দৈত স্বত্বা: রহস্য গল্প

লেখক :- রোমান্স

মতিঝিলের কাজ সারতে সারতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেলো। হাটতে হাটতে প্রেসক্লাবের দিকে যাচ্ছিলাম। রাস্তার জ্যামের জন্য বাসে উঠলাম না। রাস্তায় এক সম যুগল জুটিকে দেখলাম রিক্সায়। মনটা মোচর দিয়ে উঠলো। নাদিমের কথা মনে পরছিলো খুব।
ওভারব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে আছি আমি। সন্ধ্যার সূর্যটা বহু আগেই বাড়ি ফিরে গেছে, রাস্তার সোডিয়াম হলুদ বাতিগুলোও জ্বলে উঠেছে আলোকময় নগরীকে আরেকটু আলোকিত করে দিতে। এই সময় বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে মানুষের, ফিরে যাওয়ার নিরব প্রতিযোগীতা যেন শুরু হয়ে যায়। ভীড় বাড়ে বাসে। এই যাত্রাবাড়ি,গুলিস্তান,মিরপুর,শ্যামলী, ডাক হাঁকায় কন্ট্রাক্টাররা। আর যাত্রিদের ফিরে যাবার আকুলতা দেখতে থাকি আমি। মানুষের জীবনটা বড় বিচিত্র। দিন শেষে রাতে পরিবারের পিছুটান এড়াতে পারেনা মানুষ। অবাক লাগে মাঝে মাঝে এরকম পিছুটান। আমার পাশেও ভীড় বাড়ে, অস্থায়ী বাসিন্দারা ফিরতে শুরু করেছে আপন নীরে। শুধু আমিই ব্যস্ততার পাশ কাটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হাতের জ্বলন্ত বেনসন এন্ড হেজেসটাও আপন মহিমায় উজ্বল হয়ে উঠছে। পকেটে অনেকগুলো টাকাও আছে। হঠাত পেটটা ব্যাথা শুরু করতে শুরু করলো।

অনেকক্ষন ধরে সামনে বসা মানুষ টার দিকে তাকিয়ে আছেন ডঃ তাহসিন। মাথাটা নিচু করে বসেই আছে সেই লোক। মানে আমি। অনেকক্ষণ ধরে বসে থেকে থেকে শেষে বলতে শুরু করলাম-
“আমার যে সমস্যা সেটা হল আমার পেটে একটা ফোঁড়া ঊঠেছে।”

বলেই শুন্য দৃষ্টিতে ডঃ তাহসিনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ডঃ তাহসিনা অনেক ভাল একজন সাইকায়াট্রিষ্ট। উনি এর আগে ও অনেক মেন্টাল রুগীকে ভাল করেছেন। কিন্তু আজকের এই নিশ্চুপ। ঠায় বসেছি তো বসেছি।কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো না। অনেকক্ষন মাথা নিচু করে চুপ করে থেকে শেষে বলতে শুরু করলাম।

ঘটনার শুরু বছর চারেক আগে ।

ভার্সিটি ক্যান্টিনে ।
সৈকত ভাই এসে বলল , প্রিতম টিউশনির কথা বলছিলি মনে হয় !
-হুম ,বলছিলাম ভাই ।
-পাইছি একটা ।করাবি নাকি । সব মোটামুটি ভাল ।
-অবশ্যই করব ।
– ছাত্র এসএইচসি দেবে । পড়ালেখায় মোটামুটি ভালই ।

কয়েকদিন পর থেকে ওদের বাসায় যাই । ছাত্রের নাম আরিফ ।
আমার বিষয়বস্তু আরিফ না , নাদিম । আরিফের বড় ভাই । আমারই সাবজেক্টে পড়ে একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে । চিনতাম না ওকে ।
আরিফকে পড়াচ্ছি ,ঐ সময় হঠাত্‍ একদিন হাজির ।
আরিফ সুন্দর ফর্সা ছিল । তবে নাদিম ছিলো শ্যামলা। চেহেরায় এক প্রকার মাদকতা আছে । গালের টোলপড়া আর চোখ দুটিই আমাকে সম্মহিত করতো বারবার। যেকোন মানুষকে আকর্ষণ করতে বাধ্য ।
প্রথমদিন এসে ঘুরে ফিরে চলে গেল । কথা বলে নি ।
এরপর অনেক দিন দেখা নেই ।
আরিফের পরীক্ষা নিচ্ছিলাম একদিন । ওকে লিখতে দিয়ে ,চেয়ারে আরামসে শরীরটা ঝেড়ে ফেলে দিলাম । কখন ঘুমিয়েছি জানিনা , আগের রাতে রিয়াল বার্সার খেলা দেখার ফল ছিল বোধহয় ।
ঘুম থেকে জেগে দেখলাম ,প্রায় সন্ধ্যা সন্ধ্যা ।আরিফ টেবিলে নাই । আমি গত চার ঘন্টা ধরে টেবিলে ঘুমাচ্ছিলাম । বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলাম । আশপাশে কাউকে দেখছিও না । হঠাত্‍ আমার স্বপ্নের মানুষটা হাজির ।
-ঘুম ভেঙ্গেছে আপনার !! এত্ত ঘুমাতে পারেন !! এর মধ্যেতো কয়েকটা মশাও মেরে ফেললাম।
জবাবটা কি হতে পারে বুঝতে পারছি না । চুপ করে রইলাম ।
হঠাত্‍ আমাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় রেখে রুম থেকে বাহির হয়ে গেল ।
আমিও উঠে পড়লাম । বাসায় চলে আসলাম ।
তার এমন সহজ স্বাভাবিক কথা বলা মানতে পারছিলাম না ।
আমি আবেগী না । তবে স্বাভাবিক কথাগুলা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল । অস্বাভাবিক কথাগুলা পরদিনও মোহাচ্ছন্ন করে রাখল ।
সাধারণত পর পর দুইদিন আরিফকে পড়াতে যাই না । ঐদিন গেলাম । মূলত অস্বাভাবিক কথাগুলো আকর্ষণ করছিল ।
আরো কিছু অস্বাভাবিক কথা শুনতে আগ্রহী ছিলাম ।কিন্তু উনার দেখা নাই ।
চলে যাব ,ঐসময় উনার প্রবেশ । সাদা শার্টে তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিলো। পড়ন্ত বিকেলের মাদকতায় ভরা রোদ তার ওপর পরে শুভ্রতার মাদকতা ছড়িয়ে দিচ্ছিল ।
-কালকে হঠাত্‍ অমন চলে গেলেন কেন ? আনাতে গেলাম নাস্তা ,এসে দেখি… গায়েব ।
-জরুরী কাজ ছিল ।
কোন মতে জবাব দিলাম ।
-জরুরী কাজ থাকা মানুষ ,ওভাবে নাক ডাকে ঘুমায় না !!
আশ্চর্য হলাম । ঘুমানোর সময় নাক ডাকতাম !! কেউ বলেছে বলেতো মনে পড়ছে না ।আরিফের দিকে তাকিয়ে বললাম , সত্যিই নাক ডাকছিলাম !!
আরিফ জবাব না দিয়ে ,প্রশ্নবোধক মার্কা হাসি উপহার দিল ।
আবার নাদিমের দিকে ফিরলাম । ও হাসছে । হাসিটা ভুবন ভোলানো না হলেও ,আমাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভুলিয়েছে ।
হাসিমাখা মুখেই বলল ,”না ,আপনি মোটেও নাক ডাকেন না ।”আমিও হাসলাম । ঠোঁট ফাটা হাসি ।
এরপর প্রতিদিনই সে আসে ।কথা হয় ,তাকিয়ে থাকা হয় ,বর্তমান পৃথিবী নিয়েও আলোচনা হয় ,আবার কখনো আমাদের সাবজেক্টের বিভিন্ন ব্যাপার নিয়েও আলোচনা ।বেশ একটা ছন্দের মধ্য দিয়ে চলছিলাম । আগের মত ঠোঁট ফাটা হাসি দিইই না ,স্বাভাবিকভাবেই হাসি । তার হাসি আমাকে ভুলায় না ,মুগ্ধ করে ।প্রতিদিন মুগ্ধ হই !! মুগ্ধতা মনে হয় দিন দিন মনের চোখকে স্পর্শ করে।
হঠাত্‍ একদিন ছন্দপতন হল ।
সে আসছে না ।একদিন দেখলাম ,দুই দেখলাম ।উঁহু ,তার দেখা নাই ।
প্রায় এক সপ্তাহ পর আরিফের কাছে জিজ্ঞেস করলাম ,নাদিম কোথায় ? দেখা টেখা যায় না যে?
– ভাইয়াতো গ্রামের বাড়ী গেছেন ।। জানেন তার সাথে একটা মেয়ের প্রেম চলছে।
– ওহ তাই না কি !! তা কতদিন ?
– জানিনা।
-অহঃ ।আচ্ছা তুমি ম্যাথ কর ।
কেমন জানি লাগছিল তখন ।ঠিক বুঝাতে পারব না ।
ব্যাথা করছিল খুব বুকে ।একেবারে কলিজার নীচটায় ।
এই বয়সেই বিয়ে করবে ! আশ্চর্যকর ব্যাপার ।।
পরের এক সপ্তাহ আরিফকে পড়াতে যাই নি । উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক ওদিক ঘুরেছি ।ভার্সিটিতেও যাই নি ।ওদিকে আর যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না ।
কারণটাও বুঝতে পারছিলাম না। নাদিমকে হয়ত ভালবেসে ফেলেছিলাম ।নাও হতে পারে ।এমনিতেই হয়ত যেতে ইচ্ছে করছিল না ।
সেদিন বারটার দিকে অঘোর ঘুরে ঘুমাচ্ছিলাম । মোবাইলের চ্যাচাম্যাচিতে জেগে উঠলাম । রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ,ওপাশে ঝাঝালো কন্ঠস্বর ,
কোথায় আপনি ?এক সপ্তাহ ধরে বাসায় আসনা কেন ?
হঠাত্‍ ঘুম থেকে উঠে ,ঝাঝালো কন্ঠস্বরের হেতু বুঝতে পারছিলাম না । ঝাঝালো কন্ঠস্বরের মালিক কে ,তাও বুঝতে পারছিলাম না । আসলে আধঘুমে মাথাটা কাজ করছিল না ।
-আপনি কে ?
-চুপ । আমি কে !! বুঝাচ্ছি আমি কে ?! আজকেই আরিফকে পড়াতে আসবা । নাহলে এখনই টিএসসিতে আস ।
ততক্ষণে মাথা কাজ করা শুরু করেছে । অদ্ভুত সুন্দর ঝাঝালো কন্ঠস্বরের মালিক কে ,তাও বুঝতে পারছিলাম । আশ্চর্য হলাম ,খুশি হলাম ।খুশিতে আত্মহারা হওয়ার দশা।
-আমি আসছি । টিএসসিতেই আসছি।
-তাড়াতাড়ি ।

নাদিমের সাথে কখনো তেমন কথা হয়নি, তবে সে যে সমপ্রেমি তা আমার প্রতি খেয়াল রাখাতেই উপলব্দি করছিলাম এতদিন। তবে Sure ছিলাম না।

অন্যরকম ,অদ্ভুত এবং অপরিচিত একটা দুপুর কাটল সেদিন ।ভালবাসার কথা একজনও বলি নি । তবে ভালবাসা উপচে পড়ছিল যেন ।
ঐদিনই প্রথম তার হাত ধরেছি । তপ্ত দুপুরে রোদের মাঝে হাতে হাত রেখে হেঁটেছি । সে বকবক করছিল ,আমি অবাক বিস্ময়ে মনোযোগি শ্রোতার মত তার বকবক শুনছিলাম । এভাবেই সম্পর্কটা আপনি তুমিতে থেকে তুমি হয়ে গেল।

একদিন বললাম,,,,,
: বাবু…একটু রাখবে চোখ… আমার সমস্ত এ দু” চোখে…?
: এত বায়না ধরো কেনো তুমি..?
: আমি আয়না হবো যে তোমার……..
: তাও এই পথে…? দেখছোনা… কত লোক আড়চোখে দেখছে…তোমাকে আমাকে…
: দেখুক না.. দেখতে দেও..পাড়া-পড়শীকে… কেমন মাছ ধরছে এই বড়শিতে..
: দিন দিন এতো বাড়ছো কেনো তুমি… তোমার কি ভয় ডর সব কেটে গেছে…?
: কি করি বলো.. তোমাকে যখন দেখি.. সব গোলমাল হয়ে যায়… প্রেমে পড়লে বুঝি এমন হয়… তাই না বাবু…?
: তোমার বুঝি এবার মাথাটাও গেছে… বলোতো এমন করো কেনো…?
: শ্রষ্টা যখন আবেগ ঢেলেছেন… তোমাকে না দিয়ে তার অপমান করি কি করে…?
: বলছে তোমাকে… এক্কেবারে লক্ষী বাবুটির মত থাকোতো… যাস্ট এক মিনিট ধৈর্য ধারণ করে দেখাওতো…
: দেখছোনা…কত্তো ধৈর্য আমার…
শুধু তোমার স্পর্শ ছাড়া সে থাকতে পারেনা….
: পাগল একটা… সয়তান একটা…ভুত……………….
: যখন তুমি আমায় পাগল বলো….বেড়ে যায় সব পাগলামী… তা কি জানো তুমি….?
: হুমমম জানি… এভাবেই থেকো.. না হলে মরে যাবো আমি…..
ভীষণ রকম কাছে টানে… তোমার দুষ্ট মিষ্টি এ সয়তানি…………
: তাইতো এমন ভালো লাগে.তোমায়. তুমিও জানোনা ভালোবাসী কতোখানী…………

এ রকম সম সম্পর্কের একটা সমাপ্তি থাকে । খারাপ অথবা ভাল । আমাদের সম্পর্কের পরিণতি খারাপের দিকেই যাচ্ছিল । উঁহু আমরা ঠিক আছি । চার বছরের মধ্যে রাগ করে আমাদের মাঝে কথা হয়নি সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট তের সেকেন্ড । সমস্যাটা তৈরি করেছে ,বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধন ।
আমার চাকরী হয় গতবছর একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে। বেতন বেশ ভালই । এর মধ্যে বিয়ের জন্য পারিবারিক চাঁপ। অতএব এখন বিয়ে আমার পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব । আর আমি চাইছিলামও না। কারণ নাদিমকে আমি পাগলের মত ভালবাসতাম। কিন্তু সমাজের কারনে আমরা এক সাথে থাকতে পারিনি। যার আমার আগেই বিয়ে করার কথা ছিলো, সেই নাদিম বিয়ে করেনি। আর আমি ? পারিবারিক চাপে পরে খালার মেয়ে মাহামুদার সাথে বিয়ে হয়।

অনেক ক্ষন ধরে শুনছিলেন ডঃ তাহসিন। আমি আবার বলতে শুরু করলাম।

” আমার সমস্যার শুরু যখন আমি আমার স্ত্রী মাহমুদা কে খুন করি। আমার স্ত্রী কে নিয়ে আমি সুখে ছিলাম না। একদিকে নাদিম আরেক দিকে মাহমুদা। তারপরও চেষ্টা করছিলাম সংসার টিকিয়ে রাখার অভিনয়। এর মাঝেই ঘটে যায় একটি দূর্ঘটনা। এরপর মাস ছয়েক ঠিক ছিল। কিন্তু একদিন আমি জানতে পারি মাহমুদার সাথে, আমার সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষ নাদিমের অ অবৈধ সম্পর্ক হয়েছে। এটা শোনার পর আমার মাথা ঠিক ছিলনা। আরো মাথা খারাপ হয়ে যায় মাহমুদা নাদিমের সন্তানের মা হতে চলেছে। বিষয়টা এমন ছিলো নাদিম আমার বিয়ের সময় উপস্থিত ছিলোনা। আর বিয়ের পর ওর সাথে আমার যোগাযোগটা কমে যায় নাদিমেরই কারনে।
আমি দুইবার আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। এর মাঝেই আমাকে মাহমুদা ওর অবৈধ সম্পর্কের কথা জানায়। আমি বিমূঢ় ছিলাম বেশ কিছু দিন। কিন্তু এর মাঝেই জানতে পারি মাহমুদা কনসিভ করেছে। এটা শুনে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। ওর পেটে বাচ্চা যখন ৮ মাস – তখন আমি একদিন মাহমুদা কে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলি। মেরে ফেলি পেটের বাচ্চা টাকে ও। সেই সময় আমার ক্ষমতা বলে মাহমুদা কে আমি আমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কোন রকমে দাফন করে আসি। এর পর আমি অনেক দিন দেশের বাইরে ছিলাম।” বলেই একবার দম নিলাম আমি। তারপর টেবিল থেকে পানির জগটা নিয়ে অদ্ভুত ভাবে পানি গ্লাসে না ঢেলে জগ থেকেই ঢকঢক করে খেয়ে ফেললাম অর্ধেক পানি।
তারপর আরেকটা দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলাম –

এর মধ্যে জানতে পারি নাদিমও বিয়ে করে ক্যানাডা চলে যায়।ও আমার সাথে আর যোগাযোগ রাখেনি। আমাদের এই গন্তব্যহীন সম্পর্কটা শেষ হলেও আমি এখনো ওর শুন্যতা প্রতি মুহুর্তে অনুভব করি।
যাই হোক- ” এর পরের বছর আমি দেশে ফিরে আসি। চাকরি থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। সেখানে আবার জয়েন করি। কিন্তু দুই মাস আগে আমি ঈদের ছুটিতে গ্রামে যাই। সেখানে ঈদের দিন রাতে আমি একাকী বসে ছিলাম আমার বাড়ির পেছনের বারান্দায়। তখন দেখি মাহমুদার কবর থেকে একটা বাচ্চা ছেলে বাবা বাবা করে ডেকে আমার দিকে দৌড়ে এসে আমার মাঝে ঢুকে গেছে।
সেদিন রাতে আমি খানিকটা নেশা করেছিলাম। তাই সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে সব আজগুবি মনে করে ভুলে যাই। কিন্তু পরদিন আমার পেটে নাভীর গোড়ায় একটা ফোঁড়া ঊঠে। প্রথমে এটা ফোঁড়ার মতই ছিল কিন্তু আস্তে আস্তে এটা বড় হতে থাকে। আমি এই কয়দিন প্রায় সময় স্বপ্নে দেখছি একটা বাচ্চা ছেলে আমাকে বাবা বাবা করে ডাকছে আর বলছে আমার পেট থেকে নাকি তার জন্ম হবে। এই যে দেখেন আমার পেটের মাঝে এটা কি”- বলে শার্টের ভাজ খুলে দেখাই ডঃ তাহসিনকে।
তাহসিনা কিছুক্ষন দেখেন ফোঁড়া টা। বেশ বড় আকারের একটা ফোঁড়া। লালচে ভাব ধরেছে। তারপর হেসে আমাকে বললেন-
“দেখুন মি.”- বলে নামটা জানার জন্য তাকালেন উতসুক দৃষ্টিতে আমার দিকে।
বললাম “ প্রিতম চৌধুরী। ।
“হুম – দেখুন প্রিতম সাহেব- আপনার হ্যালুসিনেশন হয়েছিল- সেই দিন রাতে। আপনি আপনার স্ত্রীকে অনেক ভালবাসতেন। সেই ভালবাসা আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। তাই আপনি উনাকে এবং উনার সন্তান কে মেরে ফেলে অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেইদিন আপনার পিতৃসত্ত্বা আপনার মাঝে আপনার মৃত সন্তান কে ঢুকে যেতে দেখিয়েছে। এটা নিছক ই কল্পনা। আর বেশি কিছু না”। বলে মিষ্টি করে হেসে আমার দিকে তাকালেন।
“ কিন্তু আমার পেটের এই ফোঁড়া কিভাবে আসল?” এবার ক্ষেপে গেলাম আমি।
“এটা কো- ইন্সিডেন্স মাত্র। এটার সাথে আপনার স্বপ্ন কিনবা হ্যালুসিনেশন কে মেলালে তো চলবেনা”-বললেন ডঃ তাহসিন।
“ দেখেন আমি মেলাচ্ছিনা। কিন্তু ইদানিং আমার পেটের ভেতর কিছু একটা লাথি মারে। কিছু একটা হচ্ছে আমার পেটের ভেতর”- বলেই প্রায় কেঁদে ফেললাম।
“ দেখুন আপনাকে আমি কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি।এগুলো খান। আশা করি আপনার ভাল ঘুম হবে। এবং আপনার এই বিশাল ফোঁড়া ও কমে যাবে” বলেই খস খস করে কিছু ঔষধ লিখে প্যাড থেকে কাগজ ছিড়ে দেন আমার দিকে।
তারপর বললেন-“ আপনার যে কোন সমস্যা হলে আমি নিজে গিয়ে আপনাকে দেখে আসব। আপনার এখানে আসার আর দরকার নেই। এইখানে আমার ফোন নাম্বার দেয়া আছে। সেখান থেকে আমাকে ফোনে জানাবেন কি হয়েছে”- বলেই ঊঠে পড়লেন ডঃ তাহসিন।
“আমার একটা সেমিনার আছে- আমাকে এখন সেখানে যেতে হবে” বলে বের হয়ে গেলেন ডঃ তাহসিন।

এবার অন্যের মুখ থেকেই আমার ঘটনাটা শুনুন…………..

তিন মাস পর রাত ১টায় ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল ডঃ তাহসিনের। উনি ফোনটা ধরেই আরেক পাশ থেকে শুনতে পেলেন- প্রিতম সাহেবের কন্ঠ-
“ ভাই একটু আসবেন আমার বাসায়? প্লিজ ভাই আসেন।প্লিজ আসেন। আমার পেটে প্রচন্ড ব্যাথা করছে” বলেই বাসার ঠিকানা দিলেন ডঃ তাহসিনকে।
সারাদিন মেডিক্যাল এ সেমিনারে ছিলেন তিনি। তাই বাসায় এসে মাত্র শুয়েছেন। কিন্তু এই রকম কল এলে প্রায় সময় তিনি ঘুম রেখেই দৌড় মারেন রূগীর বাসায়। নিজের জীবনের চেয়ে রোগীকে অনেক গুরুত্ব দেন তিনি। আর এই প্রিতম সাহেবের ব্যাপারটা নিয়ে তিনি অনেক পড়াশুনা করেছেন ইদানিং। তাই তিনি এত রাতে ফোন পেয়ে কোন রকমে পোশাক পাল্টে গাড়ি নিয়ে বের হলেন।
প্রিতম সাহেবের বাসা গুলশানে। সেখানে পৌছে একটা সাদা রঙ এর বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি থামিয়ে নিজেই ঢুকে পড়লেন ভেতরে। বাড়িতে গিয়ে বেল টেপার পর খুলে দিল একজন বৃদ্ধা মহিলা। তিনি প্রিতম সাহেব কোথায় জিজ্ঞাসা করতেই মহিলা তাহসিনকে নিয়ে গেলেন একটা ঘরে। সেখানে শুয়ে আছেন প্রিতম সাহেব।
কিন্তু প্রিতম সাহেব কে দেখেই ভয় পেয়ে যান তিনি। প্রিতম সাহেবের পেটটা অস্বাভাবিক ভাবে ফোলা। ঠিক যেন সন্তান সম্ভবা মায়ের মত। আর ঠিক সেই সময় প্রিতম সাহেব চিৎকার করে ঊঠে অজ্ঞান হয়ে যান। এবং সেই সময় তাহসিনের চোখের সামনে ঘটল এক বিষ্ম্য়কর ব্যাপার। প্রিতমসাহেবের নাভির উপরের ফোঁড়া থেকে একটা লালচে পিণ্ড বের হতে লাগল। আস্তে আস্তে পিন্ড টার কিছু অংশ বের হয়ে চোখ আর মুখে অস্তিত্ব জানান দিল। এর পর তাহসিন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে দেয়া মহিলা কে গামছা আর কুসুম গরম পানি আনতে বলে নিজে কোন রকম টান দিয়ে বের করেন বাচ্চা টাকে। অদ্ভুত সুন্দর সেই সন্তান টাকে কোলে নিয়ে হতভম্ভ হয়ে যান তিনি। বাচ্চা টা যেন ঘুমাচ্ছে।
এর মাঝে তোয়ালে নিয়ে সেই মহিলা আসলে তিনি তোয়ালে দিয়ে কোন রকম বাচ্চা টাকে মুছিয়ে দেন। তারপর খেয়াল করেন বাচ্চা টা কাঁদছে না। তিনি অনেক চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনভাবেই বাচ্চাটাকে কাঁদাতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত দেখলেন বাচ্চাটা মারা গেছে।
বাচ্চাটা মারা যাবার পর তিনি প্রিতম সাহেবের দিকে খেয়াল দিলেন। এতক্ষন তিনি যেন ঘোরের মাঝে ছিলেন। মেডিক্যাল সায়েন্স কে বোকা বানিয়ে এই মাত্র এই প্রিতম সাহেব একটা বাচ্চা জন্ম দিল। কিন্তু বাচ্চাটাকে তিনি বাঁচাতে পারলেন না। আগে জানলে তিনি ঠিক ই প্রিতম সাহেবের ব্যাবস্থা করতেন। তিনি তাড়াতাড়ি প্রিতম সাহেব এর নার্ভ দেখলেন। কিন্তু হতাশ হলেন। তিনি ভেবেছিলেন প্রিতম সাহেব অজ্ঞান হয়েছেন। আসলে তিনি মারা গেছেন সেই চিৎকার দিয়েই। এবার কিছু টা মুষড়ে পড়লেন তাহসিন। তিনি লোকটাকে বিশ্বাস করলে দুইজন কেই হয়ত বাচানো যেত।
এরপর তাহসিন সেই বাচ্চাটাকে গোপনে সরিয়ে ফেলার ব্যাবস্থা করেন। সেই বৃদ্ধা মহিলা কে দিয়েই বাচ্চাটাকে সেই বাড়ির এক কোনায় কবর দেবার ব্যাবস্থা করেন। আর প্রিতম সাহেব কে কবর দেয়া হয় তার গ্রামের বাড়িতে। এই সব ব্যাপার ভাল মত সারতে সারতে উনার কয়েকদিন লেগে যায়।
এর তিন দিন পর রাতে ক্লান্ত ডঃ তাহসিন মাত্র হাসপাতাল থেকে এসে বাসায় খেয়ে দেয়ে শুয়েছেন।এমন সময় উনার ঘরের বারান্দায় একটা আলতো টোকা দেয় কেউ একজন। তখন ও ঘুমান নি তাহসিন। আস্তে করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে ঊঠে বারান্দার দরজা খুলেই দেখেন একটা বাচ্চা ছেলে দাড়িয়ে আছে দরজার ওপাশে। মুখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে আঙ্কেল আঙ্কেল বলে ঝাপিয়ে পরে তাহসিনের শরীরের সাথে মিশে যায়। ব্যাপারটা এতই তাড়াতাড়ি হয়েছে যে তাহসিন বেশ কিছুক্ষন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়লেন তিনি সেখানেই।
পরদিন জ্ঞান ফিরে নিজেকে মাটিতে দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যান তিনি।তারপর রাতের ঘটনা কে নিছক স্বপ্ন ভেবে হেসে ঊড়িয়ে দিলেন তিনি। তারপর ফ্রেশ হবার জন্য বাথরুমে গেলেন। হাত মুখ ধুয়ে বের হতে যাবেন তখন পেটে চিনচিনে একটা ব্যাথা টের পেলেন। তাড়াতাড়ি টি-শার্টটা সরিয়ে পেটে হাত বুলালেন তিনি। এবং দিনের আলোতেই পরিষ্কার টের পেলেন তিনি – উনার পেটের যেখানে নাভি- ঠিক তার উপরেই একটা ফোঁড়া ঊঠেছে। লালচে ফোঁড়াটা দেখতে ঠিক প্রিতম সাহেবের সেই ফোঁড়াটার মত। সাদৃশ্য টা টের পেতেই আবার জ্ঞান হারালেন সাইকিয়াট্রিষ্ট ডঃ তাহসিন…… — 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.