দ্যা মাইন্ড গেইম

লেখকঃ শতদ্রু আনন্দ

১.

মারিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললো- “বর্ষণ সাহেব আপনি ঠিক আছেন?” বর্ষণ চমকে উঠে বিব্রত ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করলো, বিব্রত ভঙ্গিটা কাটাতে খুকখুক করে কাঁসলো একটু।”আমি ঠিক আছি মারিয়া।”

মারিয়া আবারো ফিসফিস করে বললো “বর্ষণ সাহেব আজকের মিটিংটা আমাদের জন্য অনেক জরুরী। আপনার প্রেজেন্টেশনের উপরেই নির্ভর করছে আমাদের কম্পানি প্রজেক্টটা পাবে কিনা। আরো সহজ ভাবে বলতে গেলে এই প্রজেক্ট পাওয়ার উপরেই আমাদের প্রমোশনটা নির্ভর করছে। এর সবই আপনি জানেন। সিইও স্যার সবার মধ্য থেকে আপনাকে আর আমাকে নির্বাচিত করেছে মিটিংটা এ্যাটেন্ড করার জন্য। কিন্তু আপনাকে দেখে আমি এখন খুব একটা ভরসা পাচ্ছি না। আপনি তখন থেকেই অন্যমনস্ক। যেন কোন গভীর ভাবনায় ডুবে আছেন। শুনুন আপাতত অন্যসব ব্যাক্তিগত চিন্তা বাদ দিয়ে প্রেজেন্টেশন নিয়ে একটু ভাবুন প্লিজ। মিটিং শুরু হবে চার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই। ডক্টর হ্যারল্ড যে কোন মুহুর্তে মিটিং শুরু করবেন। মাথায় রাখবেন প্রজেক্টটা আমাদের পেতেই হবে।” বর্ষণ অনিশ্চিত ভঙ্গিতে হ্যা সূচক মাথা নাড়ালো।
তা দেখে মারিয়ার গা জ্বলে গেল। “সিইও স্যার কি মনে করে যে এই লোককে সিলেক্ট করলো কে জানে।” মারিয়া নিজ মনে গজগজ করতে লাগলো।

বর্ষণ কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না। অদ্ভুত এক অস্বস্তি। যেন বিশাল এক পাথর চাপিয়ে দিয়েছে কেউ তার বুকে। তার নিঃশ্বাস নিতেও কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। কোন এক অন্ধকার কূপ থেকে অচেনা কিছু শঙ্কা উঠে আসছে বারবার। সে যতই তাড়াতে চাইছে ততোই জেঁকে বসছে। আজকের মিটিংটা তারজন্যেও কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ না। প্রমোশনটা তার আরো বেশি দরকার। প্রমোশন হলে দুটা বিমান টিকিট নিয়ে গিয়ে তূর্ণকে চমকে দেয়া যাবে। তূর্ণ খুশি হবে। সব রাগ পরে যাবে। অনেকদিন ধরেই সিকিম যাওয়ার জন্য বাহানা ধরেছে সে। বর্ষণ সময় করে উঠতে পারছিলো না। তাছাড়া টাকা পয়সারো একটা ব্যাপার আছে। কোম্পানি প্রজেক্টটা পেয়ে গেলে সিইও নিশ্চই পনেরো দিনের ছুটির এ্যাপ্লিকেশনটায় সিগনেচার করতে গরিমশি করবে না। প্রেজেন্টেশনের স্লাইড গুলোতে আরো একবার চোখ বুলিয়ে নেয়া দরকার। প্রস্তুতিটা আরেকটু জোড়ালো থাকুক। যেনো এক প্রেজেন্টেশনেই বুড়ো হ্যারল্ড কাঁত হয়ে যায়। বাপ বাপ করে যেন এই বছরের প্রজেক্টটা তাদের কোম্পানিকে দিয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বর্ষণ কাজে মন দিতে পারছে না।

সমস্যাটার শুরু সকালবেলা। ছোট একটা বিষয় নিয়ে শুরু হলো সমস্যাটা। অফিসে আসার পথে বর্ষণ প্রতিদিন তূর্ণর সাথে দেখা করে আসে। আজও নিয়ম করে বর্ষণ বাড়ি থেকে বের হয়ে তূর্ণকে ফোন দিলো। তূর্ণর ফোন এ্যাংগেইজড। দশ মিনিট পর আবারো ফোন দিল বর্ষণ। এখনো এ্যাংগেইজড। এদিকে বর্ষণের অফিসে লেট হচ্ছে। তার রাগ লাগতে লাগলো। অফিসটাইম পার হয়ে যাচ্ছে, এত জরুরী একটা মিটিং আজকে, আর আজকেই কিনা তাকে অফিসে যেতে হবে লেট করে! বর্ষণ আরেকবার তূর্ণর ফোনে ধরার চেষ্টা করল। এখনো কথা বলছে সে, এখনো কল ওয়েটিং। কার সাথে কথা বলে এত? আচ্ছা রিয়াদ না তো? ধুর, তা কি করে হয়! তূর্ণ জানে বর্ষণ রিয়াদকে একেবারে সহ্য করতে পারেনা। রিয়াদ যদিও সম্পর্কে বর্ষণের বন্ধু, সেটা কেবল নামেই। ভিতরে ভিতরে তাদের দা কুমড়া সম্পর্ক, তাদের মধ্যে সবসময়ই একটা গোপন প্রতিযোগিতা চলে। যেন এক বিরামহীন স্নায়ুযুদ্ধ। যদিও বাইরে দিয়ে কেউ সেটা প্রকাশ করে না। বর্ষণ জানে তূর্ণর প্রতি রিয়াদের দুর্বলতা আছে। তার দুর্বলতা যতটা না তূর্ণের সৌন্দর্যে তারচেয়ে বেশি বর্ষণ তূর্ণকে ভালোবাসে ব’লে। তূর্ণকে অধিকার করা মানেই বর্ষণের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করা। বর্ষণকে সবচেয়ে ভয়ংকর ভাবে পরাজিত করা। আর এজন্যই তূর্ণর আশেপাশে রিয়াদকে দেখলে বর্ষণের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তূর্ণকে বর্ষণ অনেকবার বুঝিয়ে বলেছে সব। তূর্ণ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বারবার তার কথা উড়িয়ে দিয়ে বলেছে- “আমি কি কোন গোল্ড ম্যাডেল নাকি যে কেউ একজন এলো আর আমাকে জিতে নিয়ে চলে গেল!”

রিয়াদের ব্যাপারটা বর্ষণ কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারছে না। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সে রিয়াদের নাম্বার ডায়াল করলো। এ্যাংগেইজড! মানে কি? বর্ষণ সাথে সাথেই তূর্ণের নাম্বার ডায়াল করলো। ওয়েটিং! বর্ষণের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। এসব কি হচ্ছে? “তূর্ণ রিয়াদের সাথে কথা বলছে! তূর্ণের কাছে আমার সাথে দেখা করার চেয়ে রিয়াদের সাথে কথা বলাটা জরুরী?” বর্ষণ গাড়িতে চড়ে বসলো। তার মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আজকের দিনটা তূর্ণ এরকম না করলেও পারতো। সে জানে আজকের মিটিংটা কত জরুরী।

বর্ষণ অফিসে ঢুকতেই খবর পেলো সিইও চারবার তার খোঁজ নিয়েছে। খবরটা দিল রিসিপশনিস্ট মেয়েটা। নাঁকি কন্ঠে টেনে টেনে বললো- “বর্ষণ ভাইয়া, স্যার না রেগে আগুন হয়ে আছে। আপনি জলদি স্যারের সাথে দেখা করুন নাহলে স্যারের রুমে সত্যি সত্যি আগুন লেগে যাবে।” বলেই মুখ টিপে হাসতে লাগলো। মেয়েটাকে একটা কঠিন ধমক দেয়ার ইচ্ছা অনেক কষ্টে দমন করে বর্ষণ সিইও’র কেবিনে গেল। দশ মিনিট পর সে যখন বের হলো তখন তার যাচ্ছেতাই অবস্থা। সিইও তাকে ইচ্ছা মত ঝেড়েছে। ঠিক এমন সময় তূর্ণের ফোন এলো।

তূর্ণ- সরি বাবু, আমি তোমার ফোন ধরতে পারিনি।
বর্ষণ- রঙ্গলীলা শেষ হয়েছে তাহলে?
তূর্ণ- মানে? এটা কি ধরণের ভাষা?
বর্ষণ- এরচেয়ে ভালো আর কি আশা করছো?
তূর্ণ- খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না বর্ষণ? আমার কি ফোন আসতে পারে না?
বর্ষণ- ও আচ্ছা এখন তো আমার সব কিছুই বাড়াবাড়ি মনে হবে। এখন তো তোমার নতুন পাখনা গঁজেছে। সেই পাখনায় নতুন রঙ লেগেছে।
তূর্ণ- মানে? বর্ষণ তুমি কি বুঝতে পারছো তুমি কিরকম নোংরা ভাষায় কথা বলছো? ভাষা সংযত করো।
বর্ষণ- তুমি নোংরা ভাষারই যোগ্য। যাও রিয়াদের সাথে কথা বলো সে তোমার সাথে মিষ্টি ভাষায় রসের রসের কথা বলবে।
তূর্ণ- এখানে রিয়াদ আসছে কোথা থেকে?
বর্ষণ- বাহ! আর একটু পর তো রিয়াদকে চিনতেই পারবে না তুমি। এতক্ষণ রিয়াদের সাথে ফস্টিনষ্টি করে এখন বলছো রিয়াদের কথা আসছে কেন?
তূর্ণ- তুমি কি বুঝতে পারছো তুমি কি বলছো? কি নোংরা ইঙ্গিত দিচ্ছো? আমেরিকা থেকে বড়পু ফোন করেছিল তার সাথেই কথা বলছিলাম। ভাগ্নে গুলো ফোন ধরলে ছাড়তেই চায় না। তাই এতক্ষণ ফোন রাখতে পারিনি। ওদের সাথে কথা শেষ হওয়া মাত্রই তোমাকে ফোন দিলাম।
বর্ষণ- ব্যাস অনেক হয়েছে। একটা অপরাধ ঢাকতে কতগুলো মিথ্যা বলতে হয় দেখেছো? আমি তোমাদের দুজনের ফোন একসাথে ওয়েটিং পেয়েছি। তোমাকে ওর কাছথেকে দুরে থাকতে বলেছিলাম। তুমি আরো বেশি ঘনিষ্ট হয়েছো। আমার সাথে দেখা না করে তার সাথে ফোনে রসালাপ করেছো।
তূর্ণ- বর্ষণ, তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছো?
বর্ষণ- এতদিন করিনি, কিন্তু আজকে হাতেনাতে ধরা পরার পরেও তুমি যেরকম ভাবে মিথ্যা বলে যাচ্ছো তাতে সন্দেহ না করে পারছি না।
তূর্ণ- তুমি যা বলছো ভেবে বলছো তো? তুমি কি নিশ্চিত যে আমি রিয়াদের সাথেই কথা বলছিলাম? প্রমাণ করতে পারবে?
বর্ষণ- আমাকে আর বোকা বানাতে হবে না। অপরাধ করে স্বিকার না করে উল্টা আমার কাছেই প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে?
তূর্ণ- আচ্ছা বেশ। তোমার সন্দেহকে এবার সত্যিতে রুপান্তরিত করব। প্রস্তুত থেকো।
বর্ষণ- আর কি করতে বাকি রেখেছো? শুতে? সেটা যে এখনো বাকি আছে তইবা কিভাবে বিশ্বাস করব।
তূর্ণ- প্লিজ আর একটা কথাও বলো না। তোমার কথা শুনতে ঘৃণা লাগছে।
বর্ষণ- ও আচ্ছা! আর আমার আড়ালে তুমি যেটা করছো সেটা বুঝি খুব পবিত্র কর্ম?
তূর্ণ- ব্যাস, অনেক সহ্য করলাম। এবার তোমার সন্দেহটাকে সত্যি করে দেখাবো।
বর্ষণ- তোমার যা ইচ্ছা করো। আমার কিছুই এসে যায় না আর।

তূর্ণ ফোন কেটে দিল। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই বর্ষণের রাগ পরে গেল। অনুশোচনা হতে লাগলো খুব “আচ্ছা এতটা খারাপ ব্যাবহার কেন করলাম আমি? এতটা না রাগলে কি চলতো না? হয়তো তূর্ণর কথাই ঠিক। হয়তো সত্যিই তার বড়পু ফোন করেছিল। এই মহিলার কথা বলার রোগ আছে। একদিন তার সাথে টানা ছাপান্ন মিনিট কথা বলতে হয়েছিল। নিউইর্য়কের কোন রেস্টুরেন্ট কি কি খাবার পাওয়া যায় এইটা ছিল তার আলোচনার বিষয় বস্তু। আচ্ছা তূর্ণকে কি ফোন করে সরি বলা উচিৎ? না থাক, এখন ফোন করা যাবে না। ও ভয়ংকর রেগে আছে। রাগটা কমুক। তারপর ওকে সারপ্রাইজ দেয়া যাবে। এই সিইও ব্যাটা উল্টাপাল্টা কথা বলে মেজাজটা আরো বিগড়ে দিয়েছিল। নাহলে হয়তো এতটা রাগতাম না আমি।”
এই ঘটনার পরেই তাকে মিটিংয়ে এ্যাটেন্ড করতে হয়েছে। মিটিংয়ে ঢুকেই বর্ষণ বুঝতে পারলো খুব বড় ভুল হয়ে গেছে। তূর্ণকে সরি বলা উচিৎ ছিল। মিটিং কখন শেষ হবে কে জানে। ও যদি উল্টাপাল্টা সত্যিই কিছু একটা করে বসে? নাহ, তূর্ণ সেটা করবে না। সে যতই বলুক সে এমন নোংরা কিছু করতে পারে না। তবু বর্ষণ কিছুতেই মাথা থেকে অজানা শঙ্কাটা তাড়াতে পারছে না। মনের কোথাও একটা অজানা ভয় কেমন কাঁটার মত খচখচ করতে লাগলো।

২.

মিটিং শেষ করে বের হতে হতে বিকেল। ক্লান্তিতে বর্ষণের শরীর ভেঙে আসছে। কিন্তু মন বেশ ঝড়ঝড়ে। তারা শেষ পর্যন্ত প্রজেক্টটা পেয়েছে। সিইও খুশি হয়ে তার কুড়ি দিনের ছুটি মঞ্জুর করেছে। সাথে বোনাস হিসেবে একটা খাম ধরিয়ে দিয়েছে। খামে একটা চেক। টাকার অংকটা নেহায়েত কম না। বর্ষণ প্রথমেই গেল ট্রাভেল এজেন্সি তে। সিকিমের দুটি টিকিট হাতে নিয়ে সে যখন বের হলো তখন প্রায় সন্ধ্যা। ফোন বের করে তূর্ণকে ফোন করলো। তূর্ণ ফোন ধরছে না। এটাই স্বাভাবিক। বর্ষণ মুচকি হাসলো। “পাগল একটা। এত রাগ, এত অভিমান কেন রে তোর পাগলা?”
বর্ষণ আর ফোন না করে সরাসরি তূর্ণর বাসায় গিয়ে হাজির হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। তূর্ণর রাগ ভাঙানোর জন্য তাকে কি কি করতে হবে ভাবতেই একটা ছেলেমানুষী হাসির রেখা পড়লো বর্ষণের মুখে।

তূর্ণর বাসার মেইন দরজা বন্ধ। তারমানে তূর্ণ বাসায় নেই! না থাক, আসবে তো একসময়, ততক্ষণ অপেক্ষা করা যাক। অথবা ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নেয়া যেতে পারে। তূর্ণর আসার শব্দ পেয়ে ঘুমের ভান করে পরে থেকে দেখা যেতে পারে পাগলটা তাকে ঘুমাতে দেখে কি করে। বর্ষণ তার কাছে থাকা তূর্ণর ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবিটা দিয়ে দরজা খুলে প্রচন্ড অবাক হলো। তূর্ণর বেডরুমের ভেতর থেকে উদ্দাম বাজনার শব্দ আসছে। তারমানে তূর্ণ বাসাতেই আছে! রুমের দরজা আটকিয়ে কি করছে সে? ওর রুমের দরজায় নক করতেই বাজনা থেমে গেল। তারপর আস্তে করে দরজা খুলে গেল। দরজা খুললো তূর্ণ নিজেই। খোলার সাথে সাথে হুইস্কির তীব্র ঝাঝালো গন্ধ এসে নাকে লাগলো। ঘর সিগারেটের ধোয়ায় অন্ধকার হয়ে আছে। ধোয়া কিছুটা সয়ে আসতেই বর্ষণ যা দেখলো তার জন্য সে মোটেও তৈরি ছিল না। রিয়াদ একটা তোয়ালে জড়িয়ে তূর্ণর বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। তাকিয়ে আছে বর্ষণের দিকে। সেই চোখ দৃষ্টি সাপের চোখের মত কুটিল, ঠোঁটে বক্র হাসি। বর্ষণ হতবাক হয়ে তূর্ণর দিকে তাকালো। তূর্ণর চেহারা ভাবলেশহীন। তার গা খালি। কোমড়ে একটা তোয়ালে জড়ানো। বর্ষণ বিস্ময়ে বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এত জঘন্য দৃশ্য কখনো সত্যি হতে পারে না। সে অবশ্যই কোন দুঃস্বপ্ন দেখছে। এটা অবশ্যই দুঃস্বপ্ন। জটিল কোন দুঃস্বপ্ন। বর্ষণ মনে প্রাণে চাচ্ছে দুঃস্বপ্নটা ভেঙে যাক। সে স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠার অপেক্ষা করতে লাগলো।

তূর্ণই প্রথম মুখ খুললো- “আমাদের কেমন লাগছে বর্ষণ, কেমন দেখছো আমাদের ‘রঙ্গলীলা’?”

তূর্ণর কথা বর্ষণ ঠিক বুঝতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে সে প্রচন্ড ঘোরের মধ্যে আছে। ছোট বেলায় জ্বর হলে তার এমন হতো। আচ্ছা তার কি জ্বর এসেছে? হ্যা জ্বরই এসেছে। জ্বরের ঘোরে সে এসব উল্টাপাল্টা দেখছে,এসব অবশ্যই সত্যি নয়। জ্বর এলে মা একটা কবিতা শোনাতো, কেমন যেন ঘুম পাড়ানি ধরণের একটা কবিতা। মা কেমন সুর করে করে বলতো। সেই কবিতাটা শুধু একটা লাইন মাথায় ঘুরে ফিরে আসছে- বুলবুলিতে ধান খেয়েছে হুহুহুহু…….! কবিতাটার লাইনটা ভাঙা রেকর্ডের মত মাথার ভেতরে বাজতে লাগলো।

তূর্ণ বিদ্রুপের হাসি ঠোঁটে ছড়িয়ে আবারো বললো- “বর্ষণ, তোমার সন্দেহ সত্যিতে রুপান্তরিত করলাম। তোমার খুশি লাগছে না?” বর্ষণ সম্বিৎ ফিরে পেল। সে ফিসফিস করে বললো- “তোমাদের ডিস্টার্ব করার জন্য দুঃখিত। তোমরা কন্টিনিউ করো। আমি বরং চা বানিয়ে আনছি।” বর্ষণ নিজ হাতে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। দরজা ধরে ধপ করে বসে পড়লো। নীরবতা ভেঙে সে ঝড়ঝড় করে কেঁদে ফেললো।

দরজার ওপাশে আবার উদ্দাম বাজনা চালু হয়েছে। বাজনার শব্দে বর্ষণের কান্না আচমকা থেমে গেল। পাথরের মত নিরেট হয়ে উঠলো তার মুখ। মাথা নিচু করে কি যেন ভাবলো কিছুক্ষণ তারপর চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টি যদিও কিছুটা দিশেহারা কিন্তু সে শান্ত ভাবেই ঘুরে দাঁড়ালো, দৃষ্টির দিশেহারা ভাব চেহারায় ছড়িয়ে পড়লো না। যেন সে জানে এখন তাকে কি করতে হবে।পরিকল্পনা করে ফেলেছে সে। প্রথমেই সে রান্নাঘরে গিয়ে কেটলীতে চায়ের পানি চাপালো। তারপর খুব শান্ত ভাবে হেটে বেড়িয়ে এসে বাইরে থেকে মেইন দরজা বন্ধ করে দিয়ে দ্রুত গাড়িতে চড়লো। মাত্র দুই ব্লক পরেই তার বাড়ি। বাড়িতে ঢুকে ওয়ারড্রপের ডয়ার খুলে চামরার ছোট প্যাকেট বের করে হাতে নিল। আরেকটা জিনিস দরকার। একটা ছোট্ট কৌটা। সেই অনার্স পড়ার সময় ক্যামিস্ট্রি ল্যাব থেকে ফাজলামি করে চুড়ি করে এনেছিল কৌটটা। কখনো ভাবেনি ওটা এভাবে কাজে লাগবে। যাক এতদিন পর সেটা কাজে লাগতে যাচ্ছে। কৌটাটা পাওয়া গেল স্টোররুমের পুরাতন একটা টেবিলের ড্রয়ারে, মুখটা আগের মতই বন্ধ। ছোট চামড়ার ব্যাগটা আর কৌটটা পকেটে ঢুকিয়ে সে আবার গাড়িতে চড়ে বসলো। মুহুর্তেই এসে হাজির হলো তূর্ণর বাড়িতে। তূর্ণর বেডরুম থেকে এখনো মিউজিকের শব্দ আসছে। এইতো ওরা হাসছে! তাদের উদ্দাম হাসির শব্দ রান্নাঘর থেকেও শোনা যাচ্ছে।

চায়ের পানি ফুটতে শুরু করেছে। বর্ষণ ধীরে সুস্থে তিনটা মগে চা ঢাললো। মগগুলো গতবার বর্ষণ বানিজ্যমেলা থেকে কিনে এনেছিল, মগ গুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে সবগুলো একই ডিজাইনের হলেও প্রত্যেকটার রঙ ভিন্ন। নীল মগটা তূর্ণর। তূর্ণ ওটা ছাড়া চা খায় না। আর গেড়ুয়া রঙেরটায় বর্ষণ খায়।

চায়ের ট্রে হাতে বর্ষণ তূর্ণর বেডরুমের দরজায় কড়া নাড়লো। যথারীতি তূর্ণ দরজা খুলে দিল। বর্ষণ খুব স্বাভাবিক ভাবে ঘরে ঢুকলো, যেন কিছুই হয়নি। চায়ের ট্রে টেবিলে রেখে নিজহাতে দরজার ছিটকিনি তুলে দিলো। চেয়ারে আয়েশ করে বসতে বসতে খুব সহজভাবে কথা বলা শুরু করল সে, যেন হালকা কোন বিষয় নিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। “তূর্ণ চা এনেছি, খাও। রিয়াদ তুমিও খাও। তবে একটা ছোট্ট সমস্যা আছে। এই তিনটা মগের যে কোন একটাতে তীব্র বিষ মেশানো আছে। বিষটার নাম তোমরা হয়তো শুনেছো। ওটার নাম পটাশিয়াম সায়ানাইড। রাসায়নিক সংকেত KCN রিয়াদ এবং তূর্ণ দুজনেই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। রিয়াদ হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করতে করতে বললো-“বর্ষণ তুমি নিশ্চই ইয়ার্কি মারছো, রাইট?”

বর্ষণ একগাল হেসে বললো- “আমি অবশ্যই কোন ইয়ার্কি করছি না মাই ডিয়ার। বিশ্বাস না হলে প্রত্যেক কাপে একটা করে চুমুক দিয়ে দেখতে পারো।”
রিয়াদ তোতলাতে তোতলাতে বললো- “এসবের মানে কি? ফাজলামি করো? তোমার কি ধারণা তুমি বললেই আমি বিষ চা খাবো?”
বর্ষণ লম্বা একটা হাসি দিল। “আমি বললেই যে তুমি চা খাবে না এটা আমি জানি। সুতরাং তোমাকে চা খাওয়ানোর জন্য অন্য ব্যাবস্থা আছে।”
বর্ষণ কোটের পকেটে হাত দিয়ে চামড়ার ছোট প্যাকেটটা বের করে আনলো। তূর্ণর গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। তূর্ণ জানে ওটাতে কি আছে। খেলনার পিস্তলের মত একটা ছোট্ট পিস্তল। জিনিসটা দেখতে খেলনার মত হলেও আসলে ভয়ংকর। দুই বছর আগে বর্ষণের বাবার উপর কিছু আততায়ী হামলা করেছিল। তার পরপরই তিনি লাইসেন্স করে পিস্তলটা কিনেন।

বর্ষণ প্যাকেট খুলে খুব স্বাভাবিক ভাবে পিস্তলটা বের করে তার রিয়াদের দিকে তাক করলো- “এটার নামScott B21. জিনিস ছোটখাটো কিন্তু লক্ষ্য নির্ভুল। পাঁচ মিলিমিটার পুরু ইস্পাত অনায়াসেই ফুঁটো করে বের হয়ে যেতে পারে এটার বুলেট। তুমি আজ যেটা করেছো সেটার শাস্তি হিসেবে তোমার মস্তক গুড়িয়ে দিতে আমাকে খুব বেশি ভাবতে হবে না। সুতরাং কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বসে থাকো। একটু নড়াচড়া করার চেষ্টা করলেই এটার বুলেট তোমার মস্তক ভেদ করতে বিন্দু মাত্র দ্বিধা করবে না।”

রিয়াদ একদম চুপসে গেল। বর্ষণ পিস্তলটার সেফটি লক খুলে কোলের উপর রাখলো। এবার সে তূর্ণর দিকে তাকালো। তূর্ণর চোখে ভয়ের ছায়া পড়েছে। শরীরটা কেমন কুকড়ে আছে। অথচ এই শরীরটাই একটু আগে উন্মাদের মত উদ্দাম নৃত্য করেছে আরেকটা শরীরের উপর উঠে! বর্ষণের রাগ হওয়ার বদলে কেমন যেন হাসি পেয়ে গেল। সে হাসি মুখেই বললো- “তূর্ণ, রাগের কিছু কথার উপর ভিত্তি করে তুমি যে নোংরামী আজকে করেছো সেটার শাস্তি তোমাকে অবশ্যই পেতে হবে। এখানে তিনটা মগ আছে। যার একটাতে মেশানো আছে ভয়ংকর পটাসিয়াম সায়ানাইড। আমাদের মধ্য থেকে যে কোন একজনকে মরতে হবে। আমরা তিনজন তিনটা মগে চুমুক দিব। যদি রিয়াদের মগে বিষ থাকে তাহলে সে মরবে। আর তোমাকে মুক্তি দিব। তার মৃত্যুর বিনিময়ে তুমি পাবে মুক্তি। আর আমি যদি মারা যাই তাহলে তুমি আর রিয়াদ সিকিম যাবে একসাথে। আর যদি তুমি মরো তাহলে তোমার মৃত দেহ সামনে রেখে আমি রিয়াদের সাথে সেক্স করব। তাকে রেপ করব।

তূর্ণ কি যেন বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। সে বুঝতে পারছে এখন বর্ষণকে আর কিছু বলে লাভ নেই। এই বর্ষণ অপরিচিত। সে এই বর্ষণকে চিনে না। এই বর্ষণ এক ভয়ংকর উন্মাদ। যাকে সে কখনো দেখেনি। ভয়ে তার গলা বারবার শুকিয়ে আসছে।

বর্ষণের কন্ঠ আগের চেয়েও শীতল। সে গভীর চোখে রিয়াদের দিকে তাকলো। “রিয়াদ, সময় নষ্ট করো না, তুমি তোমার মগ তুলে নাও। আমার কথার অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা ভুলেও করো না। গুলি খেয়ে মরার চেয়ে চা খেয়ে মরার ব্যাপারটা অনেক বেশি উপভোগ্য হওয়ার কথা। তাছাড়া এখানে আরো একটা ব্যাপার আছে। বুলেট মিস হওয়ার সম্ভাবনা শুন্য পার্সেন্ট, তবে তোমার মগের বিষ না থাকার সম্ভাবনা কিন্তু ফিফটি ফিফটি। এখন বলো তুমি কোন চান্সটা নিতে চাও।”
রিয়াদ বুঝতে পারছে চা তাকে খেতেই হবে। এর বাইরে তার আর কোন পথ নেই। সে কাঁপতে কাঁপতে হলুদ রঙের একটা মগ তুলে নিয়ে বিরবির করে কি যেন বললো, সম্ভবত সুরা বা দোয়া পড়লো। তারপর মগটায় চুমুক দিল। বর্ষণের ঠোটের কোণে রহস্যময় হাসি। রিয়াদ চা খেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। উত্তেজনায় তার হৃদপৃন্ড ভয়ংকর ভাবে লাফাচ্ছে। এভাবেই কাটলো কিছুক্ষণ। একসময় সে খেয়াল করলো তার কোন শারীরিক সমস্যা হচ্ছে না। বুঝতে পেরে উল্লাসে চিৎকার করে উঠলো সে। সে মারা যাচ্ছে না। তার মগে বিষ ছিল না।

এবার বর্ষণ তূর্ণর মুখোমুখি বসলো। ঘোরলাগা রহস্যময় কন্ঠে বললো “চা ঠান্ডা হচ্ছে তূর্ণ। তুমিতো আবার ঠান্ডা চা খেতে পারো না। মগ তুলে নাও তূর্ণ।” একই সরলরেখায় এখন তাদের চোখ। দুজন দুজনের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে। কারো চোখের পলক পড়ছে না। যেন একে অপরের চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছে। যেন গভীর কোন খেলা চলছে দুইজোড়া চোখের মধ্যে। হঠাৎ তূর্ণর চোখে রহস্যময় হাসি খেলে গেল। সে খুব ধীরে ধীরে গেড়ুয়া রঙের মগটা টেনে নিল। বর্ষণ তূর্ণর বাসায় এলে এই মগটাতেই চা খায়। তূর্ণ গেড়ুয়া মগটা তার ঠোটের কাছে টেনে নিয়েছে। চুমুক দেয়ার এক মুহুর্ত আগে সে ফিসফিস করে বললো, “বর্ষণ ভালোবাসি। ক্ষমা করো।” বলেই সে এক চুমুকে খেয়ে ফেললো মগের সবটুকু চা।

তূর্ণর চোখ বন্ধ। কিছুক্ষণ নীরবতা। অতঃপর তূর্ণ ধীরে ধীরে চোখ খুললো। বর্ষণ হোহো করে হেসে ফেললো। তূর্ণ চিৎকার করে বলতে লাগলো- “ধোকা! আমার সাথে ধোকা হয়েছে। তুমি চিট, তুমি আমাকে ধোকা দিয়েছো। আমি জানতাম তুমি নীল মগে বিষ মিশাতে পারো না, কারণ ওটা আমার, তুমি যতোটা ভালোবাসো ততোটা ঘৃণা করতে শিখনি। তাই বিষ মিশালে সেটা তোমার গেড়ুয়া মগেই মিশাবে। তাই তোমার মগ বেছে নিয়েছিলাম। দেখাতে চেয়েছিলাম ভালো শুধু তুমি একাই বাসতে পারো না, আমিও পারি। কিন্তু তুমি সেটা করনি। তার অর্থ তুমি কোন মগেই বিষ মিশাওনি। তুমি ভয় দেখিয়েছো।”

বর্ষণের হাসি যেন থামতেই চাইছে না। হাসতে হাসতে সে নীল মগটা টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে মগের সবটুকু চা শেষ করলো। তারপর হাসতে হাসতেই বললো- “আমি চিট করিনি। আমি জানতাম শেষ সময়ে এসে তুমি অনুতপ্ত হবে। মরতে চাইবে। আর মৃত্যুর জন্য আমার মগটাই টেনে নিবে। কারণ তুমি ভেবেই রেখেছো যে আমি তোমার মগে বিষ দিতে পারি না। সুতরাং বিষ থাকলে সেটা আমারটাতেই থাকবে। কিন্তু আমিতো তোমাকে এত সহজে মারব না। আর তাই আমি বিষ রেখেছিলাম তোমার নীল মগেই। আমি চাই তুমি শেষবয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকো। আর আমার মৃত্যুর অপরাধবোধ তোমাকে তাড়িয়ে বেড়াক আমৃত্যু। এটাই তোমার শাস্তি।

হঠাৎ বর্ষণের কন্ঠ হাসি থামিয়ে করুণ হয়ে গেল। “এই দেখো আমার পকেটে এখনো দুটো সিকিমের টিকিট। তোমার জন্যই কেটেছিলাম। অথচ এসে দেখলাম তুমি সব বিশ্বাস জলাঞ্জলী দিয়ে শরীরের খেলায় মেতে আছো। ভালোবাসাবাসির ক্ষেত্রটা অনেক বিশাল। এখানে অনেক কিছুই হয় যা আমরা আগে থেকে ভেবে রাখিনা কখনো। আবার সব ঠিকও হয়ে যায়। ভালোবাসা নিজ দায়িত্বে সব ক্ষত সারিয়ে তোলে। তবে তাকে সেই সময়টুকু দিতে হয়।


কয়েক মুহুর্ত নীরব থেকে অদ্ভুত দুখী কন্ঠে বর্ষণ আবারো বলতে শুরু করলো- তুমি যদি ভুল করে বিষ মেশাননো মগটাও তুলে নিতে আমি তোমাকে সেটা খেতে দিতাম না। আমার চোখের সামনে তোমার মৃত্যু আমি দেখতে পারতাম না। অথচ কি আশ্চর্য দেখো আমার চোখের সামনেই আমার ভালোবাসার মৃত্যু দেখলাম। আফসোস, তুমি শুধু আমার রাগটাই দেখলে ভালোবাসাটা দেখলে না”
কয়েকমুহুর্ত থেমে বর্ষণ আবার বলতে শুরু করল- “তুমি এমন সময় এসে বিষ খেয়ে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে চাইলে যখন আমি সব প্রমাণপত্রের উর্দ্ধে! অথচ বিশ্বাস করো প্রমাণের প্রয়োজন ছিল না, তুমিযে আমাকে ভালোবাসো, আমিযে তোমাকে ভালোবাসি তা যদি তুমি মন থেকে বিশ্বাস করতে তাহলে আজকে আমাদের এতদুর আসতে হতো না। আমাকে মরতে হতো না। আমার মৃত্যুর জন্য তোমাকে সারাজীবন গ্লানী বয়ে বেড়াতে হত না। আমার সময় প্রায় শেষ। পটাসিয়াম সায়ানাইড পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হৃদপৃন্ডেরর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। পাঁচ মিনিট প্রায় হতে চললো। তোমাকে শেষবারের মত চুমু খেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু আমি আমার শেষ ইচ্ছাটাকে দমন করলাম। যে ঠোঁটজোড়াকে এতদিন পবিত্রজ্ঞান করে চুমু খেয়েছি আজ সেই ঠোঁটজোড়া আমার কাছে সবচেয়ে অশ্লীল, সবচেয়ে অপবিত্র। শেষ চুম্বনটা কোন অপবিত্র কোন ঠোঁটে খেতে ইচ্ছা করছে না।”

তার কয়েক মুহুর্ত পরেই বর্ষণ মারা গেল। তার কষ্ট তার আক্ষেপ মৃত্যুর পরেও তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকলো। তূর্ণ কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে বসে থাকলো। কতক্ষণ বসে থেকে কে জানে, হঠাৎ তার চোখ গেল বর্ষণের কোলে রাখা Scott B21পিস্তলটার দিকে। তোর ঠোঁটে কান্না মুছে গিয়ে অদ্ভুত একটা হাসি ফুঁটে উঠলো। সে খুব আগ্রহ নিয়ে পিস্তলটা তুলে নিল। রিয়াদ বিস্ফোরিত চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো তূর্ণর দিকে। এই ছেলে করছে কি! রিয়াদ দরজার দিকে পিছাতে লাগলো। দরজা খুলে দৌড়ে দিবে এমন সময় তূর্ণ কথা বলে উঠলো। রিয়াদ থমকে দাঁড়ালো। তূর্ণ বর্ষণের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হেসে বলছে- “তুমি খুব বোকা বর্ষণ। আমি জানতাম বিষ নীল মগটাতেই রয়েছে। আমি হিসাব করে বের করে ফেলেছিলাম সেটা। কিন্তু তোমাকে বুঝতে দেইনি। আমি এটাও জানি পিস্তলটা শুধু রিয়াদকে ভয় দেখানোর জন্যই আনোনি। তুমি মনে মনে চেয়েছিলে তোমার মারা যাওয়ার পর আমি যেন অনুতপ্ত হয়ে এটা দিয়ে আত্মহত্যা করি। কিন্তু আমিতো তোমার মত এতটা বোকা নই। আফসোস এত কিছুর পরেও তুমি বিশ্বাস করেছিলে আমাকে।

বিদ্রুপের হাসিটা আরো কিছুটা প্রসস্থ করে সে আবার বলতে শুরু করলো- হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও কয়েক মিনিট পর্যন্ত মস্তিস্ক সচল থাকে। আমি জানি তুমি এখনো সব দেখছো, এবং বুঝতে পারছো। কিন্তু কিছুই করতে পারছো না। কি অসহায় লাগছে তোমাকে। তুমি খুব বোকা বর্ষণ, খুব বোকা। শেষ খেলায় তুমি হেরে গেছ। আমি জিতে গেছি।
বর্ষণের নিরেট চোখ থেকে টুপ করে একফোটা জল গড়িয়ে পড়লো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.