পরিশেষে

লেখক :- সানশাইন ক্রিস্টাল

ফেইক আইডি রায়হান তাসির। প্রতিদিন রিকুয়েস্ট দেয়, আমি ডিলিট করে দেই। ফার্স্ট যেদিন রিকুয়েস্ট দিল, সেদিনই প্রোফাইল ঘেটে বুঝেছি ফেইক। একদিন মেসেঞ্জার ইনস্টল দিলাম। থার্টিন মেসেজ রিকুয়েস্ট। ক্লিক করলাম, ৮ নাম্বারটা রায়হান তাসিরের। ৯৯+ মেসেজ, অবাকই হলাম। অন করলাম।
প্রথম মেসেজটা ভাউ রিকুয়েস্টটা একসেপ্ট করেন। বাকীগুলা সব প্লিজ। হাসি পেল। একসেপ্ট করলাম। পরদিনই রিপ্লাই এলো থ্যাংকস। আমি আগ্রহ নিয়েই জিজ্ঞেস করলাম,
—কে তুমি?
—নাম বললেই চিনবেন?
—না, ঠিক তা নয়, ভাবছিলাম হয়ত আমার পরিচিত কেউ।
—না ভাই, আমি খুলনা থাকি। আপনি তো ঢাকা।
—ওহ, তা রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করানোর জন্য এতো মেসেজ ক্যান?
—দুই চারটা মেসেজে কাজ হয় নাই তাই।
—ফান করছো? আমি কিন্তু ফান মোটেও পছন্দ করি না।
—ডিপি দেখে তো সিরিয়াস টাইপ মানুষ মনে হয় না।
—কী মনে হয়?
—ফানি টাইপ।
—শোনো, তোমায় চিনিও না অথচ বেয়াদবি করতেছ।
—আপনিও তো করছেন। শুরুতেই তুমি তুমি দিয়ে করছেন।
—এতো তর্ক করো ক্যান মেয়েদের মতো?
—ভালো লাগে তাই।
—জাও ভাগো।
—হুম হুম, আপনিও ভাগেন।

আমি জানি এটা কোনো ইম্প্রেসিভ চ্যাটিং না। বাট তারপরও তর্ক করতে ভালই লাগল। কে জানে তর্ক করার জন্যই হয়তো প্রতিদিন নক করতে শুরু করলাম। এক মাসের মধ্যেই দুজন ফ্রি হয়ে গেলাম। তবে কখনো ফোনে কথা হয় নাই। শুধু চ্যাটই হত। ওকে ছোট ভাইয়ের মত দেখতে লাগলাম। তুই তুই করে বলতে লাগলাম। নিজের অনেক গোপন কথাও শেয়ার করলাম। তবে ও নিজের ব্যাপারে খুব কমই বলত। শুধুই তর্ক আর ফান করত। একদিন লিখল “ভালোবাসি।” আমিও লিখলাম, “হা ভাই আমিও বাসি।” ও বলল, “তুমি বুঝছ না। আমি সত্যি ভালোবাসি। বি এফ জি এফ টাইপ।” আমি ভাবলাম ফান করছে। জিজ্ঞেস করলাম, “জি এফ টা কে এখানে?” ও একটা মন খারাপ হওয়ার ইমো দিল। তারপর লিখল ও একজন সমকামী। আমি থ হয়ে গেলাম। বললাম, “ভাই ভুল জায়গায় নক করেছিলি।” ও খেপে গেল। বলল, “তোমার অ্যাবাউটে লিখা তুমি বাইসেক্সুয়াল।” আমি অবাক হলাম। প্রমাণ চাইলাম। ও আমার প্রোফাইলের স্ক্রিনশট দিল, ইন্টারেস্টেড ইন মেন এন্ড উইমেন লেখা। আমি বললাম, “আমি মেয়ে ছেলে উভয়ের সম্পর্কেই জানতে আগ্রহী। তাই এটা দেয়া। আমি বাইসেক্সুয়াল না।” দুই মিনিটের মাথায় দেখি ওর আইডি ডিএক্টিভ। আমিও অফলাইনে চলে এলাম।

পরদিন ছোটো ছোটো ঝগড়াগুলা মিস করতে লাগলাম। রায়হানরে ভাই ভাবছিলাম। তাই ওর সমস্যার ব্যাপারে জানতে আগ্রহী হলাম। অবচেতন মনেই “সমকামী” গুগল সার্চ করলাম। অনেক লিংক এল। অবাক হলাম, এত লিংক! চার পাঁচটা লিংকে ঢুকেই বুঝলাম সব জায়গায় প্রায় একই লেখা। এগুলা পরে সমকামীতার তেমন কিছুই জানা যাবে না। ফেসবুকে ঢুকে কিছু সমকামী গ্রুপে এড দিলাম। বাট এপ্রুভ করল না। আবারো অবাক হলাম এদের প্রাইভেসি দেখে। খেয়াল হল তর্কবাজটা ফেইক আইডি চালাত। আমিও খুললাম। এবার গ্রুপে জয়েন রিকুয়েস্ট দিতেই এপ্রুভ হল। গ্রুপের কিছু আইডিতেও রিকুয়েস্ট দিলাম। সবগুলোই একসেপ্ট করল। চ্যাটও শুরু করলাম বাট ঠিকভাবে কিছুই বুঝলাম না। এরিয়া, রোল, প্লেস আছে কি না কিছুই ঠিকভাবে বুঝলাম না। দু-চারজন ব্লকও দিল। তখনই একজনের সাহায্য পেলাম, উনি সব বুঝিয়ে দিলেন। সাথে কিছু গে পর্ণ দেখতে বললেন। আমিও কথামত ডাউনলোড দিয়ে ওপেন করলাম। বমি চলে এলো। সাথে সাথে মাথায় এলো আমি এসবে জড়াতে পারব না। রায়হানকে ভুলে যাওয়াই ভালো। যাকে ভাইয়ের স্থান দিয়েছি সে যদি নিজেই তা পায়ে ঠেলে তবে আমার কিসসু করার নেই।

মাথায় ভুলে যাওয়ার কথা থাকলেও দুঘন্টাপর মিস করতে শুরু করলাম। যেন তেন মিস নয়। প্রচন্ডরকমভাবে মিস করতে শুরু করলাম। বুঝলাম ওর প্রতি টান আছে ভালোবাসা নয় কিনা জানি না। কিন্তু ওকে আমার এখ্খনি দরকার। ওর প্রতি টানটা মানসিক, দৈহিক নয়। রিয়েল আইডিতে ঢুকলাম। ইনবক্সে ওর নামটা এখনো ফেইসবুক ইউসার। আবার ঢুকলাম ফেইক আইডিতে। যিনি আমায় সাহায্য করেছিলেন তাকেই সব খুলে বললাম। তিনি আমায় ফেইক আইডি ডিএক্টিভ করে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে বললেন। আমি হতবাক হওয়া সত্ত্বেও তার কথা মানলাম। পরদিনই দেখলাম রায়হান তাসীর একটিভ। আমি ইনবক্সে ভালোবাসি লিখলাম। তারপর? তারপর পৃথিবীর বুকে আরেকটা কিউট রিলেশন শুরু। ও হ্যা রায়হান কেন ফিরে এল জানেন? ফেইক আইডির ওই লোকটা রায়হানের ফ্রেন্ডলিস্টে ছিল। তিনিই রায়হানকে বুঝিয়েছেন আমি ওকে কতোটা মিস করি, কতটা ফিল করি।

আচ্ছা আমাদের কিউট রিলেশন বলতে কিন্তু ছেলে মেয়েদের মতো সাধারণ রিলেশন বুঝাচ্ছি না। আমরা দুইজনই ছেলে। তাই এটা একটা অসাধারণ রিলেশন। আমাদের দুজনেরই অনেক কিছুতে মিল। দুজনই দুজনকে ভালো বুঝতাম। তাই সম্পর্কে কোনো ঘাটতি ছিল না। আর এজন্যই বলা কিউট রিলেশন। রিলেশনটা দিন দিন এগোতে লাগল। মাসের পর মাস এগোতে লাগল। অনেক চ্যাট হল। ফোনে কথা হল। একসময় ওর রিয়েল আইডিও দিল। ছবি দেখলাম। ওর ছবি দেখে বুঝলাম পুরুষদের মধ্যেও সৌন্দর্য্য বলতে অনেক কিছু আছে। কেন যেন ওকে সামনা সামনি দেখতে ইচ্ছে করল। ওকে বললাম দেখা করতে চাই। ওরও নাকি খুব দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমার খুলনা যাওয়ার সুযোগ নেই, ওর আসারও সুযোগ নেই। তাই ইচ্ছে মনের মধ্যে রেখেই আবারও দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কাটাতে লাগলাম। বছর পেরোলো। হঠাৎ আমার সুযোগ এল। একটা ট্যুরে বাগেরহাট যাব। পাশেই খুলনা। তাই রায়হানও রাজি হল আসার জন্য। ভাবতেই অবাক লাগছে, আর মাত্র তিনদিন। খুব কষ্টে গেল দিন তিনটা। আরও কষ্টের ৮-৯ ঘন্টার জার্নি যা ৮-৯ বছরের মত লাগছে। ভাবছি রায়হানেরও ঠিক এতটাই কষ্ট, এতোটাই উত্তেজনা হচ্ছে। যখন ওর সামনে দাড়াব তখন কি হবে। আমি আর ভাবতে চাইলাম না। সময় আসুক তখনই দেখা যাবে কি হয়।

বাগেরহাট ষাটগম্বুজ মসজিদ পৌছে ওকে ফোন দিলাম। আমায় ছাদে যেতে বলল। আমি যখন উঠছিলাম পা কাপছিল। ছাদে উঠেই আমি ওর মুখোমুখি হলাম এবং আবার একবার থ বনে গেলাম। রায়হানই জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছ?” বললাম, “ভালো, তুমি?” “ভালো।” জবাব দিল। এরপর দুজনই চুপ হয়ে গেলাম। অনেকক্ষণ চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। হঠাৎ ও হাটতে শুরু করল। আমি পিছু ডাকলাম, “কই যাও? বসি একসাথে?” ও কিছু না বলে হাটতে থাকল। আমিও থামালাম না।

কী ভাবছেন? হয়তো আমার পরিচিত কেউ এজন্য থ হয়ে গেছি বা অন্য কোনো অতীতময় ঘটনা আছে? কিন্তু আমি বলছি যা ভাবছেন তা কিছুই নয়। সামনা সামনি ওকে আমার পছন্দ হয় নি। এটাই ফেসবুক জগৎ। রিয়েল লাইফে বডি পার্সোনালিটি একরকম, ভার্চুয়াল লাইফে ছবিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আবার ভাবছেন পারসোনালিটিতে ভালোবাসা কমে? কমেরে ভাই, আপনি কল্পনায় যা ভেবে ভালোবাসছিলেন, তা না পাইলে ভালোবাসার ছিটেফোটাও বাকী থাকে না। আমি ভাবছিলাম এবার আমি কি করব? রিলেশন চালিয়ে যাব? নাকি সত্যিটা বলে দিব যে ও পছন্দ না? ইতোমধ্যে রায়হানের কল এল। আমি ফোন ধরেই বললাম, “চলে গেলে কেন?” জবাব এল, “উত্তরটা পরে দিচ্ছি। আগে বলো আমায় কতটা ভালোবাসো?” আমি এবার একটু চিন্তায় পরলাম। যদি মিথ্যা বলি আমাকে আরও অনেকদিন একে বইতে হবে। আর যদি সত্যিটা বলি? হয়ত ও কষ্টে খারাপ একটা কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে। টেনশন টেনশন টেনশন। পরিশেষে সত্যিটা বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাকীটা উপরওয়ালার হাতে। রায়হান ওপাশে হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে। আমি সত্যিটা বলে দিলাম, “তোমায় আমার পছন্দ হয়নি।” জবাব এল, “থ্যাংকস গড। আমারও হয় নি। আমি তো ভয়ে ছিলাম। যদি আমি সত্যিটা বলি তুমি হয়তো খারাপ কিছু ঘটাতে পারো।” আমি হেসে দিয়ে বললাম, “বছরখানেক আগের অফারটা ওপেন আছে। ছোটো ভাই হবা?” রায়হানও হেসে দিয়ে বলল, “রাজি আছি।”

পরিশেষে আমরা ভালো আছি, আগের মতই তর্ক করি, একজন আরেকজনের কেয়ার নেই। শুধু সম্পর্কটা ভাইয়ের মত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.