পর্নোগ্রাফি কে না বলুন!

লেখক : অরণ্য দেব

আজকের দুনিয়ায় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় যে হলিউড বা বলিউড না সেটা এখন অনেকেই জানে। শুনতে খারাপ কিংবা অদ্ভুত হলেও সেটা হল অ্যাডাল্ট ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বা সোজা কথায় ‘পর্ন’। পর্ন শব্দটা নিয়ে যতই নাক কুঁচকানো ভাব থাকুক না কেন, এটার মোহনীয় ক্ষমতার জন্যই কি না কে জানে কুঁচকানো থেকেও বেশি আছে আগ্রহ। এই লেখাটা যারা পড়তে পারছেন তারা যে জীবনে একবার হলেও শব্দটা শুনেছেন আর অনেকেই দেখেছেন সেটা ধরে নেয়াই যায়। অনেকে বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখেছেন এবং দেখতে দেখতে আসক্ত হয়ে, ‘কিভাবে এর থেকে মুক্তি পাবেন’ এটা লিখে গুগলে সার্চ দেয়া মানুষও কম হবে না।

বাংলাদেশে কোন বয়সের, কি ধরনের মানুষ কতক্ষন সময় এর পিছনে দেন সেটা একটা গবেষণার বিষয় হলেও, কয়েক বছর ধরে গুগল বাংলা সার্চ ইঞ্জিনের অবস্থা দেখে বোঝা যায় লিখিত বা চিত্রিত কোন ধরনের পর্নোগ্রাফিতেই আমাদের অনীহা খুব একটা নেই। এক সময় ব্যাপারটা বেশ খারাপ চোখে দেখা হলেও এখন অনেকেই এটাকে স্বাভাবিক চাহিদা বলেই মানেন। সে যে যাই ভাবুন আর যে যাই মানুন, ‘অতিরিক্ত সব কিছুই খারাপ’- কথাটা অপ্রিয় এবং সত্য। তবে ব্যক্তির উপর পর্নোগ্রাফির প্রভাব নিয়ে কথাবার্তা তো অনেক হয়েছে। এবার আসুন সামাজিক কিছু প্রভাব দেখি, যাতে করে আমাদের মনে হতে পারে, এই পর্ন মুভি আমাদের একেবারেই বাদ দেয়া উচিৎ।

প্রথমত, অনেকেই মনে করেন পর্নোগ্রাফি হল আধুনিক কালের পতিতাবৃত্তির অপর নাম। আপনি যদি বাস্তব পতিতাবৃত্তিকে অপছন্দ করেন, তাহলে পর্নছবি পছন্দ করার কোন কারনই আপনার থাকতে পারে না। বাস্তবতা হল, আজকে যত পর্নস্টার আছে তাদের মাঝে হাতে গোনা কয়েকজনই পাওয়া যাবে যারা নিজের ইচ্ছায়, সখ করে পর্নস্টার হতে এসেছে। বেশিরভাগ পর্নস্টার আর্থিক অস্বচ্ছলতা কিংবা ‘সল্প সময়ে বিখ্যাত’ হওয়ার জন্যই আসে। অন্তত তাদের সেটাই বোঝানো হয়। কড়া আইনকানুনের কারনে হয়ত সে সব দেশে জোর খাটিয়ে কিছু করছে না, কিন্তু ব্যাপারটা অনেকটাই আমাদের দেশের পতিতালয়গুলোতে মেয়েদের যেভাবে ধোঁকা দিয়ে আনা হয়, ঠিক সেরকমই।

তবে পর্নস্টারেরা অবশ্যই সাধারণ পতিতাদের থেকে অনেক বেশি আয় করেন। আর সেটা অনেকের কাছেই একটা আগ্রহের ব্যাপার। তবে এটা ঠিক যে, পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে খুব দ্রুত ‘বিখ্যাত’ হওয়া যায়। মাত্র ‘তিন মাস; পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে থাকলেও মিয়া খলিফাকে এখন অনেক লোক চেনে। কিন্তু এই তিন মাসের কারনে তার যে অনুশোচনা সেটা কিন্তু অনেকেই জানে না।

তবে খুব কম পর্নস্টারই আছে যারা মিয়া খলিফার মত বিখ্যাত হয়। আর হলেও সেটা খুব কম সময়ের জন্য। কারন কোন লোকই এক মানুষকে বেশিদিন দেখতে চায় না অথবা বলা যায়, কোন মানুষেরই একজনকে নিয়ে বেশিদিন ফ্যান্টাসি করতে ভাল লাগে না। তাই অনেকটা বাস্তবের পতিতাদের মতই পর্নস্টারেরা খুব বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না।

এই স্বল্প সময় বিখ্যাত থাকার পর তারা যখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসতে চায়, তখন কি আমরা তাদের আসতে দেই? ভুল করে হোক বা ইচ্ছা করে, তাদের যতই টাকা থাকুক না কেন, আমরা তাদের দিকে বাঁকা চোখেই তাকাই। পর্নস্টারদের প্রতি আমাদের মনোভাব দেখলে অন্তত সেটা স্পষ্ট।

আরো পড়ুন: ১০টি দুর্ঘটনা, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিমান চলাচল হয়েছে আরো নিরাপদ

‘গণিকা’দের দেখে ছিঃ ছিঃ করলেও ‘গণিকালয়ে’ যারা যায় তাদের সাথে চলতে ফিরতে আমাদের সমস্যা হয় না। ঠিক তেমনি পর্ণগ্রাফি দেখে লালা ঝরালেও পর্নস্টারদের নূন্যতম সম্মান আমরা দেই না। তাই পর্নোগ্রাফি থেকে সরে এসেও সন্তান জন্মদানের জন্য টিটকারি শুনতে হয় সানি লিওনকে। সবার কাছে ভিক্ষা চাইতে হয় যাতে ‘তার সন্তানদের’ মায়ের পেশার জন্য কথা শুনতে না হতে হয়। অথচ ‘incognito’ মুডে গিয়ে যখন তখন সানি লিওন লিখে সার্চ করতে আমাদের একটুও লজ্জ্বা করে না।

ধরা গেল পতিতাবৃত্তির এই ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়। হাজার বছর ধরেই তো চলছে, তেমন কিছু তো হয় নি।কিন্তু পর্নোগ্রাফিতে যে ক্রমাগত মেয়েদের প্রতি পুরুষের আধিপত্য দেখানো হয় সেটা একটা চিন্তার বিষয় বটে। এই ব্যাপারটাও হাজার বছর ধরে চললেও বর্তমানে এটাকে আমরা খারাপ চোখেই দেখি। যদি খেয়াল করেন তো দেখবেন যে, সব পর্নছবিতেই মেয়েদের কে এমনভাবে দেখানো হয় যে মেয়ে পার্টনারটি ছেলে পার্টনারের অধীনে কাজ করছে। আসলে পর্নছবির প্রধান টার্গেট পুরুষেরা হওয়ার কারনে এই আধিপত্যটার চল চলে আসছে। আর ‘male dominated’ যে উদ্ভট পজিশনগুলো পর্নোগ্রাফিতে দেখানো হয় তার যতটা না যৌন আবেদনের জন্য, তারচেয়ে অনেক বেশি যাতে ক্যামেরার সামনে যাতে নির্দিষ্ট অঙ্গ দেখার ক্ষেত্রে বাধা না পায়। কিন্তু আসলেই বাস্তবে কি এমন হয়? রোমান্সের মাধ্যমে যে যৌনক্রিয়া, সেখানে এই উদ্ভট পজিশন কিংবা এই আধিপত্যের ভূমিকা কতটুকু।

আসলে ব্যাপারটাকে অতিরঞ্জিত করে দেখিয়ে ভোক্তা বাড়ানোই প্রধান উদ্দেশ্য। আপনি যদি ফেয়ার এন্ড লাভলির বিজ্ঞাপন দেখে ফর্সা হওয়ার জন্য ওই ক্রিম কিনে আনেন তাহলে তো ঠকতে বাধ্য। কিন্তু এই ফেয়ার এন্ড লাভলি যেমন আপনার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে ‘একমাত্র ফর্সা’ মানেই সুন্দর, তেমনি করে পর্নোগ্রাফি পুরুষদের মাথায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে যে, মেয়েদের ডমিনেট করা যায় এবং সেটাই উচিৎ। অথচ একটা সুন্দর স্বাস্থ্যকর যৌনজীবন আপনি এমনিতেই পেতে পারতেন, সেই সাথে একটা উদার মানসিকতা। যৌন জীবন মানেই যে সেক্সুয়াল এক্টিভিটি নয় সেটা পর্নফিল্ম আমাদের মাথা থেকে আস্তে আস্তে বের করে দিচ্ছে। যার ফলে আমরা হচ্ছি সেক্স ফ্রিক এক প্রজন্ম, যারা ধর্ষণ করে, ইভ টিজ করে, যৌন নির্যাতন করে।

চিন্তা করূন তো, আপনার নিজস্ব চিন্তা কতটা সেক্স কন্টেন্ট দ্বারা দূষিত হয়েছে। সহজ সহজ কিছু শব্দেও আপনার মাথায় এমন সব জিনিস আসবে যেটা আপনি সভ্য সমাজে উচ্চারণ করতে পারবেন না। তবে এখানে আপনার দোষই বা কোথায়? আপনি যা দেখবেন সেটাই তো আপনার মাথায় বাজবে। পরীক্ষার আগে অংক করে করে রাতে ঘুমের মাঝেও অংক করেছে এমন অনেকেই আছে। তো সারাদিন আশেপাশে সেক্স কন্টেন্ট দেখে দেখে, বল বলতে আপনার মাথায় শুধু ক্রিকেট বল ভাসবে সেটা আশা করা রীতিমত বোকামি। তাহলে পর্নোগ্রাফি যে স্লো পয়জনিং এর মত আপনার মাথায় পুরুষতান্রিক আধিপত্য ঢুকিয়ে দিচ্ছে, সেখান থেকে বের হয়ে আমাদের কি কোন নারীকে তার যথাযত সম্মান দেয়া সম্ভব?

সম্মান যে আমরা দিতে পারছি না আজকালকার ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি কিংবা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি দেখলেই সেটা বোঝা যায়। অনেক সমালোচনা থাকলেও নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা নিয়ে গেছি। ‘সেন্স অফ বিউটি’ আস্তে আস্তে ‘সেক্সুয়ালি’তে রূপ নিচ্ছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও বলিউডের সি গ্রেডের নায়িকারা সুড়সুড়ি যেসব দেয়া দৃশ্যে অভিনয় করত, আজকাল নামী দামী তারকারা সে ধরনের দৃশ্যে অভিনয় করেন। এটাকে অনেকে হয়ত আধুনিকতা বলবেন। কিন্তু আধুনিকতার লেবাসে এটা হল চাহিদা পূরণ। যখন ‘ইমরান হাশমির’ সিনেমা একের পর এক হিট হতে থাকে তখন আমীর খানকেও দুই একটা চুম্বন দৃশ্য রাখতে হয়। যখন ‘সানি লিওন’ খেমটা নাচ দিয়ে সুপার ডুপার হিট হয়, তখন আনুষ্কা শর্মাকেও ছুরি কাচির নিচে যেতে হয়। পর্ন ইন্ডাস্ট্রির কারনে ‘ফিমেইল বডি স্ট্যান্ডার্ড’ আজকাল এমন জায়গায় পৌছেছে যেটা স্বাভাবিক উপায়ে আর অর্জন করা সম্ভব না। তাই নামি দামি তারকারাও হর হামেশা প্লাস্টিক সার্জারি করাচ্ছেন। আস্তে আস্তে যে সেটা সাধারন মানুষের মাঝেও ছড়াবে সেটা আর বলার কি আছে। আমরা হব প্লাস্টিক সৌন্দর্য্যের প্লাস্টিক মানুষ।
তবে যত যাই বলা হোক না কেন, এই পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি এমন এক জায়গায় পৌছেছে যেখান থেকে ফিরে আসা আসলেই সম্ভব কি না সেটা একটা ভাববার বিষয়। পুরো বিশ্বে পর্নফিল্ম এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। প্রতি ৪০ মিনিটে একটা করে নতুন ফিল্ম বের হয়। হলিউডে যেখানে বছরে ৬০০ সিনেমা তৈরি করে সেখানে এই ইন্ডাস্ট্রি করে তৈরি করে ১৩০০০ ফিল্ম। সবচেয়ে ভয়াবহ হল এই ১৩০০০ সিনেমাকে দর্শকের কাছে পৌছানোর জন্য তাদেরকে খুব একটা কষ্টও করতে হয় না। যে কোন ১২ বছরের বাচ্চাও মোবাইল নিয়ে খেলার ছলে এদের কাস্টমার হয়ে যেতে পারে। সেটা আপনি হয়ত খেয়ালই করলেন না।

বোঝাই যাচ্ছে, দিন যত বাড়ছে, পর্নোগ্রাফির চাহিদা তত বাড়ছে। আর যতদিন চাহিদা থাকবে ততদিন প্রোডাকশন থাকবেই। আর থাকবে নারীর প্রতি পুরুষের আধিপত্য, ভদ্রলোকের পতিতাবৃত্তি আর ভোগ্যপন্য হিসেবে নারী। যৌনতা নিয়ে আমরা যে ফ্যান্টাসি কে জানে, এই পৃথিবী প্লাস্টিক সৌন্দর্য্যের মত, ‘প্লাস্টিক সেক্সের’ দিকেও গিয়ে যাচ্ছে কি না। সেক্স টয়, সেক্স ডল এগুলো কি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

There is one comment

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.