটে যেতাম খেলার মাঠে। বিশেষ একজনের খেলা দেখার জন্য। যে ছিলো আমার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। যাকে দিনে একটি বার না দেখলে রাতে দুই চোখের পাতা এক করতে পারতাম না। আসলে, খেলা দেখতাম না মোটেই। দেখতাম শুধু তাকে, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম তার দিকে। খুব ভালো ব্যাটিং করতো সে কিন্তু আমি মনে মনে আল্লাহর নিকট দুয়া করতাম সে যেন আউট হয়ে যায়। কারণ, আউট হলেই আমার পাশে এসে দাঁড়াবে, আমার সাথে কথা বলবে। দাঁড়িয়ে থাকতাম সারা বিকেল তাকে দেখার লোভে, তার সাথে কথা বলার লোভে, তার সাথে সময় কাটানোর লোভে। আউট হয়ে গেলে কখনো আমার পাশে এসে দাঁড়াতো, আবার কখনো দাঁড়াতো না। যখন সে আমার পাশে এসে দাঁড়াতো, আমার সাথে কথা বলতো, তখন মনে হতো আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি। অসম্ভব ভালোলাগা কাজ করতো মনের মাঝে। আর যখন আমার পাশে না দাঁড়াতো তখন খুব হতাস লাগতো। খুব রাগ হতো তার ওপর।

হঠাৎ বুকের মাঝে কি যেন একটা এসে আঘাত করলো। আমি বুকে হাত দিয়ে, মাথা নিচু করে বসে পরলাম। দেখলাম পাশে পড়ে আছে লাল রঙের ট্যাপ পেচানো একটা বল। বলটা আমি হাতে তুলে নিলাম। মাথাটা ওপরে তুলতেই দেখলাম একটা ছেলে ব্যাট হাতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে আর বাকী সবাই একসাথে জড়ো হয়ে কি যেন বলাবলি করছে।
ছেলেটা কাছে এসে লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল-
: সরি আংকেল। বলটা আমি অন্য দিকে মেড়েছিলাম। কিন্তু বলটা আপনার গায়ে এসে পড়লো। আপনি কি অনেক ব্যাথা পেয়েছেন?

ছেলেটার কথা বলার ধরণ, হাত নাড়ানো এমন কি চেহারাটাও কেমন যেন পরিচিত মনে হচ্ছে। ছেলেটাকে দেখে একজনের কথা খুব মনে পরলো। ছেলেটার সাথে তার অনেক মিল। শুধু একটাই অমিল চোখে পড়লো, ছেলেটার গায়ের রং দুধের মতো ধবধবে সাদা আর তার গায়ের রঙ ছিলো কৃষ্ণ বর্ণ। আমি তার কথা ভাবতে চাই না, তবুও কেন জানি আজ বার বার তার কথাই ভেবে চলেছি অবচেতন মনে। আমি মৃদু হেসে ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলাম-
: তোমার নাম কি?
: শুভ্র।

নামটা শুনে আমার অসংখ্য স্মৃতির ভান্ডার থেকে একটা স্মৃতি বেড়িয়ে আসার জন্য নাচানাচি শুরু করলো। শেষে বাধ্য হয়ে তাকে বাহিরে আসার অনুমতি দিলাম। বেড়িয়ে আসলো স্মৃতি, দেখাতে লাগলো আমাকে অতীতের ঘটনা।

এক দিন তাকে আমি বললাম-
: স্যার ভাইয়া, আপনার নামটা নাদিম না হয়ে শুভ্র হলে ভালো হতো।
: আমি কালো বলে আমায় উপহাস করছিস নাকি?
: উপহাস করবো কেনো? কালো মানুষ আমার পছন্দ। তারা নিরহংকারী হয়। ফর্সা মানুষদের মতো অতো ভাব দেখায় না।
: ওহ, তাই বুঝি? শুভ্র নামটা তোর খুব প্রিয় নাকি?
: হুম, খুব প্রিয়। শুভ্র নামটার মাঝে একটা ব্যাপার আছে।
: কি ব্যাপার?
: শুভ্র নামটা শুনলেই মনটা শুভ্রতায় ছেয়ে যায়। মনের মাঝে একটা ভালো লাগা কাজ করে।
: হা হা হা… আমার নাম রাখার দায়িত্বটা তোকে দিলেই ভালো হতো। মাঝে মাঝে কি যে বলিস পাগলেত মতো। এখন একটু মন দিয়ে ফাইনাল একাউন্টটা করতো । তাড়াতাড়ি শেষ কর। আমার একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে আজ।

ভাবনা সাঙ্গ হলো শুভ্র নামের ছেলেটির কথায়।
: কি হলো আংকেল? আপনি কিছু বলছেন না কেন? আপনি আমাকে ক্ষমা করেছেন?
আমি শুভ্রর নরম গাল টিপে দিয়ে বললাম –
: হুম, করেছি। কিন্তু তোমার এতো সুন্দর নামটা কে রেখেছে বাবু?
: আব্বু রেখেছে। কিন্তু আম্মু আমাকে এই নামে ডাকে না। আম্মু ডাকে নাভিদ বলে। নাভিদ নামটা আব্বুর নামের সাথে মিলিয়ে রেখেছে আম্মু। নাম নিয়ে আব্বু আর আম্মুর মাঝে প্রাই ঝগড়া লাগে। আম্মু আব্বুকে নাভিদ বলে ডাকতে বলে কিন্তু আব্বু আমাকে শুভ্র বলেই ডাকে।

ছেলেটা একটানা এত্তোগুলা কথা বলে হাপিয়ে উঠলো। আমি শুভ্রকে জিজ্ঞাসা করলাম-
: তাই নাকি? তা তোমার আব্বুর নাম কি?
শুভ্র বলল-
: আমার আব্বুর নাম মোঃ নাদিম ইউসুফ।

নামটা শুনে আমার বুকটা ধ্বক করে উঠলো। এক সময় এই নামটা শুনলে হৃদয়ে শিহরণ অনুভব করতাম। কিন্তু আজ! হ্যা, আজও শিহরিত হয়েছি। নাদিম ভাইয়ের মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমার দুচোখ থেকে কয়েক ফোটা অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। শুভ্র বলে উঠলো –
: আংকেল, আপনি কাঁদছেন কেন?

শুভ্রর আওয়াজ শুনে আমি কিছুটা বিচলিত হয়ে গেলাম, কিছুটা লজ্জিতও হলাম। এভাবে একটা বাচ্চা ছেলের সামনে আমার চোখের জল ফেলাটা উচিৎ হয় নি। ওর প্রশ্নের কি জবাব দেবো ভেবে পেলাম না। তাই কিছু না বলে ওর হাতে বলটা দিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা দিলাম।

২.
আমি রকিং চেয়ারে বসে বসে ভাবনার সাগরে ডুবছি আর ভাসছি। বাড়ী এসে মায়ের কাছ থেকে অনেক তথ্য জানলাম নাদিম ভাই সম্পর্কে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খুব সুখেই নাকি সংসার করছে সে। ঢাকাতে একটা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরী করে।
কথাগুলো শুনে শুধু বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এসেছিলো। এছাড়া আর কিই বা করার আছে।

কাজের মেয়েটা এসে টেবিলে এক মগ ধুয়া ওঠা কফি রেখে গেলো।
আমি ধুমায়িত কফিতে চুমুক দিলাম। চিনি বেশি হয়েছে। সমস্যা নেই। এখন আমার মিষ্টি খেতে অসুবিধে হয় না।
কিন্তু এই আমিই এক সময় মিষ্টি খাবার খেতে পারতাম না। এমন কি ঈদের দিনেও আমি সেমাই খেতাম না, মা জোড় করে আমাকে দু-এক চামচ সেমাই খাইয়ে দিতো।
আর যখন জানতে পারলাম যে আমার প্রিয় মানুষটি মিষ্টি খাবার পছন্দ করে, তখন থেকেই মিষ্টি খাবার খেতে শুরু করলাম। খেতে একটুও খারাপ লাগতো না। খুব তৃপ্তি পেতাম খেয়ে। হয়তো তাকে ভালোবাসি বলেই এমনটা হয়েছিলো। হয়তো তাকে ভালোবাসি বলেই তার প্রিয় খাবার আমার প্রিয় খাবারের তালিকার শীর্ষ স্থান দখল করে নিয়েছিলো।

মাকে প্রাই বেশী করে কিসমিস দিয়ে পায়েস রান্না করতে বলতাম। প্রথম দিকে মা আমার এহেন আচরনে খুবই অবাক হতো। মা তো আর জানতো না যে, এটা নাদিম ভাইয়ের খুবই পছন্দের একটা খাবার। নাদিম ভাইয়ের পছন্দের খাবার মানে আমারও পছন্দের খাবার।

নাদিম ভাই প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আসতেন আমাকে পড়ানোর জন্য। মা যে দিন পায়েস রান্না করতো সেদিন পড়ার ঘরে তার জন্য পায়েস নিয়ে অপেক্ষা করতাম। তখন যেনো আর সময় কাটতে চাইতো না। পড়াশুনা বাদ দিয়ে তার পথ পানে চেয়ে থাকতাম। সে আসলে আমরা একসাথে পায়েস খেয়ে পড়াশুনা শুরু করতাম।

প্রথমে নাদিম ভাই আমাকে পড়াতে চায়নি। পরে বাবার হস্তক্ষেপে পড়াতে রাজি হয়। তার কাছে পড়াটা ছিলো আমার গৌণ উদ্দেশ্য, মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো তার সাথে একান্তে কিছু সময় কাটানো। তাই আমি পড়াশুনার থেকে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করতাম বেশি। তাই পড়া-শুনা, আলাপ-আলোচনা দুইটাই চলতো সমান তালে। কথার ফাকে জেনে নিতাম তার ভালোলাগা, মন্দলাগা গুলো আর শুনিয়ে দিতাম আমার ভালোলাগা, মন্দলাগা গুলোও।

তাকে ভালোবাসার পর থেকে কালো রংটা আমার খুব ভালো লাগতো। নাদিম ভাই কৃষ্ণ বর্ণের ছিলো, তাই হবে হয়তো। তার যেই জিনিসটা আমাকে পাগল করে দিতো সেটা ছিলো তার ভূবন ভুলানো হাসি। মনে হতো তার হাসি দেখে যনম যনম পার করে দিতে পারবো।

বিকেলে মাঠে যেতাম তার খেলা দেখতে আর সন্ধ্যায় সে আসতো আমাকে পড়াতে। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিলো। এক সময় আমার পরিক্ষা নিকটে চলে এলো। বাবা জানিয়ে দিলো, পরিক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে হবে। পরিক্ষার পর বাবা আমাকে ILTS করতে ঢাকা পাঠিয়ে দেবে। তারপর রেজাল্ট বের হওয়ার পর UK তে। বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তাই সব মাথা পেতে নিলাম। নাদিম ভাইকে বললাম, পরিক্ষার পর বাবা আমাকে UK তে পাঠিয়ে দেবে। একথা শুনে নাদিম ভাই খুশিই হলো। তার খুশি দেখে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো।

পরিক্ষা শেষ হলো। আমিও ঢাকা চলে গেলাম। ঢাকায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসতো। আমি প্রতিদিন কম করে হলেও দশ থেকে বারো বার তাকে কল করতাম। কখনো কখনো সে কল রিসিভ করতো আবার কখনো করতোনা। যখন সে কল রিসিভ না করতো তখন খুব খারাপ লাগতো। ইচ্ছে করতো তখনই ছুটে যাই তার কাছে। জিজ্ঞেস করি কেনো সে আমার সাথে এমন করছে? কিন্তু কি আর করার?

এক সময় আমার রেজাল্ট বের হলো, ILTS কোর্স শেষ হলো। UK তে যাওয়ার সব প্রকৃয়া শেষ। আগামি পরশু আমার ফ্লাইট। আগামীকাল ঢাকা চলে যেতে হবে। খুব খারাপ লাগছিলো। মন খারাপ করে ঘড়ে বসেছিলাম। একটু পরেই নাদিম ভাই বাড়ীতে আসলো। এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরেলো। এই প্রথম তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরললো।
আমার খুব ভালো লাগছিলো। ইচ্ছে করছিলো, সারা জীবন এভাবে তার বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকতে। আমি যেন সুখের সাগরে ভাসছিলাম।
নাদিম ভাই বলল-
: চল, তোকে নিয়ে আজ ঘুরতে যাবো।

আমি একটু ভাব নিয়ে বললাম-
: না, আমি যাবো না।
: যাবি না মানে! আমি বলছি চল।
একথা বলে আমার হাত ধরে টানতে টানতে বাজারে নিয়ে গেলো।

আসলে আমি এটাই চাচ্ছিলাম যে সে আমার ওপর জোড় খাটাক।

আমাকে প্রথমে বাজারে নিয়ে আমার প্রিয় জায়গায় বসালো। সেখানে চটপটি, ফুচকা, ঝালমুড়ি বিক্রি করছ। ছোট ছেলেটা এসে আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, আমারা কী খেতে চাই?
নাদিম ভাই বলল, বেশি করে ঝাল দিয়ে ঝাল মুড়ি, ফুচকা আর চটপটি দিতে। আমি তো শুনে পুরাই হতবাক! নাদিম ভাই কি বলছে এগুলা? তাই আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম-
: আপনি তো ঝাল খাবার একদম পছন্দ করেন না। তাহলে ঝাঁল খাবারের অর্ডার দিলেন কেনো?

নাদিম ভাই তার ভূবন ভুলানো হাসি হেসে বললো-
: ঝাঁল খাবার তোর তো খুব পছন্দ, তাই না? আজ না হয় তোর পছন্দের কাবারই খেলাম।
: তাই বলে এক সাথে এতো কিছু?
: এতেই ভয় পেয়ে গেলি? এগুলার পর সমির চাচার হোটেলের সিঙ্গারা খাবো, সামোসা খাবো, পুরি খাবো, খাসীর গোশতের হালিম খাবো নান রুটি দিয়ে।
: ওরে বাবা! আমি এতো কিছু খেতে পারবো না।
: কেনো পারবি না?
কবি বলেছেন- ” এক বার না পারিলে, দেখো শত বার।” হা হা হা
তার হাসি দেখে আমিও হেসে ফেললাম।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমরা দুজন হাত ধরে অনেক্ষণ হাটলাম হাইওয়ে ধরে। সাঁই সাঁই করে যানবাহনগুলো ছুটে চলেছে অন্ধকার ভেদ করে। অন্ধকারের মাঝেই হাটছি আমরা দুজন। আকাশে এক ফালি চাঁদ ভেসে বেরাচ্ছে। মাঝে মাঝে ছুটন্ত গাড়ীর হ্যাডলাইটের উজ্জ্বল আলো এসে পড়ছে আমাদের ওপর।
অনেকক্ষণ হাত ধরে হাটলাম দুজনে।
হাটতে হাটতে হাইওয়ে ছেড়ে মাটির রাস্তায় নামলাম দুজনে। একটা কাঠের পুলের উপর উঠে দাঁড়ালাম দুজনে। নাদিম ভাই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশের দিকে তাকিয়েই বলল-
: তুই আমাকে অনেক ভালোবাসিস, তাই না?

আমিও আকাশের দিকে তাকিয়েছিলাম। তার কথা শুনে তার মুখের দিকে তাকালাম। কিন্তু সে আকাশের দিকেই তাকিয়ে রইলো। আমার দিকে তার মুখ ফেরালো না। তাই আবছা আলোয় তার মুখের অভিব্যক্তি আমি বুঝতে পারলাম না।

আমি কি বলবো খুঁজে পেলাম না। নাদিম ভাই বলতে শুরু করলো-
: কিন্তু আমি তোর ভালোবাসার মূল্য কখনো দিতে পারবো নারে। আমায় ক্ষমা করিস। আমার বাবা তার বন্ধুর মেয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করে রেখেছেন সেই ছোট বেলাতেই। আমি অনার্সটা শেষ করলেই আমাদের বিয়ে। আমি সারা জীবন ওকেই আমার জীবন সঙ্গি হিসেবে ভেবে এসেছি। কিন্তু তুই আমার সেই ভাবনার পালে ঝড়ো হাওয়া বইয়ে দিয়েছিস। দুর্বল করে দিয়েছিস আমাকে তোর প্রতি। সত্যি বলতে আমিও তোর প্রেমে পড়েগেছি। কিন্তু সমাজ কি মেনে নেবে আমাদের এই ভালোবাসা? নাকি আমরা পারবো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করতে? তাই আমি সব দিক ভেবেই বলছি, তুই আমাকে নিয়ে আর মিথ্যে স্বপ্নের জাল বুনিস না। ভুলে যা আমায়। আমিও তোকে ভুলে যাবো।

কথাগুলো বলতে গিয়ে নাদিম ভাইয়ের গলা ধরে এলো। হয়তো চোখের জলও পড়েছিলো। কিন্তু আমার কাছে এগুলো সব মেকি মনে হলো। তাই কিছু না বলে তার হাত থেকে আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে বাড়ী চলে এসেছিলাম। দরজা বন্ধ করে অনেক কেঁদেছিলাম সেরাতে।
সে রাতের পর কেটে গেলো কত বসন্ত কিন্তু নাদিম ভাইয়ের সাথে আর যোগাযোগ হয় নি। UK তে কেটে যাচ্ছিলো ব্যস্ত সময়।

একদিন মা আমাকে জানালো নাদিম ভাই বিয়ে করেছে। কথাটা শুনে বুকটা মোচর দিয়ে উঠেছিলো, খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু সে কষ্ট কাওকে দেখাতে পারিনি। আজও সে কষ্ট আমায় কুরে কুরে খায়। হয়ত বাকী জীবনটাও এই কষ্ট বুকে নিয়েই কাটিয়ে দিতে হবে। কেউ জানবে না আমার মনের যন্ত্রণাগুলো। বেঁচে থাকবো যন্ত্রণার পাহাড় বুকে নিয়ে। চলে যাবো দূরদেশে। আর কখনো ফিরবো না। ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো।

ভাবনা থেকে বাস্তবে ফিরে কফিতে চুমুক দিলাম।
এই যাহ, ভাবতে ভাবতে কফিটা একদম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.