দ্বিতীয় অধ্যায়

লেখক- শুভ্র ভাই

২০১৩ সাল। সন্ধ্যা। খাটের উপর উপুড় হয়ে শুভ্র ল্যাপটপে ফেসবুক চালাচ্ছে। শুভ্রর জীবনটা অনেকটা ফেসবুক কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। যারা তার ফ্রেন্ডলিস্টে আছে মিনিটে মিনিটে শুভ্রের স্ট্যাটাস প্রসব করা দেখে তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। পড়াশোনা করে চাকরিতে ঢুকেছে তাও বছরের বেশী হতে চললো। বাড়ির লোকের ধারণা শুভ্র বেশ খামখেয়ালী। এরই মধ্যে বিয়ের চেষ্টা তদ্বির চলছে। এক আত্মীয়ের সূত্র ধরে জামালপুরে গিয়ে মেয়েও দেখে এসেছে একবার। দেখেই নাকচ করে দিয়েছে। শুভ্র এখনই বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। সে অন্য লাইনের লোক। সে লাইন নিয়েই তার যত চিন্তা ভাবনা যেন। প্রকাশ্যে আসার মুরোদ নেই অনলাইনে সমধিকার সমধিকার বলে রাত দিন চিল্লাপাল্লা করে। নেট ঘেটে রঙধনু সভ্যতার তথ্য হাজির করে।

ইদানিং শুভ্রের নিজেকে ভালোবাসার কাঙাল বলে মনে হয়। ভালোবাসার কাঙাল বললে ভূল হবে। ভালোবাসা তার জীবনে এসেছে। বিভিন্ন রূপে। বাবা মা ভাই, আত্মীয়, বান্ধবের ভালোবাসা সে পেয়েছে। সে প্রেমের কাঙাল। প্রেম জিনিসটা ঠিক তার জীবনে সেভাবে এলো না। সে যে লাইনে প্রেম খোঁজে এই লাইনে প্রেমের চেয়ে দেহের কারবার বেশী। দেহে দেহে ঘর্ষনে এখানকার প্রেম নিষ্কাশিত হয়। শুভ্রের এই প্রেম ভালো লাগেনা। তার সত্যিকারে প্রেম করতে ইচ্ছে করে। যার হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজতে, যার চোখে চোখ রেখে তাকাতে ভালো লাগবে। মনের মধ্যে কেমন কেমন একটা ফিলিংস আসবে। উফস ভাবলেই শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ স্ফুলিংগ ছুঁটে যায়। শুভ্রের জীবনে প্রেম এসেছিলো। কিন্তু কোন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই সে প্রেম নেই হয়ে গেলো। শুভ্র ফিরে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু কেউ ফিরতে চায়নি। বড় স্বার্থপর ছিলো সে। এরপর কেটে গেলো কিছু কাল। অনার্স ফোর্থ ইয়ারে পড়ার সময়ে এক চাকুরিজীবির সাথে ফোনে কথোপকথন শুরু হলো। লোকটা বেশ ভালো কথা বলতো। শুভ্র আগেই শর্ত দিয়েছিলো, নো প্রেম , নো ভালোবাসা। জাস্ট ফ্রেন্ডশিপ। লোকটাও সম্মত হয়েছিলো। কতশত কথা হতো। শুভ্রের কথা শুনতে লোকটার নাকি ভালো লাগতো। তখন শুভ্র অনেক কথা বলতো। চোখে ছিলো তার স্বপ্নমাখা রঙিন চশমা।

বন্ধুত্ব যখন প্রেমের দিকে মোড় নেয় তখন লোকটাই নতুন কাউকে খুঁজে নিয়েছে। শুভ্রের মনে গেঁথে যায় একরাশ হতাশা। অতঃপর তৃতীয় প্রেম। চাকরি পাওয়ার পরে। ছেলে জাহাংগীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। মাসখানেক কথা হলো। দেখা হলো। চুমু খাওয়া হলো। কিন্তু শুভ্র প্রচন্ড বিরক্ত হতো। এই ছেলে সারাক্ষন তার এক্স বিএফের গল্প শোনাতো। নিজের ফোনের টাকা খরচ করে কোথাকার কোন ছেলের প্রশংসা শুনতে হবে সকাল বিকাল। মধ্যরাতেও। তাও এমন কারো কাছে যে দাবী করে সে শুভ্রকে ভালোবাসে। অগত্যা শুভ্র পিছন ফিরে দে দৌঁড়। ছেলেটা অনেকবার স্যরি বলেছিলো। শুভ্রের মন ফিরতে সায় দেয় নাই।

অবশেষে এলো ২০১৩ সাল। প্রেমের ভ্রমর তার গুনগুনানি এখনো থামায়নি। শুভ্র এখন ফেসবুকে মোটামুটি পরিচিতি পেয়েছে। ফেসবুকের বন্ধুদের সাক্ষাৎকার নিয়ে অনু আড্ডা লিখে বেশ সাড়া পেয়েছে। লেখাটা কেমন যেন নেশার মত হয়ে গেছে। লিখতে ভালো লাগে। গল্প লেখার চেষ্টা করে। তার মনে হয় জম্পেশ লিখেছে। কিন্তু অন্যেরা সেভাবে সাড়া দেয় না। আনন্দ ধারা, একলা পথিকেরা দারুন সব গল্প লেখে। শুভ্রেরও এরকম গল্প লিখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ওরা দারুনভাবে ভাষা ব্যবহার করে। অন্যদিকে শুভ্রের ভাষা বড়ই সাদামাটা। তবুও সে গল্প লেখা শুরু করলো। কিছুই না খুঁজে পেয়ে নিজের জীবনের কিছু ঘটনাকে কল্পনার সাথে মিশিয়ে শুরু করলো ধারাবাহিক গল্প লেখা প্রতিদিন এক পর্ব করে লিখতে থাকলো। কেন জানিনা পাঠকেরা সাড়া দিলো ব্যাপক ভাবে। শুভ্র প্রথম দিকে গল্পটির নাম রাখে লাইফ উইদাউট লাভ। পরে অবশ্য নাম বদলে রাখে, রঙধনু মন। এতো গেলো শুভ্রের জীবনের প্রথম অধ্যায়। এই গল্পের রেশ ধরেই শুরু হলো শুভ্রের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। লাইফ উইথ লাভ। বোনের ভালোবাসা, ভাইয়ের ভালোবাসা, বন্ধুর ভালোবাসা, প্রেমিকের ভালোবাসা, হতাশা।

ফেসবুকের হোমপেজ স্ক্রল করে নিচের দিকে নামতে গিয়ে একটা ছবিতে শুভ্রের চোখ আঁটকে গেলো। বেশ সুন্দর দেখতে তো ছেলেটা। কে এ? আগে তো দেখে নাই। শুভ্রর ফ্রেন্ডলিস্টে অধিকাংশ ফেক আইডির বন্ধু। সংগত কারণে শুভ্রর আইডিও ফেক। কিছু রিয়েল আইডি এড হয়। তারা শুভ্রর আলোচ্য টপিকস দেখে আনফ্রেন্ড করতে দেরি করে না। শুভ্র প্রোফাইল পিকচারে ক্লিক করে। লোড হচ্ছে। টুজি ইন্টারনেট এত্ত স্লো। শুনছে অচিরেই নাকি সারা বাংলাদেশে থ্রিজি ইন্টারনেট চালু হয়ে যাবে। লালচে ঠোঁটের স্লিম একটি ছেলে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মায়াভরা কোমল মুখ। হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রর হঠাৎ মনে হলো, ‘ইশ এই ছেলেটি যদি আমাকে ভালোবাসতো’। প্রাইভেট গাড়িখানা কি ওর নিজের তাহলে হইছে। বড়লোকের পোলাপাইনের সাথে প্রেম করার মত বিড়ম্বনা আর নাই। এদের হার্ট নামক জিনিসটার অবস্থান যে ঠিক কোথায় তা শুভ্র আজো বুঝে উঠতে পারে নাই। যাক ছেলেটার সাথে কথা বলা যাক। মেসেজ বক্সে ঢুকেই শুভ্র দেখতে পেলো ছেলেটা তাকে আগেই মেসেজ দিয়ে রেখেছে। প্রতিদিন এত অনর্থক মেসেজ আসে যে লক্ষ্য করা হয় কে কি লিখলো। শুধুমাত্র কাছের কিছু বন্ধুর রিপ্লাই দেয় সে। শুভ্র প্রতুত্তরে লিখলো
হাই
পরের দিন আবার মেসেজ এলো। ইংরেজীতেই
হাই, হাও আর ইউ ব্রাদার?
জি ভাই আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
আই এম ফাইন। ক্যান আই চ্যাট উইথ ইউ?
জি করতে পারেন।
আপনি কি জানেন আমি আপনার সব লেখা পড়ি।
না জানতাম না এইমাত্র জানলাম।
আমার এক ফ্রেন্ড আছে একলা পথিক ভাইয়া। ওনার ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে আপনাকে পেয়েছি। অনেক সুন্দর লিখেন আপনি।
ধন্যবাদ।
ভাইয়া, আমরা কি বন্ধু হতে পারি?
আসলে বলে কয়ে তো বন্ধুত্ব হয় না। চেষ্টা করে দেখতে পারি। বয়স কত আপনার?
২২ বছর।
ওহ। তাহলে তো তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মত।
আমি আপনাকে তাহলে ভাইয়া বলেই ডাকবো।
আচ্ছা। ঠিক আছে। পরে আবার কথা হবে। এখন রাখছি। বাই।
বাই

২য় পর্ব

৪ নভেম্বর ২০১৩। বাবুর কাছ থেকে মেসেজ এলো। অপ্রত্যাশিত মেসেজ। ভুল ইংরেজী বানানে ভরা।
– আই এপ্রিসিয়েট ইউর প্রোফাইল। অওসাম। আই লাভ ইউ। ভাষা নেই আমার। এতো সুন্দর গোছানো। আই লাইক ইউ। ভালো লাগলো। রিয়েলি আই ফল ইন লাভ। ডু ইউ লাভ মি? প্লিজ আন্স মি। ইউর হোম? ফেসবুকে বাড়ি কোথায় কই থাকো ইত্যাদি জিজ্ঞেস করা খুব কমন ব্যাপার।
প্রোফাইল পড়ে এসে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বাড়ি কোথায় তো স্বভাবতই শুভ্র একটু বিরক্ত হয়। উত্তর দেয় না। আবার ওপাশ থেকে মেসেজ আসে
– আই ওয়ান্ট টু কিস ইন ইউর লিপস। আন্স দেন জান।
– নো আই ডোন্ট লাভ ইউ। ভালোবাসা মুখের কথায় হয় না। এটুকু বোঝার মত বয়স নিশ্চয় আপনার হয়েছে।
– আই নো বাট আই এম স্ট্রেঞ্জ ফিল ইউ। আই ইমাজিন আই ফল ইন লাভ।
– আপনার মাথায় কি সমস্যা আছে? আমি কি ভালোবাসা চেয়েছি আপনার কাছে?
– আই ডোন্ট নো বাট আই মিস ইউ। ইউ লুক মাই পিক অর প্রোফাইল। কেন জানি আপনাকে ভালো লাগলো। মিসও করছি। হার্টে পেইনও হচ্ছে।
– প্রোফাইল পিকচারটা কিন্তু আমার না। ভালো করে দেখেন।
– এট নাও আই এম নট ফিল বেটার কজ আই ফিল ইউ এবং টক উইথ ইউ প্লিজ। আই নো ইটস নট এ ফ্যাক্টর। আই নো ইট ওয়াজ পিক অফ দেব নাট আই লাভ ইউ।
– এত ভালোবাসা রাখি কোথায়!
– আপনি আমাকে ইনসাল্ট করলেন। আমি বোকা তাই না। না হয় হলাম লাভ এর জন্য।
– এর প্রতুত্তোরে শুভ্র কি বলবে কিছু ভেবে না পেয়ে চুপ করে বসে রইলো। আবার টেক্সট এলো।
– ব্রো প্লিজ গিভ ইউর নাম্বার। আই মিস ইউ জান।আপনার প্রোফাইল খুব ভালো লাগে। এরকম করে কেউ লেখেনা, আমি বার বার পড়ি। মুগ্ধ হই। গলা ছিলা মুরগীর কথা পড়ে আমার এত হাসি পেলো যে আপনাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিলাম। প্লিজ আমার কথার উত্তর দিন। আমি আপনাকে আরো জানতে চাই।

– এই পাগলারে শুভ্র কিভাবে থামাবে বুঝতে পারলো না। সে মিথ্যা বললো,
– ভাই প্লিজ আমাকে বিরক্ত করো না। আমি বিবাহিত। আমার এসব ব্যাপারে আগ্রহ নেই।
– বাবুর খুব কষ্ট হচ্ছে। এই মানুষটা কেন তাকে বুঝতে পারছে না। এই মানুষটার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। একটু কথা বললে তার কি সমস্যা। নাকি সে খুবই অহংকারী। বাবু নিজেকে প্রবোধ দিতে পারে না। সে আবার লিখলো।

– আপনার বয়স কত? কিসে পড়ছেন? নো প্রবলেম। জাস্ট বেস্ট ফ্রেন্ড এন্ড ব্রো এন্ড লাভ।
– নিজেই তো বললে প্রোফাইল পড়েছো। তো আবার বয়স জিজ্ঞেস করো কেন?
– ইউ আর মে বি ২৭ ইয়ারস। লাভার বয়। আই লাভ ইউ। আই ওয়ান্ট টু কিস ইন ইউর লিপস এন্ড প্লে থ্রু অফ ইউর হোল মাউথ।
– এই ছেলে তো চিপ টাইপ চ্যাট শুরু করেছে। শুভ্র এগুলো ফেস করতে করতে হাফেজে ফেক আইডি হয়ে গেছে। সে ইগনোর করা শুরু করলো। কিন্তু এই ছেলে পিছ ছাড়ে না। এই ছেলে কি বোঝেনা যে শুভ্র তাকে ইগনোর করছে,
– আই ওয়ান্ট টু টক উইথ ইউ।
– আমার সাথে কি কথা?
– আই ডোন্ট নো। বাট আই মিস ইউর কম্পানি। ট্রাস্ট মি। আই লাভ ইউ সো মাচ।
– বাড়ি কোথায় তোমার?
– চিটাগাং। আই এডমিটেড এট এমবিএ।
– বয়স কত?
– আই গেস আই fill ইউ বাট হোয়াই? আই এম ২৩ ইয়ার্স।
– আরে feel বানান এটা। এমবিএ কি বাংলা মিডিয়ামে পড়ো নাকি!
– – ফেসবুকে আমার নাম্বার আছে। প্লিজ। আই নো আই মিসটেক ফিল। ব্রো এসএসসিতে জিপিএ ৫, এইচএসসিতে ৪.৮০ এবং অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছি।
– – তাহলে ইংলিশ এর এই দুর্দশা কেন। বাংলা বলো।
– – প্লিজ ইউ রিয়েলাইজ মি।
– – বাংলা বলো মিয়া। ভুল ইংরেজী মেজাজ গরম করে।
– – হোয়াট ডু ইউ মিন ব্রো।
– – আগের সেন্টেন্স হবে, প্লিজ আন্ডারস্ট্যান্ড মি।
– – আপনি কি নিয়ে পড়ছেন?
– – পড়াশোনা শেষ। জব করি।
– – ফেসবুকে অতো গ্রামার কে ইউজ করে। বাট আই এপ্রিসিয়েট ইউ। কি জব করেন। স্টাডি কি ছিলো?
– – এপ্রিসিয়েট বানান বার বার ভুল লিখছো তুমি।
– – ব্রো আই উইশ আই কিস ইউর পেনিস।
– – আরে ধ্যুর।
– – ওকে আমি শিখতে চাই। বানান। বাট আই ওয়ান্ট টু টক উইথ ইউ। প্লিজ নাম্বার দিবেন। আমি আর পারসিনা। একটু আদর করে দেন। প্লিজ ব্রো কি হলো। নাম্বার দেন। আমার ছবি দেখেছেন?
– – গাড়ি টা কার?
– – আমাদের। কি জন্য?

– শুভ্র বুঝলো এই ছেলের সাথে কথা বলে লাভ নেই। তার থেকে চুপ করে যাওয়াই উত্তম। এও সেক্স সর্বস্ব আলাপ শুরু করার চেষ্টা করছে বারবার। ভাবার অবকাশ কই। আবার মেসেজ এলো।
– ব্রো আমি খুব বাজে তাই না। বাট আমি আপনাকে মিস করি।
এরকম আলাপ অনেকের সাথেই হয়। তারপর যে যার মত থাকে। ভুলেই যায় কি কথা হয়েছিলো। ফেসবুকের মানুষগুলো কি জানে যে তারা আসলে হৃদয় থেকে কথা বলে না, কথা বলে তাদের আঙ্গুলের ডগা। অবশ্য কাল কি হবে কে বলতে পারে। এই আলাপের সুত্র ধরে শুভ্র কি জানতো আগামীতে কি হবে। বাবু কি জানতো সে কি শুরু করতে যাচ্ছে। তাদের অজান্তেই শুরু হয়ে গেছে দ্বিতীয় অধ্যায়।

৩য় পর্ব

৫ নভেম্বর ২০১৩। অনেক গুলো মেসেজ জমেছে ইনবক্সে। বাবুর মেসেজটা চোখে পড়লো।
– ব্রো কিস করবো।
– তোমার মত পাগল আমি ফেসবুকে দ্বিতীয়টি দেখি নাই।
– কেন? নাম চেঞ্জ করেছেন কেন?
শুভ্রর প্রিয় ফেসবুক নাম অনু পম চেঞ্জ করতে বাধ্য হয়েছে। ফেসবুকে অনুপম রয় নামে আরেক জন আছে । শুভ্র খুলনার। সেও খুলনার। সে কোথায় ফিরোজ নামে কার সাথে কি বাধিয়েছে আর ফিরোজের বন্ধুরা অনুপম রয় ভেবে অনু পমকেই সকাল বিকাল গালি শুনিয়ে যাচ্ছে। অগত্যা সাধের নাম খানা চেঞ্জ করতে বাধ্য হলো।
– একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
– করেন?
– কাল রাতে কতজনকে অফার করেছো?
– লাভ করা দোষ? মানে কি ব্রো? আমি বুঝলাম না। ক্লিয়ার করেন।
– তুমি বুঝবেও না। যা বোঝার আমাকেই বুঝতে হচ্ছে।
– ওহ তাই। আপনি কেমন আছে ব্রো?
– ভালো আছি। তুমি?
– আমি ভালো বোধ করছি না। ধন্যবাদ ব্রো।
– ভাবী কেমন আছে?
মিথ্যা বলে তো শুভ্র ভালই ক্যাচালে পড়েছে। কথায় আছে না এক খানা মিথ্যা বললে পরে আরো দশখানা মিথ্যা বলতে হয়।
– ভালো আছে।
– কবে বিয়ে করলেন? ভাবী কি করে? ব্রো এত সুন্দর করে কিভাবে নিজের প্রোফাইল লিখলেন?
– হাত দিয়ে লিখেছি ভাই।
– তা জানি। কিন্তু খুব নিখুঁত।
– নিখুঁত কি?
– নিখুঁত মানে মসৃণ।
– আপনি কিসের উপর পড়াশোনা করেছেন?
– সেক্সোলজি এন্ড যৌনটিক ইঞ্জিনিয়ারিং!
– কি এটা?
– এটা সবার বোঝার কথা নয়।
– ব্রো আমার উত্তর দেন। প্লিজ। আমিও লিখতে চাই। কিন্তু আপনার মত লিখতে পারি না।
– চেষ্টা করো পারবে।
– আপনি দুষ্টু হলেও অনেক ভালো।

৬ নভেম্বর ২০১৩।
– কি করসেন। ভাই আপনি আমার আন্সার দেন না কেন? ঘুমাবেন না? অনুপম রয় নামে একজন সিংগার আছে। আমাকে আমার মত থাকতে দাও।
ওদিক থেকে শুভ্রের কোন সাড়া নেই। বাবু অপেক্ষা করে। একটা কিছু লিখুক। কেন লিখছে না সে। বাবু আবার লেখে।
– আমার ফেভারিট সিংগার। ওর অনেক গুলা গান আছে আমার কাছে। এই গানটা আমার অনেক ভালো লাগে। বাড়িয়ে দাও তোমার হাত গানটাও ভালো লাগে।
-হুম
– ব্রো আমি আপনাকে রেসপেক্ট করি। মানলাম আমি আপনাকে কিছু কথা বলেছি। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। আপনার সাথে আমার কালকের চ্যাটিংয়ের পর আর আমি ঘুমাতে পারিনি। নিজের উপর প্রচন্ড ঘৃণা জন্মেছে। আমি আপনাকে দোষ দেবো না। ভালো থাকবেন।
– ভাইজান আপনি যথেষ্ট বড় হয়েছেন। জীবন অনেক কঠিন। আপনাকে বুঝতে হবে। যার সাথে চ্যাট করছেন তাকেও বুঝতে হবে। আমি ফেসবুকের অনেক পুরাতন ইউজার্। আপনি চ্যাটে বলছেন মিস করছেন, ফিল করছেন। তাকে ভালোবাসেন। কেন এই গুলো বলেন।
– ফেসবুক আর বাস্তবতা এক না। আমি বয়সেক্সে বিশ্বাসী না। এটা আমার সাথে যায় না। হঠাৎ করে একটা পেজ পড়ে কেমন যেন মনে হলো তাই জাস্ট ফান করে বলা ভালো লাগছে। আমি জীবনেও ওটা করিনি। আমার খুব সুন্দর গার্লফ্রেন্ড আছে। সে আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। আমিও তাকে ভালোবাসি। আমাদের মধ্যে শর্ত আছে আমরা বিয়ের আগে খারাপ কিছু করবো না। আমি তাকে সব বলেছি। তাকে আপনার প্রোফাইল পড়ে শুনিয়েছি। আপনি আমাকে যা মনে করছেন আমি আসলে তা না। আমার মন খুব খারাপ। আমার প্রোফাইলের স্ট্যাটাসটা একটু পড়বেন। আমি আপনার ছোট ভাই হিসেবে অনুরোধ করছি।

৭ নভেম্বর ২০১৩
– ভাই আগের এসএমএস কি পড়েছেন? আপনার প্রোফাইল এর লেখাগুলি যত পড়ছি তত অবাক হচ্ছি। বড় ভাই। বলার ভাষা নাই। আপনি কেমন আছেন?
– ভালো আছি। তুমি?
– ভালো আছি। আগামীকাল আমার একটা ইন্টারভিউ আছে। আমার জন্য দোয়া করবেন।
– কিসের ইন্টারভিউ?
– জবের। কিছুদিন আগে নেভী এবং এয়ার হোস্টেজে দিলাম।
– ভেরী গুড।
– থ্যাংক্স ব্রো। আমার জন্য দোয়া করবেন।
– ওকে।
– আপনার ফোন নাম্বার দেন।
– ০১৬৭১*******
– অনেক দিন পরে সদয় হলেন। এক্টেল নেই আপনার? আচ্ছা বলেন তো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়?
– ১৯৫৩ সালে।
– হ্যাঁ। আচ্ছা ভাই আমি কি আপনাকে পরে কল করতে পারি যদি মাইন্ড না করেন।
– কখন কল করতে চাও?
– কালকে। আজ ব্যালেন্স নেই। আপনার সাথে কথা বলবো তাই খুব ভালো লাগছে।
– আমাকে কিন্তু সব সময়ে ফোনে পাবে না। শিফটিং ডিউটি করি। ফোন বন্ধ রাখতে হয়।

৮ নভেম্বর ২০১৩
– ভাই আপনার ফোনে মেসেজ দিয়েছি। দেখেছেন।
– দাড়াও দেখছি।
– এখনও দেখেননি।
– দেখা হয় নাই ভাই। স্যরি।
– খুব কষ্ট পেলাম। আমার কথা তো আপনার মনে পড়বে না।
– বুঝলাম না।
– ঠিক আছে।

ছেলেটার ফোন দিলো। মাই গড। সেকেন্ডে যে কয়টা করে শব্দ উচ্চারণ করে শুভ্র বলতে পারবে না। কি বললো, কেন বলছে কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে বুঝতে পারছে ওপাশের মানুষটি বেশ এক্সাইটেড। কথা বেশীক্ষণ বলা গেলো না। শুভ্রের সিনিয়র শুভ্রকে কল করায় রেখে দিতে হলো।
ছেলেটার পাগলামী শুভ্রের ভালো লাগতে শুরু করেছে। অন্যদের থেকে আলাদা। পাগলামি করছে। কিন্তু আন্তরিক পাগলামি। শুভ্রই এবার নক করলো। যদি ফেসবুকের সবাইকে সোনা বলা তার কমন স্বভাব।
– কি করো সোনা?
– রাগ করছি ভাই। প্লিজ প্রশ্ন করেন।
– কি প্রশ্ন?
– ঐ যে ফোনে করতে চেয়েছিলেন।
– ওহ বস ডাকায় আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। ভুলে গেছি এখন।
– ভাই আপনি কিন্তু অন্যদের থেকে আলাদা।
– বিকেলে নাস্তা করেছো?
– না। এখন আমি শপিং মলে যাচ্ছি।
– শপিং মলে কি?
– কিছু কিনতে যাচ্ছি।
– কি কিনবে সোনা?
– টি শার্ট কিনবো। কনভার্স কিনবো। প্রোগ্রাম আছে।
– শুধু নিজের জন্যেই কিনবে! আমার জন্যেও কিছু কিনো।
– কি ভাই? কিন্তু পাঠাবো কিভাবে?
– তুমি এসে দিয়ে যাবা, তারপর আমরা দুজন হাত ধরে ঘুরব। পার্কে বেড়াবো।
– আমি জানি এটা সম্ভব না। আমরা অনেক দূরে থাকি। আপনি আসবেন। আমাদের দেখা হবে তাহলে। আপনাকে শুধু একবার দেখতে চাই। এজ লাইক এ ব্রো।
শুভ্র অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাবু আবার মেসেজ দেয়।
– প্লিজ আন্সার দেন। আসবেন?
– তুমি আসো।
– এখন তো পারসিনা। পারলে আসতাম। আম্মু আসতে দিবে না। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
– আম্মুকে বুঝিয়ে বলো।
– তা গিয়ে কোথায় থাকবো। আমার ভয় হয়।
– হোটেলে থাকবা। কোন ভয় নেই। ভয় কিসের আবার।
– আপনিও হোটেলে থাকবেন? কিন্তু আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না। আমি কিন্ত সিরিয়াস।
– ভালোবাসাকে আমি বড্ড ভয় পাই।
– তাহলে কেন থাকবেন। আমি না হয় একটু কিন্তু আপনি তো
– আমি তো কি?
– আমাকে ভালোবাসেন না। ফিল করেন না।
– বলেছি তো আমি ভালোবাসতে পারি না।
– আমি আপনাকে ভালোবাসতে চাই। আপনাকে ভালোবাসা শেখাতে চাই।
– তোমার সাথে রোমান্স করবো।
– বি সিরিয়াস ব্রো। আপনি যা বলছেন তা কিন্তু আমার কাছে চ্যাট নয়, আমার কাছে আমার জীবন স্বরূপ।
– আমি অবশ্যই তোমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলব না ।
– ভালো তো বাসবেন না। তবে কি করে আপনার সাথে থাকবো। আপনার কথা আমার জিএফকে বলেছি ফোনে।
– জিএফ কি বলে?
– ও বলে ভালো বন্ধু থাকলে ক্ষতি কি। কিন্তু আপনি সত্যিকারে কি চান। সিরিয়াসলি বলেন।
– তুমি তাকে বলেছো যে তুমি আমাকে তোমার বিএফ বানাতে চাও?
– হ্যাঁ বলেছি।
– বিশ্বাস করলাম না। যাই হোক। তোমার প্রশ্নের উত্তর দেই। বারবার জিজ্ঞেস করছো যেহেতু। তুমি ভাই ডাকছো। তোমার সাথে এক হোটেলে থাকলেও এটলিস্ট সেক্স করার ইচ্ছে নেই মাথায়। দেখ ভাই এত ইমোশানের আমি মূল্য দিতে পারব না। আমি খারাপ মানুষ ।
– না। আপনি এমন বলেই আমি আপনাকে মূল্য দিচ্ছি।

 ৪র্থ পর্ব

( লেখক এবং পেজের পক্ষ থেকে আমাদের পাঠক “জল রং” এর জন্মদিন এ আজকের পর্বটা তাকে উৎসর্গ করা হল Happy Birth Day to you “জল রং” )

৮ নভেম্বর ২০১৩।
বাবুর সব সময় শুভ্রের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। কি আছে মানুষটার ভেতরে। এত আকর্ষণ করে কেন সে। খুব কথা বলতে ইচ্ছে করে। বাড়ি থেকে হাতখরচের যে টাকা দেয় তা দিয়েই সে ফোনে কথা বলতে থাকে। অন্যদিকে শুভ্রের দিক থেকে তেমন একটা সাড়া নেই। ফোন রিসিভ করতেও যেন কষ্ট হয় লোকটার। বাবু বলে,
– আমি দেউলিয়া হয়ে গেলাম। অবশেষে আমি সত্যি সত্যি নিজেকে হারালাম। আমি তো এমন ছিলাম না।
শুভ্র হালকা রসিকতার সুরে জবাব দেয়,
– প্রেমের গাঙে জোয়ার এলে প্রথম প্রথম এরকম হয় ব্রো।
– তুমি ভুল বললে। আমি সব সময় গুছিয়ে কাজ করতে চাই যাতে পরে পস্তাতে না হয়। এমন তো না যে আমি অনেকের সাথে প্রেম করতে চাইছি। আমি তার সাথেই করতে চাইছি যাকে মনে প্রাণে ফিল করছি।
– কাকে ফিল করো তুমি?
– যদি মিথ্যা না বলা হয় তবে তাকে যে আমাকে চুম্বকের মত অহনিশি টানছে। তাই তো ঢাকা যেতে মন চায়। চ্যাট আর ফোনে কথা বলে তিয়াশ মিটছে না। নিজের মধ্যে যে ইগো প্রব্লেম ছিলো সেটাও শেষ করছি তার জন্য।
– সে ঢাকা থাকে বুঝি।
– সঠিক জানিনা। খুব কষ্ট লাগে যখন মনে হয় আমার সাথে তার কথা বলতে ইচ্ছে হয় না। আপনি যে ভয়েস ক্লিপসটা পাঠিয়েছিলেন তা আমি অবশেষে ডাউনলোড করতে সক্ষম হলাম।
– হা হা হা।
– হাসির কি হলো। ভাইয়া, তুমি কি আমার হবে? আমি কিন্তু সিরিয়াস।
– তুমি অনেক দেরীতে এলে ভাই। ভালোবাসার প্রতি আমার সেই আগের ফিলিংস আর নেই। আমার আর ফেরার পথ নেই। ভুল বয়সে ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলাম।
– আমি আপনাকে জোর করবো না। শুধু এটাই বলতে চাইছি যে আমি কেন জানি আপনাকে খুব মিস করছি। দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আপনি দেখা দিচ্ছেন না। ছবিও দিচ্ছেন না। আমার সব কিছু এলো মেলো হয়ে যাচ্চে ভাইয়া। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারছি না।
– রাতে ভাত খেয়েছো তুমি?
– আমার জীবনে এটা ঘটবে আমি কখনো কল্পনা করিনি। চিন্তা করিনি। আমার ভালো লাগছেনা কিছু। এসব কি হচ্ছে আমার। আমি ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছি।
– ভ্যানিশ হয়ে যাবে কই?
– ভাই এটা আমার জীবন, কোন ছেলে খেলা নয়। আমি বুঝতে পারছি না আমি কি করছি।
– তবে তোমার আগে বোঝার চেষ্টা করা উচিত তুমি কি করছো।
– অনেক চিন্তা করেছি বিগত চারদিন ধরে। কোন বাঁধাই পেরোতে পারিনি। নিজের ইগো, নিজের পারসোনালিটি আমি নষ্ট করতে চাইনি। কিন্তু বাধ্য হলাম।
– নষ্ট করো না প্লিজ। কষ্ট পাবে।
– আমার মনে হয় ফেরার পথ নেই। আমি জোর করব না। চাইলেই অনেকের সাথে অনেক কিছু করতে পারি কিন্তু আমি তাদেরকে ফিল করি না। আপনাকে আমি আমার জীবনে স্থান দিয়েছি। কোথাও লুকাই নি। নিজের গার্লফ্রেন্ডের কাছেও বলেছি। কারো ভালোবাসাকে রেসপেক্ট করা উচিত ভাইয়া।
– অসম্মান তো করিনি।
– হ্যা। কিন্তু আমার কি দোষ। আপনাকে খুব মিস করছি। কিন্তু কেন করছি এটাও বুঝতে পারছি না। ভাইয়া পারলে আপনি এটার সমাধান করেন।

– ওকে ডার্লিং।
– প্লিজ ফান করবেন না। আমি সিরিয়াস।

৯ তারিখে শুভ ফেসবুকে ঢুকে নিজেই বাবুকে নক করলো।
– গুড মর্নিং
– প্লিজ।
– প্লিজ কি?
– আপনি বুঝবেন না। অন্যের ফিলিংস বোঝার ক্ষমতা আপনার নেই। শুধু শুধুই ফেসবুকে লেখালেখি করেন। আমার এসএমএস পড়েননি?
– ওহ। ওই ফোন অফ করে রেখেছিলাম। অন করা হয় নাই।
– আপনার পাওয়ার আছে তাই আর কি।
– কিসের পাওয়ার ভাই?
– এই যে অন্যকে গুরুত্ব না দিয়ে অবহেলা করার।
– আমি মানুষকে মানুষ মনে করি লাভার না।

সেদিনকার মত রাজ চুপ হয়ে গেলো। শুভ্রও আপন কাজে ডুব দিলো। বাড়িতে গিয়ে একটা মেয়ে দেখানো হয়েছে। আম্মা বলেছে মেয়েটা তার খুব পছন্দের। শুভ্র যদি আপত্তি না করে তবে আম্মা কথা বলতে চান। আম্মার মুখে দিকে তাকিয়ে শুভ্র না করতে পারলো না। দুটি সন্তানকে ঘিরেই তার মায়ের জীবন। মায়ের চোখে আশার আলো চিক চিক করছে। মেয়ে দেখলেই তো আর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না। শুভ্র মা কে বললো, দেখেন যেটা ভালো মনে করেন।
আম্মা বললেন, ভেবে বলো, মেয়ে পক্ষ রাজি হলে কিন্তু আর পিছিয়ে আসা যাবে না। সামাজিক সম্পর্ক বলে একটা ব্যাপার তো আছে।

 ৫ম পর্ব

এটা এমনি এক গল্প যাতে কাহিনীর তুলনায় কথা বেশী। যে গল্পে দুটি মানব সন্তান যাদের একজন চট্টগ্রামে অপরজন নারায়নগঞ্জে বসে কথার পিঠে কথা বলে গেছে। যে যার দৃষ্টিকোন থেকে কথা বলে গেছে। দুজনেরই মনে হয়েছে অপর জন তাক ঠিক বুঝছে না। কিন্তু কেন!
১২ নভেম্বর ২০১৩।
শুভ্রের ল্যাপটপে বাবুর মেসেজ এলো।
– ভাইয়া প্লিজ। আরেকটা ভয়েস মেসেজ পাঠান। বড় করে। পাঁচ মিনিট।
– পাঁচ মিনিট। পাঁচ মিনিটে এত কি বলবো। সম্ভব না।
– প্লিজ ভাইয়া। এত অল্প শুনে আমার তৃষ্ণা মিটছে না। আপনার ভয়েস আম্মুকে শুনিয়েছি। আম্মু পছন্দ করেছে। আম্মুর জন্য আরেকটা পাঠান।
– আর ইউ ম্যাড?
– হ্যাঁ। আমি পাগল। আপনার জন্য পাগল। আমি আপনার কথা শুনেছি। আপনি আমার কথা শোনেন।
– কি কথা শুনেছো?
– আপনি বলেছিলেন আমার ফ্রেন্ডলিস্টে এত ফেক আইডি কেন। আমি ১৫০ জন ফ্রেন্ড থেকে সব ফেক আইডি রিমুভ করে ৮১ জনে নিয়ে এসেছি। শুধুমাত্র আপনার কথায়।
– আমি বলেছিলাম তোমার আইডি রিয়েল তাহলে এত ফেক আইডি এড করেছো কেন। ডিলিট করতে তো বলিনি। সো এটা করা না করা তোমার ব্যাপার।
– ব্রো আপনার ফোনে এসএমএস করেছিলাম। রিপ্লাই দেন না কেন?
– শোন বাবু, ফোনে টেক্সট পাঠাবে না। যা লেখার ফেসবুকে লিখবে।
– সমস্যা কি ভাই?
– বোঝার চেষ্টা করো। তোমার ভা্বীর হাতে এই মিস ইউ, লাভ ইউ মেসেজ পড়ে গেলে আমার লাইফ হেল হয়ে যাবে না?
– তা ঠিক। কিন্তু আমি আপনাকে আমার বড় ভাই ভাবি।
– তাহলে ভাইয়ের মতই ব্যবহার করো না। এই লাভ ইউ, মিস ইউ, কিস ইউ কেন?
– কি করতাম। আমি যে আপনাকে খুব মিস করি। ভালোবাসতে মনে চায়।
– বাবু। এটাকে ভালোবাসা বলে না। বলে মোহ। দুদিন বাদে এমনিতেই এই মোহ কেটে যাবে। ভালোবাসা গদ্য পদ্যের মত এত সরল নয়।

১৩ নভেম্বর ২০১৩।
ভালোবাসা। হায়রে ভালোবাসা। তোকে পাওয়ার জন্য এত আকুলতা। তুই বার বার দুয়ারে হানা দিস। তবে ভুলভাবে হাজির হইস। তোকে বুকে আঁকড়ে ধরতে ভয় হয়। শুভ্রের ভালোবাসার জন্য উতলা মন উন্মুখ হয়। সে বাবুকে মেসেজ করে,
– ভালোবাসা হচ্ছে শাঁখার মত । একটু আঘাতেই চুর্ণ হয়ে যায়। তারপরেও মানুষ ভালোবাসতে চায়। ভালোবাসার পরশ পেতে চায়। শাঁখা ইচ্ছে করলে বদলানো যায়, কিন্তু ভালোবাসা কখনো বদলানো যায় না । ভালোবাসা রয়ে যায় হৃদয়ের গোপন কোঠরে।
– আজ হঠাৎ এত গদ্য কেন ভাই। খুব ভালো লাগলো। ভাই একটা ভয়েস ক্লিপ্স পাঠান না।
– ওকে পাঠাচ্ছি।
– অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই। মনে হচ্ছে আমি বেস্ট গিফট পেয়েছি।
– একটু বেশী বেশী বলা তোমার বরাবরের অভ্যেষ তাইনা?
– মানে।
– না। কিছু না।

১৪ নভেম্বর ২০১৩

বাবুর মেসেজ, ভাইয়া আমি আপনার প্রোফাইল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চেক করলাম। আপনি অনেক গুলো খারাপ পেজে লাইক দিয়েছেন। এটা কিন্তু ঠিক না। আপনার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। আপনি কেন এগুলোকে লাইক দেবেন।
– আরে ভাই এটা আমার ফেক আইডি। এসব নিয়ে ভাবার সময় আছে। আই লাভ টু বি ব্যাড।
– ভাইয়া প্লিজ আমাকে আপনার রিয়েল আইডিতে এড করেন। আমি আপনাকে আমার সত্যিকারের ভাই ভাবি। আমিও আপনার সত্যিকারের আপন ছোট ভাই হবো। প্লিজ প্রোফাইল পিকচারটা চেঞ্জ করেন।
– প্রোফাইল পিকচার আবার কি করলো? এই আবদার রাখা হবে না।
– প্রোফাইল পিকের ব্যাকগ্রাউন্ড আরো বেটার হতে পারতো।

১৫ নভেম্বর ২০১৩
বাবু বললো, ভাইয়া আমি দিন দিন আপনার প্রতি উইক হয়ে পড়ছি। প্লিজ আমাকে কখনো ঠকাবেন না।
– আরে ভাই, আই এম নট ইন লাভ উইথ ইউ। সো এসব ঠকানোর প্রশ্নই আসে না।
– আমি জানি। বলতে পারেন ভাইয়া কেন আপনার প্রতি আমার ফিলিংস দিন দিন বাড়ছে। এর সমাধান কি?
– এর সমাধান আমার জানা নাই।
– আমার সাথে এগুলা যায় না। আমি নিজেকে চেনার চেষ্টা করছি। কিন্তু চিনতে পারছি না।
– নো দাই সেলফ। নিজেকে জানো। নিজের কাছে ক্লিয়ার হও যে তুমি আসলেই কি চাও। এই ব্যাপারে অন্তত কেউ তোমাকে সাহায্য করতে পারবে না।
– আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি।
– তাহলে তোমার বাবা মায়ের সাথে কথা বলো।
– আপনি এটা কি বলেন। আপনি একজন ট্যালেন্টড পারসন। আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসি এটা কিভাবে বাবা মা কে বলবো।
– আমি ট্যালেন্টেড পারসন নই। সৎ হও। কাউকে ভালোবাসলে সে কথা প্রকাশ করতে সমস্যা কোথায়? আর বাবা মাই তো আমাদের বেস্ট বন্ধু।
– বাবা মাকে আপনার কথা বলেছি। কিন্তু ভালোবাসার কথা বলিনি। এটা বলা যায় না। আপনাকে আমি সবসময় ফিল করি।
– ভাই তোমাকে একটা আগলি ট্রুথ জানিয়ে দেই। তুমি কখনোই আমাকে পাবে না। আমি কাউকে ভালোবাসতে পারবো না। আমি ভালোবাসতে ভুলে গেছি।
– না। আমি সত্যি সত্যি আপনাকে পাবো এমন চিন্তা আমি করিনি। ভাবি, আমি এমন হলাম কেন। কেন এত অস্থির হলাম। আমি কি খুব খারাপ। আমি কেন কারো প্রতি এত সিরিয়াস হলাম। কেন সারাক্ষণ তাকে নিয়ে ভাবি!
– ইটস নট এ ম্যাটার অফ লাভ। আমাদের দেখা হয় নাই কখনো। আমার ছবি দেখো নি। কিভাবে আমাকে তুমি ভালোবাসো। আমি কনফিউজড।
– আমি নিজেও কনফিউজড। আমি নিজেকে অনেকবার বোঝাতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু ব্যার্থ হয়েছি। মন মানে না। আমি কখনো এমন ছিলাম না। আমি যে আর পারছি না। আমাকে সাহায্য করুন। আর পারছিনা নিজের সাথে যুদ্ধ করে।
– – এভাবে ভাবলে তুমি হতাশা বোধ করবে। জীবনকে পজেটিভ হিসেবে নাও।

পর্ব ৬

বাবু বললো, আমি হেরে গেলাম জীবন যুদ্ধে। আমি হতাশ। আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না। আমি হেরে গেলাম জীবন যুদ্ধে। আমার ফার্স্ট লাভ এভাবে শেষ হলো কেন?
– ফার্স্ট লাভ! তুমি না বললে তোমার গার্লফ্রেন্ড আছে। তাহলে তোমার লাভ কোথায় শেষ হলো।
শুভ্র জানতে চাইলো। জবাবে বাবু লিখলো,
– মানে কি! প্লিজ বোঝার চেষ্টা করেন। আমি পারবো না ভুলতে।
– আমি বুঝে কি হবে বলো! আমি তো তোমার ভালোবাসা গ্রহন করতে পারবো না। বড় অসময়ে তুমি এসেছো আমার দুঁয়ারে। আমি আজ বড় শক্তিহীন, সাহসহীন। তোমার জন্য সমস্ত পৃথিবীর সাথে সংগ্রাম করার সাহস আর আমার নেই। আমি নিঃশেষ হয়ে গেছি।
– ভাই দেখবেন সব চেঞ্জ হয়ে যাবে।
– কিছুই বদলাবে না ভাই। এই জীবন এমনি করে চলে যাচ্ছে যুগ থেকে যুগে, শতাব্দী থেকে শতাব্দীতে এই ভালোবাসা শুধু গুমরে মরে কেঁদেছে। এই ভালোবাসাকে স্বার্থকতা দিতে পারেনি কোন প্রেমিক।
– ভাই আমি জানি আপনি বিরক্ত হচ্ছেন আমার কথায়। কিন্তু আমি নিজেকে আপনার সাথে চ্যাট করা থেকে বিরত রাখতে পারি না। কাল আমার নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছে। তবুও আমি বড় অসহায় বোধ করছি। কেন আপনি পারছেন না আমার সত্যি ভালোবাসা গ্রহন করতে। কেন পারবেন না আমাকে নিজের করে নিতে।
১৬ নভেম্বর ২০১৩।
বাবু টেক্সট করলো, হ্যালো ভাইয়া কেমন আছেন। জবাবে শুভ্র লিখলো,
– হাই বন্ধু, আজ আর চ্যাট করবো না। জ্বর এসেছে। তেমন কিছু না। ১০১ ডিগ্রি মাত্র। আমার জন্য দোয়া করো। খোদা হাফেজ।
– ভাই প্লিজ ডাক্তারের কাছে যান। আমার চিন্তা হচ্ছে। প্লিজ ডাক্তারের কাছে যান।
– ডাক্তারের সাথে কথা হয়েছে। তেমন কিছু না। সিজনাল ফিভার।
– আমার তো আজ ঘুমই হবে না। ডাক্তার কি মেডিসিন দিলো।
– এত ভালোবাসা যে তোমরা কই থেকে পাও। প্যারাডট দিয়েছে ডাক্তার।
– ওকে ভাই। আজ তাহলে নো ফেসবুক, নো ফোন, জাস্ট রেস্ট। প্লিজ এই অনুরোধ টুকু রাখুন। আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য দোয়া চাইছি।
– আমিন।

১৭ নভেম্বর ২০১৩
শুভ্রই আজ বাবুকে নক করলো, হ্যালো ভাই, কেমন আছো তুমি?
বাবু গদগদ হয়ে আন্সার দিলো, কেন! আমি কে যে আমার খবর নিবেন! আমাকে ঘৃণা করাই আপনার কাজ!
– আমি কাউকেই ঘৃণা করিনা। আগলি ট্রুথ হচ্ছে আমার ব্যবহার ন্যাচারালই রুড।
– আপনি আমাকে বোঝার চেষ্টা করেন না।
– আমি বুঝতে চাইনা তাই বুঝি না। আমি কষ্ট পেতে চাই না তাই বুঝি না।
– সেজন্য আমাকে কেন কষ্ট দিবেন। আপনি পারছেন তাই দিচ্ছেন। কিন্তু আমি আপনাকে ভুলতে পারবো না।
– আবার এক কথা। বাদ দাও। আজ তো জব লাইফে এন্ট্রি করলে। মোবারাকবাদ জানাই তোমাকে। কেমন চলছে প্রথম দিন সেটাই বলো।

– হুম। আজ আমি নতুন জীবনে পদার্পন করলাম। সকাল দশটা থেকে ১২ টা পর্যন্ত সবার সাথে পরিচিত হলাম। একরকম ভালোই কাটলো। বসকে খুব রাশভারী মানুষ মনে হচ্ছে। আগামীকাল বোঝা যাবে কত দিনে এক সপ্তাহ। আপনাকে অনেক মিস করেছি। ফেসবুকে দেখলাম খুব মজা করছেন স্ট্যাটাসে। কল দিতে ইচ্ছে করছিলো। কিন্তু কল দেইনি।
– আসলে আজও আমার শরীর খারাপ ছিলো। জ্বর গেছে। কিন্তু দুর্বলতা আছে। সারাদিন শুয়ে ছিলাম। তাই ফেসবুকে আড্ডা দিচ্ছিলাম।

১৮ নভেম্ভর ২০১৩।
বাবু লিখলো, ভাই জানি আমি কখনো আপনার যোগ্য হবোনা তবুও আমি ভালোবাসি। কেন জানি আপনাকে ভালোবাসতে খুব ভালো লাগে।

-হয়তো আমিই তোমার যোগ্য নই। হয়তো আমি প্রচন্ড খারাপ।
– উল্টোটা। তাই সরে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার জীবনটা প্রায় শেষ। কাকে মন জানিনা খুব ভাবে। আমি আপসেট। আপনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। কিন্তু আপনি ফোনে কথা বলতে চান না। আজ অনেকবার আপনাকে কল দিয়েছিলাম। আপনি ফোন সুইচ অফ করে রেখেছেন।

– সত্যি তুমি আমাকে ভুলে যাচ্ছো?
– ট্রাই করছি। কিন্তু পারছিনা। অনেক কষ্ট পাচ্ছি। প্লিজ কল ধরেন। ঢাকা যাবো। আপনার সাথে কথা আছে।
– ফোন তো বন্ধ। কল ধরবো কিভাবে? সাপ্তাহিক ছুটির দিন আমি ফোন বন্ধ করে রাখি।
– ও তাই। আমাকে মারবেন নাকি। আমি আপনার জন্য মন দিয়ে কাজ করতে পারছি না। আমার প্রব্লেম আপনি বোঝেন না কেন। খুব কষ্ট পেলাম।
– বুঝি। কিন্তু তুমি আমার প্রব্লেম বোঝো না। আমি তোমার সাথে এখনো খারাপ ব্যবহার কেন করিনি সেটাই বুঝছি না। তুমি জানো লাস্ট দুই সপ্তাহে যারা আমাকে ফোন করেছে সবাই আমাকে ব্লক করেছে। ইদানিং ফোনে আমি কারো সাথে ভালোভাবে কথা বলতে পারিনা। রেগে যাই।
– আমি তো আপনাকে ভাই ডাকি। ভাই হিসেবে আমার সমস্যার সমাধান করে দিন।
– দেখলি তুই আমার প্রব্লেমকে গুরুত্ব দিলিনা। তোকে আমার সমস্যার কথা বললাম।

এই প্রথম শুভ্র বাবুকে তুই বলে। বাবু শুভ্রর কথা বুঝতে না পেরে বললো,
– মানে।
– তোমাকে কিছু বলাই বৃথা।
– কেন? আমি ভালোবাসি এটা দোষের কি হলো? ভাইয়া মে বি আমাকে ঢাকা যেতে হবে ট্রেনিংয়ে।
– একটা জিনিস ক্লিয়ার জেনে রাখো আমি ঢাকা থাকিনা।

৭ম পর্ব

১৯ নভেম্বর ২০১৩ তারিখ সকালে বাবু শুভ্রকে লিখে পাঠালো।
– ভাই ফরমাল ড্রেস ভালো লাগেনা। সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা বিরক্তিকর। আপনাকে আমার কিছু কারণে ভালো লাগে।
– জীবন অনেক বৈচিত্র্যময়। অনেক ভালোলাগা মন্দ লাগাকে সাথে নিয়েই জীবন উপভোগ করতে হয়। শুভ সকাল।
– ফোন বন্ধ কেন?
– ফোনে কথা বলবো না তাই। যা বলার এখানেই বলো।
– কেন ভাই?
– আজ মধ্যরাতে তোমাকে একটা গিফট দেবো।
– কি গিফট ভাই। আমার আর কিছু চাই না। আপনি আমার বড় ভাই এইটুকুই যথেষ্ট। ফোন বন্ধ করে রেখেছেন। আমার কষ্ট লাগছে।
– তোমাকে আমার ছবি দেব। তবে একটা প্রমিজ করতে হবে। ফেসবুকের কাউকে আমার ছবি দিতে পারবি না। প্রমিজ?
ফোন রাত ১১ টার ওপেন করব। ঠিক আছে।
– ভাই আমার সাথে কথা না বলে কিভাবে আছেন? আমি কেন আপনার ছবি শেয়ার করবো। আমি তাদের মত নই।
– আমি কথা না বলেই থাকতে পারি। আমি আজ কারো সাথে কথা বলি নাই। আম্মার সাথে না। দাদী জানের সাথে না, নানী জানের সাথে না।

– সত্যিই ভাই। আপনি আমার উপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন। কখন পিক দিবেন। এখনি দেন। ফোন খোলা রাখেন। মা কষ্ট পাবে। ভাই জানিনা আপনি আমাকে কতটুকু ট্রাস্ট করেন কিন্তু আমি আপনাকে প্রচুর ট্রাস্ট করি। ডিপেন্ড করি। আমি বরাবরই চাই যেন কারো ওভার মূল্যায়ন না হয়। কিন্তু আমি জানি আপনি অনেক দুষ্টু। যথেষ্ট স্পষ্টবাদী, যৌক্তিক কথা বলেন। নিজেকে সমকামী ভাবেন কিন্তু আমাকে ভালো রাখার চেষ্টা করছেন। আমি ওসব লাইক করিনা। কিন্তু আপনাকে হারাতে পারবো না।
– ওকে। ওয়েট। দেখি কোন ছবিটা দেওয়া যায়। নেটের স্পিড যা খারাপ।
– অপেক্ষা করছি।
– এই যে দুটো ছবি দিলাম। একটা সিলেটের জাফলংয়ে তোলা অন্যটি রাঙামাটিতে।

ওপাশ থেকে কোন সাড়া শব্দ নেই। কি হলো! ছবি দেখে পছন্দ হলো না বলে কি কেটে পড়লো? শুভ্রের আগ্রহের পারদ বাড়লো। সেই এবার নক করলো,
– এনি কমেন্টস?
– ভাই, ধন্যবাদ। ভাই আপনি আমার বড় ভাই। তাই তো সব সুখ দুঃখ, হাসি কান্না আপনাকে বলার জন্য মনটা ব্যাকূল হয়ে থাকে। আপনার সব উপেক্ষা অপমান অবহেলা সব সহ্য করে আপনাকে বারংবার বিরক্ত করি। শুধু একটা জিনিস মানতে পারি না। আপনি আমাকে আপনার ফেসবুকের অন্যদের মত দেখেন। মনে আছে আপনি একটা ভয়েস মেসেজ দিয়েছিলেন, ”চুপ করে আছো কেন?” ওটাকে আমি ফোনের রিংটোন হিসেবে সেট করেছি।

২০ নভেম্বর ২০১৩। বাবু একাধিক মেসেজ দিয়ে চলেছে। শুভ্রের কোন উত্তর নেই।
– ভাই কি করছেন। উত্তর দিচ্ছেন না কেন?
– আজকাল আমি কম কথা বলি।
– আমার সাথেও? কিন্তু কেন?

– বুঝবেনা তুমি। তুমি অন্যদের বোঝো না।
– কেন ভাই, এমন বলছেন কেন? আমি কি বুঝি না। ফোন বন্ধ কেন?
– রাত দশটা থেকে সকাল ৬ টা পর্যন্ত ফোন খোলা থাকবে। আমি অফিস টাইমে শুধু ফোন খুলে রাখি।
– আপনার অফিস কি সব সময় একই হয়? কল দেবো প্লিজ?
– দিতে পারো।
– ওকে ভাই।
– ওকে।
– আপনার ফোন নেটওয়ার্ক বিজি এবং অফ বলছে। একটু দেখেন। অনেক ট্রাই করলাম।
– ফোন চার্জে দিয়ে রাখছি। ওপেন আছে।
– তাহলে কল যাচ্ছে না কেন?
– বুঝতে পারছি না।
– আপনার জন্য ফেসবুক থেকে বেরিয়ে অনেক বার কল দিলাম। কিন্তু প্রতিবার কল ফেইল। খুব কষ্ট হচ্ছে। আপনি বুঝবেন না। ভাই প্লিজ মিসকল দেন।
– আমার ফোন থেকে কল ইনকামিং আউটগোয়িং কাজ করছে না
– কেন? আর দিনে ফোন অফ রাখেন কেন?
– ঘুমাতে হয় তাই।
– ভাই ভাবী কোথায়?
– আরে ভাই আমার বিয়েই হয়নি এখনো। মেয়ে ঠিক হয়েছে।
– ভাবী পড়ছে কোথায়?
– খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
– ব্রো আমার ইচ্ছা আপনার বাসর ঘরটা ক্যান্ডেল দিয়ে সাজাই। আপনি আধো আলোতে ভাবীকে দেখবেন আর পাগল হয়ে যাবেন।
– দারুন ভাবনা।
– উফস কতক্ষন পরে উত্তর দিলেন। সত্যি আমার যদি অধিকার থাকতো তবে ঐভাবে আপনার বাসর সাজাইতাম।
– অধিকার কেউ দেয় না। আদায় করে নিতে হয়।

শুভ্রের এখন প্রতিদিন রুটিন ওয়ার্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ফোনে দুজনের সাথে প্রেম করা। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা হবু বউ এবং হবু বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলতে হয়। এতো গেলো বাস্তবতা। শুভ্রর মনে খবর জানে শুধু শুভ্র আর তার ইশ্বর। হবু বউয়ের সাথে টুকটাক ফরমাল কথাই হয়। এক বাপের এক মেয়ে। কাউকে গুনে কথা বলা শিখেছে বলে মনে হয় না। সে যা বলে তাই সায় দিতে হয়। মতের বাইরে কোন কথা শুনতে রাজী নয়। সে যাই বলুক। মেনে নিতে হবে। না বললে খবর আছে। রাগ করবে। দুদিন ফোন ধরবে না। বলে দেবে বিয়ে করবে না। শুভ্র ভাবে এই মেয়েকে বিয়ে করার থেকে না করাই উত্তম। কিন্তু আম্মা একে খুব পছন্দ করেন। কি দেখে করেন কে জানে। দেখা যাক।

অপরদিকে বাবু, সেও শুভ্রকে বোঝে বলে মনে হয় না। দিনের মধ্যে একাধিকবার শুভ্রকে ফোন করবে। শুভ্র শুনছে কিনা সেদিকে তার কোন ভাবনা নেই। নিজের মত কথা বলে যাচ্ছে। কোন ছেলেকে এত ঘন কথা বলতে শুভ্র এই প্রথম দেখছে। যতক্ষণ ফোনে থাকে ততক্ষন কথা বলেই চলে। নিঃশ্বাস নেয় কখন। ছেলেটার পাগলামী শুভ্রের ভালো লাগছে। কিন্তু ভালো লাগলে কি হবে। এই জীবনে ভালোবাসা স্থায়িত্ব পায় না। বড়জোর ছয়মাস। তারপর সবাই নতুন করে ভালোবাসা খোঁজে। আর এর ভালোবাসার বেগ বেশী মনে হচ্ছে। ছেড়ে যেতেও সময় নেবে না। তার থেকে ভালো সোজা রাস্তায় চলা। যেহেতু দ্বৈত জীবনকে মেনে নিতেই হবে। পরিবার, সমাজকে বৃদ্ধাংগুল দেখিয়ে একা বাঁচার সাহস শুভ্রের নেই


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.