দ্বিধা

লেখকঃ মহাকাল হাসান

১)

এইতো এই মাসেই আদনানের বয়স ৪৫ পার হল। এ বয়সেই মাথায় মস্ত এক টাক। চুল গুটি কয়েক যা আছে তাতেও পাক ধরেছে। বেশ বিশাল এক ভুঁড়িও আছে। শরীরের প্রতি তেমন একটা যত্নবান সে কখনোই ছিলনা। লোমশ শরীরে সুগন্ধিতো সে মাখে তবে কোন ব্র্যান্ডের খুব একটা ধার ধারেনা। লোমশ হাতে সোনালি রঙের ঘড়িটা বেশ চোখে পড়ে। এতো এতো এলোমেলো অবস্থার মধ্যেও ওর চোখজোড়া খুব নজর কাড়ে। খুব সজিব, প্রানবন্ত, চকচকে একজোড়া চোখ। যৌবনের প্রথম প্রহরে আয়শা এই চোখের প্রেমেই পরেছিল। এরপর ঐ চোখজোড়া দখলে নিতে দেড়ি করেনি আয়শা। ঠকেনি ও। আদনান স্বামী হিসেবে, বাবা হিসেবে অন্যান্য পুরুষদের জন্য ইর্ষনিয়। কিন্তু রোমান্স মোটেই নেই এই লোকটার মধ্যে। বড্ড কাঠ খোট্টা। ওর ধ্যান জ্ঞানের বেশিরভাগ জুড়েই শুধু টাকা আর ব্যবসা। এরপরও স্বামীর দায়িত্ব পালন করতে তার ভুল হয়না। প্রতি সপ্তাহে বউকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, বাচ্চাদের তদারকি করা সবকিছুতেই সে পটু। আশেপাশের স্বামীদের বেশ ঈর্ষার কারন। আজ অব্দি বউয়ের সাথে কখনো ঝগড়া হয়নি। ভাবা যায়! অথচ এই প্রশ্নটা কখনোই মনে আসেনি ওদের। খুব ভালই চলছে। আসলেই ভাল। সম্প্রতি নতুন একটা ব্যবসায় হাত দিয়েছে আদনান। কিছু প্রানবন্ত তরুন দরকার। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। সামনের মঙ্গলবারেই ইন্টারভিউয়ের ডেট। এই ব্যাপারটা আদনানের খুব বিরক্ত লাগে। কারন অনেক মানুষের মধ্য থেকে গুটিকয়েক মানুষ বাছাই করাটা খুব টাফ। প্রতিটা ছেলে-মেয়ের চোখে কত স্বপ্ন থাকে। কারও কারও চেহারা দেখলেই বোঝা যায় তারা খুব করুন অবস্থায় আছে। একটা চাকরি খুব দরকার। ইচ্ছা থাকলেও বিভিন্ন কারনে তাদের হেল্প করাটা সম্ভব হয়না। আদনান এইসব ইন্টারভিউ গুলো নেয়ার পর খুব ক্লান্তি বোধ করে। খুউউউব। কিন্তু নিজেকে কোনভাবেই কোনকিছুর প্রতি দুর্বল ভাবতে চায়না আদনান। নিজের চারপাশে একটা শক্ত আবরন টেনে রাখে। ভেতরের কুসুমের মত নরম আদনানকে কেউ কখনো দেখেনি। এমনকি ওর স্ত্রীওনা।

২)

আজ মঙ্গলবার। সকাল থেকেই ইন্টারভিউ নিচ্ছে আদনান। পদের বিপরীতে প্রার্থির সংখ্যা অনেক বেশি। পারলে সবাইকেই চাকরি দিয়ে দেয় আদনান। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভবনা। ইন্টারভিউ শেষ । চূড়ান্ত বাছাই চলছে। তখন পিয়ন এসে খবর দিল একজন প্রার্থি এসেছেন। ভেতরে পাঠাবে কিনা তা জানতে চায়। আদনান নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলা মানুষ সেখানে একজন লেট করা প্রার্থিকে সুযোগ দেয়ার প্রশ্নই আসেনা। কিন্তু তারপরও কি মনে করে আদনান অনুমতি দিল। কিছুক্ষন পর ঘরে ঢুকল দির্ঘদেহি গাড় রঙের এক যুবক। ঘর্মাক্ত এবং বিধ্বস্ত। গায়ের সাদা রঙের জামাটি ঘামে ভিজে লোমশ- সুঠাম বুকের সাথে লেপ্টে আছে। বুকের ভাজগুলো খুব স্পষ্ট। পুরুষালী কিন্তু মায়াবী চেহারা। উচ্চতায় প্রায় ৬ ফিট হবে। চওড়া কব্জিগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে শরীরের জোড়। আদনান ছেলেটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ছেলেটি যখন ভরাট কন্ঠে বসার অনুমতি চাইল তখন বাস্তবে ফিরে এলো আদনান। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। বুকের ভেতর জেন কেউ ঢাক বাজাচ্ছে। প্রচণ্ড অস্থির বোধ করল আদনান। পানির তেষ্টা পেয়ে গেল। ততখনে ছেলেটি বলতে লাগল আসার পথে সে একটি সড়ক দুর্ঘটনার স্বীকার হয়েছে। তাই এতোটা দেড়ি হল। কথাগুলো আদনানের কান পর্যন্ত গেল বটে তবে প্রচণ্ড তেষ্টায় সে মনোযোগ দিতে পারলনা। পিয়নকে ডেকে খুব ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি ঢক ঢক করে গিলে ফেলল আদনান। কিন্তু কিছুই হলনা। আরও এক গ্লাস পানির পরে আদনান খুব ধীরে ধীরে যুবকটির দিকে তাকাল। যুবকটি দৃষ্টিতে একটা হতাশা কাজ করছে। সাথে সাথেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে। সিলেক্ট করে ফেলল ছেলেটিকে। ছেলেটির সিভিটা দেখল একবার। ছেলেটির নাম আমান আহমেদ। বিজনেস গ্র্যাজুয়েট। সিভিটা দেখতে দেখতেই মাত্র পাঁচ ফিট দূরে বসে থাকা ছেলেটির গাঁ থেকে হালকা পারফিউম আর ঘামের একটা অন্যরকম গন্ধ আদনানের নাগে এসে লাগল। এবার আদনানের মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। সে আশেপাশে অন্ধকার দেখতে লাগল। এরপর তার আর কিছুই মনে নাই। কিছুইনা।

পরের দিন সকাল সাতটায় আদনানের ঘুম ভাঙল। সে তখন তার শোবার ঘরে। আয়শা তার পাশে একটি চেয়ারে ঘুমিয়ে আছে। শুয়ে থেকেই অনেকক্ষণ ভাবার চেষ্টা করল সে। কিন্তু কিছুই মনে করতে পারলনা। কিছুক্ষন পরেই আয়শা জিগ্যেস করল, কেমন লাগছে এখন? চমকে গেল আদনান। সে জানতে চাইল কি হয়েছিল তার। আয়শা জানাল, গতকাল বিকেলে হঠাৎ করেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। তাকে হাস্পাতালেও নেয়া হয়েছিল। ডাক্তার বলেছে হঠাৎ মানুসিক চাপ থেকে এমন হয়েছে কিন্তু চিন্তিত হবার মত কিছু নয়। তখনই তাকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দেয়া হয়েছিল। লম্বা ঘুমের জন্য। আয়শা আবার জানতে চাইল, এখন কেমন লাগছে তোমার? সুস্থবোধ করছ তো? আদনান চিন্তিতভাবে বলল, আমি ঠিক আছি। ফ্রেশ লাগছে। কিন্তু মনের ভেতর খচ খচ করতে লাগল। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই সেই ছেলেটির সিভি আর ছেলেটাকেই সে বার বার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। আদনান কিছুতেই বুঝতে পারছেনা কেন এমন হচ্ছে। আয়শা আবার বলল, আমাকে ঠিক করে বলতো কি হয়েছে তোমার? তুমি কেমন জানি অন্যমনস্ক হয়ে আছ। কোন সমস্যা হলে আমাকে বল। ব্যবসা নিয়ে কোন ঝামেলা? তুমি কি নিয়ে চিন্তিত? আদনান এবার জোড় করে একটু হাসার চেষ্টা করল। সে বুঝতে পারল সে আয়শাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। আর বেশিক্ষন এভাবে থাকলে আয়শা বাবা-মা-ভাইয়া সবাইকে ফোন দিতে শুরু করবে। বিছানা ছাড়ল আদনান। আয়শাকে বলল, টেবিলে খাবার দিতে বল। আমি একটু পরে অফিস যাব। আয়শা এবার বিরক্ত হয়ে বলল, তোমাকে আজকে অফিসে যেতে হবেনা। তুমি রেস্ট নাও। এক সপ্তাহ কোন কিছু নিয়েই ভাবতে হবেনা তোমাকে। আমি ম্যানেজারকে বলে দিচ্ছি। উনি সব দেখবেন। আদনান চোখ বড় বড় করে বলল, খেপেছ নাকি!! এক সপ্তাহ অফিস থেকে দূরে থাকলে আমি দম আটকেই মারা পড়ব। সামান্য একটু মাথা ঘুরানোকে এতো গুরুত্ব দিলে হবেনা। আয়শা বিরক্ত হয়ে বলল, ঠিক আছে। কিন্তু আজকের দিনটা অন্তত রেস্টে থাক। মেনে নিল আদনান। সেদিন সারাদিন আদনান স্ত্রী সন্তানের সাথেই থাকল। ঐদিন ওর ছেলে নিশানও স্কুলে যায়নি। সারাদিন হেসে খেলে দিন পার করল তো ঠিকই কিন্তু আমান আহমেদ ওর মাথাতেই থেকে গেল। বার বার চোখের সামনে আমানের ঘামে ভেজা শার্ট লেপটে থাকা লোমশ- সুঠাম বুক ভেসে উঠছিল। মনে মনে লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে আদনান। মনে মনে খুবই বিরক্ত হচ্ছে সে। কারন বার বার আমানকে দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে ওর। আদনান কিছুতেই ভেবে পায়না এমন কেন হচ্ছে।!

পরেরদিন সকালে যথারীতি অফিস। অফিসে পৌঁছানো মাত্র আগেই খোঁজ করল সিলেক্টেড ছেলে মেয়েগুলার সিভি। সেখানে আমানের সিভি খুঁজে না পেয়ে অস্থির হয়ে গেল আদনান। ম্যানেজারকে ডেকে একটু কড়া স্বরেই জানতে চাইল আরেকটি সিভি কোথায়? ম্যানেজার আমতা আমতা করে বলল, আপনি যাদের সিলেক্ট করেছেন তাদের সবার সিভি এখানেই আছে। আদনান ধমক দিয়ে বলল, এখানে আমানের সিভি নেই। ম্যানেজার বলল, আমান নামের কাউকে তো আপনি সিলেক্ট করেননি স্যার। আদনান কড়া গলায় বলল, শেষে যেই ছেলেটা এসেছিল আমি ওর কথা বলছি। এবার ম্যানেজার বলল, মনে পড়েছে স্যার। আমি নিয়ে আসছি এখনই। সিভিটা হাতে নিয়েই আদনান বলল, এই ছেলেটাকে এখনই ফোন দিবেন এবং বলবেন ও যেন আজকে থেকেই জয়েন করে। এখনই ফোন দেবেন। ম্যানেজার আব্দুর রহমান আজ প্রায় ৬ বছর ধরে কাজ করছে এই অফিসে কিন্তু আদনানের এমন তিরক্ষি রূপ কখনোই দেখেনি সে। যাই হোক সিভিটা নিয়ে ফোন দিল ম্যানেজার। জয়েন করতে বলল আজই। ঘণ্টা তিনেক পর আমান অফিসে হাজির হল। পিয়ন খবরটা জানাল আদনানকে। সাথে সাথে আদনানের বুকের ভেতর ঢাক বাজতে শুরু করল। তেষ্টা বাড়ছে। বুকের ভেতর মনে হয় হাজারটা প্রজাপতি একসাথে উড়ছে। আজ আমানকে ঐ দিনের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। আমানের চোখের দিকে তাকাতে পারছিলনা সে। আমান নিজেই জানতে চাইল, স্যার আজ ভাল আছেন। আদনান কেমন বিব্রত হয়ে বলল, হ্যাঁ ভাল আছি। আপনি? আমান বলল, ঐদিন আমি বেশ ঘাবড়ে গেছিলাম। আমি ভাবিনি চাকরিটা আমার হবে। ধীরে ধীরে আদনান সহজ হয়ে এলো। এবার সে আমানের চোখের দিকে তাকিয়েই কথা বলতে লাগল।

৩)

ঐদিকে ইন্টারভিউয়ের দিন ঐ ঘটনার পরে আমান নিজের ওপরেই বিরক্ত হল। একই দিনে দু দুটি দুর্ঘটনা। আসলে আমার কপালটাই খারপ ভাবতে লাগল আমান। এতো কষ্ট করে গিয়ে ইন্টারভিউটাও দেয়া হলনা। উল্টো জিনি চাকরি দিবেন তিনি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমান গত একবছর ধরে চাকরি খুঁজছে। কিন্তু কোন একটা কারনে কোন জব হচ্ছিলনা। বাবা মায়ের ঘাড়ে আর কতদিন পরে থাকা যায়। এখন তো ওর পালা। তার উপর আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীরা তো লেগেই আছে। মানুসিকভাবে খুব ভেঙে পরেছিল আমান। তাছাড়া কেয়ার পরিবার থেকেও বিয়ের জন্যও খুব তোড়জোড় করছে। নিস্ফল আক্রোশে যখন আমানের চোখে প্রায় পানি এসে যাচ্ছিল ঠিক তখনই ফোনের রিঙটি বেজে উঠল। ফোনের ওপার থেকে জানানো হল, আপনাকে আজকে থেকেই জয়েন করতে হবে। আপনি কি কাজটি করতে আগ্রহী।

সকাল থেকে জমে থাকা দমবন্ধ হওয়া অবস্থাটা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। খুব দ্রুত গোসলখানায় চলে গেল। কিছুক্ষন সময় নিয়ে শেভ করল আমান। চেহারায় একটা সবুজাভ আভা। চোখে খুশির দ্যুতি। কিছুক্ষনের জন্য নিজেকে অজয় দেবগন মনে হল। গোসলখানা থেকে বেরিয়ে কাল প্যান্টের সাথে সাদা ধবধবে শার্ট পড়ল। সাথে নীল রঙের টাই। টাইটা গত জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল কেয়া। এই প্রথম পড়ল। আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে গেল। মুচকি একটা হাসি দিয়ে ফোনটা নিল। কেয়াকে খবরটা জানাতে হবে। কল করতেই হ্যালো টিউনে বেজে উঠল “যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়……।।“ একবার ফোনটা বাজার পরও কেউ ধরলনা। দ্বিতীয়বার অপাশ থেকে ভেসে এলো একটা কিশোর কণ্ঠ। হ্যালো!! আমান ভাইয়া, কেমন আছ? আমান বলল, ভাল আছি অয়ন। আপু কোথায়? অয়ন বলল, আপু গোসলখানায়।
আমানঃ অয়ন, একটা খুশির খবর আছে। আমার একটা চাকরি হয়েছে।
অয়নঃ তাই নাকি!!! ট্রিট দিবা কবে বল।( উচ্ছ্বাস নিয়ে)
আমানঃ দিব। ট্রিট তো তোমাকে দিতেই হবে। (হেসে)
আচ্ছা অয়ন এখন অফিস যাচ্ছি। খবরটা তোমার আপুকে আমিই দেব। তুমি কিছু বলনা।
অয়নঃ ওকে, ভাইয়া। বলবনা। তবে ট্রিট কিন্তু আমাকে স্পেশালি দিতে হবে। শুধু আমি আর আপনি।
আমানঃ ওকে ওকে। বাই। (উচ্চস্বরে হাসির সাথে)
অয়ন ক্লাস টেনে পড়ে। দেখতে খুব কিউট । খুব ভাললাগে ছেলেটাকে আমানের। আমানের গার্লফ্রেন্ড কেয়ার একমাত্র ছোট ভাই। অয়ন মাঝে মাঝে অকারনেই ফোন দেয় আমানকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে। খারাপ লাগেনা আমানের। হবু শ্যালকের সাথে বেশ খাতির তার। তবে মাঝে মাঝে কেয়া ফোন না দিলেও খারাপ লাগেনা আমানের কিন্তু অয়ন ফোন না দিলে কেমন জানি একটা অস্থিরতা কাজ করে। জেন প্রেমটা কেয়ার সাথেনা, প্রেমটা হচ্ছে অয়নের সাথে। এসব উল্টা পাল্টা ভাবতে ভাবতেই মৃদু হেসে ফেলে আমান। মনে মনে বলে, কি আবোল তাবোল ভাবছি আমি। অফিসে আসার পর তাকে প্রথমেই যেতে বলা হয় আদনানের রুমে। আদনান তাকে বেশ সমীহ করল। আদনানের ব্যাবহারে মুগ্ধ আমান। জীবনের প্রথম চাকরিতেই এতোটা খাতির পাবে ভাবেনি আমান। সবকিছুই কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে। কিছুক্ষন পরেই কেয়ার ফোন। কেয়া বলল, কি কর?
আমানঃ বলতো, কি করি!
কেয়াঃ আমি কিভাবে বলব?
আমানঃ অনুমান কর। তোমার অনুমানশক্তি তো অসাধারন।
কেয়াঃ হুম, তুমি অফিসে। একটা ডেস্কে বসে আছ। তোমার সামনে কয়েকটা সাদা গ্লাডিওলাস।
আমানঃ তুমি কোথায়? (বিস্ময়ে হতবাক হয়ে)
কেয়াঃ বাসায়। এখন বাইরে যাব।
আমানঃ ঠিকাছে পরে কথা হবে।
কেয়াঃ বাই, সি ইউ।

লাইনটা কেটে দিল কেয়া। কিন্তু আমানের বিস্ময়টা এখনো কাটছেনা। আমান তিন বছর ধরে কেয়াকে চেনে। আমান জানে কেয়ার অনুমান শক্তি খুব ভাল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা আরও নিখুঁত হচ্ছে। কেয়া আগে না দেখেই ফোনের অপাশ থেকে আমানের পোশাকের রঙ বলে দিত। কদাচিৎ ভুল হত। এটা একটা খেলা ছিল ওদের কাছে। কিন্তু কেয়া আজকে খুব নিখুঁতভাবে বলে দিল। কিন্তু বলার সময় ওর কণ্ঠটা অন্যরকম লাগছিল। সত্যি সত্যি মনে হচ্ছিল কেয়া ওকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। আচ্ছা, অয়ন কি কিছু বলেছে! ভাবল আমান। নিশ্চয়ই বলেছে। তানা হলে এতোটা নিখুঁত হতে পারেনা। বাকিটা কেয়ার অনুমান ছিল। আজকাল গ্লাডিওলাস সবখানেই চলে। এটা ভেবে নিজেকে বুঝ দিল আমান।

ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় ফোনটা বেজে উঠল। অয়ন কল করেছে। ফোনটা রিসিভ করতেই অয়ন বলল, আমি রবীন্দ্র সরবোরে অপেক্ষা করছি। তুমি আস। আমানের অফিস থেকে খুব বেশি দূরে নয় রবীন্দ্র সরোবর। আধা ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেল সে। ফোন না দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করছিল আমান। হঠাৎ পেছন থেকে অয়ন জড়িয়ে ধরল আমানকে। অয়ন এই প্রথম ওকে জড়িয়ে ধরল। আমানের সমস্ত শরীরে জেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল। শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু টগবগ করে উঠল। নিজের এই অজানা অনুভূতি ওর মুখোমুখি হতে প্রচণ্ড লজ্জায় আমানের চোখ মুখ রক্তাভ হয়ে গেল। কয়েক মুহুর্ত আমান অয়নের চোখের দিকে তাকাতে পারছিলনা। আধোআলো আধো ছায়ায় অয়ন এসব খেয়াল করেনি। আমান কিছুতেই আলোকিত কোন স্থানে যেতে চাইছিলনা। নিজেকে নিজের কাছ থেকে লুকানোর জন্য। সেই প্রথম ঐ অল্প আলোতে অয়নের মুখটা ওর কাছে খুব মায়াবি লাগছিল। আমান হঠাৎ বলল, চল উঠতে হবে। অয়ন অবাক হয়ে বলল, এইমাত্রই তো আসলাম! এখনই যাব! তোমার তো আমাকে ট্রিট দেয়ার কথা। আমানের খুব বিরক্ত লাগছিল, ভীষণ বিরক্ত। সে বেশ বিরক্ত হয়েই বলল, সময় নেই। কেয়াকে সাথে নিয়ে ট্রিট দিব। অয়ন ঠিক কিছুই বুঝলনা। অপমানে চোখ ফেটে পানি আসতে চাচ্ছে। কিন্তু যাতে কেউ দেখে না ফেলে তাই সে কোন কথা না বাড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকলো। পেছন পেছন আমান আসছিল। অয়ন টুপ করে একটা বাসে উঠে পড়ল। আমান দাড়িয়ে গেল। তাকিয়ে রইল চলে যাওয়া বাসে দিকে, যতক্ষণ চোখের আড়াল নাহয়। বার বার অয়নের মায়াবি মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

৪)

বাসায় এসে অয়ন মুখ গম্ভীর করে বসে আছে। বাসে উঠার পর পরই ও কেদে ফেলে আর ধরে রাখতে পারেনি নিজেকে। নিঃশব্দ কান্না। শুধু চোখ থেকে পানি ঝরছিল, কোন আওয়াজ ছিলনা। কয়েকজন ওকে অবাক হয়ে দেখছিল। দুইবছর আগে কোন এক বিকালে কেয়ার ফোন অনেক্ষন ধরে বেজেই যাচ্ছিল। কেয়া আশেপাশে ছিলনা। অনেকটা বাধ্য হয়েই ফোনটা ধরেছিল অয়ন। অপাশের ভরাট পুরুষালী কণ্ঠস্বরটি অয়নের দুনিয়া কাপিয়ে দিল। কি হয়েছিল অয়ন জানেনা। শুধু জানে সেদিন অয়ন অনেক কেঁদেছিল। প্রচণ্ড কষ্ট অয়নকে নীল করে ফেলছিল। মানুষটাকে একটিবার দেখার জন্য অয়ন তির্থের কাকের মত অপেক্ষা করছিল। অবশেষে কোন এক বিকালে দেখা পেয়েছিল সেই কাঙ্খিত মানুষটাকে। কেয়াই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল আমানকে অয়নের সাথে। সেদিন থেকে একটি দিনও বাদ যায়নি আমানের সাথে কথা বলা, ওর ছবির খাতা ভরা ছিল আমানের অবয়ব। প্রতি রাতেই রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে না পাওয়ার যন্ত্রণা অয়নকে ছেঁকে ধরে। যন্ত্রণায় নীল হয়ে যায় সে। না বলা যন্ত্রণা যেন ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হয়। অয়ন জানে এটা সম্ভব নয়। তবুও মানুষটার হাসি, আওয়াজ, গায়ের গন্ধ অয়নকে ভেতরে ভেতরে পাগল করে দেয়।

আজ বেশ অনেকদিন আদনান কি যেন ভাবে। ওর চোখে মুখে কিছু একটা হতাশা। আয়শা বার বার জানতে চায়। কিন্তু আদনানের কিছু বলার থাকেনা। ছুটির দিনগুলোতে আদনান অস্থির হয়ে যায়। কারন সেদিন সে অফিস যেতে পারছেনা। কাউকে কিছুই বুঝতে দেয়না আদনান। শুধু আমান সামনে আসলে মুখ থেকে সকল কথা হারিয়ে যায়। কিছু বলতে পারেনা আদনান। ব্যাপারটা খেয়াল করেছে আমান কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারেনা। আজকাল আমান অন্যমনস্ক থাকে। অয়নের সাথে রাতের পর রাত কথা তার হচ্ছে, অজানা একটি আকর্ষণ তীব্র থেকে তিব্রতর হচ্ছে। কিভাবে সে এর সুরাহা করবে সেই রাস্তা খুজছে আমান। ভেবে কিছুই কুল কিনারা করতে পারেনা। শুধু নিজেকে ধিক্কার দেয়। সে কখনোই অয়ন কে বলতে পারবেনা, অয়নের ঠোঁটে আমানের খুব চুমু খেতে ইচ্ছা হয়। খুব। কেয়া হঠাৎ আবিস্কার করে অয়নের ছবির খাতায় শুধু একজন মানুষের ছবি, আরও আবিস্কার করে প্রতি রাতে আমানের সাথে কথা বলার পর অয়ন গুমরে গুমরে কাঁদে। সেই গভীর রাতেও কেয়া কড়া এক মগ কফি বানায়। জানালায় দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজেকে কেমন জানি নির্ভার লাগে। স্কুল লাইফের সেই দোলার কথা মনে পরে কেয়ার। ছিপছিপে গড়নের লম্বা মেয়েটি। কি মায়াবি ছিল দোলা! বহুরাত ঘুমাতে পারেনি কেয়া। বহুরাত। প্রচণ্ড দ্বিধায় কাউকে বলতে পারেনি সেই অজানা অচেনা অনুভূতির কথা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.