পরিত্রাণ

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

মার শরীরটা অকারনেই খারাপ হয়ে যায় ।এইতো আজ সকালে খুব ভাল ছিল, আমাকে, বাবাকে চা দিল জুবেদাকে মেঝেতে চা ফেলার জন্যে শাঁসাল তারপর ই শুরু হল শ্বাসকষ্ট।ঘরে ইনহেলার ছিল।আনতে গিয়ে দেখি শেষ।এই দিকে বাবা ,বড় ভাই অফিসে।আমাদের ড্রাইভার মফিজ তার গ্রামে।কি করি ?অবশেষে আমাকেই যেতে হল। শহরে হরতাল,চারদিকে মানুষ নেই।আমি হেটে বের হয়েছি রাস্তায়।মনে ভয় ছিল মেডিকেল হলগুলো খোলা পাব তো এই ভেবে।ভাগ্য আমার সহায় হল একটা হল খোলা ছিল।ইনহেলারটা কিনে বাড়ি ফিরছি।তাড়াতাড়ী করার জন্যে মেইন রাস্তা ছেড়ে একটা গলিতে ঢুকে গেলাম।এইগলির বা দিকে আরেকটা গলি চলে গেছে।যেটা শেষ হয়েছে বড় রাস্তায়,সেখান থেকে সোজা আমাদের দু তলা সাদা বাড়ি। গলি ছেড়ে বা দিকের গলিটাই ঢুকতেই মানুষের ঢল।পুলিশের রাবার বুলেট,আর কাদানে গ্যাস ছুড়তে লাগল। আমি ও অসহায় আর বোকার মত ছুটতে লাগলাম তাদের সাথে।

একটু দৌড়েই থেমে গেলাম।না,দৌড়ে লাভ নাই,তারচেয়ে বড় দাঁড়িয়ে থাকি।ঝামেলা কমলে যাওয়া যাবে। একটা সময় গন্ডগোল থেমে গেল।আমি বাড়ির পথ ধরলাম।আসার সময় বাবাকে ফোন করতে বলে এসেছিলাম।বাবা এসেছে কিনা কে জানে ?বাবা না আসলে মা কেমন আছে ,মনে করে ইচ্ছে করছে উড়ে চলে যায় বাড়ি।ভয়ে ভয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে এগোচ্ছিলাম ।হঠাৎ, থমকে দাড়ালাম,একজন লোক মাটিতে পড়ে ছিল।আমাকে দেখতেই ইশারাই ডাকল ।কাছে যেতেই হাত চেপে ধরল, বুঝতে পারলাম ওনার শ্বাসকষ্ট।দম আটকে যাচ্ছিল।মাথা আমার কাজ করছিল না।মার জন্যে আনা গ্যাসটা ওনাকে দিয়ে দিলাম।দু,বার মুখে গ্যাস নিতেই স্বাভাবিক হয়ে গেল।আমি একটা ট্যাক্সি ডেকে ওনাকে তুলে দিলাম। বাড়ি ফিরে এসে দেখি মা সুস্থ।টিভি রিমোট হাতে সিরিয়াল দেখছে।আমাকে আসতে দেখে একবার মাথা ঘুরিয়ে দেখে আবার টিভিতে মন দিল।বুঝতে পারলাম খুব দামী সিরিয়াল চলছে।জুবেদাকে দেখলাম খুব খুশি।তারমানে মফিজ ফিরে এসেছে।আজকাল জুবেদা আর মুফিজের মাঝে খুব ভাল সম্পর্ক।কাল,সন্ধ্যায় চা দিতে এসে দাঁড়িয়ে রইল।আমি জিজ্ঞেস করলাম
-কিরে কিছু বলবি ? -হ ভাইজান। -জলদি বল। -হি হি হি হি -হাসছিস কেন? -অ আল্লা হাসতে ও মানা নাকি? -কি বলবি বলে বিদায় হ। -মফিজ্জারে কয়েন আমারে আড় চোখে না দেখতে। -সে বুঝি তোকে আড় চোখে দেখে ?কেন বলতো? -কেন আবার।সে আমার পেমে পরছে।হি হি হি হি -যা ভাগ ফাজিল।– -যাইতাছি।হু 
জুবেদা এমন ই।মা জুবেদাকে বলবে,এই শুন আমাকে খালাম্মা ডাকবি না।আপা ডাকবি ,আর অহিন আর তুহিনকে মামা।সব ঠিক আছে,কিন্তু আমাকে সে মামার বদলে ভাইজান ডাকে।কারন জিগাইলে হি হি করে হাসে। আজকের ভোরটা খুব সুন্দর ছিল।ঘুম ভেঙে গেল সকাল সকাল।নিজ হাতে এক কাপ চা বানিয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলাম ।অনেকটা সময়।রুমে ফিরলাম টুম্পার ফোনে।এত সকালে টুম্পা ফোন কেন করল ?হরতালের কারনে ভার্সিটি তো অফ।অফ না অবশ্য ,গিয়ে বসে থাকা যায় কিন্তু ক্লাস হয়না।অনেকেই যায় আমি যায় না।বন্ধু বান্ধব আমার কাছে বিগ্রহের মত লাগে।এরচেয়ে ভাল ঘরে বসে ট্রয় নামক উপন্যাস টা পড়া। ফোনটা তুলতেই ওপাশ থেকে, 
-তুহিন,একটু আস্তে পারবি ? -কেন ? -আহা। আস না।আমার প্রজেক্টটা পারছি না।একটু হেল্প করবি। -আচ্ছা ।আসছি। 
টুম্পাদের বাসা আমাদের বাসা থেকে বেশি দূরে নয়।কিন্তু আমার যাওয়া হয় খুব কম।খুব সাধারণ একটা মেয়ে টুম্পা।খুব ভাল ছাত্রী।আমি জানি ওর প্রজেক্ট শেষ।আমাকে মিথ্যা বলে ওখানে নিচ্ছে অন্য কারনে।হয়তো আজ ওর খুব আনন্দের দিন।আমি যেমন একা স্বভাবের ও তেমন নয়।ওর অনেক বন্ধু বান্ধব।তবে,কলেজ থেকে এক সাথে পড়ছি সেই হিসেবে বন্ধুত্বটা একটু বেশি জোরালো। ওদের বাসাটা বিশাল।দারোয়ান আমাকে দেখেই গেইট খোলে দিল।বাসায় ঢুকেই টুম্পার আনন্দের কারনটা বুঝতে পারলাম।আমাকে দেখতে পেয়ে টুম্পা ছুটে আসল।
-তুই আসছিস খুব ভাল করেছিস। -আর কে কে আসছে ? -মিথুল,সজল,রুমা,ফয়সাল -এত খুশি কেন তুই ? -আন্দাজ কর। -পারবো না। -আহা চেষ্টা কর। -তুর মামা আসছে ? -হু।কেমনে বুঝলি? -আন্দাজ। 
আচ্ছা,চল। উপরে সবাই বসে আছে। আমি টুম্পার মামাকে দেখি নাই।ওনি আমেরিকায় থাকেন।টুম্পা প্রায় ওনার কথা বলেন।ওনার নাকি অনেক জ্ঞান ।আজ সেই,জ্ঞানবৃক্ষকে দেখে নয়ন জুরাব। উপরে,সবাই ছিল।আমাকে দেখে,সবাই হেসে উঠল।তাদের হাসি আমার কাছে উপহাসের মত মনে হল।আমি সবাইকে এড়িয়ে দুরের একটা সোফাতে বসে রইলাম।বিরক্তিতে কিছু সময় পর ঊঠে,ছাদে চলে গেলাম।ওদের বাড়ির ছাদটা খুব সুন্দর।ছাদ থেকে নদী দেখা যায়।আমি বসে থাকতে থাকতে যখন চলে যাব তখন পিছন হতে একটা ভারি কন্ঠ আমার নাম ধরে ডাকল।আমি ঘুরেই অবাক,এই তো সেই লোকটা যিনি ঐদিন,অসুস্থ ছিল।আমি ভদ্রতা জাহির করতে কাছে গেলাম।ওনার বয়স চল্লিশ হবে।অথচ ওইদিন ওনাকে মনে হয়েছিল বৃদ্ধ।ওনার চোখে চশমা,ঘন কাল চুল,শান্ত দুটি চোখ আর লম্বা কঠিন একটা শরীর অপুর্ব সুন্দর।এত সুন্দর উনি দেখতে তা ঐদিন খেয়াল করি নাই ।আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। 
-ঐদিন তোমাকে ধন্যবাদ টুকু দেওয়া হয়নি। -না তার দরকার নেই। -আসলে তুমি না থাকলে ঐদিন আমি হয়তো বিলিন হয়ে যেতাম। -আসলে তেমন কিছু হত না আপনার। -তুমি যা করলে তার ফরমালিটি যতেষ্ট নয়। -আপনি টুম্পার মামা ? -না,টূম্পা আমায় মামা ডাকে। -তা একি হল। -হতে পারে। -চলুন ভিতরে যাই।
ঐদিন ওনার সাথে আর কথা হয়নি।তারা সবাই ওনার সাথে অনেক কথা বলছিল।আমি কেবল দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছি।উনি হাসেন অল্প,সেটাও ঠোট চাপা হাসি সেই হাসিতে ওনাকে অদ্ভুত রকম সুন্দর লাগে।উনি যখন কথা বলছিলেন তখন ওনার মাথার চুলগুলো বাতাসে নড়ছিল।আমি বুঝতে পারছি না এত অবাক হয়ে ওনাকে আমী কেণ দেখছি? রাতে আমার একদম ঘুম হল না।মনে হল কি যেন নাই।মনে এত শুন্যতা হুট করে এল কোথা থেকে ?বুকটা কেমন খা খা করছিল।গলাটা বারবার শুকিয়ে যাচ্ছিল।ইচ্ছে করছিল টুম্পার মামার কাছে ছুটে যায়,এতে করে হয়তো আমার ঘুম হবে।ওনার নামটা যেন কি ?ভুলে গেছি।কাল জেনে নিতে হবে ।ঘুমুতে গেলাম অনেক পর। বিছানা ছাড়লাম নয়টার দিকে।ডেকে তুলল জুবেদা।আমি শুয়ে ছিলাম। 
-ভাইজান ওঠেন ।একজন পুরুষলোক আইছে। -বল রুমে আসতে। -হায় আল্লা লোকটা যা সুন্দর। -যা তো।আমি আসছি। নিচে নামতে নামতে আধা ঘন্টা লাগলো। যার খেইয়ালে বেখেয়ালী রাত কাটিয়েছি, ভোর হতেই তাকে দেখতে পাব ভাবিনি।ওনি চশমা চোখে।সাদা একটা পাঞ্জাবী।কত সুন্দর ই না তাকে লাগছিল। -মামা আপনি ? -হু,চলে এলাম। -চিনলেন কেমনে বাসা? -ড্রাইবার চিনে ।সে ই নিয়ে এসেছে। -আপনার শরীর কেমন? -ভাল বেশ ভাল। -চা দিতে বলি? -তিনবার খাওয়া হয়ে গেছে। -তো,কি মনে করে? -রাতে ঘুম হয়নি আমার। 
আমি ভাবনায় পরে গেছি।রাতে তো আমার ও ঘুম হয়নি।সে কি তা জানে ?এত সকালে কেন ছুটে এসেছে সে?আমাকে দেখার জন্যে ?সে কি ………………..? না তা হবে না।এত জ্ঞানী ব্যক্তি। -তুহিন চল ঘুরে আসি।কি ভাবছু এত ? -চলুন।কিন্তু যাবেন কোথায় ? -তুমি নিয়ে যাও যেখানে। ঐ দিন ওনার সাথে অনেক ঘুরা হল।দুপুরে বাহিরে খেয়ে সন্ধ্যাই বাড়ি ফিরলাম।অনেক দিন পর মনে হয়েছিল,আজ আমি সুখি।সবচেয়ে অদ্ভুত,এত দীর্ঘ সময়ে আমাদের খুব কম কথা হয়ে ছিল।কিন্তু সে যা ই বলেছে আমি মুগ্ধ হয়ে শুনেছি।এত সুন্দর করে কিছু মানুষ কেমনে কথা বলে ? অনেকটা কাছে চলে গেছিলাম তার ।সেও আমাকে খুব চায়তো।তার হতে বয়সে খু্ব ছোট একটা ছেলেকে যে খুব কাছের কেউ ভাবতে শুরু করেছিল ।আমি টুম্পাদের বাড়ী খুব কম যেতাম।একদম ই যেতাম না।মামা আসতো আমাদের বাড়ি।
একদিন সে আসেনি,আমার খুব খারাপ লাগছিল।তাই সোজা চলে গেলাম টুম্পাদের বাড়ি।সেখানে আমার জন্যে এক ভয়াবহতা ছিল। টুম্পা বলেছিল ওর মামা অবিবাহীত।আমি ও জানতাম।কিন্তু ঐ দিন টুম্পাদের বাড়ি যেয়ে আমি অবাক।মামা একটা মহীলার সাথে কথা বলছিল।ওনার কাছেই ছিল সাত বছরের একটা বাচ্চা।আমি কাজের লোককে জিজ্ঞেস করলাম তার পরিচয় সে বলল মামার স্ত্রী।মামা আমাকে দেখে কিছু বলল না।,আমি আর দাড়ালাম না।বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠল।কান্না চেপে বাড়ি চলে আসলাম। ভালবাসা খুব অদ্ভুত বস্তু।যখন তখন যাকে তাকে সবটা দিয়ে ভালবেসে ফেলে।কিন্তু ঘৃণা যাকে তাকে যেমন করা যায় না ভালবাসা ও হুট করে ফিরিয়ে আনা যায় না।
গত তিন দিন মামার কোন খোজ নেই।আমি নেইনি।মায়া বাড়িয়ে লাভ নাই।যা আমার না তা কামনা করা বোকামী।আর সত্য জানার পর কামনা করা ও উচিত নয়। বিকালে ছাদে ছিলাম।আকাশের সুর্যটা সবটা দিয়ে কি করে নিস্ব হয়ে যায় তাই দেখছিলাম।মা ডাকল নিচে যেতে তখন গেলাম।মামা বসে ছিল।চিন্তিত মুখ।নির্ঘুমের চোখ আর এলোমেলো চুল।ওনাকে দেখেই বুকের ভেতরটা ছেদ করে উঠল।ইচ্ছে করছিল ওনাকে জড়িয়ে ধরে কাদি আর বলি ভালবাসি আপনাকে।মুখে কারো কোন কথা ছিল না।দু জনেই চুপ।ওনি গলা ঝেড়ে বলে উঠলেন-চল বাহিরে যায়।আমি আপত্তি না করে চললাম। আমি চুপ ই ছিলাম ।যা বলার ওনি বললেন।অনেক কিছু বললেন।যা ওনি না বললে হয়তো কোন দিন জানতে পারতাম না ।
ওনি বললেন, তুহিন,আমি তোমায় কিছু সত্য কথা বলব্।তা শুনে ইচ্ছে হলে আমায় ভালবেস আর ইচ্ছে না হলে ভুলে যেও।আমি বিবাহীত ।কিন্তু,আমাদের বিয়েটা টিকেনি।কারন আমি হোমোসেক্সুয়্যাল।আমাদের বিয়ের তিন বছর পর আমার স্ত্রী আমায় ছেড়ে দেয় যদিও বিয়ের আগে তাকে এই সত্যটা বলা হয়েছিল।ভালবাসতো সে আমাকে ।তাই সব জেনে ও আমায় বিয়ে করল।চেষ্টা করেছি অনেক কিন্তু পারিনি একদম।ভেঙ্গে গেল বিয়েটা।তারপর থেকে আমি একা।ভালবাসার মত কেউ ছিল না তাই শুন্যতাকে ভালবাসতে শুরু করলাম।
যেদিন তুমি আমায় বাচিয়ে দিলে সেদিন মনে হল শুন্যতা আমার দূর হবে।কিন্তু আজ ছয় বছর পর হঠৎ আমার এক্স স্ত্রী এসে আবার সংসার করতে চাইছে।আমি হ্যা না কিছুই বলিনি।কারন ভালবাসা ছাড়া সংসার হয় এখন আমার হাতটা যদি তুমি ধর তবে জীবনের শেষ কয়টা দিন আমি তোমায় সাথে নিয়ে বাচতে পারব।হাতে আমার সময় অল্প।আমি লিকোমিয়ায় ভুগছি।আর অল্প কিছু দিন বাচব আমি।ধরবে আমার হাতটা ?নাকি ছেড়ে দিবে ? আমি কিছু বলতে পারছিলাম না।এত ভালবাসা আমার জন্যে তার বুকে?আমি কোন কথা খোজে পাচ্ছিলাম না।তাই হুট করেই প্রশ্ন করলাম ,-তোমার নাম কি ?আমার প্রশ্ন শুনে,সে কিছুক্ষণ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল তারপর হু হু করে হেসে ঊঠল।আমিও হেসে দিলাম।সে ঝাপটে আমাকে জরিয়ে ধরে,বলল আমার নাম জাফর।তুমি ভালবাস আমায় ?আমি তার গলায় আমার ঠোট দুটি ছুয়ে দিয়ে বললাম-হুম জাফর সাহেব,তোমায় আমি খুব খুব বেশি ভালবাসি।
(সমাপ্ত)


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.